বন-বন্দুকের ডায়েরি-পাগলা হাতি(দ্বিতীয় পর্ব)-মার্ভিন স্মিথ-অনু-দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য-বসন্ত ২০২৪

বন বন্দুকের ডায়েরি আগের পর্বঃ হাতি হাতি, শঙ্খচূড়ের ডেরায়, আলাদিনের গুহা, শিকারী বন্ধু গোন্দ, হুনসুরের আতঙ্ক… পীর বক্স (১), হুনসুরের আতঙ্ক… পীর বক্স (২)বোয়া সাপের খপ্পরে, বে-ডর লছ্‌মণ, মানুষখেকো নেকড়ে , নেকড়ে মানুষ সিয়াল, বাঘমারা ভীম, ডাইনি প্যান্থার, মহিষাসুরের খপ্পরে, অরণ্যের সন্তান জুয়াং, জল হুপু, সাদা বাঘ, সামনে ভালুক, পরদেসি ডোম, ডোঙায় চেপে বুনোকুকুর শিকার

bonerdiarybonbonduk

আগের সংখ্যা-র পর

আহ্না পায়ী-র নিয়তি

আগের সংখ্যায় গ্রামগুলোতে পাগলা হাতিটার যে অত্যাচারের খবর দিয়েছি, সেরকম অত্যাচারের খবর নিয়ে কালেক্টরের কাছে অসংখ্য আবেদন নিবেদন এসে জমা হতে সরকার এবারে মাঠে নামতে বাধ্য হল। খেদার সেই ত্রিশটা হাতিকে এক রাত্রে সাবাড় করবার পরেও ততদিনে তার আক্রমণে মারা পড়েছে ছ’টা পোষা সরকারি-বেসরকারি হাতি আর বেশ কয়েক ডজন মোষ। সে-এলাকার গ্রামাঞ্চলে তখন এমন ত্রাস ছড়িয়েছে সে যে কোল্লেগাল সীমান্তের অনেক গ্রাম ছেড়ে লোকজন পালিয়ে গেছে তার ভয়ে।  ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সে-এলাকার চাষবাস আর বনদফতরের কাজকর্মও। হাতি ধরবার বিশেষজ্ঞ মিস্টার স্যান্ডারসনের বিখ্যাত সহকারী মিস্টার থিওবোল্ড সে-সময় মাদ্রাজ সরকারের বনদফতরের চাকুরে। শিকারি হিসেবেও তাঁর যথেষ্ট নামডাক।  সরকার থেকে এই থিওবোল্ডকে তখন নিয়োগ করা হল গুণ্ডা হাতিকে শায়েস্তা করবার জন্য।

তদ্দিনে খেদার দুর্ঘটনার পর ছ-মাস সময় পেরিয়েছে। গোটা সময়টা ধরে অনবরত তাণ্ডব চালিয়ে গেছে জন্তুটা। তাকে ধরবার জন্য সবরকম ফাঁদ ফেলা হয়েছে। কিন্তু লুকোনো গর্ত, লাফানে ধনুক, সুতোয় টান পড়লে ছুটে যাওয়া বর্শা, ফাঁস, নকল মূর্তি দিয়ে ভোলানো এই সমস্ত চেষ্টাকেই ব্যর্থ করে দিয়ে সে তার অত্যাচার চালিয়ে চলেছে। শিকারিদের হাতে ক্রমাগত মার খেয়ে খেয়ে তখন সে দিনের বেলা বাইরে বের হওয়াও ছেড়ে দিয়েছে। কোনো গ্রামে তার আক্রমণ আসে শুধু রাত্রের গভীর অন্ধকারে। তারপর সে-গ্রামের সমস্ত মোষকে মেরে শেষ করে দিয়ে সে এক মুহূর্তও আর সেখানে অপেক্ষা করে না। গ্রাম ছেড়ে বিশ-ত্রিশ মাইল দূরের কোথাও গিয়ে উদয় হয় ফের।

হাতিটার আরেকটা কৌশল ছিল, এক পথে দু-বার না হাঁটা। যে-পথে সে একবার গেছে সেখানে যে তার জন্য বিপদ ওত পেতে থাকতে পারে সে-আন্দাজ  তার ভালই ছিল।

সব মিলিয়ে, সরকারি পুরস্কারের লোভে ঝাঁক বেঁধে আসা দিশি শিকারিদের হাত থেকে নিজের প্রাণটা বাঁচিয়ে রাখতে তার কোনো অসুবিধে হচ্ছিল না। এমনকি ওয়াইনাদের বিখ্যাত হাতিশিকারি ক্যাপ্টেন গডফ্রে প্রায় একমাস সে-অঞ্চলে ঘোরাঘুরি করে একবারের জন্য তার টিকিরও দেখা পাননি।

সেখানকার তামিল লোকজন তার নাম রেখেছিল আহ্না পায়ী (হাতি শয়তান)। তাকে শান্ত করবার জন্য শান্তি-স্বস্ত্যয়নেরও বন্দোবস্ত হচ্ছিল নানা জায়গায়। মুরগি কিংবা ভেড়া বলি দিয়ে সে-সব পুজোতে বলা বাহুল্য কোনো লাভ হচ্ছিল না। তা এহেন হাতিকে শায়েস্তা করবার ভার এবারে পড়ল থিওবোল্ডের ওপর।

কাজে নেমে থিওবোল্ডের প্রথম কাজ হল, এলাকার সব দেশি শিকারিকে ডেকে এনে বিষয়টার ভাল করে খোঁজখবর নেওয়া। কোন কোন কায়দায় হাতিকে কাবু করবার চেষ্টা হয়েছে সেগুলো সব ভাল করে শুনে নিয়ে সে একটা ফন্দি আঁটল। গ্রামে ঢুকে হাতিটার প্রধান নিশানা হয় পোষা মোষগুলো। সেই মোষকেই তাহলে টোপ বানিয়ে দেখলে হয়।  সেইমত আক্রমণের ঘুঁটি সাজানো হল।

একটা গ্রামের মোষ রাখবার খোলা গোয়াল বেছে নিয়ে তার ঠিক মাঝখানে একটা গর্ত খোঁড়া হল। হালকা একটা দড়ির বেড়া দিয়ে সেটাকে ঘিরে নেওয়া হল যাতে গোয়ালের মোষরা সেখানে এসে আছাড় না খায়।  এরপর সেই গর্তে বন্দুক নিয়ে বসে অপেক্ষার পালা। মোষের অসহ্য গন্ধ আর পোকামাকড়ের কামড় সয়ে প্রায় সাতটারও বেশি রাত কেটে যেতে সবাই যখন হাল ছেড়ে দিতে বসেছে ঠিক তখন, একদিন মাঝরাত্রির দিকে মোষগুলোর ছটফটানি শুরু হল। গোয়ালের খোলা দিকটা দিয়ে জঙ্গল থেকে হাওয়া বয়ে আসছিল। সেদিকটা ছেড়ে তারা সবাই গোয়ালের একেবারে উলটোদিকের দেওয়াল ঘেঁষে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। তাদের চোখে ভয়ের ছাপ। থেকে থেকেই মুখ তুলে বাতাসে কিছু গন্ধ শুঁকতে চায় তারা।

আকাশে চাঁদ ছিল না সেদিন। গভীর অন্ধকারে কয়েক পা দূরের জিনিসও নজরে পড়ে না। একটু বাদে হঠাৎ তারা একসঙ্গে ছুটে এল গোয়ালের মাঝখানের সেই গর্তটার দিকে। তার হালকা বেড়ার কাছে জড়ো হয়ে তারা যেন তাদের মানুষ প্রভুর কাছে লুকোতে চাইছিল।

সতর্ক হয়ে উঠল গর্তে লুকোনো শিকারিরা। সে আসছে। কিন্তু না। খানিক বাদেই দেখা গেল জন্তুগুলোর ভয়ডর কেটে গিয়ে ফের সব আগের মত হয়ে গেছে। পরদিন সকালে উঠে দেখা গেল, গোয়ালের চারপাশেই হাতির পায়ের ছাপ। রাতের অন্ধকারে নিঃশব্দে সে পাক মেরেছে গোয়ালটাকে ঘিরে। তারপর ভেতরে মানুষ শত্রুর গন্ধ পেয়ে দেখা দেবার কোনো ঝুঁকি না নিয়েই ফের নিঃশব্দে ফিরে গেছে তার জঙ্গলের বাসায়।

বোঝা গেল এ-কায়দাতেও ফল হবে না কোনো। বড়ো বেশি ধূর্ত হয়ে উঠেছে জন্তুটা। এমনকি যখন সে খাবার খায় তখনও, যে পথে সে এসেছে তার থেকে খানিক উঁচুতে বেয়ে উঠে খাবার জায়গা ঠিক করে যাতে সে-সময় পথটার দিকে সতর্ক নজর রাখা যায়। কেউ তাকে অনুসরণ করলে, তীক্ষ্ণ কান আর ঘ্রাণশক্তি দিয়ে তাদের অনেক আগেই সে তাদের খোঁজ পেয়ে যায়। তারপর সঠিক মুহূর্তটা এলে তাদের বাঁ বা ডানদিকের জঙ্গল ধরে নিঃশব্দে এগিয়ে এসে গর্জন করে আক্রমণ করে। এর কয়েক ঘন্টার মধ্যেই আবার তার দেখা মেলে অন্তত কুড়ি মাইল দূরের কোনো গ্রামে।

পরের আক্রমণের বুদ্ধিটা দিয়েছিল এক মাহুত। তার পরামর্শমত দুটো কুনকি হাতিকে একটা কৌশল শেখানো হল খাবারের লোভ দেখিয়ে। তাদের যে-কোনো একজন এগিয়ে আসছে এমনটা টের পেলেই অন্যজনকে শুঁড় তুলে হাঁক দিতে হবে। হাঁকটা দিলেই দু’নম্বরজন কিছু একটা ভালোমন্দ খাবার পাবে।

কয়েকদিন এইটে করবার পর দেখা গেল দুই হাতিই এমন চালাক হয়েছে যে কাছাকাছি যে-কোনো হাতির আভাস পেলেই তারা শুঁড় উঁচিয়ে তাণ্ডব চিৎকার জোড়ে। শিক্ষা শেষ হবার পর একদিন তারা চলল পাগলা হাতির সন্ধানে। তাদের একজনের পিঠে  থিওবল্ড আর অন্যজনের পিঠে অন্য দুজন পাকা শিকারি।  প্রথম দিন প্রায় পনেরো মাইল পথ পেরিয়েও শিকারের দেখা মিলল না। দ্বিতীয় দিন দুপুর নাগাদ একটা বাঁশঝাড়ে ঘেরা খাই-এর মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে হঠাৎ দুই হাতিই ডানদিকে ঘুরে শুঁড় উঁচিয়ে হাঁকডাক শুরু করল।  সঙ্গে সঙ্গে শিকারিরা তৈরি হয়ে গেল। একশো গজ দূরত্বে দুই পোষা হাতিকে রেখে খুব সাবধানে ডানদিকে ঘুরে রওনা হল তারা। খানিকদূর যেতেই বাঁশ ফাটবার ফটফট শব্দ পাওয়া গেল জঙ্গলের ভেতর থেকে। জন্তুটা তখন সেখানে সম্ভবত দুপুরের খাওয়া সারছিল। ঘন জঙ্গল পেরিয়ে শব্দটার দিকে সাবধানে আরো একটু এগোতে বাঁশের একটা বড়োসড়ো ঝাড়ের পেছনে একটা পাহাড়ের মত অন্ধকার ঢিবির আভাস চোখে পড়ল। তারপর পাতার আড়াল দিয়ে চুঁইয়ে আসা সূর্যের আলোয় হঠাৎ ঝিকিয়ে উঠল একজোড়া দাঁত।

আরো কাছাকাছি এগিয়ে যেতেও দাঁতালটা দেখা গেল মোটেই ভয়টয় পায়নি। আপনমনে খেয়ে চলেছে। যখন সে প্রায় গুলির আওতায় এসে পৌঁছেছে তখন হঠাৎ ক্যাঁও ক্যাঁও করে একটা শব্দ উঠল জঙ্গলের ভেতর থেকে। তারপর সেখান থেকে একটা ছোট্টো হাতির ছানা বের হয়ে এল। পেছন পেছন বেরিয়ে আসছিল তার মা-ও। তার পেছনে আরো একটা…আরো একটা। বোঝা গেল এইটে কোনো নিরীহ হাতির দল। ক্ষ্যাপা হাতি এখানে নেই।

আরো একবার এমনটা হতে বোঝা গেল এ-কায়দাতেও কোনো কাজ হবে না। থিওবল্ড তখন একেবারে কিংকর্তব্যংবিমূঢ় হয়ে পড়েছে। আর কোনো উপায় না দেখে সে এবার তার মনে পড়ল তার কয়েকজন শোলিগা বন্ধুর কথা। কোল্লেগাল সীমান্তের বেলিগেরি-রঙ্গন অরণ্যের বাসিন্দা এই বুনো জাতের মানুষরা জঙ্গলের অন্যতম সেরা খোঁজারু আর শিকারি। বুনো হাতির মতিগতির ব্যাপারেও তাদের জ্ঞানগম্যির জুড়ি মেলা ভার।  অতএব থিওবল্ড লোক পাঠাল শোলিগাদের এক মুখিয়া ভূমি গৌড়ার কাছে (এঁর কথা ‘হাতি হাতি’ গল্পে রয়েছে।)

ভূমি গৌড়া এসে সব শুনে বলে, “ভাববেন না। ও হাতিকে আমি  দোরাই (মহামান্য)-এর হাতে এনে দেব।”

“পাগলা হাতিকে আমার কাছে ধরে আনবে? তুমি কি নিজেই পাগল হলে ভূমি গৌড়া?”

“দোরাই মিলিয়ে নেবেন। এক সপ্তাহ সময় দিন আমায়। আহ্নে পায়ীকে আমি আপনার বন্দুকের সামনে এনে হাজির না করি তো আমার নাম ভূমি গৌড়া নয়।” 

এই বলে বুড়ো মুখ বন্ধ করল। আর কোনো কথা ভাঙল না। বলে, আগে হাতি মরুক। তারপর সব বলব। শুনে সেখানে হাজির সব দিশি শিকারি আর মাহুতের দল গা টেপাটেপি করে হাসছিল। বলে, “জংলিটার মাথাটা গেছে একেবারে।” থিওবল্ড কিন্তু কিছু বলল না আর। ভূমি গৌড়াকে সে ভালোমতই চেনে।

এর ক’দিন বাদে এক শোলিগা এসে থিওবল্ডকে বলে, ভূমি গৌড়া শিকারিদের একটা জায়গায় নিয়ে আসতে খবর দিয়েছে। জায়গাটা সেখান থেকে মাইল দশেক দূরে। সেখানে এসে শিকারিরা যেন তার আসবার জন্য অপেক্ষা করে।

গিয়ে দেখা গেল সে-একটা শুকনো পাহাড়ি নালা। বড়োজোর পনেরো ফুট চওড়া। তার খাতে এবড়োখেবড়ো পাথর আর দুপাশে ফুটদশেক উঁচু মাটির পাড়। দু’পাড়েই বড়ো বড়ো গাছের ঘন জঙ্গল, তবে মাইলকয়েক অবধি ছোটো ঝোপঝাড় বিশেষ নেই। কাজেই, গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকলে নদীখাত ধরে এগিয়ে আসা শিকার সহজেই চোখে পড়বে, কিন্তু শিকার শিকারিকে দেখতে পাবে না। ভূমি গৌড়ার নির্দেশ ছিল, নালা থেকে মাইলখানেক দূরে তার বাঁ-পাড়ে শিকারিদের অপেক্ষা করতে হবে। তারপর সে এসে পড়লে, নালার ভেতরে তার ডানপাড়ের গা ঘেঁষে শিকারিরা বসবে। হাতি আসবে ডানদিক থেকে। গাছে বা মাচানে ওঠা বারণ। কারণ উঁচুতে বসলে শিকারিদের গন্ধ বাতাস বেয়ে হাতির কাছে পৌঁছে যাবে। নালার ভেতর নিচু হয়ে তার পাড় ঘেঁষে থাকলে সে-ভয় থাকবে না।

দিনদুয়েক অপেক্ষা করবার পর একদিন ভোর ভোর ভূমি গৌড়া ক্যাম্পে ফিরে এল। এসেই তাড়া দিতে শুরু করেছে সে, “জলদি করো সাহেব। হাতি ঠিক দশটার মধ্যে এসে পড়বে।”

নালায় নিয়ে গিয়ে থিওবল্ড আর অন্য এক শিকারিকে ঠিকঠাক করে বসিয়ে দিয়ে ভূমি গৌড়া ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলল, “কোনো শব্দ নয়। আর, একদম উঠে দাঁড়াবেন না। মাঝে মধ্যে শুধু পাড়ের ওপর দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে নেবেন। আমি চললাম সব ঠিকঠাক আছে কিনা তাই দেখতে।”

প্রায় সাড়ে নটা অবধি সেখানে বসে থাকবার পর হাতি দেখা দিল। যেমনটা ভূমি গৌড়া বলেছিল ঠিক তেমনভাবে, নালার দক্ষিণ পাড়ের দিক থেকে ভারী সাবধানে পা পা করে সে এগিয়ে আসছিল। তার শুঁড়ের আগাটা প্রায় মাটিতে ঠেকানো। সেখানে শত্রুর চলাফেরার নিশানা খুঁজতে খুঁজতে এগোচ্ছে সে। মাঝে মাঝে আবার শুঁড়টাকে উঁচু করে চারপাশে ঘুরিয়ে বাতাসের গন্ধ শুঁকে নেয় সে। তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে ফের একটু একটু করে এগোয়। তার লক্ষ, নালার যেখানটায় শিকারিরা লুকিয়ে রয়েছে ঠিক সেইখানটা। সেখানে থিওবল্ড তখন তৈরি। এবারে আর ভুল করলে চলবে না। হাতিটার বিরাট চেহারা আর সাবধানি চালচলন থেকে বোঝাই যাচ্ছিল এই সেই ধূর্ত, খুনে দানব। থিওবল্ডের ইচ্ছে ছিল তার কানের ফুটোর ঠিক পেছনে গুলিটা করে। ওখানে গুলি লাগিয়ে সে কয়েক ডজন হাতি মেরেছে তার আগে। কিন্তু হাতি যেভাবে সরাসরি তার দিকে এগোচ্ছিল তাতে সেখানে গুলি লাগার কোনো সুযোগ তার ছিল না। কাজেই এবার সে লক্ষ্যস্থির করল তার কপালের মাঝখানের মাংসের গদির মত জায়গাটায়।

মাথা নিচু করে এগোতে এগোতে শিকারিদের থেকে বিশ পা মত দূরে এসে হঠাৎ হাতিটা একেবারে থেমে গেল। তারপর মাথা উঁচিয়ে বিরাট কানদুটোকে খুলে ধরল সে।  ততক্ষণে থিওবল্ড ট্রিগারে চাপ দিয়ে ফেলেছে। হাতি হঠাৎ মাথা উঁচিয়ে ফেলতে গুলিটা লক্ষ্যস্থলে না লেগে গিয়ে বিঁধেছে তার ইঞ্চিছয়েক নিচে। ও-জায়গায় তার খুলির হাড় সবচেয়ে শক্ত।

দ্বিতীয় আরেকটা গুলি করবার মত সময় আর ছিল না। ক্রুদ্ধ একটা হুঙ্কার ছেড়ে হাতি তখন তাদের ওপরে এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তার শূলের মত দাঁতগুলো তাদের পেরিয়ে নালার উল্টোপাড়ের মাটিতে গেঁথে গেছে সেই আছড়ে পড়বার ধাক্কায়। সম্ভবত ক্ষিপ্ত হাতি নালাটাকে লক্ষ করেনি, বা লক্ষ করলেও নিজের টাল সামলাতে পারেনি শেষ মুহূর্তে। হাতির পেছনের পায়ের ধাক্কায় নালার ডানপাড় থেকে বড়ো বড়ো মাটির তাল খসে পড়ছিল থিওবল্ডদের মাথায়। মাথার খানিক ওপরে ছড়ানো হাতির প্রকান্ড শরীরের দাপাদাপি আর মাটির তালের বৃষ্টির মধ্যেই তারা কোনমতে হামাগুড়ি দিয়ে প্রাণটা নিয়ে সরে এসে আর একমুহূর্ত দাঁড়াল না সেখানে। হাতের বন্দুকটন্দুক কার কোথায় ছিটকে পড়েছে কে জানে। তখন আর সে-সব নিয়ে মাথা ঘামাবার অবস্থা তাদের নয়। হাতি চারপায়ে উঠে দাঁড়াবার আগে পালাতে না পারলে বাঁচবার কোনো সুযোগ পাবে না তারা।

জায়গাটা থেকে সরে এসেই নদীর এবড়োখেবড়ো পাথরের বুকে লাফাতে লাফাতে উজানের দিকে ছুটছিল তারা। ছোটে আর এদিক-ওদিকে চায়, কোথাও যদি নালা থেকে ওপরে ওঠবার জায়গা মেলে।  কিন্তু পঞ্চাশ পা যেতে না যেতে হঠাৎ তাদের পেছনে দড়াম করে একটা শব্দ উঠতে তারা বুঝতে পারল, দাঁতের ঘায়ে পাড় ফাটিয়ে হাতি নালার ভেতরে নেমে এসেছে।

নেমে  এসে একটুক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল খ্যাপা হাতি। তারপর এদিক-ওদিকে ঘুরে চোখ ফেলতেই তার নজর গিয়ে পড়েছে ছুটতে থাকা শিকারিদের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে শুঁড় তুলে একটা কানফাটানো হাঁকার দিয়ে সে তাড়া করেছে শত্রুদের পিছুপিছু। এরপর যা ঘটেছিল সেটা থিওবল্ডের জবানিতে শুনুনঃ

দৃশ্যটা একঝলক দেখে আমার পায়ে এমন কাঁপুনি ধরল যে মনে হল আর এক পা-ও এগোতে পারব না আজ। সঙ্গের শিকারি তো বন্দুকের গুলির মত ছুটে বেরিয়ে গেল আগে আগে। প্রায় ছাব্বিশ গজ দৌড়ে গিয়ে নালার ওপর ঝুঁকে থাকা গাছের ডাল ধরে ঝুল খেয়ে দেখি সে দিব্যি পাড়ে উঠে পড়েছে।

খেদার সেই হতভাগা শিকারির দু-টুকরো করে চিরে ফেলা শরীরের ছবিটা তখন বারবার আমার চোখে ভেসে উঠছে। বুঝতে পারছিলাম, শিগগির সামনের ওই গাছের ডালটার নাগাল না পেলে দু-এক মিনিটের ভেতর আমারও ওইরকম দশা হতে চলেছে। ওদিকে ভয়ে তখন পা দুটো আমার সীসের তালের মত ভারী। তাই নিয়ে টুকটুক করে এগোই আর ওদিকে পাড় থেকে শিকারি চিৎকার করে বলে, “আইও, আইও, হদু ই হদু চিক্রাম ( ওহোহো…ওহোহো… ছুটুন ছুটুন…আরো জোরে…)  আমার তখন মাথায় চক্কর দিচ্ছে। না পারি জোরে ছুটতে, না পারি তার কথার কোনো জবাব দিতে। ঠিক তখন হঠাৎ পাড় থেকে লাফ দিয়ে আমার কাছে নেমে এল ভূমি গৌড়া। তারপর আমার হাতটা চেপে ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলল সামনের দিকে। কেমন করে যে সেই গাছের ডালটার নাগাল পেয়েছিলাম আমি নিজেই জানি না। হুঁশ ফিরতে দেখি পাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছি, শিকারি আর ভূমি গৌড়া দু-পাশ থেকে আমাকে ধরে রেখেছে। আমাদের পায়ের নিচে নালার ভেতর হাতিটা দাঁড়িয়ে। আকাশ-বাতাস তোলপাড় করে হুঙ্কার দিতে দিতে, যে-গাছের ডাল ধরে পালিয়েছি সেটাকে শুঁড় দিয়ে টেনে নামিয়ে থ্যাঁতলা করে দিচ্ছে। কৃতজ্ঞতায় আমি তখন ভূমি গৌড়ার হাতটা চেপে ধরেছি প্রাণপণে। আজ সে নিজের জীবন বিপন্ন করে নালায় নেমে আমাকে না বাঁচালে এতক্ষণে ওই গাছটার দশাই হত আমার।

খানিক বাদে গাছের দফারফা করে হাতি নালার উজান বরাবর রওনা দিল। সঙ্গে তখন কোনো অস্ত্র নেই আমাদের। বন্দুক তো পড়ে আছে নালার ভেতর, অন্তত শ-খানেক গজ পেছনে। ঠিক তক্ষুণি পেছন থেকে কে যেন আমার বন্দুকটা বাড়িয়ে ধরল আমার দিকে। ঘুরে দেখি একজন শোলিগা। নালার ভেতর থেকে বন্দুক কুড়িয়ে নিয়ে চলে এসেছে এই সময়টুকুর মধ্যে। জানা গেল, আমায় তুলে আনবার সঙ্গে সঙ্গেই ভূমি গৌড়া তাকে বন্দুক আনতে রওনা করিয়ে দিয়েছিল। 

হাতে বন্দুকটা নেবার সঙ্গে সঙ্গেই ভূমি গৌড়া আমায় ছেড়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। বলে, “আসুন সাহেব। তাড়াতাড়ি। সামনে নালাটা একটা বাঁক নিয়ে ফের সোজা হয়েছে। বাঁক পেরোতে হাতির সময় লাগবে বেশি। ওপর দিয়ে সিধে গেলে আমরা ওর থেকে সামনে পৌঁছে যাব ওর আগে।”

তার পেছন পেছন ছুটতে শুরু করলাম আমরা। তারপর তার দেখানো একটা জায়গায় থেমে নদীর পাড়ের একটা ঝোপের পেছনে লুকিয়ে বসলাম। বসতে না বসতে শুনি সে আসছে। নালার আলগা পাথরের চাঁইগুলোতে তার পায়ের ধাক্কায় এমন শোরগোল উঠছে যে মনে হবে গরু-মোষের একটা গোটা পাল যেন চলেছে তার বুক বেয়ে। খানক বাদে তার মাথাটা দেখা দিল বাঁকের মুখে। গুলি লাগা জায়গাটা থেকে  টপটপ করে রক্ত ঝরছিল তার।  গোটা মুখটা সেই রক্ত মেখে লাল হয়ে উঠেছে। আমার মাথা তখন বরফের মত ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। খানিক নিচে ওর কানের পেছনটা এখন আমার সামনে একেবারে পরিষ্কার খোলা। এবারে আর কোনো ভুল নয়। আমি নিশানা নিলাম। একটা বুলেট নির্ভুল লক্ষ্যে উড়ে গেল। তারপর অতিকায় নিষ্প্রাণ শরীরটা আছড়ে পড়ল নদীর পাথরগুলোর বুকে।

***

যে-কায়দায় ভূমি গৌড়া হাতিকে আমার কাছে এনে দিয়েছিল সেটা পুরোনো দিনের হাতিশিকারিরা হয়ত জানবেন। গারো পাহাড় থেকে দক্ষিণ ভারতের নানান আদিবাসী এ-কায়দাটা কাজে লাগিয়ে হাতিকে গর্তের ফাঁদে এনে ফেলে। কিছু বুনো জিনিসপত্র জলে মিশিয়ে নিয়ে সেই জল কাজে লাগানো হয় এ-কাজের জন্য। যে-পথে হাতিকে আনতে হবে, সে-পথের মাঝে মাঝে এই জল খানিক খানিক করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। হাতির কাছে ও-জিনিসের গন্ধের টান বড়ো সাংঘাতিক। তারই বশ হয়ে আহ্না পায়ীর মত ধূর্ত হাতিকেও তাই আমার বন্দুকের সামনে হাজির হতে হয়েছিল তার মৃত্যুর দিনটায়।       

বনের ডায়েরি সব লেখা একত্রে

Leave a Reply