বন-বন্দুকের ডায়েরি-প্রথম বাইসন -মার্ভিন স্মিথ-অনু দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য-বর্ষা২০২৪

বন বন্দুকের ডায়েরি আগের পর্বঃ হাতি হাতি, শঙ্খচূড়ের ডেরায়, আলাদিনের গুহা, শিকারী বন্ধু গোন্দ, হুনসুরের আতঙ্ক… পীর বক্স (১), হুনসুরের আতঙ্ক… পীর বক্স (২)বোয়া সাপের খপ্পরে, বে-ডর লছ্‌মণ, মানুষখেকো নেকড়ে , নেকড়ে মানুষ সিয়াল, বাঘমারা ভীম, ডাইনি প্যান্থার, মহিষাসুরের খপ্পরে, অরণ্যের সন্তান জুয়াং, জল হুপু, সাদা বাঘ, সামনে ভালুক, পরদেসি ডোম, ডোঙায় চেপে বুনোকুকুর শিকার, পাগলা হাতি ১ম পর্ব,পাগলা হাতি২য় পর্ব

bonerdiary (1)

“ভগবান তোমায় ক্ষমা করুন নেড, তবে আমার মনে হচ্ছে গতবার আমার হাতে হেনস্থা হবার বদলা নিচ্ছ তুমি। বাইসন! হাঃ! হা ঈশ্বর! মাত্র তিন মাইল দূর! সেই ছোটা হাজরির পর থেকে চার ঘণ্টা ধরে ঘুরে-ঘুরেও তোমার তিন মাইলের ধাক্কা ফুরোল না। কী বললে, কাছাকাছিই আছে? চিহ্ন-টিহ্ন সব একদম গরমাগরম? উঁহু! আমার মাথা এখন তোমার ওপরে যতটা গরম, তার চাইতে বেশি গরম বোধ হয় হবে না।

“শোনো হে, আমি আর এখন এক পা-ও ওদিকে এগোতে রাজি নই। আগে আমি এখানে বসব, ঠান্ডা হয়ে এক পেগ খাব, তারপর ওসব ফের ভাবা যাবে। ওহে কুলি বাবাজীবন, বোসো হে। খাবারদাবার, মালপত্তর নামাও।  তোমার বোঝা খানিক হালকা করি।

“কী বললে? সামনের টিলাটার পেছনেই তারা লাইন দিয়ে আমাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে? থাকুক। অপেক্ষা করুক। আমার গলাটা একটু ভিজিয়ে নেওয়া অবধি দাঁড়িয়ে থাকলে ওদের পায়ে ব্যথা হবে না। আগে খাওয়াদাওয়া হোক, তারপর ধীরেসুস্থে তাদের খবরাখবর নেওয়া যাবে’খন। এই গরমে তেতেপুড়ে ওদের পেছনে ধাওয়া না করে খানিক তাজা হয়ে নিয়ে এগোলেই ভালো। বাইসন আজকে আমার একটা চাই-ই। এসো। আগে টিফিন, তারপর খানিক গড়িয়ে নেওয়া, তারপর বাইসন, কেমন?”

ভালো বুদ্ধি। আগে খাওয়া, তারপর খানিক গড়িয়ে নেওয়া। তারপর দেখা যাবে।

এ-দেশের যে-কোনো জায়গাতে যে-কোনো শিকারির এই একই অভিজ্ঞতা হতে পারে। শুধু ওই গড়িয়ে নেওয়ার সময়কালটা আলাদা হবে। মানে, বিশ্রামটা কতক্ষণ চলবে সেটা নির্ভর করবে জায়গাটার অক্ষাংশ আর বছরের কোন সময় শিকারটা হচ্ছিল তার ওপর। এই ছোটোনাগপুরের এপ্রিল মাসের গরমে ওই ‘কতক্ষণ’-এর জবাব হল, ‘যতক্ষণ না তোমার ফের রোদে বেরোবার সাহস হয় ততক্ষণ।’

“তবে আমার এখনও সে-সাহস জমে ওঠেনি। আরে একটু ধৈর্য ধরো ভাই। হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে বাইসনটা মারতে তুমিই এসেছ, আমি নই। মনে রেখো, এই আমার প্রথম বাইসন। বেজায় উত্তেজিত রয়েছি ওই নিয়ে। কী বললে? গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল? এ যে জ্ঞান দেয় দেখি! একবার নাচতে নামি—থুড়ি, একবার যুদ্ধে নামি, দেখে নিও, তোমার ওই গাছে কাঁঠাল বলা বন্ধ হয়ে যাবে! ধরেই নাও বাইসন মারাই গেছে। মাথাটা… দেখি  মিস্টার  W… ওটা হেড-কোয়ার্টারের আর্মারিতে টাঙাবার অনুমতি দেন কি না! দিলে অবশ্য ভালোই হয়। বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ের ভলান্টিয়ার শিকারিরা ওতে উৎসাহ পাবে। আহা হেসো না হে! জেনে রেখো, শেষ হাসিটা যে হাসে তারটাই কিন্তুই আসল হাসি। বাজি ধরবে? আচ্ছা, পাঁচ পাউন্ড বাজি রইল। আজ আমার হাতে একটা বাইসন মারা পড়বেই। দেখে নিও।

“উঁহু। তাড়াহুড়ো নয় নেড। যদি তুমি আমায় একটুও ভালোবাসো তাহলে আর একটু জিরোতে দাও ভাই। তাহলে কোম্পানির পরের ড্রিলে যখন তুমি ফের গড়বড় করবে তখন আমি তোমার শাস্তি কম করিয়ে দেব, কথা দিলাম। রোদে প্রাণ বেরিয়ে যাবার জোগাড় হয়েছে। আরে ধুৎ! তাও জ্বালায়। এই যাও দেখি। ইচ্ছে হলে নিজে গিয়ে বাইসন মেরে এসো। সূর্য ডোববার আগে আমি এখান থেকে নড়ছি না।”

কার্তিক খবর নিয়ে এসেছিল, সামনের টিলাটার ও-পাশে একটা ঘাসজমিতে বাইসনের দলটা চরছে। বড়োজোর মাইল খানেক দূরে হবে। নষ্ট করবার মতো সময় আমার হাতে ছিল না। অতএব মহান অ্যাডজুটেন্ট সাহেবকে ওই অবস্থাতেই শালগাছের ছায়ায় রেখে দিয়ে আমি ছুটলাম টিলার দিকে। প্রায় দৌড়ে টিলাটার মাথায় উঠেই দেখা গেল নীচে বাইসনের দলটা চরছে। মেরেকেটে ছ’শো গজও হবে না। দূরবীনে চোখ রেখে দেখা গেল দলটায় চারটে মা বাইসন আর গোটা দুই বাছুর মিলে একজায়গায় ভিড় করে ঘাস খাচ্ছে। আর তাদের থেকে খানিক দূরে পরিবারের বিরাটকায় কর্তা খেতে-খেতেই সতর্ক পাহারায় আছেন। এইটেই বাইসনদের স্বভাব। দলের নেতা বাকিদের থেকে খানিক দূরে একলা একলা খাওয়াদাওয়া সারে।

খানিক দূরে একটুকরো উঁচুনীচু জমি। বাতাস সেদিক থেকে বাইসনদের দিকে বইছে। হিসেব করে দেখলাম, ওইখানটায় পৌঁছুতে পারলে বড়ো বাইসনটাকে বন্দুকের পাল্লায় ধরা যাবে।

যেমন ভাবা তেমন কাজ। মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে, ঝোপঝাড়ের আড়ালে আড়ালে আমরা চললাম সেই জায়গাটার দিকে। এই যে শিকার নজরে পড়বার পর তাকে ফাঁকি দিয়ে গুলি চালাবার জায়গায় পৌঁছোবার সময়টা, বাইসন শিকারে ওর চাইতে উত্তেজক সময় আর নেই। এমনকি গুলি চালিয়ে শিকারকে ধরাশায়ী করবার পরও অত উত্তেজনা হয় না। গরম, ক্লান্তি, হাত-পা ছড়ে যাওয়া—এ-সবের দিকে কোনও ভ্রূক্ষেপই থাকে না সেই সময়টায়। প্রতি মুহূর্তে মনে হতে থাকবে এই বুঝি টের পেয়ে গেল। এই বুঝি ছুট দিল নাগালের একেবারে বাইরে। এ-ব্যাপারে কাঁচা আর পাকা শিকারিতে কোনও তফাত নেই। ডজন ডজন বাইসন মেরেছেন এমন শিকারিরও এ-সময়টা সেই একইরকম উত্তেজনা হয়।

মিনিট পাঁচেক হামাগুড়ি দিয়েই নিশানার জায়গাটায় পৌঁছে যাওয়া গেল। ঘেমে স্নান করে গেছি আমি ততক্ষণে। চোখে ঘামের নোনতা জল পড়ে সবকিছু ঝাপসা দেখাচ্ছিল। হাঁটু গেড়ে বসে আমি আমার প্যারাডক্সটার (প্যারাডক্স একধরনের বন্দুক যা দিয়ে রাইফেলের মতো বুলেট কিংবা শটগানের মতো ছররা—দুটোই ছোড়া যায়) ব্যারেল দিয়ে ঘাম মুছতে যাব, ঠিক তখনই বিপত্তিটা ঘটে গেল। সামান্য ওই নড়াচড়াটুকু চোখে পড়ে গেল এক মা-বাইসনের। সঙ্গে-সঙ্গেই নীচুগলায় গাঁ গাঁ আওয়াজ করে গোটা দলটাকে সাবধান করে দিল সে, কাছাকাছি শত্রু  আছে।

সঙ্গে-সঙ্গেই দলের সবক’টা মাথা ঘুরে গেল আমাদের দিকে। বুঝলাম, বিপদ। আমার তরফে আচমকা কোনও নড়াচড়া হলেই গোটা দলটা ছুট দেবে। কার্তিক ঘুঘু শিকারি। তার দিকে তাকিয়ে দেখি, উপুড় হয়ে একটুকরো পাথরের মতোই শুয়ে আছে সে।

খুব আস্তে আস্তে, সাবধানে আমি উঠে দাঁড়াতে শুরু করলাম এবার। গোটা দলটাই তখন এই কিম্ভূত দু-পেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখছে। এইবার, একটু একটু করে বন্দুকটা আমি কাঁধে তুলে ধরলাম। বড়ো বাইসনটা এইবার কৌতূহলী হয়েছে। অস্থির পায়ে মাটিতে তাল ঠুকে সে দু-এক গজ সামনে এগিয়ে এল শত্রুটিকে ভালো করে দেখে নেবার জন্য। এই মুহূর্তটার আনন্দ যে কী তীব্র, তা যিনি মাঠে নেমে এ-খেলা না খেলেছেন তাঁকে কিছুতেই বোঝানো যাবে না। আঙুলের একটা ছোট্ট চাপে ওই দানবটাকে  আমার পায়ের নীচে আছড়ে ফেলতে পারি আমি এখন! কুচকুচে কালো, হাঁটু আর কপালে বাদামি ছোপ, খুরের ধাক্কায় অস্থিরভাবে মাটি উড়িয়ে চলেছে দানবটা! কী ভয়ংকর সুন্দর তার রূপ!

আমার দিকে চোখ ধরে রেখেই এইবার সে মাথাটা নীচু করে ফেলল তার। তেড়ে আসবার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবারে। ওর শক্তপোক্ত কপালটা আমার সরাসরি সামনে। দুনিয়ার সবচেয়ে ভারী বন্দুকের গুলিও ওর কপালের ওই শক্ত হাড়কে ফুটো করতে পারবে না। না, আমায় নড়লে চলবে না। এইভাবে দাঁড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করতে হবে, যতক্ষণ না ওর শরীরে গুলি চালাবার মতো একটা ঠিকঠাক জায়গা আমার বন্দুকের নিশানায় আসে।

নড়ছে না জন্তুটা। একইভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে আমার চোখে চোখ রেখে! কতক্ষণ কেটে গেছে কে জানে। ও কি নড়বেই না আর? আর ঠিক তখনই সে তার মাথাটা উঁচু করে ফেলল। বাতাসে নাক উঁচিয়ে বিপদের গন্ধ শুঁকে নিচ্ছে। ওর বুকটা এইবার আমার নিশানায়। ট্রিগারে একটা চাপ। সঠিক নিশানায় একটামাত্র বুলেট উড়ে গেল। অত বড়ো জন্তুটা মাটিতে আছড়ে পড়েছে মুহূর্তে। তার পরিবারের আর সবাই এলোমেলো ঘুরে বেড়ায়। আমি তখন কাঁধে বন্দুক রেখে পাথরের মতো স্থির। যদি ফের উঠে দাঁড়ায় জন্তুটা, তেড়ে আসে আমার দিকে, অথবা যদি পালাতে চায়, তাহলে দু-নম্বর বুলেটটাকেও উড়িয়ে দেব তার দিকে। কার্তিক তখনও মাটিতে উপুড় হয়ে পাথরের মতো স্থির। সে জানে, জন্তুটার শরীরে যদি এখনও প্রাণ থেকে থাকে, আর সে যদি একবারও নড়ে তাহলে সে-ই হয়ে যাবে আহত বাইসনের একমাত্র নিশানা।

কিন্তু তা ঘটল না। পাগুলো তার থরথর করে কেঁপে উঠে এদিক-ওদিক নড়ে উঠল দু-একবার। তারপর সব স্থির। দেড় আউন্সের একটা সিসের বল, ন’-দশ হাত উঁচু মাংস আর হাড়ের পাহাড়টাকে একেবারে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। একেবারে পূর্ণযুবক ছিল সে। দুর্দান্ত একটা শরীরের মালিক।

কার্তিককে গ্রামের লোকজন ডেকে আনতে পাঠিয়ে আমি একটা সিগার ধরালাম। ক্লান্তি-টান্তি বিশেষ লাগছিল না আমার। খানিক আগের তীব্র উত্তেজনার জোয়ারে সে-সব কোথায় ধুয়ে গেছে। মনে হচ্ছিল এই রোদের মধ্যে আরও দশ মাইল হেঁটে যেতে পারি সটান। ততক্ষণে লোকজন এসে নিপুণ হাতে তার পেট চিরে নাড়িভুঁড়িগুলো বের করে ফেলে দিয়েছে। তার পরেও, প্রায় ত্রিশজন মানুষ দরকার হল শরীরটাকে সাগ্‌গার-এ (গ্রাম্য গাড়িতে) টেনে তুলতে। তাদের বললাম, গাড়ি নিয়ে সটান আমাদের ঘাঁটিতে পৌঁছুতে। এর ছাল ছাড়াবার সময়টা আমি সামনে থাকতে চাই। তারপর তারা রওনা হয়ে গেলে খালি হাতে আমি চললাম টিলা পেরিয়ে অ্যাডজুটেন্ট সাহেবের খোঁজে।

“কী হে নেড? খালি হাতে যে? কিছুই পেলে না তাই তো? আমিও তাই ভেবেছিলাম। জানতাম তাড়াহুড়ো করে গোটা খেলাটাই তুমি বরবাদ করে দেবে। শুধু যদি আমার বিশ্রামটুকু শেষ করে নেবার জন্য অপেক্ষা করতে, তাহলে আজ ফিরে গিয়ে কিছু তো অন্তত দেখাতে পারতাম লোকজনকে!

“আরে না না, খালি হাতে আছ সেজন্য বলছি না। বাইসন কি আর ডাহুক পাখি, যে মালার মতো কাঁধে ঝুলিয়ে আনবে? আসলে তোমার মুখ দেখে বুঝতে পারছি কিছু পাওনি। ফ্যাকাশে মুখ হে! একেবারে ফ্যাকাশে। সাফল্যের আভাই নেই কোনও ওতে। তবে ও নিয়ে আর ভেবে লাভ নেই হে। এসো। এক পেগ খেয়ে নাও দেখি! মেজাজ শরিফ হয়ে যাবে দেখো। তবে যাই বলো না কেন, এভাবে অধৈর্য হয়ে গোটা দিনটাই মাটি করলে তুমি। ছ্যা!”

পেগটায় চুমুক দিতে দিতে আমি এইবার তাঁকে গোটা গল্পটা বললাম। এমনিতে দশ লাইন গল্পও বলতে পারি না, কিন্তু সেদিন অত বড়ো জন্তুটাকে ধরাশায়ী করবার পর স্বয়ং সরস্বতী আমার জিভের ডগায় বসেছিলেন এসে যেন। শুনেই অ্যাডজুটেন্ট সাহেব লাফ দিয়ে উঠলেন, “এই এই, পাকড়ো জলদি। সবকিছু একদম গুটিয়ে ফেলো। চটপট! চটপট! শিগগির ক্যাম্পে চলো। নইলে মুখ্যুগুলো চামড়াটার কী দশা করবে কে জানে! আহা কী দারুণ কায়দায় মারলাম আমরা জন্তুটাকে, বলো! আমার কী মনে হচ্ছে জানো? এক্ষুনি আরও একটা বাইসনকে গুলিতে উড়িয়ে দিই। কপালটাও আমার সবসময়ই বেশ ভালো থাকে এ-সব ব্যাপারে, দেখলে কি না! খালি হাতে শিকার থেকে ফিরি না কখনও। লোকজন তো তাই আমার সঙ্গে শিকারে যেতে পেলে আর কিচ্ছু চায় না। কত বললে? দশ হাত? কর্নেল সাহেব আজ চমকাবেন। নিজে তো এর আগে কখনও ছ’হাতের চাইতে বেশি উঁচু বাইসন মারতেই পারেননি। আর আজ? আমার প্রথম চেষ্টাতেই আমরা একটা দশ হাতি বাইসনকে পেড়ে ফেললাম হে! মজার কথা কী জানো? এত খাটাখাটুনি করেও আমার একটুও ক্লান্তি ঠেকছে না।  একদম ফিট।”

মাস দুয়েক বাদে নাগপুরে একটা ডিনারে গিয়ে আমি ঘণ্টা খানেক ধরে অ্যাডজুটেন্টের নিজে হাতে প্রথম বাইসন শিকারের একটা রোমহর্ষক বিবরণ শুনেছিলাম।

বনের ডায়েরি সব লেখা একত্রে

Leave a Reply