বিচিত্র দুনিয়া-অজিব দাস্তাঁ-হোরেশিও(পর্ব-৭) -শীত’২৫

আগের পর্ব- পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব ৪, পর্ব ৫, পর্ব ৬

  

ক্রিপটোবায়োসিস বড়ো আশ্চর্য জিনিস। এ একেবারে শীতঘুমের অতিবৃদ্ধ ঠাকুরদা। অসহনীয় ঠান্ডায় কোনও কোনও অমেরুদণ্ডী প্রাণীর টিকে থাকার হাতিয়ার এই পদ্ধতি। শরীরের সব প্রক্রিয়া স্রেফ বন্ধ করে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে পারে এরা। শুকনো, মৃতপ্রায় হয়ে যায় বটে, কিন্তু সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি হলেই আবার জেগে উঠতে পারে। সাইবেরিয়ার চিরহিমায়িত অঞ্চল বা পার্মাফ্রস্টে এমনই এক কৃমিজাতীয় আণুবীক্ষণিক প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে এই স্লিপিং বিউটিরা মোটে একশো বছর নয়, ৪৬,০০০ হাজার বছর ধরে ঘুমিয়ে ছিল। প্রায় তিনশোখানা নমুনা পাওয়া গেলেও, মোটে দুটোর ঘুম ভাঙানো গেছে। পার্মাফ্রস্ট সমেত ওদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল গবেষণাগারে। সেখানে দ্রব হওয়ার পর দুটো কৃমি জল-টল শুষে দিব্য নড়াচড়া শুরু করে দেয়। শুধু তাই নয়, খাদ্যগ্রহণ, বংশবৃদ্ধি কিছুতেই তারা পিছপা নয়।

বলাই বাহুল্য, এদের নিয়ে এখন বিস্তর হইচই, পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে। কীভাবে ৪৬,০০০ হাজার বছর জীবনকে থামিয়ে রেখে আবার তাজা হয়ে উঠতে পারল এই প্রশ্ন তো আছেই, তাছাড়াও পার্মাফ্রস্টে না জানি আরও কী কী বিস্ময় অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। এই ঘুমন্ত রাজকন্যাদের পাওয়া গেছে ৩৭ মিটার নীচে। আরও গভীরে হয়তো অন্য কোনও অমেরুদণ্ডী প্রাণী ক্রিপটোবায়োসিস পালন করছে।

আর মঙ্গলগ্রহের পার্মাফ্রস্টে? প্লট থিকেনস।

ওপরে তার ছবি। চিত্রঋণ : Institute of Physicochemical and Biological Problems in Soil Science RAS (Russian Academy of Sciences)

***

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। বেলজিয়াম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে জার্মেনির বিরুদ্ধে। সেই প্রতিরোধে শামিল হয়েছে সাধারণ নাগরিকরাও। উলকাঁটা হাতে বয়স্ক মহিলারাও বাদ যাননি। না, সৈনিকদের সোয়েটার, মোজা বুনে দেওয়া তো ছিলই, তা ছাড়াও ছিল অন্য এক গভীর উদ্দেশ্য। ট্রেন লাইনের ধারে বসে তাঁরা শত্রুপক্ষের ট্রেনের যাতায়াত লক্ষ করতেন সারাদিন, আর সে-সব তথ্য বুনে দিতেন সোয়েটার বা মোজার মধ্যে। বোনার সময়ে প্রধানত তিন ধরনের ফোঁড় ব্যবহার করা হত— ‘ভি’ (V)-র মতো, ছোটো ছোটো বাম্প বা পোঁটলার মতো, আর ঘর ফেলে দিয়ে ছোটো ফুটোর মতো। এই তিন ধরনের ফোঁড়ের সংমিশ্রণে সংবাদ প্রেরণে রীতিমতো পোক্ত হয়ে পড়েছিলেন বুদ্ধিমতী বেলজিয়ান বৃদ্ধারা। কোন ফোঁড়ের কী মানে তা অবশ্য আগে থাকতেই ঠিক করা থাকত। তাছাড়া উলের গোছায় মর্স কোড অনুসরণ করে গিঁট ফেলে তথ্য পাচার করা তো এইসব মহীয়সীদের কাছে ছেলেখেলা। আপাতনিরীহ উলের জিনিস যে আসলে কী, বুঝতে সময় লেগেছিল শত্রুপক্ষের।

এইভাবে চোখের সামনে সাধারণ কিছুর ভেতর তথ্য গোপন করে রাখার পদ্ধতিকে বলা হয় স্টেগানোগ্রাফি।

চিত্রঋণ : stock photos, Getty images

***

১৯২৯-এর মার্কিন মুলুক। বিশ্বজুড়ে মহামন্দার প্রকোপ চলছে তখন। খাদ্যবস্তু থেকে পোশাক-আশাক— কোনোকিছুতেই অপচয় যাতে না হয়, সেদিকে গৃহস্থের কড়া নজর। ময়দা বা খাদ্যশস্যের কাপড়ের তৈরি বস্তাটা মোছামুছির কাজে বরাবরই লাগাত গ্রামের বাসিন্দারা, এখন টানাটানির সময় সেগুলোকে গামছা, টেবিলের ঢাকা হিসাবেও কাজে লাগাতে শুরু করল তারা। দিন যায়, মানুষের আর্থিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটতে থাকে। একদা গামছার কাজে ব্যবহৃত বস্তাকে পোশাক তৈরির কাজে লাগাতেও আর বাধল না তাদের। বস্তা জুড়ে জুড়ে তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের দেশের মতোই তখন পোশাক বানিয়েছিল খোদ মার্কিন দেশের চাষিরা। ধীরে ধীরে এই খবর কানে উঠেছিল ব্যবসায়ীদের। ১৯৩৬ সালে ক্যানসাস হুইট নামে এক ময়দা কোম্পানি পোশাকের উপযুক্ত নকশা করা বস্তা বাজারে চালু করে। স্বাভাবিকভাবেই হইচই পড়ে যায় বেশ। তবে পরোপকারের সদিচ্ছা থেকে এমন সিদ্ধান্ত, নাকি এর পেছনে তাদের উৎপাদিত দ্রব্য বেশি বিক্রি হবে এমন একটা অঙ্ক কাজ করছিল, সেটা বলা মুশকিল। ধরে নিচ্ছি, সদিচ্ছাই ছিল। একটা বস্তা দিয়ে তো পোশাক হবে না, তাই একরকম দেখতে বস্তা জমিয়ে বা অন্যের সঙ্গে বিনিময় করে চমৎকার সব পোশাক তৈরি হতে থাকল। বলাই বাহুল্য, শুধু ক্যানসাস হুইট নয়, অন্য ব্যবসায়ীরাও উঠে পড়ে লাগল।

এর পরে লাগল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। পোশাক ব্যবসায়ীদের মূল নজর তখন সৈনিকদের পোশাক তৈরির দিকে। ফলে বস্তা দিয়ে পোশাক তৈরির চল বন্ধ হল না একেবারেই। এর মধ্যে আবার যুদ্ধের বাজারে খরচ বাঁচানোর তাগিদে ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের অনুরোধ জানাল খালি বস্তা ফেরত দিয়ে যেতে। বস্তা বানানেওয়ালারা দেখল, ভারী মুশকিল। তাদের ব্যাবসা লাটে উঠবে তাহলে। ওরা উলটে ভীষণ সুন্দর দেখতে নকশায় ভরিয়ে তুলল বস্তা, যা দেখে কেউ আর বস্তা ফেরত দেবে না। হলও তাই। যা ছিল নিরুপায়ের আশ্রয়, তা ক্রমে হয়ে দাঁড়াল ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। যুদ্ধপরবর্তী কালেও এমন পোশাক রমরমিয়ে চলত। এমনকি কে কত ভালো বস্তার পোশাক বানাতে পারে সেই নিয়ে প্রতিযোগিতাও হত।

প্রথম ছবিতে নকশাকাটা বস্তা দিয়ে তৈরি কাঁথা ও বস্তা দিয়ে বানানো পোশাকের নমুনা। চিত্রঋণ : National Museum of American History, Washington, D.C.

দ্বিতীয় ছবিতেও একই জিনিস। চিত্রঋণ : Life Magazine

তৃতীয় ছবিতে পোশাক তৈরির নির্দেশিকার বিজ্ঞপ্তি। চিত্রঋণ: Western Development Museum Collection

***

বায়ুশূন্য পরিস্থিতিতে এক (১) পার্থিব দিনে, অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টা বা ৮৬,৪০০ সেকেন্ডে আলো যতখানি দূরত্ব যেতে পারে তাকে বলে লাইট ডে। সেটা হিসেবে দাঁড়ায় মাত্র ২৬ বিলিয়ন কিমি। আটচল্লিশ বছর আগে যাত্রা শুরু করা ভয়েজার-১ দু-হাজার ছাব্বিশ সালের নভেম্বর মাসে পৃথিবী থেকে এক লাইট ডে দূরে পৌঁছাবে। আর এক আলোকবর্ষ দূরে পৌঁছতে? সেও আর বেশিদিন বাকি নেই। হিসাবমতো আর ১৭,০০০ কি ১৮,০০০ বছর ভেসে বেড়ালেই সেখানে ঠিক পৌঁছে যাবে ভয়েজার দ্য স্পেস ট্র্যাভেলার। যদি না তার আগে কোনও কৃষ্ণগহ্বরের খপ্পরে পড়ে যায় সে।

চিত্রঋণ : NASA/ JPL-Caltech ( না, ভয়েজারের ছবি কেউ তোলেনি, নেহাতই শিল্পীর কল্পনা)

 

 

Leave a Reply