গল্প-সাহারার চোখ-চুমকি চট্টোপাধ্যায়-শরৎ’২৬

চুমকি চট্টোপাধ্যায়ের আরো গল্প
আজব মানুষের গজব কাহিনী, ভগবানের বেটা বেটি, শুদ্ধ ভক্তের ঘড়ি, জ্বর গাছ, হরিদ্রাবৃত্ত, কঙ্কাল কান্ড, আহা কী আনন্দ, রহস্য খুঁজতে খুঁজতে, সেরিমোনিয়াল পাইপ, ফরেনকাকু দ্য গ্রেট

“আজ প্রচন্ড গরম পড়েছে, পারা যাচ্ছে না।”  

“তাপমাত্রা যে খুব বেশি তা নয়, আর্দ্রতা বেশি। তাই অস্বস্তি বেশি হচ্ছে। তাও তো এখন লোডশেডিং হয় না। আগে কি মারাত্মক লোডশেডিং হতো? তিন ঘণ্টা, চার ঘণ্টা কারেন্ট থাকত না। বাবা রে বাবা! যা কষ্ট হত গরম কালে! তখন স্কুলে পড়ি। অন্য সময় তবু বারান্দায় বা ছাদে উঠে গল্প করে কাটিয়ে দিলেও, পরীক্ষার সময়ে পড়তেই হত। হ্যারিকেন, লম্ফ জ্বালিয়ে, ঘামতে ঘামতে, মশার কামড় খেয়ে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যেত। ভয়ানক কষ্ট গেছে। তোর মনে আছে সুবু?” 

“তা আর নেই! সেদিক দিয়ে এখন অনেক ভালো আছি। গরম লাগলে মাথার ওপর ফ্যান তো পাচ্ছি! হঠাৎ সীতেশকাকার কথা মনে এল। সেই লোড শেডিং-এর সময়ে কাকা থাকলে কেমন সব গা ছমছমে গল্প বলত। ভয় লাগত রীতিমতো।”  

“সীতেশকাকা একজন জিনিয়াস। দেশ দুনিয়া সম্পর্কে ওরকম নলেজ আজ অবধি আমি দেখিনি। শুধু কি ভয়ের, কী সব গল্প বলত বল তো! টাইম ট্রাভেল নিয়ে কত সন্ধে আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনেছি। লোডশেডিঙের কষ্টের মধ্যে ওটুকুই ছিল পরম পাওয়া, তাই না?”

“একদম তাই। সীতেশকাকা বিশ্বাস করতেন টাইম ট্রাভেল করা যায়। বিশ্বাস করতেন জাগ্রত অবস্থায় মানস ভ্রমণ করা যায়। মানে সবাই দেখছে এখানে বসে আছি, আমি কিন্তু তখন কাশ্মীরের ডাল লেকে শিকারায় চেপে ঘুরছি। সে সময়ে এসবের কিছুই বুঝতাম না। রূপকথার গল্পের মতো লাগত। এখন কিছুটা বুঝি তাও সবটা নয়। সমান্তরাল পৃথিবী যার প্যারালাল ইউনিভার্স নামটাই বেশি পরিচিত, সে সব কথাও সীতেশকাকার কাছেই শোনা। সত্যি বলছি ভাই, এই বিষয়টা আমি এখনও পরিষ্কার করে বুঝি না।”  

“আমিও বুঝি না, বোঝার চেষ্টাও করি না। কিন্তু সীতেশকাকা দুম করে উধাও হয়ে যাওয়াটা আজও হজম হয় না আমার। কী যে হল!”

“যেদিন শেষ এসেছিল আমাদের বাড়িতে তার পরদিন আমার অঙ্ক পরীক্ষা ছিল। সীতেশকাকাকে দেখে আমি তো দারুণ খুশি হয়েছিলাম। অঙ্ক আর জল — দুটোই কাকার কাছে এক।

“কাকা আসতেই ঘরে টেনে নিয়ে গেলাম। ট্রিগনোমেট্রি আমার মাথার ওপর দিয়ে যায়। সাইন, কস, ট্যান, সেকের ফরমূলা কিছুতেই মনে থাকে না। বিশ্বাস করবি না রোরো, একটা হাতের পাতা এঁকে যেভাবে আমাকে ফরমুলা মনে রাখার ট্রিক্স বুঝিয়ে দিল। এমন বুঝলাম যে আজও ভুলিনি। তার দুদিন পর থেকেই শুনলাম সীতেশকাকাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। খুব ভেঙে পড়েছিলাম। এত ভালোবাসার, শ্রদ্ধার একজন মানুষ এভাবে কোথায় যেতে পারে বল তো?”

“কী বলব বল, সবাটাই রহস্যে মোড়া। কাউকে কোনো কিছু না বলে কোথায় যে উধাও হয়ে গেল সীতেশকাকা, ভাবলেই মন খারাপ করে।”  

“মন খারাপের কী আছে, এই তো হাজির হয়ে গেলাম। মন প্রাণ দিয়ে ডাকলে স্বয়ং ভগবান দেখা দেন, আমি তো সামান্য মানুষ!”

“সীতেশকাকা!” হতবাক সুবু আর রোরো, “তুমি কোথায় চলে গেছিলে আর এলেই বা কবে? কত খুঁজেছি তোমাকে, কেউ তোমার খবর দিতে পারেনি।”  

“আরে দাঁড়া দাঁড়া বাচ্চারা। কোথায় গেছিলাম সেটা কেউ জানলে তো বলবে। আর তোরা তো জানিসই, আপনজন বলতে আমার কেউ নেই। তোদের মতো যারা আমাকে ভালোবাসে, তারাই আমার আপনজন। আমি এমন আচমকা গেছি যে কাউকে খবর দেবার সময়টুকু পর্যন্ত পাইনি। আর যেখানে গেছিলাম, সেখান থেকে খবরাখবর দেওয়া যায় না।”  

“কোথায় গেছিলে তুমি?” সুবু, রোরোর চোখে মুখে বিস্ময়। 

“সাহারার চোখের ভেতর।”  

“মানে?”

“আগে কিছু খাওয়া তারপর বলছি সব। খিদে পেয়েছে।”  

সুবু আর রোরো খুড়তুতো জ্যাঠতুতো ভাই। সাত মাসের ছোটো বড়ো। দুজনের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব। স্কুল পেরিয়ে এখন দুজনেই কলেজে পড়ছে। সুবুর ইচ্ছে জার্ণালিজম পড়ার আর রোরো আইন নিয়ে পড়ার প্রিপারেশন নিচ্ছে। 

সুবু, রোরোর দাদু ব্রজকিশোরবাবুর বন্ধুর ভাইয়ের ছেলে হলেন সীতেশ মুখার্জি। অল্প বয়েসে বাবা মা মারা যাওয়াতে একটু বাউন্ডুলে মতো হয়ে গেছিল। ব্রজকিশোরবাবুকে তার বন্ধু অনুরোধ করেছিল সীতেশের কোনো একটা কাজের ব্যবস্থা করে দেবার জন্য। সেই সূত্র ধরে ব্রজকিশোরবাবুর বাড়িতে আসা যাওয়া করত সীতেশ। অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছেলেটিকে ব্রজকিশোরবাবু এবং বাড়ির বাকিরাও খুব ভালোবাসত। ছোটোরা ছিল সীতেশের অন্ধ ভক্ত।

সীতেশের জন্য কারুর কিছুই করতে হয়নি, সে নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নিয়েছিল। বঙ্গীয় বিজ্ঞান কলেজের পদার্থবিদ্যা বিভাগের ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে যোগ দিয়েছিল সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায়। বিজ্ঞানের সব বিষয়গুলোতে তুখোড় ছিল সীতেশ। কী করে ওরকম হল তার ব্যাখ্যা নেই। ব্রজকিশোরবাবু বলতেন, সীতেশ আগের জন্মে ডক্টর হোমি ভাবা ছিল। 

পরোটা, আলুর দম আর ডবল ডিমের ওমলেট পেট ভরে খেয়ে, কড়া করে চিনি দুধ দেওয়া চা হাতে নিয়ে সোফায় পায়ের ওপর পা তুলে বসল সীতেশকাকা। সুবু আর রোরো চাতক পাখির মতো ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।

“ট্রিগনোমেট্রি করতে পেরেছিলি সুবু?”

“একদম। যা শিখিয়েছ না, এখনও ভুলিনি। তোমার কথা বলো কাকা। আর অপেক্ষা পোষাচ্ছে না।”   

“এই তো বলছি। রাতে শুতে যাবার আগে আমি একটু বইপত্তর ঘাঁটি। পৃথিবীটা একটা আশ্চর্য কারখানা জানিস তো। যতটুকু আমরা চোখে দেখি, তা কণামাত্র। এর বাইরে যে কী আছে আর না আছে, অবিশ্বাস্য! আমি যা বলব, তা হয়তো তোরা বিশ্বাস করবি না। যাইহোক, তাও বলি। 

“সেদিন রাতে আমি এনসাইক্লোপিডিয়া খুলে ‘The eye of the Sahara’ যাকে বাংলায় বলে সাহারার চোখ, সেই টপিকটা পড়ছিলাম। পড়তে পড়তে ভয়ানক ইচ্ছে হল জায়গাটায় যাবার। আমি বই বন্ধ করে খাটের ওপর শান্ত হয়ে বসে মনঃসংযোগ করলাম সাহারা মরুভূমির মধ্যেকার ওই বিশেষ জায়গাটার ওপর। 

“কতক্ষণ সময় পার হয়েছে জানি না, এক সময় আমার শরীরটা পালকের মতো হাল্কা হয়ে গেল আর আমি এক্কেবারে অচেনা একটা জায়গায় গিয়ে পড়লাম। চারিদিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলাম, ভারী সুন্দর একটা শহর। সুন্দর না বলে বলা উচিত অপূর্ব! 

“বড়ো বড়ো ঝকঝকে প্রাসাদ, ছোটো ছোটো বাড়িগুলোও কি চমৎকার। আমি অবাক হয়ে শহরটা ঘুরে দেখতে লাগলাম। শহরের আকৃতি হল গোল। মানে মাঝখানে একটা গোলাকৃতি শহর। তাকে গোল করে ঘিরে খালের মতো জলাশয়। আবার একটা শহরের বৃত্ত, সেটা ঘিরে জলাশয়ের বৃত্ত । তারপর আবার একটা জনবসতি, সেটা তৃতীয় রিং। তাকে ঘিরে আবারও জলাশয়। মানে তিনটে স্থলভূমি আর তিনটে জলভূমি। 

“অত্যন্ত উন্নত এক সভ্যতার দেখা পেলাম বুঝলি। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো কবেই লিখে গেছেন এই শহরের কথা, সেই খ্রিস্টজন্মের ৩৬০ বছর আগে। যার নাম উনি দিয়েছিলেন আটলান্টিস। এক রাত আর এক দিনের প্রলয়ে যে শহর ধ্বংস হয়ে গেছিল। আমি বুঝলাম, সেই আটলান্টিস শহরে আমি রয়েছি। 

“ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। অত প্রাচীন একটা শহরের কী সব পরিকল্পনা! বাড়ি বাড়ি জল পৌঁছনোর জন্য পাইপ লাইন বসানো। যাতায়াতের জন্য উড়ন্ত যান। প্রাসাদগুলো সম্ভবত সোনারুপোর পাত দিয়ে বানানো। সূর্যের আলো পড়ে কি ভীষণ ঝলকাচ্ছে।”  

সীতেশকাকা অনর্গল বলে যাচ্ছে, সুবু আর রোরো চুপ করে বসে শুনছে। দুজনের মনেই অনেক প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে কিন্তু ওরা কাকাকে মাঝপথে থামাচ্ছে না। 

“আমি ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। একটা স্থলভাগ থেকে আর একটায় যাবার জন্য শক্তপোক্ত ব্রিজ করা। অত প্রাচীন একটা শহর আমাদের এখনকার বড়ো বড়ো শহরের থেকে কত উন্নত। 

“ধাতু মানে মেটালের ব্যবহারও ওরা জানে দেখলাম। প্রাসাদের প্রহরীদের কোমরে যে তলোয়ারের মতো লম্বা অস্ত্র ঝুলছে, সেগুলো লোহা বা স্টিল নয়। ওই ধাতুর নাম অরিক্যাল্কাম। কোন কোন ধাতু মিলিয়ে তৈরি তা বলতে পারব না। 

“ঘুরতে ঘুরতে খিদে আর জল তেষ্টা দুটোই পেয়েছে । কী করি! রাস্তা দিয়ে অনেক মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। একজন বৃদ্ধ মানুষকে দেখে তার কাছে গিয়ে বললাম, ‘আমাকে খেতে দেবে কিছু?’  বৃদ্ধ অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকাল। ভাষা বুঝতে পারছে না তো! তখন আমি ইশারায় বোঝালাম। বৃদ্ধ মানুষটি তার সঙ্গে যেতে ইশারা করল।

“এক কাপ চা খাওয়া না, গলা শুকিয়ে গেছে।”  

সীতেশকাকার কথা শেষ হবার আগেই চা আর পপকর্ণ নিয়ে সুবুর মা ঘরে ঢুকল, “এতদিন কোথায় ছিলে ঠাকুরপো? সবাই তো চিন্তায় পড়ে গেছিল। যেখানেই যাও, বলে যাবে তো।”  

“ওই যাবার গল্পই করছি ভাইপোদের, পরে শুনে নিও। চা দিয়ে বাঁচালে বৌদি।

“কী যেন বলছিলাম, ও হ্যাঁ, আমি সেই বুড়ো মানুষটার পেছনে পেছনে গেলাম। উনি আমাকে দাঁড়াতে বলে ভেতরে গেলেন। তারপর ওই মেটালের বাটিতে করে সুজির মতো কিছু একটা আর জল এনে দিলেন। অপূর্ব খেতে সেই খাবার। আমি খেয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে তাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এগিয়ে গেলাম। 

“খানিকটা চলার পর একটা বড়ো মাঠের মতো দেখলাম যেখানে অল্পবয়েসী ছেলেরা হাতে লাঠি নিয়ে বড়ো বলকে ঠেলে ঠেলে খেলছে। অনেকটা আমাদের হকির মতো, বুঝলি তো। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলাম। বুঝলাম, বলটা পায়ে লাগলে আউট। লাঠি দিয়ে ঠেলেই নির্দিষ্ট গর্তে ফেলতে হবে। 

“সন্ধে হয়ে আসছে, রাতে থাকব কোথায় সেই চিন্তায় পড়লাম। পরের দিন যে কোনো একটা প্রাসাদ দেখতে যাব ঠিক করলাম। তখনো মাঠের ধারেই দাঁড়িয়েছিলাম। ছেলেপিলেগুলো আসতে আসতে চলে যেতে লাগল। আমি দেখতে পেলাম, মাঠের একদিকে প্রচুর ছোটো ছোটো টুলের মতো রাখা। আমি পরপর তিনটে টুলের ওপর শুয়ে পড়লাম। টুলগুলো ফিক্সড, নড়ছে না বলে আমার সুবিধে হল। মনোরম আবহাওয়া।

“ঘুমিয়ে পড়েছি। রাত্রে বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। ধড়মড় করে উঠে পড়লাম। বিশ্বাস করবি না, দেখলাম বিশাল বিশাল ঢেউ উঠে আসছে সমুদ্র থেকে। সে মনে হয় পনেরো কুড়ি তলা বাড়ির সমান উঁচু ঢেউ। আটলান্টিস তো মাঝ সমুদ্রে একটা দ্বীপ। সমস্ত বাড়িঘর ভাসিয়ে ঢেউ এগিয়ে আসতে লাগল। বুঝতেই পারছিলাম, এই দ্বীপরাজ্যটা আর থাকবে না। কিছুটা দূরে আগুনের হলকাও চোখে পড়েছিল। সেটা ঠিক কী ছিল, বুঝিনি। আমি আর কোনো কিছু চিন্তা না করে সমস্ত মনকে কেন্দ্রীভূত করে নিজের বাড়ির চিন্তা করতে শুরু করলাম। ঠিক সময়েই বাড়িতে ফিরে এলাম।”  

“এই এখন তুমি ওখান থেকে এলে নাকি সীতেশকাকা?”রোরো জিগ্যেস করল। 

“না রে, এটা বেশ কিছুদিন আগের কথা বলছি। আমি আবার চলে গেছিলাম, আটলান্টিসের কী পরিণতি হল সেটা দেখতে। মনোসংযোগ করে পৌঁছে গেলাম সেই আটলান্টিস যেখানে ছিল, সেই জায়গায়। অবাক হয়ে দেখলাম বিশাল জায়গা জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে এক গোলাকার চোখ, যেন ড্যাবডেবিয়ে তাকিয়ে আছে মহাশূন্যের দিকে। যেন বলছে ক্ষমা করে দাও মহাকাল, আমি উদ্ধত, অহঙ্কারী হয়ে গেছিলাম। 

“আমি বেশ খানিকটা ওপর থেকে দেখছিলাম, তাই পরিষ্কার দেখতে পেলাম সেই স্থলভাগ আর জলভাগের বৃত্তগুলো। মাঝখানের ভূখন্ডটা একটা চোখের মণির মতো হয়ে রয়েছে। এখনকার বিজ্ঞানীরা এটিকে রিচাট স্ট্রাকচার অথবা দ্য আই অফ দ্য সাহারা বলেন। এক অভাবনীয় দৃশ্য! তোরা যদি দেখিস না, অবাকের থেকেও বেশি কিছু হয়ে যাবি। তবে, এই স্ট্রাকচারটা কিন্তু মরুভূমি দিয়ে হেঁটে গেলে দেখতে পাবি না। এটা কেবল ওপর থেকেই দেখা যায়। অমন সমৃদ্ধশালী একটা দ্বীপরাজ্য, তার কী অবস্থা হয়েছে, দেখলে ভীষণ খারাপ লাগে। 

“যাইহোক, সব দেখেটেখে চলে এলাম। ফিরেই তোদের কথা মনে হল, তাই সটান এখানে হাজির হয়ে গেলাম।”  

সুবু আর রোরো মনে মনে একই কথা ভাবছিল। সীতেশকাকা এত গুলগাপ্পা কবে থেকে দিচ্ছে! এমন তো ছিল বলেই না কাকা। টাইম ট্রাভেল করে একেবারে আটলান্টিস! তাও আবার একবার নয়, দ্বিতীয়বার আই অফ দ্য সাহারায়! মাথাটা মনে হয় খারাপই হয়ে গেছে সীতেশকাকার। বাড়িতে ছিল না, এ কথা ঠিক,মনে হয় কোথাও ঘুরতে চলে গেছিল।

“কী রে, তোরা এরকম বমকে গেলি কেন? বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি? ভাবছিস সীতেশকাকা পাগল হয়ে গেছে, তাই তো?”

“না মানে তা ভাবছি না। তুমি এত জ্ঞানী মানুষ, কেন মিথ্যে বলবে। কিন্তু…”রোরোর কথা শেষ হবার আগেই সুবু বলে, “তুমি হঠাৎ যে চলে গেলে, বাড়িতে তালা দিল কে? নাকি খোলাই ছিল?”

“ও হো হো, এই জন্যে অবিশ্বাস করছিস? বলি তাহলে,দরজা ভেতর থেকে বন্ধই ছিল। টাইম ট্রাভেলে দরজা দিয়ে বেরতে লাগে না, তাই দরজায় তালা দেবার দরকার পড়ে না। অনেক জায়গাতেই গেছি, কিন্তু এরকম অভাবনীয় অভিজ্ঞতা আর হয়নি।”  

“আমাদের শিখিয়ে দাও না টাইম ট্রাভেল কী করে করতে হয়, তাহলে নিখরচায় নানান দেশে ঘুরে আসতে পারি।”  রোরোর কথায় সায় দেয় সুবু।

“তোদের কথায় একটা হাল্কা তাচ্ছিল্য ধরা পড়ছে আমি বেশ বুঝতে পারছি। তোরা আমার কথা ঠিক মানতে পারছিস না। আমি কিন্তু খুশি হচ্ছি তোদের এই পরিবর্তন দেখে। যা দেখবি, শুনবি তাই অন্ধের মতো বিশ্বাস করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তোদের মধ্যে সেই সেন্সটা তৈরি হয়েছে দেখে স্বস্তি পেলাম। সহজে ঠকবি না। যাইহোক, আমি তোদের দুজনের জন্য দুটো ছোট্ট উপহার নিয়ে এসেছি, নিজেদের কাছে রেখে দিবি, কাউকে দেখাবার দরকার নেই।”   পাঞ্জাবির পকেট থেকে দুটো ছোটো ছুরি মতো জিনিস বের করল সীতেশকাকা। 

“এই দুটো ছোটো ছুরি অরিক্যাল্কাম ধাতু দিয়ে তৈরি। এই দিয়ে সব কিছু নিখুঁতভাবে কাটা যায়। কাগজ থেকে শুরু করে মাংস অবধি। কয়েক পুরুষ ধরে ব্যবহার করলেও জং ধরবে না বা ধার কমবে না। এই নে।”  

সুবু আর রোরো হাত বাড়াল। সত্যি, অদ্ভুত শেপ ছুরি দুটোর আর রঙটা শ্যাওলা সবুজ ধরনের। 

“থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ কাকা।”   বলে দুজনেই মন দিয়ে দেখতে লাগল জিনিসটা। এ দুটো কি সত্যিই আটলান্টিস থেকে আনা কিছু নাকি … 

সুবু মুখ তুলে জিগ্যেস করতে গেল, “আচ্ছা সীতেশকাকা…” 

কিন্তু সোফা তো খালি! যেখানে সীতেশকাকা বসেছিল, কেউ নেই সেখানে। সুবু চীৎকার করে উঠল, “রোরো, কাকা কোথায় গেল?”

রোরো চোখ বড়ো বড়ো করে হাঁ হয়ে তাকাল সুবুর দিকে।

“এটা কী হল!” সুবুর চোখে অপার বিস্ময়। 

সীতেশকাকা কোথাও নেই।

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply