বিচিত্র দুনিয়া-অজিব দাস্তাঁ-হোরেশিও(পর্ব-৮) -বসন্ত’২৬

আগের পর্ব- পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব ৪, পর্ব ৫, পর্ব ৬, পর্ব ৭

কাঁকড়াবিছেরা রীতিমতো এলেমদার প্রাণী। পৃথিবীতে এদের প্রথম আবির্ভাব ঘটে সাড়ে চারশো মিলিয়ন বছর আগে। তখন অবশ্য এদের সেই মহান পূর্বপুরুষ, থুড়ি, পূর্ব-বিছে সমুদ্রে বিচরণ করত। ডাইনোসরদের আসতে তখনও দুশো মিলিয়ন বছর বাকি। সমুদ্র থেকে স্থলে উঠে আসতে বিছেকুলের আরও প্রায় পনেরো মিলিয়ন বছর লেগে গিয়েছিল। বাসস্থানের পরিবর্তন আর আকারে হ্রাস পাওয়া ছাড়া তাদের আর বিশেষ কোনও বদল এই এত বছরেও হয়নি। প্রায় দেড় হাজার প্রজাতির কাঁকড়াবিছের সন্ধান পাওয়া গেলেও জীববিজ্ঞানীরা সন্দেহ করেন, তাদের আরও বহু প্রজাতি থাকতে পারে। বেশিরভাগ প্রজাতির গড় আয়ু দুই থেকে দশ বছর। দীর্ঘায়ু না হলেও, এদের কেরামতির শেষ নেই। এমনিতেই এদের খাদ্যের প্রয়োজন খুব ঘনঘন পড়ে না, তবু তেমন ঝামেলায় পড়লে পুরো এক বছর না খেয়ে দিব্য কাটিয়ে দিতে পারে। আসলে খাদ্যাভাব ঘটলে নিজেদের শরীরের বিপাক ক্রিয়া এরা মন্থর করে দেয়। স্থলচর হলেও টানা দু-দিন পর্যন্ত জলের তলায় কাটিয়ে দিতে পারে এরা। এমনকি ঠান্ডায় জমে গিয়েও ডোন্ট কেয়ার কানাকাড়ি হাবভাব বজায় রাখে। বিজ্ঞানীরা জমে যাওয়া কাঁকড়াবিছেকে গলিয়ে দেখেছেন, তারা গলে গিয়েই নতুন উদ্যমে হাঁটাহাঁটি শুরু করে দিয়েছে। এসব অসামান্য গুণের কোনোটাই আমাদের নেই, তবু কাঁকড়াবিছে দেখলেই মানুষ রে রে করে তেড়ে যায়, অথবা ভয়ে চম্পট দেয়।

সঙ্গের ছবিটি ব্রেজিলের প্রাচীন বিচ্ছুর জীবাশ্ম। চিত্রঋণ: উইকিকমন্স

***

মহাভারতে কথিত আছে, পিতামহ ভীষ্ম দিব্যাস্ত্র দিয়ে বাঁধ তৈরি করে গঙ্গার গতি নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। মোজেস তাঁর ইজরায়েলি অনুগামীদের ফারাওয়ের বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য লোহিত সাগরকে বিভক্ত করে ফেলেছিলেন। এসব কাহিনি চিত্তাকর্ষক হলেও প্রমাণের অভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়। কিন্তু কানাডার নিউ ব্রান্সউইক আর নোভা স্কোশিয়ার মাঝে বে অফ ফান্ডি নামে এক খাঁড়িতে প্রায় এমনই আশ্চর্য এক কাণ্ড ঘটে প্রতিদিন। আটলান্টিক মহাসাগরের অংশ এই খাঁড়ির আকার কুপির মতো। ফলে জোয়ারের সময়ে প্রায় ১০০ বিলিয়ন টন জল এই কুপির ভেতর প্রবাহিত হয়। জলতল ফুলে ওঠে ৫২ ফুট পর্যন্ত। খাঁড়িতে এসে পড়া সেইন্ট জন নদী এই বিপুল তোড়ের ধাক্কা সামলাতে না পেরে উলটোবাগে বইতে থাকে তখন। জোয়ার নেমে গেলে আবার নদী তার স্বাভাবিক ধারায় গিয়ে পড়ে বে অফ ফান্ডিতে। এই উলটপুরাণের ফলে খাঁড়িতে বিচিত্র সব বাস্তুতন্ত্র তৈরি হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এমন আশ্চর্য দৃশ্য সারা পৃথিবীর পর্যটকদের টেনে আনে। তবে সময়মতো পৌঁছতে না পারলে সব মাটি।

অধ্যায়ের শুরুতে রইল বে অফ ফান্ডির ছবি, চিত্রঋণ: উইকিপিডিয়া

***

১৯২৭ সাল। কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক থমাস পার্নেল ক্লাসে ছোট্ট এক ডেলা পিচ (বিটুমিন) দেখিয়ে বললেন, “দেখতে কঠিন হলেও এটা কিন্তু আসলে ঘরের তাপমাত্রায় অতি ধীর গতিতে বয়ে যাওয়া তরল।”

ক্লাসের সবাই তো হেসে অস্থির। হাতুড়ি দিয়ে টুকরো করা যায়, হাতে মুঠো করে ধরে দেখা যায়, তা নাকি আবার তরল! পার্নেল তাঁর বক্তব্য প্রমাণ করার জন্য তখন যে পরীক্ষাটি শুরু করলেন তা পৃথিবীর দীর্ঘতম পরীক্ষা বলে আজ পরিচিত।

প্রথমে তিনি পিচের ডেলাটিকে গরম করে গলিয়ে ফেললেন। তারপর কাচের ফানেলে ঢেলে ঠান্ডা করতে দিলেন, ইয়ে, তিন বছর ধরে। ফানেলের নলির মুখ বন্ধ করা ছিল। ১৯৩০-এ নলিটা কেটে দিয়ে শুরু হল আসল মজা। এবার ঘরের তাপমাত্রায় যদি মাধ্যাকর্ষণ সেই জমানো পিচকে ধীরে ধীরে ফোঁটায় ফোঁটায় টেনে নামাতে পারে তবে ও-বস্তু যে তরল ছাড়া আর কিছুই নয়, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকবে না। শুরু হল দীর্ঘ প্রতীক্ষা। ঘরের তাপমাত্রায় পিচের সান্দ্রতা (viscosity) জলের ১০০ বিলিয়ন গুণ বেশি, ফলে প্রথম ফোঁটাটি পড়ল আট বছর পর, ১৯৩৮ সালে। দুর্ভাগ্যবশত পার্নেল সেই সময় উপস্থিত ছিলেন না। বলা বাহুল্য, যাদের জন্য এই অভূতপূর্ব পরীক্ষার সৃষ্টি, তারা ততদিনে কে কোথায় ছড়িয়ে পড়েছে। দ্বিতীয় ফোঁটা নামল ১৯৪৭-এ। পৃথিবীর কত পটপরিবর্তন ঘটে গেল এর মধ্যে। প্রতি আট-নয় বছর অন্তর নামতে থাকে এক-একটা ফোঁটা, কিন্তু পার্নেল স্বচক্ষে তা আর কোনোদিন দেখে উঠতে পারলেন না। তাঁর মৃত্যুর পর এই পরীক্ষার রক্ষক হলেন অধ্যাপক জন মেইনস্টোন, তাঁরও কপাল খুলল না। পরবর্তী বাহান্ন বছর ধরে নজর রেখেও সে স্বর্গীয় দৃশ্য থেকে তিনি বঞ্চিত হলেন। একবার তো স্রেফ কফি আনতে বাইরে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে দেখলেন যা ঘটার ঘটে গিয়েছে। ২০০০ সালে বসানো হল ক্যামেরা। সে-বছর দু-দুটো ফোঁটা পড়ল পরপর, তবুও পরিষ্কার ছবি এল না, ক্যামেরার সামনে অন্য কী যেন চলে এসেছিল। ২০১৪-তে ফোঁটা পড়ো-পড়ো হলে লাইভ স্ট্রিমিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। দুনিয়াজোড়া বিজ্ঞানীদের চোখ ছিল সেই ফিডে। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা। ফোঁটা যেমন পড়ার ঠিকই পড়ল, কিন্তু যান্ত্রিক গোলযোগের দরুন স্ট্রিমিং বন্ধ হয়ে গেল। কেউ কিছুই দেখতে পেল না। দশ নম্বর ফোঁটা পড়ার জন্য তৈরি হচ্ছে ধীরে ধীরে। হয়তো ২০৩০ নাগাদ ঝরে পড়বে। অবশেষে এই দুর্লভ দৃশ্য চাক্ষুষ করার মতো উপযুক্ত মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় কি না দেখা যাক।

রইল কাচের বাক্সে সযত্নে রাখা পিচ ড্রপ পরীক্ষার ছবি, পাশে ওয়েবক্যাম। চিত্রঋণ : কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়

 

আরও একটা কথা না বললে এই গল্প শেষ হয় না, পার্নেলকে ইগ নোবেল (Ig Nobel Prize) পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। ইগ নোবেল হল নোবেল পুরস্কারের প্যারোডি, ‘মানুষকে প্রথমে হাসায়, কিন্তু পরে ভাবায়’ গোত্রের অদ্ভুত সব গবেষণার জন্য ১৯৯১ থেকে এই পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়। পার্নেল জীবিত থাকলে খুশি হতেন কি না কে জানে।

 

 

Leave a Reply