বন-বন্দুকের ডায়েরি-হনুমান খেকো -মার্ভিন স্মিথ-অনু দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য-শরৎ ২০২৪

বন বন্দুকের ডায়েরি আগের পর্বঃ হাতি হাতি, শঙ্খচূড়ের ডেরায়, আলাদিনের গুহা, শিকারী বন্ধু গোন্দ, হুনসুরের আতঙ্ক… পীর বক্স (১), হুনসুরের আতঙ্ক… পীর বক্স (২)বোয়া সাপের খপ্পরে, বে-ডর লছ্‌মণ, মানুষখেকো নেকড়ে , নেকড়ে মানুষ সিয়াল, বাঘমারা ভীম, ডাইনি প্যান্থার, মহিষাসুরের খপ্পরে, অরণ্যের সন্তান জুয়াং, জল হুপু, সাদা বাঘ, সামনে ভালুক, পরদেসি ডোম, ডোঙায় চেপে বুনোকুকুর শিকার, পাগলা হাতি ১ম পর্ব,পাগলা হাতি২য় পর্ব, প্রথম বাইসন

bonerdiarybonbonduk90

কারো-র উত্তর পাড় দিয়ে হাঁটছিলাম। ছোটোনাগপুর মালভূমির এই জায়গাটার নাম লোহারদাগা। হঠাৎ একটা শব্দ পেয়ে কান খাড়া হয়ে উঠল আমার। খানিক দূরেই কারো একটা আশি ফিট খাড়াই জলপ্রপাত হয়ে কোয়েলের  বুকে ঝরে পড়ছে। ওর খানিক উজানে নদীর একটা বাঁকের ওপাশ থেকে শব্দটা উঠছিল… হিল-হিল্লো-লোইই! হিল-হিল্লো-লোইই।

জিজ্ঞেস করে জানা গেল আওয়াজ তুলছে বেহুরদের একটা শিকারির দল। এরা হনুমান ধরে খায়। সেই শিকারের পর্বই চলেছে তাদের তখন। আমার সঙ্গী জানালেন, এগিয়ে গেলে এরা কী করে হনুমান শিকার করে সেইটে দেখতে পারা যাবে। তবে এগোতে হবে একেবারে নিঃশব্দে। যাতে এরা একটুও টের না পায়। বেহুররা একেবারে বুনো। থাকে গাছের মাথায়, পাথরের খোঁদলে। গ্রামগঞ্জের মানুষের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগই নেই। আমরা কাছাকাছি এসেছি টের পেলে শিকারটিকার ফেলে এক ছুটে জঙ্গলের ভেতর পালিয়ে যাবে। 

শিকার চলছিল নদীর দক্ষিণ পাড়ে। আমরা বাঁকটা ঘুরে চুপচাপ এগিয়ে গিয়ে বাঁকের ঠিক উল্টোদিকের জঙ্গলে লুকোলাম। নদী এখানে বড়োজোর পঞ্চাশ গজ চওড়া।  কাজেই অন্যদিকে কী হচ্ছে সেটা সেখান থেকে পরিষ্কার দেখা যায়। সেখান থেকে হনুমানের হুপ হুপ শব্দ আর মাঝে মাঝে ভয় পেলে এরা যে কাশির মত শব্দ করে ডাকে সেই শব্দ ভেসে আসছিল। আস্তে আস্তে হিল্ল-হিল্লো শব্দটা সেদিকে এগিয়ে আসছিল। গাছের মাথাগুলো হনুমানের লাফঝাঁপে তখন থরথর করে কাঁপছে। খানিক বাদেই প্রায় গোটা বারো হনুমান গাছগুলোর মাথায় দেখা দিল। বারবার তারা নদীর জলের দিকে দেখে আর নিজেদের মধ্যে কিচিরমিচির করে কথাবার্তা বলে। খানিক বাদে তাদের মধ্যে কয়েকটা গোদা হনুমান গাছ থেকে নেমে জলের দিকে এগিয়ে গেল। সে-জায়গাটায় নদী বেশ  গভীর আর চওড়া। লাফিয়ে বা সাঁতরে কোনোভাবেই পার হওয়া যাবে না।  তাছাড়া এই লঙ্গুর জাতের হনুমানরা জলকে যমের মত ডরায়। অতএব তারা ঠিক করে নিল ওইখান দিয়ে নদী পাড় হয়ে পালানো সম্ভব নয়।

খবরটা খুব শিগগিরই গাছের মাথায় অপেক্ষায় থাকা তাদের সঙ্গীসাথীদের কাছে চলে গেল। এইবার শুরু হল ডালে ডালে তাদের প্রবল লাফঝাঁপ। চিৎকারগুলো তখন ক্রমশই তাদের  আরো কাছে এগিয়ে আসছে। গাছগুলোর কাছে এসে তাদের একটা দল তলায় দাঁড়িয়ে গুলতি দিয়ে গাছের মাথায় মাথায় পাথর ছুঁড়ে হনুমানগুলোকে তাড়িয়ে বের করে আনবার কাজে লাগল। আর অন্য একটা দল তিরধনুক হাতে গাছ বাইতে শুরু করে দিল। দলের মেয়ে আর বাচ্চারাও বসে নেই। লাঠি হাতে তারা চারপাশের ঝোপঝাড় পেটায় আর হিল্লো হিল্লো হিল্লোই বলে চিৎকার করে। 

হনুমানগুলো দেখা গেল এইবার ভয়ে একেবারে পাগল হয়ে গেছে। গাছ থেকে ঝড়ের মত নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে  তারা নদীর ধারের বালির চড়া ধরে ছোটে। শিকারিদের দলটা তখন চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে তাদের পিছু ধাওয়া করেছে। ওদিকে ততক্ষণে নদীর ধারের বন থেকে সার বাঁধা বেহুরদের আরেকটা দল বেরিয়ে এসেছে। তাদের কাজ হনুমানদের বনের ভেতর ঢুকে পড়া আটকে তাদের নদীর চরে লাইন বেঁধে ছোটানো। ছুটন্ত হনুমানগুলোর সামনে তখন কিছুদূরে অপেক্ষা করে ছিল নদীর চরে একেবারে জলের কিনারা অবধি আড়াআড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা একটা বড়ো জাল।

একে একে হনুমানগুলো সেই জালে জড়িয়ে পড়তে বেহুররা ছুটে গিয়ে মুগুরের ঘায়ে তাদের প্রাণ বের করে দিচ্ছিল। জালে জড়ানো হনুমানগুলো কোনো বাধাই দিচ্ছিল না আর। এমনকি তাদের মধ্যে সবচেয়ে গোদাগুলোও চুপচাপ মুগুরের সামনে আত্মসমর্পণ করছিল। অথচ এই হনুমানরা সাধারণত খুব লড়াকু হয়। একবার আমার দুটো শক্তপোক্ত কুকুরকে ওদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছিল আমার চোখের সামনে। কিন্তু জালে বাঁধা পড়ে হঠাৎ তারা আতঙ্কে বেজায় জবুথবু হয়ে পড়েছিল। একসঙ্গে জড়ো হয়ে একে অন্যের আড়াল নিয়ে, মাথায় মুগুরের ঘা থেকে নিজেদের বাঁচাবার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতেই মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছিল তারা একে একে।

এইবার আমরা আস্তে আস্তে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে তাদের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালাম। হাতে এতগুলো শিকার পেয়ে  বেহুরদের তখন আর আমাদের দেখে পালাবার কোনো ইচ্ছে নেই। তাছাড়া তারা দলেও বেশ ভারী। বাচ্চাবুড়ো মিলিয়ে প্রায় তিরিশজন। আমাদের দলে লোক মাত্র তিনজন। ভয় না পাবার সেটাও একটা কারণ হতে পারে। আমাদের দিকে কোনো খেয়াল না দিয়ে তারা তখন শিকার গোছাতে ব্যস্ত। প্রায় বারো-চোদ্দোটা হনুমান পেয়েছে তারা। মেয়ে আর বাচ্চারা তখন  জাল  গুটিয়ে তোলবার কাজে ব্যস্ত আর দলের ছেলেরা শিকারের ছাল ছাড়াতে বসেছে।

ছাল ছাড়াবার কায়দাটা খুব সরল। প্রথমে পায়ের একটা জায়গায় একটা ছোটো ফুটো করা হল। তাতে হাতের বুড়ো আঙুলটা ঢুকিয়ে মাংস থেকে চামড়াটাকে খানিকদূর ছাড়িয়ে নেওয়া হল। এইবার নলখাগড়ার একটা সরু, ফাঁপা ডাঁটির একটা মুখ সেখানটায় ঢুকিয়ে দিয়ে তার অন্য প্রান্তে জোরে ফুঁ দিয়ে  চামড়ার ভেতরে বেশ খানিক বাতাস ঢুকিয়ে দেওয়া হল। তারপর ফুটোটাকে চিমটি দিয়ে ধরে রেখে অন্য হাতে চামড়ায় চাপ দিয়ে দিয়ে তার ভেতর আটকানো হাওয়াটাকে খানিক ঠেলে ওপরের দিকে তোলা। তাতে আরো খানিক চামড়া মাংসের থেকে আলাদা হয়ে গেল। এবারে ফুটো দিয়ে আরো খানিক বাতাস ঢোকানো হল। ফের তাকে ওপরের দিকে ঠেলে তুলে আরো খানিক এগিয়ে দেওয়া। এইভাবে ক্রমাগত বাতাসটাকে ঠেলে ঠেলে তুলতে তুলতে খানিক বাদে প্রায় গোটা শরীরের চামড়াই মাংসের থেকে আলাদা হয়ে একটা বেলুনের মত উঁচু হয়ে উঠল। 

এর পরের কাজটা তো সহজ! ঘাড়ের কাছে গোল করে চামড়া কেটে সেইটে ধরে টান দিয়ে গোটা শরীরের চামড়াটাকে মোজার মত টেনে উলটে দেওয়া, আর তারপর হাত-পায়ের পাতা আর লেজটাকে কেটে ফেলে সেটাকে একেবারে খুলে আনা।

চামড়াটায় যত্ন করে বুনো হলুদের গুঁড়ো মাখিয়ে সেটাকে তারা শুকিয়ে রাখে। লেজগুলোকে চামড়াশুদ্ধু শুকিয়ে নিয়ে ফুটচারেক লম্বা আর বেজায় শক্তপোক্ত ডাণ্ডা হয়। সেই দিয়ে বেহুররা পিটিয়ে হনুমান মারে। চামড়াগুলো গস্‌সিরা কিনে নিয়ে যায় ঢোলক ছাইবার জন্য। এরা বলে, হনুমানের চামড়ায় নাকি সেরা ঢোলক হয়।

কথাবার্তা শুনে বোঝা যাচ্ছিল এদের ভাষা অনেকটা মুণ্ডারি বা কোল ভাষার মত। ছেলেদের কয়েকটা সিগার আর মেয়েদের কয়েকমুঠো তামার পয়সা দিতে এবার তাদের লজ্জা ভয়ডর একেবারে কেটে গেল। এমনকি আমাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতেও আর কোনো আপত্তি রইল না তাদের।

আমরা এটা ওটা জিজ্ঞাসা করতে করতেই তাদের কাজ দেখছিলাম। হনুমানগুলোর  যকৃত, হৃৎপিণ্ড আর বাকি সব ছোটোখাটো জিনিস বের করে এনে টুকরো টুকরো করে কেটে ছোটোছোট কাঠিতে গেঁথে রোদে শুকোতে দেওয়া হচ্ছিল। মাংসের একটা অংশ পুড়িয়ে খাবার জন্য সরিয়ে রেখে বাকি মাংস সরু সরু ফালি করে কেটে ফেলা হচ্ছিল শুঁটকি বানাবার জন্য।

শুঁটকির মাংস কাটা শেষ হবার পর ফালিগুলোকে গাছের ডালের একটা ফ্রেমে ঝুলিয়ে তার নিচে আগুন দেওয়া হল। ঢিমে আগুনে রাশ রাশ কাঁচা শালপাতা এনে ফেলতে  আগুন ঢেকে ধোঁয়া উঠল ঠেলে। জানা গেল, এই ধোঁয়ায় শুকিয়ে নিলে মাংস বহুদিন ভালো থাকে। কয়েক মাস ধরে খাওয়া যায়।

“ঘর বানিয়ে থাকো না কেন তোমরা?” জিজ্ঞাসা করতে তাদের একজন জবাব দিল, “বনে এত বড়ো বড়ো গাছ থাকতে ঘরে আমাদের কাজ কী? গাছ আমাদের রোদে জলে ঠাঁই দেয়, আমাদের খাবার দেয়। বাঁচতে হলে আর কী-ই বা দরকার? বর্ষা এলে মাটিতে হাজারো শেকড়বাকড় মেলে। গরমকালে বুনো ফলে জঙ্গল ভরে যায়। লালপিঁপড়ের ডিমও মেলে গরমের দিনে। সে ভারী ভালো খাবার। খেলে গায়ে শক্তি হয়। তাছাড়া জঙ্গলে হনুমান মেলে বিস্তর। বুনো শুয়োর মেলে। মাঝে মধ্যে হরিণও মিলে যায়। আমরা কক্ষণো কষ্টে থাকি না। জঙ্গলের মানুষ কক্ষণো উপোস করে না।  বন আমাদের মা। তার কোলে থাকি যে আমরা! শুকনোর দিনে গাছের ডালে ঘুমুই, আর বৃষ্টির দিন এলে পাথরের খোঁদলে ঢুকে পড়ি। নদীর কাছছাড়া হই না আমরা। সরগুজা থেকে বোনাই, ময়ূরভঞ্জ থেকে পালামৌ-এর জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই নদীর ধার ধরে ধরে। খুব ভালো আছি আমরা। মাঝে মধ্যে  হনুমানের চামড়া বেচে তামাক আর নুন কিনতে তোমাদের হাট-এ যাই দু-একবার। তা নইলে বনের বাইরে পা দিই না।”

ইতিমধ্যে হনুমানদের নাড়িভুঁড়িগুলোও বেছে ফেলা হয়েছে। তাদের পরিষ্কার করে রোদে শুকিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। জানা গেল ওই দিয়ে শক্তপোক্ত ফাঁস বানিয়ে, তাই দিয়ে তারা ময়ূর, বনমুরগি এইসব শিকার করে। সে শিকারের কায়দাও বেশ সুন্দর। একটা পোষা মোরগের টোপ দিয়ে কাজটা সারা হয়।

জঙ্গলের মধ্যে একটা জায়গা বেছে নিয়ে সেখানে খানিক জমি সাফ করে নিয়ে তার মাঝখানে মোরগটার পায়ে সুতো এঁটে একটা খোঁটায় বেঁধে রাখা হয়। তাকে ঘিরে গোল করে কয়েকটা ছোটোছোটো খোঁটা পোঁতা হয় এর পর। ফুটখানেক উঁচু করে পোঁতা খোঁটাগুলোর মাথায় মাথায় একটা দড়ি পেঁচিয়ে দিয়ে মোরগকে ঘিরে একটা বৃত্ত বানানো হয়। সেই দড়ি থেকে পরপর অনেকগুলো ফাঁস ঝুলিয়ে দিলেই ফাঁদ তৈরি।

ফাঁসের সেই বৃত্তের মধ্যে দাঁড়ানো মোরগ এবার প্রাণপণে রণহুঙ্কার শুরু করে। এখন, নিজের এলাকায় অচেনা মোরগ ঢোকা মানেই যুদ্ধের আহ্বান। অতএব এলাকার জঙ্গলের কোনো না কোনো বনমোরগ খানিক বাদেই সে ডাকের জবাব দেয়। আর তারপর কাছাকাছি কোনো গাছের মাথা থেকে যুদ্ধপিপাসু বনমোরগ উড়ে এসে নামে ফাঁসের বৃত্তের ভেতর। সেখানে খোঁটায় বাঁধা মোরগও ততক্ষণে ঘাড়ের পালক ফুলিয়ে যুদ্ধের জন্য তৈরি। ঠিক এই সময় পাশের জঙ্গল থেকে বের হয়ে আসে বেহুর শিকারি।

আচমকা মানুষ দেখে বনমোরগ ঘাবড়ে যাবেই। যুদ্ধটুদ্ধ ছেড়ে সে তখন পালাবার মতলবে মাথাটা নিচু করে প্রাণপণে ছুটে বেরোতে চায় চারপাশে ঘিরে রাখা অজস্র ফাঁসের বৃত্ত থেকে। আর সেই করতে গিয়েই একটা না একটা ফাঁসে তার পা বা মাথা আটকে যায়। শিকারি তখন এগিয়ে এসে মোরগকে ধরে ঝোলায় পুরে নিয়ে ফের লুকিয়ে পড়ে জঙ্গলের ভেতর। খোঁটায় বাঁধা পোষা মোরগ ততক্ষণে ফের তার রণহুঙ্কার ছাড়তে শুরু করে দিয়েছে। একবেলার শিকারে এই কায়দায় কম করে চার-পাঁচটা বনমোরগ ধরে ফেলতে পারে বেহুররা।

তারপর ভোজের পালা।

বনের ডায়েরি সব লেখা একত্রে

Leave a Reply