জয়ঢাকের অভিযান লাইব্রেরি- এভারেস্ট-এরিক শিপটন(অনু-বাসব চট্টোপাধ্যায়) অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ(অনু তাপস মৌলিক) কন-টিকি অভিযান- থর হেয়ারডাল (অনু-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়)
সব পর্ব একত্রে-পর্ব ১, পর্ব ২, পর্ব ৩, পর্ব ৪, পর্ব ৫

স্বেন হেডিন একাধারে একজন সুইডিশ ভূগোলবিদ, টপোগ্রাফার, অভিযাত্রী, ফটোগ্রাফার ও চিত্রশিল্পী। ১৮৬৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারিতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে জন্মগ্রহণ করেন। মৃত্যু: ২৬ নভেম্বর, ১৯৫২, স্টকহোম।
এই আত্মজীবনীতে নিজের জীবনভর অভিযাত্রার দুর্ধর্ষ সব অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেছেন হেডিন। রোমহর্ষক উত্তর মেরু অভিযানের নায়ক সুইডিশ অভিযাত্রী নর্দেনস্কিওল্ডকে দেখে অনুপ্রাণিত হন এবং পনেরো বছর বয়সেই ভবিষ্যতে উত্তর মেরু অভিযাত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। পরে তাঁর অভিযাত্রার গতিমুখ পরিবর্তিত হয়ে এশিয়ার দিকে ধাবিত হয়। নিয়তির ফেরে কাস্পিয়ান সাগরতীরের ঝড়ের শহর বাকুতে আসেন আর সেখান থেকেই যাত্রা শুরু করেন এশিয়ার পথে। শুরু হয় রাশিয়া, ককেশাস আর পারস্য হয়ে প্রায় সমগ্র এশিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অর্জন। বাধাবিঘ্ন বিপত্তির সম্মুখীনও হন প্রচুর। তুলে ধরেন দেশীয় সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূগোল আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিবরণ। গবেষণার নিরিখে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই লেখাচিত্র তারই সাক্ষ্য বহন করে। MY LIFE AS AN EXPLORER স্ভেন হেডিনের অসামান্য সৃষ্টি। ১৯২৬ সালে কাসেল অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড-এর হাত ধরে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়।
॥ পনেরো॥
এক বাহনে দু-হাজার মাইল—পৃথিবীর ছাদে শীতকালীন যাত্রা
১৮৯১-এর বসন্তে বাড়ি ফিরে এলাম যখন, হিসেব করে দেখি ককেশিয়া, মেসোপটেমিয়া, পারস্য, রুশ-তুর্কিস্তান আর বোখারার মতো দুর্গম এক বিস্তৃত অঞ্চল জয় করে ফিরেছি আমি। তাই শুধু নয়, চিনে-তুর্কিস্তানের ভেতরেও ঢুকেছিলাম গিয়ে। ফলে এতটাই উদ্দীপ্ত হয়ে পড়লাম, সাহস জাগল যে পুব থেকে পশ্চিম গোটা এশিয়ার পথে নতুন করে বেরিয়ে পড়ি আবার। একজন শিক্ষানবিশি হিসেবে এশিয়া ভ্রমণের বেশ কিছুটা অভিজ্ঞতা এতদিনে আমার হয়েছে বটে, তবে যথেষ্ট নয়। পরবর্তীতে তার চেয়েও অনেক বেশি ভৌগোলিক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করতে হবে আমাকে, এও বিলক্ষণ জানি। তৎসত্ত্বেও আবার সেই বন্য পথে বেরিয়ে পড়বার উত্তেজনায় বড়ো অস্থির হয়ে পড়লাম। ধাপে ধাপে, ধীরেসুস্থে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মহাদেশের কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছোবার প্রস্তুতি শুরু হল আবার। সে-মহাদেশের এমনসব জায়গায় যেখানে আজও কোনও ইউরোপবাসীর পা পড়েনি, আমিই প্রথম গিয়ে হাজির হব ভেবে উত্তেজনা হচ্ছিল বড়ো।
সে-যাত্রায় বেরিয়েছিলাম মোট তিন বছর ছ’মাস পঁচিশ দিনের জন্যে। দুই মেরুর মধ্যবর্তী দূরত্বেরও বেশি পথ অতিক্রম করেছি আমি, প্রায় ১০,৫০০ কিলোমিটার। অর্থাৎ, পৃথিবীর মোট পরিধির এক-চতুর্থাংশ। পাঁচশো বাহান্ন পাতার একটা মানচিত্রও তৈরি করেছিলাম সেই যাত্রাপথের। স্কেলে মাপলে তার দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় তিনশো চৌষট্টি ফুট। এই মানচিত্রের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ৩,২৫০ কিলোমিটার স্থলভূমি ইতোপূর্বে ছিল সম্পূর্ণ অজানা। খরচা হয়েছিল দু-হাজার পাউন্ডের সামান্য কম।
এদিকে ব্যারন ভন রিক্টোফেনের লেখা ‘এশিয়াটিক জিওগ্রাফি’ গোটাটা না গেলা পর্যন্ত বেরোতেও পারছিলাম না। তবে ১৮৯৩ সালের ১৬ অক্টোবর বাড়ি থেকে বিদায় নিলাম শেষ অবধি। নোঙর তুলে রওনা হলাম পুবদিকে সেন্ট পিটার্সবার্গের পথে।
সার রাজধানী থেকে অরেনবার্গ অবধি মোট ২,২৫০ কিলোমিটার পথ মস্কো এবং টাম্বফ ছুঁয়ে তীব্র গতিতে পেরিয়ে গেলাম। ভোলগার বুকে ৪,৮৬৭ ফুট লম্বা ব্রিজও পার করে ফেললাম একসময়। অরেনবার্গ হচ্ছে অরেনবার্গ কসাকের রাজধানী। স্থানীয় ভাষায় ‘আতামান’ হচ্ছেন সেখানকার শাসক। এখানে বাশকির, কিরগিজ এবং তাতারদের বসবাস বুঝিয়ে দেয় যে এ-ই হচ্ছে এশিয়ার প্রবেশদ্বার।
এইবারে আমার প্রথম গন্তব্য হচ্ছে তাশখন্দ। কাস্পিয়ান সাগর থেকে দক্ষিণের পথঘাট আমি চিনি, এতদিনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি বেশ। তাই কিরগিজ ময়দান হয়ে উত্তরের পথ ধরলাম এই যাত্রা। ছিয়ানব্বইটি ধাপে বিভক্ত ২,০৮০ কিলোমিটার বিস্তৃত এই প্রান্তর। গোটা পথটাই পার হলাম ট্যারান্টাস গাড়িতে। ধাপে ধাপে ছিয়ানব্বই বার লটবহর বদলাবার ঝক্কি এড়াতে পথচারীরা সাধারণত নিজস্ব গাড়ি আর মেরামতির ব্যবস্থা তথা প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সঙ্গে রাখে। এ-পথে স্তারেস্তা বা স্টেশন মাস্টারেরা সবাই রুশ। আর ইয়ামশ্চিক, অর্থাৎ গাড়িচালকেরা সবাই কিরগিজ। তাদের বার্ষিক বেতন পঁয়ষট্টি রুবল। সঙ্গে মাসিক দেড় পুড পরিমাণ রুটি আর অর্ধেকটা ভেড়া বরাদ্দ। স্টেশন ঘরগুলোতে টেবিল, চেয়ার, কৌচ ইত্যাদি থাকে, যাত্রীরা ইচ্ছে করলে রাতভর বিশ্রামও নিতে পারে। এককোণে দেখি একটা বিগ্রহও রয়েছে ঘরটায়, আর টেবিলে ওপরে জেভালস্কির উপহার দেওয়া একখানা বাইবেল।
অ্যানেনকফ থেকে সমরখন্দ পর্যন্ত রেলপথ ছিল আগেই। ইদানীং তা তাশখন্দ অবধি সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে সেই ওয়াগন পথে নাকি বড়ো কষ্ট কিরগিজ প্রান্তর পেরোনো। প্রতিরক্ষা কৌশলগত কারণে সেই রেলপথ তৈরি করা হলেও পরে তুলে নেওয়া হয় একসময়।
ফলে অরেনবার্গ থেকে পঁচাত্তর রুবল দিয়ে একটা ট্যারান্টাস কিনেই ফেললাম আমি। মারগেলান পৌঁছে পরে পঞ্চাশ রুবলে বিক্রিও করে দিয়েছি আবার। আমার মালপত্রের মোট ওজন তিনশো কেজি। বাক্সগুলো সব খাগড়ার মাদুরে বোনা। সেগুলো সব গাড়ির পেছনে আর গাড়োয়ানের আসনে বাঁধা হল। এর মধ্যে দুটো বাক্স ছিল ভারী অস্ত্রশস্ত্রে বোঝাই। ঈশ্বর সহায় ছিলেন সেদিন। নইলে অমন তেড়ে লাফিয়ে উঠছিল গাড়ি, কার্তুজ সব গুঁড়ো হয়ে যেত আমার। অলৌকিক ঘটনাই বলতে হবে, কিচ্ছুটি ক্ষতি হয়নি বাক্সের।
১৪ নভেম্বর অরেনবার্গ ছেড়ে রওনা হলাম যেদিন, এই শীতের প্রথম তুষার-ঝড় শুরু হল। তাপমাত্রা ২১ ডিগ্রি। ছোট্ট একটা খড়ের গাদায় একখানা ফরাস মুড়ি দিয়ে গুটিসুটি মেরে বসে আমি; পরনে পশমি পোশাক, গায়ে কম্বল আর বাশলিক জড়ানো। দম চাপা মেঘ আকাশে। দেখতে দেখতে তুষারের ঘূর্ণি এসে আছড়ে পড়ল গাড়ির ছইয়ে। রাতে বৃদ্ধ এক ডাকবাহক এসে উদ্ধার করলেন আমাকে। তুহিন কণা লেগে আরও সাদা দেখাচ্ছে তাঁর পাকা দাড়ি। অরেনবার্গ এবং অর্স্কের মধ্যে বছরে পঁয়ত্রিশ বার করে মোট কুড়ি বছর যাতায়াতের অভিজ্ঞতা রয়েছে লোকটার। পৃথিবী থেকে চাঁদের যে দূরত্ব, তার থেকেও ছ’হাজার মাইল বেশি পথ। এই খানিক বিশ্রামের ফাঁকে সামোভারের (বিরাট আকৃতির চায়ের কেটলি) ধারে বসে মোট এগারো পেয়ালা ধোঁয়া ওঠা চা খেলেন তিনি।
ইউরাল নদীর এশিয়া মহাদেশের তটে ছোট্ট শহর অর্স্ক। সেখানে পৌঁছেই মন বলে উঠল, ‘বিদায় ইউরোপ।’ আমার গাড়ি ইউরোপের শেষ পথটাও পেরিয়ে গেল একসময়। ঠিক তার পর থেকেই দুর্গম কিরগিজ প্রান্তরের শুরু। কাস্পিয়ান সাগর, আরাল সাগর, ইউরাল নদী ও ইরটিশ নিয়ে তার বিস্তৃতি। সে-পথে নেকড়ে, শেয়াল, কৃষ্ণসার হরিণ আর খরগোশের রাজত্ব। কিরগিজ যাযাবরেরা পশুর দল চরিয়ে বেড়ায়। ইতিউতি কিবিৎকা নামের মৌচাকের মতো কালো কালো তাঁবু ফেলে বাস করে। লবণহ্রদে গিয়ে পড়া ছোটো ছোটো জলধারার পাশে তাদের নলখাগড়ার তাঁবু। একজন কর্মক্ষম কিরগিজের হাতে সাধারণত তিন হাজার ভেড়া ও পাঁচশো ঘোড়া থাকে। ১৮৪৫ সালে রুশেরা সুবিশাল প্রান্তরের এই অঞ্চলটা নিজেদের দখলে এনেছিল। দুর্গও নির্মাণ করেছিল কিছু। সেগুলো এখনও সেনাবাহিনীর আবাসস্থল।
জমে যাওয়া তুষারে ক্যাঁচ-কোঁচ আওয়াজ উঠছিল গাড়ির চাকায়। ঘোড়ারা কখনও কদম তালে, কখনো-বা লাফিয়ে-ডিঙিয়ে চলেছে। গাড়ির ঝাঁকুনিতে হাড়গোড় খুলে আসবার জোগাড়।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথ চলেছি। নির্জন প্রান্তরে ছুটে চলেছে একা একটি গাড়ি। গাড়োয়ান মাঝে মাঝে অল্প সময়ের জন্যে গাড়ি দাঁড় করিয়ে দম নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে ঘেমে ওঠা ঘোড়াদের। আর মাঝেমধ্যেই চাবুক উঁচিয়ে পথনির্দেশ করে গাড়োয়ান বলে উঠছে, ‘আর কিছুক্ষণের মধ্যেই দক্ষিণ থেকে আসা একটা ট্যারান্টাসের দেখা পাব আমরা।’
দূরবীনে চোখ রেখে দিগন্তরেখায় তাকিয়ে আছি আমি। ক্ষুদ্র একটা বিন্দু ছাড়া কিছুই চোখে পড়ল না আর। অথচ গাড়োয়ান ব্যাটা আগুয়ান ঘোড়াগুলোর রঙ পর্যন্ত বলে দিচ্ছে। অবশ্য এরা এখানকার ভূমিপুত্র। চেতনা-শক্তি অবিশ্বাস্য রকমের তীক্ষ্ণ। জন্ম থেকেই কিরগিজেরা এই প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে সেই ক্ষমতা অর্জন করেছে। আলকাতরার মতো অন্ধকার আর মেঘলা আকাশের মাঝরাতেও পথ চিনতে পারে ঠিক। আঁধার তো আঁধার, তুষারের প্রলয় ঝড়েও ভুল হয় না একটুও। অবশ্য সার সার টেলিগ্রাফের খুঁটি পোঁতা আছে এই পথে, তবুও তেমন ঝড়ের মুখে পড়লে যে-কেউই দুই খুঁটির মাঝে পথ হারিয়ে ফেলতে পারে অনায়াসে। তখন রাত পোহানো ছাড়া গতি নেই। চাই কি নেকড়ের হাতে প্রাণটাও চলে যেতে পারে তখন।
তামদি পৌঁছে ক’ঘণ্টার বিশ্রাম পেলাম। স্তারেস্তা (স্টেশন মাস্টার) ক’মুঠো শুকনো আগাছা তুলে এনে আগুন জ্বেলেছেন, এমনি সময় তাঁর তিনটে হাঁস তুলে নিয়ে গেল নেকড়েতে।
২১ নভেম্বরে তাপমাত্রা নেমে গেল মাইনাস চার ডিগ্রিতে। তাশখন্দের পথে এর চাইতে ঠান্ডা রাত কাটাবার অভিজ্ঞতা নেই আমার। মাত্র দুটি কিবিৎকা নিয়ে পরের স্টেশনটি, নাম কনস্টান্টিনোভস্কায়া—খুবই সাধারণ এলাকা। সেখান থেকে আরাল সাগরের তীর বরাবর পথ। সাগরটি আসলে একটি লবণহ্রদ, প্রছুর মাছ ওতে। আয়তনে ভিক্টোরিয়া নিয়াঞ্জার কাছাকাছি। সেখান থেকে বাহাত্তর মাইল যেতে হবে বালিয়াড়ির পথে। ফলত তিনটে ব্যাক্ট্রিয়ান উট জুতে দেওয়া হল গাড়ির সঙ্গে। ঝাঁকুনি তুলে তুলে চলতে লাগল গাড়ি। গাড়োয়ান উঠে বসেছে মাঝের উটের পিঠে। উটেদের পিঠের কুঁজ দু-পাশে হেলিয়ে দুলিয়ে চলনটায় বড়ো মজা পাচ্ছিলাম আমি।
খানিক বাদেই অপেক্ষাকৃত গরম একটা জায়গায় পৌঁছলাম এসে। বৃষ্টি হচ্ছিল তখন। ফলে উটেদের পাটা পা আটকে যাচ্ছিল ভিজে বালিতে। অগত্যা সির-দরিয়ার (জাক্সারটেস নদী) পাড়ে কাজালিনস্ক নামে ছোট্ট এক শহরে উঠলাম গিয়ে। উরাল কসাকদের সেখানে স্টার্জন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছের ডিমের ভালো বাণিজ্য চলে। নদীর পাড় ধরে আমাদের পথ। বাঘ, বুনো শুয়োর আর রঙবেরঙের অসংখ্য পাখির বাস এখানটায়। দুর্ভেদ্য জঙ্গল। তাশখন্দ যাওয়ার পথে এক শিকারি এসে বেশ কিছু ওই পাখি দিয়ে গিয়েছিল আমাকে।
তুর্কিস্তান তখনও একশো আট মাইল দূরে, এমন সময় গাড়ির সামনের অ্যাক্সেলটা গেল ভেঙে। জোড়াতালি দিয়ে ঠিক করে খুব সাবধানে আর ধীরে পথ চলতে হচ্ছিল তখন। এক ঐতিহাসিক নগরে তৈমুর লঙের তৈরি কিরগিজদের মসিহা হজরত সুলতান খ্বাজার ঝলমলে গম্বুজ আর নজর মিনারে সজ্জিত অপূর্ব স্মৃতি-মসজিদ আমাদের অপেক্ষায় রয়েছে যে।
নির্জন প্রান্তরে মাইলের পর মাইল পথ চলেছি। কাদামাটিতে পড়ে গাড়ি আটকাল এইবারে। তিনটে ঘোড়া মিলে এক ইঞ্চিও নড়াতে পারল না সেটাকে। ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। ঘোড়ারা অস্থির হয়ে আগুপিছু করে বাঁধন ছিঁড়ে ফেলল নিজেদের। গাড়োয়ান শেষে একটা ঘোড়া নিয়ে পেছনের স্টেশনে ফিরে গেল সাহায্য চাইতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে যাচ্ছে। শো শো শব্দে বাতাসও বইতে লাগল এইবারে। চুপচাপ অপেক্ষায় রয়েছি, ওদিকে নেকড়ের ভয়ও রয়েছে বিলক্ষণ। একা পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে যদি? দুটো ঘোড়া আর একজন লোক নিয়ে আমার গাড়োয়ান ফিরে এল শেষে। উদ্ধার পেয়ে রওনা হলাম ফের।
ফেরিতে করে আরিস নদী পেরোলাম এইবারে। সামান্য ঢেউখেলানো অঞ্চল। সাধারণ একটা পিয়াতর্কা (পাঁচ ঘোড়ায় টানা গাড়ি) করে চলেছি তখন। সবচাইতে সামনের ঘোড়াটায় গাড়োয়ান বসে। আমার মালপত্র কম নয়, ফলে গাড়ির ওজনও হয়েছে বেশ। সেই ওজন নিয়ে গাড়ি চলেছে দুর্বার গতিতে উতরাই বেয়ে। যেন লেজ তুলে দৌড়চ্ছে ঘোড়ারা। এদিকে আমি ভয়ে কাঁটা হয়ে আছি, সামনের ঘোড়াটা কখন পড়ে গিয়ে গাড়োয়ান না চাকা তলায় পিষে যায়। দুর্ঘটনা কিছুই ঘটল না অবশ্য।
চিমখন্দে এসে পৌঁছলাম শেষে। জায়গাটার নাম আমি আগের বার শুনে গিয়েছিলাম।
অবশেষে ৪ ডিসেম্বর তারিখে ঘোড়ারা ঘণ্টি বাজিয়ে তাশখন্দে এনে হাজির করল আমাকে। হিসেব করে দেখলাম, এই উনিশ দিনে মোট সাড়ে এগারো ডিগ্রি অক্ষাংশ, ত্রিশ হাজার টেলিগ্রাফের খুঁটি পেরিয়ে এসেছি আমি। গোটা পথে একশো এগারো জন গাড়োয়ান বদলাতে হয়েছে আমাকে। তিনশো সতেরোটি ঘোড়া আর একুশটি উট মিলে গাড়ি টেনেছে আমার। বিস্তর ফারাক তাপমাত্রাতেও। সাইবেরিয়ার শীতের মরণ কামড় থেকে এক গরমের দেশে এসে উঠেছি, যেখানে দিনে প্রায় ৫৪ ডিগ্রি অবধি পারদ উঠে যায়।
ফের একবার তাশখন্দের মারগেলানে গভর্নর জেনারেল ব্যারন ভন রিওস্কির বাসভবনে উঠলাম এসে। ফারগানার গভর্নর জেনারেল পাভলো-শেইকওস্কির সঙ্গেই রইলাম এখানে। ওই ফাঁকে পদে পদে যেসবের অভাব বোধ হচ্ছিল—তাঁবু, কম্বল, পশমি কোট, ফেল্ট বুট, জিন, রান্নার বাসনকোসন, নতুন অস্ত্রশস্ত্র, রুশ-এশিয়ার মানচিত্র ইত্যাদি কিনে ফেললাম চটপট। স্থানীয় অধিবাসীদের জন্যেও উপহার নিলাম যেমন কাপড়চোপড়, জামাজোড়া, রিভলভার, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, ছুরি, চাকু, রুপোর পেয়ালা, হাতঘড়ি, আতস কাচ আর ওই আকর্ষণীয় দু-চারটে জিনিস। কিনলাম তো বটে, তো এইসব ভারী মালামাল রাখি কোথায়? কিনতে হল ইয়াখতান নামে চামড়ায় মোড়া সর্ত সিন্দুক। ঘোড়ার জিনে এরও জায়গা হয়ে যাবে আশা করি।
ঠিক করলাম, পামির হয়েই কাশগরে যাব এইবারে। এশিয়ার গোটা অন্তর্বর্তী অঞ্চলের সবচাইতে উল্লেখযোগ্য পাহাড়শ্রেণি। বিরাট বিরাট সব গুচ্ছের তুষার ঢাকা পাহাড়ের মাঝে যেন এক যোগসূত্র গ্রন্থি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে পামির। তার চারদিক ঘিরে পৃথিবীর উচ্চতম তথা সুবিশাল পর্বতশ্রেণি সব। যেমন উত্তর-পূর্বে তিয়ান-শান; দক্ষিণ-পূর্বে কুন-লুন, মুজতাগ পর্বতশ্রেণি বা কারাকোরাম এবং হিমালয়; আর দক্ষিণ-পশ্চিমে দাঁড়িয়ে আছে হিন্দুকুশ। এই জন্যেই একে ‘তাগদুম্বাশ’ বা পৃথিবীর ছাদ বলা হয়।
রুশ-তুর্কিস্তান, বোখারা, আফগানিস্তান, ব্রিটিশ-কাশ্মীর, চিনে-তুর্কিস্তান—সব দেশেরই নজর এই পামিরের দিকে। এই অঞ্চলে এর রাজনৈতিক গুরুত্ব সাংঘাতিক। আমার এই লেখা চলাকালীন রাশিয়া এবং গ্রেট ব্রিটেনের মধ্যে একে নিয়ে দারুণ ঝামেলা চলছিল। পামিরের পশ্চিম ও দক্ষিণ অঞ্চলে ব্রিটিশ ও আফগানদের আধিপত্য। ওদিকে পূর্বদিকটা আবার রয়েছে চিনের দখলে। ১৮৯১ সালে রুশেরা পামিরের উত্তরাংশে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে সে-অঞ্চলের দখল নেয়। তার দু-বছর পর মুরগাবে পামিরস্কি পোস্ট নামে এক দুর্গ নির্মাণ করে। আমু-দরিয়ার যত উৎসস্থল আছে, এটি তারই একটি। নজরদারিতে সামান্যতম অসতর্ক হলেই যুদ্ধ অবধারিত।
মারগেলান থেকে পামিরস্কি পোস্ট ২৯৪ মাইল। দূরত্বটা আহামরি কিছু না হলেও মারাত্মক শীত আর তুষারপাতে পথের অবস্থা সঙ্গিন। আমার থার্মোমিটারের পারদটুকু পর্যন্ত জমে যাচ্ছে রাতে। যে শোনে সে-ই সাবধান করে, আলাই ভ্যালির ভয়ংকর তুষারপাতে বেঁচে ফেরা খুব কঠিন। মারগেলান এবং পোস্টের মধ্যে কিরগিজ ডাকবাহক জিগিতেরাই একমাত্র চলাচল করতে পারে শুধু। তবে ভোগান্তি তাদেরও কম নয়, তারাও বিপদে পড়ে।
যাই হোক, যেতে তো আমাকে হবেই। পৃথিবীর ছাদে না ওঠে এইবারে ফিরছি না আমি। জেনারেল পাভলো-শেইকোওস্কি অশ্বারোহী এক ডাকবাহককে রওনা করিয়ে দিলেন পথে পথে কিরগিজ তাঁবু বাসিন্দাদের খবর দিতে। বলে পাঠালেন, গোটা পথ জুড়ে আমাকে যেন সসম্মানে স্বাগত জানানো হয় এবং যে-কোনো প্রয়োজনে সাহায্য করা হয়। ওদিকে দুর্গের সৈন্যাধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন সাইতসেফকেও খবর পাঠানো হল আমার আগমনের।
এই যাত্রায় বিশেষ কিছু লটবহর নেই আমার। তিনজন লোক শুধু যাবে সঙ্গে। একজন রহিম বাই, আমার খাস পরিচারক। আর দুজন কাফেলা কর্মীর মধ্যে একজন ইসলাম বাই। অনেকদিন ধরে বিপদে আপদে আমার কাজে এসেছে সে পরবর্তী সময়ে। মাথাপিছু দৈনিক এক রুবল কড়ারে নিজের জন্যে একটা আর মালবাহী সাতটা ঘোড়া ভাড়া করলাম আমি। ফলে এদের রক্ষণাবেক্ষণ ও খাদ্যের ভার আর আমার ওপর বর্তাবে না জেনে স্বস্তি পেলাম। এছাড়াও কাফেলার লোকেরা নিজেদের খরচে আরও তিনটে ঘোড়া নিয়েছে সঙ্গে। তাদের পিঠে দানা আর খড় বোঝাই।
২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৪ তারিখে রওনা হয়ে গেলাম আমরা। ইস্ফাইরান নদীর উপত্যকায় এসে হাজির হলাম চলতে চলতে। নদীটা আলাই পর্বতশ্রেণির ঢালে। এইবারে যতই ওপরে উঠছি, পথ তত দুর্গম হয়ে আসছে। শেষ জনপদটাও পেরিয়ে এলাম একসময়। পেছনে ফেলে এলাম কাঠের শেষ পলকা সাঁকোটাও। উপত্যকাটা ধীরে ধীরে একটা করিডোরের মতো সরু হয়ে আসছে। পথের ঢালও খাড়া হয়ে আসছে ততই। এই ডানে বাঁক, তো এই বাঁয়ে। দু-পাশের ঝোরাগুলোতে বরফ জমে আছে। এমনি এক সংকীর্ণ জায়গায় মালবাহী এক ঘোড়া পিছলে পড়ল। দুটো ডিগবাজি খেল প্রথমে। তারপর পাহাড়ের গা ফুঁড়ে বেরিয়ে থাকা কোন স্লেট পাথরে লেগে নদীর ধারে পড়ে ঘাড় মটকে মারা পড়ল বেচারা।

শেষ যে গ্রামটা পেরিয়ে এসেছিলাম, সেখানকার ক’জন লোক সঙ্গ নিয়েছিল আমাদের। সে যে কী উপকারে এল আমাদের, বলার নয়। পথ ততক্ষণে ভয়ংকর রূপ ধরেছে। খাড়া আর উঁচু গিরিচূড়াতে একটা কার্নিশের মতো ঝুলে আছে আমাদের পথ। কখনও তুষারে ঢাকা, কখনো-বা বরফের তলায়। গাঁইতি, কুড়ুল ইত্যাদি চালাতে হচ্ছে অবিরাম। পিছল জায়গাতে বালি ছেটানো হচ্ছে।
চুপিসারে অন্ধকার নেমে এল রাজ্য জুড়ে, রাত হল। তখনও তিন ঘণ্টার পথ বাকি আমাদের ক্যাম্পে পৌঁছতে। অন্ধের মতো পাহাড় বাইছি; কখনও হামাগুড়ি দিতে হচ্ছে, কখনো-বা পিছলে পড়ছি অতল গহ্বরে। সেখান থেকে চোখে আর কিছুই ঠাহর হয় না। মাথার দিকে একজন করে লাগাম ধরে আছে ঘোড়াদের, আর একজন লেজ। ঘোড়া যাতে পিছলে না যায়। কানফাটা চিৎকার চেঁচামেচির অনুনাদ উঠেছে উপত্যকা জুড়ে। বারে বারে বিঘ্নিত হচ্ছে আমাদের চলার গতি। এখন ধস নামার সময়। প্রতিমুহূর্তে ভয় হচ্ছে এই বুঝি ঝুরঝুরে তুষারের তলায় চাপা পড়লাম। চারদিকে ঘোড়ার কংকালের ছড়াছড়ি। গোটা কাফেলাটাই হয়তো মানুষজন মালপত্রসহ ধস চাপা পড়েছিল।
খানিক চওড়া এক উপত্যকায় এসে পৌঁছলাম শেষতক। দূর থেকে আমাদের ক্যাম্পে জ্বালিয়ে রাখা আগুনের আভা দেখতে পেয়ে কী যে স্বস্তি হল! দীর্ঘ বারোটি ঘণ্টার দুঃসহ পথচলার পর শ্রান্ত দেহে লঙ্গরে গিয়ে উঠলাম শেষে। কিরগিজেরা সেখানে আমার জন্যে দারুণ এক ইয়ুর্ট (কম্বলের তাঁবু) খাটিয়ে রেখেছে।
এখান থেকে আটজন কিরগিজকে পাঠালাম আলাই পাহাড়শ্রেণির তেঙ্গিস-বাই গিরিপথে ঘোড়াদের পথ কেটে তৈরি রাখার জন্যে। বেলচা, গাঁইতি আর কুড়ুল কাঁধে বেরিয়ে গেল তারা।
পরদিন রাবাতের উদ্দেশে রওনা হলাম। ৯,৫৫০ ফুট উচ্চতায় ছোট্ট এক আশ্রয়স্থল। সেখানে পৌঁছে আমার সুদ্ধু দলের ক’জনের সে কী মাথাব্যথা, বুক ধড়ফড়, কান ভোঁ ভোঁ আর বমিভাব। বুঝলাম, পার্বত্য পীড়ায় ধরেছে, অর্থাৎ মাউন্টেন সিকনেস। রাতে খাবারের দিকে ফিরে তাকাতেও ইচ্ছে হল না, নিঃসাড় ঘুম। অথচ পরে তিব্বতে ১৬,০০০ ফুট উঁচুতে বাতাসের অভাব থাকা সত্ত্বেও বিন্দুমাত্র কষ্ট বোধ করিনি আর।
তার পরদিন সকাল সকাল কিরগিজদের খুঁড়ে রাখা সুঁড়িপথে রওনা হয়ে গেলাম। চোখের সামনে আলাই পর্বতশ্রেণির গিরিশিরা সব মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে। ক্রমশ নীচে বয়ে যাওয়া ধবধবে সাদা এক নালার মধ্যে প্রবেশ করলাম আমরা। এর ছয় ফুট গভীর তুষার কেটে কিরগিজেরা সরু এক পথ বার করেছে, যেন বিশাল জলাভূমিতে সরু এক তক্তা বেয়ে পার হচ্ছি। সামান্য পা হড়কালেই সোজা তুষার সমুদ্রে। অগুনতি বাঁক পেরিয়ে গিরিপথে (১২,৫০০ ফুট) উঠলাম গিয়ে। চারদিকে তখন বিশাল এলাকা জুড়ে তুষারে ঢাকা সব গিরিশিরার অবর্ণনীয় দৃশ্য। দক্ষিণে আলাই এবং ট্রান্স-আলাই পর্বতশ্রেণির মাঝে আলাই ভ্যালি শুয়ে আছে। পুবে-পশ্চিমে তার বিস্তার।
সেখান থেকে সংকীর্ণ এক গিরিপথ নেমে গিয়েছে উপত্যকায়। গোটাকতক সাঁকো আর তুষারের খিলান পার করে বার কয়েক ছোটো একটা ঝোরা পেরোলাম আমরা। এদিকে ঘোড়ারা বেগড়বাই শুরু করেছে। সবাই মিলে তখন টেনে ধরে আবার মালপত্র চাপাতে হচ্ছে পিঠে। একদিন আগেই দানবের মতো এক তুষার ধস নেমে এসেছে এখানে। এগিয়ে দেখি গোটা পথটাই নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে তাতে। জোর বেঁচে গিয়েছে বলে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিল কিরগিজেরা। অগত্যা সেই ধস ডিঙিয়েই এগোতে হল আমাদের। পায়ের নীচে সম্ভবত কুড়ি বা ত্রিশ গজ গভীর তুষার তখন।
দারাউত-কুরগান দিয়ে আলাই ভ্যালিতে ঢুকলাম আমরা। সেখানে দেখি কুড়িটা ইয়ুর্টের দিব্যি ছোটো এক আউল বা তাঁবু-গাঁ রয়েছে একখানা। তেঙ্গিস-বাই জুড়ে তখন তীব্র তুষারঝড়। কিরগিজেরা লাফিয়ে উঠল আবার। একদিন আগেই তুষার ধসে চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়েছি, আর তার একদিন পরেই ঝড়ে পড়ে তুষার সমাধি হতে পারত আমাদের।
১ মার্চের আগের রাত্তিরে দারাউত-কুরগানে আছড়ে পড়ল তুষারঝড়। পাথরের দেওয়াল তুলে তাতে দড়িদড়া বাঁধা ইয়ুর্টগুলোকে তছনছ করে ফেলেছে প্রায়। জেগে উঠে দেখি আমার বালিশের পাশে ছোটোখাটো এক তুষারের দেওয়াল আড় হয়ে জমে আছে। গজ খানেক গভীর ধু ধু তুষারের মাঝে ইয়ুর্টগুলোকে যেন গুঁজে রেখে গিয়েছে কে।
একটা দিন বিশ্রামের পর কিরগিজ গাইডদের সঙ্গে আবার পথচলা শুরু। লম্বা লম্বা ঠেঙ্গা ঠুসে তুষার মাপছিল ওরা। দূরদূরান্ত অবধি যেদিকে চোখ যায় শুধু সাদা আর সাদা। অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে ফিরে দেখি ওই দূরে কালোমতো একটা বিন্দু দেখা যায়, যে ইয়ুর্টে রাত কাটিয়েছিলাম কাল। আগুন জ্বালানো হয়েছে সেখানে। গলগল করে ধোঁয়া উঠছে আকাশে। সন্ধেতে তার বাঁধা এক যন্ত্র বাজিয়ে আমাদের মনোরঞ্জন করল এক কিরগিজ। রাতে সেই তুষারঝড়ের দাপট ফের।
আলাই ভ্যালি ধরে পুবদিকে চলেছি আমরা। কিজিল-জু (লাল নদী) বয়ে চলেছে নীচে। আমু-দরিয়ার অন্যতম উৎস এই নদী। সেও চলেছে পুবদিকেই। এইখানে চারটে উট কাজে লাগানো হল আমাদের ঘোড়াদের জন্যে পথ তৈরি করতে। সেগুলো দেখি হঠাৎ হঠাৎ তুষারে ডুবে যাচ্ছে প্রায়। ফলে কম গভীর জায়গায় টেনে নিয়ে যেতে হচ্ছিল সবক’টাকে।
বেশি নয়, মাত্র দেড়শো পা ফেলে আমাদের পরবর্তী নাইট ক্যাম্পে পৌঁছেছি শেষে। কিন্তু হলে কী হবে, এটুকু পথ পেরিয়ে আসতেই দম বেরিয়ে যাবার জোগাড়। ক্যাম্পের ইয়ুর্ট আর আমাদের মধ্যে তখনও ন’ফুট পুরু তুষারের বিপজ্জনক এক গিরিখাত। চোখের সামনে একটা ঘোড়া অদৃশ্য হয়ে গেল আমাদের। তবে পিঠের বাক্সটা দড়িদড়া টেনে ধরে বাঁচানো গিয়েছে, এই যা রক্ষে। এই গভীর তুষারে বেলচা চালানো নিষ্ফল। কিরগিজেরা এক কৌশল করল তখন। ইয়ুর্টের ওপর থেকে কম্বলের টুকরোগুলো টেনে নামিয়ে তুষারের ওপর বিছিয়ে দিতে লাগল। ঘোড়ারাও দিব্যি গুটি গুটি পায়ে তার ওপর দিয়ে একে একে পেরিয়ে গেল। আমরাও পেরিয়ে এলাম জায়গাটা। যেন কোন অনন্তকালের যাত্রা।
কম্বল-তাঁবুগুলোর চারধারে তুষারের দেওয়াল দাঁড়িয়ে গিয়েছে। রাতে শীত নামল মাইনাস পাঁচ ডিগ্রিতে। পরদিন সকালে চোখ মেলে দেখি ট্রান্স-আলাইয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কওফমান (২৩,০০০ ফুট) মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে সামনে। অপূর্ব তার বাহার।
যেখানটায় রয়েছি উপস্থিত, জিপ্তিক ক্যাম্প থেকে এক কিরগিজকে পাঠালাম কোনও সাহায্য পাওয়া যায় কি না খোঁজ নিতে আসতে। সে-ব্যাটার ঘোড়া দেখা গেল সওয়ারির হাঁটু অবধি গভীর তুষারে গিয়ে পড়েছে লাফ মেরে। হাসব না কাঁদব বুঝতে পারছি না। লোকটা ফিরে এল তক্ষুনি। এইবারে মেনে নিতেই হল যে সত্যি তুষারে আটকা পড়েছি আমরা, অপেক্ষা ছাড়া উপায় নেই।
ক’টা উট আর ঘোড়া নিয়ে ক’জন কিরগিজ এসে হাজির হল শেষে। দাঁড়ায়নি বেশিক্ষণ, তবে খাসা এক বুদ্ধি দিয়ে গেল আমাদের। বলে, এখানে অমন তুষারপাত নতুন কিছু নয়। পথ তৈরিতে তখন চমরীগাইদের লাগিয়ে দেওয়া হয়। ওরা তুষার গুঁতিয়ে বেরিয়ে যায়। ফলে ক্ষণকালের জন্যে যে সুড়ঙ্গটি তৈরি হয়, তার ভেতর দিয়ে ঘোড়া নিয়ে অনায়াসে পারাপার সম্ভব।
নেকড়েদের দৌরাত্ম্যের কাহিনিও শোনাল তারা। গত তুষারঝড়ে তাদের কোন এক সঙ্গীর চল্লিশটা ভেড়ারই নাকি ভবলীলা সাঙ্গ করেছে এক নেকড়ে। আর একজন হারিয়েছে একশো আশিটি ভেড়া। আসলে এই প্রতিকূল আবহাওয়া নয়, নেকড়েরাই হচ্ছে কিরগিজদের আসল শত্রু। একটি নেকড়ে একাই ঝড়ের রাতে গোটা ভেড়ার পালকে শেষ করে দিতে পারে। তাজা রক্তে তার বড়ো লোভ। তবে কিরগিজদের হাতে একবারটি যদি ধরা পড়ে তো গেল। গলায় ফাঁস লাগিয়ে শক্ত এক খুঁটিতে ঝুলিয়ে দেয় তারা প্রথমে নেকড়েটিকে। তারপর চোয়ালে কাঠের এক টুকরো ঢুকিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে গলার দড়িটা ছেড়ে দেয়। এরপর শুরু হয় আসল খেল, চাবুকের মার। জ্বলন্ত কয়লা দিয়ে চোখও ফুঁড়ে দেওয়া হয়। মুখে ঠুসে দেওয়া হয় নস্যির ঢেলা। আমি হলে অবশ্য ঢের আগেই এই মৃত্যুযন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতাম ব্যাটাকে।
এক-একবারে পালে পালে বুনো ভেড়ার (ওভিস পলি: মার্কো পোলো এর নামকরণ করেছিলেন) টুঁটি ছিঁড়ে ফেলে নেকড়েরা মিলে। বেশ বুদ্ধি খাটিয়ে শিকার ধরে এরা। দল বেঁধে ঘাপটি মেরে ভেড়ার পালের অপেক্ষায় থাকে প্রথমে। তারপর খাড়া ঢালের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। ভেড়ারা তখন ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে আসা রক্তচক্ষু নেকড়েদের তাড়ায় সেই খাদ টপকাবার ব্যর্থ চেষ্টা করে। বড়ো সুন্দর প্যাঁচালো শিং হয় এই প্রজাতির ভেড়ার। লাফের সঙ্গে সেই শক্ত শিং গিয়ে গেঁথে যায় খাদের নীচে। তারপর সেখানে অপেক্ষায় থাকা আর এক দল নেকড়ে তখন ঝাঁপিয়ে এদের ওপর।
গত শীতে এই আলাই ভ্যালিতেই আমার দলের একজন কিরগিজ ও তার এক সঙ্গী বারোখানা নেকড়ের খপ্পরে পড়েছিল। ভাগ্যিস, বন্দুক ছিল সঙ্গে। সেখানেই গুলি করে দুটিকে মারে তারা।
আরও একটি ঘটনা বলি। বেশিদিন আগের কথা নয়, এক তাঁবু থেকে আর একটায় যাচ্ছিল এক কিরগিজ, আর ফিরে এল না। শেষে তার খুলি আর কংকালটাই পাওয়া গেল কেবল তুষারের মধ্যে। সঙ্গে অবশ্য পশমি কোটটাও ছিল। চারপাশে রক্তের দাগ আর তুমুল ধস্তাধস্তির চিহ্ন। ঘটনাটার একটা কাল্পনিক দৃশ্য গেঁথে গিয়েছিল আমার মাথায়। তাড়াতেই পারছিলাম না। হিংস্র নেকড়ের একটা দল ঘিরে ধরেছে তাকে, চারপাশে ধু ধু তুষার ছাড়া আর কেউ কোত্থাও নেই—কত রাত জেগে কাটিয়েছি ভয়ংকর এই দৃশ্যটা কল্পনা করে। নিশ্চয়ই কোনও তাঁবু-গাঁয়ের পথ ধরেছিল সে। আচমকাই নেকড়ের দল ঘিরে ধরেছিল তাকে। কোমরের খঞ্জর খুলে ডানে-বাঁয়ে চালিয়ে লোকটা নিষ্ফল আত্মরক্ষার চেষ্টা করছিল হয়তো। তাতে অবশ্য সাক্ষাৎ সেই দুশমনদের রক্তের লোভ আর হিংস্রতাই বাড়ছিল ক্রমে, লাভ কিছু হয়নি। অবশেষে হয়তো ক্লান্ত হয়ে টলমল পায়ে বসে পড়েছিল লোকটা, গ্রাস করেছিল অবসাদে। ততক্ষণে নিশ্চয়ই অন্ধকার নেমে আসছে ধীরে ধীরে। সুযোগ পেয়ে সবচাইতে কাছের নেকড়েটা হয়তো এক লাফে ঝাঁপিয়ে পড়ে তীক্ষ্ণ শ্বদন্ত বসিয়ে দিয়েছে তার গলায়।
যাই হোক, আমার কাজ হল এগিয়ে চলা। কিজিল-জু নদী পেরোলাম এইবারে। তার তটরেখায় বরফ জমে। যেন লম্বা এক সাদা ফিতে চলে গেছে বহুদূর। নদীর মাঝবরাবর অবশ্য জল যেমন গভীর, তেমনি স্রোত। ঘোড়াগুলো প্রথমে পাড়ের পিছল বরফ থেকে লাফিয়ে পড়ল নদীতে, তারপর আবার এক লাফে ও-পাড়ের বরফে।
ওখান থেকে বেশি দূর নয়, একজায়গায় গভীর তুষারের ওপর এসে তাঁবু ফেললাম আমরা। তার জন্যে বেশ কিছুটা তুষার পরিষ্কার করে জায়গা বের করে নিতে হল অবশ্য। পরিষ্কার রাত, ঝিলমিলে তারা আকাশে। চারদিকের তুষার প্রান্তরও ঝকমক করছে। তাপমাত্রা এখানে মাইনাস ত্রিশ ডিগ্রি। ঘোড়াগুলোর জন্যে খারাপ লাগল। বেচারিরা বাইরে দাঁড়িয়ে জমে যাচ্ছে নিশ্চয়ই এই ঠান্ডায়।
পুবেই পথ চলেছি, যেমনটা চলছিলাম। লক্ষ করে দেখি, আমার শরীরের ডানদিকে সূর্যের আলো পড়ে বেশ আরাম বোধ হচ্ছে। আর বাঁদিকটা আছে ছায়ায়, সেখানে শীতের কামড়। আমার মুখের চামড়া ইতোমধ্যেই খসখসে হয়ে আঁশ উঠে আসছে। ফলত ভূর্জপত্রের মতো শক্ত হয়ে আছে।
এইখানটায় একটা বরদোবা রয়েছে জানতাম। মাটির ছোটো কুঁড়ে, ডাকহরকরারা বিশ্রাম নেয়। এক কিরগিজকে সঙ্গে করে দল ছেড়ে অগ্রিম সেখানে রওনা হয়ে গেলাম আমি। তিন ফুট গভীর তুষার চষে হেঁটে চলেছি তো চলেছিই। রাত কাবার হতে চলল, সেই কুঁড়ের আর দেখা পাই না। বরং গোটা সাতেক নেকড়ের একটা দলের আভাস পাচ্ছি আশেপাশে।
ঠিক এইখানটা থেকে ট্রান্স-আলাইয়ের কিজিল-অর্ত গিরিপথের (১৪,০০০ ফুট) শুরু। তার মাথায় এক শিলাস্তূপ দাঁড়িয়ে আর গুটিকতক পতপত করে উড়ে চলা পতাকার খুঁটি। কিরগিজেরা হাঁটু গেড়ে তার সামনে বসে আল্লাহ্র প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে নির্বিঘ্নে এই পবিত্র অথচ ভয়ংকর পাহাড় ডিঙোতে সাহায্য করার জন্যে। পরে তিব্বতে গিয়েও এই একই জিনিস দেখেছি আমি—সেই শিলাস্তূপ, সেই খুঁটিওলা পতাকা আর সর্বশক্তিমানের প্রতি সেই একই শ্রদ্ধা জ্ঞাপন।
গিরিপথটার দক্ষিণদিকে তুষারের পরিমাণ খুব কম। গোটা অভিযানে আমি সর্বনিম্ন তাপমাত্রা পেয়েছিলাম মাইনাস সাঁইত্রিশ ডিগ্রি। কোক-সাইয়ের মাটির কুঁড়েতে মেপেছিলাম বসে।
পরদিন তোরণদ্বারের মতো এক গিরিশিরা পেরিয়ে এলাম আমরা। তার চুড়োয় দাঁড়ালে গোটা কারা-কুলটাকেই চোখে পড়ে, কালো এক সমুদ্র যেন। সূর্য এইবারে পাটে বসেছে। পশ্চিমের পাহাড়গুলোর ছায়া এসে ঊষর তুষার-মরুর দখল নিল ঝপাঝপ।
১১ মার্চে রওনা হলাম কারা-কুলের বিশাল বরফ প্রান্তর হয়ে। সঙ্গে দুজন, চারটে ঘোড়া আর দিন দুইয়ের রসদ। বাকি দলটা আবার একত্র হবে এর দক্ষিণ-পূর্ব তটে গিয়ে। একশো ত্রিশ বর্গমাইল জুড়ে এই জলাশয়ের বিস্তৃতি। দৈর্ঘ্যে তেরো মাইল, প্রস্থে সাড়ে নয়। ভাবলাম এর গভীরতা মেপে দেখি একবার। পুবদিকের ক’টা গর্তের মুখে শব্দ পাঠালাম আমরা। জমাট বরফ দেখি উদ্ভট উদ্ভট সব শব্দ তুলেছে প্রত্যুত্তরে। একবার মনে হল যেন ডঙ্কা বা বড়ো বড়ো বেহালা বাজাচ্ছে কেউ। স্বর তাদের খাদে, বেশ গুরুগম্ভীর আওয়াজ। আবার মনে হল, না, এ তো বন্ধ গাড়ির দরজায় আঘাত করার আওয়াজ। দলের লোকেদের বিশ্বাস, দানো দানো মাছেরা অতলে বরফের ছাদে মাথা পিটছে নির্ঘাত। রাতটা সেদিন ছোট্ট এক পাথুরে দ্বীপে কাটালাম আমরা।
জলাশয়ের পশ্চিমদিকের খাদে নেমে জায়গায় জায়গায় শব্দ করে মেপে দেখলাম। দেখা গেল এর সর্বোচ্চ গভীরতা সাতশো ছাপ্পান্ন ফুট। সেখান থেকে আমার কিরগিজ সঙ্গীটিকে নিয়ে বাকি দলটা যে সুঁড়িপথে এগিয়ে গিয়েছে, সে-পথেই আসছিলাম বেরিয়ে। কিন্তু যেই না এক খোলা জায়গায় গিয়ে পড়লাম, অমনি পথ গেল হারিয়ে। সেই সুঁড়িপথের আর হদিস পাই না খুঁজে। এদিকে বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নেমেছে ততক্ষণে। তুষার ঢাকা প্রান্তর ধরে ঘণ্টা চারেক হাঁটলাম আরও। চিৎকার করে ডাকাডাকি করলাম সারাক্ষণ। উত্তর এল না কোনও। শেষতক শুষ্ক তুষার-মরুর কিছু গাছগাছড়ার হদিস পেয়ে সেখানেই রাতটা কাটাবার মনস্থ করলাম। চেষ্টাচরিত্র করে খানিকটা আগুনও জ্বালালাম। এ অবশ্য শুধু ওম পেতে নয়, দলের জন্যে সংকেতও বটে। রাত একটা অবধি বসে গালগল্পে সময় কাটালাম আমরা—ভয়ংকর সব নেকড়েদের ঘটনা। না একদানা খাবার, না এক ফোঁটা চা। শেষে চোখ বুজে আসতে মোটা পশমে জড়িয়ে আগুনের পাশেই ঘুমিয়ে পড়লাম দুজনে।
পরদিন সকালেই অবশ্য কাফেলাটা খুঁজে পেয়ে গেলাম আবার। এইবারে মুস-কোল উপত্যকা হয়ে যাত্রা আমাদের। আক-বৈতালের গিরিপথ (১৫,৩০০ ফুট) অবধি নিয়ে গেল সে-পথ। সেই উপত্যকায় আবার সার সার বরফ আগ্নেয়গিরি। বরফের তলা থেকে জল বেরিয়ে এসে স্তরে স্তরে জমাট বেঁধে শঙ্কু আকৃতির সব বরফ আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে বড়োটা মেপে দেখলাম মাথায় ছাব্বিশ ফুট আর তলায় সাড়ে ছ’শো ফুট তার পরিধি।
এই গিরিপথে সাদা তুষার ঘূর্ণি ভেসে বেড়ায় অবিরাম, যেন নববধূর ঘোমটাটি। এইখানে একটা ঘোড়া ছেড়ে দিতে হল আমাদের। গিরিপথের শেষে এসে দেখা পেলাম কুল মামেতিফের। পামিরস্কি পোস্টের দোভাষী ইনি। আমুদে লোক, অমায়িক। জাতে কিরগিজ, তবে লেখাপড়া করেছেন রাশিয়ায়। খানিকটা পথ আরও পেরিয়ে এসেছি যখন, মুরগাবের বিস্তীর্ণ উপত্যকার দক্ষিণে আঙুল তুলে বললেন, “ওই যে পতাকাটা উড়ছে দেখতে পাচ্ছেন তো? এ-ই সেই পামিরস্কি পোস্ট, রাশিয়ার সমস্ত দুর্গের মধ্যে সর্বোচ্চ।”
॥ ষোলো॥
কিরগিজদের সঙ্গে
মাটির ব্লক আর বালির বস্তা দিয়ে তৈরি দুর্গটি। চার কোনায় বন্দুক উঁচিয়ে আছে বারবেটের ওপর। দুর্গের উত্তর মুখে যেই পৌঁছেছি, অমনি একশো ষাট জন সৈনিক আর কসাকদের গোটা সৈন্যদলটা প্রাচীরে উঠে হর্ষধ্বনি করে উঠল। মূল প্রবেশদ্বারে সাক্ষাৎ হল সৈন্যাধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন সাইতসেফ আর তাঁর ছ’জন সহকর্মী আধিকারিকের সঙ্গে। স্কোবেলেফের সহকারী পদে কর্মরত তিনি।
একঘেয়েমির ক্লান্তি থেকে যেন তাদের মুক্তি দিয়েছে আমার উপস্থিতি। গোটা শীত জুড়ে একটিও সাদা চামড়ার মানুষের দেখা পায়নি ওরা। তাদের হাবেভাবে স্পষ্ট, যেন কোন ভিন দুনিয়া থেকে ঈশ্বর পাঠিয়েছেন আমাকে। তাদের আপ্যায়ন আর আতিথেয়তায় আমি আপ্লুত। আর সেই দুর্গেই আমি স্বেচ্ছা বন্দি হিসেবে কাটিয়ে দিলাম কুড়িটা দিন।
চমৎকার বিশ্রাম নিলাম ততদিন। এখানে আমার দিন কাটে গালগল্পে, ছবি এঁকে আর ছবি তুলে। হঠাৎ হঠাৎ ঘোড়া নিয়ে চলে যাই এই অঞ্চলের কিরগিজ মোড়লদের কাছে। রোববার রোববার খেলাধুলোর আয়োজন থাকে। সৈনিকেরা কন্সার্টিকার তালে নৃত্য করে। আর আমি প্রতি মঙ্গলবার দূরবীন হাতে দৌড়ে যাই উত্তর দিগন্তে। প্রতীক্ষায় থাকি খবরের কাগজ আর চিঠিপত্র নিয়ে ডাকিয়ারা কখন আসে।
দেখতে দেখতে চোখের পলক ফেলতেই যেন কেটে গেল দিনগুলো। ৭ এপ্রিল এখান থেকে বিদায় নিয়ে নিজের ঘোড়ায় চড়ে বসলাম ফের। ছোটো দলটা নিয়ে চললাম উত্তর-পূর্বে রাং-কুল সরোবরের পথে। এক ইয়ুলামিকায় (চিমনিবিহীন শঙ্কু আকৃতির তাঁবু) রাতটা কাটালাম এইবারে। ছ’ফুট মাত্র গভীর এই সরোবর, তিন ফুট পুরু বরফে ঢাকা। বসন্তে অবশ্য বরফের নামগন্ধও থাকে না। ঝাঁকে ঝাঁকে বন্য হংসী আর পাতিহাঁসের মেলা বসে।
পুব ধরে চলতে চলতে চুঘতাই গিরিপথ হয়ে সারিক-কোল পর্বতশ্রেণি পেরিয়ে এলাম একসময়। ও-পারে গিয়ে চিনের মাটিতে প্রথম কিরগিজ তাঁবু-গাঁয়ে ডেরা ফেললাম আমরা। কাছেরই এক চিনে দুর্গ বুলুন-কুলের তিনজন বেগ বা প্রধান দেখা করলেন এসে। অত্যন্ত সাবধানী চোখে আমাদের নিরীক্ষণ করে আর মাথা গুনে নিয়ে ফিরে গেলেন দুর্গে। গুজব ছড়িয়েছে নাকি, রাশিয়ার এক সৈন্যদল রওনা হয়েছে চিনে-পামির দখল নিতে। মুখে মুখে এও ঘুরছে যে আমরা সকলেই নাকি ছদ্মবেশী সৈনিক আর আমাদের অস্ত্রশস্ত্র লুকোনো আছে সঙ্গের বাক্স-প্যাঁটরাতে। তবে সরেজমিনে আমি একা একজন ইউরোপিয়ান আর সঙ্গের ক’জন এই দেশেরই লোকজন দেখেশুনে শেষে আশ্বস্ত হলেন তাঁরা।
বুলুন-কুল থেকে দূর নয়, সৈন্যাধ্যক্ষ চাও দারিন দশজন প্রহরী পাঠিয়ে ডেকে পাঠালেন আমাদের। তিনি অবশ্য মুজতাগ-আতার পশ্চিম পাদদেশে যাত্রার পরিকল্পনায় কোনও আপত্তি করলেন না আমার। তবে শর্ত একটাই, দলের যে-কোনো একজনকে আমাদের মোট মালপত্রের অর্ধেক সহ জামিনদার থাকতে হবে এখানে। বুলুন-কুল থেকে কাশগর যাবার একটি মাত্র পথ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হল আমাকে, গেজ-দরিয়া উপত্যকা হয়ে।
চিনেরা এমনিতেই খুব সন্দেহপ্রবণ হয়। ফলে সারারাত ধরে আমাদের তাঁবু ঘিরে রক্ষীবাহিনী আর চরেদের পাহারা থাকবে, এ আর নতুন কী? তবে খুব একটা বিরক্ত তারা করেনি, এই যা রক্ষে।
১৪ এপ্রিল চারজন লোক আর চারটে মালবাহী ঘোড়া নিয়ে রওনা হলাম ফের। সারিক-কোলের প্রশস্ত উপত্যকার পথ ধরে দক্ষিণে চলেছি। কারা-কুলের মনোরম পার্বত্য সরোবর পেরিয়ে তগদাসিন বেগের তাঁবু-গাঁয়ের উঠলাম গিয়ে। অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ এই কিরগিজ প্রধান মানুষটি। ওদিকে যেই না শুনল এক ইউরোপিয়ান এসেছে গাঁয়ে, অমনি অসুস্থদের ধরে ধরে পিলপিল করে আমার ইয়ুর্টে আসতে শুরু করল কিরগিজেরা। কী আর করি, যথাসাধ্য চিকিৎসা শুরু করলাম সঙ্গে থাকা কুইনাইন আর নিরীহ কিছু তেতো জিনিসপত্র দিয়ে। আশ্চর্য ফল পাওয়া গেল তাতেই।

তুষার-পর্বত অধিপতি মুজতাগ-আতা এইবার আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে অটল। মাথায় ২৫,৫০০ ফুট। চুড়োটি ঝকঝকে চির তুষারে ঢাকা। পুবের মরুর গভীরে দাঁড়িয়েও বাতিঘরের মতো চোখে পড়ে একে। দক্ষিণের কাশগর পর্বতশ্রেণির দিকে এর পেছনটা পড়েছে। পূর্ব তুর্কিস্তানের অববাহিকার দিকে পামির মালভূমিকে আলাদা করে রেখেছে সে।
মুজতাগ-আতা সম্পর্কিত বহু শ্রুতি আখ্যান শোনা যায় কিরগিজদের মুখে। তাদের বিশ্বাস, এ এক অতিকায় মাজার বই কিছু নয়। আলি নামের এক পীরের সমাধি। কয়েকশো বছর আগে পুণ্যাত্মা এক বৃদ্ধ নাকি বেয়ে উঠেছিলেন এই পাহাড়ে। চুড়োয় পৌঁছে এক সরোবর ও এক নদীর সন্ধান পেয়েছিলেন তিনি। তার তীরে সাদা এক উট চরে বেড়াচ্ছে। আর সুদৃশ্য ফল বাগানে আপাদমস্তক সাদা পোশাকে গুরুস্থানীয় ক’জন মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছেন উদ্দেশ্যহীন। বৃদ্ধ একটা ফল পেড়ে নিলেন গাছ থেকে। অমনি সাদা পোশাকের আর এক বৃদ্ধ এসে অভিনন্দন জানালেন তাঁকে। বললেন, ফলটাকে পায়ে না পিষে ভালো করেছেন উনি। তাতে সারাজীবনের জন্যে এখানেই থেকে যেতে হত তাঁকে। তারপর আচমকা এক অশ্বারোহী এসে তাঁকে ঘোড়ায় তুলে নিয়ে ঢাল বেয়ে নামিয়ে দিয়ে গেল নীচে।
মুজতাগ-আতার মাথায় জনাইদর নামে একদা এক নগর ছিল বলেও স্থানীয়দের বিশ্বাস। সুখী জীবন ছিল নাগরিকদের। শীত কী জিনিস তারা জানত না। জরা বা মৃত্যুও কখনও স্পর্শ করত না তাদের।
যেখানেই গেছি, যত আউলেই আশ্রয় পেয়েছি কিরগিজদের, এই পবিত্র পাহাড়ের কোনও না কোনও গল্প অবশ্যই শুনেছি আমি। স্বভাবতই দুর্নিবার এক আকর্ষণ জেগে উঠেছে আমার ভেতরে ওই পাহাড়ে যাবার। চুড়োয় নাই-বা উঠলাম, তার খাড়া ঢাল বেয়ে তুষার-ঝঞ্ঝার মধ্যে এগিয়ে যাবার অভিজ্ঞতাও তো কম লোভনীয় নয়।
নিজের ঘোড়াটি আর দলের ক’জনকে এখানেই ছেড়ে দিতে হল। এইবারে ছ’জন দুঃসাহসী কিরগিজ চলল সঙ্গে আর বলিষ্ঠ দেখে ন’টা চমরীগাই। আবার নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে পড়া। দু-হাজার ফুট ওপরে উঠে যেখানটায় তাঁবু ফেললাম, সেখানে তুষার নেই। পাথুরে জমি, নুড়িতে ভরতি। কলকল করে বয়ে চলেছে হিম-ঝরনা। শুকনো কিছু গাছগাছালিতে আগুন করে তাঁবুর বাইরেই কাটালাম সবাই প্রথম রাতটা।
কিন্তু এই দানবসম পাহাড়ে আমার প্রথম চড়ার অভিজ্ঞতা সুখকর হল না মোটেই। চমরীদের নিয়ে তুষারভরা খাড়া ঢালের ধার ধরে অত্যন্ত কঠিন পরিশ্রমে বেয়ে উঠছি আমরা। ঠিক পাশেই উত্তরে ইয়াম-বুলাক হিমবাহের গভীর খাদ। এইখানটা থেকে পশ্চিমে তাকালে নয়নাভিরাম সারিক-কোল উপত্যকা চোখে পড়ে। আর দেখা যায় আমাদের পায়ের নীচে অববাহিকার জলে পুষ্ট সুবিশাল এক হিমবাহ। কী তার বাহার! সাদায়-নীলে ঝিকমিকিয়ে চুড়ো থেকে নেমে আসছে গভীর খাঁজ বেয়ে। যেন পরাক্রমী কোন সম্রাট আবির্ভূত হয়েছেন নিজের শিলাখণ্ডের সাম্রাজ্যে।
কিন্তু সে-সবে মন দেওয়ার সময় বেশি ছিল না হাতে। বাতাসের জোর বাড়ছিল। ওপরের ঢালের দিকে তুষার-ঝড়ও শুরু হল সহসা। মাথার ওপর চক্কর কাটছে তুষার-মেঘ। ক্রমেই আঁধার ঘনাচ্ছে চারদিকে। আমাদেরও ক্যাম্পে পৌঁছতে হবে তাড়াতাড়ি।
ওদিকে আমাদের অনুপস্থিতিতে তোগদাসিন বেগ বিরাট এক কম্বল-তাঁবু নিয়ে ক্যাম্পে হাজির। মোক্ষম সময়ে, অর্থাৎ ঝড় এসে গোটা পাহাড়টাকে গ্রাস করে ফেলার আগেই এসে পৌঁছে গিয়েছিল সে। খানিক পরই শুরু হল সেই ঝড়ের দাপট। ঝাপসা হয়ে এল চারদিক, কিচ্ছুটি দেখা যায় না। বেগের কল্যাণেই আমরা রক্ষে পেলাম সে-যাত্রা।
এই দুর্যোগও সহসা কমবে না, আমাদেরও ওপরে ওঠার অপেক্ষায় বসে থাকতে হবে আরও, এই আশঙ্কা করে ক’জন কিরগিজকে নীচে উপত্যকায় পাঠিয়ে দিলাম আরও কিছু রসদ সংগ্রহ করে নিয়ে আসবার জন্যে।
এইবারে আমার দুর্ভাগ্য জল ঢেলে দিল যাবতীয় পরিকল্পনায়। নিজেই কাবু হয়ে পড়লাম চোখের ব্যামোয়। তীব্র বাতজ ব্যথা শুরু হল সহসা। বাধ্য হয়ে খানিক গরম জায়গায় নেমে যেতে হল শেষে। অতএব যাত্রা স্থগিত রইল, আমার ছোট্ট কাফেলাটা নিয়ে প্রায় অন্ধের মতো নেমে এলাম ফের কারা-কুল ও বুলুন-কুলে। আবার সেই গেজ-দরিয়ার সংকীর্ণ উপত্যকার পথে।
নতুন একটা নদী পেরোতে হল আমাদের। ইয়া বড়ো বড়ো পাথরের চাঁই গলে সগর্জনে ফেনা তুলে বয়ে চলেছে সে। জলে নেমে ঘোড়াদের পার করাচ্ছিল দলের লোকেরা। ওরা জলে না নামলে ভেসেই যেত ঘোড়াগুলো। এই নদীতে অবশ্য অল্প ক’টাই সাঁকো। এদের একটিতে আবার সুবিশাল এক পাথর ঘাটের মতো পড়ে ছিল নদীর পাড়ে। সে থেকে ঝুলন্ত তক্তার ওপর দিয়ে ঘোড়াগুলো পার হচ্ছিল যখন, দেখার মতো এক দৃশ্য ছিল বটে।
গরমটা বাড়ছিল দ্রুত। নামতে নামতে গ্রীষ্মের হলকা গায়ে লাগছিল এসে। তাপমাত্রা সেখানে ৬৬ ডিগ্রি।
১ মে তারিখে কাশগরে পৌঁছতে পৌঁছতে আমার চোখ আবার স্বাভাবিক হয়ে এল প্রায়। কাশগর বাসের অল্প কিছু স্মৃতি ভাগ করে নিই এইবারে। আমার পুরোনো বন্ধু কনসাল-জেনারেল পেত্রোভস্কির সঙ্গে দীর্ঘ সময় যাপন, মি. ম্যাকার্টনির আতিথেয়তা আর মজার মানুষ ফাদার হেনড্রিকসের কথা ভুলি কী করে।
এখানে আমার প্রথম কাজই ছিল এই শহর এবং এলাকার প্রশাসক চান দাও তাইয়ের সাক্ষাতে হাজির হওয়া। চমৎকার মানুষ, আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ থেকেই চিনি তাঁকে। উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন আমাকে। পাসপোর্ট অনুসারে আমার যেখানে খুশি যাবার অনুমতি দিয়ে দিলেন সঙ্গে সঙ্গে।
রীতি অনুসারে পরদিন প্রতি-সাক্ষাতে আমার কাছে এলেন তিনি। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলাম। সাজে, পোশাকে, অমায়িক ব্যবহারে ঠিক যেন দেবমূর্তিটি। জমকালো এক শোভাযাত্রা নিয়ে তিনি হাজির হলেন কনসুলেটের দরবার কক্ষে। কী সে রঙের বাহার! প্রথমেই এক অগ্রদূত এল ঘোড়ায় চড়ে। প্রতি পাঁচ পা এগিয়ে এসে সুমধুর এক ঘণ্টাধ্বনি করে সে। তার পেছনে পায়ে হেঁটে একদল কর্মচারী। তাদের হাতে হাতে ছোরা আর চাবুক। জনতার মাঝে মহামান্য নগরপালের সুরক্ষিত পথ করে দেওয়াই তাদের কাজ। খাসা দেখতে এক খচ্চরে টানা ঢাকা গাড়িতে বসে আছেন নগরপাল। দু-পাশে সার সার পরিচারকেরা রয়েছে চন্দ্রাতপ আর লম্বা খুঁটির মাথায় হলুদ রঙের ধ্বজা হাতে। তাতে আবার কালো লিপিতে কীসব লেখা। শোভাযাত্রার এক্কেবারে শেষে সাদা ঘোড়ার পিঠে টগবগে একদল উর্দি পরা জওয়ান।
একদিন কনসাল অ্যাডাম ইগ্ন্যাটিফ আর আমি নৈশভোজের নিমন্ত্রণ পেলাম চান দাও তাইয়ের ওখানে। যাওয়ার পথে চিনেদের সেই শোভাযাত্রার তুলনায় আমাদের আয়োজন ছিল একেবারেই সাদামাটা। পশ্চিম তুর্কিস্তানের বণিকদের মধ্যে থেকে এক বৃদ্ধ আকসাকাল (আক্ষরিক অর্থে ‘পাকা দাড়ি’) চললেন সবার প্রথমে। আর এক সহিস রুশ সাম্রাজ্যের ধ্বজা উঁচিয়ে চলল আমাদের গাড়ির আগে আগে। সাদা উর্দিতে রক্ষীবাহিনীর দুজন আধিকারিক আর গোটা বারো কসাক আছে সবার শেষে। এ-ই আমাদের দলবল। গোটা নগর, তার হাটবাজার আর রেগিস্তান (বাজার চক বা পাবলিক স্কোয়ার) ঘুরে এসে বাজারে ঢুকলাম আমরা। ‘ফ্লি বাজার’ও বাদ গেল না। এখানে হাত-ফেরতা জিনিস মেলে সব।
নগরপালের কার্যালয় তথা বাসভবনে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে দুটো বন্দুক থেকে গুলি ছুড়ে ‘গান স্যালুট’ দেওয়া হল আমাদের। ভেতরের কক্ষে নগরপাল সপার্ষদ এসে দেখা করলেন আমাদের সঙ্গে। ভোজন কক্ষের ঠিক মধ্যিখানে বিরাট এক গোল টেবিল। নিমন্ত্রণকর্তা খোদ চারধারের চেয়ারগুলো নেড়েচেড়ে আমাদের ইঙ্গিতে বোঝালেন যে বেশ শক্তপোক্ত চেয়ার, বসলে ভেঙে পড়বে না। তারপর টেবিল-চেয়ারের ওপর হাত বুলিয়ে আমাদের আশ্বস্ত করলেন যে সবই ঝাড়ামোছা, নির্দ্বিধায় বসা চলে। শেষে গজদন্তের চপস্টিকগুলো কপালে ছুঁইয়ে যথাস্থানে রাখলেন আবার।
অতএব আর দেরি কেন? চটপট বসে পড়ে দক্ষিণ হস্তের কাজটি শুরু করা গেল। মোট ছেচল্লিশটি পদ ছিল এই ভোজে। মাঝে মাঝে বিরামের সময় গরম গরম কাঁচা মদ (স্পিরিট) ঢেলে দেওয়া হচ্ছিল পেয়ালায় পেয়ালায়। অ্যাডাম ইগ্ন্যাটিফ একটুও না টলে সতেরো পেয়ালা স্পিরিট মেরে দিল টপাটপ। তার পরিণতি কী হতে পারে ভেবেও দেখল না একবার। অবশ্য ঘরের দেওয়ালে লেখাই ছিল— ‘মদ্য গ্রহণ করো আর প্রলাপ বকো’। আমরা দুটোই করেছি অবশ্য। তবে ভয়ও পাচ্ছিলাম চিনে শিষ্টাচার বারংবার অতিক্রম করে যাচ্ছিলাম বলে। গৃহকর্তার মুখখানা দেখি ফ্যাকাসে হয়ে উঠছে। যদিচ জন্ম থেকে এঁদের ওই একটাই রঙ হয়, রোদে পোড়া পিচ ফলের মতো হলদেটে। সর্ত বাজনদারদের একটা দল গোটা ভোজের সময় বাজনা বাজিয়ে চলেছে অবিরাম। শেষ পদটা পেটে চালান হওয়ামাত্র তক্ষুনি বিদায় নিলাম আমরা।

পুরোদস্তুর গরম পড়ে গিয়েছে এইবারে। পারদ গিয়ে পৌঁছেছে ৯৫ ডিগ্রিতে। গরম যত পড়ছে, ততই আমার চির তুষারে ঢাকা মুজতাগ-আতার কথা মনে পড়ছে। চোখে ভেসে উঠছে তার ঝলমলে নীলচে হিমবাহগুলো।
জুন মাসে ইসলাম বাইয়ের পরিচালনায় ছোটো এক কাফেলা নিয়ে কাশগর থেকে বিদায় নিলাম। ঘোড়ার পিঠে গিয়ে হাজির হলাম ইয়াঙ্গি-শহর নামে ছোট্ট এক জনপদে। সেখানকার আম্বান আমাকে আগেভাগেই সংকীর্ণ এই উপত্যকার উছল নদীগুলো সম্পর্কে সাবধান করে দিলেন। আমার যাত্রাপথ সুগম করবার উদ্দেশ্যে নিয়াজ বেগ নামের একজনের নেতৃত্বে ক’জন কিরগিজকেও দিলেন সঙ্গে।
পাহাড়ের পর পাহাড় ডিঙিয়ে কিপচাক কিরগিজদের গাঁয়ে পৌঁছলাম গিয়ে। সেগুলোর কোনোটায় ইয়ুর্টে থাকে লোকজন, কোনোটায় আবার পাথর আর কাদামাটির কুঁড়ে। এগিয়ে চলেছি। যথাসময়ে পৃথিবীর সবকিছু ছাপিয়ে মুজতাগ-আতার ধবধবে সাদা শৃঙ্গ ভেসে উঠল চোখের সামনে। বন্য মনোরম সব উপত্যকা চারদিকে। বুকে ফেনা তুলে ছুটে চলেছে গভীর জলের এক-একটা নদী। কোনও অঘটন ছাড়াই পথ চলেছি আমরা এ-যাবৎ। বিস্তৃত উপত্যকায় ইতিউতি সব জনবসতি। সবুজ ঘাসের প্রাচুর্য চারদিকে। গাছে গাছে বুনো গোলাপ ফুটে আছে। হাথর্ন (কাঁটাগাছ বিশেষ) আর বার্চের সমাহার। পস-রাবাত গ্রামে পৌঁছতেই শুরু হল বৃষ্টি। আর এতেই খরস্রোতা নদীগুলো সাপের পাঁচ পা দেখে ফেলল যেন। ক্রমে জলের রঙ পালটে হয়ে উঠল বাদামি-ধূসর। সে কী গর্জন তাদের!
এই পথে কঠিনতম কাজ ছিল তেংরি-তার গিরিসংকট পার হওয়া। খাড়া দুই ঢালের মাঝে কয়েক গজের সরু এক গলতা। সেই সরু পথে আবার নদী নেমে এসেছে। পামিরের দিকে এই পথে যে-কেউ এলে নদীর ওপর দিয়েই যেতে বাধ্য। অজস্র পাথরখণ্ড গড়িয়ে নিয়ে ঢেউ তুলে বয়ে চলেছে নদী। সঙ্গে কানফাটানো এক প্রতিধ্বনি। ঘোড়ারা নিজেরাও কোথায় পা ফেলছে জানে না। আপ্রাণ চেষ্টা করছে সাবধানে বড়ো বড়ো গোল গোল পাথরগুলো বাঁচিয়ে পেরিয়ে যেতে। কখনও আবার লাফিয়ে একের পর এক পাথর ডিঙিয়ে পরেরটা পেরোবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সঙ্গে পিঠের বোঝার ভারসাম্যও রক্ষা করতে হচ্ছে আবার। সবচাইতে ভয়ংকর জায়গাগুলোতে দুজন লোক নেমে এসে পাথর চাগিয়ে সুবিধেমতো রেখে ঘোড়াদের সাহায্য করছে পেরিয়ে যেতে।

ছাই ছাই গ্রানাইট পাহাড়ের মাঝে উঁকি দেওয়া এতক্ষণের একচিলতে নীল আকাশটা বেশ খানিক চওড়া হয়েছে এইবারে। বেশ স্বস্তি পেলাম মনে। ১৫,৫৪০ ফুটের কোক-মৈনাক গিরিপথ পার হয়ে আবার এসে হাজির হলাম পৃথিবীর ছাদে। তারগামার বিস্তৃত উপত্যকায় ক’জন বেগ এসে স্বাগত জানাল আমাদের।
গিরিশৃঙ্গের চূড়ায় নির্মল বায়ুতে পার্বত্য জীবনের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য উন্মোচিত হল আমাদের চোখে। জিভের আকৃতির সব হিমবাহ নেমে আসছে মুজতাগ-আতার গভীর এবং সংকীর্ণ ফাটল বেয়ে। সে-সব থেকে জন্ম নিয়েছে ঢেউ তুলে নাচতে নাচতে নেমে আসা সব স্ফটিক স্বচ্ছ ঝোরার দল। সুবিশাল চারণভূমির বুক চিরে বয়ে চলেছে তারা। সেই ভূমিতে চরে বেড়াচ্ছে অগুনতি চমরী আর ভেড়া। আর আছে কালো চুমকির মতো গোটা আশিটি ইয়ুর্ট।
সু-বাশির সমতলের দিকে এগোচ্ছি এইবারে। সেখানে সুজন তোগদাসিন বেগ নিজের সবচাইতে ভালো ইয়ুর্টটি খাটিয়ে রেখেছে। তারপর প্রায় মাস তিনেক এই কিরগিজদের সঙ্গেই বাস করেছি আমি। তাদের মতোই থেকেছি, তাদেরই ঘোড়া এবং চমরীতে চড়েছি। তারা যা খায়—সেই মাংস আর টক দুধ, আমিও তা-ই খেয়েছি। ফলে অচিরেই স্বজন হয়ে উঠতে পেরেছি তাদের। তারপর থেকে তারা প্রায়শই বলত, ‘এইবারে একজন খাঁটি কিরগিজ হয়ে উঠেছ তুমি।’
১১ জুলাই তারিখে সু-বাশির ময়দানে তোগদাসিন বেগ এক বাইগার আয়োজন করল আমার সম্মানে। বাইগা মানে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বা খেলার আসর। ঐতিহ্যবাহী সোনারঙা ঝলমলে খলত পরে এতদঞ্চলের সমস্ত বেগেরা এসে ভিড় করেছে আমাদের তাঁবুর সামনে। বিয়াল্লিশ জন উজ্জ্বল পোশাকের ঘোড়সওয়ারের সঙ্গে গিয়ে হাজির হলাম খেলার মাঠে। ময়দান ঘিরে লোকে লোকারণ্য, আমাদেরই অপেক্ষায় রয়েছে সবাই। সবার মাঝে একজন খোয়াতও উপস্থিত রয়েছেন দেখি। একশো এগারো বছর নাকি বয়স তাঁর। সঙ্গে পাঁচ ছেলে, তাঁরাও বৃদ্ধ, সবারই পাকা দাড়ি গালে।
গোটা ময়দান ঘোড়সওয়ারে গিজগিজ করছে। খেলা শুরুর অপেক্ষায় উদগ্রীব সবাই। সংকেত দিতে দেরি, অমনি এক সওয়ার তীব্র গতিতে ছুটে এল আমাদের দিকে। আমাদের সামনে এসে গোল হয়ে ঘুরছিল সে। তারপর ঘুরে হাঁটু মেরে ঘোড়াটাকে নির্দেশ দিল। জ্যান্ত একটা ছাগল তুলে নিয়ে এসেছে সে বাঁহাতে। ডানহাতে ধারালো তরোয়াল। নির্ভুল নিশানায় এক কোপে কেটে নিল ছাগলটার মাথাটা। রক্তাক্ত ধড়টা একপাশে ঝুলে হেঁচকি তুলছে।
এই অবস্থাতেই গোটা ময়দানটার এক চক্কর লাগাল সে। এইবারে আরও আশি জন ঘোড়সওয়ার ঝড়ের বেগে আবার ছোটা শুরু করেছে আমাদের দিকে। খুরের দাপটে তখন মাটি কাঁপছে। ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে দলটা, মাঝে মাঝে আড়াল হয়ে যাচ্ছে ধুলোর মেঘে। আর মুহূর্তকাল দেরি হলেই বিধ্বংসী এক ঝড়ের মতো আছড়ে পড়ত আমাদের ওপর। কিন্তু ঠিক কয়েক কদম দূরে এসেই ঘুরে গেল দলটা। আমাদের চোখে-মুখে তখন যত রাজ্যের ধুলোমাটি। মরা ছাগলটাকে এক ঝটকায় আমার পায়ের কাছে ফেলে দিয়েই সেই সর্দার ধুলোয় আচ্ছন্ন সমতলে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ওরা ফিরে যাবার পরের দণ্ডেই কাটা ছাগলটা নিয়ে যুদ্ধ লেগে গেল। আমরা পিছিয়ে এলাম তাড়াতাড়ি। খেলাটা ছিল ঘোড়া নিয়ে দৌড়ে এসে কে কার আগে সেই ছাগলটা তুলে নিয়ে পালিয়ে যেতে পারে। সে এক দেখার মতো দৃশ্য বটে। আশি জন ঘোড়সওয়ার গোল হয়ে ধুন্ধুমার বাধিয়েছে তখন। ক’টা ঘোড়া তো পড়েও গেল দেখলাম। পিঠ থেকে সওয়ার ফেলে মাঠ ছেড়ে সে কী প্রাণপণ দৌড় তাদের! ওদিকে সেই বৃত্তের বাইরে থেকে আরও কিরগিজ খেলোয়াড়েরা ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে এদিকে। একে মাড়িয়ে, ওকে দলে সেই গিজগিজে বৃত্তের মাঝে ঢোকবার চেষ্টা। দেখেশুনে এ হূণেদের লুঠতরাজ বললেও অত্যুক্তি হয় না।
অমনি বলিষ্ঠ এক কিরগিজ ছাগলটা নিয়ে বেরিয়েই পাশবিক উল্লাসে গোটা ময়দানে চক্কর দিতে শুরু করল। আর তাকে গোটা দলটা তাড়া করেছে হিংস্র নেকড়ের মতো। এইভাবে বারংবার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকল খেলাটার।
খেলা দেখতে দেখতে তোগদাসিন বেগও আর আটকে রাখতে পারেনি নিজেকে। তুমুল উত্তেজনায় সেও নেমে পড়ল হঠাৎ। কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘোড়া-সহ এক ডিগবাজি খেয়ে কপালটা গিয়ে লাগল লালরঙা চিনে নিশানে। ফলে সে-যাত্রা ক্ষান্ত দিল সে।
খেলা শেষে এক দস্তরখানে নেমন্তন্ন দেওয়া হল আমাদের। মাংস, ভাত, টক দুধ আর চা— এই ছিল খাবারে। খেয়েদেয়ে রুপোর মুদ্রা দিয়ে বিজয়ীদের পুরস্কৃত করলাম আমি। তাদের মধ্যে ইয়েহিম বাই আর মোল্লা ইসলাম নামের বলিষ্ঠ দুই কিরগিজকে নিয়োগ দিলাম আমার দলে।
আলো পড়ে আসতেই ঘোড়সওয়ারের দল যে-যার তাঁবুতে ফিরে গেল। ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে এল মুজতাগ-আতার পদতলে।
ক্রমশ