
সাধারণত কোথাও এক মাসের বেশি থাকতে হলেই আমি সে-এলাকার লাইব্রেরির খোঁজ করি। কানাডায় পৌঁছে প্রথমে ছিলাম অন্টেরিওর সু-সেন্ট-মারিতে (Sault Ste. Marie)। সে খুব বড়ো শহর নয়, বরং মফস্সল বলা যেতে পারে। একে নতুন দেশ, তার ওপর ঘোর শীতকাল। সবকিছু সামলে নিতে বেশ কিছু মাস পার হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ একদিন মনে হল, এরা তো বেশ বই-টই পড়ে বলেই মনে হয়। বাসে মানুষজনকে বই পড়তে পড়তে যেতে দেখি হামেশাই। তাহলে লাইব্রেরিও আছে নিশ্চয়ই। খোঁজ নিয়ে দেখি, বাসস্থান থেকে সামান্য দূরে আছে বটে একখানা সাধারণ পাঠাগার, মানে পাবলিক লাইব্রেরি। গিয়ে দেখি বেশ বড়ো এলাকা জুড়ে সারি দিয়ে বইয়ের তাক, ঝলমলে আলোর নীচে একেবারে মেলার ভিড়। তা লাইব্রেরিতে ঢুকতে গেলে কার্ড থাকা প্রয়োজন। কাউন্টারে গিয়ে সবিনয়ে জানাই, আমি লাইব্রেরির সদস্য হতে চাই, আমাকে অ্যাপ্লিকেশন ফর্ম দিয়ে বাধিত করা হউক। তাছাড়া কতদিনে কার্ড পাওয়া যাবে ইত্যাদি। আমাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বৃদ্ধা লাইব্রেরিয়ান বললেন, “ফর্ম কীসের? ওসব তো হয় না। তুমি এই শহরে থাকো?”
ঘাড় নেড়ে জানাই, এই শহরই আমার বর্তমান বাসস্থান বটে।
আকাশ থেকে পড়ে সে টুকটুকে বৃদ্ধা বলেন, “তা পরিচয়পত্র দাও, কার্ড দিচ্ছি।”
পাঁচ মিনিটের মধ্যে পরিচয়পত্র থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য কম্পিউটারে ঢুকিয়ে ছোটো একটা কার্ড ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “ব্যস, এই লাইব্রেরি এখন তোমারও।”
না, একটি ডলারও লাগেনি সদস্য হতে।
আমার তবুও বিশ্বাস হয় না দেখে তাড়া লাগালেন, “যাও, বই নাও গিয়ে!”
দুই পা গিয়ে আবার ফিরে আসি আমি। ক’টা বই নিতে পারি জানা খুব প্রয়োজন। হয়তো পাঁচটা নিলাম, তারপর দেখলাম দুটোর বেশি নিতে দিচ্ছে না। মিনমিন করে জিজ্ঞেস করি, “আচ্ছা ক’টা বই নেওয়ার অনুমতি আছে?”
বৃদ্ধার চোখ-মুখে এবার দুষ্টুমিভরা হাসি খেলে যায়। সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে ফিসফিস করে বলেন, “যথেচ্ছ।”
আমিও নাছোড়বান্দা গলায় বলি, “তবুও, ক’টা?”
এবারে আর হাসি চাপতে পারেন না তিনি। প্রায় অট্টহাস্য করে বলেন, “নিরানব্বইটা। আজ অবধি কেউ একসঙ্গে অতগুলো নিয়ে উঠতে পারেনি।”
শুনে তো আমি বিষম খেয়ে আলজিভ গিলে-টিলে একাকার।
সু-সেন্ট-মারি ছোট্ট শহর, একটাই লাইব্রেরি ছিল তখন। সম্প্রতি নাকি আরও একটা খুলেছে। যাই হোক, সেখানে আর বেশিদিন থাকার প্রয়োজন ছিল না, চলে আসতে হল কানাডার পুব থেকে একেবারে পশ্চিম প্রান্তের অ্যালবার্টার ক্যালগেরি শহরে। অবশ্যই লাইব্রেরির কার্ড জমা দিয়ে আসতে হয়েছিল।
ছবিতে সু-সেন্ট-মারির লাইব্রেরির সিঁড়িতে হতবাক লেখক। তখনও নিরানব্বইটা বইয়ের ধাক্কা সামলে উঠতে পারিনি।

ক্যালগেরি শহরের লাইব্রেরিদের কথা বলার আগে এ-দেশের পাঠাগারের ইতিহাসটা একটু ঘাঁটা দরকার। ইউরোপীয়রা কীভাবে কানাডায় বসতি স্থাপন করতে শুরু করল সে-কাহিনি তো কিছু কিছু বলেছি আগে। যখন তারা ওদিকের পাট একেবারেই চুকিয়ে পাকাপাকিভাবে কানাডায় চলে আসতে শুরু করল, নিজেদের প্রয়োজনীয় এবং দামি সামগ্রীর সঙ্গে বইয়ের সম্ভারও নিয়ে এল। ফলে কানাডার একেবারে প্রথম দিকের লাইব্রেরি বলতে সেই ব্যক্তিগত সংগ্রহ বোঝায়। স্বাভাবিকভাবেই সেসব সংগ্রহ আমজনতার আওতার বাইরেই থাকত। ১৭৭৯-এ কোয়েবেক সিটির গভর্নর জনসাধারণের জন্য প্রথম পাঠাগার চালু করেন। তবে বিনামূল্যে সদস্য হওয়া যেত না, মাসিক চাঁদা ধার্য ছিল তার জন্য। এই লাইব্রেরি পরে লিটারেরি অ্যান্ড হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি অফ কোয়েবেকের অংশ হয়ে গেলেও আদি বইয়ের সংগ্রহ এখনও আলাদা করে রাখা আছে।
এরপর ১৭৯৬ সালে মনট্রিয়ালে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা হয়, বছর চারেক বাদে নোভা স্কোশার বাসিন্দারাও পায় সেই সুযোগ। কিন্তু তখনও পর্যন্ত সদস্যদের চাঁদার ওপর নির্ভর করেই এর কার্যকলাপ চলত। পয়সা দিয়ে বই পড়ার লোক যে খুব বেশি ছিল এমনটা নয়, তবু কোনোক্রমে চলত লাইব্রেরিগুলো। আজকের যে কানাডাকে আমরা দেখি, তখন তার একেবারেই শৈশব অবস্থা। কিছু কিছু পাবলিক স্কুল তখন সবে শুরু হয়েছে। স্কুল নিয়ন্ত্রণকারী সংগঠনকে এখানে বলা হয় স্কুল ডিস্ট্রিক্ট। সব পাবলিক স্কুলই কোনও না কোনও স্কুল ডিস্ট্রিক্টের অধীন।
শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে এরপর স্কুল ডিস্ট্রিক্টের নিজস্ব পাঠাগারের কথা ভাবা হল। কয়েকটা ডিস্ট্রিক্ট সেইমতো চালুও করেছিল, কিন্তু পরে দেখা গেল ব্যবস্থাটা কিঞ্চিৎ অসুবিধার। বরং প্রতিটা স্কুলের নিজস্ব আলাদা লাইব্রেরি থাকলেই সুবিধা। সেই ব্যবস্থাই মোতায়েন আছে এখনও। সেই লাইব্রেরিকে এরা বলে লার্নিং কমন্স।
এর মধ্যে আবার নিউ ব্রান্সউইকের সেন্ট জন শহরে ঘটে বিধ্বংসী এক অগ্নিকাণ্ড। শহরের প্রায় অর্ধেক পুড়ে শেষ হয়ে যায় তাতে, সঙ্গে নষ্ট হয়ে যায় বহু ব্যক্তিগত সংগ্রহ। কর্নেল জেমস ডমভিল ক্ষতিপূরণের চেষ্টায় নানা স্থান থেকে বই জোগাড় করা শুরু করেন। সেটাই বলা যেতে পারে জনসাধারণের বিনামূল্যে লাইব্রেরি পরিসেবা পাওয়ার প্রথম ধাপ। দেখা গেল, নাগরিকদের দেওয়া আয়করের সামান্য অংশকে কাজে লাগিয়ে দিব্য লাইব্রেরির ব্যবস্থা হয়ে যাবে। বলা বাহুল্য, এই সিদ্ধান্ত কারও অপছন্দ হওয়ার কথা নয়। ব্রান্সউইককে দেখে অন্টেরিও অনুপ্রাণিত হল এরপর। তারপর মনট্রিয়াল। দেখতে দেখতে প্রায় সব অঞ্চলেই পাঠাগার গড়ে উঠতে থাকল। কিন্তু সে কেবল শহরের দিকে। একে তো জঙ্গলের দেশ, দুর্গম অঞ্চলের অভাব নেই, তার ওপর লাইব্রেরি তো খুলে বসলেই হয় না। যথাযোগ্য একটা বাড়ি চাই, বই যে লোকে নেবে তার ক্যাটালগ বানানো চাই, কে কী নিল বা ফেরত দিল তার হিসেব রাখা চাই, কিছু নীতিনিয়ম চাই, সর্বোপরি কিছু কর্মী চাই। এগিয়ে এলেন স্কটিশ-আমেরিকান শিল্পপতি অ্যানড্রু কার্নেগি। তিনি ইতিমধ্যে আমেরিকায় সাধারণ পাঠাগার বানানোর জন্য প্রচুর দান করেছেন। এবার কানাডার দিকে তাঁর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। তাঁর অনুদানে ১২৫টি লাইব্রেরি তৈরি হয়েছিল। তার মধ্যে এখনও ৬৩টি চালু আছে।
একবার পরিকাঠামো তৈরি হয়ে গেলে কাজ এগোতে দেরি হয় না। ধীরে ধীরে বিভিন্ন অঞ্চলে লাইব্রেরি গড়ে উঠল। ক্রমে সরকারি গ্রান্টও জুটল, তৈরি হল আঞ্চলিক বোর্ড।
নানা বাধাও এসেছে মাঝেমধ্যে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, উনিশশো সত্তরের দশকের মুদ্রাস্ফীতি বা আটের দশকের মন্দা—সবকিছুরই প্রভাব পড়েছে লাইব্রেরির ওপর। কখনও বন্ধ থেকেছে দীর্ঘদিন, তবে আবার নতুন উদ্যমে চালু হয়েছে। ততদিনে লাইব্রেরি শুধু বই পড়ার জায়গা নয়, বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রোগ্রামও চালু হয়েছে সেখানে। সে-কথায় পরে আসছি আবার। এই ক্যালগেরি শহরের কথা বলে নিই আগে।
সেটা ১৯০৬ সাল, ক্যালগেরি তখন গড়ে উঠছে সবে। ধুলোমাখা রাস্তা আর খামারবাড়ি ছাড়া খুব বেশি কিছু নেই তখন। স্কুল অবশ্য আছে কয়েকটা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য একটা কলেজও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বছর খানেক আগে। নানা অঞ্চল থেকে মানুষ আসছে, শহরের জনসংখ্যা ওই বারো হাজারের মতো। ম্যানিটোবা থেকে এলেন আটষট্টি বছরের অ্যানি ডেভিডসন। সঙ্গে এল এক বিশাল ট্রাংক ভরতি বই। ডেভিডসনের স্বামী মারা গিয়েছিলেন, দশজন সন্তানের মধ্যে বেঁচে ছিল মাত্র চারজন। অসুখে আর দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল বাকি ছয়জনের। শোকতাপের জীবন অ্যানির, শান্তি পেতে তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন বইয়ের পাতায়। আশেপাশের পড়শিরাও কানাডার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসেছিল। পুরুষরা কাজে বেরিয়ে যেতেই এইসব আত্মীয়-বন্ধুহীন মহিলারা একে একে এসে জুটত বই পড়ার লোভে। অ্যানি খুশি হয়েই ভাগ দিতেন তাঁর বইয়ের সম্ভারের। দেখতে দেখতে উইমেন্স লিটারেরি ক্লাব তৈরি হল অ্যানির বাড়িতে। শখের ক্লাব নয়, রীতমতো চর্চা ও আলোচনা চলত বই নিয়ে। দূরের গ্রামাঞ্চল থেকেও অনেকে আসতে শুরু করেছিল এই ক্লাবে।
অ্যানির মাথায় হঠাৎ এক মতলব খেলে গেল। কার্নেগি ফাউন্ডেশনের কাছে অর্থসাহায্য চেয়ে পিটিশন দাখিল করলেন তাঁরা। মনে রাখা প্রয়োজন, মহিলাদের ভোটাধিকার ছিল না তখনও। তাই পিটিশনে পুরুষদের সই থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। ডেভিডসন আর তাঁর দলবল একরকম দরজায় দরজায় বার বার ঘুরে প্রয়োজনীয় সই জোগাড় করেছিলেন।
বিফল হয়নি পিটিশন, কার্নেগি আশি হাজার ডলার তুলে দিয়েছিলেন ক্যালগেরি পৌরসভার হাতে। শহরের পক্ষ থেকে এসেছিল আরও কুড়ি হাজার ডলার। ১৯১২ সালে হাজার পাঁচেক বই নিয়ে শুরু হল এই শহরের প্রথম পাবলিক লাইব্রেরি।
নীচে রইল তার ছবি। এই লাইব্রেরি এখনও বহাল তবিয়তে চলছে। (চিত্রঋণ: সিটি আর্কাইভস)

একের পর এক পাঠাগার তৈরি হতে থাকল ক্যালগেরিতে। আসলে প্রত্যেক অঞ্চলের নিজস্ব লাইব্রেরি থাকার রীতি, যাতে বাসিন্দাদের বই পড়ার জন্য অনেক দূরে যেতে না হয়। ১৯৪৭ সালে ক্যালগেরির কোনো-কোনো লাইব্রেরি থেকে শুধু বই নয়, গানের রেকর্ড ধার দেওয়ারও ব্যবস্থা করা হল। এর আগে কানাডার কোনও শহরে এই ব্যবস্থা হয়নি।
উল্লেখ্য, বর্তমানে ক্যালগেরিতে পাবলিক লাইব্রেরির বাইশটি শাখা আছে, তার মধ্যে একটি মূল বা সেন্ট্রাল লাইব্রেরি যার কথা আলাদাভাবে বলব। সবচেয়ে মজা হল, এদের মধ্যে যে-কোনো একটা শাখা থেকে বই নিয়ে অন্য যে-কোনো শাখাতে সেটা ফেরত দেওয়া যেতে পারে। সদস্য প্রমাণপত্র বা মেম্বারশিপ কার্ড একটাই করাতে হয়। বই, রেকর্ড, সিডি ছাড়াও ওই কার্ড দিয়ে পাওয়া যায় বাদ্যযন্ত্র। অবশ্য বাদ্যযন্ত্র সব শাখা থেকে নেওয়া যায় না, ফেরতও দেওয়া যায় নির্দিষ্ট শাখায়। বই পড়ার জন্য ধার্য তিন সপ্তাহ, তারপর দু-বার পুনরায় ইস্যু করা যায় বটে যদি না কেউ সেই বইয়ের জন্য ইতিমধ্যেই নাম লিখিয়ে রেখে থাকে। এমন নয় যে সেক্ষেত্রে আর নিতে দেবে না, তবে কেউ অপেক্ষা করে থাকলে সে-বই ফেরত দিয়ে নিজের নামটা অপেক্ষমাণ পাঠকদের তালিকায় ঢুকিয়ে নেওয়াই দস্তুর। দেখেছি, সবাই তাই করে, পড়া শেষ না হলেও কেউ অপেক্ষায় থাকলে বই আটকে রাখে না। আগে ফেরত দেওয়ার নির্দিষ্ট সম়য়সীমা পেরিয়ে গেলে সামান্য ফাইন দিতে হত, কোভিডের সময় থেকে সে নিয়ম উঠে গেছে চিরতরে। তবে বই নষ্ট করলে কী হারালে ফাইন দিতে হয়। বইগুলো দেখলে বোঝা যায় সবাই বেশ যত্ন নিয়েই পড়ে। দুমড়ে যাওয়া কি হিজিবিজি কাটা পাতা চোখে পড়েনি বিশেষ। বৈদ্যুতিন বইয়ের সংখ্যাও কম নয়, লিবি অ্যাপ দিয়ে সে-সমস্ত পড়া বা শোনা যায়। ক্যালগেরি পাবলিক লাইব্রেরির সংগ্রহে রাখা মুদ্রিত বই, বৈদ্যুতিন বই, অডিও বই, সিডি, ডিভিডি, বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদির সংখ্যা মোট ১.৪ মিলিয়ন। কলকাতার শুধু ন্যাশনাল লাইব্রেরির ক্ষেত্রে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ২.৫ মিলিয়ন!
অতীতে আবার একটু ফেরা যাক। কার্নেগির সৌজন্যে বেশ কিছু পাঠাগার তো তৈরি হল, কিন্তু সবই তো মূল শহরের ভেতর। শহরতলির দিকে সে পরিকাঠামো তখনও নেই। তাদের জন্য ১৯৫২ সালে এল ভারি মজাদার এক সমাধান, চালু হল লাইব্রেরির ভ্রাম্যমাণ শাখা, বুক-মোবাইল। হাজার চারেক বই নিয়ে একটা বাস পাড়ি দিত প্রত্যন্ত অঞ্চলে, আর ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা খুশিতে দৌড়ে এসে ভিড় জমাত।
নীচে রইল ক্যালগেরির কিছু বুক-মোবাইলের ছবি। (চিত্রঋণ: ক্যালগেরি হেরাল্ড সংবাদপত্র)

ইচ্ছে থাকলেও বুক-মোবাইল দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। কারণ, ১৯৯১ সালের পর তা চালু রাখার প্রয়োজনীয়তা আর ছিল না। ততদিনে সব অঞ্চলেই লাইব্রেরি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তবে একটা বাস এখনও আছে, নাম হয়েছে বুক-ট্রাক। চার্চে বিশেষ উৎসবের দিনে ধর্মগ্রন্থ নিয়ে হাজিরা দেয়। এছাড়া যে-কেউ চাইলে তার পাড়ায় বুক-ট্রাক আনতে পারে। জন্মদিন বা কোনও পার্টিতে বুক-ট্রাক আনার চল আছে। বলা বাহুল্য, লাইব্রেরিতে আগে থাকতে জানিয়ে তাদের অনুমতি নিয়ে তবেই এই ব্যবস্থা করা সম্ভব, তবে এই পরিসেবাও পাওয়া যায় বিনামূল্যে।
এবার লাইব্রেরিতে বসে কী কী করা যায় তা বলি। প্রত্যেকটা শাখায় বাচ্চাদের জন্য আলাদা এলাকা আছে, সেখানে তারা যতক্ষণ খুশি খেলতে পারে, আঁকতে পারে, পড়তে পারে অবশ্যই চেঁচামেচি গোলমাল না করে। নানারকম খেলার সরঞ্জাম থাকে সেখানে। মাসে একবার গল্প বলার আসর বসে। কখনো-কখনো শিশুসাহিত্যিকরা নিজেরা এসেও তাঁদের লেখা বই থেকে পড়ে শোনান।
এছাড়া বড়োদের পড়াশোনা করার এলাকা যেমন থাকে সে তো আছেই। লাইব্রেরি কার্ড দিয়ে মাসে পঞ্চাশটা সাদাকালো বা পঁচিশটা রঙিন প্রিন্ট-আউট নেওয়া যায়। এছাড়া কিশোর-কিশোরীদের জন্য কবিতার ক্লাব, লিখিয়েদের ক্লাব ইত্যাদিও আছে। সদ্য আগত অভিবাসীদের জন্য ইংরেজি আর ফরাসি ভাষা শেখার ব্যবস্থা আছে। বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা অতিথি হয়ে এসে তাঁদের বিষয়ের ওপর বক্তব্য রাখেন মাঝে মাঝে। মোট কথা, লাইব্রেরি রীতিমতো ঘটনাবহুল জায়গা।
প্যান্ডেমিকের সময়ে লাইব্রেরির ভিতরে ঢোকা নিষেধ থাকলেও পরিসেবা কিন্তু বন্ধ হয়নি। কী বই চাই অনলাইনে বা ফোন করে জানিয়ে দিলে লাইব্রেরির বাইরে থেকে তা সংগ্রহ করে নেওয়া যেত। বই ফেরত দেওয়ার জন্য চওড়া একটা খোপ লাইব্রেরির বাইরের দেওয়ালে এমনিতেই থাকে। চিঠির বাক্সের মতো ব্যাপার, তবে অনেক বেশি চওড়া। লাইব্রেরি বন্ধ থাকলেও এই রিটার্ন স্যুট দিয়ে বই ফেরত দেওয়া চলে।
প্যান্ডেমিকের ভয়ংকর দিনগুলোয় বন্ধ লাইব্রেরি আর বই নেওয়ার ব্যবস্থার ছবি রইল।

এবারে আসা যাক সেন্ট্রাল লাইব্রেরি বা প্রধান শাখার গল্পে। সে এক অতি আশ্চর্য জায়গা। ২৪০,০০০ বর্গ ফুটের পাঁচতলা এই বাড়ি বানাতে লেগেছিল পাক্কা তিন বছর। ভেতরে ঢুকলে কেমন একটা জাদুঘর জাদুঘর অনুভূতি হয়। প্রথমেই চোখে পড়ে বিশাল আয়তনের কাঠের আর্চ, আর অগুনতি উঁচু উঁচু সিঁড়ির ধাপ। বাইরের দেওয়াল কাচে ঢাকা হওয়ার দরুন দিনের বেলা আলো ঝলমল করে ভেতরে। নিভৃতে পড়াশোনা করার জন্য সব তলাতেই আলাদা করে জায়গা নির্দিষ্ট করা আছে। এছাড়া কোনও না কোনও লেখক, শিল্পী, পুরাতত্ত্ববিদ, ঐতিহাসিক সবসময় উপস্থিত থাকেন লাইব্রেরিতে। প্রয়োজনে তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করাও সম্ভব হয়।
লাইব্রেরির সাজসজ্জা কেমন একটু দেখাই, তবে বাইসন মহাশয় কী করছেন তা ঠিক জানি না। নির্ঘাত মহাজ্ঞানী বাইসন।

সিঁড়িগুলো প্রায় পাহাড়ে ওঠার অনুভূতি দেয়। এত উঁচু সিঁড়িতে বয়স্ক বা পায়ের সমস্যা থাকা মানুষের অসুবিধা হওয়ার কথা।
বই সাজানোর কায়দা একটু দেখাই।

চারতলার একটা তাকে ক’টা বাংলা বই খুঁজে পেয়ে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। এখানে জয়ঢাকের কিছু বই থাকলে কেমন হয়?

আর একটা ভারি মজার জিনিস আছে এখানে। একতলায় ফেরত দেওয়া বই কনভেয়ার বেল্টে চেপে দোতলার সর্টিং রুমে যায়, সেখান থেকে বিষয় অনুসারে ভাগ হয়ে যে-যার তাকে আবার চলে যায়। শেষ কাজটা অবশ্য মানুষই করে। এই চলমান বেল্টের নাম আবার বুকস্ক্যালেটর। জিনিসটা এইরকম দেখতে।

বসার জায়গা সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এছাড়া চারতলায় রয়েছে বিশাল আয়তনের পড়ার ঘর। কেউ যদি বিশেষ নিভৃতি চায়, তাদের জন্য ঘেরা আসনের ব্যবস্থা আছে, বেশ বাক্সের মতো লাগে। অনুমতি ছাড়া মানুষের ছবি তোলা যায় না, তাই খুঁজে ফাঁকা আসনের ছবি তুলেছি। না-হলে লাইব্রেরি ফাঁকা থাকে না মোটেই।

এই সমস্ত ছাড়াও সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে আছে রেকর্ডিং স্টুডিও, নাচ গান থিয়েটার ইত্যাদি পরিবেশন করার হল, তিরিশখানা মিটিং রুম এবং একটা রেস্তোরাঁ। সেখানে অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে অতি চমৎকার আইসক্রিম পাওয়া যায়। দুশো কুড়িটা ল্যাপটপ লাইব্রেরি জুড়ে নানা জায়গায় ছড়ানো আছে, যে-কোনো সদস্য সেগুলো ব্যবহার করতে পারে।
১২,০০০ বর্গফুট জুড়ে বাচ্চাদের বিভাগটা একেবারে নীচে, একতলায়। বাচ্চাদের নানারকম খেলাধুলোর ব্যবস্থা তো অবশ্যই আছে সেখানে।
কাজ করার ইচ্ছে থাকলে প্রাণভরে সেটা করার সুযোগ আছে, কিন্তু সে তো অন্য ব্যাপার। যেটা মুগ্ধ করে তা হল কেউ এসব সুবিধার অন্যায় সুযোগ নেয় না। নিজে প্রয়োজনমতো ব্যবহার করে, অন্যরাও যাতে সে সুযোগটা পায় সেই দিকেও খেয়াল রাখে। বিনামূল্যে পাচ্ছে বলে অযত্ন করে না কোনও কিছুর। তা না হলে এত বছর ধরে এমন সুন্দর বন্দোবস্ত চালু থাকতে পারত না।
আর একটা মজার জিনিসের কথা না বললে লেখাটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। পাড়ায় পাড়ায় দেখা যায় ছোটো একটা খুঁটি, তার ওপর একটা মাঝারি আকারের বাক্স বসানো। পুরোটাই কাঠের। ছোট্ট একটা দরজা আছে বাক্সের, ভেতরে দশ-বারোটা বই। প্রথমে বুঝতে পারতাম না ব্যাপারটা কী। পরে জেনেছি, ওকে বলে লিটল ফ্রি লাইব্রেরি। পাড়ার মানুষজন কোনও বই ভাগ করে পড়ার ইচ্ছা হলে ওখানে রেখে দেয়, যার ইচ্ছা হয় নিয়ে পড়তে পারে। এরা বলে, টেক আ বুক, লিভ আ বুক। শুধু নিও না, দিতেও শেখো। বাক্সের দরজায় কিন্তু তালা থাকে না, আর ফেরত দেওয়ারও কোনও তাড়া নেই। সম্পূর্ণ নিজেদের মধ্যে স্রেফ বিশ্বাসের ওপর চলে এই পাড়াতুতো ছোট্ট লাইব্রেরি। নিজেরাই রঙ-টঙ করে বেশ ঝলমলে করে তোলে বাক্সটা। বেপাড়ার লোকজন কিন্তু সচরাচর অন্য পাড়ার লিটল ফ্রি লাইব্রেরি থেকে কিচ্ছু নেয় না, তবে কেউ বদমাইশি করলে কিছু করার নেই। আমাদের দেশে এরকম ছোট্ট লাইব্রেরি পাড়ায় পাড়ায় চালু করলে বেশ হয়, তাই না?

পরের পর্বে এখানের মানুষজনের স্বভাব-চরিত্র নিয়ে কথা বলব, সে ভারি মজার ব্যাপার। আজ তবে এই পর্যন্ত, টা টা।
ক্রমশ