
২০১৯-এর জুলাই মাসে যখন অন্টেরিওর সু-সেন্ট-মারি (Sault Ste. Marie) থেকে অ্যালবার্টার ক্যালগেরিতে এসে পৌঁছালাম, সদ্য তখন স্ট্যামপিড শেষ হয়েছে। ছবি-টবি দেখে, লোকজনের ‘ইশ্ আর সপ্তাহ খানেক আগে আসতে পারলে না’, ইত্যাদি শুনে বুঝতেই পারছিলাম বেজায় মিস করে গেছি ব্যাপারটা। তখনও শহরের এদিকে ওদিকে ফেস্টুন, ঝলমলে পতাকার বাহার। অগত্যা পরের বছরের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই। তখন কি আর জানি ২০২০-তে পৃথিবী হাসতে ভুলে যাবে, প্যান্ডেমিকের মৃত্যুমিছিল এড়িয়ে টিকে থাকাটাই তখন গ্রেটেস্ট আউটডোর শো। একশো বছরের মধ্যে প্রথমবার বাতিল হল স্ট্যামপিড। এমনিতেই শহরটা বড়ো পালটে যেতে শুরু করেছিল, রাস্তার উলটোদিকের গ্রিক ডাইনারটা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল একদিন, তারপর তার পাশের ছোট্ট মনিহারি দোকানটাও। বেশি বেরোতাম না, তবে খবর পাচ্ছিলাম শহরের চারদিকেই এমন অনেক দোকানপাট ছোটোখাটো ব্যাবসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একে একে। তখনও সবাই ভাবছিল, যাই হোক, স্ট্যামপিডটা তো আসছে। জুন মাসের মাঝামাঝি জানা গেল, স্ট্যামপিড বাতিল, একশো বছরের মধ্যে এই প্রথমবার। প্রাণচঞ্চল শহরটা এমনিতেই প্যান্ডেমিকের দাপটে ঝিমিয়ে পড়েছিল, এবার একেবারে মুষড়ে পড়ল। আমাদেরও আর স্ট্যামপিড দেখা হল না সে-বার, তবে স্টেডিয়াম থেকে রোজ রাতে মিনিট পনেরো ধরে আতসবাজি ফাটানো হত। এখানে আবার ইচ্ছা করলেই বাজি ফাটানো যায় না, পুরসভার লিখিত অনুমতি লাগে।
যাই হোক, ২০২১-এর জুন মাসের শুরুতেই দেখি শহরজুড়ে ল্যাম্প-পোস্টে কাউবয় আঁকা ফেস্টুন লাগাচ্ছে। সঙ্গে যত্রতত্র ঘোড়া আর কাউবয় বুটের কাট-আউট। সেটাই স্ট্যামপিডের সাজসজ্জা। আমরা সেই সময় যেখানে থাকতাম, তার উলটোদিকে একটা ম্যাকডোনাল্ডস ছিল। তার বাইরে খড় দিয়ে সাজিয়ে ছোটো একটা এক্কা গাড়ির মডেল রেখেছিল। ছোটো হলেও নিখুঁতভাবে বানানো। একদিন সেই খড়ে কীভাবে যেন আগুন ধরে সে এক বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড। মোট কথা, সারা শহর জুড়ে সাজ সাজ রব, কলকাতায় ঠিক দুর্গাপুজোর আগে যেমনটা হয়।
স্ট্যামপিডের দিন সাতেক আগে থাকতে দেখি সবার পোশাক-আশাক হঠাৎ পালটে যেতে শুরু করেছে। মাথায় বারান্দা দেওয়া কাউবয় টুপি, হাঁটু পর্যন্ত উঁচু বুট, গলায় তেকোনা রুমাল। পরনে ব্লু জিন্স আর খোপ কাটা শার্ট। ওই পরেই অফিস যাচ্ছে, সেটাই নাকি দস্তুর। আমার বরাবরই মনে হয়েছে, কলকাতার সঙ্গে ক্যালগেরির কোথায় যেন একটা আত্মিক মিল আছে; দুই শহরের লোকজনই রীতিমতো হুজুগে, আর যে-কোনো অবস্থায় কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয় সেটা তারা ভালোমতো জানে।
অবশেষে এল সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। রীতি অনুযায়ী অনুষ্ঠান শুরু হয় প্যারেড দিয়ে। চার কিলোমিটারেরও বেশি লম্বা এই প্যারেডে ব্যান্ড ছাড়াও থাকে বেশ কিছু ট্যাবলো। রোডিওতে অংশগ্রহণকারী ঘোড়া আর কাউবয়ের দল তো থাকেই এই প্যারেডে। ডাউনটাউন ধরে স্টেডিয়ামের দিকে হেঁটে যায় পুরো দলটা। সে-সব রাস্তায় যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয় তখন। প্রায় পুরো শহরটা ভিড় জমায় রাস্তার দুই পাশে, অফিস স্কুল কলেজে অঘোষিত ছুটিই বলা যায়। সেই ১৯১২ থেকে চলে আসছে এই পরম্পরা। এখানে বসবাসকারী অন্য দেশের মানুষরাও এই প্যারেডে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পান। গুজরাটি সমিতি, মারাঠি সমিতির পাশাপাশি বাঙালি সমিতির প্রতিনিধিরাও সক্রিয় ভূমিকা নেন প্যারেডে।
সিকসিকা (Siksika), গাইনাই (Kainai), বিগানি (Piikani), স্টোনি নাকোটা (Stoney Nakota/Nakoda), সুটিনা (Tsuut’ina) সম্প্রদায়ের ফার্স্ট নেশনরা এই প্যারেডের অন্যতম প্রধান অংশ। এছাড়া প্রত্যেক বছর একজন স্ট্যামপিড রাজকুমারী (Stampede Princess) আর একজন ফার্স্ট নেশন রাজকুমারী (First Nation Princess)-কে নির্বাচন করা হয় বিভিন্ন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। নির্বাচন পদ্ধতি মোটেই সহজ নয়। পরবর্তী এক বছর এই রাজকুমারীরা নানা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করতে সাহায্য করবেন, তাই নিজেদের শিকড় সম্বন্ধে গভীর জ্ঞান থাকা আবশ্যক। সবরকম মানুষের সঙ্গে সহজভাবে মেশার ক্ষমতাও থাকা চাই। রাজকুমারীরা ঘোড়ার পিঠে চড়ে প্যারেডে অংশ নেন, স্ট্যামপিডের সবরকম অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করাও তাঁদের দায়িত্ব।
প্যারেডের একেবারে সামনে থাকেন প্যারেড মার্শাল। গোটা প্যারেডের ভার একরকম তাঁর উপর। সাধারণত বিখ্যাত কোনও মানুষকেই এই ভূমিকায় নির্বাচন করা হয়। রাজকুমারীদের আর মার্শালকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজটা সারাবছর ধরে চলে। তবে সেই সময় তাঁদের নিজেদের কাজ যাতে ব্যাহত না হয় সেইদিকেও নজর রাখতে ভোলেন না স্ট্যামপিড কর্তৃপক্ষ।
১৯৬৫ সালের প্যারেড মার্শাল ছিলেন স্বয়ং ওয়ল্ট ডিজনি।
প্যারেডের কিছু মুহূর্ত রইল নীচে। চিত্র ঋণ : উইকিকমন্স

স্ট্যামপিডের টিকেটের দাম বেশ ভালোই, তবে বিশেষ বিশেষ দিনে কিছু সময়ের জন্য টিকেটের প্রয়োজন হয় না। রোজ সকালে প্যানকেক ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা থাকে,কোনো-কোনো দিন সেটাও ফ্রিতে পাওয়া যায়।
প্রথমবারের অভিজ্ঞতার কথা বলি আগে। তখনও প্যান্ডেমিকের ভীতি কমেনি, তাই গোটা সময়টা মাস্ক পরে থাকতে হয়েছিল। তবে ভিড় কিছু কম হয়নি। জানি না পৃথিবীর সব জমজমাট মেলার মেজাজ একইরকম হয় কি না, তবে স্ট্যামপিডের রোডিও শো বাদ দিলে মেলার সুরটা কিন্তু একেবারেই আমাদের রথের মেলার মতো। সেই নৌকোর মতো দেখতে স্টেডিয়ামকে ঘিরে বিশাল মেলা বসে, খাবারদাবারের দোকানই বেশি। তাছাড়া আছে ভয়ানক সব রাইড।
মেলার চিরাচরিত রীতি মেনে কোনও বড়ো ব্র্যান্ড কিন্তু আসে না, সে খাবার হোক কি অন্য কোনও পসরা। পারিবারিক ব্যাবসা বা কয়েকজন বন্ধু বা ভাইবোন মিলে হাতখরচের জন্য দোকান দিয়েছে, এমনটাই দেখা যায়। নানারকম বার্গার, সসেজকে ময়দার কোটিং দিয়ে ভেজে কর্ন ডগ, ভাজা চিকেন, পিৎজা এসবই সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার। এছাড়া আছে আলুভাজার উপর নরম ফাঁপা চিজ আর গ্রেভি দেওয়া পুটিন, আর অবশ্যই নানারকম আইসক্রিম। প্রত্যেক স্ট্যামপিডে একেবারে নতুন কিছু খাবার আবিষ্কার করার একটা ঐতিহ্যও আছে, সে-কথায় পরে আসছি। আগে দোকানগুলোর চেহারা দেখাই।
ওই যে নৌকোর মতো স্টেডিয়াম, আর তাকে ঘিরে খাদ্যরসিকদের ভিড়।

ভর্জিত কুক্কুট পাওয়া গেলেও চিকেন বার্গার পাওয়া যায় না। বদলে বাইসন আর এল্কের বার্গার হাজির। বাইসনের মাংস শুকিয়ে সসেজের মতো দেখতে বিঘত প্রমাণ একটা খাবার বানায়, তাকে বলে বাইসন জার্কি। আমি নাম রেখেছি বাইসন শুঁটকি।
আইসক্রিমের দোকানগুলো আমার সবচেয়ে ভালো লাগে,মনে হয় যেন অতীত থেকে টাইম ট্র্যাভেল করে চলে এসেছে।

নতুন খাবার উদ্ভাবনের কথা যা বলছিলাম,সেগুলো যে খুব সফল হয় তা কিন্তু নয়। এই বছরে পরীক্ষাটা হয়েছিল আইসক্রিমের উপর। দুর্ভাগ্যবশত মশলা মাখানো কর্নের উপর ভ্যানিলা আইসক্রিম বা তরমুজের শাঁসের উপর চকোলেট আইসক্রিম বিশেষ কারোই মন বা জিভ জয় করে নিতে পারেনি।
এ তো গেল খাওয়াদাওয়ার কথা। রাইড ছাড়া কি আর মেলা জমে? বিশাল বড়ো নাগরদোলা তো আছেই,এছাড়া ওয়াটার শুট,মাধ্যাকর্ষণকে ডিফাই করে অনেক উপরে উঠে উলটে গিয়ে নেমে আসা,এসবও আছে। মেলার মাঝবরাবর রোপওয়ে চলে,বেশ ঝুলে ঝুলে এক পার থেকে অন্য পারে চলে যাওয়া যায়।

আমাদের দেশে গ্রামের মেলায় শুনেছি পশুপাখির প্রদর্শনী হয়,কখনও স্বচক্ষে দেখা হয়নি। স্ট্যামপিডেও খামারের পশুদের নিয়ে রীতিমতো বড়ো প্রদর্শনী হয়। তবে কেনাবেচার ব্যাপার নেই,কেবল আলাপ করার সুযোগ পাওয়া যায়। ঘোড়া ইবেশি, তবে লামা, অ্যালপ্যাকা,ভেড়া,পুঁচকে আকারের পিগমি ঘোড়াও আসে। মেলা চলাকালীন দর্শকদের ভিড়ে এদের যাতে বিন্দুমাত্র কোনও অসুবিধা না হয় তার সম্পূর্ণ খেয়াল রাখা হয় দেখেছি। বেশি গরম পড়লে ফ্যান চালিয়ে আরামের ব্যবস্থা করা থেকে দিনে কয়েকবার প্রদর্শনী বন্ধ করে বিশ্রামের সুযোগ করে দেওয়া— কোথাও সামান্য বিচ্যুতি হয় না। পশুদের গায়ের জেল্লা সত্যিই তাকিয়ে দেখার মতো। আবার প্রত্যেকের নাম,বয়স,গুণাবলি সুন্দর করে লিখে টাঙানো থাকে দেওয়ালে।

একটু গম্ভীর কথা বলি এবার। ১৯১২-তে একবার ফিরতে হবে সে-কথা বলার জন্য। ফার্স্ট নেশনদের সমস্ত কাজকর্ম, আচার-আচরণ তখন ইন্ডিয়ান অ্যাক্ট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। শিকারের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের জায়গায় তারা পেয়েছে অস্বাস্থ্যকর অনুর্বর জমির টুকরো, সরকারি পরিভাষায় যাকে বলে রিজার্ভ। এই রিজার্ভের বাইরে কোনও কারণে যেতে হলে সঙ্গে থাকতে হবে পাস, না থাকলে কারাবাস অনিবার্য। কোনও অবস্থাতেই রিজার্ভের বাইরে নিজেদের গোষ্ঠীর পোশাক পরার উপায় নেই, নিজের ভাষায় কথা বলা বা নিজেদের নাচ-গানের চর্চা করার তো প্রশ্নই উঠছে না। ধরা পড়লে কড়া সাজার ব্যবস্থা। ফাইন তো দিতে হবেই, সশ্রম কারাদণ্ডও কপালে জুটতে পারে। যে জন্মভূমিতে তারা বাজপাখির তেজ নিয়ে দাপিয়ে বেড়াত,সেই ভূমির উপরেই তাদের কোনও অধিকার আর নেই। সমস্যা, অভাব, সবই ছিল আগে,তবু তাদের সবচেয়ে বড়ো শক্তি ছিল তাদের স্বাধীনতা। রিজার্ভের পরাধীন জীবন তাদের প্রত্যেক মুহূর্তে বিদ্ধ করত চরম অপমানে।
এহেন সময়ে সেই নাছোড়বান্দাদের বাদশা গাই উইডিক এসে ভারি অদ্ভুত এক প্রস্তাব রাখল তাদের সামনে। রিজার্ভের বাইরে হাজার হাজার মানুষের সামনে তারা নাকি নিজেদের পোশাক পরে নিজেদের গান গাইবে,নাচবে! প্যারেড করে হেঁটে যাবে সবার সামনে দিয়ে। কেউ নাকি কিচ্ছু বলবে না। দুই সপ্তাহের জন্য তারা মুক্তি পাবে রিজার্ভ থেকে,আর সেইসব অনুমতি জোগাড় করার সম্পূর্ণ ভার উইডিকের।
দীর্ঘদিনের তিক্ত অভিজ্ঞতার ফলে ফার্স্ট নেশনরা রাজি হয়নি প্রথমে। ততদিনে ইয়োরোপিয়ানরা পাকাপাকিভাবে বসতি স্থাপন করে ফেলেছে,কিন্তু ফার্স্ট নেশনরা রিজার্ভের গণ্ডির ভিতরে সীমাবদ্ধ থাকার কারণে দুই পক্ষের মধ্যে কোনোরকম সংযোগ ছিল অসম্ভব। ফলে আপত্তি ও আশঙ্কা দুই তরফেই ছিল। কিন্তু গাই উইডিকের বিখ্যাত জেদের পরিচয় আমরা আগেই পেয়েছি। তাছাড়া উইডিক নিশ্চিতভাবেই জানত,ফার্স্ট নেশনদের পাশে না পেলে তার ওই স্বপ্নের স্ট্যামপিড কোনোদিন সফল হবে না। সে প্রথমে রাজনৈতিক নেতাদের গিয়ে ধরল, তাদের সাহায্যে সরকারি অনুমতিপত্র জোগাড় হল অবশেষে। কাজটা মোটেও সহজ ছিল না,কিন্তু ফার্স্ট নেশনদের রাজি করাতে গেলে অনুমতিপত্র ছাড়া গতি নেই। ধীরে ধীরে নরম হয়ে এল তারাও। হয়তো ওরা ভেবেছিল স্বাভাবিক অধিকার না থাকলেও অন্তত দুই সপ্তাহের জন্য বাইরের পৃথিবী স্বীকৃতি দিক তাদের,বুঝতে চেষ্টা করুক পুঁতি আর পালক ছাড়া তাদের আরও অনেক কিছু দেওয়ার আছে।
মেলার একটা অংশ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হল ফার্স্ট নেশনদের জন্য। রঙিন টিপি খাটিয়ে, নাচ-গান করে,পুঁতি,হাড়,পাথরের গহনা,পশুর চামড়ার পোশাকের প্রদর্শনী করে দিব্য কাটল তাদের। হয়তো সেই প্রথম মানুষের প্রাপ্য সম্মানটুকু জুটল বাইরের পৃথিবীর কাছ থেকে। উইডিক নিজের স্বার্থেই হয়তো এমন একটা উদ্যোগ নিয়েছিল,তবু একটা নতুন রাস্তার হদিস মিলেছিল সেই সঙ্গে।
উল্লেখ্য,ফার্স্ট নেশনদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় ১৯৬০ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত নানারকম পরিবর্তন আনা হয়েছিল ইন্ডিয়ান অ্যাক্টে।
যাই হোক, উইডিকের সঙ্গে বেশ একটা সখ্য তৈরি হয়েছিল ফার্স্ট নেশনদের। তাদের জন্য বরাদ্দ মেলার অংশের নাম ছিল ওল্ড ইন্ডিয়ান ভিলেজ। কিন্তু বন্যায় প্রত্যেক বছর ক্ষতিগ্রস্ত হত এলাকাটা। পরবর্তী সময়ে এলবো নদীর পাড়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় পুরো ব্যাপারটা। তবে ইতিহাসকে সম্মান জানাতে পুরোনো জায়গায় অর্ধেক টিপির আকারে চমৎকার এক স্থাপত্য তৈরি করা হয়। একবারে শুরুর ছবিতে স্ট্যামপিডের গেটের পিছনে দেখা যাচ্ছে সেটা।
ততদিনে ইন্ডিয়ান নামটা নিয়েও শুরু হয়েছে অসন্তোষ,প্রতিবাদ। তবে ওল্ড ইন্ডিয়ান ভিলেজ নামটা বহুদিন চলেছিল। একেবারে হালে, ২০১৬-তে এলবো নদীর ধারে স্ট্যামপিডের ফার্স্ট নেশনদের অবস্থানের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে রাখা হয় এলবো রিভার ক্যাম্প। নামের পিছনে মজার একটা গল্প আছে। রিজার্ভের বিচ্ছিন্ন জীবনের ফলে সাত প্রধান গোষ্ঠী একে অন্যের ভাষা ভুলে গিয়েছিল একেবারেই। স্ট্যামপিডে দেখা হলেও ইশারায় কথা বলতে হত। মেলার সব জায়গায় যেতে তারা স্বচ্ছন্দ ছিল না, কিন্তু এলবো নদীর ধারে বেশ একটা জমায়েত হত কখনো-কখনো। এই ইশারাটা একরকম ছিল সবার, নিজের নিজের কনুই দেখিয়ে বোঝাত সমাবেশের কথা। সেই ইশারা থেকেই এই নামের উৎপত্তি।
বর্তমানে মেলার কর্মকর্তাদের মধ্যে একাধিক ফার্স্ট নেশন প্রতিনিধি আছে, মেলার বেশ কিছু দায়িত্ব সম্মানের সঙ্গে দেওয়া হয় তাদের। তবে মেলার পুরো সময়টা ধরে টিপি সাজিয়ে নিজেদের সংস্কৃতি, জ্ঞান, বিশ্বাসের পরিচয় দেওয়ার প্রথা আজও অব্যাহত। সবার কিন্তু টিপি বানানোর অধিকার নেই, টিপি অত্যন্ত পবিত্র ওদের কাছে। যাদের সে-অধিকার আছে, তারাই একমাত্র আসে।
রইল সিকসিকা আর সুটিনা গোষ্ঠীর টিপির ছবি।

এবারে বলি স্ট্যামপিডের কোন জিনিসটা ঠিক পছন্দ হয় না। রোডিও শোতে সাধারণত ছয় রকমের হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা হয়। ভীষণ উত্তেজনাপূর্ণ সব প্রতিযোগিতা, ঘোড়ারাও সুশিক্ষিত। প্রাইজের অঙ্কও বড়ো কম নয়। তাই হয়তো নিজেকে এবং ঘোড়াকে দক্ষতা এবং শক্তির শেষ সীমায় নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকে কাউবয় বা কাউগার্লদের। দর্শকের পক্ষে তা মনোরঞ্জক হলেও আঘাতপ্রাপ্ত হয় অনেক ঘোড়া।
যেমন, ব্যারেল রেসিং। আরিনা জুড়ে বসানো থাকে তিনটে ব্যারেল। প্রত্যেকটিকে আলাদাভাবে পাক খেয়ে যে সবচেয়ে কম সময়ে ফিরে আসতে পারবে তারই জিত। পাক খাওয়ার সময়ে যত ছোটো ব্যাসার্ধ নিয়ে ঘোরা যাবে, স্বাভাবিকভাবেই তত কম সময় লাগবে। সেটা করতে গিয়ে ঘোড়ার সামনের পা চিরতরে খোঁড়া হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এছাড়া আছে টাই-ডাউন রোপিং। সেই যে ভ্যাক্যুরোরা ঘোড়ার পিঠে চড়ে পলাতক গবাদি পশুদের ধরে আনত, তাদের স্মরণ করেই এই খেলার প্রচলন। ঘোড়া ছাড়াও এই খেলায় লাগে একটি বাছুর। ঘোড়ার পিঠে আসীন কাউবয় বা গার্লের সম্মতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাছুরকে ছেড়ে দেওয়া হয় আরিনায়। সে ফুট দশেক এগিয়ে যাওয়ার পর ঘোড়া দৌড় শুরু করে। প্রথমে ল্যাসো ছুড়ে বাছুরকে আটকে ছুটন্ত ঘোড়া থেকে নেমে পড়তে হয়। তারপর দড়ির বাকি অংশ দিয়ে বাছুরের তিনটে পা বেঁধে শূন্যে হাত ছুড়ে সংকেত দিলেই কাজ শেষ। এখানেও কে কত কম সময়ে ব্যাপারটা সারতে পারছে সেটাই দেখার। ভ্যাক্যুরোদের এটা অন্যতম কাজ ছিল, গবাদি পশু ধরতে গিয়ে তাদের আহত করে ফেললে লাভ হত না বিশেষ, কিন্তু সে দায় রোডিও প্রতিযোগীদের নেই। ছুটন্ত বাছুরের গলায় ল্যাসোর হ্যাঁচকা টানে আঘাত লাগে এবং এই গোটা অহেতুক প্রতিযোগিতাটার ভিতর একটা রোমান নিষ্ঠুরতার গন্ধ পাওয়া যায় বইকি।
তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা বোধ হয় স্যাডল ব্রঙ্ক রাইডিং। সদ্য ধরে আনা ঘোড়া বা প্রশিক্ষণ পায়নি এমন ঘোড়ারা অনেক সময়ে পিঠ বাঁকিয়ে পিছনের পা শূন্যে ছুড়ে সওয়ারকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। কোনো-কোনো ঘোড়ার খুব বেশি প্রবণতা থাকে এটা করার। তাদের বলে ব্রঙ্কো বা বাকিং হর্স। স্যাডল ব্রঙ্ক রাইডিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গেলে এমন ঘোড়ার পিঠে অন্তত আট সেকেন্ড টিকে থাকতে পারা চাই। যে সবচেয়ে বেশি সময় ছিটকে না পড়ে টিকে থাকতে পারবে,অবশ্যই জিত তারই। শুধু ঘোড়া নয়,একইভাবে ষাঁড়ের পিঠেও চড়ার চেষ্টা করে কাউবয়রা। সত্যি বলতে কি,টি-রেক্সের পিঠে চড়ে বসলেও বিন্দুমাত্র অবাক হব না।
তবে সবচেয়ে বিপজ্জনক খেলা চাকওয়াগন রেসিং। এটা অনেকটা বেন হার সিনেমার চ্যারিয়ট রেসিংয়ের মতো,তবে রথের বদলে ছই টানা ছ্যাকড়া গাড়ি। এই প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বেশি ঘোড়া আহত হয়। প্রত্যেক বছর নানা দুর্ঘটনা ঘটে, এমনকি হার্ট অ্যাটাক হয়ে ঘোড়া মারা গেছে এমনও হয়েছে।
রোডিও শোতে আহত ঘোড়াদের বাঁচিয়ে রাখা মুশকিল। আঘাত এতটাই গুরুতর হয় যে চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।
চাকওয়াগন রেসিং বন্ধ করে দেওয়ার প্রস্তাব উঠেছে অনেকবার,তবে এই ধরনের প্রতিযোগিতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে হাজার হাজার ডলার, হয়তো মানুষের কাছে তার তুলনায় চার-পাঁচটা ঘোড়ার প্রাণ কিছুই নয়। এমনিতে কিন্তু এরা রীতিমতো পশুপ্রেমী,তাই এই অসঙ্গতিটা মেনে নেওয়া একটু কঠিন।
প্রচুর বাজি ফাটিয়ে দুই সপ্তাহের মহোৎসব শেষ হয়। অপেক্ষা শুরু হয় পরের বছরের। নৌকো মার্কা স্টেডিয়ামের কোণে পড়ে থাকে শূন্য এক্কা,সব ভাঙা মেলার চেহারা কেন যে একইরকম হয়।
মেলায় অনেক ঘোরাঘুরি হল। এবার পড়াশোনায় মন দেওয়া উচিত।
পরের পর্বে বলব এ-দেশের ভয়ংকর ভালো পাবলিক লাইব্রেরি সিস্টেমের কথা।
আজ তবে এই পর্যন্ত, টা টা।
ক্রমশ