ধারাবাহিক অভিযান-খোটানের বালুসমাধিতে(৯ম পর্ব)-অরেলস্টাইন-অনু-অরিন্দম দেবনাথ-শীত ২০২৩

জয়ঢাকের অভিযান লাইব্রেরি- ভারেস্ট-এরিক শিপটন(অনু-বাসব চট্টোপাধ্যায়)  অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ(অনু তাপস মৌলিক) কন-টিকি অভিযান- থর হেয়ারডাল (অনু-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়)

এই ধারাবাহিকের আগের পর্ব- পর্ব ১, পর্ব ২ পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব ৫ পর্ব ৬, পর্ব ৭, পর্ব ৮

obhijjaankhotancover

স্যার অরেল স্টাইন ছিলেন একজন ব্রিটিশ পুরাতাত্ত্বিক। ১৮৬২ সালের ২৬ নভেম্বর তাঁর জন্ম হাঙ্গেরিতে। তিনি ব্রিটিশ সময়কালে নানা ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় নিযুক্ত ছিলেন। তিনি মধ্য এশিয়ায় একাধিক প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানে নেতৃত্ব দেন। তিনি শুধু একজন প্রত্নতাত্ত্বিকই ছিলেন না, ছিলেন একজন নৃতাত্ত্বিক, ভূগোলবিদ, ভাষাবিদ এবং জরিপকারী। ডানহুয়াং গুহা থেকে উদ্ধারকরা পুথি এবং পাণ্ডুলিপির সংগ্রহ মধ্য এশিয়ার ইতিহাস এবং বৌদ্ধধর্মের শিল্প ও সাহিত্যের অধ্যয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তাঁর অভিযান এবং আবিষ্কারের উপর বেশ কিছু বই লিখেছিলেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রাচীন খোটান, সেরিন্ডিয়া এবং আভ্যন্তরীণ এশিয়া বিষয়ক বই। সংস্কৃত থেকে রাজতরঙ্গিণীর ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন তিনি। চিরকুমার অরেল স্টাইন ১৯৪৩ সালের ২৬ অক্টোবর কাবুলে দেহত্যাগ করেছিলেন। এই নিবন্ধে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে চলেছে তাঁর তাকলামাকান মরুভূমির প্রত্নতাত্ত্বিক খোটান অভিযানের কথা।

খোটানের কাছাকাছি

খোটানের প্রায় কাছে পৌঁছে গেছি। পিয়ালামা থেকে আক-লাঙ্গার যেতে ঊষর সমতল প্রান্তরে শক্ত পাথর ভরা পথের পাশে দুটো ভাঙা স্তম্ভ দেখেছিলাম। এই স্তম্ভ দুটো কার্গালিক আর খোটানের সীমানাকে চিহ্নিত করেছে। পিয়ালামা থেকে আক-লাঙ্গার-এর প্রায় চোদ্দ মাইল দূরত্বের মাঝে তাখতুয়েনে নামে এক জায়গায় আছে প্রায় ২০০ ফুট গভীর এক কুয়ো, এ’পথে জলের একমাত্র উৎস। আক-লাঙ্গার-এও আছে অনুরূপ এক কুয়ো। পিয়ালমা থেকেই দক্ষিণে দূর বহুদূরে পাহাড়ের রেখা তপ্ত মরুপথের দৃষ্টির সঙ্গী হয়েছিল। কিন্তু কুয়াশার কারণে একবারের জন্যও পরিপূর্ণ রূপে দেখা দেয়নি তুষারমৌলী। আক-লাঙ্গার থেকেই আবার শুরু হয়ে গিয়েছিল ছোটো ছোটো বালির পাহাড়। যখন কুম-রাবাত-পাদশাহিমের মাজারে (মাই লর্ড অফ দ্য স্যান্ডস স্টেশন) পৌঁছেছিলাম তখন আমরা আবার বালির সাগরে পৌঁছে গেছি। 

বালি সমুদ্রের মাঝে এক অদ্ভুত মাজার এই কুম-রাবাত-পাদশাহি, একে অনেকে ভালোবেসে কাপ্তার মাজার বা ‘পায়রার অভয়ারণ্য’ও বলে। শয়ে শয়ে কাঠের খোপের মধ্যে হাজার হাজার পায়রার বাস। ভ্রমণার্থীদের দান করা অর্থ থেকেই এই পায়রাদের রক্ষণাবেক্ষণ চলে। বিশ্বাস ইমাম শাকির পাদশাহের অলৌকিক ক্ষমতা বলে মরুর বুকে আবির্ভূত হয়েছিল দুই পায়রা। আর এই পায়রারা সেই দুই পায়রার বংশধর। শাকির পাদশাহ এখানে কাফেরদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন। এখানে খোটানের বৌদ্ধদের কাফের বলা হয়েছে। দু’পক্ষেরই হাজার হাজার লোক মারা গিয়েছিল। মৃতদেহগুলো এমন জড়াজড়ি করে ছিল, যে তার মধ্যে কারা কাফের আর কারা মোহম্মদের অনুগত তা নির্ধারণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তখন এক জীবিত মোহম্মদ অনুগামীকে এই দুই পায়রা ইমাম শাকির পাদশাহের দেহের হদিশ দিয়েছিল। আর গল্পটা আমাকে শুনিয়েছিল মাজারের রক্ষণাবেক্ষণে যুক্ত শাইকের এক যুবক পুত্র। সেই থেকে যে সব ভ্রমণকারী এখানে আসেন তাঁরাই পায়রাদের খাবার জোটান। আমিও মাজারের দোকান থেকে কয়েক বস্তা ভুট্টা কিনে পায়রাদের খাওয়ার জন্য ছড়িয়ে দিয়েছিলাম।

এই প্রসঙ্গে হিউয়েন-সাং বর্ণিত খোটানের পশ্চিম সীমান্তের একটি অনুরূপ ঘটনার কথা উল্লেখ করছি। খোটানের রাজধানীতে পৌঁছনোর তিরিশ মাইল আগে তিনি মরুর মাঝে একটি ছোটো পাহাড় দেখেছিলেন। সেই পাহাড়টি ছিল ইঁদুরের গর্তে ভর্তি।  এই ইঁদুরগুলোকে খাবার দিয়ে পুজো করা হত। লোকে বিশ্বাস করে যে পুরাকালে এই ইঁদুরগুলো হূন আক্রমণের হাত থেকে এই দেশকে বাঁচিয়েছিল। খোটানের রাজা হূণদের আক্রমণের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে কোন দিশা না পেয়ে প্রার্থনায় বসেন। তারপর এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। দলে দলে ইঁদুর রাতারাতি নিঃশব্দে হূনদের ঘোড়ার চামড়ার জিন ও হূন সৈন্যদের চামড়ার বর্ম দাঁত দিয়ে কেটে ফালা ফালা করে দেয়। এরপর প্রায় নিরস্ত্র হয়ে পড়া হূনদের তাড়িয়ে দিতে বেশি সময় নেয়নি খোটনের রাজার সৈন্যরা। এই ইঁদুরগুলো আকারে ছিল ‘হেজহগ’দের মতো, সারা শরীর সোনালি আর রুপালি রোমে ভরা। হিউয়েন-সাং বর্ণিত জায়গার সঙ্গে কাপ্তার মাজারের অবস্থান হুবহু মিলে যায় প্রাচীন খোটান-এর অবস্থান ধরলে। ছোটো ছোটো টিলায় ঝাঁঝরির মতো গর্তে ভর্তি। শুধু ইঁদুরের পরিবর্তে এখন পায়রাদেই দেখা যায়।

এই স্থানীয় উপাসনাক্ষেত্রগুলোর সূত্র ধরে আমি খোটান জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য বৌদ্ধ স্তূপ-এর হদিশ পেয়েছিলাম। কাশ্মীর আর সিন্ধু উপত্যকায় প্রাচীন বৌদ্ধ ও হিন্দু উপাসনালয়গুলো খুঁজে বের করাও আমার কাছে খুব একটা সহজ কাজ ছিল না। মুসলিম উপাসনাস্থলে প্রচলিত এরকম অনেক কাহিনীর উপর ভিত্তি করেই খোঁজ পেয়েছিলাম সেরকম অনেকগুলোর। ধরে নিয়েছিলাম কাপ্তার মাজারের ধার্মিক প্রথার মতো ঘটনা আমাকে বর্তমান মুসলিম স্থানের পূর্বসূরী বৌদ্ধদের খোঁজ পেতে সাহায্য করবে।   

কাপ্তার মাজার ছাড়িয়ে মাইল তিনেক যাবার পর বালুভূমি ছেড়ে আমরা পৌঁছেছিলাম খানিক জলা মতো জায়গায়। এখানে আমরা টারবুগাজ ল্যাঙ্গারের কুঁড়ের পাশে আমাদের তাঁবু গেড়েছিলাম। পিয়ালামা থেকে আমরা রওয়ানা হবার পরপরই আমাদের আসার খবর পৌঁছে গিয়েছিল আশপাশের গ্রামগুলোতে। সন্ধে নাগাদ আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন এক সুদর্শন সৌখিন বৃদ্ধ জাওয়ার বেগ, তিনি আমাদের পথের সামনের গ্রামের প্রধান। খোটানের মাটিতে তিনি আমাদের স্বাগত জানিয়েছিলেন আন্তরিকভাবে।  

পরদিন সকালে টারবুগাজ ছাড়তেই সামনে এসেছিল আবাদি জমি। মাইল তিনেক যাবার পর পৌঁছেছিলাম মাটি দিয়ে তৈরি এক দুর্গের কাছে। বহুকাল আগে ইয়াকুব বেগের সময়ে তৈরি হয়েছিল এই দুর্গ। এই দুর্গ থেকে খানিক দূরেই আছে খোটান পথের প্রথম বড়ো গ্রাম জাওয়া।

এরপর থেকেই পথের দু’পাশে এসেছিল একের পর এক বসতবাড়ি, বাগান, আর চাষের ক্ষেত। পপলার আর উইলো গাছের ছায়া পড়ে পথের ওপর। হেমন্তের ছোঁয়া গাছের পাতায়। লাল আর হলুদ রঙ ধরেছে ডালে ডালে। মরুর একঘেয়ে খাকি রঙ দেখতে দেখতে বিস্বাদ হয়ে যাওয়া চোখে স্বাদ ফিরে এসেছিল! কিন্তু পথ ধুলোময়। গোড়ালি পর্যন্ত ডুবেছিল ধুলোয়।

রাস্তার যানজট দেখেই টের পাচ্ছিলাম যে আমরা একটি বড়ো বাণিজ্যিক কেন্দ্রে প্রবেশ করতে চলেছি। গাধা, খচ্চর আর মোষের পিঠে বোঝাই হয়ে চলেছে ‘ঝুবাস’ নামের ভেড়ার লোম থেকে তৈরি কোট। এই কোট তৈরির জন্য খোটান প্রসিদ্ধ। আবার অনেকে স্রেফ পায়ে হেঁটে পিঠে কোটের বোঝা নিয়ে চলেছে। এদের পরনের বেশভূষা দেখে বোঝা যাচ্ছিল এদের আর্থিক ক্ষমতা সীমিত। কিন্তু সবার পরনেই হাঁটু পর্যন্ত উঁচু বুট। বালির রাজ্যে লম্বা জুতো খানিক হাস্যকর দেখতে লাগলেও এরা ধুলোর হাত থেকে বাঁচতেই এই ধরনের জুতো পরে। 

জাওয়া থেকে মাইল সাতেক পথ যাওয়ার পর খোটানের দ্বিতীয় বড়ো নদী কারা-কাশ পার হয়েছিলাম। পাথর ভরা নদীর বুকে খুব বেশি জল নেই এখন। আধ মাইলের বেশি চওড়া নদীখাত গ্রীষ্মে ভরে যায় কারাকোরাম পর্বতের হিমবাহ গলা জলে। অনেকগুলো জলের খাত থাকলেও মাত্র একটিতেই ত্রিশ গজ মতো চওড়া, ফুট দুয়েক গভীর জলের ধারা বইছিল। সম্ভবত চাষের প্রয়োজনে এই নদীর জল নিয়ে নেওয়া হচ্ছে নানা জায়গায়।

এখান থেকে মাইল দেড়েক যাবার পর পার হতে হয়েছিল কারা-কাশ নদীর একটি শাখা। এই নদী পরিচিত ইয়াঙ্গি-দরিয়া নামে। যার অর্থ নতুন নদী। নদীর বয়স যাই হোক না কেন, প্রাচীন চীনা ঐতিহাসিক বর্ণনায় এই নদীর উল্লেখ আছে। বলা আছে এই নদী প্রাচীন খোটানের রাজধানীর পশ্চিমে অবস্থিত। যদিও  ‘বোরাজান’ নামক প্রাচীন রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ যেখানে আছে বলে অনুমান তা এখান থেকে অনেক দূরে।

‘নতুন নদী’র কাছের পূব দিকের  গ্রাম সিপার কাছে একটা বড়ো বাগান ক্যাম্প করার জন্য মনে ধরেছিল। আমার মালপত্র নামানোর সময় হঠাৎ নজরে এসেছিল কাছের একটা বাড়িতে একটা লোকের ঘাড়ের সঙ্গে একটা লম্বা ভারী লোহার রড চেন দিয়ে বাঁধা। রডটা লোকটার থেকে বেশি লম্বা। শুনলাম লোকটা প্রতিবেশি চাষীকে অযথা মারধোর করার শাস্তি ভোগ করছে। লোকটার শাস্তির বহর দেখলেও একপক্ষে মনে হল আর যাই হোক জেল-এর ঘেরটোপে রাখার থেকে ভালো। এতে করে লোকটা শাস্তি ভোগ করতে করতে পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারছে, ও সব কাজ করতে পারছে। দৃষ্টিকটু লাগলেও সবাই চলতে ফিরতে শাস্তির কথা জেনে যাচ্ছে, ফলে অনুরূপ আচরণ করার থেকে আগামীতে ও বিরত থাকবে।

Sand-buried ruins of Khotan : personal narrative of a journey of

১৩ অক্টোবর সকালে খোটানের উদ্দেশ্যে রওনা দেবার আগে ইয়োকাকুনের বেগ এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। খোটানের আম্বান ওঁকে পাঠিয়েছিলেন আমাকে নিয়ে যাবার জন্য। খোটান শহরের মাইল খানিক আগে দলবল সহ ঘোড়ায় পিঠে চড়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল খোটানের আফগান ব্যবসায়ীদের প্রধান ও লাদাখের একজন বড়ো ব্যবসায়ী বদরুদ্দিন খান, ঘোড়ায় চেপে এক বিশাল শোভাযাত্রা সহকারে প্রবেশ করেছিলাম শহরে। 

নতুন শহরের বর্গাকার দুর্গের প্রাচীরের পাশ দিয়ে খানিক এগিয়ে পুরনো শহরের ধার ঘেঁসে আমাকে নিয়ে তোলা হয়েছিল তোখতা আখুন নামের এক বড়ো ব্যবসায়ীর বাগান বাড়িতে। এটি আগে বদরুদ্দিনের ছিল। কিন্তু আমার বাড়িটা পছন্দ হয়নি। ঘরের একদম ওপরের দিকে খানিক ঘুলঘুলি মতো থাকলেও প্রায় দমবন্ধ ঘরে থাকার কোনো ইচ্ছে ছিল না। পরিবর্তে আমি বাগানে তাঁবু খাটিয়ে নিয়েছিলাম। যদিও এতে করে আমার প্রাইভেসি অনেকটাই ক্ষুণ্ণ হয়েছিল। দিনের অনেকটাই বাকি ছিল।  খানিক বিশ্রামের পর আম্বানের জন্য আনা উপহার পাঠিয়ে দিয়ে একটা মনের মতো ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড খোঁজার জন্য বেরিয়ে পড়েছিলাম।

এই অঞ্চলের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হল ধনী দরিদ্র যে কোন বাড়িতে নির্দ্বিধায় ঢুকে পড়া যায়। আর প্রত্যেক বাড়িতেই সমাদর মেলে। সে আপনি প্রত্যাশিত বা অপ্রত্যাশিত যাই হোন না কেন। চীনাদের বিরুদ্ধে শেষ বিদ্রোহের স্মৃতি ভাঙাচোরা মাটির দুর্গের পাশ দিয়ে তোখতা আখুন-এর বাগানবাড়ির আধ মাইল মতো দূরে নজর কেড়েছিল উঁচু পাঁচিল ঘেরা এক বাগানবাড়ি। আমি কোন দ্বিধা না করেই ঢুকে পড়ে বেশ কয়েকটা ছোটো ছোটো ঘরের পাশ দিয়ে গিয়ে একটা বড়ো হলঘর মতো দেখতে পেয়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। এগিয়ে এসেছিলেন একজন সুদর্শন বৃদ্ধ ভদ্রলোক, বাড়ির মালিক আখুন বেগ। অভ্যর্থনা করে নিয়ে বসিয়েছিলেন হলঘরে।  আমি কেন এখানে এসেছি জানিয়ে ওঁর বাগানে থাকার অনুমতি চাইতে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে অতিথি রূপে বরণ করে নিয়েছিলেন। চা খেতে খেতে আমি ওনাকে ফিরদুসীর শাহনামার তুর্কি সংস্করণ থেকে পড়ে শুনিয়েছিলাম। আখুন বেগ মোহিত হয়ে শুনছিলেন। মহান ফার্সি মহাকাব্য আমাদেরকে একে ওপরের হৃদয়ের কাছে নিয়ে এসেছিল। আমার মনে অযাচিত আতিথ্য গ্রহনের যে দ্বিধা ছিল তা চলে গিয়েছিল। পরদিন সকালে আমি ছায়াময় থোকা থোকা ফুলের বাগানের মধ্যে নির্জনে আমার তাঁবু খাটিয়েছিলাম। দলের বাকি সদস্যরা ছিল অন্য জায়গায়।

প্যান-দারিনের সঙ্গে প্রথম বৈঠক

Sand-buried ruins of Khotan : personal narrative of a journey of

দুপুরবেলা খোটানের আম্বান প্যান-ডারিনের সঙ্গে দেখা করতে যাই। উনি আমার অভিযানের উদ্দেশ্য খুব মনোযোগ দিয়ে শুনেছিলেন। যদিও অনেক আগেই কাশগর থেকে আমার অভিযান সম্পর্কিত বিশদ তথ্য ওঁর কাছে পৌঁছেছিল। রাষ্ট্রীয় পোশাক পরিহিত শান্ত, বয়স্ক মানুষটি আমার অভিযান ও খোটান নদীর উৎস জরিপের বিষয়টি উনি কীভাবে দেখছেন তা জানতে আমি উৎকণ্ঠিত ছিলাম। 

আমার উৎকণ্ঠা অচিরেই দূর হয়ে গিয়েছিল। উনি আমাকে প্রথমেই আশ্বস্ত করেছিলেন রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে  যা যা সহযোগিতা করা ওঁর পক্ষে সম্ভব উনি করবেন। প্যান-ডারিনের মতে, আমি যার সন্ধান করছি তা যদি আদৌ থেকে থাকে তা আছে গোবি মরুভূমির বালির তলায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছনো এক অসম্ভব কাজ হবে। শুধু তাই নয় ওখানকার বাসিন্দারা বর্বর – একেবারেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। আর পাহাড়ের পথ যেমনি কষ্টের তেমনি ঝুঁকিবহুল। বস্তুত পাহাড়ে নির্দিষ্ট পথ বলে কিছু নেই। কারাংহু-তাগের উপত্যকা পার হলে পরে তিব্বতের অজানা ভূখণ্ড। চীনা কর্তৃপক্ষের আদেশে যেখানে পদার্পণ নিষিদ্ধ। শুধু তাই নয় সুং-লি-ইয়ামেনের কঠোর নির্দেশে ওই ভূখণ্ডে যাওয়ার জন্য কোনরকম সহয়তা করা সম্ভব নয়।

প্যান-ডারিনের সহজ সরল কথাবার্তা, উদার দৃষ্টিভঙ্গীতে হিউয়েন-সাংএর ভ্রমণ বৃত্তান্ত ও খোটানের প্রাচীন বৌদ্ধ সংস্কৃতি নিয়ে পাণ্ডিত্যপূর্ণ আগ্রহভরা আলোচনা আমায় নিশ্চিত করেছিল যে উনি আন্তরিকভাবেই আমাকে সবরকম সাহায্য করবেন। পরবর্তীকালে আমি পদে পদে টের পেয়েছিলাম উনি যদি আগ্রহভরে সহযোগিতা করতে না এগিয়ে আসতেন তাহলে মরুর বুকে অভিযান বা পাহাড়ের জরিপের কাজ করা সম্ভব হত না।

খোটানে পৌঁছেই আমি সম্ভাব্য প্রাচীন স্থান-এর খোঁজ শুরু করেছিলাম। আমি বেশ বুঝতে পেরেছিলাম আসল জায়গায় পৌঁছতে খানিক সময় লাগবে। ‘ধন-সন্ধানী’রা প্রাচীন জিনিসপত্রের সন্ধানে প্রায়শই হানা দেয় ধ্বংসস্তূপের মাঝে। আর সঠিক জায়গায় পৌঁছতে আমাকে এই ধন-সন্ধানীদের সাহায্য নিতে হবে। যদিও ওরা অন্য কেউ এই ধন-সম্পদের খোঁজ পাক তা নাও চাইতে পারে। বস্তুত খোটানে বহু মানুষ বালি খুঁড়ে বেড়ায় হঠাৎ করে ধন-প্রাপ্তির আশায়। মরুদ্যানের কাছে জলের স্রোতে বালি ধোয় সোনা পাবে বলে। ঠিক এই কারণেই আমি খোটানে পৌঁছনোর আগে পুরাকীর্তির খোঁজ শুরু করিনি, কারণ এতে করে পুরাকীর্তির জালিয়াতরা আমাকে ভুল পথে চালনা করার চেষ্টা করতে পারত। বিগত বেশ কিছু বছর ধরে কাশগর ও অন্য অঞ্চলের ইউরোপিয়ান পুরাকীর্তি সংগ্রাহকদের চাহিদা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় বেশ কিছু লোক প্রাচীন ধনসম্পদ খুঁজে বের করে তা বিক্রি করাকে পেশা বানিয়ে নিয়েছে। এবং এরা রীতিমত সংগঠিত অভিযান করে পুরাকীর্তির খোঁজে। বেশ বুঝতে পেরেছিলাম এরা কোনভাবেই চাইবে না অন্য কাউকে সঠিক ধংসস্তূপের খবর দিতে।  অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এরা চাইবে ভুল পথে চালিত করতে বা এমন কোন জায়গায় নিয়ে যাবে যেখানে যা চাইছি তা পাব না। এতে করে শুধু অর্থ বা শ্রম নষ্ট হবে না, সবচাইতে মূল্যবান ‘সময়’ চলে যাবে। আমার এতদূর আসার পরিশ্রম জলে যাবে। কাজেই সবচাইতে জরুরি ছিল সঠিক তথ্য জোগার করা সঙ্গে কিছু নমুনা সংগ্রহ। বদরুদ্দিন খান, যিনি মিঃ ম্যাকার্টনির সঙ্গে কিছুদিন কাজ করেছিলেন, তিনি প্রস্তাব করেছিলেন ছোটো ছোটো কয়েকটি ‘অনুসন্ধান দল’ বানিয়ে মরুর মাঝে নানা দিকে পাঠাতে যারা নানা ধ্বংসস্তূপ থেকে নমুনা ও খানিক তথ্য সংগ্রহ করে আনবে। প্রস্তাবটি যুক্তিপূর্ণ  ছিল, তবে একমাসের আগে কোন দলেরই আমার কাছে ফিরে আসার সম্ভবনা ছিল না। এই সময়টা আমি অন্য কাজের জন্য ব্যয় করব বলে ঠিক করে নিয়েছিলাম। খোটানের দক্ষিণ পাহাড়ে এই কাজটি করব বলে আগে থেকেই মনস্থির ছিল। তবে সময়টা ঠিক করা ছিল না। 

পাহাড় যাত্রার প্রস্তুতি

কুয়েন-লুয়েন রেঞ্জের  যে অংশ থেকে  ইউরুং-কাশ বা খোটান নদীর জন্ম, তা এখনও কার্যত জরিপ হয়নি। এই নদী সম্পর্কে সামান্য তথ্য মেলে 1865 সালে মিঃ জনসন লাদাক থেকে খোটান পর্যন্ত যে পথ দিয়ে গিয়েছিলেন তার স্কেচ ম্যাপে। যদিও সে তথ্য খুবই সামান্য। ১৮৭৫ সালে কর্নেল ট্রটার বলেছিলেন যে তিনি মনে করেন মিঃ জনসন, ইউরুং-কাশ নদীর উৎস বলে যেই জায়গাকে ম্যাপে চিহ্নিত করেছিলেন তা তার থেকে আরও উত্তরে। সম্ভবত পলু উপত্যকার দক্ষিণে উৎসরীত ও মালভূমি দিয়ে প্রবাহিত জলস্রোতটি ইউরুং-কাশ নদীর মূল উৎস।  ১৮৯৮ সালে ক্যাপ্টেন ডেইসি পলু উপত্যকায় অনেকটাই কাজ করেছিলেন। ১৬০০০ ফুট উচ্চতায় এক নদীর স্রোতের উৎসেও পৌঁছেছিলেন, কিন্তু নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি সেটাই ইউরুং-কাশ নদীর মূল উৎস কি না। কাজেই ইউরুং-কাশ নদীর মূল উৎস নির্ধারণ ও তার আশপাশ অঞ্চলের জরিপের কাজ বাকি পরেই আছে।  

শীতের প্রস্তুতি নিয়ে আমি চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। শুধু মানুষদের জন্য নয় খচ্চরদের জন্যও গরম পোশাকের প্রয়োজন। বিশেষ করে যাদের নিয়ে আমি পাহাড়ে যাব। বরফে উট কোন কাজে আসবে না, কিছু অতিরিক্ত খচ্চর সঙ্গে নিতে হবে লটবহর বহন করার জন্য। এইসময় কিরাকাশ বা পেশাদার ক্যারাভান নিয়ে যাবার লোকেরা সবাই কারাকোরামের পথে মাল পরিবহণে চূড়ান্ত ব্যস্ত থাকে, ফলে চট করে খচ্চর পাওয়া অসম্ভব হয়ে পরে। পাওয়া গেলেও খুবই চড়া দাম দিতে হয়। কিন্তু খোটানের আম্বান আমার সমস্যার কথা জানতে পেরে এক আদেশবলে আশপাশের গ্রাম থেকে দ্রুত খচ্চরের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।  

বদরুদ্দিন খান যখন দলের লোক আর খচ্চরদের জন্য পশমের পোশাক আর চামড়ার কম্বল কিনছিল তখন আমি হানা দিয়েছিলাম ইয়োটকান গ্রামে। এটি খোটানের প্রাচীন রাজধানীর অংশ। এবং প্রাচীন পুরাকীর্তি সংগ্রহের অন্যতম স্থান হিসেবে পরিচিত। দিনটা খুব ভালো কেটেছিল। ধ্বংসাবশেষের ওপর চাপা পড়া বালি খানিক খুঁড়লেই বেরিয়ে আসে প্রাচীন মৃৎপাত্র, মুদ্রা, শিলমোহর এইসব, এমনকি এই অঞ্চলের বালি নিয়মিত ধুয়ে চলে একদল লোক সোনা পাবার আশায়। খুব দ্রুত দেখা এই ধ্বংসাবশেষ সম্পর্কে আর বিশদে কিছু বলছি না।

পাহাড়ে যাত্রা শুরু করার আগে খোটানে যে কদিন ছিলাম তার পুরোটাই কেটে যাচ্ছিল গ্রামবাসী আর ধন-সন্ধানীদের বিক্রির জন্য নিয়ে আসা মুদ্রা, টেরা-কোটার মুর্তি এবং অনান্য পুরাকীর্তি পরীক্ষা করতে। বেশিরভাগই ছিল ভাঙা মাটির পাত্র আর তামার মুদ্রা যা ইয়োটকানএ হামেশাই পাওয়া যায়। পরীক্ষা করতে করতে আমিও অনেক কিছু শিখে গেছিলাম। অপ্রয়োজনেও অনেক কিছু কিনে নিচ্ছিলাম, যাতে করে পেশাদার ধন-শিকারিদের আস্থা অর্জন করে সঠিক জায়গার হদিশ পাই, যার সন্ধানে এতদূর আসা।

আমি ভীষণ উদগ্রীব ছিলাম ‘ব্লক-প্রিন্টে’ ছাপা বা হাতে লেখা পুরনো বই সম্পর্কে। অজানা ভাযার এই বইগুলো কাশগরের ইউরোপিয় সংগ্রাহকদের কাছে গত পাঁচ’ছ বছর ধরে প্রচুর পরিমাণে বিক্রির জন্য আনা হয়েছে। এই বইগুলোর অধিকাংশই জাল বলে বেশ কিছু পণ্ডিত ব্যক্তি দাবি করেছেন। কিন্তু এর প্রমাণ দরকার ছিল। আমার কাছে আসা কিছু ‘পুরনো বই’এর নমুনা দেখে এগুলো যে জাল সে বিষয়ে আমি অনেকখানি নিঃসন্দেহ হয়েছিলাম। আমার কথা শুনে একজন রাশিয়ান আর্মেনিয়ান কোকান্দ থেকে এসেছিলেন বার্চ গাছের ছালের ওপর অচেনা ভাষায় হাতে লেখা একটি বইয়ের নমুনা নিয়ে সেটি আসল না নকল জানতে। উনি বইটি চল্লিশ রুবল দিয়ে কিনেছিলেন। স্বভাবতই বইটির বাণিজ্যিক মুল্যায়ন করাতে চাইছিলেন।    

আমি প্রথমেই লক্ষ করেছিলাম বার্চের ছালের ওপর লেখাগুলোর সেই প্রলেপ নেই যা প্রাচীন ভুর্জ পাণ্ডুলিপির ওপর থাকে। কাশ্মীর এই ধরনের প্রচুর প্রাচীন পান্ডুলিপি দেখে আমি তার চরিত্র সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলাম। বার্চ গাছের ছালের ওপর নকল পান্ডুলিপি তৈরি করার সময় জালিয়াতরা এই বিষয় গুরুত্ব দেয়নি। অথবা সেই বিশেষ কালি তৈরি করতে পারেনি। আমি যেই ‘জল-পরীক্ষা’ করলাম দেখলাম আমার ভেজা আঙুলের ছোঁয়ায় কালি উঠে গেল। গাছের ছালের ওপর লেখা আর ব্লক-প্রিন্ট উভয় পদ্ধতিতে আনা বইগুলোর সবগুলোর একই হাল হয়েছিল। আমি কলকাতার সংগ্রহে থাকা এই ধরনের বইয়ের একই হাল দেখেছিলাম। আর্মেনিয়ান ভদ্রলোক এই বইগুলো কিনেছিলেন বহুল পরিচিত ধন-শিকারি ইসলাম আখুনের থেকে। আমার কাছে খবর এসেছিল এই ধরনের ‘প্রাচীন’ বই তৈরির জন্য ইসলাম আখুন রীতিমতো একটা কারখানা বানিয়ে রেখেছে। এই মুহূর্তে ইসলাম আখুন খোটান ছেড়ে অন্য কোথায় আছে, ফলে ওর সঙ্গে কোনরকম সাক্ষাৎ সম্ভব হয়নি। 

পাহাড়ের যাত্রা শুরুর আগে ইয়ারকান্দ থেকে আমার একগুচ্ছ চিঠি আসাতে আমার খুব আনন্দ হয়েছিল। অধিকাংশই বাড়ি থেকে, ১৭ আগস্ট ভারত হয়ে পাঠানো। যদিও গতকাল একটা চিঠি এসেছিল রাশিয়ান পোস্ট থেকে কাশগর হয়ে চীনা সরকারি ডাকের মাধ্যমে। সেই চিঠির তারিখ ছিল ১৯ সেপ্টেম্বর। এতে করে প্রমাণ হয় রাশিয়ান রেলওয়ে সুদূর তুর্কিস্তানের ঘরের কোণায় পৌঁছে গেছে। ১৮৬৫ সালে মহান পণ্ডিত স্যার হেনরি ইউল তুর্কিস্তান সম্পর্কে “ক্যাথে অ্যান্ড দ্য ওয়ে দিদার” বইতে বলেছিলেন ‘সবচাইতে দুর্গম ও স্বল্প পরিচিত,’ কারণ ছিল একটাই যোগাযোগ ব্যবস্থা। ওঁর এই বই আমার অভিযানের অন্যতম সঙ্গী।  

ইউরুং-কাশএর উৎস সন্ধানে

১৭ অক্টোবর আখুন বেগ-এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রওনা হয়েছিলাম পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। একটা ছোটো স্টিলের বাক্সে পাঁচ রুবল-এর সোনার কয়েন ওঁর হাতে গুঁজে দিয়েছিলাম বাগান ব্যবহারের ভাড়া হিসেবে। উনি খানিক দোনামনা করে গ্রহণ করেছিলেন। পাহাড় অভিযানে যা লাগবে না তা বদরুদ্দিন-এর জিন্মায় খোটানে ছেড়ে গিয়েছিলাম। সার্ভের সরঞ্জাম সহ এক মাসের খাবারদাবার ও অনান্য জিনিসপত্র সঙ্গে নিতে দশটা খচ্চর লেগে গিয়েছিল।

প্রথমদিনের যাত্রাপথ খুবই সহজ ছিল। যমদা গ্রাম পর্যন্ত প্রথম ছয় মাইল পথ ছিল আবাদি জমির মধ্যে দিয়ে।  দুপাশে ছিল অজস্র ছোটো ছোটো গ্রাম। যমদা গ্রাম ইউরুং-কাশ নদীর বাম দিকে অবস্থিত। নদী থেকে গ্রামের দূরত্ব খুব বেশি নয়। এর পরই শুরু হয়েছে দশত। ধীরে ধীরে চড়াই শুরু হয়ে পৌঁছেছে পাহাড়ের পাদদেশে। খোটান থেকে এই পাহাড়ের আবছায়া দেখা পাওয়া যায়।

যমদা থেকে খানিক এগিয়ে বালিময় সমভূমিতে একটি ‘তাতি’র খোঁজ পেয়েছিলাম। চারদিকে পড়ে ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন। কয়েকজন গ্রামবাসী আমাদের দেখে পুরনো মুদ্রা, পুঁতি এবং ছোটো ছোটো শিলমোহর নিয়ে এসেছিল। একজন আবার একটি ছোটো মূর্তি দেওয়া শিলমোহর নিয়ে এসেছিল। এখান থেকে মাইল চারেক পথ এগিয়ে পাথরভরা নদী পার হয়ে আমরা পৌঁছেছিলাম নদীর ডান ধারে। এখানে নদীখাত এক মাইলেরও বেশি চওড়া। কিন্তু নদীর জল বইছে কয়েকটা তিরতিরে ধারা বেয়ে। নদীর মূল স্রোতকে কয়েকটা খালের মাধ্যমে বইয়ে দেওয়া হয়েছে খোটান মরুদ্যানের অভিমুখে।  

রাত্রিটা কেটেছিল বিজিল নামের নদীখাত ঘেঁষা একটি ছোটো গ্রামে। নদীখাতে অসংখ্য গর্ত আর তার পাশে স্তূপীকৃত হয়ে থাকা নুড়ি-পাথরের স্তূপ জানান দিচ্ছিল ‘জেড’পাথর খুঁজিয়েদের উপস্থিতি। বহু প্রাচীনকাল থেকেই চিনে অতি মূল্যবান জেড পাথরের চাহিদা তুঙ্গে এবং সে চাহিদা বর্তমানেও বহাল।

বিজিল ছাড়িয়ে দক্ষিণের দিকে পাহাড়ের ঢাল ওপরের দিকে উঠে গেছে। ১৮ অক্টোবর সকালে নদীখাতের নুড়ি আর বালির ওপর দিয়ে শুরু হয়েছিল পাহাড়ে ওঠা। সম্পূর্ণ জনশূন্য অঞ্চলে গাছপালা খুবই কম। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠতে উঠতে বহুদূরের খোটানের আবছায়া মরুদ্যান দেখা যাচ্ছিল। তাশলিক-বয়ান গিরিপথের শীর্ষ থেকে ইউরুং-কাশ নদীর গিরিখাতের বিস্তার স্পষ্ট ধরা পড়েছিল চোখের সামনে। দেখা যাচ্ছিল দক্ষিণের বেশ কিছু বরফের টুপি পরা পাহাড়। তাশলিক-বয়ান গিরিপথের মাথা থেকে সোজা নেমে আসতে হয়েছিল কিসেল নদীর ধারার পাশে। এই নদীর ধার দিয়েই এগোতে হবে আমাদের। ঢাল বেয়ে নামার সময় খচ্চরের খুড়ের ধাক্কায় ধুলো ধুলো হয়ে যাচ্ছিল চারদিক।

উপত্যকার নীচে পৌঁছতে এসেছিল কুমেত নামের একখানা পুঁচকে গ্রাম। নদীর ধারের একফালি জমিতে ফলা ফসলে চলে গোটা পনেরো পরিবার। ক্রমশ সরু হয়ে আসা উপত্যকায় আঁধার ঘনিয়ে আসছিল দ্রুত। আমাদের রাতের আস্তানা চার মাইল দূরের ইয়াঙ্গি-লাঙ্গার যেন আর আসতেই চাইছিল না। খোটানের মরুদ্যান থেকেও এখনাকার তাপমাত্রা বেশি। রাত আটটায় ইয়াঙ্গি-লাঙ্গারে তাপমাত্রা দেখাচ্ছিল ৪৮ ফারেনহাইট(৮.৮ সেলসিয়াস)।  

১৯ অক্টোবর প্রায় আঠারো মাইল চলে পৌঁছেছিলাম তারিম-কিশলকজে। কিসেল নদীখাত ধরে চলতে চলতে সারা পথে একটাও গ্রাম বা মানুষের দেখা পাইনি। পথ খালি রুক্ষ আর পাথর ভরাই ছিল ন, অজস্র ছোটোছোটো জলের ধারা দুপাশের খাড়া পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে এসে মিশছে কিসেল নদীতে। বেশ কয়েক জায়গায় মালপত্র বোঝাই খচ্চরকে নদীখাতের বড়ো বড়ো পাথর টপকে নিয়ে যেতে বেগ পেতে হয়েছিল। উদ্দাম গতিতে বাতাস বইছিল সরু উপত্যকার মাঝ দিয়ে।  দু’পাশের পাহাড়ের ওপারে কী আছে জানার কোন উপায় ছিল না। কারণ এই অঞ্চলে জরিপের কাজ হয়নি কখনো। পাহাড়ের মাথায় উঠে আশপাশ দেখার মতো সময় হাতে নেই।

তারিম-কিশলক-এ একটা মাত্র মাটির ঘর। তার কাছের একফালি জমিতে খানিক ওট ফলে আছে। এর বাইরে চারপাশে খালি বড়ো বড়ো পাথরের চাঁই ছাড়া আর কিছু নেই।

২০ অক্টোবর সকালে তাঁবু থেকে বার হয়ে দেখি যে ছোটো জলের ধারার পাশে আমার তাঁবু খাটিয়েছিলাম সেটা প্রায় জমে আছে। বয়েলিং পয়েন্ট থার্মোমিটার-এ তারিম-কিশলকএর উচ্চতা দেখাচ্ছিল ৯০০০ ফুট আর সকাল সাতটায় তাপমাত্রা ছিল হিমাঙ্ক বিন্দুতে। যে গিরিসঙ্কট ধরে চলছিলাম তার বিস্তার ছিল দক্ষিণ-পূর্বে আরও মাইল আটেক। তারপর আমরা নদীর কিনারা ছেড়ে চলতে শুরু করি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। পাহাড়ের গায়ে আলগা মাটির স্তর। অজস্র গুল্ম মাটিকে আঁকড়ে ধরে। গিরিপথের শীর্ষে পৌঁছনোর খানিক আগে থেকেই দমকা বাতাস আঘাত হানতে শুরু করেছিল। আশপাশ ঢেকেছিল মেঘ আর ধুলোয়। দুপুর দুটো নাগাদ গিরিপথের মাথা উলুগ-দাওয়ানে পৌঁছনোর পর খানিক কুয়াশার মধ্যে দিয়েও সুদূর দক্ষিণের বরফ ঢাকা পাহাড়ের দেখা পেয়েছিলাম। আমি আর সাব-সার্ভেয়ার রাম সিং মিলে পিরিপথ লাগোয়া এক চূড়োর মাথায় উঠে পড়েছিলাম। পুরস্কার পেয়েছিলাম সঙ্গে সঙ্গে। দক্ষিণ-পূর্বে হিমবাহ আচ্ছাদিত সুউচ্চ পর্বতশিখর জ্বলজ্বল করছিল চোখের সামনে। ভুল হবার কোন সম্ভাবনা ছিল না। আকাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে কুয়েন-লুয়েন পিক-৫। ইন্ডিয়ান ট্রিগোনোমেট্রিক্যাল সার্ভের টেবিলে এই পর্বতের উচ্চতা উল্লেখিত আছে ২৩৮৯০ ফুট। মেঘে ঢেকে থাকায় তুষার-মৌলীর ডান-বাঁয়ের পাহাড় চূড়াগুলো চিনতে পারিনি। গিরিসঙ্কটের মাথায় উদ্দাম গতিতে বাতাস বইছিল, তাপমাত্রও ছিল হিমাঙ্কের নীচে। বয়েলিং পয়েন্ট থার্মোমিটার জায়গাটার উচ্চতা বলছিল ১২০০০ ফুটের খানিক বেশি। 

বিকেল চারটের সময় গিরিসঙ্কট থেকে বুয়া উপত্যকার দিকে নামতে শুরু করেছিলাম আমরা। ইউরুং-কাশ পূর্ব থেকে পশ্চিম এক দুর্গম গিরিখাতের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে। আর সেই গিরিখাতে পৌঁছতে আমাদের যে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতে হচ্ছিল তা যেমনি খাড়া তেমনি ক্লান্তিকর। অসংখ্য জলের ধারা নেমেছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। কালো পাথরের ঢালে  প্রাণের কোন চিহ্ন নেই। অন্ধকার ঘনিয়ে আসা পাহাড়ের গা বেয়ে মালবোঝাই খচ্চরগুলো নিয়ে নামতে আমাদের নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছিল। আমাদের দক্ষ গাইড খানিক ধীরে ধীরে হলেও গভীর রাতে বুয়া উপত্যকার এক গ্রামে নিয়ে পৌঁছেছিল কোন অঘটন ছাড়াই।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি পরিষ্কার আকাশ। এমন দিন জরিপের জন্য আদর্শ। যদিও আমাদের দলের লোকজন আর খচ্চরগুলোর একদিন বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল কিন্তু এমন সুন্দর দিনটাকে হাতছাড়া করতে চাইনি, তাই পিশাতে চলে যেতে চেয়েছিলাম। আট হাজার ফুট উচ্চতার বুয়া উপত্যকার এই গ্রামটি প্রায় মাইলখানেক জায়গা জুড়ে। তিরিশটির মতো পরিবার এখানে মূলত ওটস চাষ করেই বেঁচে আছে। চড়াই ভেঙে উপত্যকার মাথার খানিক সমতল জায়গায় পৌঁছতে আমাদের সামনে লাদাখ আর তিব্বতের পশ্চিম সীমান্তের তুষারাবৃত পর্বতগুলো তাঁদের রূপ মেলে ধরেছিল। কুয়েন-লুয়েন পর্বতের হিমবাহের প্রতিটি ভাঁজ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। বুয়ার উন-বাশি অর্থাৎ মোড়ল এই কুয়েন-লুয়েনকে জানে  ‘মুজ-তাগ’ বা বরফ পাহাড় নামেই। বরফ পাহাড়ের বাইরে এই সব চুড়ার আলাদা কোন পরিচিতি নেই এদের কাছে। দক্ষিণে যতদূর চোখ যায় শুধু বরফ পাহাড় কিন্তু তারই মাঝে নীচের অংশের কুয়াশা সরে যেতে নজরে এসেছিল শৈলশিরায় মালভূমির হলদেটে ছাপ। চরম আবহাওয়া, শুকনো বাতাস আর গাছপালার অভাব প্রকৃতিকে এখানে করে তুলেছে বিপরীতমুখী। মরুর পাশেই বরফের সাম্রাজ্য!

এরপর আমরা দশ মাইল পথ পার হই, আমাদের ভাগ্য ভালো খচ্চরগুলোর চলতে কোন অসুবিধা হয়নি। মালভূমির দক্ষিণের শেষ শীর্ষদেশ থেকে পিশার প্রশস্ত ও খানিক চাষের জমি দেখা যাচ্ছিল। দেখা যাচ্ছিল সেই শৈলশিরা যা কুয়েনে-লুয়েনকে তার পাদদেশের শেষ জনবসতিপূর্ণ অঞ্চল কারাংঘুটাঘ থেকে আলাদা করে রেখেছে। 

পাঁচটা নাগাদ আমরা পিশা উপত্যকার প্রধান গ্রাম কুলডোবেতে পৌঁছেছিলাম। আমাদের স্বাগত জানাবার জন্য জনা চব্বিশ তাঘলিক অপেক্ষায় ছিল। ওদের কথাবার্তা ও আচরণ অনেকটাই খোটানের বাসিন্দাদের মতো বলে আমার মনে হয়েছিল। ওদের ভেড়ার চামড়ায় তৈরি পোশাক আর খানিক কোঁচকানো চামড়া বলে দিচ্ছিল দু’জায়গার জলবায়ুর ফারাক। এদের অধিকাংশই কোনদিন সমতল দেখেনি। এই রুক্ষ কঠিন পার্বত্যভূমিই এদের জীবনের বাস্তব। আমার খালি মনে হচ্ছিল এরা বোধহয় কেউ ফুলে ছাওয়া পাহাড়ি চারন-ভূমি কীরকম দেখতে হয় তাও জানে না।   

২২ অক্টোবর বিশ্রামের জন্য কুলডোবেতে থেকে গেছিলাম। আকাশ মেঘে ঢেকেছিল। খানিক পরপর তুমুল ঠান্ডা ঝোড় বাতাস কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। সঙ্গে ছিল ধুলো। সকালটা খানিক চিঠিপত্র লিখে কাটিয়ে হাঁটতে বেরিয়ে পড়েছিলাম। একটা ছোটো জলের ধারা বয়ে গেছে চাষের জমির পাশ দিয়ে। কিন্তু কুয়াশা আর মেঘের জন্য দূরের কিছু নজরে আসছিল না। ফিরে এসে দেখি বলতে গেলে পিশার সব মানুষ এসে ভিড় জমিয়েছে আমাদের ক্যাম্পে। বহু বছরের মধ্যে ওরা গ্রামের বাইরের এতো লোকজন দেখেনি। হাকিম শাহ, বয়োবৃদ্ধ ইজবাশি যিনি নিজের বয়স একশ-র ওপর বলে জানিয়েছিলেন। কুঁজো হয়ে যাওয়া লাঠি ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা কোঁচকানো চামড়া আর বরফের মতো সাদা চুলদাড়ির হাকিম শাহ পুরো সক্রিয়। মুহাম্মাদার বিদ্রোহের আগে প্রথমদিকের চীনা শাসকদের কথা তাঁর স্পষ্ট মনে আছে। জীবনে একবারই তিনি এই অঞ্চল  ছেড়ে খোটানে গিয়েছিলেন। স্থানীয় লোকজন তাই ওঁকে বহির্বিশ্বের খবর জানা মানুষ বলে মনে করেন।   

আমার দলের লোকেরা জেনে গিয়েছিল সামনের পথ শুধু লম্বাই নয়, কঠিনও বটে। তাই ২৩ অক্টোবর খুব ভোরেই তাঁবু গুটিয়ে চলা শুরু হয়েছিল। সকাল ছ’টায় তাঁবু থেকে বেরিয়েই প্রথমে নজরে পড়েছিল পরিষ্কার আকাশ। জমাটি ঠান্ডা। থার্মোমিটার বলছিল ২৩ফারেনহাইট (-৫ সেলসিয়াস)। আমার তাঁবুর সামনে দিয়ে বয়ে চলা চিলতে জলের ধারা জমে শক্ত বরফ হয়ে গেছে। পিশা উপত্যকার শ’পাঁচেক ফুট উপরে উঠতেই বরফের চাদরে মোড়া পুরো অঞ্চলটা চোখের সামনে ফুটে উঠেছিল। দক্ষিণ-পূবে কুয়েন-লুয়েন-৫। পরিষ্কার আবহাওয়ায় কুয়েন-লুয়েনএর হিমবাহ ঝকঝক করছিল। প্রায় আট মাইল অনুর্বর প্রশস্ত মালভূমির ওপর দিয়ে হেঁটে একটা শৈলশিরার মাথায় চেপেছিলাম। জরিপের কাজ করার আদর্শ জায়গা ছিল এটি।

এখানকার উচ্চতা ১৩৯৫০ ফুট। মুজতাগ-আতার ঢালের পর এতো সুন্দর দৃশ্য আবার দেখতে পেলাম। কুয়েন-লুয়েন শৃঙ্গের পাশের গিরিসঙ্কটের মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে ইউরুং-কাশ নদীর মূল খাত। ছোটো ছোটো জলের ধারা নানাদিক থেকে এসে নদীতে মিশছে। কারাকোরাম আর হিন্দুকুশের এক অসাধারণ অরোগ্রাফি। 

Sand-buried ruins of Khotan : personal narrative of a journey of

গভীর গিরিখাত আর মূল পর্বত থেকে নেমে আসা বরফের গিরিশিরাগুলি পেছনের মালভূমির সমতলের সঙ্গে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে। পশ্চিমের দিকে ইউরুং-কাশএর মূল ধারা দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছে সুউচ্চ পাথর-প্রাচীরের কল্যানে, যা ধীরে ধীরে সমতলের দিকে গিয়ে ক্রমশ ছোটো হয়ে এসেছে। উত্তরের দিকের অবিচ্ছিন্ন পাহাড়ি রেঞ্জ যা আমরা বুয়াতে আসার সময় পার হয়ে এসেছি। আর খানিক দূরে তুষারাবৃত উলুগ-দাওয়ান আর তার পূব দিকে তিকেহক-তাগ শৃঙ্গ। যে গিরিশিরার ওপর জরিপের কাজের জন্য দাঁড়িয়েছিলাম তার থেকে আর ভালো জায়গা হতে পারে না। ঠিক মানচিত্রের মতো বিস্তৃত অঞ্চল চোখের সামনে। রাম সিং তার প্লেন টেবিল নিয়ে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল আর আমি ফটো-থিওডোলাইট নিয়ে পুরো অঞ্চলটা নিরীক্ষণ করছিলাম। আকাশ নীল থাকলেও প্রচণ্ড ঠান্ডায় আঙুলগুলো অসাড় হয়ে আসছিল ফলে সুক্ষ যন্ত্রটা ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলাম না।

বিকেল তিনটের সময় কাজ শেষ করে রিজের মাথা থেকে খুব দ্রুত নেমে আসি আমরা। ওপর থেকেই লক্ষ করেছিলাম মালপত্র সহ খচ্চরদের নিয়ে আমাদের দলের বাকি সদস্যরা পিসার গাইডদের সঙ্গে কারাংহু-তাগ উপত্যকার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। মাইলদুয়েক সহজে নামার পর উপত্যকায় নামার ভয়াবহ পথটি এসেছিল। মালভূমি সটান গিরিসঙ্কট বেয়ে ঝাঁপ দিয়েছে গিরিখাতের মাঝে। এগারো হাজার ফুট উচ্চতা থেকে পাথরের দেওয়ালের সঙ্কীর্ণ ঢাল বেয়ে নামতে হবে প্রায় তিন হাজার ফুট নীচে।

আমরা যখন নীচে নামা শুরু করি তখন একটু একটু করে রাতের আঁধার ঘনাতে শুরু করেছিল। দিনের প্রখর আলোতেও এপথে নামা ওঠা করতে অতি সাহসীর বুক কেঁপে যাবে। ঘুরে ঘুরে পাহাড়ের খাড়া দেওয়াল বেয়ে সরু পথটা নেমেছে। ভীত খচ্চরগুলোকে প্রায় টেনে নামাতে হচ্ছিল অতি সন্তর্পণে। সামান্য হিসেবের ভুল বা একটা ভুল পদক্ষেপ মানেই ভয়ংকর ঘটনা। সবচাইতে বেশি বেগ পেতে হচ্ছিল আলগা নুড়ি আর মালভূমি থেকে উড়ে এসে জমে থাকা পুরু ধুলোর আস্তরণ নিয়ে। এমন ধুলো-মেঘের মধ্যে দিয়ে আমি আগে কখনও পথ চলিনি। প্রায় ঘণ্টাদেড়েক ধরে ধীরে ধীরে অবরোহণ করে উপত্যকার তলদেশে ইউরুং-কাশএর ধারে পৌঁছে হাঁফ ছেড়েছিলাম। কারাংহু-তাগ-এর পাশের এক উপত্যকা থেকে কাশ নদী এখানে এসে ইউরুং-কাশএর সঙ্গে মিশেছে।

তিনটে গাছের গুঁড়ি পাশাপাশি ফেলে কোনক্রমে জোড়া লড়বরে প্রায় ৭০ ফুট লম্বা ব্রিজ টপকে ইউরুং-কাশএর বাম দিকে যখন এসে পৌঁছেছিলাম তখন পুরো অন্ধকার হয়ে গেছে। পাথরের ওপর দিয়ে দুরন্ত গতিতে বইতে থাকা নদীর জলের ফেনা অন্ধকারেও ঝলক দিচ্ছিল। রাতে নদীতে খানিক জল কম থাকে কিন্তু দিনের আলোতে আর শরীর মন ক্লান্ত না থাকলে এই ব্রিজের ওপর দিয়ে জল বয়ে যাওয়া নদী টপকাতে যে কোন লোকের স্নায়ুতে যে চাপ দেবে তাতে সন্দেহ নেই। আমাদের দলবল নির্বিঘ্নে মালপত্র বোঝাই খচ্চর সহ নদী পার হয়ে এসেছিল দেখে খানিক স্বস্তি পেয়েছিলাম। কারাংহু-তাগ কথাটির অর্থ ‘অন্ধ করা পাহাড়ি অন্ধকার’ যে কতটা সত্য তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। এরপর আরও প্রায় ঘণ্টাখানেক ক্লান্ত পশুর দলের সঙ্গে খাড়া পাহাড়ের দেওয়ালকে পাশে রেখে কাশ নদীর ধারের পাথরের ওপর দিয়ে হেঁটে পৌঁছেছিলাম উপত্যকার শেষ গ্রামে।

২৪ অক্টোবর কারাংহু-তাগ-এই কাটিয়েছিলাম আমরা। কারণ এরপর এগোনোর জন্য কিছু লোকবল আর ইয়াকের দরকার। গতকালের জরিপের ফলে এটা বুঝতে পেরেছিলাম যে খোটান নদী অর্থাৎ ইউরুং-কাশএর উৎসে পৌঁছনোর অন্যতম পথ নদীখাত নিজেই। ছোটো গ্রামের ইজবাশি ও বৃদ্ধরা আমার কাছে এসে প্রথমেই জানিয়েছিল যে পর্যন্ত  আমরা এসে পৌঁছেছি তার আগে আর এগোনো সম্ভব নয়।  

একটা বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছিলাম যে বরফ শৃঙ্গ থেকে নেমে আসা নালার ধারে পাহাড়ের ওপর বেশ কিছু গ্রীষ্মকালীন চারণভূমি আছে। আর এই চারণভূমিতে ইউরুং-কাশএর কিনারা থেকে যাওয়া যায়। কোন সন্দেহ নেই এই গ্রামের লোকজন পরিচিত অংশের গণ্ডী ছাড়িয়ে পাহাড়ের উচ্চতর অংশে ভ্রমণে ভীত। ১৮৬৫ সালে মিঃ জনসনের লে থেকে খোটন অভিযান পথের নকশার সঙ্গে পিশার দক্ষিণের পাহাড়ের আসল অরোগ্রাফি খানিক বিভ্রান্তিমূলক। স্থানীয় মানুষজন ছাড়া এই বিভ্রান্তি দূর হবার নয়। সে যাই হোক আমার মূল উদ্দেশ্য পূবের দিকে ইউরুং-কাশএর উৎস চিহ্নিত করা। গ্রামের লোকদের ইয়াক আর প্রয়োজনীয় লোকবল দিতে অনিচ্ছা দেখে আসরে নামে ইসলাম বেগ। খোটান ইয়ামেনের এক তরুন আর উদ্যমী পরিচারক। স্বয়ং প্যান ডারিন ইসলাম বেগকে আমার সঙ্গে পাঠিয়েছিলেন সবরকম সাহায্য জোগাড় করে দেবার জন্য। ইসলাম বেগ গ্রামবাসী তাঘলিকদের বলে আম্বানের আদেশ আমাদের অভিযানের জন্য সবরকম সাহায্য করতে হবে, না হলে বিপদ। কারাংহু-তাগএর শীর্ষস্থানীয়রা এরপর নানা দিকে লোক পাঠাতে শুরু করে ইয়াক আর উঁচু পাহাড়ে যাবার জন্য লোকজন জোগাড় করে আনতে।  

পর্বতের মাঝে লুকিয়ে থাকা কারাংহু-তাগএর গ্রামের লোকেরা অনিচ্ছুক হলেও আম্বানের হুকুমে আমাদের প্রয়োজনীয় লোকবল আর ইয়াক জোগাড় করে দিয়েছিল অচিরেই। সকালে গ্রাম ঘুরতে গিয়ে দেখেছিলাম নয় নয় করেও এই প্রত্যন্ত গ্রামে প্রায় চল্লিশটি বাড়ি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চাষের ক্ষেতে ওটস ফলে আছে প্রচুর। অন্তত এই গ্রামবাসীদের খাবারের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট। শুধু তাই নয় টের পেয়েছিলাম যারা এই উপত্যকার ওপরের অংশে ইয়াক আর ভেড়া চড়িয়ে বেড়ায় কারাংহু-তাগ সেই পশুচারণদের শীতকালীন আবাসও বটে। এইসব পশুর পালের আসল মালিক খোটানের কোন না কোন ব্যবসায়ী বা ‘বাইস।’ কখনও কখনও এই ব্যবসায়ীরা আসেন পশুপাল পরিদর্শনে। আর এই ব্যবসায়ীরাই উপত্যকার মানুষদের সঙ্গে বহির্বিশ্বের একমাত্র মেলবন্ধন। কারাংহু-তাগএর জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে আরও ভূমিকা থাকে খোটানের অপরাধীকুলের। বিশেষ অপরাধে অপরাধীদের এখানে নির্বাসনে পাঠানো হয়।

Sand-buried ruins of Khotan : personal narrative of a journey of

নির্বাসন কথাটা এই পরিবেশের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে মিলে যায়। নির্বাসিত জীবন কাটানোর জন্য এইরকম জায়গা আরও খুঁজে পাওয়া দূরূহ। খাড়া পাহাড়ের মাঝে সঙ্কীর্ণ এক উপত্যকা, বহির্জগতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ দূরের কথা, এখান থেকে খানিক দূরের বরফ ঢাকা পাহাড়ের দৃশ্যও চোখে পড়ে না। বাইরে থেকে যারা কদাচ  আসে তাদের কাছে প্রকৃতির এই বদ্ধ জায়গাকে সত্যিই জেলখানা মনে হবে। শুনে অবাক লাগছিল যে সব পাহাড়ি মানুষ এই অঞ্চলের কোথাও না কোথাও নির্জনে বসবাস করে তাদের কাছে কারাংহু-তাগ হল এক শহর। যেখানে বলতে গেলে প্রাণের কোন সাড়া নেই, সেখানে গুটিকয়েক ইউলো আর পপলারএর ঝাড়-এর মাঝে পাথর আর মাটি দিয়ে গাঁথা গোটা চল্লিশ ঘরবাড়ির সাম্রাজ্য যে এক শহর বলে পরিচিত হবে সেটাই স্বাভাবিক।  আমার কাছে এইরকম কঠিন আবহাওয়ার দুর্গমতম অঞ্চলের পরম নির্জনতায় নির্বাসনের ব্যবস্থা কঠিনতম শাস্তি বলে মনে হয়েছে।   

গ্রামের উত্তর-পূর্ব দিকের একটা খাড়া পাহাড়ের মাথায় উঠেছিলাম জরিপের কাজ করার জন্য। নিঃসন্দেহে জরিপের জন্য পাহাড়চূড়াটা একটি আদর্শ জায়গা ছিল। কিন্তু গতকালের মতো আজকের আকাশ অতো পরিষ্কার ছিল না। খারাপ আবহাওয়ার কারণে খুব একটা কাজের কাজ হবে না দেখে পাহাড়ের মাথা থেকে নেমে এসে কাছের এক কবরখানা দেখতে গেছিলাম। কবরের সংখ্যা প্রমাণ দেয় এখানকার বর্তমান জনসংখ্যা খুব বেশি হলে শ’দুয়েক হলেও জনবসতি খুব প্রাচীন। মাটি স্তূপ করে কাঠের ঘের দিয়ে চিহ্নিত কবরের সংখ্যা অসংখ্য। কবরের ওপর খুঁটি পুঁতে ঝুলিয়ে রাখা ইয়াকের লোমের ঝালর।  দুটো ছোটো মসজিদ আর আধ ডজন মাজারও ছিল জায়গাটায়। ইয়াকের লেজ আর কাপড়ের লেজ দিয়ে সাজানো মাজারগুলো বুঝিয়ে দেয় এই সমাধিগুলো কোনো না কোনো সন্তের বিশ্রামস্থল।

ইউরুং-কাশ-এর উৎসের দিকে যাওয়ার সম্ভাব্য পথ নিয়ে কারাংহু-তাগের ইজবাশি বা তার লোকেরা কোনোরকম আলোকপাত করতেই পারল না। গ্রামের গণ্ডীর বাইরে এদের ধারণা প্রায় নেই বললেই চলে। তবে একটা কথা ওর বলেছিল এখান থেকে একদিন হাঁটলে ওমশা জিলগা নামে একটা ছোটো গ্রাম আছে, ইয়াকে চেপে সেখানে যাওয়া যেতে পারে। সেই গ্রামের কাছে একটা গরম জলের কুন্ড আছে। সেই কুন্ডের জল গিয়ে ইউরুং-কাশএ পড়েছে। কিন্তু ওই গ্রামের পর নদীর উৎসের দিকে যাবার কোন পথ আর নেই। ওদের দেওয়া তথ্য সঠিক কিনা জানার একমাত্র উপায় ছিল নিজে পরিদর্শন করা।

আমাদের ও অভিযানের মালপত্র বহন করার জন্য বেশ কিছু ইয়াক এনে হাজির করা হয়েছিল। আমাদের সঙ্গের ক্লান্ত খচ্চরগুলো কারাংহু-তাগে থেকে যাবে আমাদের চীনা দোভাষী নিজাম আখিম-এর দায়িত্বে। এই কঠিন পথে যাত্রার ধকলে ও অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। শুধু খচ্চরগুলোই নয় আমার ছোট্ট টেরিয়ার ইওলিচ বেগকেও ওর কাছে রেখে যেতে হবে। ওর মধ্যে ক্লান্তির কোন লক্ষণ না থাকলেও অভিযানের আগামী দিনগুলোর জন্য ওকে সুস্থ রাখতে, ওকেও বিশ্রামে রাখা প্রয়োজন।     

২৫ অক্টোবর সকাল দশটার সময় ইয়াকের পিঠে মালপত্র চাপিয়ে আমরা যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছিলাম। প্রতিটি ইয়াকের সঙ্গে একজন করে স্থানীয় পাহাড়ি মানুষ রেখেছিলাম। বরফ পাহাড়ের প্রাণী ইয়াক ‘শিওরফুট’ হলেও প্রচণ্ড অলস। ওকে দড়িতে বেঁধে টেনে না নিয়ে চললে একজায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবে তো থাকবেই। দলের প্রতিটি সদস্যর কম করে দশদিন চলার মতো খাবার সঙ্গে নিয়েছিলাম। আমরা রওনা দেবার সময় কারাংহু-তাগের প্রতিটি মানুষ জড়ো হয়েছিল। কারণ এর আগে লটবহর নিয়ে এইরকম বিশাল দলের যাত্রা এরা আগে কখনও দেখেনি।

কাশ উপত্যকা ধরে মাইল মাইল দুয়েক চলার পর পূব দিকের এক ঢাল পার করে পৌঁছেছিলাম পাশের উপত্যকা বুসাতে। সামনেই এটি দুটি গিরিপথে ভাগ হয়ে এগিয়ে গেছে দক্ষিণের দিকে। উপত্যকার শীর্ষ বয়ানক পৌঁছতে খাড়াই ঢাল বেয়ে উঠতে হয়েছিল। ১২০০০ ফুট উঁচুতে পৌঁছতে মুজতাগ পর্বতের হিমবাহ আর তা থেকে নেমে আসা বড়ো জলের ধারা আর গিরিখাতগুলোর পরিষ্কার ছবি ধরা দিয়েছিল।  ফটো-থিওডোলাইট নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছিলাম। কিন্তু খানিক পরেই কাজ বন্ধ করে দিতে হয়েছিল আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করায়। ক’দিন ধরে লক্ষ করেছি সকালে আবহাওয়া খানিক ভালো থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবল শক্তিশালী ঠান্ডা উত্তুরে বাতাস বইতে শুরু করছে। সঙ্গে সঙ্গে মেঘ আর ধুলোর কুয়াশায় ঢেকে যায় চারদিক। 

বয়ানক থেকে একটা সহজ মাইল তিনেক পথ বেয়ে নেমে গেছিলাম ওমশা উপত্যকায়। এখানে আমাদের ইউরুং-কাশ নদী পার হয়ে নদীর ডান পাশে যেতে হয়েছিল। ইউরুং-কাশ এখানে প্রায় ৫০ গজ চওড়া আর ফুট তিনেক গভীর। নদীর পান্না সবুজ জল আমাকে কাশ্মীর আর আল্পসের নানা নদীর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। নদীর জলের স্বচ্ছতা বলে দিচ্ছিল ইউরুং-কাশ শুধু মুজতাগএর বরফগলা জলেও পুষ্ট নয় আরও অনেক চূড়ার হিমবাহের জল এতে এসে মিশেছে। নদীখাতের বিস্তৃতি বুঝিয়ে দিচ্ছিল কি পরিমাণ জল গ্রীষ্মে বয়ে যায় ইউরুং-কাশ-এর খাত বেয়ে।

২৬ অক্টোবর সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি ঝকঝকে পরিষ্কার আকাশ। খানিক বাদেই সূর্য কিরণ আমাদের সকাল সাতটার ২৪ ফারেনহাইট (-৪.৫ সেলসিয়াস) তাপমাত্রার কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল।  যেখানে নদীর ধারে গতকাল ক্যাম্প করেছিলাম সেই তেরেক-আগজি থেকে প্রায় টানা আড়াই ঘণ্টা খাড়া পাহাড়ের ঢাল বেয়ে পৌঁছেছিলাম জিলান নামের একটা ঘাসে ঢাকা অঞ্চলে। এখানে পৌঁছে দক্ষিণদিকে মুজতাগ আর অনান্য তুষারাবৃত পর্বতের দেখা পেয়ে সব ক্লান্তি দূর হয়ে গিয়েছিল। এখান থেকে দক্ষিণপূর্ব দিকে প্রায় মাইল চারেক দূরে ইউরুং-কাশএর গিরিখাত সম্পূর্ন চোখের আড়ালে চলে গিয়েছে নানা পাহাড়ের ভিড়ে। পাথুরে পাহাড়ের পেছন থেকে উঁকি দিয়ে আছে ‘কে-৫’ সহ আরও কিছু বরফ চূড়া। ওই বরফচূড়াগুলোর পেছনেই আছে পামিরের উচ্চভূমি, যার সম্পর্কে আমি জেনেছিলাম ক্যাপ্টেন ডেইসির অভিযানের বর্ণনা থেকে। পাথুরে পাহাড়ের ওপর দিয়ে মুজতাগ পর্বতের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ইউরুং-কাশএর খাত যে অনুসরণ করা যাবে না তা স্পষ্ট বুঝে গেছিলাম। একমাত্র উপায় নদীখাত ধরে চলা। কিন্তু তা করতে গেলে আমাদের পাহাড়ের গা বেয়ে নামতে হবে নদীর ধারে। যা ‘শিওর ফুট’ ইয়াকদের কল্যানে সম্ভব। ওখানেই নদীর বাম পাশে আছে ‘ইসিক-বুলাক’ গরম জলের ঝরনা। আমাদের ক্যাম্পের উল্টোদিকে নদীতল থেকে প্রায় শতিনেক খাড়া উঠে যাওয়া পাথরের দেওয়াল বেয়ে নেমে আসা গরম জলের ঝরনা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। শীতকালে নদী পুরো জমে গেলে অনেক পাহাড়ি মানুষ এই ঝরনায় স্নান করতে যায়। ওমশার ছয় পশুপালক যারা আমার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল তারা জোড় গলায় জানিয়েছিল এর আগে আর এগোন সম্ভব নয়। ইয়াকদের পক্ষে সম্ভব হলেও মানুষের পক্ষে অগম্য। ওদের দাবি সত্যি কিনা তা আর না এগোলে বোঝা সম্ভব নয়।

২৭ অক্টোবর সূর্য ওঠার খানিক পরই রাম সিং আর আমার দলের অন্যতম সক্রিয় লোক  তিলা বাই আর ওমশার দুই পশুপালককে নিয়ে পাহাড়ে ওঠা শুরু করেছিলাম। সঙ্গে নিয়েছিলাম সবচাইতে শক্তিশালী তিনটে ইয়াক। ওঠা শুরু করতেই টের পেয়েছিলাম পশুপালক তাঘলিকদের কথার সারবত্তা। পাহাড়ের ঢাল বড়ো বড়ো পাথরের টুকরো আর আলগা নুড়িতে ভরা। নদীর ধারে যেখানে আমারা ক্যাম্প করেছিলাম, নদীর ধারের সেই ডান পাশের পাহাড়ের ওপরে ওঠার চেষ্টা করছিলাম আমরা যাতে করে সামনে কি আছে না আছে তার একটা পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যায়।

মাইল দেড়েক পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এগোনোর পর খাড়া পাহাড়ের গায়ে আটকে থাকা বড়ো বড়ো পাথরের ফাঁদ পেড়িয়ে আর এগোন সম্ভব ছিল না। প্রকৃতি এখানে ভয়ংকর রকম বন্য। খাড়া পাথরের দেওয়াল সোজা নেমে গেছে নদীখাতে। ওপর থেকে দেখতে পারছিলাম নদীখাত এখানে দুশো ফুটের মতো চওড়া, কোথাও আরও কম। শরৎকালে জলের পরিমাণ কম থাকায় নদীখাতের তিন-চতুর্থাংশ জলে ভরা ছিল। পাহাড়ের ওপর থেকে গড়িয়ে আসা বিশাল বিশাল পাথরের টুকরোয় নদীখাত ভরা। পাথরগুলো এক সারিতে নেই। ফলে নদীর জলের ধারা পাথরে বাধা পেয়ে কখনও ডান কখনও বাম তীর বেয়ে চলেছে। জলের রঙ কোথাও সবুজ আবার কোথাও নীল। নীলরঙের জায়গায় জল ঘুরে চলেছে, যা বলে দেয় ওখানে জলের গভীরতা খুব বেশি। নদী পার হতে হলে এই সবুজ রঙ ধরেই হতে হবে। 

আমরা পাহাড়ের যেখান পর্যন্ত উঠেছিলাম সেখান থেকে নেমে আসাটা সহজ ছিল না। হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে আধা মাইল মতো পথ নামার পর তুলনমূলক কম খাড়াই একটা ঢাল খুঁজে পেয়ে যেখান দিয়ে কোনরকমে নদীর ধারে নেমে এসেছিলাম। ইয়াকগুলোকে প্রায় টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে নদীখাত ধরে এগোতে শুরু করেছিলাম। দুপাশে খাড়া পাহাড়ের প্রাচীর তার মাঝ দিয়ে দুরন্ত গতিতে বয়ে চলা নদী। ইয়াকবাহনে নিরাপদে বরফ-ঠান্ডা কোমরজল পার হয়ে নদীর অন্য পারে যেতে পেরেছিলাম আমরা। ইয়াকদের এমনিতেই সমতল জমিতে নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল। তাই ঈশ্বর ভরসায় নদী পার হওয়া ইয়াকদের মর্জির ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম পাহাড়ে ইয়াকদের কেন ‘শিওর ফুট’ বলা হয়। বরফগলা জলে পিচ্ছিল পাথরের ওপর দিয়ে অক্লেশে নদী পার হয়েছিল ওরা।   

নদীর বাম তীর দিয়ে কয়েকশো গজ যাবার পর নদীর বুকের মাঝে অজস্র বড়ো বড়ো পাথর পড়ে ছিল। সে পাথর বেয়ে ওঠা অসম্ভব কাজ। একমাত্র উপায় আবার নদীর অন্য পারে গিয়ে পথ খোঁজা। পাথর বেয়ে জল যেখানে গড়িয়ে পড়ছিল তার রঙ ছিল ঘন নীল। দূর থেকেই বুঝিয়ে দিচ্ছিল সেখানকার গভীরতা। একটা ইয়াককে নামিয়ে জলের গভীরতা মাপার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সেটা সাঁতার কাটতে শুরু করাতে বুঝে গেছিলাম এখানে ভেলা ছাড়া নদী পার হওয়ার চেষ্টা প্রবল মূর্খামি। এখানে কোন গাছও নেই যা দিয়ে ভেলা বানানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। 

এগোনোর একমাত্র পথ ডানদিকের খাড়া পাহাড়ের গায়ে এবড়োখেবড়ো হয়ে বেরিয়ে থাকা পাথরের টুকরো ধরে ওপরে ওঠা। এবং পাশাপাশি এটাও নিশ্চিত করা যে সে পথ দিয়ে আবার নদীর ধারে নেমে আসা সম্ভব। ইয়াকগুলোকে নদীর ধারে ছেড়ে রেখে আমি সঙ্গের লোকেদের নিয়ে প্রায় পাঁচশো ফুট মতো কঠিন আরোহণের পর একটা পাহাড়ের এক সংকীর্ণ সমতল চূড়ায় উঠতে পেরেছিলাম। সেই সরু শৈলশিরাও শখানেক গজ গিয়ে ঝাঁপ দিয়েছে গিরিখাতে। সে পাহাড়ের গা বেয়ে নামতে যে কোন দুঁদে পর্বতারোহীও বহুবার ভাববে।

পাহাড়ের গা বেয়ে নদীর বুকে নামার একটা নির্ভরযোগ্য পথ খুঁজে বের করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছিলাম। খাড়া পাথরের দেওয়ালে পা রাখার মতো একটাও খাঁজ দেখতে পাইনি। বিলকুল মসৃণ পাথরের দেওয়াল। আগে এগোনোর পথ খুঁজে বের করতে আমি পাশের একটা পাহাড়ের গা বেয়ে প্রায় হাজারখানেক ফুট উঠে নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম কোনভাবেই মালপত্র সহ ইয়াক বা মানুষের পক্ষে এখান দিয়ে আগে যাওয়া সম্ভব নয়।   

পাহাড়ের ঢালে বসে খানিক বিশ্রাম নিচ্ছিলাম এমন সময় পাথর গড়িয়ে পড়ার শব্দ শুনে সামনে তাকিয়ে দেখি আমার ঠিক উল্টোদিকের পাহাড়ের গা বেয়ে এক দঙ্গল পাহাড়ি ছাগল (কিয়েক) নামছে। পাহাড়ের ঢালে এই ছাগলদের চলার চিহ্ন আমার নজরে এসেছিল অনেক আগেই।  আমার সামনে থাকা এই বন্য দুনিয়ায় সম্ভবত এই প্রাণীদেরই একমাত্র প্রবেশাধিকার আছে! মুজতাগ হিমবাহ থেকে বের হওয়া ইউরুং-কাশ-এর স্রোতের উৎস খুব কাছে মনে হয়েছিল। যদিও বাস্তবে তা নয়। হয়তো নদীর এই বাঁকটা পার হতে পারলে সেখানে পৌঁছনো যেত। কিন্তু নদী সম্পূর্ণ জমে বরফ না হয়ে গেলে নদীখাত ধরে উৎস অভিমুখে এগোন অসম্ভব। তার জন্য ভরা শীতের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, যা এই যাত্রায় সম্ভব নয়। 

প্রবল ঠান্ডা ঝোড় বাতাস শীতের আগমন ঘোষণা করছিল। নদীর উৎসে পৌঁছতে না পারলেও আমাদের জরিপ অনুযায়ী নদীর উৎসের মোটামুটি সঠিক হদিশ নথিভুক্তি সম্ভব হয়েছে।  

ইয়াকের পিঠে চেপে নদী পার হয়ে সন্ধ্যেবেলা নিরাপদে সবাইকে নিয়ে তাঁবুতে ফিরে ভীষণ খুশি হয়েছিলাম। আকাশ পুরো মেঘে ঢেকে ছিল। সকালে উঠে দেখি যেখানে আছি, সেই ন’হাজার ফুট থেকে হাজার তিনেক ফুট উঁচু পাহাড় তুষারের চাদরে ঢেকে গেছে। যদিও নদীর ধারের তাপমাত্রা গতকালের তুলনায় খানিক বেশি ৩৪ ফারেনহাইট (১.১ সেলসিয়াস)। যে পথ দিয়ে এসেছিলাম সে পথ দিয়ে ফিরে যাবার সময় ঠান্ডা বাতাস আমাদের ছিঁড়ে খাচ্ছিল। এই অঞ্চলে শীত এসে গেছে যে!

কারাংহু-তাগে ফেরার সময় ১১৫০০ ফুট সোগক-ওঘিলের শৈলশিরা পার হয়ে ১০০০০ ফুট ওমশা উপত্যকায় পৌঁছেছিলাম সহজেই। ওমশা উপত্যকায় ওটসের ক্ষেতের মধ্যে দুটি নিচু মাটির বাড়ির সন্ধান পেয়েছিলাম, যেখানে কয়েকজন পশুপালক বাস করে। দুপুরে আবহাওয়া একদম পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। ওমশা উপত্যকা এক-চতুর্থাংশ মাইলের মতো চওড়া হলেও ভয়ংকর বন্য পাহাড়ের কয়েকদিন কাটিয়ে আসার পর এই উপত্যকাকে অত্যন্ত মনোরম মনে হয়েছিল। 

রাতে প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়েছিল ওমশায়। ২৯ অক্টোবর সকাল সাতটায় থার্মোমিটারে তাপমান দেখাচ্ছিল ১৭ ফারেনহাইট (-৮.৩৩ সেলসিয়াস)। কিন্তু আকাশ পরিষ্কার ও উজ্জ্বল ছিল। ঘণ্টা দুয়েক পথ চলে ইউরুং-কাশ নদীর ডানদিকের তিরে পৌঁছেছিলাম। এখান থেকে আসার সময় যে পথ ধরে এসেছিলাম সে পথ না ধরে নদীর কিনারা ধরে এগোতে শুরু করেছিলাম। মাইল দুয়েক চলার পর নদী টপকে ডানদিকে চলে এসেছিলাম। নদীর ধারের পাশের পাহাড়ের উঁচু নিচু ঢাল ধরে চলাটা ক্লান্তিকর হলেও নদীখাতের মনোরম দৃশ্য মন ভরিয়ে রেখেছিল। কাশ উপত্যকা যেখানে কারাংহু-তাগে মিশেছে সেখানে পৌঁছনোর খানিক আগে থেকে ইউরুং-কাশ দুই খাড়া পাহাড়ের মাঝের ফুট পঞ্চাশেক চওড়া খাত দিয়ে কয়েকশো গজ বয়ে গেছে দুরন্ত গতিতে। এখানে আমাদের খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে চলতে হয়েছিল। উঠতে হয়েছিল নদীখাত থেকে পাঁচশো ফুটের মতো উঁচুতে। প্রকৃতি এখানে নিজেই পাহাড়ের গায়ে ধাপ কেটে রেখেছিল। ইয়াকরা আমাদের নির্বিঘ্নেই পাহাড়ি ঢালের পথটা পার করে দিলেও ওপর থেকে নীচের দিকে আকাতে অস্বস্তিই হয়েছিল।

ক্রমশ

খেলার পাতায় সমস্ত ধারাবাহিক অভিযান একত্রে

Leave a Reply