এই লেখকের আগের গল্প- ম.জা.রু এল বঙ্গে, ঘণ্টা রহস্য, বিভ্রম, ম.জা.রু-র প্রথম আলো, ম.জা.রু.-র ইতিকথা

এক
শরৎ-ভোরের হিমেল হাওয়া গায়ে লাগিয়ে আর শিশিরভেজা ঘাসে পা ডুবিয়ে কৌশিক, তীর্থ আর রাজু— তিন বন্ধু প্রায় একসঙ্গেই উপস্থিত হল রাসমাঠে। এখনও পুজোর ছুটি পড়েনি। শিউলিভেজা বাতাসে মায়ের আগমনী বার্তায় ওদের মন বেশ খুশিতেই ভরে আছে কিছুদিন ধরে।
রাজুর হাতে একটা ফুটবল আছে বটে, কিন্তু মাঠে জায়গা নেই বিশেষ। গোটা মাঠ জুড়েই পুজোর প্যান্ডেল বাঁধার কাজ চলছে। কাজেই, একধারে ফুটবলটা রেখে দিয়ে তিন বন্ধু মাঠের ধার বরাবর গোল হয়ে দৌড় শুরু করল।
দৌড়তে দৌড়তে প্রতিদিনই তিনজনের মধ্যে বিভিন্ন জিনিস নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলে। আজও তার ব্যতিক্রম হল না। দৌড়তে দৌড়তে তীর্থ আর কৌশিকের মধ্যে তর্ক চলছিল ব্যোমকেশ আর ফেলুদা এই দুজনের মধ্যে কার বুদ্ধি বেশি সেই নিয়ে। মাঠের দু-পাক চক্কর দেবার পরেও রাজু সেই আলোচনায় বিন্দুমাত্র অংশগ্রহণ না করায় কৌশিক রাজুর মাথায় একটা চাঁটি মেরে বলল, “মুখে সেলোটেপ কেন?”
তীর্থ ফোড়ন কাটল—“সেলোটেপ নয়, ফেভিকুইক।”
তিন অভিন্ন-হৃদয় বন্ধু। পড়া, খেলা সব একত্রে। পাড়ায়, স্কুলে ‘থ্রি-মাস্কেটিয়ার্স’ নামে ডাকে তাদের। কিন্তু সুযোগ পেলে একে ওপরের পিছনে লাগতে কেউ ছাড়ে না। খানিক অমন মশকরার পর রাজু মুখ খুলল, “বেশি বকিস না। কনসেনট্রেট করতে দে।”
“এ কী রে ভাই! এটা কি পরীক্ষার হল নাকি যে মনঃসংযোগ করবি?” তীর্থ বলল।
একরাশ বিরক্তি নিয়ে রাজু বলল, “খেলার মাঠে মনঃসংযোগ লাগে না কে বলল?”
তীর্থ দেখল রাজু ভীষণ সিরিয়াস হয়ে কথা বলছে। তাই রাজুকে আরও একটু রাগিয়ে দেবার উদ্দেশ্যে বলল, “আহা! সে তো প্রতিযোগিতার সময়। এখন এই ভোরবেলায় কি তুই কৌশিক আর আমার সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতায় নেমেছিস নাকি?”
রাজু কোনও উত্তর না দিয়ে শেষ পাকের দৌড়টা নিঃশব্দে শেষ করেই মাঠে পড়ে থাকা ফুটবলটা হাতে নিয়ে প্রচণ্ড সিরিয়াস মুখ করে ড্রপ দিতে থাকল। এবার কৌশিক এগিয়ে গিয়ে রাজুর কাঁধে হাত দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কী কেস রে? সকালবেলায় মুড এমন অফ কেন?”
সেইরকমই সিরিয়াস মুখ করে ফুটবলটা হাতে নিয়ে গোল-পোস্টের দিকে তাকিয়ে রাজু উত্তর দিল, “আজ রাজাদার পেনাল্টি শট আমাকে আটকাতেই হবে।”
এবার হো হো করে হেসে উঠল তীর্থ আর কৌশিক। হাসতে-হাসতেই কৌশিক বলল, “তাই বুঝি ভোর থেকে কনসেনট্রেট করছিস?”
ফুটবলটা দু-হাত দিয়ে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে রাজু বলল, “হ্যাঁ, কনসেনট্রেট তো করতেই হবে। যে-কোনোভাবে আজ রাজাদার পেনাল্টি আমাকে আটকাতেই হবে। না-হলে যে রাজাদার কাছ থেকে উন্নতি দেবীর সিক্রেটটা কিছুতেই বার করা যাবে না।”
শুনে তীর্থ আর কৌশিকের মুখ থেকে অস্ফুটে বের হয়ে এল, “উন্নতি দেবী!”
দুই
গতবছর মহলায়ার দিন জমিদারবাড়ির ঠাকুরদালানে মায়ের চোখ আঁকা দেখছিল তীর্থ, কৌশিক আর রাজু। একদিকে চলছিল চণ্ডী পাঠ আর একদিকে কী অদ্ভুত দক্ষতায় কুশের আগা দিয়ে দেবী দুর্গাকে কাজল পরানো হচ্ছিল—প্রথমে ত্রিনয়ন, তারপর বাম চক্ষু ও শেষে ডান চক্ষু আঁকা হতেই মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ীতে রূপান্তরিত হয়ে গেলেন দেবী মা। অদ্ভুত শিহরন লেগেছিল ওদের। আর ঠিক তারপরেই চোখ পড়েছিল রাজাদার দিকে। রাজাদা মন্দিরের সাবেকি মূর্তিটার সামনে স্থির হয়ে বসে ছিলেন। ধীরে ধীরে ওরাও এসে বসেছিল রাজাদার পাশে।
রাজাদা এই জমিদারবাড়ির বর্তমান উত্তরাধিকারী। জমিদারি তো সেই কবেই ঘুচে গেছে। পুরোনো আমলের জমিদারবাড়ি নতুন করে রি-মডেলিং করে ঝাঁ-চকচকে নতুন বাড়ি হয়ে গেছে। পুরোনো কালের থাকার মধ্যে শুধু আছে এই ঠাকুরদালান, মন্দির আর এক্কেবারে পিছন দিকে বাগানের ভিতর একটা কড়ি-বরগার ঘর।
বেশ কিছুক্ষণ ধরে মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত মায়ের মূর্তির সামনে বসে ছিলেন রাজাদা। কিছু যেন বিড়বিড় করছিলেন। ওদের কানে শুধু এসেছিল ‘উন্নতি দেবী’ এই শব্দ দুটো। প্রণাম সেরে উঠে ওদের তিনজনকে দেখতে পেয়েই একগাল হেসে রাজাদা বলেছিলেন, “কী রে, মায়ের চক্ষুদান দেখলি?”
সম্মতিসূচক একদিকে ঘাড় হেলিয়ে রাজু বলেছিল, “উন্নতি দেবী কে রাজাদা?”
সন্দেহের চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে রাজাদা বেশ কঠিন স্বরেই জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তোরা কি চুপিচুপি আমার কথা শুনছিলি নাকি?”
আড়ি পেতে কারও কথা যে শুনতে নেই, তা ওরা ভালোই জানে। কিন্তু ওরা তো রাজাদার কথা শুনতে আসেনি! রাজাদার সঙ্গে গল্প করতেই এসেছিল। আসলে রাজাদাকে যে ওরা ভীষণ ভালোবাসে। যদিও রাজাদা ওদের থেকে অনেক বড়ো, ঠিক দাদার মতোও নয়, বরং কাকুই বলা উচিত, কিন্তু রাজাদা নিজেই ওদের দাদা বলে ডাকতে বলেছেন। আর অমন হাসিখুশি, প্রাণবন্ত, সুপুরুষ মানুষটা যিনি কিনা খেলাধুলা তো বটেই বিভিন্নরকম দুষ্টুমিতেও ওদের সাথী হয়ে হাসি-মজা-আনন্দে হইহই করেন, তাঁকে কাকু বলতে ওদের বয়েই গেছে। সেদিন কিন্তু রাজাদার ভারী গলা আর সন্দেহের দৃষ্টিতে ওরা যেন বেশ কুঁকড়েই গেছিল। মাথা নীচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়েছিল তিনজন।
একটু পরেই হো হো করে হেসে উঠে রাজাদা বলেছিলেন, “কী রে, ভিজে বেড়ালের মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়লি কেন?”
মুখ নীচু করেই মৃদু স্বরে কৌশিক জবাব দিয়েছিল, “না, মানে আমরা ইচ্ছা করে তোমার কথা শুনতে চাইনি। হঠাৎ কানে এসে গিয়েছিল। কিন্তু তুমি কি আমাদের ওপর রাগ করেছ?”
অবাক হয়ে রাজাদা বলেছিলেন, “রাগ করব কেন তোদের ওপর?”
“তবে যে ওরকম রাগী রাগী গলায় ধমকে উঠলে?” তীর্থ বলল।
হাসতে হাসতে রাজাদা বললেন, “আর ওতেই তোদের পিলে চমকে গেল বুঝি?”
“তবে বলো, উন্নতি দেবী কে।” নাছোড়ের মতো আবার জিজ্ঞেস করেছিল রাজু।
একটু যেন অন্যমনস্ক হয়ে মন্দিরের মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে রাজাদা বলেছিলেন, “সে আছে এক রহস্য।”
রহস্যের কথা শুনেই কৌশিক, তীর্থ আর রাজু— তিনজনেরই চোখগুলো চকচক করে উঠেছিল। একই সঙ্গে তিনজনে অসীম আগ্রহে বলে উঠেছিল, “রহস্য! কী সেই রহস্য?”
একে একে তিনজনেরই মুখের ওপর চোখ বুলিয়ে রাজাদা বলেছিলেন, “রহস্য শুনেই যে উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠলি তোরা! খুব উৎসাহ তোদের রহস্য নিয়ে, তাই না?” তারপর কী যেন চিন্তা করে হাসতে হাসতে বলেছিলেন, “ঠিক আছে। সবটাই তোদের বলব। তবে আজ নয়, আসছে বছর মায়ের চোখ আঁকা হবে যেদিন, সেদিন। তবে আমারও একটা শর্ত আছে।”
সঙ্গে সঙ্গে কৌশিক জিজ্ঞেস করেছিল, “কী সেই শর্ত?”
রাজুর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে হাসতে রাজাদা বলেছিলেন, “রাজু তো তোদের গোলকিপার। এই এক বছরের মধ্যে ওকে একবার আমার পেনাল্টি আটকাতে হবে। তবেই হবে রহস্য উদঘাটন। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যে আমাকে আর কেউ এই নিয়ে একদম জ্বালাতন করবে না। তবে নিজেরা যদি রহস্যভেদ করতে পারো, সে নিয়ে আমার কিছু বলার নেই।”
কথা ক’টা বলেই রাজাদা পিছন দিকে ঘুরে গটগট করে হেঁটে অন্যদিকে চলে গেছিলেন। রাজাদার গমনপথের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তীর্থ বলে উঠেছিল, “ব্যস, হয়ে গেলো। রহস্য শুরু না হতে-হতেই শেষ।”
“কেন? এমন বলছিস কেন?” জিজ্ঞেস করেছিল কৌশিক।
ব্যঙ্গের সুরে তীর্থ উত্তর দিয়েছিল, “রাজাদার শট আটকাবে রাজু! জানিস, কলকাতা মাঠে যে-কয়েক বছর রাজাদা খেলেছে তাতে কোনোদিন পেনাল্টি মিস করেনি। রাজাদার বাঁ পায়ের শট বিখ্যাত ছিল কলকাতা মাঠে। নেহাত ডান পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে গিয়েছিল বলে বেশিদিন খেলতে পারল না, না-হলে দেশের হয়ে তো রাজাদা খেলতই। আর রাজু বাঁচাবে তাঁর শট! আর হাসাস না।”
একটু অন্যমনস্ক হয়ে কৌশিক বলে উঠেছিল, “আচ্ছা, আমরা নিজেরাও তো চেষ্টা করতে পারি। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজখবর করতে পারি উন্নতি দেবীর ব্যাপারে।”
“ইয়েস, দ্যাটস কলড পজিটিভ থিংকিং।” তীর্থর বাড়ানো হাতে হাত মিলিয়েছিল কৌশিক আর রাজু।
তিন
পুজো শেষ হতেই তিন বন্ধু এক বিকেলবেলায় গভীর আলোচনায় বসেছিল ‘উন্নতি দেবী রহস্য’ উদ্ধারের চেষ্টা কোথা থেকে শুরু করা যায় সে ব্যাপারে। উন্নতি দেবী ঠিক কে হতে পারেন সে সম্বন্ধে একটা ছোটো তর্কবিতর্কও চলেছিল নিজেদের মধ্যে। তারপর এ-সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়েছিল যে, উনি নিশ্চয়ই জমিদার বাড়ির কেউ হবেন। কারণ, পুরোনো দিনের মহিলাদের নামের সঙ্গে ‘দেবী’ শব্দটা হামেশাই জুড়ে থাকত, এ-কথা ওরা বিভিন্ন বইতে পড়েছে আর উন্নতি দেবী নামে কোনও ঠাকুর-দেবতার নাম ওরা কখনও শোনেনি। কিন্তু জমিদারবাড়ির পুরোনো ইতিহাস ওরা পাবে কোথায়! অনেক ভেবেচিন্তে ওরা উপস্থিত হয়েছিল এই আধা-শহরের একমাত্র পাঠাগারে। সেখান থেকেও নিরাশ হয়ে ফিরেছিল ওরা। সেখানে জমিদারবাড়ির ইতিহাস সংক্রান্ত কোনও বই তো ছিলই না, বরং সেখানকার গ্রন্থাগারিককে উন্নতি দেবী সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করায় জুটেছিল তিরস্কার। যথেষ্ট সিরিয়াস মুখ নিয়ে কৌশিক গ্রন্থাগারিককে জিজ্ঞেস করেছিল, “স্যার, আমাদের উন্নতি দেবী সম্পর্কে একটু আলোকপাত করতে পারেন?”
কিছুক্ষণ ওদের দিকে বিরক্তিসূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে উনি বলেছিলেন, “পড়াশুনা নেই? যত্তসব উলটোপালটা প্রশ্ন! অঢেল বই আছে পাঠাগারে, যেটা খুশি নিয়ে ওই টেবিলে বসে পড়ো, আমাকে বিরক্ত কোরো না।”
হতাশ হয়ে পাঠাগার থেকে বেরিয়ে তিন বন্ধু ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছিল সদাব্রত ঘাটের দিকে। হঠাৎ তীর্থ লাফিয়ে উঠে চিৎকার করল, “ইউরেকা! ইউরেকা!”
আচমকা তীর্থর এমন লাফালাফিতে বেশ অবাক হয়েই কৌশিক বলে উঠেছিল, “খামোখা খেপে গেলি কেন?”
তীর্থর চোখ দুটো উত্তেজনায় চকচক করে উঠেছিল।—“এই শহরের ইতিহাস সবথেকে ভালো যিনি জানেন, তিনি হলেন আমাদের হরিচরণ স্যার। চল স্যারের বাড়ি যাই, এখুনি রহস্যভেদ হয়ে যাবে।”
আনন্দে তীর্থকে জড়িয়ে ধরেছিল কৌশিক আর রাজু। বলে উঠেছিল, “গ্রেট আইডিয়া। চল, এখুনি স্যারের বাড়ি যাই।”
যেমন কথা তেমনি কাজ। দ্রুত পায়ে হেঁটে ওরা পৌঁছে গিয়েছিল হরিচরণ স্যারের বাড়ির সামনে। প্রবল উত্তেজনা চোখে-মুখে। কিন্তু স্যারের বাড়ির সামনে এসে সব উৎসাহ-উদ্দীপনা কেমন যেন মিইয়ে গেল। আসলে হরিচরণ স্যার ভীষণ রাশভারী মানুষ, ক্লাসসুদ্ধু সকলে ভয় পায় স্যারকে। স্যারের বাড়িতে ঢোকার সাহস কিছুতেই ওদের হল না। কিছুক্ষণ স্যারের বাড়ির সামনে অনর্থক ঘোরাঘুরি করল ওরা। এদিকে সন্ধে হয়ে আসছে। বাড়ি ফিরতে যদি সন্ধে পার হয়ে যায় তাহলে তিনজনেরই ভাগ্যে অসীম দুর্গতি। বেধড়ক মার খেতে হবে মায়ের হতে। তাই মনে অনিচ্ছা নিয়েই ওরা বাড়ির দিকে পা বাড়াচ্ছিল। ঠিক সেই সময়েই স্যারের বাড়ির গেট খুলে বাইরে বের হয়ে এলেন স্বয়ং হরিচরণ স্যার।
“কী রে! কী ব্যাপার? এই অসময়ে তোরা তিনটে হনুমান এখানে কী করছিস?” জলদগম্ভীর স্বরে স্যার বললেন।
স্যারকে দেখেই তিনজনে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। কারও মুখে কোনও কথা নেই। একে একে তিনজনের মুখের ওপর একবার করে চোখ বুলিয়ে স্যার এবার একটু কোমল স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, “কোথাও আটকে গেছিস? কোনও অধ্যায় বুঝতে পারছিস না, নাকি কোনও প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছিস না?”
স্যারের কোমল গলার স্বর শুনে একটু আশ্বস্ত হয়ে রাজু আমতা আমতা করে বলেই ফেলল, “স্যার, উন্নতি দেবী কে?”
ওদের মনে হল স্যার যেন কিছু ভাবছেন। ওরাও আগ্রহী দৃষ্টিতে স্যারের দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু একটু পরেই স্যারের হুংকারে ওদের পিলে চমকে গেল।—“ওরে হতভাগা! তিনি যে-ই হোন না কেন, তোদের উন্নতিতে একটুও এগিয়ে আসবেন না। এই রাতদুপুরে নিজেদের পড়াশুনা ছেড়ে যত্তসব অলীক চিন্তাভাবনা! আজ তোদের দেখাচ্ছি তোদের উন্নতির চাবিকাঠি আমার হাতের এই দু-আঙুলে।” স্যার কান ধরার জন্য দু-হাত ওদের দিকে বাড়াতেই তিনজনেই পোঁ পোঁ দৌড়।
সেই শেষ ওদের উন্নতি দেবী রহস্যভেদের চেষ্টা। তারপর নিজেরা উৎসাহী হয়ে আর কারও কাছে ওই ব্যাপারে কোনও প্রশ্ন করেনি। বরং ভরসা করেছে রাজুর গোলকিপিং দক্ষতার উপর। প্রচুর উৎসাহ দিয়েছে রাজুকে। যদিও তীর্থ আর কৌশিক ভালোমতোই জানত রাজাদার পেনাল্টি শট আটকানোর মতো ক্ষমতা রাজুর নেই। তবে কত অসম্ভবই তো হঠাৎ সম্ভব হয়ে যায়। যেমন, ফুটবল সম্রাট পেলের পেনাল্টি কিকও তো কলকাতা মাঠে আটকে দিয়েছিলেন মোহনবাগানের গোলকিপার শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই যদি কোনও মিরাকল ঘটে— প্রথম প্রথম এমন আশায় ছিল ওরা। তারপর একসময় অসম্ভব বুঝে হাল ছেড়ে দিয়েছে। বিগত এক বছরের প্রতিদিনই রাজাদা একটা করে পেনাল্টি শট নিয়েছেন আর রাজু ব্যর্থ চেষ্টা করেছে সেই শট আটকানোর। ধীরে ধীরে উন্নতি দেবীর রহস্যের কথা নিয়ে ওদের মধ্যে আলোচনাও বন্ধ হয়ে গেছিল। আজ হঠাৎ করে রাজু সেই উন্নতি দেবীর প্রসঙ্গ তোলায় কৌশিক আর তীর্থরও পুরোনো দিনের সেইসব কথা একদম গড়গড় করে মনে পড়ে গেল।
চার
কৌশিক আর তীর্থ হঠাৎ দেখল বল হাতে রাজু এগিয়ে চলেছে গোল-পোস্টের দিকে আর মাঠের উলটোদিক থেকে ধীরে ধীরে ওদের দিকে এগিয়ে আসছেন রাজাদা। রাজাদার মুখে সেই অকৃত্রিম হাসি। ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে ‘সুপ্রভাত’ বলে রাজাদা এগিয়ে গেলেন পেনাল্টি বক্সের দিকে। পেনাল্টি বক্সের মাথায় দাঁড়িয়ে রাজুকে সুপ্রভাত জানিয়ে রাজাদা তৈরি হলেন শট নিতে। তীর্থ আর কৌশিক উত্তেজনায় হাত মুঠো করে দাঁড়িয়ে, মনে মনে দু-চারবার ভগবানের নাম জপে প্রার্থনা করল, ‘হে ভগবান, আজ মিরাকল ঘটিয়ে দাও। রাজাদার পেনাল্টি যেন আজ মিস হয়, নয়তো উন্নতি দেবী রহস্যোদঘাটন আর সম্ভব হবে না।’
ভগবানকে ডাকতে ডাকতে বোধ হয় চোখের পাতা দুটোও বুজে গিয়েছিল ওদের। ‘বেটার লাক নেক্সট টাইম’ কথাটা শুনেই তীব্র হতাশায় চোখ খুলে গেল তীর্থ আর কৌশিকের। প্রতিদিনের মতো আজকেও বল জড়িয়ে রয়েছে গোল-পোস্টের জালে। গোল-পোস্টের নীচে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে রাজু। আর প্রতিদিনই ‘বেটার লাক নেক্সট টাইম’ বলার পর রাজাদা যেমন দুলকি চালে এগিয়ে চলেন মাঠের পাশের দিঘিটার দিকে, ঠিক সেই একইভাবে সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছেন রাজাদা।
কৌশিক আর তীর্থ রাজুর সামনে গিয়ে তার কাঁধে সান্ত্বনার হাত রাখল। রাজুর চোখ দুটো ছলছল করছে। সান্ত্বনা জানিয়ে কৌশিক বলল, “আরে ভেঙে পড়ছিস কেন? কাল একটা শেষ সুযোগ তো আছে।”
অতিকষ্টে কান্না চেপে রাজু বলল, “কাল বাদ দিয়ে পরশু মহালয়া। কাল রাজাদা মাঠে আসবে না, আগেই বলে দিয়েছিল। আজ শেষ সুযোগ ছিল। পারলাম না রে, সরি।”
আশাহতের মতো চোখ-মুখ ছিল তীর্থ আর কৌশিকেরও। কিন্তু রাজুর সামনে একটুও ভেঙে না পড়ে কৌশিক বলল, “তুই তো তবু চ্যালেঞ্জটা নিয়ে এক বছর ধরে লড়াই চালিয়ে গেলি। আমরা তো কবেই ভুলে মেরে দিয়েছি।”
পরিবেশটা হালকা করার উদ্দেশ্যে তীর্থ বলল, “ছাড় তো ওসব উন্নতি দেবী-টেবির কথা। মনে নেই হরিচরণ স্যারের কথা, আমাদের আসল উন্নতি তো স্যারের হাতের ছোঁয়া়র মাধ্যমে আমাদের কানের লতি দিয়ে আমাদের মগজে প্রবেশ করে।” তারপর একটু চুপ করে থেকে আবার বলল, “আজ আর ফুটবলে লাথাতে ইচ্ছা করছে না। চল, একটু দিঘির পাড়ে গিয়ে বসি।”
ধীর পদক্ষেপে তিন বন্ধু এগিয়ে চলল দিঘির পাড়ের দিকে। পাড়ের কাছাকাছি আসা মাত্রই ওদের কানে ভেসে এল গুরুগম্ভীর গলায় সূর্য প্রণাম মন্ত্র। প্রতিদিনের মতোই আজও রাজাদা একবুক জলে দাঁড়িয়ে পূর্বদিকে মুখ করে সদ্য উদীয়মান সূর্যের দিকে তাকিয়ে জপ করে চলেছেন। ক্লান্ত তিন বন্ধু দিঘির পাড়ে বসে চুপ করে সেই দৃশ্য দেখতে লাগল।
স্নান সেরে পাড়ে উঠে ওদের তিনজনকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে রাজাদা একগাল হেসে বললেন, “কী ব্যাপার? আজ থ্রি-মাস্কেটিয়ার্স একদম চুপচাপ! ব্যাটারি ডাউন?”
রাজাদার কথার কোনও উত্তর না দিয়ে তিন বন্ধু একদম চুপচাপ রইল। রাজাদার দিকে একবার শুধু তাকিয়ে অনেক কষ্টে একটু হাসার চেষ্টা করল কৌশিক। রাজাদা একে একে তিনজনেরই মুখের দিকে ভালো করে তাকিয়ে বলে উঠলেন, “শোন, পরশু তো মহালয়া। ওদিন ভোরে ঠাকুরদালানে চলে আসিস।” তারপর একটু চুপ করে থেকে বললেন, “কাল তো তোদের সঙ্গে দেখা হবে না, তাই আজই বলে দিলাম।”
একটু অবাক হয়েই কৌশিক জিজ্ঞেস করল, “কাল সারাদিন তোমার সঙ্গে দেখা হবে না?”
রাজাদাকে চুপ করে থাকতে দেখে তীর্থ বলল, “অন্তত ভোরবেলায়। আর একটা সুযোগ রাজুর প্রাপ্য।”
তিনজনের মুখের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে রাজাদা বলে ওঠেন, “ঠিকই বলেছিস। আরও একটা সুযোগ রাজুর প্রাপ্য। তা যখন দিতে পারছি না, তখন তার খেসারত তো আমায় দিতেই হবে।” তারপর রাজুর দিকে তাকিয়ে বলেন, “গোল বাঁচাতে পারিসনি ঠিকই, তবে এই এক বছর ধরে তুই যে চেষ্টাটা চালিয়েছিস সেটা সত্যিই প্রশংসা করার মতো। পুরস্কার তো তোকে দিতেই হবে।”
রাজু রাজাদার দিকে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা স্বরে প্রশ্ন করে, “কী পুরস্কার দেবে?”
কোনও উত্তর না দিয়ে ওদের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে দিঘির পাড় থেকে নিজের বাড়ির দিকে মুখ করে হাঁটতে শুরু করেন রাজাদা। একটু এগিয়েই আবার ওদের দিকে ঘুরে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, “যদি উন্নতি দেবী সম্বন্ধে জানতে চাস, তবে আজ বিকেলে চলে আয় আমার বাড়ি।”
রাজাদার মুখ থেকে এই কথা শুনে আনন্দে উত্তেজনায় তিনজনের মুখ-চোখ চকচক করে ওঠে। এই এক বছর ধরে উন্নতি দেবী সম্বন্ধে যে অদম্য কৌতূহল অনেক কষ্টে মনের মধ্যে চাপা পড়ে ছিল, এক লহমায় তা যেন আগ্নেয়গিরির লাভার মতো ছুটে বেরিয়ে আসতে চায়। আনন্দের চোটে কৌশিক, তীর্থ আর রাজু পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে।
পাঁচ
বিকেল হতে না হতেই তিন বন্ধু হাজির রাজাদার বাড়ি। উত্তেজনায় তিনজনেরই হৃদস্পন্দন যেন অনেকটা বেড়ে গেছে। মূল বাড়িতে ঢোকার ঠিক আগেটাতেই ঠাকুরদালান ও আদ্যিকালের সেই মন্দির। পুরোনো কাঠামো বজায় রেখেই মেরামত করা হয়েছে মন্দির আর ঠাকুরদালান। ঠাকুরদালানে নবনির্মিত দুর্গা মা তাঁর সন্তানদের নিয়ে এক কাঠামোয় দাঁড়িয়ে আছেন। আজ মৃৎশিল্পীদের কেউ এখন নেই। শুধু মন্দিরের সামনে বসে কীসব পুজোর জোগাড় গোছগাছ করছেন পুরোহিত মশাই। কৌশিক, তীর্থ আর রাজুকে মন্দির প্রাঙ্গণে আসতে দেখেই তিনি বললেন, “ভালো আছ বাবারা?”
মন্দিরের এই পুরোহিত মশাই ওদেরই বন্ধু শঙ্করের বাবা। পুরুষানুক্রমে এই মন্দিরের পূজা-অর্চনার দায়ভার সামলে আসছেন তাঁরা। নিপাট ভদ্রলোক আর মুখে সবসময় হাসি। ওরাও হাসি মুখে উত্তর দিল, “হ্যাঁ জেঠু, আমরা ভালো আছি। রাজাদা কোথায়?”
পুরোহিত মশাই উত্তর দিলেন, “রাজাবাবু বলছিলেন বটে যে তোমরা আসবে। যাও, সোজা ভিতরে ঢুকে যাও। বাগানের মধ্যে যে ঘরটা আছে, সেখানে আছেন উনি।”
কৌশিক, রাজু আর তীর্থ একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। ওরা একদম ছোট্টবেলা থেকে শুনে আসছে জমিদারবাড়ির বাগানের মধ্যে যে পুরোনো ঘরটা আছে সেটা জমিদারি আমলের গুমঘর। বেয়াদপ প্রজাদের শায়েস্তা করার জন্য ওই ঘর ব্যবহার করা হত পুরোনো দিনে। অপরাধ যদি ছোটো হত তবে শাস্তি দেবার পর আধমরা প্রজাকে ছেড়ে দেওয়া হত; আর অপরাধ যদি জমিদারের বিচারে বেশি হত তবে ওই ঘরেই গুম করে মাটির নীচে পুঁতে দেওয়া হত বেয়াদপ প্রজাকে। সেই গুমঘরেই রাজাদা ওদের জন্য অপেক্ষা করছেন শুনে বেশ একটু দমেই গেল ওরা। ওদের সেই দোনোমনা ভাব দেখেই পুরোহিত মশাই ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ভয় করছে নাকি? কিচ্ছু ভয়ের নেই। নিশ্চিন্তে চলে যাও।”
এখনও তো সন্ধে হতে অনেক বাকি। আর তার ওপরে রাজাদা নিজেই তো আছেন ওই ঘরে। তবে আর ভয়ের কী আছে! মনে মনে এই ভেবে তিন বন্ধু এগিয়ে গেল বাগানের মধ্যে দিয়ে সেই পুরোনো ঘরের দিকে। জমিদারদের পুরোনো বাগান আর পুরোনো সেই কড়ি-বরগার ঘর। কে জানে কত অজানা ইতিহাস লুকিয়ে আছে সেখানে!
ওদের পায়ের আওয়াজ পেয়েই ঘর থেকে বাইরে বার হয়ে এলেন রাজাদা। পরনে সাদা পাজামা আর পাঞ্জাবি। একমাথা কোঁকড়ানো চুল অবহেলায় নেমে এসেছে ঘাড়ের কাছে। দীর্ঘদেহী সুপুরুষ রাজাদাকে দেখে রাজুর মনে হল, পুরোনো দিনের কোনও জমিদার যেন ঘর থেকে বার হয়ে আসছেন তাঁর প্রজাকে শাস্তি দেবার জন্য।
ওদেরকে দেখেই একগাল হেসে রাজাদা বললেন, “ও তোরা এসে গেছিস? আয় আয়, ভিতরে আয়। ভূতের ঘরে আয়।”
“রাজাদা, এই ঘরে কেন? চলো না তোমার নতুন ঘরে গিয়ে বসি।” কৌশিকের গলাটা একটু কেঁপে গেল।
কাঁপা কাঁপা গলায় তীর্থ বলল, “আর তাছাড়া বুবান আর বউদিই-বা কোথায়? ওদের তো দেখতে পেলাম না।”
গম্ভীর হয়ে তিনজনের মুখের দিকে একবার দেখে নিয়ে হো হো করে হেসে উঠলেন রাজাদা। তারপর বললেন, “গুমঘরে যদি গুম করে দিই তোদের তিনজনকে, এই ভয় পাচ্ছিস! এই সাহস নিয়ে তোরা রহস্যভেদ করবি!”
খুব প্রেস্টিজে লাগল তিনজনের। সত্যিই তো, এখন তো আর জমিদারি নেই। আর রাজাদাই-বা কেন খামোখা ওদের গুম করতে যাবেন! গুমঘরের ভূতেরাও নিশ্চয়ই এই সূর্যের আলোয় দেখা দেবে না। তবু বুকটা যে একটু দুরুদুরু করছে না তা নয়; ভগবানের নাম নিয়ে তিনজনে রাজাদার পিছন পিছন ঢুকে পড়ল সেই ঘরে।
ঘরে ঢুকেই ওরা বেশ অবাক হয়ে গেল। পুরোনো দিনের চুন-সুরকির গাঁথনি দেওয়া দেওয়াল আর অনেক উঁচুতে কড়ি-বরগার ছাদই শুধু নয়, একটা বিশাল উঁচু পালঙ্কও রয়েছে সেই ঘরে, যার উচ্চতা এতটাই বেশি যে তাতে ওঠার জন্য রয়েছে একটা সিঁড়ির ব্যবস্থা। উপর থেকে ঝুলছে একটা বিশাল ঝাড়বাতি। দেওয়ালে দেওয়ালে রয়েছে বেশ কিছু পুরোনো সাদা-কালো ছবি আর আছে কয়েকটা বিশাল কাঠের আলমারি। এককোণে রাখা আছে বিশাল পিয়ানো। ঘরের কোথাও কিন্তু একটুও অপরিষ্কার নেই, বরং বেশ সাজানো-গোছানোই গোটা ঘরখানা।
ঘরের মাঝে রাখা একটা পুরোনো দিনের শ্বেতপাথরের টেবিলের সামনে রাখা চেয়ারে বসে রাজাদা ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী? কেমন লাগছে ভূতের ঘর?”
রাজু, তীর্থ আর কৌশিক তখনও হাঁ করে ঘরের এদিক-ওদিক দেখছে। রাজাদার ডাকে তাঁর দিকে ফিরে তীর্থ বলল, “এত সুন্দর একটা ঘর, গুমঘর!”
রাজাদাকে মিটিমিটি হাসতে দেখে কৌশিক বলল, “তুমিই-বা কেন এই ঘরকে ভূতের ঘর বললে?”
হাসতে হাসতে হাতের ইশারায় ওদের বসতে বলে রাজাদা বললেন, “ভূতের ঘর নয়তো কী? ভূত মানে তো অতীত। আর এখানে যে অতীত থমকে আছে।”
গোল টেবিলের সামনে রাখা চেয়ারে বসতে বসতে রাজু বলল, “তবে এবার বলো উন্নতি দেবীর ইতিহাস।”
রাজাদা টেবিলের ওপর রাখা একটি ফাইলের ফিতে খুলতে খুলতে বললেন, “দেখি তোদের ইতিহাসের জ্ঞান কেমন। জাতীয় মেলার নাম শুনেছিস?”
সঙ্গে সঙ্গে কৌশিক গড়গড় করে বলে দিল, “ব্রিটিশ ভারতে স্বাদেশিকতার ভাব জাগরণ তথা জাতীয় চেতনার প্রসারের উদ্দেশ্যে ১৮৬৭ সালে জাতীয় মেলার উৎপত্তি। হিন্দু মেলা ও স্বদেশী মেলা নামেও এই মেলা পরিচিতি লাভ করে।”
প্রশংসার দৃষ্টিতে কৌশিকের দিকে তাকিয়ে রাজাদা বললেন, “বাহ্! এই জন্যেই তো তোদেরকে এত ভালোবাসি। বল, আর কী কী জানিস। তোদের এই গ্রামেও যে জাতীয় মেলা হত তা জানিস?”
তিনজনেই ঘাড় নাড়িয়ে ওদের না জানার কথা জানতে একটুও দেরি করল না। তারপর সমস্বরে বলে উঠল, “রাজাদা, তুমি বলো।”
মৃদু হেসে রাজাদা ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বলব বলেই তো ডেকেছি তোদের। জাতীয় কংগ্রেসের জন্মের আগে ইন্ডিয়ান লিগ, ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ও হিন্দু মেলাই ছিল বাংলার তথা ভারতের জাতীয় চেতনা প্রকাশের সংগঠন। এই হিন্দু মেলা বা জাতীয় মেলার সংগঠকদের প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়, জাতীয় সংবাদপত্র, জাতীয় সংস্থা প্রভৃতি স্থাপিত হয়। দেশীয় শিল্পে উৎসাহ দান, গ্রামে গ্রামে দেশীয় জিনিসের প্রতি আনুগত্য প্রচারের জন্য এই মেলাকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের স্বদেশী আন্দোলনের পূর্বসূরি বলে মনে করা হয়। আর তখনকার দিনে বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা এই মেলার প্রধান সংগঠক ছিলেন।”
“হুঁ, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও কিশোর বয়সে এই মেলার একজন উৎসাহী অংশগ্রহণকারী ছিলেন।” বলে উঠল কৌশিক।
“কিন্তু এর সঙ্গে উন্নতি দেবীর কী সম্পর্ক?” প্রশ্ন করল রাজু।
টেবিলের ওপর রাখা ফাইল থেকে একটা মলিন বাঁধানো খাতা বার করে এনে রাজাদা বললেন, “খাতাটা অনেক পুরোনো। বেশি নাড়াচাড়া করলে ছিঁড়ে যেতে পারে। সব পৃষ্ঠা আস্ত যে আছে, তাও নয়। তোরা এদিকে আয়, পড়ে দেখ।”
সঙ্গে সঙ্গে তিনজনে চেয়ার ছেড়ে উঠে রাজাদার ঘাড়ের ওপর দিয়ে উঁকি মারল সেই খাতার ওপর। দেখল, মলিন সেই খাতায় ততোধিক মলিন হয়ে যাওয়া হলদেটে একটি খবরের কাগজের একটু অংশ আঠা দিয়ে লাগানো আছে। লেখাগুলো খুব পরিষ্কার নয়, তবে পড়া যায়।
চৈত্রমেলায় প্রতিষ্ঠিত উন্নতি দেবী
গত ৩০শে ফাল্গুন হইতে ২রা চৈত্র পর্যন্ত মহা সমারোহে একটি জাতীয় হিন্দু মেলা হইয়া গেল। মেলাস্থলে কৃষিজাত ও শিল্পজাত দ্রব্য যাহা কিছু ছিল তাহা নিতান্ত নিন্দনীয় নহে। মেলাস্থলে প্রায় ১০ হাজার লোক উপস্থিত ছিল। এটি স্থায়ী হইলে এদেশের যথেষ্ট উপকার হইবার সম্ভাবনা। শ্রীযুক্ত বাবু মোহনলাল বসুর মৌখিক বক্তৃতার দ্বারা কৃষক ও অন্যান্য ভদ্রলোকমাত্রই বিশেষ সন্তুষ্ট হন। তিনি বলেন, ‘এই মেলা রাধাকৃষ্ণের উৎসবের জন্য নহে, গঙ্গার উদ্দেশ্যেও নহে, পীরের মহিমাসূচকও নহে। এই মেলার উদ্দিষ্টা দেবী তন্ত্রোক্তা নন – পুরাণোক্তা নন। ইহার নাম ‘উন্নতি’। উন্নতি দেবীকে প্রসন্না করিবার জন্যই, তাঁহাকে অর্চনা করিবার জন্যই এই মেলা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। শারদীয়া মহাদেবীর ন্যায় এই উন্নতি দেবীও দশভুজা। তাঁহারও দশ হস্তে দশবিধ অস্ত্র আছে – প্রথম হস্তে কৃষি, দ্বিতীয় হস্তে উদ্যানতত্ত্ব, তৃতীয় হস্তে বাণিজ্য, চতুর্থে শিল্প, পঞ্চমে ব্যায়াম, ষষ্ঠে সাহিত্য, সপ্তমে প্রতিযোগিতা, অষ্টমে সামাজিকতার জীর্ণ সংস্কার, নবমে স্বাবলম্বন এবং দশম হস্তে ঐক্য। ‘উদ্যম’ নামক সিংহের পৃষ্ঠে আরূঢ়া হইয়া উন্নতি দেবী এইসব অস্ত্র বিশেষত শেষোক্ত ভল্ল দ্বারা দৈত্যপতি ‘পরবশ্যতার’ বক্ষঃস্থল বিদ্ধ করিতেছেন। দৈত্যরাজের সর্বাঙ্গে রুধির ধারা, চক্ষু রক্তবর্ণ, দেহ কম্পিত জরজর, পরাস্ত প্রায় তথাপি কি আশ্চর্য! হারিয়াও হারিতেছে না, মরিয়াও মরিতেছে না।’
লেখাটা পড়ে রাজু, কৌশিক আর তীর্থ বিস্ময়ে বাক্যহারা হয়ে গেল। ওদের দিকে তাকিয়ে রাজাদা বললেন, “কী রে, কী বুঝলি?”
রাজাদার মুখের দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রাজু প্রশ্ন করল, “এই উন্নতি দেবীর মূর্তি এখন কোথায়? পূজা হয় তাঁর এখনও? আমরা কি দেখতে পাব?”
একটু চুপ করে থেকে মৃদু হেসে রাজাদা বললেন, “তোরা তো দেখেছিস।”
এবার তিনজনেই বিস্মিত হয়ে বলে উঠল।—“আমরা দেখেছি! কোথায়?”
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে রাজাদা বললেন, “আসার সময় তো মন্দির চত্বর দিয়েই এসেছিস। ওই মন্দিরে যে সাবেকি মূর্তি যুগ যুগ ধরে পূজা হয়ে আসছে, তিনিই উন্নতি দেবী।”
ভীষণ অবাক হয়ে গেল ওরা তিনজনেই। এত বড়ো একটা ইতিহাস ওদের নাকের ডগায় রয়েছে, অথচ ওরা বিন্দু-বিসর্গ জানে না! স্তব্ধ হয়ে বসে থাকল ওরা।
বেশ কিছুক্ষণ পরে কৌশিক বলল, “তাহলে তো ওই মূর্তির ঐতিহাসিক মূল্য অনেক।”
একটু যেন চমকে উঠে রাজাদা বললেন, “তা আছে বটে। তবে ইতিহাসকে আমরা থোড়াই গুরুত্ব দিই।”
“কত দাম হতে পরে ওই মূর্তিটার?” তীর্থ জানতে চাইল।
“কত আর দাম হবে? হয়তো হাজার পঁচিশেক। কিন্তু এর সঙ্গে যে জড়িয়ে আছে প্রথম স্বদেশী আন্দোলনের ইতিহাস। এ যে অমূল্য।” বেশ বিষণ্ণ হয়েই যেন বললেন রাজাদা।
কৌশিক প্রশ্ন করল, “কিন্তু উন্নতি দেবীর ওই মূর্তি তোমাদের ঠাকুরঘরে কীভাবে প্রতিষ্ঠা হল?”
মৃদু হেসে রাজাদা বললেন, “আসলে এই মূর্তি আমাদের পরিবারে যুগ যুগ ধরে পূজিত হয়ে আসছে। আর জাতীয় মেলার উদ্যোক্তাদের মধ্যে এই জমিদারবাড়ির পূর্বপুরুষরাও ছিলেন। তখনকার দিনের হদ্দ এই গ্রামে এই মেলায় সকলকে দেশাত্মবোধে চাঙ্গা করার জন্য কিছু অভিনবত্বের দরকার ছিল। তাই আমাদের বাড়ির এই দেবীকেই সে-বারের মেলায় ‘উন্নতি দেবী’ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।”
“বাহ্! দারুণ ব্যাপার তো। তাহলে তো এই মূর্তি আরও পুরোনো। কী রাজাদা, ঠিক বলছি তো?” কৌশিক বলে উঠল।
রাজাদা কোনও উত্তর না দিয়ে চুপ করে বসে রইলেন। তাঁর মুখে যেন একটা বিষণ্ণতার ছায়া এসে পড়েছে। বেশ কিছুক্ষণ পর ভীষণ অন্যমনস্ক রাজাদা অত্যন্ত মৃদু স্বরে উত্তর দিলেন, “হুঁ।”
“আচ্ছা, ঠিক কতদিনের পুরোনো হবে?” ভীষণ আগ্রহী হয়ে জিজ্ঞাসা করল তীর্থ।
দূরে কোথাও শাঁখের আওয়াজ পেয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রাজাদা বললেন, “সন্ধে হয়ে গেছে। আজ আর নয়। কাল আমি ব্যস্ত থাকব। পরশুদিন সকালে মায়ের চক্ষুদান হয়ে গেলে বাকি কথা হবে। এখন তোরা তাড়াতাড়ি বাড়ি যা।”
রাজু সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আচ্ছা, এই মূর্তিটা ঠিক কতদিনের পুরোনো, সেটা তো বললে না?”
রাজাদা এবার একগাল হেসে ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “সব রহস্যের সমাধান একদিনেই হয়ে যাবে! পরশুদিনের জন্য কিছু তোলা থাক। হয়তো যা ভাবছিস তার থেকেও বেশি অবাক হবার মতো কিছু জানতে পারবি। এখন বাড়ি যা।”
নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও কৌশিক, তীর্থ আর রাজু গুটিগুটি পায়ে ঘর ছেড়ে বার হয়ে আসা মাত্রই রাজাদা পিছন থেকে ওদের উদ্দেশে বললেন, “পরশুদিন সকালে তাড়াতাড়ি চলে আসিস, তোদের জন্য সারপ্রাইজ আছে।”
সারপ্রাইজের কথা শুনেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল ওরা। কিন্তু আবার পিছন থেকে ভেসে এল রাজাদার স্বর, “আর কোনও প্রশ্ন নয়, সোজা বাড়ি।”
তিনজনে বাগান পার হয়ে বাইরে এসে মন্দির চত্বরে আর একবার দাঁড়াল। পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস জড়িয়ে আছে এই মূর্তির সঙ্গে। ওরা ভালো করে দেখার চেষ্টা করল দেবী মূর্তিখানা। কিন্তু ফুল, বেলপাতায় মূর্তিখানা সবসময় এমন ঢাকা থাকে যে, মুখ ছাড়া বাকি কিছু দেখাও যায় না। মন্দির চত্বরে আর কেউ নেই। শুধু পুরোহিত মশাই প্রস্তুতি নিচ্ছেন সন্ধ্যা আরতির জন্য। ওরা মনে মনে ঠিক করল, একদিন পুরোহিত মশাইকে অনুরোধ করবে ফুল-বেলপাতা সরিয়ে পুরো মূর্তিখানা দেখানোর জন্য। ওদের বন্ধুরই তো বাবা, ওদের কথা নিশ্চয়ই ফেলতে পারবেন না। তারপর উন্নতি দেবীকে প্রণাম করে যে-যার বাড়ির উদ্দেশ্যে দৌড় লাগাল। মনে অজানা ইতিহাসকে জানতে পারার আনন্দ, সঙ্গে ফাউ সারপ্রাইজের অজানা সুগন্ধ সেই আনন্দকে যেন দ্বিগুণ করে দিল।
ছয়
পরের দিন সকালবেলায় তিন বন্ধু প্রায় একসঙ্গেই হাজির খেলার মাঠে। নতুনত্ব শুধু এই যে কৌশিকের গলায় ঝুলছে একটা ক্যামেরা। তীর্থ চোখ দিয়ে ক্যামেরার দিকে নির্দেশ করে বলল, “এ কী রে! এই ভোরবেলায় খেলার মাঠে ক্যামেরা নিয়ে এসেছিস কেন?”
কৌশিককে মুচকি মুচকি হাসতে দেখে রাজু বলে উঠল, “আরে, বুঝছিস না! উন্নতি দেবীর ছবি তুলবে বলে কৌশিক ক্যামেরা নিয়ে এসেছে। কিন্তু জমিদারবাড়ির ঠাকুরদালানে ছবি তোলা যে নিষিদ্ধ। ঠাকুর মশাই কি ছবি তুলতে দেবেন?”
“সেটা একটা কথা বটে। কিন্তু ঠাকুর মশাই তো আর শুধু ঠাকুর মশাই নন, উনি যে আমাদের আপন বন্ধু শঙ্করের বাবা, আমাদের প্রিয় জেঠু। উনি কি আমাদের আবদার মেনে নেবেন না?” হাসতে-হাসতেই কৌশিক বলল।
“তা যা বলেছিস। কিন্তু এই ভোরবেলায় এত অল্প আলোয় ছবি ভালো উঠবে না। তার চেয়ে একটু পরে সূর্য ভালো মতন উঠলে তখন যাওয়া যাবে ছবি তুলতে। ততক্ষণ একটু দৌড়াদৌড়ি করে নেওয়া যাক। কী বলিস তোরা?” তীর্থ বলে উঠল।
তীর্থর কথায় সায় দিয়ে তিন বন্ধু মাঠের চারধারে গোল হয়ে চক্কর দিতে শুরু করল। কিন্তু দু-পাক ঘোরার পরেই রাজু বলে উঠল, “ধুর! দৌড়তে ভালো লাগছে না। চল মন্দিরে যাই।”
কৌশিক সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, চল। এই আলোতে ভালোই ছবি উঠবে।”
তীর্থ হেসে উঠে বলল, “ধুর! এই আলোতে ভালো ছবি ওঠে কখনও! আসল কথা হল উন্নতি দেবী তোদের টানছেন।”
“আর তোকে টানছেন না?” রাজু বলল।
সিরিয়াস মুখ করে তীর্থ বলল, “হুঁ, টানছে তো অবশ্যই। আমাকে টানছে একটা ঐতিহাসিক মূর্তি। অথচ আমরা কেউ ভালো করে দেখিইনি মূর্তিটা।”
“শুধু আমরা কেন, কেই-বা দেখেছে? কেই-বা খোঁজ রাখে ইতিহাসের?” কৌশিক বলে উঠল।
কথা বলতে-বলতেই তিনজনে এগিয়ে চলল রাজাদার বাড়ির দিকে। মন্দির চত্বরে উপস্থিত হয়ে দেখল পুরোহিত মশাই সেখানে নেই এবং মন্দিরের গর্ভগৃহের দরজা বন্ধ। রাজাদার বাড়িতে ঢোকার মূল দরজাও বন্ধ। রাজাদা আজ সারাদিন ব্যস্ত থাকবেন সেটা ওদের জানাই ছিল, তাই দরজা বন্ধ থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মন্দিরের দরজা বন্ধ কেন?
তিনজনে ভীষণ চিন্তিত মুখে একে ওপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে করতে হঠাৎই হেসে ফেলল। পুরোহিত মশাই কখন মন্দিরে আসেন, কখন মন্দিরের দরজা খোলা হয় সেটাই তো ওরা জানে না। এর আগে কখনোই এত ভোরবেলায় ওরা যে আসেনি মন্দির চত্বরে! কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরেই পুরোহিত মশাই আসতেই ওরা তিনজনে একসঙ্গে বলে উঠল, “সুপ্রভাত জেঠু।”
এত সকালবেলায় ওদের সেখানে দেখে বেশ অবাক হয়েই পুরোহিত মশাই বললেন, “এই এত ভোরবেলায় তোমরা মন্দিরে! কী ব্যাপার?”
বেশ আদুরে গলায় কৌশিক বলল, “জেঠু, আমরা দেবী মূর্তিটা একটু দেখতে চাই।”
“ও, এই ব্যাপার। সে তো মন্দির খোলা হলেই দেখতে পাবে বাছারা। তার জন্য এই ভোরবেলা আসা কেন?” গর্ভগৃহের দালানে উঠতে উঠতে বললেন পুরোহিত মশাই।
“না, ওইরকম দেখা নয়। আসলে মূর্তিটা তো সবসময় ফুল-বেলপাতা দিয়েই ঢাকা থাকে। শুধু মুখ ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। আমরা গোটা মূর্তিটার ছবি তুলতে চাই।” তীর্থ বলল।
একটু যেন চমকে উঠলেন পুরোহিত মশাই। তারপর মন্দিরের গর্ভগৃহে ঢুকতে ঢুকতে তিনি বললেন, “মাকে ওইভাবেই দেখতে হয়। সেটাই নিয়ম। আর মায়ের ছবি তোলা যে বারণ, সে কি তোমরা জানো না?”
এবার রাজু বলে উঠল, “আপনি তো এখন ফুল-বেলপাতা দিয়ে মাকে সাজাবেন। আর তো কেউ এখানে নেই। আমরা যদি আপনার সঙ্গে থেকে সেই সাজানোটুকু শুধু দেখি তাহলে তো কেউ জানতেও পারবে না, আর আমাদের ইচ্ছাটাও পূরণ হবে। ঢুকব গর্ভগৃহে?”
গর্ভগৃহের ভিতর থেকে মুখটা একটু বার করে গর্ভগৃহের দরজাটা বন্ধ করে দিতে দিতে পুরোহিত মশাই এবার বেশ রাগী গলায় বললেন, “স্কুলে যাবার সময় হয়ে যাচ্ছে। বাড়ি যাও।”
হতাশ হয়ে ওরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত হয়ে বাড়ির পথে রওনা দিল। যেতে যেতে রাজু বলল, “কাল রাজাদাকে বলব। রাজাদা নিশ্চয়ই আমাদের আবদার ফেলতে পারবে না।”
কৌশিকের মুখটা বেশ শুকিয়ে গেছে। বড়ো আশা করে সে এসেছিল দেবী মূর্তির ছবি তোলার জন্য। সে বলল, “কাল কেন? আজ স্কুল ছুটি হবার পরেই একবার ঢুঁ মেরে যাব এখানে। যদি রাজাদা ফিরে আসে তার মধ্যে।”
রাজু আর তীর্থও সম্মতি জানিয়ে বলল, “ঠিক। আজ স্কুল থেকে ফেরার পথেই আসব।”
সাত
স্কুলে আজ পড়াশোনায় কিছুতেই মন বসল না ওদের তিনজনের। এতদিন যে দেবী মূর্তি সম্বন্ধে ওদের কোনও আগ্রহ ছিল না, গতকাল রাজাদার কাছ থেকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের আদি ইতিহাসের সঙ্গে তার যোগসূত্র জানতে পেরে ওরা প্রচণ্ড আগ্রহী হয়ে পড়েছে সেই মূর্তির স্বরূপ দেখতে। স্কুল ছুটি হতেই তিনজনে হনহন করে হাঁটা লাগাল রাজাদার বাড়ির উদ্দেশে।
মন্দির চত্বরে এসে বেশ হতাশই হল ওরা। মন্দিদের গর্ভগৃহের দরজা বন্ধ। রাজাদার বাড়ির মূল দরজাও বন্ধ, তবে সকালে যেমন বাইরে থেকে তালা লাগানো ছিল, এখন তা নয়। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। ওরা একবার ভাবল রাজাদাকে ডেকে ওদের ইচ্ছার কথা জানায়। কিন্তু রাজাদা নিজেই বলেছেন যে, আজ সারাদিন তিনি ব্যস্ত থাকবেন। তাই আজ রাজাদাকে বিরক্ত না করাই শ্রেয় বলে মনে করল ওরা। আর কাল সকালেই তো রাজাদার সঙ্গে দেখা হবে।
মন্দির চত্বর থেকে চলে যাবার জন্য ওরা পা বাড়াতে গেল, ঠিক সেই সময়ই মন্দিরের গর্ভগৃহের দরজা খুলে গেল আর ভিতর থেকে পুরোহিত মশাই বার হয়ে এসে ওদের দেখে অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে রাগত স্বরে বলে উঠলেন, “কী ব্যাপার তোমাদের, দিন নেই, রাত নেই এখানে ঘোরাঘুরি করছ?”
কৌশিক আমতা আমতা স্বরে কিছু একটা বলতে যেতেই উনি প্রচণ্ড রেগে উঠে বলে উঠলেন, “এক্ষুনি বাড়ি যাও। স্কুল থেকেই এখানে চলে এসেছ! আমি জানাচ্ছি তোমাদের হেড স্যারকে।”
সদা হাস্যময় পুরোহিত মশাইয়ের এমন রুদ্র রূপ এর আগে কখনও দেখেনি ওরা। হেড স্যারের কাছে নালিশ হবে শুনেই পড়ি কি মরি করে স্কুল ব্যাগ পিঠে ছুট লাগাল ওরা। একটু দূরে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে তীর্থ বলল, “কী ব্যাপার বল তো? জেঠু তো আমাদের খুবই ভালোবাসেন। আজ এত রেগে গেলেন কেন?”
রাজু বলল, “আমরা স্কুলের ইউনিফর্ম পরে বাড়ি না ফিরে এখানে এসেছি, তাই মনে হয় উনি রেগে গেছেন।”
“উনি একা ছিলেন না, সঙ্গে আরও কেউ ছিলেন।” গম্ভীর হয়ে কৌশিক বলল।
“মানে? কে ছিল ওঁর সঙ্গে?” বিস্মিত হয়ে তীর্থ বলল।
“কে ছিল সেটা জানি না। আমি তাকে দেখতে পাইনি, কিন্তু ছিল কেউ।” অন্যমনস্ক গলায় কৌশিক বলল।
তীর্থ অবাক হয়ে বলল, “দেখতে পাসনি, কিন্তু কেউ ছিল কী করে বুঝলি?”
কৌশিক বেশ আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল, “মন্দিরের গর্ভগৃহে কেউ একজন ছিল। তার গলায় ক্যামেরা ঝোলানো ছিল। আমি জেঠুর ঠিক পিছনে ক্যামেরার সামনের লেন্সের সেই অংশটা দেখতে পেয়েছি।”
“এটা তো রীতিমতো সন্দেহজনক ব্যাপার। জেঠু সকালবেলায় আমাদের বললেন যে, ছবি তোলা নিষিদ্ধ। আর অন্য কেউ ওঁর সঙ্গেই ক্যামেরা নিয়ে একেবারে মন্দিরের ভিতর!” রাজু বলল।
“হুম। অবাক করার মতোই ব্যাপার বটে। ওদিকে দেখ।” তীর্থ বলে উঠল।
ওরা ছুটে একটু দূরে চলে এসছে ঠিকই, কিন্তু এখান থেকেও রাজাদার বাড়ির সামনেটা দিব্যি দেখা যায়। তীর্থর দৃষ্টি অনুসরণ করে রাজু আর কৌশিক দেখল, পুরোহিত মশাই কথা বলছেন থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট আর রঙচঙে জামা পরা এক ভদ্রলোকের সঙ্গে। ভদ্রলোকের মাথায় একটা টুপি আর গলা দিয়ে ঝুলছে একটা ক্যামেরা। একটু ভালো করে দেখে ওরা নিশ্চিত হল যে, ওই ভদ্রলোক বিদেশি। বেশ অবাক হল ওরা। ওদের এই মফস্সল এলাকায় হঠাৎ একজন বিদেশি! তাও আবার পুরোহিত মশাইয়ের সঙ্গে একেবারে জমিদারবাড়ির মন্দিরের গর্ভগৃহে! বেশ কিছুক্ষণ সেদিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল ওরা। তারপর কী যেন হঠাৎ মনে পড়ে গেছে এমন ভঙ্গিতে রাজু বলে উঠল, “আর এখানে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করলে হবে না। বোধদার কাছে পড়া আছে না?”
সঙ্গে সঙ্গে তীর্থ বলে উঠল, “আর নিউ ইন্ডিয়ান মাঠে ডে-নাইট ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনালও তো আজকে। পড়ে ফেরার সময় একটু দেখতে হবে তো, নাকি?”
“ঠিক বলেছিস।” বলেই তিনজনে তড়িঘড়ি পা চালাল ওদের বাড়ির দিকে।
আট
সারা মাঠ ভেসে যাচ্ছে আলোর বন্যায়। প্রচুর লোক হয়েছে খেলার মাঠে। পড়ে ফেরার পথে রাজু, কৌশিক আর তীর্থ সাইকেল একটু দূরে অস্থায়ী গ্যারেজে রেখে দাঁড়িয়ে পড়ল একটু খেলা দেখার লোভে। বেশ জমজমাটি খেলা হচ্ছে। কিন্তু খেলা শেষ হতে অনেক রাত হয়ে যাবে। পুরো খেলা দেখে বাড়ি গেলে ওদের মায়েরা আর আস্ত রাখবে না ওদের। তাই ওরা ঠিক করল হাফ-টাইম অবধি দেখে বাড়ি চলে যাবে।
সেইমতো হাফ-টাইম হতেই ওরা বাড়ি ফিরে যাবার জন্য মাঠের ধার দিয়ে সাইকেল যেখানে রাখা আছে সেদিকে এগোতে থাকল। নজর কিন্তু মাঠের দিকেই। সেখানে তখন কয়েকজন এক্সট্রা প্লেয়ার ফুটবল নিয়ে কসরত দেখাচ্ছে। হঠাৎই একটা বল কী করে যেন ঠিক ওদের সামনে দিয়েই মাঠের বাইরে এসে একটু দূরে বটগাছটার দিকে গড়িয়ে গেল। বলটার দিকে নজর দিতে গিয়েই রাজু চমকে উঠল। রাজাদা না! আর রাজাদার সঙ্গে সকালে দেখা সেই বিদেশি লোকটা। সেই একই রঙবাহারি জামা, থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট আর মাথায় টুপি। বলটা গড়িয়ে গড়িয়ে বটগাছের নীচে দাঁড়ানো রাজাদা আর সেই বিদেশির দিকে যেতেই রাজাদা এক শট মেরে আবার সেটাকে মাঠের ভিতর পাঠিয়ে দিলেন।
রাজু চিৎকার করে বলে উঠল, “রাজাদা, কাল সকালে দেখা হচ্ছে।”
মাঠের অত লোকের আওয়াজে রাজাদা সে-কথা শুনতেই পেলেন না। এক ঝলক রাজুদের দিকে তাকিয়ে সেই লোকটার সঙ্গে হাত-পা নাড়িয়ে কথা বলতে বলতে মাঠের অন্যদিকে চলে গেলেন।
কৌশিক বলে উঠল, “আলোর উলটোদিকে আছি বলে রাজাদা আমাদের দেখতে পায়নি।”
“কিন্তু ওই বিদেশি লোকটার সঙ্গে রাজাদা কী অত কথা বলছে?” তীর্থ বলল। তারপর আবার বলল, “যেরকম হাত-পা নেড়ে কথা বলছে দুজনে, তাতে তো মনে হচ্ছে না শুধু কথা বলছে। মনে হয় কোনও বিষয়ে তর্ক হচ্ছে দুজনের।”
“কাল সকালেই তো রাজাদার সঙ্গে দেখা হবে। তখন যা জানবার জেনে নিস। এখন তাড়াতাড়ি বাড়ি চল। অনেক রাত হয়েছে।” তাড়া লাগল কৌশিক।
তিনজনেই দ্রুত হেঁটে সাইকেল স্ট্যান্ডের কাছে এসে সাইকেল নিয়ে জোরে সাইকেল চালিয়ে দিল বাড়ির উদ্দেশে। সাইকেল চালাতে-চালাতেই রাজুর মনে হল, ফুটবল খেলা দেখা আর রাজাদার সঙ্গে দেখা হওয়ার মধ্যে কিছু একটা গণ্ডগোল আছে। কিন্তু কী সেটা? ভাবতে-ভাবতেই ওরা ওদের বাড়ির কাছে পৌঁছে গেল। কাল মহালয়া শেষ হওয়া মাত্রই রাজাদার বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেবে বলে ঠিক করে নিয়ে একে অপরকে বিদায় জানিয়ে যে-যার বাড়িতে ঢুকে পড়ল ওরা।
নয়
মহালয়ার দিনে কিছুতেই পুরো মহালয়া শোনা হয় না রাজুর। ঠিক সময়ে ঘুম থেকে উঠে রেডিও চালু করে ঠিকই, কিন্তু বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মোহময় গলায় ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জীর’ শুনতে শুনতে কখন যে দু-চোখের পাতা আবার এক হয়ে যায়, তা সে কিছুতেই বুঝতে পারে না। ঘুম যখন আবার ভাঙে তখন মহিষাসুরমর্দিনী প্রায় শেষের পথে। প্রতিবছরের মতো এবারও ঠিক তাই। তবে ঘুমের মধ্যে এবার রাজু একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল। জমিদারবাড়ির ঠাকুরদালানে মহা ধুমধাম করে উন্নতি দেবীর পূজা হচ্ছে। তীর্থ আর কৌশিকের সঙ্গে রাজুও সেখানে উপস্থিত। সবাই মহা আনন্দে মেতে আছে। রাজাদা সবাইকে প্রসাদ বিতরণ করছেন। হঠাৎ চারদিকে একটা যেন আতঙ্কের ভাব ছড়িয়ে পড়ল। দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সবাই কেমন ছোটাছুটি করছে। তারপরই ঘোড়ায় চেপে সেখানে এসে হাজির হল একদল বিদেশি সৈন্য। ঘোড়া থেকে নেমেই তারা এগিয়ে চলল মন্দিরের দিকে, উন্নতি দেবীকে হরণ করতে এসেছে তারা। সবাই অসহায়ের মতো দেখছে। হঠাৎ রাজাদা ওদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বললেন, “ভারতের উন্নতি দেবী হরণ করে নিয়ে যাবে বিদেশি শত্রু! প্রাণ থাকতে আমি তা হতে দেব না। রাজু, তীর্থ, কৌশিক আটকা ওদের।” রাজাদার গলার আওয়াজ শুনেই এক সৈন্য রাজাদার দিকে ঘুরে তার হাতের বন্দুক উঁচিয়ে গুলি চালিয়ে দিল রাজাদার দিকে। গুলির প্রচণ্ড আওয়াজে কেঁপে উঠল পুরো মন্দির চত্বর।
ধড়মড় করে ঘুম ভেঙে উঠে বসল রাজু। শরতের ভোরের এই শীতল আবহাওয়াতেও সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে রাজুর। ওদিকে তার মা ঘরের দরজা ধাক্কা দিতে দিতে বলছেন, “ওরে রাজু, ওঠ! রেডিওটা এবার বন্ধ কর। মহিষাসুরমর্দিনী তো কখন শেষ হয়ে গেছে। রাজাদার বাড়ি যাবি না চক্ষুদান দেখতে? কৌশিক আর তীর্থ তো অপেক্ষা করবে তোর জন্য।”
কিছুটা সময় নিল রাজু ধাতস্থ হতে। তারপর দরজা খুলে দিয়ে মুখে-চোখে জল দিয়ে ভাবতে লাগল হঠাৎ এমন বিদঘুটে স্বপ্ন কেন দেখল সে। কিছুটা হাবিজাবি ভেবে কূলকিনারা কিছু না পেয়ে ব্রাশ করে সবে বার হয়ে রাজাদার বাড়ির দিকে একটু এগোতে না এগোতেই দেখতে পেল উলটোদিক থেকে কৌশিক আর তীর্থ দৌড়ে আসছে।
“কী রে, কী ব্যাপার? এমনভাবে দৌড়াছিস কেন?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করল রাজু।
হাঁপাতে হাঁপাতে কৌশিক বলল, “মূর্তি নেই।”
“মূর্তি নেই! মানে?” প্রচণ্ড বিস্ময়ে রাজু বলল।
হাঁপাতে হাঁপাতে একটু দম নিয়ে তীর্থ বলল, “মন্দিরের গর্ভগৃহের দরজা খোলা। কিন্তু ভিতরে মূর্তি নেই।”
“আর পুরোহিত মশাই, রাজাদা?” প্রায় দমবন্ধ হয়ে যাওয়া উত্তেজনা নিয়ে রাজু জিজ্ঞেস করল।
কৌশিক বলল, “আমরা কাউকে দেখতে পাইনি। মন্দিরের দরজা খোলা আর ভিতরে মূর্তি নেই, এই দেখেই আমরা প্রচণ্ড ঘাবড়ে গেছি।”
“রাজাদা তো থাকবেই। চল, শিগগির চল।” বলেই রাজু, কৌশিক আর তীর্থ দৌড় লাগাল রাজাদার বাড়ির দিকে।
রাজাদার বাড়িতে ঢুকেই প্রথমেই সেই মন্দির। রাজু একবার মন্দিরের ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখে নিল—ভিতরে মূর্তিও নেই, পুরোহিত মশাইও নেই। রাজাদার বাড়ির মূল দরজাটা বন্ধ। তাহলে রাজাদা কি বাড়ির ভিতরে আছেন? কৌশিক দরজাটা ঠেলতেই দরজাটা হাট হয়ে খুলে গেল। ওরা তিনজনেই ভিতরে ঢুকে চিৎকার করে রাজাদাকে ডাকল। কিন্তু কোনও সাড়াশব্দ নেই। এবার বেশ ভয় পেয়ে গেল ওরা। রাজু কৌশিকের দিকে তাকিয়ে বলল, “কী হল বল তো?”
“কী হল সেটা নিয়ে না ভেবে এখন কী করণীয় সেটা ঠিক কর।” বলে উঠল তীর্থ।
তীর্থর কথায় সায় দিয়ে কৌশিক বলল, “তীর্থ একদম ঠিক বলেছে।” একটু চুপ থেকেই কৌশিক আবার বলল, “এখুনি চন্দ্রর বাড়ি চল। ওর বাবা তো এর আগেও আমাদের সাহায্য করেছেন। ওঁকে গিয়ে সবটা বলি। তারপর উনি যা ভালো বোঝেন করবেন।”
তীর্থ বলে উঠল, “ঠিক বলেছিস। চল সি.আই.ডি কাকুর কাছে।”
ওরা তিনজনে সবে মন্দির চত্বর ছেড়ে বাইরে বার হয়েছে আর তখনই শঙ্কর হন্তদন্ত হয়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল, “আমার বাবাকে দেখলি মন্দিরে?”
ওরা তিনজনেই মাথা নাড়িয়ে বলল, “না তো, জেঠু মন্দিরে নেই।”
শঙ্কর প্রচণ্ড চিন্তান্বিত হয়ে বলল, “বাবা কোথায় গেল বল তো? কাল রাত থেকে বাড়ি ফেরেনি।” তারপর একটু থেমে আবার বলল, “আমি জানতাম একদিন এরকম হবে।”
“এরকম হবে! মানে? কী হবে?” কৌশিক জিজ্ঞেস করল।
শঙ্কর ভয় পাওয়া গলায় বলল, “জমিদারবাবুদের মর্জি তো, একটু ভুল করলেই শাস্তি। কে জানে কী শাস্তি দিয়েছে আমার বাবাকে!”
রাজু অবাক হওয়া গলায় বলল, “জমিদারবাবু! শাস্তি! এসব কী বলছিস তুই?”
শঙ্কর মিনমিন করে বলল, “একবার পুজোর মন্ত্র ভুল করেছিল বলে আমাদের এক পূর্বপুরুষকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল তখনকার জমিদারবাবু।”
তীর্থ ফুঁসে উঠে বলল, “এ কি জমিদারি আমল নাকি! দেশে কি আইনকানুন নেই! তুই চল তো আমাদের সঙ্গে সি.আই.ডি কাকুর বাড়ি।”
কৌশিকও সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আমরা চন্দ্রর বাড়ি যাচ্ছি। মন্দিরের মূর্তি নেই। তুইও চল আমাদের সঙ্গে।”
মন্দিরের মূর্তি নেই শুনে শঙ্কর আরও ঘাবড়ে গেল। সে বলে উঠল, “মন্দিরের মূর্তি নেই আর আমার বাবাকেও পাওয়া যাচ্ছে না। পুলিশ তো তাহলে…”
রাজু শঙ্করের হাত ধরে বলল, “ভয় পাস না। আমরা সবাই জানি জেঠু কেমন মানুষ। অন্য কিছু হয়েছে, সেটা আমাদের মগজে আসবে না। পুলিস বা সি.আই.ডি-কে সবটা বললে ওঁরাই রহস্য উদ্ধার করতে পারবেন।”
তীর্থ আর কৌশিক বলল, “ঠিক বলেছিস। এখন যত তাড়াতাড়ি ওঁদের সবটা জানানো যায় ততই মঙ্গল।”
চার বন্ধু দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলল চন্দ্রর বাড়ির দিকে।
দশ
চন্দ্রর বাড়ি ঢুকতে গিয়েই বাইরে থেকে হরিচরণ স্যারের উচ্চৈঃস্বরে হাসির শব্দ শুনে থমকে গেল কৌশিকরা। তারপর একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে সাহসে ভর করে ঢুকেই পড়ল চন্দ্রর বাড়ির ভিতর। ডাইনিং রুমে একটা সোফায় বসে চন্দ্রর বাবা আর হরিচরণ স্যার চা পান করছেন। ওদের দেখেই হরিচরণ স্যার বলে উঠলেন, “এই যে হনুমানের দল! সকালবেলাতেই চরতে বেরিয়েছ!”
রাজু মিনমিন স্বরে বলল, “না স্যার, কাজে এসেছি।”
চোখ-মুখ কুঁচকে হরিচরণ স্যার বললেন, “কাজ! ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ। পড়াশোনাই ছাত্রদের এক ও একমাত্র কাজ। তো এই সাতসকালে এখানে তোমরা নিশ্চয়ই দল বেঁধে সেটা করতে আসোনি?”
চারজন মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে দেখে এবার চন্দ্রর বাবা বললেন, “আহ্ হরি, আজ মহালয়ার শুভদিনে বাচ্চাগুলোকে বকছ কেন?”
যেন ফুঁসে উঠলেন হরিচরণ স্যার।—“এরা বাচ্চা! এক-একটা আস্ত হনুমান সব। জানো, একদিন রাতের বেলায় দেখি আমার বাড়ির সামনে ঘোরাঘুরি করছে। আমি ভাবলাম হয়তো পড়ায় কিছু বুঝতে সমস্যা হয়েছে, জিজ্ঞাসা করতে এসেছে। তা নয়, বলে কিনা উন্নতি দেবী কে! সাহসটা একবার ভেবে দেখেছ?”
স্যারের কথা শেষ হওয়া মাত্র কৌশিক বলে উঠল, “উন্নতি দেবীর মূর্তি নেই।”
কৌশিকের কথা শুনেই সোফা ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন হরিচরণ স্যার আর চন্দ্রর বাবা, দুজনেই। দুজনের মুখের ওপরেই যেন হঠাৎ আষাঢ়ের কালো মেঘ নেমে এল।
“নেই মানে? তোমরা কী করে জানলে উন্নতি দেবীর মূর্তি নেই?” চন্দ্রর বাবা পুলিশি দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন।
তীর্থ, কৌশিক আর রাজু আজ সকালে মন্দিরে যাওয়া থেকে শুরু করে মূর্তি উধাও হয়ে যাওয়া, রাজাদাকে দেখতে না পাওয়া আর শঙ্করের বাবার কাল রাত থেকে বাড়ি না ফেরা সবটাই হুড়মুড় করে বলে দিল। সবটা শোনার পর চন্দ্রর বাবার মুখের ওপর থেকে কালো মেঘের ভাবটা যেন সরে গেল। তিনি হরিচরণ স্যারের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তবে এই যে তুমি ওদের অত বকাঝকা করলে, ওরা কিন্তু মোটেই অকাজে আসেনি।” তারপর সোফায় বসতে বসতে বললেন, “তোমরা তোমাদের কাজ করেছ। এবার বাড়ি যাও। আমি দেখি কী করতে পারি। শঙ্কর, তুমি চিন্তা কোরো না। তোমার বাবা নিশ্চয়ই কোনও কাজে আটকে গেছেন, একটু পরেই চলে আসবেন।”
ওরা চারজনে চন্দ্রর বাড়ি থেকে বার হয়ে এসে বাইরের পাকা রাস্তায় দাঁড়াল। রাস্তার ওপর পড়ে থাকা একটা ইটের টুকরোকে এক কিক মেরে পাশের ড্রেনে ফেলে দিয়ে প্রবল বিরক্তিতে তীর্থ বলে উঠল, “মহালয়ার সকালটা পুরো ঘেঁটে গেল!”
রাজু হঠাৎ এক হাতে ঘুসি পাকিয়ে আর এক হাতের চেটোয় সেই ঘুসি মেরে আবার চন্দ্রর বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে ওদের বলল, “তোরা এক মিনিট দাঁড়া, আমি এখুনি আসছি।”
বাইরে দাঁড়িয়ে কৌশিকের চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে তীর্থ বলল, “কী চিন্তা করছিস বল তো?”
কৌশিক বলল, “একটা জিনিস লক্ষ করেছিস? উন্নতি দেবী নেই কথাটা শোনা মাত্র স্যার আর সি.আই.ডি কাকু কেমন চমকে লাফিয়ে উঠলেন! তার মানে ওঁরা দুজনেই উন্নতি দেবী সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল।”
“ঠিক কথা। আর একটা জিনিস খেয়াল করিসনি বোধ হয়, ওঁদের মুখের ওপর দারুণ চিন্তার যে ভাবটা এসেছিল, পুরোটা শোনার পর সি.আই.ডি কাকুর মুখ থেকে কিন্তু সেটা চলে গিয়েছিল। কিন্তু স্যার তখনও মুখ কালো আর গম্ভীর করে রেখেছিলেন।” তীর্থ বলল।
তীর্থর কথা শেষ হবার সঙ্গে-সঙ্গেই রাজু ভিতর থেকে বার হয়ে এসে বলল, “চল।”
শঙ্কর এতক্ষণ একদম চুপচাপ ছিল। ওদের কথার মাঝে কোনও কথা বলেনি। এবার একে একে সবার দিকে একবার করে তাকিয়ে ভীষণ অবাক হওয়া গলায় বলল, “পাওয়া যাচ্ছে না তো জমিদারবাড়ির দেবী মূর্তিটা! তাকে উন্নতি দেবী বলছিস কেন তোরা?”
কৌশিক শঙ্করের দিকে তাকিয়ে বলল, “চল জমিদার বাড়ি। ওখানেই আছে উন্নতি দেবী রহস্য।”
ওরা চারজনেই এগিয়ে চলল জমিদারবাড়ির দিকে।
এগারো
শরতের ভোরের হিমেল হাওয়ার রাস মাঠের পাশের দিঘিটায় জল মৃদুমন্দ আলোড়িত হচ্ছে। সোনালি মাছের ঝাঁক এদিক-ওদিক সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে। দিঘির পাশ দিয়ে চিন্তান্বিত মুখে হেঁটে হেঁটে রাজাদার বাড়ির দিকে যেতে যেতে শঙ্কর সেই দিঘির দিকে তাকিয়ে বলল, “জানিস, এই দিঘিতে অনেক মাছ। কিন্তু কেউ সেই মাছ ধরতে পারে না। কারণ, ওদের একটা গুপ্ত ঘর আছে জলের তলায়। কেউ ধরতে এলেই ওরা লুকিয়ে পড়ে সেই গুপ্ত ঘরের ভিতর।”
কথাটা শুনেই কৌশিক আপনমনে বলে উঠল, “গুপ্ত ঘর!” তারপরই অন্য তিনজনের দিকে তাকিয়ে বলল, “কুইক! দৌড় লাগা।”
কৌশিকের কথা শুনেই ছুটতে শুরু করল চারজনেই। ছুটতে-ছুটতেই তীর্থ বলল, “কী হল? ছুটছিস কেন?”
ছোটা না থামিয়েই কৌশিক বলল, “আমরা গুমঘরে যাইনি। রাজাদা তো ওই ঘরেও থাকতে পারে।”
“ঠিক কথা।” রাজু বলল।
বাগানের মধ্যে সেই গুমঘরের সামনে এসে তীর্থ চিৎকার করে রাজাদাকে ডাকল। কিন্তু কোনও সাড়া নেই। কৌশিক আলতো করে ঘরের দরজাটা ঠেলতেই দরজাটা খুলে গেল। ঘরে ঢুকে বেশ অবাক হয়ে গেল ওরা। মাত্র একদিন আগেই এই ঘরে এসেছিল ওরা। সুন্দর সাজানো-গোছানো ছিল ঘরটা। কিন্তু আজ ঠিক সেরকম নেই। টেবিলের ওপর বেশ কিছু খাতা আর ফাইল ছড়ানো-ছিটানো হয়ে পড়ে আছে। উঁচু সেই পালঙ্কের ওপর চাদরটাও কুঁকড়ে-মুকরে রয়েছে। শ্বেতপাথরের চারধারে যে চেয়ারগুলো সুন্দরভাবে রাখা ছিল, সেরকম নেই, বরং একটা চেয়ার উলটে পড়ে আছে। কিন্তু রাজাদা এই ঘরেও নেই। ঘর থেকে বার হয়ে আসার সময় তীর্থ বলল, “ঘরটা গোছানো নেই ঠিকই। কিন্তু কিছু একটা মিসিং। আগের দিন ছিল, আজ নেই। কী সেটা?”
সবাই ভালো করে ঘরের চারদিকে একবার চোখ বোলাল। তারপরই কৌশিক চিৎকার করে বলল, “সিঁড়ি! পালঙ্কের গায়ে যে সিঁড়িটা লাগানো ছিল, সেটা নেই।”
তীর্থ আর রাজু ঠিক যেখানে সিঁড়িটা লাগানো ছিল সেখানে গিয়ে দেখল সেখানকার কার্পেটের ওপর ঠিক এক হাত দূরত্বে দুটো গোল গর্ত, নিশ্চিত সিঁড়ির পায়ার দাগ। প্রবল কৌতূহলে তীর্থ মেঝের ওপর থেকে সেই জায়গার কার্পেট সরিয়ে দিতেই চমকে উঠল ওরা। ঠিক সেই জায়গাটায় একটা মার্বেল মেঝের অন্য মার্বেলগুলোর থেকে একদম আলাদা; সেটা মেঝেতে ঠিকমতো বসানোও নেই আর তার কোনাগুলো ভাঙা। অথচ ঘরের মেঝের অন্য মার্বেলগুলো দিব্যি একে অন্যের সঙ্গে নিখুঁতভাবে জুড়ে আছে। চোখে চোখে কী যেন ইশারা হয়ে গেল রাজু আর তীর্থর, দুজনে মিলে চাগাড় দিয়ে তুলে ফেলল সেই নড়বড়ে মার্বেলটা। তারপরই প্রচণ্ড বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল, “গুমঘর!”
যে-জায়গাটার মার্বেলটা সরানো হয়েছে এখন সেখানে চৌকো গর্ত, আর তলায় নিকষ কালো অন্ধকার। সেই অন্ধকার গর্তে মুখ লাগিয়ে রাজু চেঁচিয়ে উঠল, “রাজাদা!”
প্রতিধ্বনি হয়ে সেই আওয়াজ ফিরে এল। রাজু আর তীর্থ মেঝেতে কান পেতে শোনার চেষ্টা করল আর কোনও আওয়াজ আসে কি না। ওদের মনে হল নীচে যেন কিছু একটা ঘষটানোর আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
তীর্থ বলল, “একটা আলো চাই নীচটা দেখার জন্য।”
সঙ্গে সঙ্গে শঙ্কর এগিয়ে এসে পকেট থেকে একটা টর্চ বার করে ওদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “কাল রাতে বাবাকে খোঁজার জন্য টর্চ নিয়ে বার হয়ে ছিলাম। সেই থেকেই পকেটে আছে।”
টর্চের আলো নীচে ফেলতেই একটা মানুষের অবয়ব দেখা গেল। মানুষটা মেঝের ওপর শুয়ে আছে। কিন্তু মানুষটা কে? রাজাদা, না শঙ্করের বাবা? নাকি অন্য কেউ?
ইতোমধ্যে কৌশিক ঘরের পিছন দিক থেকে খুঁজে নিয়ে এসেছে সেই সিঁড়িখানা। সিঁড়িটার পায়া দুটোর সঙ্গে একটা মার্বেল লাগানো। সেই মার্বেলের রঙ ঘরের মেঝের অন্য মার্বেলগুলোর সঙ্গে একদম এক, আর সেই মার্বেলটার মাপ আর ঘরের মেঝের গর্তের মুখের মাপ একই। অর্থাৎ, ওই গর্তটার ওপরেই লাগানো ছিল এই মার্বেল সমেত সিঁড়িখানা। কিন্তু এই সিঁড়ি দিয়ে নীচে কী করে নামা সম্ভব! সিঁড়িটা নীচের দিকে নামালে গর্তের মুখটাই তো আটকে যাবে মার্বেলে।
কৌশিক সিঁড়ির পায়ের কাছে লাগানো মার্বেলের দিকে তাকিয়ে বলল, “কত কাল আগে কী অদ্ভুত দক্ষতায় এটা বানানো হয়েছে দেখ। এই সিঁড়িটা পালঙ্কে ওঠার কাজেও লাগানো যায়, আবার এই সিঁড়ি ব্যবহার করেই গুমঘরে যাওয়া-আসা করা যায়।” বলেই এক হ্যাঁচকায় মার্বেল থেকে সিঁড়িটা আলাদা করে নিল। তারপর সিঁড়িটা লাগিয়ে দিল মেঝের গর্তটার মুখে। সিঁড়িটা একদম ঠিকঠাক নীচের মেঝেতে গিয়ে ঠেকল।
প্রথমে টর্চ হাতে নীচে নেমে গেল তীর্থ। নীচ থেকে তীর্থ চেঁচিয়ে বলল, “রাজাদাই আছে এখানে। মুখ, হাত, পা বাঁধা। আমি খুলছি। কেউ একজন নীচে নেমে আয়। আমি একা সিঁড়ি দিয়ে তুলতে পারব না রাজাদাকে।”
সঙ্গে সঙ্গে কৌশিক তড়তড় করে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেল।
একটু পরেই সিঁড়ি দিয়ে এক এক করে ওপরে উঠে এল রাজাদা, তীর্থ আর কৌশিক। রাজাদা বেশ বিধ্বস্ত। তখনও হাঁপাচ্ছেন। ইশারা করে ঘরের কোনার দিকে রাখা কুঁজো দেখালেন। শঙ্কর সঙ্গে সঙ্গে কুঁজো থেকে জল নিয়ে এসে দিল রাজাদাকে। একটু পরে ধাতস্থ হয়ে রাজাদা বললেন, “আজ তোরা আমার প্রাণ বাঁচালি।”
রাজু, কৌশিক, তীর্থ, শঙ্কর সকলেই ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে ছিল। এবার রাজু জিজ্ঞেস করল, “তোমার এমন অবস্থা হল কেন?”
কষ্টের হাসি হেসে রাজাদা বললেন, “উন্নতি দেবীর জন্য।”
ভীষণ অবাক হয়ে ওরা সমস্বরে বলল, “উন্নতি দেবী! কিন্তু সে-মূর্তি তো মন্দিরে নেই।”
একটু চুপ করে থেকে রাজাদা মাথা নীচু করে বললেন, “ও, ওটাও গেছে বুঝি?”
কৌশিক আশ্বাস দেওয়ার মতো করে বলল, “আমরা সি.আই.ডি কাকুকে জানিয়ে এসেছি। তুমি কোনও চিন্তা কোরো না। মূর্তি উদ্ধার হয়ে যাবে।”
রাজাদা মুখ তুলে প্রশংসাসূচক দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাহ্! খুব ভালো কাজ করেছিস।” তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে ঘরের বাইরের দিকে যেতে যেতে বললেন, “চল, মন্দির চত্বরে গিয়ে বসি। একটু পরেই তো মায়ের চোখ আঁকার কাজ শুরু হয়ে যাবে।”
রাজাদার সঙ্গে ঘরের বাইরে যেতে যেতে তীর্থ বলল, “কিন্তু তোমার এই অবস্থা করল কে?”
ওদের দিকে ঘুরে তাকিয়ে রাজাদা বললেন, “তোদের সারপ্রাইজ দেব বলেছিলাম না? আমি নিজেই সারপ্রাইজড হয়ে গেছি।” রাজাদার চোখের কোণটা ভিজে ভিজে, গলাটা ধরা ধরা আর বড়ো কষ্টের হাসি মুখে।
বারো
মন্দিরের দালানে বিধ্বস্ত রাজাদার সঙ্গে চার বন্ধুও বসে আছে। ওদিকে মৃৎশিল্পীরাও এসে গেছে। তাদের দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে মৃন্ময়ী মা চিন্ময়ী রূপে ফুটে উঠছে। একদিকে চলছে চণ্ডীপাঠ। সবকিছু ঠিক গতবছরের মতোই, কিন্তু এবার যেন এই অনুষ্ঠানের প্রাণের স্পন্দনটাই অদৃশ্য।
হঠাৎ মন্দিরের শূন্য গর্ভগৃহের দিকে তাকিয়ে রাজাদা বলে উঠলেন, “পুরোহিত মশাইকে তো দেখছি না। উনি কোথায়?”
শঙ্করের দিকে একবার দেখে তীর্থ ধীরে ধীরে বলল, “উনি কাল রাতেও বাড়ি ফেরেননি।”
একটু চুপ করে থেকে রাজাদা বললেন, “কিন্তু আজ সকালে তো ওঁর এখানে থাকার কথা।”
রাজাদার কথা শেষ হতে না হতেই সাইরেন বাজিয়ে একটা পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়াল। আর তার সামনের সিট থেকে নেমে এলেন চন্দ্রর বাবা, রাজুদের সি.আই.ডি কাকু। রাজাদার সামনে এসে চিন্তিত মুখে তিনি বললেন, “আপনি ঠিক আছেন তো?”
রাজাদা মলিন হেসে বললেন, “হ্যাঁ, ঠিক আছি। কিন্তু…”
রাজাদার কথা শেষ হবার আগেই সি.আই.ডি কাকু আবার বললেন, “আপনাকে তো মাটির নীচে কোন এক গুপ্তঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। উদ্ধার পেলেন কী করে?”
রাজাদা বেশ অবাক হয়ে যাওয়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, “এই যে এইসব ছেলেরাই আমাকে উদ্ধার করেছে। কিন্তু আমাকে যে বন্দি করে রাখা হয়েছিল, আপনি জানলেন কী করে? তবে কি…”
রাজাদার কথার উত্তর না দিয়ে সি.আই.ডি কাকু কৌশিক, রাজু আর তীর্থর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, “বাহ্! থ্রি মস্কেটিয়ার্স দেখছি সত্যিই জিনিয়াস। তোমরা সত্যিই পুরস্কার পাওয়ার মতো কাজ করেছ।” তারপর কী যেন মনে পড়ে গেছে এমনভাবে বললেন, “আচ্ছা, তোমাদের হরিচরণ স্যার বলছিলেন যে তোমাদের নাকি উন্নতি দেবী সম্বন্ধে খুব আগ্রহ। জানতে পেরেছ সে-সম্বন্ধে?”
কৌশিক সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, “উন্নতি দেবীর মূর্তি তো মন্দির থেকে চুরি হয়ে গেছে।”
“সারাজীবনে বোধ হয় এই একটা কাজের কাজ করেছিস তোরা। তোদের জন্যই শেষ পর্যন্ত মূর্তি আবার ফিরে এসেছে।”
হরিচরণ স্যারের গলার আওয়াজ পেয়ে কৌশিক, রাজু আর তীর্থ দেখল পুলিশের গাড়ি থেকে নেমে আসছেন স্যার। স্যারের হাতে একটা সুটকেস। সুটকেসটা নিয়ে স্যার এসে দাঁড়ালেন রাজাদার সামনে। তারপর সুটকেসটা রাজাদার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, “এই নাও অমূল্য রতন।”
সঙ্গে সঙ্গে সুটকেসটা খুলে ফেলেই এক অদ্ভুত আনন্দের দীপ্তি ছড়িয়ে পড়ল রাজাদার চোখে-মুখে। সেইদিকে তাকিয়ে তৃপ্তির হাসি হেসে সি.আই.ডি কাকু হরিচরণ স্যারের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কই হে হরি, এবার তো উন্নতি দেবীর কাহিনি এদের শোনাও।”
হরিচরণ স্যার মৃদু হেসে বললেন, “আমি কেন? রাজা বিক্রমজিৎ চৌধুরীর পারিবারিক সম্পত্তি। তিনিই শোনান।”
সঙ্গে সঙ্গে রাজাদা বলে উঠলেন, “স্যার, জাতীয় মেলার সময় যে এই মূর্তি পূজিত হয়েছিল, সে-কথা ওদের জানিয়েছি। বাকি রহস্যটা আপনি বলুন।”
হরিচরণ স্যার বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “রহস্য! ভালো কথাই বলেছ। ইতিহাস মানেই তো রহস্য।” এইটুকুনি বলে কৌশিকদের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলে চললেন, “হিন্দু ধর্ম আর বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন দেবদেবীর মধ্যে নামে আর আকৃতিতে অনেক মিল আছে, সে-কথা সবারই জানা। এখন কোন দেবী কোন ধর্ম থেকে এসেছে সেটা নিয়ে অনর্থক তর্ক করাও উচিত নয়। তবে এই জমিদারবাড়িতে যে-দেবীকে উন্নতি দেবী বলে পূজা করা হয়, আমার সন্দেহ সেই দেবী মূর্তি প্রাচীন, খুবই প্রাচীন। সেই পাল যুগের বৌদ্ধ দেবীর মূর্তি এটি।”
তীর্থ অবাক হয়ে বলল, “তা কী করে সম্ভব স্যার? হিন্দু দেবী, বৌদ্ধ দেবী— সব কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে স্যার।”
স্যার একটু হেসে বললেন, “তাই তো বললাম, ইতিহাস বড়ো রহস্যময়। এই তো ক’দিন আগেই জানা গেল, যুগ যুগ ধরে পুজো হয়ে আসা তামিলনাড়ুর সালেমের এক মন্দির আসলে বৌদ্ধ স্তূপ। এমনকি স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দও জগন্নাথদেবের মন্দিরকে প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির বলে অভিহিত করেছিলেন।”
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল রাজুরা। কৌশিক অবাক বিস্ময়ে বলে উঠল, “তবে কি উন্নতি দেবীর মূর্তি হাজার বছরের পুরোনো?”
যেন কোন সুদূর অতীত থেকে ভেসে এল হরিচরণ স্যারের গলা, “ইয়েস ডিয়ার, থাউজ্যান্ড ইয়ার্স ওল্ড।”
“নো, নট অ্যাট অল।”
তীর্থরা দেখল, গতকালের সেই বিদেশি আজ কখন যেন হাজির হয়েছে এখানে। গতকালের মতোই সাজপোশাক— গলায় ঝোলানো ক্যামেরা আর মাথায় একই টুপি। তিনিই এই কথা বলে স্যারের দিকে এগিয়ে আসছেন।
হরিচরণ স্যার প্রথমে একটু অবাক হয়ে গেলেন সেই বিদেশি ভদ্রলোককে দেখে। তারপরই হাসিতে মুখ ভরে গেল স্যারের। অভ্যর্থনার ভঙ্গিতে সেই ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে গেলেন স্যার। দুজনের মধ্যে কথোপকথনে কৌশিকরা যেটুকু বুঝল তা হল এই যে, ওই বিদেশি ভদ্রলোকের নাম মিস্টার ব্রাউন এবং উনি একজন মূর্তি বিশেষজ্ঞ। গতকালই উনি এখানে এসেছেন। স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টাও করেছিলেন, কিন্তু স্যারের ফোন খারাপ থাকায় যোগাগোগ করতে পারেননি। অবশেষে নিজে খুঁজেই বিকেলের দিকে এই মন্দির চত্বরে আসেন এবং রাজাদাকে নিজের পরিচয় দিয়ে পুরোহিত মশাইকে নিয়ে মন্দিরে ঢুকে মূর্তি দেখেন। কিন্তু মন্দিরে ঢুকে মূর্তি দেখে উনি অত্যন্ত আশাহত হয়েছেন, কারণ হাজার বছর তো দূর অস্ত, মূর্তিটা নাকি একশো বছরেরও পুরোনো নয়।
ব্রাউনের শেষ কথা শুনে তীর্থ, কৌশিক আর রাজুও ভীষণ ভগ্ন-হৃদয়ে একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। পাল যুগের কথা শোনার পর থেকেই এতদিন ইতিহাসে পড়ে আসা গোপাল, ধর্মপাল, দেবপাল এইসব রাজারা আর তাঁদের রাজধানী বিক্রমপুর, পাটলিপুত্র, গৌড় এইসব যেন ওদের চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল। এক লহমায় সে-সব যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে ভেঙে পড়ল। কিন্তু ওরা অবাক হয়ে দেখল, হরিচরণ স্যার বেশ নিশ্চিন্ত হয়ে ব্রাউনের হাত ধরে রাজাদার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তারপর রাজাদার হাত থেকে সুটকেসটা নিয়ে মেলে ধরলেন ব্রাউনের সামনে। এত দূর থেকেও রাজুরা দেখতে পেল, একটা নয়, দু-দুটো একই ধরনের মূর্তি সুটকেসটার ভিতর আর মিস্টার ব্রাউনও হঠাৎ প্রচণ্ড আগ্রহী হয়ে একের পর এক ছবি তুলে চলেছেন সেই মূর্তি দুটোর।
তেরো
দু-দুখানা উন্নতি দেবীর মূর্তি দেখে কৌশিক, রাজু আর তীর্থর চোখ তখন ছানাবড়া হয়ে গেছে। ওরা ধীর পদক্ষেপে সেই দিকে এগিয়ে হরিচরণ স্যারের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল। ওদের দেখে মৃদু হেসে স্যার বললেন, “বৌদ্ধ মূর্তি শাস্ত্রের ভিত্তি যে তন্ত্রগ্রন্থের উপর প্রতিষ্ঠিত তার নাম সাধনমালা। তার যতগুলি পুথি পাওয়া গেছে তার মধ্যে সর্বাপেক্ষা পুরাতনটি রাখা আছে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে। এই বইটিই আবার বরোদার গায়কোয়াড় ওরিয়েন্টাল সিরিজে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছিল। যদিও এখন তা দুষ্প্রাপ্য। কিন্তু এই জমিদারবাড়িতেই বিভিন্নরকম পুরাতন পুথি নাড়াচাড়া করতে গিয়ে আমি বইটা খুঁজে পাই এবং সেখানে অসংখ্য মূর্তির ছবির মধ্যে আমি এই মূর্তির ছবিও পাই। তারপর আরও কিছু পুরাতন নথি-পত্তর ঘাঁটাঘাঁটি করে আর এতদিনের ইতিহাস চর্চার অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে হয় যে এই মূর্তি পাল যুগের। এখন মিস্টার ব্রাউন পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত জানাবেন যে আমার ধারণা ঠিক, না অমূলক। উনি এই ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ। ওঁর ওপর তো আর কথা চলে না।”
তীর্থরা এতক্ষণ হাঁ করে স্যারের কথা শুনছিল। স্যারের কথা শেষ হওয়া মাত্র কৌশিক জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু মূর্তি দুটো হল কী করে?”
ইশারায় সি.আই.ডি কাকুকে দেখিয়ে হরিচরণ স্যার বললেন, “ওঁকে জিজ্ঞেস করো।”
স্যারের কথামতো সি.আই.ডি কাকুর দিকে তাকাতেই তিনি বললেন, “তোমাদের স্যার যখন মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে এই মূর্তি ১০০০ বছরের পুরোনো, তখন আমরা তিনজন মানে তোমাদের রাজাদা, স্যার আর আমি মিলে ঠিক করলাম যে এই মূর্তিকে আর এভাবে মন্দিরে অরক্ষিতভাবে রাখা যাবে না। দেশের এত পুরাতন এক ঐতিহ্য! মূর্তি শিকারি মানে মূর্তি চোরাচালান করে যারা, তাদের কাছে এর দাম ৫০ লাখেরও বেশি হবে। তাই আমরা আসল মূর্তিটাকে ব্যাংকের লকারে রেখে একটা নকল মূর্তি এই মন্দিরে রাখি। আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল এই যে, মিস্টার ব্রাউন তাঁর সিদ্ধান্ত জানানোর পরেই আমরা এটাকে কলকাতা যাদুঘর কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেব।”
“কিন্তু মিস্টার ব্রাউন যে বললেন, আমার সঙ্গে কাল ওঁর দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে! কই? আমার সঙ্গে তো…” এটুকু বলেই রাজাদা বোকার মতো একটু হেসে বললেন, “ওহ্ হো! বুঝেছি।”
তীর্থ অবাক হয়ে রাজাদার দিকে তাকিয়ে বলল, “তবে যে কাল রাতে নিউ ইন্ডিয়ান মাঠে খেলার সময় তোমাকে দেখলাম মিস্টার ব্রাউনের সঙ্গে কথা বলতে!”
“ওটা তোমাদের রাজাদা ছিল না।” সি.আই.ডি কাকু বলে উঠলেন।
বিস্মিত হয়ে কৌশিক প্রশ্ন করল, “তবে কে ছিল?”
ম্লান হেসে ভেঙে পড়া গলায় রাজাদা বললেন, “ওই যে তখন বললাম, তোদের সারপ্রাইজ দিতে গিয়ে আমি নিজেই সারপ্রাইজড হয়ে গেছি।”
অবাক হয়ে তীর্থ প্রশ্ন করল, “এমন কেন বলছ রাজাদা?”
কোনও উত্তর না রাজাদা মাথা নীচু করে রইলেন।
সি.আই.ডি কাকু রাজাদার কাঁধের ওপর যেন সান্ত্বনার হাত রেখে বললেন, “এই ছেলেগুলোর পুরোটা জানার অধিকার আছে।” তারপর পুলিশের গাড়ির দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন, “মিস্টার মিত্র, অপরাধীকে একবার নিয়ে আসুন।”
কৌশিক, তীর্থ আর রাজু দেখল এক পুলিশ অফিসার হাতে হ্যান্ডকাফ লাগানো একটি লোককে পুলিশের গাড়ির পিছন থেকে নামিয়ে ওদের দিকেই নিয়ে আসছেন। সেই ব্যক্তির হাঁটাচলা প্রচণ্ড চেনা বলে মনে হল ওদের। কাছে এসে সেই লোকটি মুখ তুলে তাকাতেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল ওরা। ওদের সেই বিস্মিত মুখের দিকে একবার তাকিয়ে সি.আই.ডি কাকু আবার সেই পুলিস অফিসারকে নির্দেশ দিলেন, “যান, এবার এঁকে নিয়ে গিয়ে আবার গাড়িতে তুলুন। আমি এখুনি আসছি।”
সেই ব্যক্তি মুহূর্তের মধ্যে রাজাদার পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে কেঁদে উঠে বার বার বলতে থাকল, “ক্ষমা করে দাও দাদা।”
ঘটনার আকস্মিকতায় রাজু, তীর্থ, কৌশিক একদম পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। চোখের পাতাও যেন ফেলতে ভুলে গেছে ওরা। এই লোকটিকে যে অবিকল রাজাদার মতো দেখতে!
পুলিশ অফিসার সেই ব্যক্তিকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে তোলার পর সি.আই.ডি কাকু বলে উঠলেন, “উনি হলেন তোমাদের রাজাদা, মানে রাজা বিক্রমজিৎ চৌধুরীর যমজ ভাই রাজা শুদ্ধজিৎ চৌধুরী। দীর্ঘদিন প্রবাসী। সেখানেই ব্যাবসা-বাণিজ্য করতেন বলে শুনলাম। কিন্তু করোনার সময় নাকি ওঁর ব্যাবসা-পত্তর ডুবে যায়। তাই এখানে দাদার কাছ থেকে সাহায্য নেবেন বলে এসেছিলেন। তারপর এখানে এসে দাদার কাছ থেকে পারিবারিক মূর্তির দাম যে ৫০ লাখেরও বেশি হতে পারে তা জানতে পারেন। সেই লোভ আর সামলাতে পারেননি। কাজে-কাজেই দাদাকে গুমঘরে বন্দি করে নিজে রাজা বিক্রমজিৎ চৌধুরী সেজে ব্যাংকের ম্যানেজারকে বোকা বানিয়ে লকার থেকে মূর্তি বার করে নিয়ে একেবারে বিদেশে ফিরে যাবার ইচ্ছা চাগল। মন্দিরের মূর্তিটাও সঙ্গে নিলেন, যদি বেচে উপরি কিছু আয় হয়। এসবই অবশ্য ওঁর কথা। এবার থানায় নিয়ে গিয়ে দেখি আরও কিছু কথা বার করা যায় কি না।” কথা ক’টা বলেই পুলিশের গাড়ির দিকে এগোতে গিয়েও কী মনে করে আবার ঘুরে রাজুর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, “তুমি যদি রাজাদার ডান পায়ের শটের কথাটা না বলতে তা হলে হয়তো এত তাড়াতাড়ি আসামি ধরা পড়ত না। আর তোমাদের রাজাদাকে যদি খুঁজে বার করে ওই গুমঘর থেকে উদ্ধার না করতে তাহলে হয়তো ওঁর একটা বড়ো বিপদ হয়ে যেত। সরকারের কাছে তোমাদের তিনজনেরই নাম আমি পুরস্কারের জন্য প্রস্তাব করব। বৌদ্ধ ধর্মের হোক আর হিন্দু ধর্মেরই হোক, মূর্তিটা যে প্রাচীন সে-সম্বন্ধে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। দেশের সেই সম্পত্তি তোমরা রক্ষা করেছ। পুরস্কার তোমাদের প্রাপ্য।”
তীর্থ আর কৌশিক ভীষণ অবাক হয়ে রাজুকে প্রশ্ন করল, “রাজাদা তো সবসময় বাঁ পায়েই শট মারে। ডান পায়ে আবার শট মারল কখন?”
রাজু বলে উঠল, “কাল রাতে নিউ ইন্ডিয়ান মাঠে। তোরা হয়তো খেয়াল করিসনি, আমিও সেই মুহূর্তে খেয়াল করিনি। কিন্তু কাল রাজাদা যখন শট মেরে ফুটবলটা মাঠে পাঠাল, তারপর থেকেই কী যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল আমার। মনে হচ্ছিল কী যেন একটা ভুল দেখেছি। আসলে এই এক বছর ধরে তো প্রতিদিনই সকালবেলা রাজাদার বাঁ পায়ের দিকে কনসেনট্রেট করেছি আর তারপর রাজাদার বাঁ পা থেকে বেরোনো গোলার মতো শটের কাছে পরাস্ত হয়েছি। তাই কাল যখন নিউ ইন্ডিয়ান মাঠে শটটা অন্য পা দিয়ে এল, চোখ সেটা মেনে নিতে পরেনি, কিন্তু মাথা কিছুতেই ধরতে পারেনি গণ্ডগোলটা ঠিক কী। আজ সকালে…”
“সি.আই.ডি কাকুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে তীর্থ যখন রাস্তার ওপর পড়ে থাকা একটা ইটের টুকরোকে এক কিক মেরে পাশের ড্রেনে ফেলে দিল, তখনই তোর মাথায় খেলে গেল বাঁ পা-ডান পায়ের গণ্ডগোলটা। আর সঙ্গে সঙ্গে তুই আবার সি.আই.ডি কাকুর বাড়িতে ঢুকে সেটা কাকুকে ইনফর্ম করলি। কী, তাই তো?” কৌশিক বলে উঠল।
একটু হেসে রাজু উত্তর দিল, “এক্সাক্টলি। কিন্তু আমি কখনোই ভাবিনি যে ওটা রাজাদা নয়। জাস্ট এমনিই, পুলিশকে সব কথা বলতে হয়, তাই বলা।”
ওদের কথাবার্তার মাঝেই সি.আই.ডি কাকু পুলিশের গাড়িতে উঠে বসেছেন। হরিচরণ স্যারও একটা মূর্তি রাজাদার হাতে ধরিয়ে আর একটা সুটকেসে ভরে মিস্টার ব্রাউনের সঙ্গে গুটি গুটি পায়ে সেই গাড়ির দিকে এগোতে থাকলেন। গাড়িতে ওঠার ঠিক আগে একবার কৌশিকদের দিকে ঘুরে স্যার হাতের সুটকেসের দিকে ইশারা করে বললেন, “আসল মূর্তি নিয়ে থানায় চললুম। উন্নতি দেবী মূর্তি রহস্য তো উদঘাটন হল, এবার পড়াশোনায় মন দাও বাছারা। নয়তো পরীক্ষার খাতা যে রহস্যময় নম্বরে ভরে যাবে।”
স্যার গাড়িতে ওঠামাত্র পুলিশের গাড়ি সাইরেন বাজিয়ে হু হু করে চলে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে যে কয়েকজন উৎসাহী লোকজন এতক্ষণ মন্দির চত্বরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল আর শুনছিল, তারাও সেখান থেকে চলে গেল।
হাতের মূর্তিটা কোলের উপর নিয়ে শূন্য দেবালয়ের দিকে তাকিয়ে মন্দিরের দালানে বসে পড়লেন রাজাদা। চোখের কোণ দুটো যেন ভেজা ভেজা। শঙ্করও মন্দিরের দালানের অন্যদিকে মুখ কালো করে বসে পড়ল। তার বাবার যে এখনও কোনও খবর নেই। বেশ কিছুক্ষণ কারও মুখে কোনও কথা নেই। অদ্ভুত এক নীরবতা গোটা মন্দির চত্বরে। তীর্থ ধীরে ধীরে রাজাদার পাশে বসে সেই নীরবতা ভেঙে বলল, “সবই তো হল। কিন্তু পুরোহিত মশাই কোথায় গেলেন?”
তীর্থর কথা শেষ হওয়া মাত্র একটা গাড়ি ব্রেক কষে দাঁড়াল রাজাদার বাড়ির মূল গেটের সামনে। তার থেকে প্রথমেই নেমে এলেন পুরোহিত মশাই। পুরোহিত মশাইকে দেখেই রাজাদা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “ওই যে ঠাকুর মশাই এসে গেছেন। উনি তো কাল রাতের গাড়িতে দক্ষিণেশ্বর গেছিলেন। ওখানের গঙ্গা থেকে পবিত্র জল এনে মূর্তিকে স্নান করানোর কথা ছিল। আর আসার সময় তোদের বউদি আর…”
রাজাদার মুখের কথা আর শেষ হল না। তার আগেই রাজাদার ছেলে বুবান ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল রাজাদার গলা। পিছন থেকে শোনা গেল বউদির গলা, “এই বিচ্ছুর জন্যই তো আসতে এত দেরি হল। কিছুতেই ঘুম থেকে উঠতে চায় না। আর উঠবেই-বা কী করে! কাল রাতদুপুর অবধি দাদু-দিদিমার সঙ্গে দুষ্টুমি করেছে। রাতের বেলায় দুষ্টুমি আর দিনের বেলায় ঘুম, এতেই ওর যত আনন্দ! এদিকে পুরোহিত মশাইয়ের দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে উনি ছটফট করছেন, কিন্তু আমাদের ছেড়ে দিয়ে তো আর একা আসতে পারেন না। তাই ওঁরও দেরি হয়ে গেল।”
বুবানকে আদর করতে করতে রাজাদা বললেন, “আনন্দই তো করবে। ওটাই তো সব, আনন্দই তো জীবন। তাই তো, মিস্টার আনন্দ চৌধুরী?”
রাজাদার ছেলে বুবানের ভালো নাম যে রাজা আনন্দ চৌধুরী, সেটা তীর্থদের জানাই ছিল। তীর্থ শুধু রাজাদার বলা কথায় ভুল একটু শুধরে দেবার উদ্দেশ্যে বলল, “আনন্দ চৌধুরী নয়, রাজা আনন্দ চৌধুরী বলো।”
রাজাদা বুবানকে আদর করতে-করতেই বললেন, “না রে, রাজা নয়। আমি তো ‘রাজা’ ত্যাগ করতে পারলাম না, তবে ও ত্যাগ করেছে। ও আনন্দ, শুধু আনন্দ চৌধুরী।”
এই সময় রাজাদার পোষা বিড়ালটা কোথা থেকে যেন এসে রাজাদার গায়ে গা ঘষতে ঘষতে আদুরে স্বরে ‘মিয়াও মিয়াও’ করতে থাকল। রাজাদা এক হাত দিয়ে বিড়ালটাকে আদর করতে করতে হেসে উঠে বললেন, “না, না ভয় পেও না। তোমায় রাজা উপাধি ত্যাগ করতে হবে না। তুমি রাজাই থাকবে। রাজা মিউ মিউ চৌধুরী।”
রাজাদার বলার ধরনে খিলখিল করে হেসে উঠল সেখানে উপস্থিত সকলে। সকালের কালো মেঘের ঘনঘটা কেটে গিয়ে আবার সোনালি রোদে ঝলমল করে উঠল গোটা রাজবাড়ির চত্বর।

ছবি-মৌসুমী
জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস