আগের পর্ব- পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব ৪, পর্ব ৫
১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে ইন্দোনেশিয়ার সুম্বাওয়া দ্বীপে মাউন্ট ট্যাম্বোরা থেকে হয়েছিল এক বিধ্বংসী অগ্ন্যুৎপাত। মানবসভ্যতার নথিভুক্ত ইতিহাস অনুযায়ী আর কোনও আগ্নেয়গিরি থেকে এত ভয়ানক বিস্ফোরণ কখনও হয়নি। ছাই আর অগ্ন্যুৎপাতে নির্গত সালফার ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়েছিল। বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত অন্যান্য যৌগের সঙ্গে বিক্রিয়ার ফলে তৈরি হয়েছিল সালফেট অ্যারোসল, যা সূর্যের আলোকে প্রতিফলিত করতে পারে। ফলে, সূর্যের আলো মাত্র আংশিকভাবে পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারছিল। স্বাভাবিকভাবেই পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল কয়েক ডিগ্রি। ১৮১৬ সালকে তাই গ্রীষ্মহীন বছর বলা হয়। পৃথিবীর কোথাও কোথাও নেমে এসেছিল অকাল শৈত্য, কোথাও-বা ফলে থাকা শস্যের ওপর নেমে এসেছিল অবিশ্রান্ত বৃষ্টি।
ইউরোপ আর উত্তর আমেরিকায় গ্রীষ্মকালীন শস্য ফলেনি সে-বছর, ফলে খাদ্যশস্যের দাম বেড়ে গিয়েছিল বহুগুণ। আয়ারল্যান্ডে ফসল নষ্ট হয়েছিল অকালবর্ষণে। ভারতবর্ষে বর্ষা আসতে দেরি হয়েছিল বটে, কিন্তু পরবর্তী সময়ের অতিবর্ষণে বঙ্গভূমির গঙ্গাপাড় থেকে মস্কো পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল কলেরার প্রকোপ। অসুখ, দুর্ভিক্ষ ও দুর্মূল্য খাদ্যদ্রব্যের কবলে পড়ে জর্জরিত হয়েছিল পৃথিবী। গ্রীষ্মহীন পৃথিবীতে শুরু হয়েছিল মৃত্যুর মিছিল।
তবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রভাব কেটে গিয়েছিল একদিন, আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এসেছিল জনজীবন। আজ মনুষ্যসৃষ্ট বিশ্ব-উষ্ণায়নের মাঝে দাঁড়িয়ে সে আশা আমরা বোধ হয় আর করতে পারি না। গ্রীষ্মহীন বছর নয়, হয়তো শৈত্যহীন এক যুগের দিকে দ্রুত এগিয়ে চলেছি আমরা।

রইল গ্রীষ্মহীন বছরে নিউ ইয়র্কের এক গ্রামের অগস্ট মাসের ছবি। চিত্রঋণ: মরিস ক্রিস্টোফার মর্লি কালেকশন
***
লিবিয়ার মরুভূমির গভীরে আছে এক উদ্ভট উপত্যকা, যার নাম ওয়ান টিকোফি – অর্থাৎ গ্রহের উপত্যকা, বা ভ্যালি অফ প্ল্যানেটস। এর কারণ, এই তিরিশ কিলোমিটার দীর্ঘ উপত্যকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অদ্ভুতদর্শন পাথরের সম্ভার। এর কোনোটা গোলাকার, কোনোটা আবার ডিস্কের মতো হয়েও মাঝখানটা গোলাকার, ঠিক যেন শনি গ্রহের মডেল। কোনও পাথর আবার উঁচু পিলারের ওপর বসানো।
এমনিতে ও-তল্লাটে লোকজন বিশেষ যায় না, থাকার মধ্যে আছে তুয়ারেগ নামক যাযাবর জাতি। তুয়ারেগরা কিন্তু হাজার দেড়েক বছর ধরে ওই অঞ্চলে আছে। তাদের আবার গ্রহ-নক্ষত্রের সঙ্গে গভীর সংযোগ। মরুভূমির অসহ্য উত্তাপ এড়াতে তারা দিনমানে ভ্রমণ করত না, যাযাবরগিরি যা করার সব রাতের দিকে। তাই পথ চলার জন্য গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের হিসেব জানা ছিল তাদের কাছে খুব জরুরি। হয়তো তুয়ারেগদের পূর্বপুরুষের শিল্পকীর্তি এইসব পাথর, তবে জানার কোনও উপায় নেই। আর পাথরগুলো দেখলে কেউ খোদাই করে বনিয়েছে বলেও মনে হয় না।
এখানেই চমকের শেষ নয়। এরা আবার ট্রোভান্ট, অর্থাৎ জ্যান্ত জিনিসের মতো আড়েবহরে বাড়ে। বলাই বাহুল্য, বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি এই অদ্ভুত পাথরের ওপর পড়তে বাধ্য।
তাঁদের মতে, এসব পাথর তৈরি হয়েছে ষোলো থেকে এগারো মিলিয়ন বছর আগে, মধ্য মায়োসিন যুগে। সে-সময় খুব ভূমিকম্প হত পৃথিবীতে, হয়তো তার ফলেই সৃষ্টি হয়েছিল এরা। কিন্তু এরা বাড়েই-বা কীভাবে? বিজ্ঞানীদের মতে, বৃষ্টির জল পড়লে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে পাথরগুলোর ভেতর। তার ফলেই এই বাড়বৃদ্ধি।
কারণ যাই হোক, এই অদ্ভুত উপত্যকার নাম ভ্যালি অফ প্ল্যানেটস হওয়া সার্থক।

হাতের মতো দেখতে পিলারের মাথায় মস্ত গোলাকার পাথরের ছবি রইল। কেমন ফিফা কাপের মতো দেখাচ্ছে না? চিত্রঋণ: thebrainchamber.com
***
স্পার্ম হোয়েলদের ঘুমানোর কায়দাটা অতীব চমৎকার। লম্বা একটা নিশ্বাস নিয়ে প্রথমে প্রায় পনেরো মিটার নীচে ডাইভ দেয় ওরা। তারপর জলের মধ্যে খাড়া দাঁড়িয়ে দশ থেকে পনেরো মিনিট গভীর ঘুম লাগায়। তবে একা নয়, পাঁচ-ছ’জন সঙ্গীসাথীকে জুটিয়ে দল বেঁধে এই মহান কর্মটি সম্পন্ন করে। এদের ঘুম আবার ইউনিহেমিস্ফেরিক, অর্থাৎ ঘুমের সময়ে এদের অর্ধেক মস্তিষ্ক পালা করে সজাগ থাকে সবসময়। এরা যে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমায়, সেটা ২০০৮ পর্যন্ত কেউ জানতও না। ঘুমন্ত স্পার্ম হোয়েলের প্রথম ছবি তোলা হয় ২০১৭ সালে, তোলেন এক ফরাসি আলোকচিত্রশিল্পী।

***
প্লেনে, নৌকায়, গাড়িতে না চেপে, স্রেফ হেঁটে সাউথ অ্যাফ্রিকার কেপ টাউন থেকে রাশিয়ার ম্যাগাদানে পৌঁছানো সম্ভব। বলা বাহুল্য, এটি পৃথিবীর দীর্ঘতম হাঁটার রাস্তা, লম্বায় ২২,৩৮৭ কিমি। দিনে আট ঘণ্টা করে হাঁটলে ল্যাজা থেকে মুড়োয় পৌঁছতে লাগবে মাত্র ৫৬১ দিন। মাঝে চমৎকার সব ব্রিজ আছে। রাস্তায় পড়বে ১৭টা দেশ, ছ’খানা টাইম জোন, আর গোটা ঋতুচক্র পালটাবে দুইবার।

নীচে রইল সেই লম্বা রাস্তার ছবি। চিত্রঋণ: ম্যাথ্যু কক্স, ডেইলি মেইল পত্রিকা