FUNবিজ্ঞান- গৌতম ও শম্পার দপ্তর-ক্যালেন্ডারের গল্প-বসন্ত’২৬

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

আজকে তোমাদের ক্যালেন্ডারের গল্প শোনাব। ভাবছ ক্যালেন্ডারের মধ্যে আবার নতুন কী আছেওই প্রতিবছর হয় পয়লা জানুয়ারি নয়তো পয়লা বৈশাখ নতুন ক্যালেন্ডার আসেকোনোটা দেয়ালে টাঙানো হয়কোনোটা টেবিলে বা পকেটে রাখি। সেগুলোও নিশ্চয় ক্যালেন্ডারকিন্তু আমাদের গল্পগুলো তার থেকে পুরোনো। এতই পুরোনো যে অনেক গল্পের শুরু কবে সবাই ভুলে গেছে। প্রাচীন রোমানরা মাসের প্রথম দিনটাকে বলত ক্যালেন্ডসসেই থেকে ক্যালেন্ডার শব্দটা এসেছে। আমাদের দেশে আমরা বলি পঞ্জিকা বা পাঁজি। আয়ারল্যান্ডে এমন কবরের সন্ধান পাওয়া গেছে যার ভিতরে একটি সমাধি আছে। একমাত্র একুশে ডিসেম্বরঅর্থাৎ মকর সংক্রান্তির দিনে সূর্যোদয়ের সময় সেই সমাধি সূর্যের আলোতে কয়েক মিনিটের জন্য সরাসরি আলোকিত হয়। এইরকম স্থাপত্য আমাদের দেশেও আছে। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষের দিকে কেরালাতে তৈরি শ্রীপদ্মনাভস্বামীর মন্দিরে গোপুরমের পাঁচটি স্তরের জানালা ভেদ করে সূর্যাস্তের সময় সূর্যের আলো ঢুকতে পারে মহাবিষুব ও জলবিষুবের দিনেঐ দু’দিন সূর্য বিষুবরেখার উপর লম্বভাবে কিরণ দেয় ইংল্যান্ডের বিখ্যাত স্টোনহেঞ্জও বছরের হিসাব রাখার জন্য তৈরি হয়েছিল। এদের ক্যালেন্ডার বলবে কিনা তা তোমরাই ঠিক করো।

পয়লা জানুয়ারিকি পয়লা বৈশাখকি মহরম মাসের এক তারিখযেদিনই বছরটা শুরু হোক না কেনক্যালেন্ডার বানাতে হলে দুটো জিনিস জানতে হয়। এক হল বছরটা কত লম্বামানে কত দিন পরে আবার নতুন বছর আসবে। আর দু’নম্বরটা হল ঠিক কোন দিনে বছর শুরু হবে। এখন এই দ্বিতীয়টা নানা কারণে আলাদা আলাদাতার কয়েকটা উদাহরণ আমরা দেখব। কিন্তু প্রথমটাতেও যে সবাই একমততা কিন্তু নয়। এক বছরে কত দিনতোমরা বলবে ৩৬৫ দিনআর লিপ ইয়ার হলে ৩৬৬। ঠিককিন্তু এটাই একমাত্র উত্তর নয়। যেমন ইসলামিক ক্যালেন্ডারে এক বছরে ৩৫৪ কিংবা ৩৫৫ দিন। সেটার কারণ আমরা জানিএকটু পরেই সেখানে আসব। কিন্তু মধ্য আমেরিকার মায়া সভ্যতা দু’রকম ক্যালেন্ডার ব্যবহার করততার একটাতে ছিল ২৬০ দিন। মায়া সভ্যতা স্পেনের আক্রমণে ধ্বংস হয়ে গেছেতাই কেন তারা বছরে ২৬০ দিন রেখেছিলতা জানার আর উপায় নেই।

আচ্ছা ৩৬৫ বা ৩৬৬ দিন কোথা থেকে এলোএখন আমরা জানি যে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একপাক ঘুরতে সময় নেয় ৩৬৫ দিনের একটু বেশিঠিকঠাক মাপটায় আমরা পরে আসছি। তার ফলে গ্রীষ্মবর্ষাশীত সব ঠিক এক বছর পরে ঘুরে আসে। নিশ্চয় জানো যে পৃথিবী ঠিক সোজা দাঁড়িয়ে সূর্যের চারদিকে ঘোরে নাএকটু হেলে আছে। কোনো এক সময় সূর্য উত্তর গোলার্ধের উপরে বেশি লম্বভাবে কিরণ দেয়তখন সেখানে গ্রীষ্মকাল। আবার ছ’ মাস পরে সূর্য উত্তর গোলার্ধের উপর তেরচা ভাবে কিরণ দেয়তখন সেখানে শীতকাল। কিন্তু প্রাচীন যুগের মানুষ তো এসব জানত নাতাহলে তারা বছর গুনত কেমন করে?

অনেক রকম পদ্ধতি তারা নিয়েছিল। প্রথম ক্যালেন্ডার তৈরি হয়েছিল মিশরে। ভূগোল বইতে পড়েছ মিশরের সভ্যতা হল নীলনদের দান। মরুভূমির মধ্যে দিয়ে নদী বয়ে চলেছেবছরের একটা নির্দিষ্ট সময় সেখানে বন্যা আসত। কূল ছাপিয়ে নদী তীরকে প্লাবিত করতরেখে যেত জল আর উর্বর পলিমাটি। সেইখানে সারা বছরের জন্য ফসল চাষ হত। কবে নাগাদ বন্যা আসবে আগে জানা গেলে তৈরি থাকা যায়জল নামার সঙ্গে সঙ্গে বীজ বোনা যায়। মিশরিয়রা দেখল যখন সূর্য ওঠার ঠিক আগে পূর্ব আকাশে আকাশের সব থেকে উজ্জ্বল নক্ষত্র লুব্ধকের উদয় হয়তার কয়েকদিনের মধ্যেই নীলনদে বন্যা আসে। তারা গুনে দেখল দু’বার এই ঘটনার মধ্যে মোটামুটি ৩৬৫ দিনের তফাত। তার থেকেই তারা বছর মেপে ফেলল। আসলে হিসেবটা ৩৬৫ দিনের থেকে একটু বেশিমোটামুটি এক দিনের চার ভাগের এক ভাগ। তাহলে প্রতি চারবছরে এক দিন বেশি হয়। মিশরিয়রা সেটা বুঝতে পেরেছিলকিন্তু সেটাকে হিসেবে আনার প্রয়োজন মনে করেনি। সেজন্য প্রতি চার বছরে এক দিনের গোলমাল হত। কবে থেকে তারা বছর গুনতে শুরু করেছিলেতাই নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে তর্ক আছেতার মধ্যে আমরা যাব না। কিন্তু খ্রিস্ট জন্মের তিন হাজার বছর আগে যে তারা এভাবে বছর গুনতে শুরু করেছিল তাই নিয়ে সন্দেহ নেই। প্রতি চার বছরে একদিনের গণ্ডগোল মানে ১৪৬০ বছরে এক বছরের গণ্ডগোল। বুঝতেই পারছ গোনা শুরুর কয়েকশো বছর পরেই লুব্ধকের উদয়ের সঙ্গে বন্যার আর কোনো সম্পর্ক রইল না। তৃতীয় টলেমি যখন ২৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিশরের সম্রাট হলেনতখন তিনি বলেছিলেন যে প্রতি চার বছরে এক দিন যোগ করা হোকএখন আমরা যাকে লিপ ইয়ার বা অধিবর্ষ বলি। কিন্তু টলেমি ছিলেন গ্রিকআলেকজান্ডার মিশর দখল করে নিয়েছিলেনতাঁর মৃত্যুর পরে সেখানে গ্রিকরাই সম্রাট বা ফারাও হয়ে শাসন করতে শুরু করেন। বছরের হিসেব রাখত পুরোহিতরাতারা গ্রিক সম্রাটের আদেশকে গুরুত্ব দেয়নি। সে যাই হোকমিশরিয়রাই প্রথম ৩৬৫ দিনে বছর গুনেছিল।

অন্যভাবেও কিন্তু এই হিসেবটা করা যায়। প্রতিদিন যদি সূর্য একই জায়গায় উদয় হয় বা অস্ত যায় না। একুশে জুন কর্কটসংক্রান্তির দিনে সূর্য সব থেকে উত্তর দিকে উদয় হয়তারপর সে দক্ষিণদিকে চলতে শুরু করে। বাইশে ডিসেম্বর দক্ষিণতম বিন্দুতে যায়আবার তারপর উত্তর দিকে রওনা দেয়। সেই দেখেই বছরের হিসাব করা যায়। ঠিক তেমনি ঠিক দুপুর বেলা একটা খাড়া ভাবে রাখা লাঠির ছায়া কোনদিকে পড়ে আর কত বড় হয়তাই দেখেও বছর মাপা যায়। ধরোবেশ কয়েকবছর ধরে কর্কটক্রান্তি রেখার উপরে কোনদিন দুপুরবেলা লাঠির ছায়া থাকে নাতার থেকে হিসেব করলে দেখা যাবে বছর ৩৬৫ দিনের থেকে ছ’ ঘণ্টা বেশি। ভারতমেসোপটেমিয়াচিনএই সমস্ত দেশে এভাবেই হয়তো বছরের হিসেব করা হয়েছিল। কিন্তু নীল নদের বন্যার সঙ্গে যোগ রেখে লুব্ধক উদয়ের সঙ্গে নতুন বছর শুরু করার হিসাব মিশরিয়রা করেছিলঅন্যদের বছরের শুরুটা সেই দিনে পড়ার কোনো কারণ নেই। যেমন আমাদের যে বঙ্গাব্দতার পয়লা বৈশাখ ছিল মার্চ মাসের একুশ তারিখ অর্থাৎ মহাবিষুবসেই দিন সূর্য বিষুবরেখার উপর লম্বভাবে কিরণ দেয়।

আমি জানি তোমরা এক্ষুনি বলবে যে পয়লা বৈশাখের ছুটি তো ১৫ এপ্রিল পাই। আসলে সূর্য দেখে আর নক্ষত্র দেখে বছরের হিসেব করলে একটু তফাত হয়তার কারণ পৃথিবীর অয়নচলন। এটা একটু জটিলআসলে পৃথিবীর অক্ষ মোটামুটি ছাব্বিশ হাজার বছরে কক্ষতলের সঙ্গে লম্বের সাপেক্ষে একপাক ঘুরে আসে। কিন্তু আমাদের বঙ্গাব্দের পঞ্জিকায় সেটাকে হিসাবে রাখা হয়নি। ফলে ২০২৩ সালে মে মাসের গরমে রবীন্দ্রজয়ন্তী হলআর ১৫০২৩ সালে সোয়েটার গায়ে দিয়ে পঁচিশে বৈশাখ পালন হবে। বঙ্গাব্দ কে কবে শুরু করেছিলেন তাই নিয়ে তর্ক আছেতার মধ্যে না ঢুকে একটা কথা বলতেই পারি। বঙ্গাব্দ শুরুর হিসাবের পরে চোদ্দশো তিরিশ বছরে পয়লা বৈশাখ পিছিয়ে পিছিয়ে পনেরই এপ্রিলে চলে গেছে। এই অয়নচলন বিষয়টা আবিষ্কার করেছিলেন গ্রিক বিজ্ঞানী হিপ্পারকস খ্রিস্ট জন্মের একশো বছর আগে। কিন্তু আমাদের পঞ্জিকায় সেটা আর কেউ ঢোকায় নি। জ্যোতিষীরা জন্মের সময় কোন রাশি ছিল জানতে চায়। রাশি আর কিছু নয়আকাশে সূর্যের গতিপথে বারোটা নক্ষত্রমণ্ডলের কল্পনা করা হয়েছেতাদের বলে রাশি। কিন্তু বছর পিছিয়ে যাওয়ার ফলে রাশির হিসেবেও গণ্ডগোল হয়ে গেছে। অবশ্য রাশি ঠিক থাকলেও জ্যোতিষীদের ভবিষ্যৎবাণী মেলার কোনো কারণ নেইসূর্য আকাশে কোথায় আছে তার সঙ্গে মানুষের ভবিষ্যতের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। জ্যোতিষীরা যা বলে সবই ভুলভালকিন্তু তাদের হিসেবের গোড়াতেও ভুল আছে।

সূর্যকে ধরে বছর হিসেব করার কারণ আছে। কবে ফসল রোপণ করতে হবেশীত শুরুর আগে কবে পশুপালকরা পাহাড় থেকে তাদের ভেড়ার পাল নিয়ে নেমে আসবেনবর্ষার শেষে রাজা কবে যুদ্ধযাত্রা করবেন বা শিকার করতে বেরোবেনএ সমস্তই ঋতুর উপর নির্ভর করত। আগেই বলেছি পৃথিবী ও সূর্যের আপেক্ষিক অবস্থানের জন্যই ঋতু পরিবর্তন হয়। মানুষের জীবনের জন্য এই বছরটাই হল সব থেকে গুরুত্বপূর্ণএকে বলে ক্রান্তীয় বা সৌর বছর। কিন্তু অন্য এক ধরনের বছরও আছে।

আকাশে সব থেকে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক নিশ্চয় সূর্যকিন্তু রাতের আকাশের চাঁদও মানুষের মন কেড়ে নিয়েছিল। চান্দ্র বছরের হিসাব সৌর বছরের থেকে বেশি পুরানোচাঁদকে দেখে ক্যালেন্ডার বানানোর সব থেকে বড় সুবিধা হল চাঁদের কলা। পূর্ণিমার দিনের থালার মতো চাঁদ ক্ষয় পেতে পেতে অমাবস্যাতে অদৃশ্য হয়ে যায়তারপর আবার বাড়তে বাড়তে পূর্ণিমাতে ফিরে আসে। এই বিষয়টা বোঝা খুব সোজা। এক অমাবস্যা থেকে আরেক অমাবস্যা বা এক পূর্ণিমা থেকে আরেক পূর্ণিমার মধ্যে মোটামুটি সাড়ে ঊনত্রিশ দিনের তফাত থাকে। একে বলে এক চান্দ্র মাস। যদি বারোটা চান্দ্র মাসের হিসেব করিতাহলে হয় ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিনের মাঝামাঝি। এই সংখ্যাটা ৩৬৫ দিনের সৌর বছরের কাছাকাছিতাই বারো চান্দ্র মাসে এক বছর গোনা শুরু হয়েছিল। ইসলামিক হিজরি ক্যালেন্ডার চান্দ্র মাস মেনে চলেতাই প্রতিবছর ইদ মহরম ইত্যাদি সৌর বছর বা বঙ্গাব্দের হিসাবে দশ থেকে এগারো দিনে আগে পড়ে। একে বলে চান্দ্র ক্যালেন্ডার। হজরত মহম্মদ যে বছর তাঁর অনুগামীদের সঙ্গে নিয়ে মক্কা থেকে মদিনা গিয়েছিলেনসেই বছর থেকে হিজরি সাল গোনা শুরু হয়।

বছরকে বারো মাসে ভাগ করার ধারণাটা এসেছিল চান্দ্র মাস থেকেকিন্তু পরে অনেক সময় তাকে চাঁদের কলার থেকে আলাদা করা হয়। মিশরিয়রা ধরেছিল তিরিশ দিনে এক মাসতার সঙ্গে চাঁদের কলার কোনো সম্পর্ক নেই। বারো মাসে ৩৬০ দিনশেষ পাঁচ দিনকে তারা কোনো মাসের মধ্যে ফেলে নি। চাঁদের সঙ্গে বঙ্গাব্দের মাসেরও কোনো সম্পর্ক নেই। তাই বঙ্গাব্দ হল বিশুদ্ধ সৌর ক্যালেন্ডার। বুঝতেই পারো চাঁদের কলার সম্পর্ক আছে তিথির সঙ্গে। ইদের মতোই দুর্গাপুজোও এগোতে থাকেকিন্তু তার একটা সীমা আছে। মহালয়া হল এমন অমাবস্যা তিথি যাকে আশ্বিন মাসে পড়তেই হবে। তার পরের পক্ষকে বলা হয় দেবীপক্ষদুর্গাপুজো সেই সময় হয়। এক মহালয়ার পরে আবার তেরো নম্বর অমাবস্যাই মহালয়াকিন্তু এগোতে এগোতে যখন সেই অমাবস্যাটা ভাদ্র মাসে চলে যায়তখন তার পরের অমাবস্যাতে মহালয়া পালন করা হয়। এভাবে চান্দ্র ক্যালেন্ডারকে যদি সৌর ক্যালেন্ডারের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়তখন তাকে বলে চান্দ্রসৌর ক্যালেন্ডার। দুই ক্যালেন্ডারের মধ্যে বছরে দশ বা এগারো দিনের তফাত হয়সেই কারণে ভারতীয় পাঁজিতে তিন বছর অন্তর একটি অতিরিক্ত মাস যোগ করা হয় যাকে বলে মলমাস। অনেক ক্যলেন্ডারেই এই রকম ব্যবস্থা আছে।

এখানে একটা কথা বলে রাখিসাধারণভাবে দিন কত লম্বা তা মাপা হয় এক মধ্যাহ্ন থেকে পরের মধ্যাহ্নের মধ্যের সময় দিয়ে। রাত বারোটা থেকে দিনের শুরু হয়েছে অনেক পরে। বঙ্গাব্দে দিন শুরু হয় সূর্যোদয় থেকে। হিজরি ক্যালেন্ডার চাঁদ মেনে চলেতার দিনের শুরু সূর্যাস্ত থেকে। হিন্দুরা যে তিথি গণনা করেনতা কিন্তু সৌর দিনের মাপের থেকে আলাদাসেটা চান্দ্রমাসের হিসাবেই হয়। দিনেরও অনেক গল্প আছেসে সব পরে কখনো বলা যাবে।

প্রতি চারবছরে একটা অধিবর্ষের নিয়ম চালু করেছিলেন রোমের শাসক জুলিয়াস সিজার। তাঁর পরে রোমের সম্রাট হন অগাস্টাস। জুলিয়াস মিশর দখল করেছিলেনঅগাস্টাস সেখানে অধিবর্ষ চালু করেন। জুলিয়াসের আগে রোমে বছর গোনা হত ৩৫৫ দিনে অর্থাৎ মোটামুটি বারোটি চান্দ্র মাস। দু’বছর অন্তর তার সঙ্গে বাইশ বা তেইশ দিন যোগ করা হতকিন্তু তার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল না। ফলে জুলিয়াস সিজারের সময় দু’মাসের বেশি ফারাক হয়ে যাচ্ছিল। সিজার মিশরের থেকে ৩৬৫ দিনের সৌর বছরটিকে নিলেনআর খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ সালকে বাড়িয়ে করলেন ৪৪৫ দিনের। তিনি মাসের সঙ্গে চাঁদের কোনো সম্পর্ক রাখলেন নাএবং অধিবর্ষের নিয়ম চালু করলেন। একে বলা হয় জুলিয়াসের ক্যালেন্ডার।

কিন্তু বছরের আসল দৈর্ঘ্য হল ৩৬৫.২৪২২ দিনঅধিবর্ষের নিয়মে প্রতি চার বছরে ০.০৩১২ দিন বেশি যোগ হয়ে যাচ্ছিল। ১৫৮২ সালে পোপ দ্বাদশ গ্রেগরির আগ্রহে আবার ক্যালেন্ডার সংশোধন করা হয়। সমস্যাটা ছিল মূলত ধর্মীয়যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার ও পুনরুত্থানের যে উৎসব সেই ইস্টারের তারিখ নিয়ে গণ্ডগোল দেখা দিয়েছিল। তাই গ্রেগরি নিয়ম করলেন শতাব্দীর ক্ষেত্রে অধিবর্ষ তখনই প্রযোজ্য হবে যদি তা চারশো দ্বারা বিভাজ্য হয়। অর্থাৎ ১৯০০ সাল অধিবর্ষ ছিল না২১০০ সালও অধিবর্ষ হবে নাকিন্তু ২০০০ সাল ছিল অধিবর্ষ। এর ফলে সমস্যাটা পুরোপুরি চলে যায় নিতবে তিন হাজার বছর না পেরোলে একদিনের নড়চড় হবে না। জুলিয়াস সিজার ও দ্বাদশ গ্রেগরির যুগের মধ্যে এগারো দিন গণ্ডগোল হয়েছিলতাই তিনি নির্দেশ দেন যে ১৫৮২ সালের ৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবারের পরের দিন হবে ১৫ অক্টোবর শুক্রবার। আস্তে আস্তে সব দেশই এই নিয়ম মেনে নিয়েছেএই ক্যালেন্ডার গ্রেগরির ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত। রাশিয়া ১৯১৭ সালের বিপ্লবের আগে পর্যন্ত জুলিয়াস সিজারের ক্যালেন্ডার মেনে চলতবিপ্লবের পরে গ্রেগরির ক্যালেন্ডার অবলম্বন করে। আগের ক্যালেন্ডারে বিপ্লব হয়েছিল অক্টোবর মাসেপরের হিসাবে সেটা ছিল নভেম্বর মাস। তাই পুরানো বইতে রুশ বিপ্লবকে অক্টোবর বিপ্লব বলা হত।

সেপ্টেম্বরঅক্টোবরনভেম্বরডিসেম্বরএদের মানে হল সপ্তমঅষ্টমনবমও দশম মাস। কিন্তু ক্যালেন্ডারে তো তা নয়। আসলে রোমে বছর শুরু হত পয়লা মার্চ থেকেসেই জন্যই এই নাম। খ্রিস্টজন্মের সাড়ে চারশ বছর আগে রোমে জানুয়ারি থেকে নতুন বছর গোনা শুরু হয়। তখন ছিল চান্দ্র মাসতাতে থাকত আটাশ বা ঊনত্রিশ দিন। তার চারশো বছর পরে জুলিয়াস সিজার সব মাসগুলোকে হয় তিরিশ না হয় একতিরিশ দিনে চালু করেছিলেন। খালি ফেব্রুয়ারি মাসে আছে আটাশ দিনঅধিবর্ষে সেটা হয় ঊনত্রিশ দিন। জুলিয়াস ও অগাস্টাসের শাসনকে স্মরণীয় করে রাখতে বছরের সপ্তম ও অষ্টম মাসের নাম রাখা হয় জুলাই ও আগস্ট। কোথাও কোথাও গল্প শুনবে যে অগাস্টাস নিজের নামের মাস যাতে ছোট না হয় তার জন্য ফেব্রুয়ারি থেকে একদিন নিয়ে নিয়েছিলেন। ওটা গল্পইঅগাস্টাস সম্রাট হওয়ার আগেই অষ্টম মাসে একত্রিশ দিন ছিল।

একটা কথা বলে রাখিপৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব সব সময় সমান নয়আমাদের যখন গ্রীষ্মকালতখন আমরা সূর্যের থেকে একটু বেশি দূরে থাকি। গ্রীষ্মকালের সঙ্গে সূর্য পৃথিবীর দূরত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। বিজ্ঞানী জোহানেস কেপলার দেখিয়েছিলেন যে গ্রহ যখন সূর্যের থেকে বেশি দূরে থাকে তখন তার বেগ কমে যায়। সেই কারণে উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল বেশি লম্বা। এই কারণেই আমাদের বঙ্গাব্দের হিসাবে গ্রীষ্মকালের মাসগুলি অপেক্ষাকৃত বড় রাখা হয়। যেমন ১৪৩০ বঙ্গাব্দে বৈশাখআষাঢ়ভাদ্র ও চৈত্র মাসে আছে একত্রিশ দিন করেজ্যৈষ্ঠ ও শ্রাবণ মাসে বত্রিশ দিনআবার পৌষ ও মাঘ মাসে উনতিরিশ দিন। পৃথিবীর গতির কথা জানা না থাকলেও উদয় বা অস্তের সময় সূর্যের অবস্থান পর্যবেক্ষণ থেকেই প্রাচীন পঞ্জিকাকাররাই এই ধরনের হিসাবে পৌঁছেছিলেন।

আমার কথা শেষ করার সময় এসেছে। আরো অনেক রকম ক্যালেন্ডার আছেতাদের প্রত্যেকের অনেক গল্প আছে। ইচ্ছা করলে তোমরাও বই বা ইন্টারনেট ঘেঁটে তাদের সম্পর্কে জানতে পারো। দুটো খুব ভালো বইয়ের কথা বলিপলাশ বরন পালের লেখা সাল তারিখের ইতিহাস‘ ও প্রদীপ্ত সেনের সনতারিখের পাঁচালি‘; উপরের অনেকগুলো কথাই এদের থেকে নেওয়া। 

এ লেখাটি খুশির হাওয়া ছাপা পত্রিকায় শারদীয় ১৪৩০ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়ের আরো লেখা: দেড়শো বছর আগের এক সূর্যগ্রহণের গল্প, স্বর্ণযুগের কাহিনি, কৃষ্ণগহ্বর, ব্যতিক্রমী বিন্দু ও স্টিফেন হকিং , তেজষ্ক্রিয় ভদ্রমহিলাগণ ১ম পর্ব, তেজষ্ক্রিয় ভদ্রমহিলাগণ ২য় পর্ব হ্যারিয়েট ব্রুক্‌স্‌তেজষ্ক্রিয় ভদ্রমহিলাগণ-(৩) লিজে মাইটনার, স্টেফানি হরোভিৎজ, এডা হিচিন্স ও এলেন গ্লেডিচ

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর 

Leave a Reply