ভ্রমণ- পাহাড়ি গ্রামের গল্প- গংগোল-ইন্দ্রনাথ- বসন্ত’২৬

পাহাড়ি গ্রামের গল্প- আগের পর্বগুলো

bhromonkhati

ভোরবেলা রাস্তায় গাড়িঘোড়া এমনিতেই কম। লোকজনও তেমন একটা নেই। যাত্রার মরশুম শেষ হয়ে যাওয়াতে ভুখ হরতাল রুটে বাসের চলাচল তো নেইই ট্যুরিস্ট গাড়িরও দেখা পাওয়া দায়। স্থানীয় গাড়ি চলে বটে তবে এই সাতসকালে তাও নেই। মন্ডল থেকে গংগোল সামান্য পথ, গোপেশ্বর যাবার পথে কিলোমিটার দশেক। এখান থেকে আর তিন কিলোমিটার গেলেই জেলাসদর গোপেশ্বর। মন্ডল ছেড়ে ভোরবেলাতেই বেরিয়ে এসেছি এক পরিচিত দাদার গাড়িতে। আমাকে নামিয়ে দিয়ে ওরা চামোলি কর্ণপ্রয়াগ হয়ে গোয়ালদামের দিকে চলে যাবেন। ঘড়ির কাঁটা সাতটাও ছোঁয়নি, আমি গাড়ি থেকে নেমে হাত নাড়তেই গাড়ি সামনের বাঁক পেরিয়ে অদৃশ্য। যে বন্ধুর এখানে দাঁড়াবার কথা, তাকে দেখতে না পেয়ে ফোন করলাম। সে জানালো, তার আসতে আসতে দুপুর গড়িয়ে যাবে, আমি যেন তার মেয়েকে ফোন করে দিই। তার শ্বশুরঘর রাস্তা থেকে মাত্রই কয়েক পা ওপরে। তো তাকে ফোন করে দিতেই সে বলল “আমি এখুনি আসছি তাউজি।”

রাস্তা থেকেই খাড়া পাহাড়ি ঢাল উঠে গেছে। সেদিকেই গ্রামের বাড়িঘরদোর বেশি। রাস্তার অন্যপাশ ঢালু, সে ঢাল নীচের দিকে এবং সেদিকে চাষের খেতই বেশি। নামতে নামতে তা চলে গেছে বালখিল্য গঙ্গার খাত অবধি। রাস্তার পাশেই বাস ধরার যাত্রী প্রতীক্ষালয়। মানে চারটে পিলারের ওপর ঢালাই করা একটা ছাত। ব্যস। বসার কোনো জায়গা, মায় সিমেন্টের বেঞ্চিটুকুও নেই। এদিক ওদিক তাকিয়ে চা-দোকান চোখে পড়ল না তবে ফুট চল্লিশেক তফাতে দুটি দোকানঘর চোখে পড়ল। কীসের দোকান দূর থেকে তা বোঝা গেল না। দুই দোকানিই সবে দোকান খুলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রোদ পোহাচ্ছিলেন। ওরা দুজন কথা বলাবলি করতে করতে মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকিয়ে দেখছিলেন। আমি এগিয়ে গেলাম।

“চা পাওয়া যাবে?”

“ইধার চায়ে কি দুকান নেহি মিলেগি।” নির্লিপ্ত গলায় জবাব এল। তারপর সন্ধিগ্ধ জিজ্ঞাসু চোখে প্রশ্নও করলেন একজন, “ইধার কাঁহা? কাঁহা জায়েঙ্গে আপ?”

বন্ধুর মেয়ের শ্বশুরবাড়ি যাব বলতে গিয়ে ভাবলাম আবার বন্ধুর পরিচয় দাও, সাত সতেরো ব্যাখ্যা – তার চেয়ে মেয়ের বিয়ে হয়েছে এগ্রামে বলে ল্যাঠা চুকিয়ে দিই। বললাম।

উত্তর শুনে তাদের চোখমুখের ভাব আরও ঘন এবং গম্ভীর হয়ে গেল। পাকাপাকিভাবেই অবিশ্বাসটা তাদের সারা শরীরের ভঙ্গীতে প্রকাশ পাচ্ছিল।

“এখানে, মেয়ের শ্বশুরবাড়ি?” আপাদমস্তক আমায় জরিপ করে একজন অস্ফুটে সেকথা বলেও ফেলল। “তা কোত্থেকে আসা হয়েছে?”

“কোলকাতা!” উত্তর শুনে তারা চুপ রইল কিন্তু যেকথাটা তারা উহ্য রাখল তা হল, “পেঁয়াজি হচ্ছে! মেয়ের বিয়ে হয়েছে এখানে? মামদোবাজি!”

কথাবার্তা ওখানেই শেষ। আমি দশ হাত দূরে বেকুবের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। দোকানি দুজন নিজেদের মধ্যে নীচু স্বরে নিজেদের মধ্যে শলা করতে লাগল। আলাপচারিতার কেন্দ্রে যে আমিই সে বিষয়ে আমার একরত্তি সন্দেহ রইল না। ফলে যতক্ষণ মেয়ে এসে না পৌঁছচ্ছে আমার অবস্থা না ঘরকা না ঘাটকা। মিনিট দশেক অপেক্ষায় ছিলাম, মনে হচ্ছিল যেন এক ঘণ্টা!

বাস স্ট্যান্ড ছাড়িয়ে বিশ তিরিশ মিটার দূরে পাথরের সিঁড়িপথ এসে নেমেছে পিচ রাস্তায়। করিশমা সেদিক থেকেই রাস্তায় নেমে “তাউজি!” বলে এক দৌড়ে এসে ঢিপ করে আমায় এক পেন্নাম করেই জোর করে আমার পিঠের বোঝাটা নিজের কাঁধে তুলে নিল। আমি ওর মাথায় হাত রেখে ঘাড় ঘুরিয়ে দোকানি দুজনের দিকে তাকাতেই দেখি আমূল বদলে গেছে তাঁদের চোখমুখের হাবভাব, শরীরের ভঙ্গী। মুখময় হাসি ছড়িয়ে নরম দৃষ্টিতে তারা এদিকেই তাকিয়ে দুহাত জড়ো করে রেখেছেন প্রণামের ভঙ্গীতে। বহিরাগত আগন্তুক লোকটি তাদের পরিচিত গন্ডীর ভেতরেই রয়েছে এই ভেবে যেন তারাও স্বস্তি পেয়েছেন। আমিও হেসে মাথা ঝুঁকিয়ে গ্রামের ভেতরে যাবার রাস্তার দিকে এগোলাম।

গংগোল বেশ অবস্থাপন্ন গ্রাম বলে মনে হল। বাড়িঘরদোরের চেহারা অন্তত সেই সাক্ষ্যই দিচ্ছে। করিশমার বিয়ে বছরখানেক আগেই হয়েছে। গোপেশ্বর বাজারে ওর বরের একটা ছোটো খাবারের দোকান। রুটি, তরকারি, ম্যাগি, বান রুটি, চা জল এইসব। ওদের গ্রামের বাড়িটা পিচরাস্তা থেকে চড়াই পথে মিনিট পনেরো। দোতলা বাড়ি। নীচের তলা পাথরে তৈরি, পুরোনো নির্মাণ, তার ওপরে আরেকটা তলা নতুন, ইট সিমেন্টে তৈরি। ঢালাই ছাদ। ওপরের তলাতে দুটো শোবার ঘর; তার সামনের দিক জুড়ে যথেষ্ট চওড়া ছাতখোলা বারান্দা।

নীচের উঠোন থেকে সিঁড়ি সোজা উঠে এসেছে সেইখানে। সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসে বারান্দাতেই থিতু হয়ে বসলাম। প্রায় গোটা গ্রামটাই উঁকিঝুঁকি মেরে ছাত থেকে দেখা যায়। এদিকের পাহাড়ের ঢাল অত্যন্ত খাড়া। গ্রামের সীমানা ছাড়ালেই জঙ্গল শুরু। জঙ্গল লাগোয়া ছানবাড়ি, গোয়ালঘর। তাতে গরু বাছুর মহিষ। এই সাত সকালে গ্রামের প্রায় সব মহিলারাই গোয়ালের কাজে গেছেন অথবা জঙ্গলে, পাহাড়ের ঢালে ঘাস কাটতে চলে গেছেন। বেলা পড়লে ফিরবেন। পুরুষদের অনেকেই বাইরে চাকরিবাকরি করেন। কাছাকাছি গোপেশ্বর শহরে দোকানপাট, ব্যাবসা বা জন মজুরি। কেউ গাড়ি চালান। করিশমার শাশুড়িও গেছেন গোয়ালে; ফিরতে ফিরতে বেলা তিনটে। বর গেছে দোকানে। সেও ফিরবে সন্ধের পর।

মিনিট দুই বাদে দুটি বাচ্চা ছেলে মেয়ে ইস্কুলের পোশাক পরে ছাতে উঠে এসে খানিক তফাতে দাঁড়িয়ে আমায় জরিপ করতে থাকল। আমি হেসে কাছে ডাকতেই দুটোই দুদ্দাড় করে নীচে পালাল। নীচ থেকে এক মহিলার গলা শোনা গেল। আমি কৌতূহলী হয়ে পিছু পিছু নীচে নেমে এলাম। একটি শ্যামলা রঙের মেয়ে সিঁড়ির মুখেই আমায় দেখে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানাল। আমি পালটা নমস্কার করে হাসতেই সে বলল, “আমার নাম পূজা, আমি সম্পর্কে করিশমার জা হই।” তারপর খানিকটা থেমে কী বলবে ভেবে না পেয়ে বলল, “আপনি আরাম করুন। আমি পরে এসে আপনার সঙ্গে গল্প করব। এখন ওদের ইস্কুলে রওনা করে দিয়ে আসি!”

আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে করিশমাকে দেখতে না পেয়ে ফের ছাত-বারান্দায় উঠে এলাম। বসে থাকতে থাকতে চোখটা লেগে এসেছিল। হঠাৎ একটা চেঁচামেচিতে চটকা ভেঙে দেখি তলা থেকে উঠে আসা গ্রামের রাস্তায় গোটা তিনেক বাড়ি নীচে একটা বাড়ির দেওয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে একটা লোক তারস্বরে গাল দিচ্ছে আর থুতু ছেটাচ্ছে ডাইনে বাঁইয়ে। সামনে পেছনে পাশে কোত্থাও কোনো লোক নেই। অদৃশ্য কোনো শত্রুকে যেন কথার তোড়েই পেড়ে ফেলবে। এক ঝলক মনে হল, সকালে করিশমার বাড়িতে উঠে আসার সময় গ্রামের পঞ্চায়েত ভবনের সামনের উঠোনে একটা পোস্টারের সামনে দাঁড়িয়ে এই লোকটিকেই বিড়বিড় করে কীসব বলতে শুনেছি। খানিক পরে লোকটিকে দেখি ওপরের দিকে উঠে এসে এই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে খুব নরম করে বলছে, “বহু, ও বহু, করিশমা! মেহমান আয়া হ্যায়। চায়ে পানি পুছা কি নেহি?”

ভালো করে লোকটির দিকে তাকিয়ে দেখি, উনি অন্ধ, হাত দিয়ে দেওয়াল স্পর্শ করে করে রাস্তা চলছেন। দেখেশুনে আমি ভড়কে গেলাম। আমার কথা উনি জানলেন কি করে!

“কুছ না, তাউজি। উয়ো হামারা জ্যেঠ হ্যায়।” করিশমা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ছাতে উঠে এসেছিল। আমি ওর হাত থেকে চা নিয়ে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই করিশমা বলল, “আমার শাশুড়ির মেজ ছেলে। অমনিই ঘুরে বেড়ায়। একা একা। জন্মান্ধ। খাবার সময় এসে খায় রাতে এসে শোয় নীচের ঘরে। আর সারাদিন টই টই করে ঘোরে। অমন আনাব-সানাব বকে। লোকে কেউ কিছু মনে করে না। গা লাগায় না। অন্ধ তো!”

“গ্রামের এই গলিঘুঁজি উচুনীচু পাথর ফেলা রাস্তা, ওর অসুবিধে হয় না?”

করিশমা হেসে বলে, “না। দিব্যি হেঁটে চলে বেড়ায়। হোঁচটও খায় না। দিব্যি সব বুঝতেও পারে। দেখলে না তুমি এসেছ বলে কেমন আমায় বলল, চা দিতে। আমাকে খুব স্নেহও করে।”

আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না কিন্তু চোখের সামনেই লোকটিকে রাস্তা বরাবর গ্রামের অন্যপাশে চলে যেতে দেখলাম। যে পথে দিনের বেলাতেই রাস্তার দিকে না তাকিয়ে চললে আমার মতো চক্ষুস্মান লোক দু চারবার হোঁচট খাবে, সেপথে লোকটি হাতদুটো দুপাশে ছড়িয়ে মাঝে মাঝে সামনে একদুবার ঘুরিয়ে নিয়ে দিব্যি টুকটুক করে হেঁটে চলে গেল। একটিবারও উঁচুনীচু পাথরে ঠোক্কর খেল না।

“বেচারা খুব দুঃখী, জানো তো!” মুখটা করুণ হয়ে গেল করিশমার। মিনিট খানেক চুপ করেই ঝলমল করে হেসে উঠে বলল, “তুমি বসো, তোমার খাবার নিয়ে আসি।” বলেই সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মুখ ফিরিয়ে বলল, “চা খাবে তো আরেকবার?” আমি হেসে ঘাড় কাত করে হ্যাঁ বললাম। সেই ছোট্ট করিশমাও কেমন গিন্নিবান্নি হয়ে উঠেছে। ওকে প্রথম দেখি ছমাস বয়েসে। দিদির কোলে চেপে ঘুরে বেড়াত।


ছাতের ওপর একটা মাদুর পেতে বসেছিলাম। শীতের সকালে রোদের ওমটাও বেশ আরাম লাগছে। করিশমা আর পূজা একটু বাদে হাতের কাজটাজ মিটিয়ে এল। হঠাৎ মনে পড়ল ব্যাগে একটা বাতাবি রয়েছে যে, মন্ডল থেকে ভাবিজি দিয়েছিলেন। এই মেয়েদুটোকে দিলে নিশ্চয়ই খুশি হবে। হলও তাই। ওরা বাতাবি দেখেই মহা উল্লাসে তেল লঙ্কা নিয়ে এসে মাদুরে পা ছড়িয়ে বসে দিব্যি কেটে কুটে মেখে টেখে খেতে থাকল। চোখেমুখে কুসুম কুসুম বয়েসের উল্লাস দেখে আমার আশ মিটছিল না।

গোড়ার দিকে পূজার যে লাজুক ভাবটা ছিল এই সুযোগে সেটা কোথায় ভেসে গেল। করিশমা তো ছিলই এবারে সেও যোগ দিল কথায়। তারাই বলে কয়ে গেল। হাজারো প্রশ্ন তাদের। আমি একটি দুটি যা জানি উত্তর দিই। যা বলি তার চেয়ে শুনতে থাকি ঢের বেশি।

‘জানো তো, আমার গ্রাম অনেক দূরে, পোখরিতে। কর্ণপ্রয়াগ হয়ে মোহনখালের পথে যেতে হয়।’ পূজা বলল। অমনি করিশমা বলে, আরে অনেক দূর আবার কি, আমার তো গোয়ালঘরে যেতেই মনে হয় কত্ত দূর! ইতনা দূর কে পয়দল আতে সময় রোনা আ যাতা হ্যায়!’ বলেই অমনি দুই বোন হেসে গড়িয়ে পড়ে। এদিকে বাতাবি মাখা চলছে। টুকটাক মুখও চলছে।

‘খাও গে?’ আমার দিকে বাড়িয়ে দেয় করিশমা।

‘না না তোরা খা। আমি অত টক খেতে পারি না।’

‘না না মিঠা হ্যায়।’ পূজা বলে।

‘থাক। তোরাই খা।’ বলেই প্রসঙ্গ বদলে জিজ্ঞেস করি, ‘হ্যাঁরে ছেলেমেয়েরা আসবে কখন? ইস্কুল থেকে?’

‘ঠিক জানতে পেরে যাবে তুমি।’ হিহি করে হাসে পূজা। ‘এলেই কি আর চুপ করে থাকবে ভেবেছ? ঠিক এই ছাতে এসে হাজির হবে।’

সাগর গ্রামে ওদের ইস্কুল। তিন কিলোমিটার। সক্কালবেলা ইস্কুলের গাড়ি এসে নিয়ে যায়। বিকেলে সেই গাড়িই ফেরত নিয়ে আসে। দুই ভাইবোনের জন্য একুনে ছশো টাকা মাসে। পূজার বর, নিজের গাড়ি চালায়। অনেক সময় পার্টি পেলে এদিক সেদিক যেতে হয়। তিন চার পাঁচদিন বাদে ঘরে ফেরে।

কয়েক বছর আগে একবার সাগর গ্রামে একরাত থাকতে হয়েছিল। পরদিন মন্ডলে ফিরব বলে রাস্তায় অপেক্ষায় বসে আছি তো আছিই। সেটাও বছরের এমন সময়ই ছিল, যখন গাড়িঘোড়া কম, বাস চলাচল নেইই প্রায়। অনেকটা নীচে বালখিল্য গঙ্গার দিকে তাকিয়ে দেখি একটা মন্দির। প্রশস্ত চত্বর, প্রায় নতুনই বলতে গেলে। সদ্য বুঝি রঙ করা হয়েছে। রঙিন কাগজ ফুল মালা টাঙিয়ে সাজানো। মন্দিরে যাবার রাস্তায় সিমেন্টে বাঁধানো সিঁড়ি। কৌতূহল হয়েছিল, স্থানীয় যার ডেরায় ছিলাম, তিনি বললেন নীচে বাবাজি হ্যায়। যাও মন্দির দেখে এসো, গাড়ি আসতে বহোত দেরি এখনও।

তো গিয়েওছিলাম। শুনশান ঝকঝকে প্রাঙ্গণে বাবাজি সাদা ধুতি আর গেরুয়া পাঞ্জাবি পরে বসেছিলেন মন্দির দালানের মেঝেতে। সাদা দাড়ি বুক পর্যন্ত। লম্বাটে যোদ্ধার মতো মুখের কাঠিন্য। কপালে লাল ও গেরুয়ায় মেশানো তিলক। কোত্থেকে আসছি জিজ্ঞাসার উত্তরে কোলকাতা শুনেই সটান রাজনীতি নিয়ে কথা শুরু করে দিয়েছিলেন হিন্দিভাষী বাবাজি। আমার একটু আশ্চর্য লাগলেও টুকরো-টাকরা উত্তর দিচ্ছিলাম। সেসময় পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদল ঘটে গিয়েছিল, উত্তরাখণ্ডে নয়। বাবাজিকে প্রশ্ন করে জানতে পারি উনি পাহাড়ের লোক নন। এই মন্দিরে ওনাকে পাঠানো হয়েছিল দেখভাল করতে। কে বা কোন সংস্থা তা উনি জানাননি। আমিও জোরাজুরি করিনি। শুধু বলেছিলাম ও আপনাদেরও ট্রান্সফারেবল কাজ নাকি? মনে আছে বাবাজির সঙ্গে অনেকক্ষণ কথাবার্তা সেরে ওপরের রাস্তায় উঠে এসেছিলাম। বাবাজিই বলেছিলেন বসে যাও, আমিও যাব। গাড়ি কখন আসবে আমি জানি। রাস্তায় যে দোকানে এসে চা খেয়েছিলাম, তার সঙ্গে কথাবার্তায় মালুম হয়েছিল মন্দির কেন্দ্র করে জনসংযোগ তৈরিই আসলে বাবাজির কাজ। করিশমার বাড়ি থেকে সাগর গ্রাম দু-তিন কিলোমিটার। বিকেলের দিকে হাঁটতে হাঁটতে সেখানে গিয়ে চাদোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেল ওই বাবাজি এখন আর নীচের মন্দিরে নেই। অন্যত্র চলে গেছেন। যতদূর মনে পড়ে ওটা হনুমানজির মন্দির ছিল।

বীরু, করিশমার বাপ, দুপুরেই চলে এসেছিল। দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে দুজনে জমিয়ে গপ্প করছি। করিশমাও বসে রয়েছে পাশে, দুই বিচ্ছু স্কুল থেকে ফিরে জামাকাপড় বদলে সটান এসে হাজির। সকালে সামান্য জড়তা যদি থেকেও থাকে এখন তা আর নেই। ছেলেটি ছোটো, সে পারলে প্রায় গায়ে মাথায় উঠে পড়ে।

‘তোমাদের নাম কি?’

ভাই নামধাম বলার পর দিদি, ‘দাঁড়াও ভুলে যেতে পারো, লিখে দিচ্ছি,’ বলে গোটা গোটা করে আমার লেখার খাতায় নাম লিখল, ‘অনুষ্কা রানা’। তারপর লিখল ভাইয়ের নাম, আয়াংশ রানা। তারপর পেন থুতনিতে ঠেকিয়ে কী ভেবে ‘দাঁড়াও, বাবা মা চাচা চাচিদের নামও লিখে দিই’ বলে পরপর লিখে গেল লাকপাত সিং রানা, পূজা রানা, করিশমা রানা, রাকেশ রানা। লিখেটিখে কর্তব্য শেষ করে পেনটা আমার হাতে দিতে, তার ভাই আমার দিকে চোখ সরু করে বলল, ‘আপ ইংলিশ জানতে হো?’ বলা বাহুল্য তার দিদি নামগুলো কাগজে ইংরিজি অক্ষরে লিখে দিয়েছিল। এবারে তার ক্লাস থ্রি।

‘জানো তাউজি, এই দুই ছেলেমেয়ের ইস্কুলের চক্করে আমার বাপের বাড়ি যাওয়া প্রায় হয়ই না। ওদিকে আমার বাড়ির খুব কাছেই কার্তিকস্বামী মন্দির। বিয়ের আগে গিয়েছি। তারপর, আর যাওয়াই হয়নি। তুমি গেছ?’ হেসে ঘাড় নাড়াতে, পূজা খুশি হল, ‘পরেরবার যখন যাবে আমাদের বাড়িতেও ঘুরে এসো। একবারটি আমায় জানিয়ে দিও।’

দুপুরে খাবার সময় করিশমার সেই ভাসুর, জন্মান্ধ লোকটি বাড়িতে ফিরল। ফিরেই তার ঘোষণা, ‘বাচ্চারা গোল কোরো না, বাড়িতে মেহমান এসেছে।’ তা শুনে পূজা বলল, ‘তাহলে সকালে অমন গালাগাল করছিলে কেন চিৎকার করে?’ শুনে সে লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল, ‘পোয়াটাক পেটে গিয়েছিল তো তাই।’ কে খাওয়ালো, কেন খাওয়ালো এসব নিয়ে তার কোনো জানার গরজ নেই। তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে পা ঘসে ঘসে হাত নাড়িয়ে বাড়িয়ে সে আবার গ্রাম চক্কর দিতে বেরিয়ে পড়ল। মজা হল, গ্রামের বাড়িতে কোনো অতিথি এলে গোটা গ্রামেরই সে অতিথি। গাড়োয়ালের গ্রামের অধিবাসীরা তাইই মনে করেন। প্রাচীন মানুষরা তো বটেই। তেমনই একজন রোদ পড়ার আগেই লাঠি ঠুকতে ঠুকতে এলেন দেখা করতে। বৃদ্ধা। মুখের চামড়া কুঁচকে গেছে। বয়েস একশো চার! এখনও দিব্যি একা হেঁটে চলে বেড়ান। তবে দিনের বেলা। রাতে দৃষ্টি আর তেমন চলে না। বহু কথাই বললেন, মূলত স্মৃতিচারণ। আমরা চুপ করে বসে পুরোনো দিনের গল্প শুনলাম। যেন আরেক ঠাকুরমার ঝুলির গল্প শুনছি। বৃদ্ধা অনেক কথাই বলেছিলেন, তার মধ্যে দুটি কথা স্পষ্ট আমার মনে রয়ে গেছে। বললেন, ‘জানো, কোনো জায়গায় যেতে হলে হাঁটাই হচ্ছে মানুষের শ্রেষ্ঠ বাহন আর খাবার খেতে হলে গোবর সারে ফলানো ফসল। ব্যস। তোমার রোগভোগ কম হবে। মান্ডুয়ার রুটি, খেতে ফলানো সবজি আর ডাল, গাই ভঁইসো কা দুধ, ব্যস। যতো ভেজাল খাবে তত রোগ বাড়বে।’ বুড়ি হাসে, ‘আমাদের ছোটোবেলায় হাঁটা ছাড়া তো আর গতি ছিল না কোনো! আমরা বেড়াতে গেলে বাবা কিংবা দাদাজির হাত ধরে হেঁটে হেঁটেই যেতাম। এখান থেকে সকাল সকাল বেরিয়ে গোনাতাল গিয়ে নৌকো চড়ে এপার ওপার করেছি কত!’

গোনাতাল মানে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে হিমালয় পাহাড়ের ওপরে বিরেহী নদীর খাতে ধস নেমে তৈরি হওয়া এক মস্ত ঝিল। ঝিল তৈরি হবার পরের বছরেই আংশিকভাবে ভেঙে যাওয়ায় এবং গত শতকের সত্তরের দশকে দ্বিতীয়বার প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে নদীর ওপরে তৈরি হওয়া সেই বাধা চিরতরে সরে যাওয়ার ফলে গোনাতালও নিশ্চিহ্ন হয়। বিরেহী গঙ্গার ওপরে তৈরি হওয়া সেই ঝিলের স্মৃতিচিহ্ন আজও আছে। যার পাড়ে বীরুদের গ্রাম গোনা। করিশমা যে গ্রামের মেয়ে। আজ সেখানে যেতে হলে গংগোল থেকে মোটরগাড়িতে কমবেশি তিরিশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়! সন্ধে নামার আগে বৃদ্ধা লাঠি ঠুকঠুক করতে করতে রাস্তা ধরে বাড়ির দিকে নেমে গেলেন।

রাতে খাবার সময় করিশমার বর আর শাশুড়ির সঙ্গে দেখা হল। বর বাবাজি বাড়ি ফিরেই রান্নাঘরে ঢুকে গরম গরম রুটি বানিয়ে ফেলেছে। বানাতে দেরি, ঝপাঝপ ঘি মাখানো রুটি হাতে হাতে পরিবেশন হয়ে গেল। সঙ্গে গরম রাজমার ডাল আর শাকভাজা।

পরদিন ভোরে ফিরে আসার সময় মুখটা কালো হয়ে রয়েছে করিশমার। ওর শাশুড়ি ছল ছল চোখে এসে বললেন, অতিথি বাড়িতে এসেছে এমন সময়, সে আমাদের অশেষ পুণ্যের ফল। হাতে পার্বনের থালা, তাতে হলুদ কুঙ্কুম, ফুল চাল আর দূর্বা রাখা। সেখান থেকে কপালে টিকা পরানো চলল। তারপর হাতে গুঁজে দিলেন কয়েকটা টাকা। ভঙ্গীটা হুবহু আমার ছোটো পিসিমার মতো, কোনো তফাত নেই। যতবার গ্রাম থেকে শহরে ফিরতাম এমনি ভঙ্গীমায় ছলছল চোখে হাতে টাকা গুঁজে দিতেন আমার ছোটো পিসিমা।

‘জানো তাউজি, আজ গো-পূজন হয়। চানটান করিয়ে গরুদের মালা পরিয়ে শিঙে ঘি মাখিয়ে, খাইয়ে দাইয়ে মুখ মুছিয়ে ধূপ ধুনো দিয়ে পরিষ্কার গোশালায় তোলা হয়। খুব যত্ন করে। আজ আমাদের পবিত্র পরব। কাল ছোটে দিওয়ালি।’

আমি শুধু শুনছিলাম আর জোড় হাত করে দেখছিলাম। বলার কিছু ছিল না। বিদায় নিয়ে গ্রামের অন্য একটা সরু পথ ধরে নীচের পিচ রাস্তায় নেমে এলাম গাড়ি ধরব বলে।

সকালে যথারীতি বাসস্ট্যান্ডে লোকজন গাড়িঘোড়া নেই। পূজার বরকে রাতে বলে রাখা ছিল। সে গাড়িটা বাস স্ট্যান্ড ছাড়িয়ে রাস্তার একপাশে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। হেঁটে সেখানে এসে গাড়িতে ওঠার আগে উল্টোদিকের পাশাপাশি দোকানের দিকে চোখ গেল। দুই দোকানি রাস্তার ওপর জোড় হাত করে নমস্কার করে হাসিমুখে বলে উঠলেন, “আবার আসবেন।”

ভ্রমণ সব লেখা একত্রে

Leave a Reply