গল্প-লালি অন্তর্ধান রহস্য-পিয়ালী গাঙ্গুলি-শীত ২০২৫

পিয়ালি গাঙ্গুলীর আগের লেখা–  ফোচনের  কীর্তি , ফোচনের আরেক কীর্তি  মিঠে প্রতিশোধ , বেলুন দাদু , দুটি অণুগল্প , নতুন বছর , বাঘমামার বিয়ে, মাম্বোর শুঁড় , জঙ্গলের নতুন নিয়ম , টুংটাং, লেজ নিয়ে, জুনিয়র পাণ্ডব গোয়েন্দা,তিতাসের নৈশ অভিযান  , মায়ের যখন রাগ হয়

“এই, লালির পা দেখা যাচ্ছে ছবিতে।” কে যেন একটা চেঁচিয়ে উঠল।

আজ অফিসে পার্টি ছিল। এইচ.আর-এর কাছে বিল ক্লেম করতে গেলে বিল, ছবি সব পাঠাতে হয় হেড অফিসে। সেই ছবিতেই লালির পা দেখা যাচ্ছে। সে তো হবেই। ওঁকে বাদ দিয়ে ছবি তোলা যে দুঃসাধ্য। উনি তো সব আসরের মধ্যমণি। কাউকে বললে বিশ্বাস করবে যে অফিসে খাওয়াদাওয়ার সময় ওঁর জন্য আলাদা খাবার অর্ডার করা হয়? হ্যাঁ, মিস লালি হচ্ছেন টিউলিপ মিডিয়ার কলকাতা অফিসের প্রাণভোমরা। বেড়াল বলিয়া উহাকে তুচ্ছ করিও না। অনেকটা সি.ই.ও-র মতোই ওঁর প্রতিপত্তি। সকাল থেকে উনি এসিতে থাকেন, অন্যান্য তুচ্ছ বেড়ালদের মতো ওঁকে লোকের বাড়ি থেকে খাবার চুরি করতে হয় না। মাটিতে নয়, অধিকাংশ সময় উনি অফিসের কোনো না কোনো খালি চেয়ারে শুয়ে ন্যাপ নেন, আর মাঝে মাঝে এর-ওর কাছে গিয়ে একটু আদর খেয়ে আসেন। কাজেই উনি একেবারেই ‘আম’ বেড়াল নন, উনি হচ্ছেন এলিট ক্লাস। কিন্তু হেড অফিসের কাছে লালির ব্যাপারটা গোপনই রাখে কলকাতা অফিস। অতএব ফটোশপ করে ছবি থেকে লালির পা মুছতে বসল অফিসের ডিজাইনার ছেলেটি।

প্রীতির সেদিন অফিসে ঢুকতে একটু দেরি হয়েছে। অফিসে ঢোকার আগে একটা জরুরি কাজে একটু ব্যাংকে যেতে হয়েছিল। অফিসে ঢুকে দেখে কেউ কাজকর্ম করছে না, চারদিকে জটলা পাকিয়ে কী যেন আলোচনা চলছে। প্রীতি জুনিয়র একটি মেয়েকে জিজ্ঞেস করল কী হয়েছে। উত্তরে সে জানাল, লালিকে কেউ কিডন্যাপ করেছে। কাল অফিস বন্ধ হওয়ার পর থেকে ওকে আর দেখা যায়নি। অফিসের দারোয়ান, কেয়ারটেকার কেউই তাকে দেখেনি। কাল অফিস থেকে বেরোনোর সময়ও সবাই ওকে দেখেছে। ও নিজে থেকে তো কোথাও চলে যাবে না। এলগিন রোডের এই ঝাঁ-চকচকে অফিস বিল্ডিংটাই তো ওর বাড়ি। টিউলিপের স্টাফেরা ওর পরিবার। এত সুখ, এত ভালোবাসা ছেড়ে ও নিজে থেকে নিশ্চয়ই কোথাও যাবে না।

রোহিতের মাথায় হঠাৎ একটা ভাবনা এল।— “আচ্ছা ম্যাডাম, লালিকা এজ ক্যায়া হোগা? উও কিসিকে সাথ ইলোপ তো নহি কিয়া না?”

কথাটা শুনে প্রীতি হো হো করে হেসে উঠল। আশেপাশে সবাই। প্রীতি একটু কল্পনাপ্রবণ। রোহিতের কথাটা শুনেই ওর মনের পর্দায় দেখতে পেল লালি বেশ হ্যান্ডসাম একটা বেড়ালের সঙ্গে ‘কয়ামত সে কয়ামত তক’-এর জুহি চাওলার মতো বাড়ি থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। সেটা ভেবে আর এক রোল হাসিতে ফেটে পড়ল প্রীতি। কিন্তু লালির আচার আচরণে তো কোনও পরিবর্তন দেখা যায়নি। ও তো অফিসের এসি ছেড়ে নড়তই না, ও কখন অন্য বেড়ালের সঙ্গে ভাব জমাবে? অতএব এ থিওরি বাতিল। লালি খুবই অ্যাট্রাক্টিভ বেড়াল, ওকে অবশ্যই কেউ কিডন্যাপ করেছে।

একদিন দু-দিন করে এক সপ্তাহ কেটে গেল। লালির কোনও খবর নেই। বেড়ালের মিসিং রিপোর্ট করতে নেহাত থানায় যাওয়া যায় না। তা ছাড়া আর যেভাবে খোঁজখবর নেওয়া সম্ভব সব করা হল। প্রথমেই অফিসের সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ চেক করা হল। তাতে বিকেলবেলায় শেষ দেখা গেছে লালিকে। অফিসের সামনে চওড়া ফুটপাথে কুইন ভিক্টোরিয়ার মতো তিনি ওয়াক করছেন। কিন্তু তারপর থেকে তার আর কোনও ফুটেজ নেই। লালিকে ছাড়া অফিসটা কেমন যেন প্রাণহীন লাগছে সবার। বাংলা খবরের ভাষায় অফিসে ‘শোকের ছায়া নেমে এসেছে’। কাজের ফাঁকে সারাদিন কেউ না কেউ বলছে এই লালি এখানটা শুয়ে থাকত, এই লালির এখন লাঞ্চের সময়, কে জানে কোথায় আছে, কী খাচ্ছে। প্রীতিরও মনে হচ্ছে ও অফিসে ঢুকলে কীরকম ওর কোলে উঠে ওর মুখটা খানিক চেটেপুটে আদর করত।

অফিসের জেন-জি ইতোমধ্যে ‘ফাইন্ড লালি’ হ্যাশ ট্যাগ দিয়ে সোশাল মিডিয়ায় বেশ হইচই ফেলে দিয়েছে। অনেকে অনেক খবরাখবর দিচ্ছে। অফিসের কাজের মধ্যেও ম্যানেজ করে কেউ না কেউ ছুটে ছুটে এদিক-ওদিক দেখতে যাচ্ছে। কিন্তু প্রতিবারই আশাহত হয়ে ফিরতে হচ্ছে। তারা কেউই লালি নয়। এত বড়ো একটা শহরে, এত লোকের মাঝে লালি যেন কর্পূরের মতো উবে গেল। কলকাতার যত অ্যানিম্যাল রেসকিউ সেন্টার, পেট হসপিটাল আছে তাদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। কিন্তু কোনোদিক থেকে কোনও আশার আলো নেই। অফিসের বিল্ডিংয়ের মালিক মিস্টার মেহতা বেশ প্রতিপত্তিশালী লোক। ওঁর প্রচুর কন্ট্যাক্ট। কোনোদিকে কোনও কূলকিনারা হচ্ছে না দেখে উনি ওঁর তাবড় তাবড় পরিচিতদের কাজে লাগালেন।

কোথা থেকে কে কী খবর দিল জানা নেই, হঠাৎ এক শনিবারে শোনা গেল লালিকে নাকি বালিগঞ্জের কোন পার্কে দেখা গেছে। কাজকর্ম শিকেয় তুলে তাড়াতাড়ি অফিসের দুটো ছেলে গাড়ি নিয়ে ছুটল বালিগঞ্জ। নাহ্‌, এবারে আর নিরাশ হতে হয়নি। পার্কে গাছের তলার একটা বেঞ্চে লালিকে শুয়ে থাকতে দেখা গেল। গলায় কে যেন আবার একটা বো বেঁধে দিয়েছে। চেনা লোক দেখেই লালি ওদের কোলে উঠে বেশ খানিক চেটে-চুটে আদর করল। করেই এমন মুখ করে ওদের দিকে চেয়ে রইল যেন বলছে, ‘চলো, এবার আমায় বাড়ি নিয়ে চলো।’

অফিসে লালির জন্য রেড কার্পেট ওয়েলকাম অপেক্ষা করছিল। একে শনিবার, উইকেন্ড। এমনিতেই সবাই একটু ছুটির আমেজে থাকে। তারপর আবার লালি বাড়ি ফিরে আসছে। বড়োসড়ো একটা সেলিব্রেশন তো বনতা হ্যায়। ইতোমধ্যেই বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করা হয়ে গেছে। আজকে একটা নয়, লালির জন্য দু-চাররকম খাবার অর্ডার করা হয়েছে। জেন-জির মধ্যে সবচেয়ে কমবয়সিগুলো বেলুন-টেলুন দিয়ে অফিস সাজিয়ে ফেলেছে। সত্যিকারের একটা রেড কার্পেট জোগাড় করতে পারলেই ষোলোকলা পূর্ণ হত। সময়ের অভাবে সেটা নেহাত আর করা যায়নি।

ম্যাডাম লালি বিশাল দাদার কোলে চেপে গাড়ি থেকে নামলেন। অফিসের বাইরের দৃশ্যটা দেখলে মনে হচ্ছে কোনও সেলিব্রিটি এয়ারপোর্ট থেকে বেরোচ্ছেন আর তাঁকে ঘিরে পাপারাজ্জিদের ভিড়। এখানে শুধু সাংবাদিকদের বদলে আশেপাশের সমস্ত দোকানের কর্মীদের ভিড়। লালি যে সারা এলগিন রোড চত্বরে এত পপুলার, টিউলিপের লোকেরা আগে তা বোঝেনি। লালিও বেশ সেলিব্রিটি স্টাইলে পুরো অ্যাটেনশনটা উপভোগ করছে।

ওপরে উঠতেই বেলুন ফাটিয়ে লালিকে ওয়েলকাম করা হল। সবাই এসে এসে একবার করে লালিকে আদর করল। মিসেস মেহতা আর ওঁর দুই ছেলেমেয়েও এসেছিলেন লালিকে আদর করতে। খাওয়াদাওয়া ছাড়া কি সেলিব্রেশন জমে? তাই আর বেশি সময় নষ্ট না করে চটপট খাবারের প্যাকেটগুলো খুলে ফেলা হল। লালিকে সুন্দর প্লেটে করে সাজিয়ে খেতে দেওয়া হয়েছে। খেতে খেতে সমানে ছবি তোলা চলছে। লালির সঙ্গে প্রায় সবাই একটা করে সেলফি তুলল। তাছাড়া গ্রুপ ফটো তো বটেই। আজ কোনও বিল ক্লেম করা হবে না, অতএব লালিকে নিয়ে ছবি তুললে কোনও অসুবিধা নেই।

লালিকে ফিরে পেয়ে সবাই খুশি, কিন্তু প্রীতির মনে একটা জিনিস সমানে খচখচ করেই যাচ্ছে। লালি এই সাতদিন কোথায় ছিল? কী করেই-বা ও এলগিন থেকে বালিগঞ্জ পৌঁছল? কেউ কি ওকে ধরে নিয়ে গেছিল? কেনই-বা নিয়ে গেছিল? এসব প্রশ্নের আর কোনও উত্তর পাওয়া যাবে না। প্রীতি মনে মনে ঠিক করল, ভবিষ্যতে আবার এমন কিছু ঘটলে ফেলু মিত্তিরের সঙ্গে যোগাযোগ করবে।

জয়ঢাকি গল্প-উপন্যাসের লাইব্রেরি এইখানে

Leave a Reply