জয়ঢাকের অভিযান লাইব্রেরি- এভারেস্ট-এরিক শিপটন(অনু-বাসব চট্টোপাধ্যায়) অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ(অনু তাপস মৌলিক) কন-টিকি অভিযান- থর হেয়ারডাল (অনু-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়)
এই ধারাবাহিকের আগের পর্ব- পর্ব ১, পর্ব ২ পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব ৫ পর্ব ৬, পর্ব ৭, পর্ব ৮ পর্ব৯

স্যার অরেল স্টাইন ছিলেন একজন ব্রিটিশ পুরাতাত্ত্বিক। ১৮৬২ সালের ২৬ নভেম্বর তাঁর জন্ম হাঙ্গেরিতে। তিনি ব্রিটিশ সময়কালে নানা ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় নিযুক্ত ছিলেন। তিনি মধ্য এশিয়ায় একাধিক প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানে নেতৃত্ব দেন। তিনি শুধু একজন প্রত্নতাত্ত্বিকই ছিলেন না, ছিলেন একজন নৃতাত্ত্বিক, ভূগোলবিদ, ভাষাবিদ এবং জরিপকারী। ডানহুয়াং গুহা থেকে উদ্ধারকরা পুথি এবং পাণ্ডুলিপির সংগ্রহ মধ্য এশিয়ার ইতিহাস এবং বৌদ্ধধর্মের শিল্প ও সাহিত্যের অধ্যয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তাঁর অভিযান এবং আবিষ্কারের উপর বেশ কিছু বই লিখেছিলেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রাচীন খোটান, সেরিন্ডিয়া এবং আভ্যন্তরীণ এশিয়া বিষয়ক বই। সংস্কৃত থেকে রাজতরঙ্গিণীর ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন তিনি। চিরকুমার অরেল স্টাইন ১৯৪৩ সালের ২৬ অক্টোবর কাবুলে দেহত্যাগ করেছিলেন। এই নিবন্ধে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে চলেছে তাঁর তাকলামাকান মরুভূমির প্রত্নতাত্ত্বিক খোটান অভিযানের কথা।
কারা-কাশ রেঞ্জে
আমাদের জরিপ অভিযানের ফলে ইউরুং-কাশ নদীর উৎস ও তার স্রোতপ্রবাহ নিয়ে অনেক তথ্যই পাওয়া গেছিল। এর পরের অভিযান ঝুঁকিবহুল হলেও সমান আকর্ষণীয় ছিল। কারণ আমার উদ্দেশ্য ছিল কুয়েন-লুয়েন রেঞ্জের দক্ষিণ ও কারাংহু-তাগ-এর দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের প্রধান জলস্রোতগুলোর উৎস খুঁজে একটা জলবণ্টনের নকশা তৈরি করা, এই জলস্রোতগুলো আসলে মূল নদীর উপনদী সমূহ।
ওমশা উপত্যকার পশু চারনদারদের সহযোগিতায় ইউরুং-কাশ নদীতে মেশা উপনদীর সন্ধান করতে করতে আরও অনেক হিমবাহের দেখা পাব এই আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছিলাম। আমি নিশ্চিন্ত ছিলাম পথ যতই দুর্গম হোক, ইয়াক বাহিনীর পিঠে মালপত্র চাপিয়ে সে পথে আমরা যেতে পারব। জানতে পেরেছিলাম কাশ উপত্যকা থেকে কারা-কাশ নদীর ওপরের দিকের পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিসা উপত্যকা হয়ে কুয়েন-লুয়েন রেঞ্জে পৌঁছনো সম্ভব। ওমশা পশুচারকদের থেকে পাওয়া পথের সন্ধান আমাকে খানিক নিশ্চিন্ত করেছিল। যদিও কারাংহু-তাগ-এর লোকেরা আমার কাছ থেকে এই তথ্যটা গোপন করেছিল।
৩০ অক্টোবর নিসা উপত্যকার দিকে রওনা হবার আগে সবচাইতে বড়ো বাধা এসেছিল কারাংহু-তাগের ইজবাশির থেকে। একটাও ইয়াকও সে জোগাড় করে দেয়নি। আমরা যাতে আর না এগোই তা যে লোকটা প্রতি পদে পদে মনেপ্রাণে চাইছে সেটা আগেই টের পেয়েছিলাম। ও এই পথের খোঁজ শুধুমাত্র নিজের লোকেদের মধ্যেই লুকিয়ে রাখতে চায়। তাই আম্বানের আদেশ পাওয়ার পরেও চরম অসহযোগিতা শুরু করেছিল। শেষমেস আমাদের চিনা দোভাষী ইসলাম বেগ ও নিয়াজ বলে দিল, প্যান ডারিন-এর হুকুম অমান্য করলে তার ফল কি হবে একবার ভেবে দেখতে। তখন সে যখন বুঝতে পারল যে আমাদের আটকে রাখা যাবে না। এবারে সুড়সুড় করে তড়িঘড়ি লোক পাঠিয়ে উপত্যকার নানদিক থেকে ইয়াক এনে হাজির করা শুরু করল।
এতে করে অনেকটাই সময় নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এই সময় সংকীর্ণ উপত্যকায় দ্রুত অন্ধকার নেমে আসে।
১০টার সময় আমরা কাশ নদীর ধার ধরে যাত্রা শুরু করি এবং মাইল দু’য়েক যাবার পর পৌঁছই গেজ জিলগা নামের এক সরু উপত্যকায়। সেখান থেকে টানা তিন ঘণ্টা কঠিন চড়াই ভেঙে ১২৪০০ ফুট উঁচু পম-তাগ পাসে পৌঁছই। পূব থেকে পশ্চিমের এক অনন্যসাধারণ দৃশ্য সামনে দাঁড়িয়ে। মুজতাগ থেকে শুরু করে আরও বেশ কিছু তুষারাবৃত শিখরের ঢালে জমে থাকা হিমবাহের বরফ ঝকঝক করছিল সূর্যের আলোয়। পম-তাগের শীর্ষদেশ থেকে দেখা যাচ্ছিল নীচের কারাংহু-তাগ উপত্যকা। চোখে দেখে যা বুঝতে পারছিলাম দিগন্ত পর্যন্ত ছুঁয়ে থাকা কোনো শৃঙ্গই ২০০০০ ফুট-এর কম উচ্চতার নয়। এদের মধ্যে বেশ কিছু শৃঙ্গের উচ্চতা ২২ থেকে ২৩ হাজার ফুট হবে। এই অদ্ভুত সুন্দর পাহাড়গুলোর মাঝে নিসার চারণভূমি। কোন সন্দেহ নেই ওমাশার পশুচারকরা আমাকে সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছিল। আমি রাম সিংকে নিয়ে পম-তাগ পাস সংলগ্ন একটা শ’চারেক ফুট উঁচু গোলাকার টিলার উপর চড়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য চূড়ান্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম প্লেন টেবিল আর ফটো-থিওডোলাইট নিয়ে। জরিপের জন্য দিনটা ছিল আদর্শ। আকাশে মেঘের ছিটেফোঁটাও ছিল না। তাপমাত্রা ছিল একদম কাজের উপযোগী ৫০০ ফারেনহাইট (১০০ সেলসিয়াস।)
এক ভীষণ খাড়াই পাথুরে শৈলশিরা বেয়ে আমাদের মাল বোঝাই খচ্চরগুলো টুকটুক করে এগোচ্ছিল। এপথে দ্রুত এগোনোর চিন্তা কেউ ভুলেও মাথায় না আনে। প্রতিটি পদক্ষেপ সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে এগোন মানেই যেচে বিপদ ডেকে আনা। বিকেল সাড়ে চারটের সময় আলগা পাথরে ভরা পথ বেয়ে প্রায় হাজার তিনেক ফুট টানা নামার পর আমরা পৌঁছেছিলাম কারগাজ গিরিসঙ্কটে। পাহাড়ের মাথায় রোদ্দুর থাকলেও গিরিসঙ্কটের ভেতরে অন্ধকার নেমে এসেছে। সঙ্কীর্ণ গিরিসঙ্কট ধরে মাইল দু’য়েক যাওয়ার পর পৌঁছেছিলাম কারজাগ আর নিসার গিরিসঙ্কটের মিলনবিন্দুতে। সূর্যের আভা পুরোপুরি নিভে গেলেও পাহাড়ের ওপরের অংশ খানিক লালচে হয়েছিল তখনও।
নিসা গিরিসঙ্কটও খুব সঙ্কীর্ণ। দীর্ঘপথ চলে আসার পর অবসন্ন খচ্চরদের নিয়ে অন্ধকারে নদীতীরের পাথর আর ঝোপঝাড়ের ফাঁক বুঝে পথ চলা অসম্ভব ক্লান্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নদীর বাঁকে বাঁকে চোখ সয়ে যাওয়া অন্ধকারের চাপা আলোয় দেখতে পাচ্ছিলাম পরিত্যক্ত ছোট ছোট চাষের ক্ষেত আর মাটির কুঁড়েঘর। শুধুমাত্র গরমের সময় এখানে লোক বসবাস করে। কারাংহু-তাগের ইজবাশি বদমাইশি করে সময় নষ্ট না করালে রাতের অন্ধকারের দুর্ভোগ পোয়াতে হত না। ঘাড়ের ওপর শ্বাস ছাড়ছিল মাল পিঠে ইয়াকের দল। গন্তব্য এখনও অনেক দূর।
অবশেষে অনেক রাতে নিসা পৌঁছতে, ওখানকার এক মেষপালক আমাকে সাদরে তার মাটির কুঁড়েতে নিয়ে বসিয়েছিল। হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় কয়েকটা ইয়াক আর ভেড়ার মালিকের কুঁড়ের ভেতরে জ্বলতে থাকা কাঠের আগুনের তাপে আরাম মিলেছিল সঙ্গে সঙ্গে। আতিথ্যের আন্তরিকতায় ক্লান্তি দূর হয়ে গেছিল নিমেষে।
৩১ অক্টোবর নিসাতে থেকে গিয়েছিলাম আমরা। দলের লোকজন আর পশুদের বিশ্রামের প্রয়োজন তো ছিলই পাশাপাশি রাম সিং জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত কিছু পর্যবেক্ষণের জন্যও সময় চেয়েছিল। আমি খানিক ঘোরাঘুরি করে কারা-কাশ উপত্যকা হয়ে খোটানে পৌঁছোবার পথের হদিশ পেতে চাইছিলাম। কিন্তু বুঝতে পেরেছিলাম তথ্য পাওয়াটা প্রায় অসম্ভব। কোন দুর্বোধ্য কারণে তথ্য দিয়ে আমাকে সাহায্য করতে চাইছিল না এখানকার পাহাড়িরাও।
নিসাতে প্রায় কুড়িটি ঘর। শীতকালে যারা এখানে বসবাস করে তাদের অনেকেই এখনও দূর পাহাড়ে ইয়াক আর ভেড়ার পাল চড়িয়ে বেড়াচ্ছে। যদিও তাদের প্রায় সবারই ঘরে ফেরার সময় হয়ে এসেছে। ভরা শীতের আর বেশি দেরি নেই। খানকতক উইলো গাছ আর কয়েকটি তুষার শৃঙ্গ ছাড়া এক চিলতে ধূসর পাথুরে সমভূমিতে কিছুই দেখার নেই। কিন্তু আকাশ এখানে বিশুদ্ধ নীল। সূর্যের উষ্ণতা ক্লান্তি ভোলানো।
সভ্যতার ভাগ্য ভালো যে নিসা পশ্চিমের কোন অঞ্চল নয়। হলে শৌখিন পুরাকীর্তিওয়ালাদের খপ্পরে এর শোচনীয় দশা হত। এই অঞ্চল হল পৌরাণিক গল্পের ভারতীয় ‘ইন্ডিয়ান ককেসাস’এ ডায়োনিসাসের বাসস্থান যা স্বয়ং আলেকজান্ডার পরিদর্শন করেছিলেন বলে মনে করা হয়। ভাবতেও শিহরণ জাগে এইরকম এক অনুর্বর অগম্য পাথুরে অঞ্চল মহান বিজয়ী তার ভারত অভিযান কালে পরিদর্শন করেছিলেন।
ব্রেনজাক পাস-এ জরিপ

পয়লা নভেম্বর সকালে ব্রেনজাক পাস-এর দিকে রওনা হই। এই পাস নিসা উপত্যকা থেকে উত্তরের দিকের পাহাড়গুলোর দিকে যাবার পথ। এই পাসের মাথা থেকে ইউরুং-কাশ এর উৎসের একটা পরিষ্কার চিত্র পাওয়া সম্ভব, তাই সকাল থেকেই জরিপের প্রয়োজনে এই পাসের সর্বোচ্চ অংশে যতটা বেশি সময় সম্ভব কাটানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলাম। চাইছিলাম ব্রেনজাক পাসের শীর্ষের কাছাকাছি তাঁবু খাটাতে।
কিন্তু যা চাইছিলাম তা হয়ে ওঠেনি। যে গিরিখাত বেয়ে আমাদের এগোতে হচ্ছিল তা যেমনি সরু তেমনি খাড়া তার চড়াই। চলতে চলতে আমরা এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছিলাম যেখানে কয়েকটা তাঁবু খাটানো সম্ভব। অ্যানেরয়েড ব্যারোমিটার বলছিল জায়গাটার উচ্চতা ১২৮০০ ফুট। আমি ওখানে তাঁবু খাটাতে হুকুম দিয়ে গিরিখাতের দক্ষিণের খাড়া অংশ বেয়ে উঠতে শুরু করেছিলাম। আমার মন বলছিল যে গিরিখাতের উত্তর-পূর্ব দিকে বেয়ে উঠলে জরিপের উপযুক্ত খানিক জায়গা পাওয়া যাবে। কিন্তু ঝোড়ো ঠান্ডা বাতাসে শরীরে কাঁপুনি লাগায় নেমে আসতে বাধ্য হই। তাঁবুর ভেতরেও স্বস্তি মিলছিল না। তাঁবুগুলো ২৫ ডিগ্রি কোণে হেলে ছিল। না যাচ্ছিল ভালো করে বসা না যাচ্ছিল বিছানা পাতা। রাতটা প্রায় জেগেই কাটে আমাদের।
পরদিন সকাল সাতটায় তাপমাত্রা ছিল ২১০ ফারেনহাইট (-৬.১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস), আমাদের তাঁবুর কাছ দিয়ে বয়ে চলা ছোট্ট জলের স্রোতটা জমে বরফ হয়ে গিয়েছিল।
এদিন ঘণ্টাখানেক খাড়া চড়াই ভেঙে পৌঁছেছিলাম ব্রেনজাক পাসের মাথায়। অ্যানারয়েড-এ জায়গাটার উচ্চতা দেখাচ্ছিল প্রায় ১৪০০০ ফুট। পাহাড়ের যে অংশটাকে দূর থেকে জরিপের কাজে সবচাইতে উপযুক্ত বলে মনে হয়েছিল সেখানে পৌঁছনোই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বড়ো বড়ো খোঁচাওয়ালা পাথর স্তূপীকৃত হয়ে পড়ে পাসের মাথায়। ইয়াকের পিঠে জরিপের প্রয়োজনীয় মালপত্র চাপিয়ে কয়েকশো মিটার এগোনোর পর দেখা গেল ইয়াকদের নিয়ে আর এগোন সম্ভব নয়। পাথরের গায়ে ধাক্কা লেগে লেগে যন্ত্রপাতি সব ভেঙে যাবার অবস্থা। অভিযানের সঙ্গী এক তাঘলিক অনেক কষ্টে পাথরের ফাঁক দিয়ে কোনক্রমে পাথরের ছোঁয়া বাঁচিয়ে ফটো-থিওডোলাইট যন্ত্রটি নিয়ে এগোতে পেরেছিল।
শৈলশিরাটি ক্রমেই সরু হতে হতে চূড়ায় পরিণত হচ্ছিল। ঘণ্টাদেড়েক চলে শৈলশিরার মাথায় পৌঁছেছিলাম। জায়গাটিতে বরফ জমে শক্ত হয়ে ছিল।
উত্তর-পূর্ব কোণে খাড়া উঠে আছে মুদাচে-তাগ, এই চূড়ার দেখা এর আগেই আমরা পেয়েছি পম-তাগ পাস থেকে। হাতে অনেক সময় থাকলেও এই চূড়ায় ওঠা সম্ভব হতো না। একমাত্র দক্ষ পর্বতারোহীদের পক্ষেই এর চূড়ায় আরোহণ করা সম্ভব। ১৭২২০ ফুট উঁচু এই শৃঙ্গ পেছনের দৃশ্যকে আড়াল করে রেখেছিল। আকাশ ছিল একদম পরিষ্কার। মুজতাগ পর্বত স্বমমিহায় নিজেকে মেলে ধরে আছে। দক্ষিণ-পশ্চিমে অনেক তুষারাবৃত শৈলশিরা দেখা যাচ্ছিল যা এর আগে আমরা দেখতে পাইনি। এই শৈলশিরাগুলোয় ইউরুং-কাশ-এর উৎসের দিকটা ঢেকে রেখেছে। সুদূর দক্ষিণে দিগন্তে মেশা আকাশ জুড়ে অজস্র হিমবাহ আর তুষার ঢাকা শিখরের পটচিত্র।
নিসা উপত্যকার প্রান্তে আমাদের সবচাইতে কাছে শঙ্কুর মতো দেখতে যে চূড়াটি মাথা তুলে আছে তা আমাদের কষা হিসেবে ২৩০৭০ ফুট উঁচু। চূড়া থেকে নেমে আসা বরফের-স্রোত এতটাই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে মনে হচ্ছে যেন কারাংহু-তাগ উপত্যকার আকাশে কোন শিল্পী তার বিশাল ইজেল ঝুলিয়ে রেখেছে। পশ্চিম আর দক্ষিণ-পশ্চিম আকাশজোড়া চাঙ্কুল সহ আরও কয়েকটি শৃঙ্গ দূরের দৃশ্যকে আমাদের চোখের আড়াল করে রেখেছিল। প্রতিটি পাহাড়ই তাজা তুষারে ঢাকা। সম্ভবত ইসিক-বুলাকে থাকাকালীন এই তুষারপাত আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু এ-সব চূড়ার মাঝে অবস্থিত নীচের ইস্কুরাম উপত্যকার গিরিখাতে জমে থাকা বরফকে অনেক পুরনো লাগছিল, অনেকটা নতুন সৃষ্ট হিমবাহের মতো।
নীলকান্তমণির মতো উজ্জ্বল আকাশ চকচকে হিমবাহের নান্দনিক মাধুর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। দুপুর হয়ে গেলেও সূর্যের তাপ যথেষ্ট ছিল না, ২৫০ ফারেনহাইট (-৩.৮৮০ সেলসিয়াস।) আমাদের ভাগ্য ভালো যে বাতাসের তেজ ছিল না। ঘণ্টাদেড়েক এখানে থাকার পর আঙুলের সাড় খানিক ফিরে পাওয়ায় ফটো-থিওডোলাইট নিয়ে কাজ করতে সক্ষম হয়েছিলাম আমি। অ্যানারয়েড যন্ত্র দিয়ে জায়গাটার উচ্চতা মেপে দেখেছিলাম ১৫৩০০ ফুট।
দেড়টা নাগাদ আমাদের কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল। রাম সিং গত দশ দিন ধরে প্লেন টেবিলে যে কাজগুলো করেছিল সেগুলো একবার যাচাই করে নিতে পেরেছিল।
গিরিপথে ফিরে উত্তরের দিকে নামার জন্য আমাদের ইয়াকগুলো আবার ব্যবহার শুরু করলাম। কিন্তু নামার পথে এক অপ্রত্যাশিত অসুবিধার সামনে পড়তে হয়েছিল। গিরিপথ থেকে মাইল খানেক যাবার পর আমাদের নামতে হচ্ছিল এক সরু গিরিসঙ্কটের ভেতরে। সে পথের ওপরের অংশে ধুলো আর পাথর থাকলেও নীচের অংশ জমে বরফ হয়ে ছিল। সকালের তাজা তুষার দিনের তাপে গলে ভূ-ত্বকে প্রবেশ করে আবার জমে শক্ত বরফ হয়ে গিয়েছিল, যা ওপর থেকে বোঝা যাচ্ছিল না। এধরনের প্রকৃতিতে অভ্যস্ত ইয়াকগুলোর পা পর্যন্ত পিছলে যাচ্ছিল। আর ঢালটাও অসম্ভব খাড়াই। একবার পা পিছলে গেলে সোজা গিয়ে পড়তে হবে গিরিসঙ্কটের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত জলস্রোতে।
বরফ আর ধুলোর সহাবস্থান খোটান অঞ্চলের কঠোর পার্বত্যভূমির এক বৈশিষ্ট্য। প্রায় একঘণ্টা ধরে অতি সন্তর্পণে পা টিপে টিপে চলে আমরা বরফ-মাটির জায়গাটা পার হতে পেরেছিলাম নিরাপদেই। গিরিসঙ্কট এখানে বেশ চওড়া। ভাগ্য ভালো রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে আসার আগেই আমরা ‘চাশ’ নামের চারণভুমিতে পৌঁছোলাম। এই উপত্যকার নামও চাশ। আমার লোকেরা আমার ছোট তাঁবুটা শুকনো ঘাসের ওপর খাটিয়েছিল। তার খানিক দূরে বেশ কিছু বড়ো বড়ো পাথরের মাঝে বাকি লোকেদের তাঁবু। সামান্য এগিয়ে কিছু পাহাড়ি খোঁদলের গা ঘেঁসে নজরে এসেছিল কয়েকটি চামড়ার তাঁবু, তাতে অল্প কয়েকটি ভেড়া সম্বল করে গুটিকয় তাঘলিক পরিবার সারাবছর বাস করে। এরা মূলত গ্রীষ্মে এখানে ভেড়ার পাল চড়াতে নিয়ে আসা বোরাজান মেষপালকদের সাহায্যের ওপর নির্ভর করে। প্রায় ১০৫০০ ফুট উচ্চতায় জন্মানো নানা ভেষজ এই দরিদ্র তাঘলিকদের কঠোর শীত সহ্য করার অন্যতম চাবিকাঠি।
ইসলাম বেগ কয়েকজন সামনে পাঠিয়েছিল কাছাকাছি গ্রামের খোঁজে, কারণ নিসা থেকে নিয়ে আসা পশুদের খাবার প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। সন্ধের খানিক আগে চারজন তাঘলিক এসে উপস্থিত হয়েছিল মিতাজ গ্রাম থেকে, ওরা এসেই জানিয়েছিল বেগের কথামতো পশুখাদ্য আসছে। পশুখাদ্যের ব্যবস্থা পাহাড়ি তাঘলিকরা করে দিলেও কিছুতেই এই অঞ্চলের অন্য লোকেদের মতো ওদের কাছ থেকেও পাহাড় পেড়িয়ে কারা-কাশ উপত্যকায় যাওয়ার হদিশ বের করতে পারিনি। বার বার করে একটা কথাই আমার মনে হয়েছে কোনো দুর্বোধ্য কারণে এরা বাইরের লোকজনকে অবিশ্বাস করে, চায় না এই অঞ্চলে বাইরের লোকেরা এখানে আসা-যাওয়া করুক। পথের খোঁজ চাইতে একটাই উত্তর মিলেছে ‘বিলমাইদিম’– জানি না। আমাদের সঙ্গে আসা নিসার পশুপালকেরা পর্যন্ত ওদের এই না জানার ভান দেখে হেসে ফেলেছিল। তবে এখানকার লোকেরা যে ভীষণ অতিথিপরায়ণ তাতে ভুল নেই।
যগান-দাওয়ান

দলের লোকেরা খুব পরিশ্রান্ত থাকায় ৩ নভেম্বর খানিক দেরি করে যাত্রা শুরু করেছিলাম, – ঠান্ডার ভাব কমে গিয়ে রোদ ঝলমলে হয়ে যাবার পর। মাইলতিনেক হাঁটার পর আমরা পৌঁছেছিলাম চাশ উপত্যকায়। এখানে ইউরুং-কাশ বয়ে চলেছে পূর্বদিকে বাঁক নেওয়া এক গিরিসঙ্কটের মধ্যে দিয়ে। এখানে পৌঁছে প্রথমেই দলের পশুগুলোকে ঠেসে জল খাওয়ানো হয়েছিল, কারণ এরপর উপত্যকার ওপরের যে অংশ দিয়ে যেতে হবে তা প্রায় জলশূন্য। আমরা আগেই জেনে গিয়েছিলাম যে কিছু ঝর্না সেখানে থাকলেও তার জল এতো লবণাক্ত যে তা পানের অযোগ্য। আরও আট মাইল চলার পর পৌঁছেছিলাম যগান-দাওয়ানের পাদদেশে। আমরা চাশ থেকে তিন বস্তা বরফ বয়ে নিয়ে এসেছিলাম পানীয় জল পাওয়ার জন্য।
ঢালু জমিতে রাতটা তুলনামূলক আরামেই কেটেছিল। সকালে তাঁবু গুটিয়ে দলের লোকেরা রওনা দেবার আগেই আমি আর রাম সিং পাসের মাথার দিকে উঠতে শুরু করে দিলাম। নিসা থেকে আসা লোকেদের বেশ কয়েকজন আর আগে যেতে না চাওয়ায় সমস্যা দেখা দিয়েছিল। কারণ ইয়াকের সঙ্গে কাউকে না থাকতে হয়, গুঁতো না মারলে এই প্রাণীগুলো এগোতেই যায় না। তাই দলের অবশিষ্ট লোকেদের এক একজনকে তিনটে বা চারটে ইয়াকের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল।
কাজটা সহজ ছিল না মোটেই। যগান-দাওয়ান পাসের মাথায় চড়াটা খুবই কঠিন ছিল। দুই খাড়া পাহাড়ের মাঝে গিরিপথের শীর্ষবিন্দু। এখান থেকে এই অঞ্চলের পুরো দৃশ্যটা দেখা যাবে মনে করে আমরা পশ্চিমদিকের গিরিশিরা ধরে এগিয়েছিলাম।
প্রায় ১২০০০ ফুট উচ্চতায় একটা চমৎকার সার্ভে করার জায়গা খুঁজে পেলাম। পাথুরে শৈলশিরার মাঝে গভীর গিরিখাতগুলো দেখা যাচ্ছিল স্পষ্ট। ইউরুং-কাশ এবং কারাকাশে এসে মেশা নানা জলধারা বয়ে চলেছে সেইসব খাত বেয়ে। আমরা দুই নদীর জলবিভাজিকার মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে। কিন্তু নিসা থেকে যে সুউচ্চ পাহাড় অতিক্রম করে এখানে এসে পৌঁছেছিলাম তা আমাদের দক্ষিণের দৃশ্যকে পুরোপুরি অবরোধ করে দাঁড়িয়ে ছিল। এমনকি মুজতাগ পর্বতের উত্তরের খানিক হিমবাহের ঢাল ছাড়া আর কিছু নজরে আসছিল না।
কিন্তু পশ্চিমদিকে ক্রমে সমতলের দিকে মেশা দৃশ্যটি আমি কখনও ভুলব না। একের পর এক পাথুরে ঢালের ঢেউ পরপর এগিয়ে গেছে, জানা নেই কোন ঐশ্বর্য লুকিয়ে আছে ওই ঢেউয়ের উলটো দিকে। দূরে বহু দূরে দিগন্তের হলদেটে আভা জানান দিচ্ছিল আর এক জনহীন প্রান্তরের – কোনো হলদে বালির সাম্রাজ্যের কথা।
এক অসাধারণ গিরিখাতে
তিনঘণ্টা পর কাজ সেরে যখন পাসের মাথা থেকে উত্তর-পশ্চিম অভিমুখে চলা গিরিসঙ্কটের নীচে নেমে এসেছিলাম তখনও একটা দৃশ্যচিত্র মাথায় ভর করে ছিল। গিরিসঙ্কটের ভেতরের বর্ণনা দেওয়া সাধ্যাতীত। একের পর শিলাস্তম্ভ উঠে গেছে গিরিসঙ্কটের তল থেকে। শিলাস্তম্ভের এইরকম গঠন আমি আগে কখনও দেখিনি। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে দু’পাশের খাড়া পাথরের দেওয়ালের মাঝে হাজার ফুট পর্যন্ত সোজা উঠে যাওয়া নানা আকৃতির শিলা-বনের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হয়েছিল। ভূতত্বে আমার দীর্ঘ প্রশিক্ষণ আছে। সেই জ্ঞান থেকেই বুঝতে পারছিলাম, পাথরের এইরকম আকার এখানকার অদ্ভুত জলবায়ুর কারণে সৃষ্ট। জল ও বাতাসের ঘর্ষণে প্রকৃতির এ এক অসাধারণ শিল্পকলা। অথচ গিরিসঙ্কটের তলদেশে জলের চিহ্নমাত্র নেই। গোড়ালি পর্যন্ত ডুবে আছে ধুলোর স্তরে। গিরিসঙ্কটের মাঝে নেমে আসার পর থেকে প্রথম চার-পাঁচ মাইলের মধ্যে একটা সবুজের কণাও নজরে আসেনি। এরকম অনুর্বর গিরিখাত আগে কখনও দেখিনি। কোনো প্রাণী এখানে বেঁচে থাকতে পারবে না। জলের অভাব আমার ওপর সেরকম কোন প্রভাব না ফেলতে পারলেও দলের খচ্চর আর চমরিগুলোকে কাহিল করে তুলেছিল। প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা এক ফোঁটা জল পায়নি বেচারারা। অথচ, আমার নজর বারবার চলে যাচ্ছিল ঝুলন্ত পাথরের খোঁচ আর শিলাস্তম্ভের দিকে। কোন সন্দেহ নেই প্রকৃতির এই ভাস্কর্যের পেছনে আছে জলেরই হাত।
মাথার ওপরকার আকাশ জ্বলজ্বলে নীল, আশপাশের পাহাড় ঝকঝক করছিল সূর্যের আলোয়। শুধু গিরিখাতের তলদেশ অদ্ভুতরকম প্রাণশূন্য। দেখতে পাচ্ছিলাম আমাদের লটবহর পাথরের দেওয়ালে ঘষটা খেতে খেতে এগোচ্ছে। খচ্চর আর চমরিগুলো ওদের পিঠের বাঁধন প্রবল আক্রোশে পাথরের গায়ে ঘষে ছিঁড়ে ফেলে দিতে চাইছিল। একেকজন মানুষের পক্ষে তিন চারটে করে প্রাণীকে তাড়িয়ে নিয়ে চলা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছিল।
মাইল আটেক চলার পর পৌঁছেছিলাম অপেক্ষাকৃত এক খোলা উপত্যকায়। উপত্যকার নাম – মিতাজ। উপত্যকায় তাপ ছিল যথেষ্ট, তার থেকেও আনন্দের কথা উপত্যকার মুখেই আমরা দেখা পেয়েছিলাম এক জলস্রোতের। খচ্চর আর চমরিগুলো সশব্দে জল খেয়েছিল অনেকক্ষণ ধরে। একটা প্রাণহীন অঞ্চল পার হয়ে আসার পর জলের শব্দ আর পাথরে ধাক্কা খেয়ে শূন্যে ছিটকে ওঠা জলের বিন্দুগুলো আমার সমস্ত ক্লান্তি দূর করে দিচ্ছিল।
লটবহর নিয়ে দলের সবার পৌঁছতে এখনও অনেক দেরি। অতএব আমি আমার কাঁধের ঝোলা থেকে হোরাসের একটা ছোটো, সপ্তদশ শতাব্দীর সংস্করণ খুলে বসলাম। এই কবিতার বই সবসময় আমার কাঁধের ব্যাগেই থাকে। আমার মনে জেগে উঠছিল এক প্রশ্ন, কবির কল্পনায় কী হতে পারে এই পাহাড়ের বর্ণনা! এ পাহাড় তুলনাহীন! এর অতীত কি জানা নেই, কল্পনাতীত এর ভবিষ্যৎ। আমার পরে, যদি না কারো ভাগ্য কাউকে এ-পথে টেনে নিয়ে আসে, তবে কি আর কারো পায়ের চিহ্ন পড়বে কখনো এই পথে? অথবা, দূড় ভবিষ্যতে, হয়তো আমারই মতো কেউ আবার আসবে খোটানের মতো কোন নদীর উৎস সন্ধানে। ভবিষ্যৎ জানে!
৫ নভেম্বর নিসা থেকে দলে যোগ দেওয়া লোকজনের সমস্ত হিসেব চুকিয়ে ছেড়ে দিতে গিয়ে যাত্রা শুরু করতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। এখান থেকে মিতাজ গ্রামের লোকেরা তাদের পশুদের দিয়ে আমাদের মাল পরিবহনের দায়িত্ব নেবে। মিতাজ একটি খুব ছোট গ্রাম, আট-ন’টি পরিবার উপত্যকার ওপরের অংশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে।
আমাদের আগের যাত্রাপথের তুলনায় সামনের পথটিকে অনেক বেশি সহজ মনে হচ্ছিল। নদীর ধার দিয়ে দিয়ে গিয়েছে এ পথ। স্বচ্ছ নদীর জল দু’ফুটের বেশি গভীর নয়। চলার পথে বারবার নদী এপার-ওপার করতে হচ্ছিল। নদীর তলদেশে খোঁচা খোঁচা পাথর থাকলেও সহজেই সেই বাধা অতিক্রম করা যাচ্ছিল। শুধু বিরক্ত হচ্ছিল আমার টেরিয়ার কুকুর ইওলিচ বেগ, কেননা নদী পার হবার সময় প্রত্যেকবার ওকে ঘোড়ার পিঠে তুলে দেওয়া হচ্ছিল।
নদীর পাশ দিয়ে প্রায় মাইল ষোল পথ পার হয়ে যাবার পরও কোন মানুষজনের দেখা পাইনি। শুধু একটি গুহাবাসী মেষপালক পরিবারের চার শিশু ছাড়া। এদের বড়োটির বয়স সাত, গুটি বসন্তের ফলে শিশুটি তার দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিল। কিন্তু উপত্যকার খুঁটিনাটি ওর নখদর্পণে ছিল। ও আমাদের আগামী পথের দিশা দিয়ে দিয়েছিল। বলে দিয়েছিল সামনের গ্রামের নাম। আমার কাছে একটা রুপোর পাত ছিল, সেটা ওকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলাম। ও কথা দিয়েছিল রুপোর পাতটি ও ওর মায়ের জিন্মায় রেখে দেবে।
বাচ্চাগুলোর সান্নিধ্য ছেড়ে খানিক এগিয়ে মিতাজ উপত্যকা ছেড়ে সমতলের দিকে যাবার এক বিকল্প পথ কুনাট পাসের মুখে আমাদের ক্যাম্প করেছিলাম। যদিও আমাদের জেনেছিলাম দূরত্ব কম হলেও এই পথ খুবই দুর্গম। গিরিখাত সরু ও পাথরে ভরা, ঘোড়া নিয়ে চলার জন্য মোটেই উপযুক্ত নয়।
হাইপসোমিটার বলছিল জায়গাটার উচ্চতা ৬৮৯০ ফুট। সকাল সাতটায় তাপমাত্রা ছিল হিমাঙ্ক বিন্দুতে। সমভূমির গন্ধ পেতে শুরু করেছিলাম। ৭ নভেম্বর মিতাজ নদীর পাশ দিয়ে মাইল আটেক যাবার পর ডানদিকে এক বালি-পাথরের ঢাল নজরে এসেছিল। ঢালটি ক্রমশ ওপরের দিকে উঠে একটি শৈলশিরায় মিশেছে। আশপাশের পাহাড়ের অন্য ঢালের সঙ্গে কোন মিল নেই এই ঢালটার। কোন পাথরের খোঁচ নেই, একটা ঢাল ধীরে ধীরে উঠে গেছে ওপর পানে। সে কারণেই বাস্তবের তুলনায় অনেক কম উঁচু মনে হচ্ছিল ঢালটিকে। এমনকি রাম সিংএর মতো ঝানু লোকও ঢালটির উচ্চতা খুব বেশি হলে ১০০০ ফুট মতো হবে বলে ধরে নিয়েছিল।
ফলে, আমরা ঢাল বেয়ে ওঠা শুরু করবার আগে বুঝতে পারিনি আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে। আড়াই ঘণ্টা ধরে আমাদের খচ্চরগুলো ২৫০ ঢাল বেয়ে ওপরে ওঠার জন্য লড়ে গিয়েছিল। পুরো ঢালটাই ছিল আলগা মাটি আর নুড়িতে বোঝাই। আর তার ওপর পুরু হয়ে জমে ছিল ধুলো। ওপরে পৌঁছতে যত দেরি হবে ততই আলোর অভাবে চারপাশের দৃশ্য দেখার সম্ভবনা কমে যাবে। লাদাখের দিকের ত্রিভুজের মতো চূড়াগুলোর রেখা দেখা পাবার কোন আশাই থাকবে না। এটাই আমাদের খোটানের অবস্থান নির্ভুলভাবে ভারতীয় ত্রিকোণমিতিক সমীক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার শেষ সুযোগ। মুজতাগ পর্বত যে বারবার আমাদের নানা সময় নানা কোন থেকে ধরা দিয়েছে শুধুমাত্র তার অবস্থান দেখান এই জরিপ বা সমীক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়।
উলুঘাট-দাওয়ান-এ রাত
চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে দ্রুত ওপরের দিকে উঠতে শুরু করেছিলাম। লম্বা ঢালের মাথায় উলুঘাট-দাওয়ান পাসের শীর্ষ ছাড়িয়ে উঁচু পাহাড়ের মাথা দেখা যাচ্ছিল, যত ওপরের দিকে উঠছিলাম ঢালের খাড়াই তত কমে আসছিল। কিন্ত একটা বিশাল পাথরের দেওয়াল বাঁদিকের দৃশ্যকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। ফলে পাসের শীর্ষে না পৌঁছনো পর্যন্ত আমার উৎকণ্ঠা বেড়েই চলেছিল। শুধুমাত্র রাম সিংকে সঙ্গী করে দলবলের থেকে অনেক আগে ছুটছিলাম আমি। অবশেষে দুই পাহাড়ের ঢালের মাঝে খানিক সমতল ‘স্যাডেল’-এ পৌঁছেছিলাম। সেখান থেকে দক্ষিণের দিকে একটা চওড়া টিলা দেখে তার মাথায় চড়ে দেখে নিতে চাইছিলাম আমাদের মনস্কামনা পূরণ হবার কোন সম্ভবনা আছে কিনা।
খচ্চর ছেড়ে একরকম ছুটতে শুরু করেছিলাম দু’জন। টিলার মাথায় পৌঁছে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম সামনের দৃশ্য দেখে। গত তিন-সপ্তাহ ধরে যে সব অঞ্চলে চষে এসেছি সেই প্রায় পুরো অঞ্চলটাই আমাদের চোখের সামনে। শুধু তাই নয় অর্ধবৃত্তাকার আকারে সামনে দাঁড়িয়ে সেই সব তুষারমৌলী যা বিভিন্ন সময়ে নানা পাহাড়ের ঢাকা পরে থাকার কারণে আমাদের দৃষ্টির আড়ালে ছিল।
মুজতাগ ছাড়িয়ে ইউরুং-কাশএর উৎসের দিকের ঝকঝকে পাহাড়গুলো দেখা যাচ্ছিল পরিষ্কার। ইসিক-বুলাক আর নিসা উপত্যকার মাঝে যে সব হিমবাহগুলো আমরা ছুঁয়ে এসেছিলাম সেগুলো নিজেদের মেলে ধরেছিল, গম্বুজ, পিরামিড, শঙ্কু আকৃতির নানা রূপ সুউচ্চ বরফ চূড়ার ফাঁক দিয়ে।
পশ্চিমে কারা-কাশ নদীর জলের স্রোতকে বেড় দিয়ে উঠে গেছে একের পর এক বরফে ঢাকা পাহাড়ের ঢাল। কোন ইউরোপিয়ানের চোখ দক্ষিণ থেকে এই দৃশ্য আগে কখনও দেখেনি। উত্তরের দিকে পাথুরে শৈলশিরাগুলো ক্রমশ উচ্চতা হারিয়ে খোটান মরুদ্যানের সমতলে মিশেছে।
বিকেল তিনটে বেজে গিয়েছিল টিলার মাথায় পৌঁছতে। আমাদের হাতে থিওডোলাইট নিয়ে কাজ করার মতো আর সময় ছিল না।
এইখানে, প্রকৃতি নিজেই যেন আমাদের কাজের জায়গা ঠিক করে দিয়েছিল। যেন বলে দিয়েছিল ওটাই হবে আমাদের রাতের আস্তানা। সেইমত টিলা থেকে আমরা শৈলশিরার মাথায় নেমে এসেছিলাম। তাঁবু খাটানোর জন্য জায়গা থাকলেও সেখানে জল ছিল না। এইরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে আশঙ্কা করে আমি ইসলাম বেগকে দলের অনেক আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিলাম কারা-কাশের এক গ্রাম পুজিয়াতে। ওকে বলে দিয়েছিলাম নতুন করে খচ্চর জোগাড় করে সঙ্গে জল নিয়ে শৈলশিরার মাথায় আসতে। সূর্যাস্তের পূর্বে আমাদের দল শৈলশিরার মাথায় এসে তাঁবু খাটানোর আগেই আমাদের সেকশান শিটে দেখানো পয়েন্টগুলো নিয়ে আমরা কাজ করতে শুরু করে দিয়েছিলাম।
প্রার্থনা করছিলাম যেন আবহাওয়া আমায় হতাশ না করে। প্লেন টেবিলে আমাদের স্থান সঠিক নিরুপণ করে নেবার পর, এতো এতো চূড়ার ভিড়ে সহজেই কুয়েন-লুয়েন পিক-১ নির্দিষ্ট করে ফেলা গিয়েছিল। কাশ উপত্যকার হিমবাহের ওপরে, ২১৭৫০ ফুট উচ্চতায় পিরামিড আকৃতির এই শৃঙ্গের মাপ ইতিপূর্বে ভারতীয় জরিপ দল নিয়েছিল। এর অবস্থান আমাদের মানচিত্রের নির্দেশিত দিকনির্দেশের সঙ্গে সঠিকভাবে মিলে গিয়েছিল। পূব দিকে আর একটি চূড়াকে, ‘টার্টারি পিক নং 2’ হিসেবে চিহ্নিত করা গিয়েছিল অনায়াসে। ইস্কারুম পর্বতশ্রেণী ফাঁক দিয়ে একটা বহু দূরের বরফ চূড়া দেখা যাচ্ছিল, আমাদের সার্ভে টেবিলে অজানা পর্বতটিকে উল্লেখ করা হয়েছিল ‘কারা-কাশ পিক নং ২’ বলে। আমাদের হিসেবে পর্বতশৃঙ্গটির উচ্চতা ২২০০০ ফুটের কাছাকাছি।
দক্ষিণের বরফ ঢাকা পাহাড়ের ঢালে সূর্যাস্তের দৃশ্য ছিল অতুলনীয়। মধ্যবর্তী পাহাড়গুলো কালচে নীলাভ আলোয় ডুব দিয়েছিল, কিন্তু ইউরুং-কাশ-এর হিমবাহ পার করে অবস্থিত বরফপাহাড়ের মাথায় তখনও জ্বলজ্বল করছিল সূর্যাস্তের আলো।
ধীরে ধীরে আলোর রঙ বদলাতে শুরু করেছিল। প্রথমে গোলাপি আভা ছেয়ে গিয়েছিল বরফে, তারপর লাল থেকে আরও ঘন লাল হতে হতে সে আভা হঠাৎ অন্ধকারে বদলে গিয়েছিল। শুধু মুজতাগ পর্বতের গম্বুজ চূড়া আর আমাদের সদ্য আবিষ্কৃত আর এক চূড়া ‘কুয়েন-লুন পিক ১’ এর মাথাটুকু লাল আলো ধরে রেখেছিল অনেকক্ষণ।
সমতলের দিকে হলদে কুয়াশায় রঙের খেলাও ছিল দেখার মতো। কিন্তু বেড়ে চলা হাওয়ার গতি আর প্রচণ্ড ঠান্ডা আমাদের বাধ্য করেছিল তাঁবুর ভেতরে ঢুকে যেতে। এই ঠান্ডায় আমার জলের বোতলে যতটুকু জল ছিল তা দিয়ে এক কাপ কফি হয়েছিল। সেটাই ক্লান্তি দূর করে দেবার জন্য যথেষ্ট ছিল।
ইসলাম বেগ বা জল বা খচ্চর কোনোকিছুই এসে পৌঁছয়নি। তবে আজকের দিনের কাজের সফলতা আমার খিদে, ক্লান্তি সব ভুলিয়ে রেখেছিল।
পাহাড়ের পাদদেশ থেকে উঠে আসা চাঁদ আমাকে এরপর আবার তাঁবুর বাইরে টেনে আনে। এই উচ্চতায় ঝকঝকে চাঁদের আলো আগেও আমি ভারতে উপভোগ করেছি।
পূবদিকের শৈলশিরাগুলো চাঁদের নরম আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। সমতলভূমি থেকে ধুলোর কুয়াশার মধ্যে দিয়ে যখন চাঁদ নিজেকে প্রকাশ করছিল তখন মনে হচ্ছিল যেন সমুদ্রের বুক থেকে মাঝ আকাশের দিকে যে যাত্রা করছে। কিন্তু সমতল থেকে যত উপরে উঠছিল তার আলোর তেজ যেন খানিক কমে যাচ্ছিল।
এরপর ঠান্ডার কাঁপুনিতে বাধ্য হয়ে ফিরে গিয়েছিলাম তাঁবুর ভেতরে, বসে গিয়েছিলাম নিষ্প্রাণ ভূমি থেকে বন্ধুদের ক্রিসমাসের শুভেচ্ছা পত্র লিখতে। যদিও জানি না এ’চিঠি কবে তাদের হাতে পৌঁছবে। আমি জানি, ইহজীবনে এমন চাঁদের দৃশ্য আর একবারও দেখা হবে না।
রাত দশটা নাগাত তাঁবুর বাইরে হইচই শুরু হয়ে গিয়েছিল। ইসলাম বেগ হাজির হয়েছে জলভর্তি কিছু পাত্র নিয়ে। যদিও জল খুব কমই ছিল কিন্তু দলের সবার কয়েক কাপ করে চা হয়ে গিয়েছিল। এমন কি সাদাক আখুন আমার জন্য খানিক খাবারও বানিয়ে দিয়েছিল ওই রাতে। সেই খাবার খেয়ে, এরপর মাঝরাতের পর তাঁবুতে শুয়ে খানিক ঘুমিয়ে নিয়েছিলাম।
পরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল তখন সূর্য সবে পূব আকাশের এক শৈলশিরার মাথা টপকে অর্ধেক দেখা দিয়েছে। আকাশ হালকা মেঘে ঢেকে ছিল। আমাদের সৌভাগ্য পাহাড়ের দক্ষিণ দিগন্তরেখা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। আমরা আর সময় নষ্ট না করে আগের দিন ঠিক করে রাখা কাজের জায়গায় পৌঁছে কাজ শুরু করে দিলাম। বিস্তৃত জায়গাজোড়া অজস্র পাহাড়চূড়া নির্দিষ্টকরণের কাজটা মোটেই সহজ ছিল না। শুধু তাই নয় অন্য জায়গায় পৌঁছে এগুলোকে অন্য কোণ থেকে আবার নির্দিষ্টকরণ করতে হবে। পাঁচ ঘণ্টা টানা কাজ করে আমরা ২৬টা বিশিষ্ট বিন্দু নির্দিষ্ট করতে পেরেছিলাম। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড হাওয়ায় মেঘ সরে গেলেও ঠান্ডা কাঁপিয়ে দিচ্ছিল আমাদের। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে কাজ করছিলাম তার উচ্চতা ছিল ৯৮৯০ ফুট।
আমি ফটো-থিওডোলাইট দিয়ে দেখে প্রত্যেকটা বিন্দু এমনভাবে চিহ্নিত করেছিলাম যাতে পরবর্তীকালে ‘ট্রাঙ্গুলেশান স্টেশান’ হিসেবে এই বিন্দুগুলো শনাক্ত করতে কোন অসুবিধা না হয়। যেখানে কাজ করছিলাম তা চিহ্নিত করে রাখার জন্য পাথরের টুকরোর দরকার ছিল। কিন্তু জায়গাটা এমন ছিল যে আশেপাশে অনেক খুঁজেও পাথরের টুকরো পাওয়া যায়নি। পুজিয়া থেকে যে লোকগুলো ইসলাম বেগের সঙ্গে জল নিয়ে এসেছিল তারা একটা উপায় করেছিল। বালি মাটির সঙ্গে ঘাস আর আর লতাপাতা ছিঁড়ে মণ্ড তৈরি করে একটা ঢিবি মতো বানিয়ে দিয়েছিল।
ক্যাম্পে ফিরে খুব খুশি হয়েছিলাম এক কাপ চা পেয়ে, আমাকে অবাক করে আমার হাত-মুখ ধোবার জলও হাজির করা হয়েছিল। কারা-কাশ নদীর পারের এক গ্রাম পপুনা থেকে আমাদের জন্য অনেকটা জল পাঠানো হয়েছিল। জনমানবহীন শুকনো পাহাড়ের উচ্চতায় মুখ গোমড়া করে বসে থাকা আমার লোকেদের মনে হাসি ফুটেছিল এই অযাচিত আতিথেয়তা পেয়ে। তারা বুঝে গিয়েছিল সমতলে পৌঁছতে আর বেশি দেরি নেই।
কারা-কাশ উপত্যকায়
৮ নভেম্বর সকালে যখন উলুঘাট-দাওয়ান ছেড়ে রওনা দিলাম তখন আকাশ ঝকঝকে নীল। সকাল ৭.৩০-এ তাপমাত্রা ছিল হিমাঙ্কের খানিক ওপরে। আসন্ন শীতকালেও এই উচ্চতায় এমন উঁচু তাপমাত্রা ঘটে, প্রতিবেশী সমভূমির বায়ুমণ্ডলীয় প্রভাবে।
প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নেমে একটি গিরিখাতের সামনে পৌঁছেছিলাম। পুরো পথটাই ছিল বালিময়, মরু থেকে উড়ে আসা বালি, পাহাড়ের পাথুরে শরীরকে ঢেকে রেখেছে। গিরিখাতে পৌঁছে পাথরের গায়ে অভ্রের ঝিলিক দেখতে পেয়েছিলাম। গিরিখাতটি খুবই সরু। দুই থেকে তিন গজ চওড়া এক জলের ধারা বয়ে গেছে গিরিখাত বেয়ে। কিন্তু সেই জল এতই লবণাক্ত যে তৃষ্ণার্ত খচ্চরগুলো পর্যন্ত সেই জলে মুখ ছোঁয়াল না। মাইলদুয়েক প্রবাহিত হয়ে সেই জলের ধারাও উধাও হয়ে গিয়েছিল গিরিখাতের বুকে।
প্রায় তিনঘণ্টা ধরে দু’পাশে স্লেট পাথরের খাড়া পাহাড়ের মাঝের গিরিখাত ধরে চলে পৌঁছেছিলাম পপুনা গ্রামের কাছে কারা-কাশ-এর এক খোলা উপত্যকায়। এর আগের দিন এই পপুনা গ্রাম থেকেই আমাদের জন্য জল পাঠানো হয়েছিল।
সমতলের সবুজ গাছের সারি দেখে আনন্দে মেতে উঠেছিল সবাই। উপত্যকাটি আধ মাইল মতো চওড়া আর দু’পাশের ২০০ ফুটের মতো উঁচু নুড়ি পাথরের স্তূপ ধীরে ধীরে ঢালু হয়ে মিশে গেছে সমতলে। কারা-কাশ নদী এখানে ৪০ গজের মতো চওড়া আর ফুট তিনেক গভীর। স্বচ্ছ সবুজ জলের কারা-কাশকে দু’বার এপার ওপার করতে হয়েছিল আমাদের এগিয়ে যেতে। মাইলতিনেক চলে আমরা পৌঁছেছিলাম লাংরু নামের এক গ্রামে। প্রায় ষাটটি পরিবারের এই ছোট গ্রামকেই দীর্ঘদিন দুর্গম পাহাড়ের কাটিয়ে আসার পর আমাদের বিশাল জনপদ বলে মনে হয়েছিল। অনেকদিন পর আমাদের দলের লোকেদের হুল্লোড় করার জন্য একটি রাত মিলেছিল।
এই সময়টা খানিক আশঙ্কায় ভুগছিলাম আমি। কারণ, জানতাম বাতাসে কুয়াশা বেড়ে গেলে জরিপের কাজ পন্ড হয়ে যাবে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উলুঘাট-দাওয়ান পাসের সঙ্গে যুক্ত কৌরুক-কুজ-এর শীর্ষে পৌঁছতে চাইছিলাম। এটাই কাছাকাছির মধ্যে একমাত্র উঁচু পাহাড় যেখানে যন্ত্রপাতি নিয়ে পৌঁছন সম্ভব।
৯ নভেম্বর খুব ভোরে যাত্রা শুরু করেছিলাম কুনাত পাসের দিকে। শুরু থেকে যাত্রাপথ যতটা কষ্টকর হবে ভেবেছিলাম তা হয়নি। প্রথম মাইল ন’য়েক পথ ছিল চওড়া গিরিখাতের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু কুচকাচ-বুলাকি নামের এক জায়গা থেকে খাত সরু হয়ে গিয়েছিল। একটা নোনা জলের স্রোত বইছিল সেখানে। নুন জমে জমে স্রোতের তলদেশ এতটাই সাদা হয়ে গিয়েছিল যে মনে হচ্ছিল পুরু বরফের ওপর দিয়ে জল বইছে। যতই এগোচ্ছিলাম ততোই দু’পাশের পাহাড় উঁচু আর ভয়ংকর হতে শুরু করেছিল। আমার মনে সন্দেহ হতে শুরু করেছিল উলুঘাট থেকে দেখা যে পাহাড়ের শীর্ষে আমাদের জরিপের কাজ করব বলে ঠিক করেছিলাম আদপেই কি সেখানে এই পাথরের গোলকধাঁধার জট ছাড়িয়ে পৌঁছতে পারব?
বিকেল চারটে নাগাদ অন্ধকার হতে শুরু করে দিয়েছিল, আমরা এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছিলাম যেখান পর্যন্তই খচ্চর যেতে পারে। ওখান থেকে বাঁদিকে একটা খাড়া ঢাল উঠে গিয়েছিল মনে হয়েছিল ওই ঢাল বেয়ে উঠলেই পৌঁছনো যাবে কৌরুক-কুজএর মাথায়। আমরা যেখান পর্যন্ত পৌঁছেছিলাম সেখানেই তাঁবু ফেলার হুকুম দিয়েছিলাম। অ্যানেরয়েড ব্যারোমিটার জায়গাটার উচ্চতা দেখাচ্ছিল প্রায় ৮০০০ ফুট। আমাদের ভাগ্য খুব ভালো ছিল, আমরা যেখানে তাঁবু ফেলেছিলাম তার কাছেই নিসার একটি ছোট দল চারটে ইয়াক নিয়ে কুনাত-পাস পার হয়ে এসে অপেক্ষা করছিল খোটান থেকে কিছু আটা এসে পৌঁছনোর জন্যে। ওদের ইয়াকগুলো গত দু’দিনে এক ফোঁটাও জল পায়নি, তবুও ওরা ইয়াক নিয়ে আমাদের সঙ্গে খানিক পথ যাবার জন্য ওরা রাজি ছিল।
পরের দিনের পাহাড়ের চড়াটা যথেষ্ট কঠিন ছিল। যে জায়গাতে যাবার কথা ভেবে রেখেছিলাম তা আমাদের ক্যাম্প থেকে নেই নেই করেও হাজার তিনেক ফুট উঁচুতে। আর পাহাড়ের ঢাল ভীষণ খাড়া। প্রায় ঘণ্টাতিনেকের চেষ্টায় ইয়াকে চেপে আমরা চূড়ায় পৌঁছে ছিলাম।
চূড়ায় পৌঁছে আমি আর রাম সিং সঙ্গে সঙ্গে কাজে লেগে পড়লাম। এখান থেকে উলুঘাট-এর চাইতেও বেশি বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল। আকাশ অবশ্য খুব একটা পরিষ্কার ছিল না। সকাল থেকেই কুয়াশা লক্ষ করেছিলাম। খানিক বাদে প্রবল বাতাসে দিগন্তের কুয়াশা এসে ঢেকে দিয়েছিল আশপাশের দৃশ্য। একই সঙ্গে মরুভূমির ধুলোও আমাদের নাজেহাল করে দিচ্ছিল। তবে আমাদের সৌভাগ্য, ধুলো আর কুয়াশার হানাদারি ভালোভাবে শুরু হবার আগেই, আগে হয়ে যাওয়া জরিপদেরর ফলগুলো আমরা দ্রুত মিলিয়ে নিতে পেরেছিলাম। ধুলো আর কুয়াশায় সব ঢেকে যাবার আগেই খুব দ্রুত ফটো-থিওডোলাইট দিয়ে দেখার কাজটাও নির্ভুল ভাবে শেষ করা গিয়েছিল। কিন্তু খোটান ঘেঁষা পাহাড়ের দ্রাঘিমাংশ নির্ণয়ের কাজটা শেষ করা যায়নি সব কুয়াশার মোড়কে চলে যাওয়ায়। ২৬টার মধ্যে ২৩টা চূড়া বিন্দু নির্দিষ্টকরণের কাজ শেষ করতে পেরে দু’ঘণ্টা পরে যখন আমরা নেমে আসছিলাম তখন ভাবছিলাম আজ যদি সামান্যতম দেরি হতো তাহলে জরিপের কাজ অসমাপ্ত থেকে যেত। যেখানে বসে জরিপ কাজের সমাপ্তি টেনেছিলাম তার উচ্চতা ১০৮২০ ফুট।
খাড়া ঢাল বেয়ে হাঁচোড়পাঁচোড় করে যেখানে আমাদের খচ্চরগুলো অপেক্ষা করছিল সেখানে নামতে ঘণ্টাখানেক লেগে গিয়েছিল। যেহেতু এখানে জল পাওয়া যাবে না আগেই জানতাম তাই লাংরু থেকে গাধার পিঠে চাপিয়ে জল নিয়ে আসা হয়েছিল। আমি সকালেই আমাদের দলের অধিকাংশ লোকেদের লাংরু গ্রামের দিকে নামার হুকুম দিয়েছিলাম মূলত জল নেই বলে। যে খচ্চরগুলো আমাদের জন্য অপেক্ষায় ছিল সেগুলো তেষ্টায় কষ্ট পাচ্ছিল টের পাচ্ছিলাম।
যতটা সম্ভব দ্রুত নামছিলাম আমরা। কিন্তু অন্ধকার নেমে যাওয়ায় আমাদের চলার গতি কমে গিয়েছিল। তার ওপর অন্ধকারে আমাদের গাইডের পথ গুলিয়ে যাচ্ছিল। যাতে কোনোভাবেই পুরো ভুল দিকে না চলে যাই তাই শুকনো নদীখাত ছাড়িনি আমরা। অন্ধকারে পাথরের মধ্যে দিয়ে খচ্চরদের নিয়ে দিকভ্রান্ত হয়ে পথ চলা একটা অসম্ভব কাজ ছিল।
ওদিকে, আমাদের আসবার দেরি দেখে গ্রামের লোকেরা আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিল। বহুদূর থেকে সেই আলো আমাদের চোখে পড়েছিল। সেই আলো লক্ষ করে গভীর রাতে লাংরু পৌঁছেছিলাম আমরা।
ক্রমশ