
ভূমিকা
সৌরজগতের বিস্ময়কর মহাজাগতিক দুনিয়ায় এমন কিছু গ্রহ রয়েছে যেগুলো তাদের অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে যুগে যুগে বিজ্ঞানী, দার্শনিক এবং সাধারণ মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় ও দৃষ্টিনন্দন গ্রহ হল শনি। সূর্য থেকে ষষ্ঠ স্থানে অবস্থান করা এই গ্যাস জায়ান্ট গ্রহটি পৃথিবী থেকে খালি চোখে দেখা যায় এবং প্রাচীনকাল থেকেই মানবসভ্যতার আকাশ পর্যবেক্ষণের ইতিহাসে একটি বিশেষ স্থান দখল করে রেখেছে। ভারতীয়, গ্রিক, রোমানসহ বিশ্বের বহু প্রাচীন সংস্কৃতিতে শনিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে পৌরাণিক কাহিনি, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
পৌরাণিক কাহিনি
মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রাচীনকালে গ্রহগুলিকে শুধু আকাশের বস্তু হিসেবে দেখা হত না, বরং তাদের ঘিরে গড়ে উঠেছিল রহস্য, বিশ্বাস আর পৌরাণিক কাহিনি। শনি (Saturn) সেই দৃষ্টান্তের অন্যতম। ভারতীয় পুরাণ থেকে শুরু করে গ্রিক ও রোমান পৌরাণিক কাহিনিতে শনির বিশেষ স্থান আছে।
ভারতীয় জ্যোতিষ ও পুরাণ অনুযায়ী শনি অত্যন্ত শক্তিশালী দেবতা। ইনি সূর্যদেবের পুত্র, আর মাতা ছিলেন ছায়া বা ছায়াদেবী। শনি ন্যায়পরায়ণ, কঠোর ও নিরপেক্ষ বিচারক হিসেবে পরিচিত। মানুষের কর্মফল অনুযায়ী তিনি সুখ-দুঃখ প্রদান করেন। এজন্য তাঁকে ‘ন্যায়দেবতা’ বলা হয়। লোকবিশ্বাসে শনির প্রভাব শুভ হলে সাফল্য আসে, কিন্তু অশুভ প্রভাবে জীবনে কষ্ট নেমে আসে। তাই জ্যোতিষশাস্ত্রে শনির সময়কাল নিয়ে বহু কাহিনি প্রচলিত। এই দেবতাকে আমরা প্রায় সকলেই খুব ভয় পাই। কারও কিছু খারাপ হলে আমরা অনেকে বলি, তার ওপর শনির দৃষ্টি পড়েছে। আমরা কেন এই দেবতাকে এতটা ভয় পাই? এর উত্তর বা ব্যাখ্যা রয়েছে ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনও একদিন শনি যখন ধ্যানমগ্ন ও পূজারত ছিলেন তখন তাঁর পত্নি ঋতুস্নাতা হয়ে সুন্দর বেশভূষা পরিধান করে তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে নিজের মনোভাব প্রকাশ করেন; কিন্তু ধ্যানমগ্ন শনি তাঁর দিকে ফিরেও তাকালেন না এবং তাঁর ঋতুরক্ষাও করলেন না। এতে স্ত্রী ক্রুদ্ধা হয়ে স্বামীকে শাপ দেন—তুমি যার প্রতি দৃষ্টিপাত করবে সে-ই ভস্ম হয়ে যাবে। তাই আমরা এই দেবতাকে এতটাই ভয় পাই যে অনেক সময় ‘শনি’ নামের পরিবর্তে ‘বড়ো ঠাকুর’ বলে থাকি।
গ্রিক পুরাণে শনির প্রতীক দেবতার নাম ক্রোনস (Kronos)। তাই তারা শনিকে বলত ‘ক্রোনসের তারা’ (the star of kronos)। এছাড়াও তারা এই গ্রহটিকে ‘ফাইনন’ (Phainon) নামেও ডাকত। শনির রোমান নাম ‘স্যাটার্নাইন’ (Saturnine)। তিনি ছিলেন কৃষি ও ফসলের দেবতা। তাঁকে উৎসর্গ করে সপ্তাহের শেষ দিনটির নাম রাখা হয়েছিল ‘স্যাটার্নস ডে’। তাঁর নামে ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হত বিখ্যাত উৎসব ‘স্যাটার্নালিয়া’ (Saturnalia)। এই আনন্দ উৎসবে ভোজসহ উপহার বিনিময়ও চলত। সুমেরীয়দের কাছে শনি গ্রহ ‘উবু-ইদিম’ (Ubu-idim) বা ‘সাগ-আস’ (Sag-us) নামে পরিচিত। ব্যাবিলনীয় ও অসিরীয় সভ্যতায় শনি যুদ্ধ ও ধ্বংসের দেবতা হিসাবে ধরা হত। তাঁদের কাছে এই গ্রহটি জেন্না (Genna), নিনিব (Ninib) বা নিন-উরতা (Nin-urta) নামে পরিচিত ছিল। প্রাচীনকালে চিনদেশীয়দের কাছে শনি গ্রহের নাম ছিল ‘টু-ক্সিং’ (Tu-xing)।
শনির মৌলিক বৈশিষ্ট্য
শনি (Saturn) সূর্য থেকে ষষ্ঠ গ্রহ এবং বৃহস্পতি-পরবর্তী সৌরজগতের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রহ। এটি একটি গ্যাস জায়ান্ট, যার গড় ব্যাসার্ধ পৃথিবীর প্রায় ৯ গুণ। পৃথিবীর তুলনায় শনির ঘনত্ব প্রায় আট ভাগের এক ভাগ হলেও এর ভর পৃথিবীর চেয়ে ৯৫ গুণ বেশি। যদিও আকারে শনি প্রায় বৃহস্পতির সমান, তবুও বৃহস্পতির ভরের এক-তৃতীয়াংশেরও কম ভর রয়েছে শনির। শনি সূর্যের চারপাশে ৯.৫৯ AU (১,৪৩৪ মিলিয়ন কিমি) দূরত্বে কক্ষপথে ঘোরে এবং একটি পূর্ণ কক্ষপথ সম্পূর্ণ করতে ২৯.৪৫ বছর (পৃথিবীর হিসেবে) সময় নেয়। এই কারণে একবছর পরে শনিকে আকাশে প্রায় ১২ ডিগ্রি পূর্বদিকে সরে যেতে দেখা যায়। গ্রহটি নিজের অক্ষের ওপর প্রচণ্ড দ্রুতগতিতে ঘোরে। একটি ঘুরপাক খেতে এটি সময় নেয় ১০ ঘণ্টা ৪০ মিনিট। তাই এর বিষুব অঞ্চল মেরু অঞ্চলের তুলনায় ফোলা। শনি গ্রহে একটি দিনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১০ ঘণ্টা ৩৩ মিনিট। তাই সূর্যোদয়ের ৫ ঘণ্টার কিছু পরে এখানে সূর্যাস্ত হয়। গ্রহটির অনেকগুলি চাঁদ থাকায় শনিতে কখনও রাত হয় না।
প্রতি ৩৭৮ দিনে শনি পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে আসে। সে-সময় তাদের মধ্যে দূরত্ব থাকে ১১৯ কোটি ৫৭ লক্ষ ৭২ হাজার ২০ কিলোমিটার, আর গ্রহটি যখন পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থান করে তখন সেই দূরত্ব বেড়ে হয় ১৬৫ কোটি ৮৮ লক্ষ ৫৪ হাজার ৯৮০ কিলোমিটার।
শনির অভ্যন্তরীণ উপাদান
এখনও পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের ধারণা, শনির অভ্যন্তর একটি শিলাময় কেন্দ্র নিয়ে গঠিত। সম্ভবত শনির কেন্দ্র অঞ্চলটি সিলিকেটের যা উচ্চ তাপমাত্রায় রয়েছে। একে ঘিরে রয়েছে একটি গভীর ধাতব হাইড্রোজেন স্তর। এই স্তরটির সৃষ্টির কারণ সম্ভবত গ্রহটির অভ্যন্তরে বিদ্যমান প্রচণ্ড চাপ। এই স্তরটির বাইরের দিকে রয়েছে তরল হাইড্রোজেন ও তরল হিলিয়ামের একটি মধ্যবর্তী স্তর। সবচেয়ে বাইরের স্তরটি গ্যাস দ্বারা গঠিত। গ্রহটির সমগ্র ভরের প্রায় ৭০% জুড়ে রয়েছে হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম। বৃহস্পতির সঙ্গে শনির উপাদানের অনেক মিল থাকলেও শনির ভর ও ঘনত্ব তুলনায় অনেক কম। শনির ওপরের বায়ুমণ্ডলে অ্যামোনিয়া স্ফটিকের উপস্থিতির কারণে গ্রহটির আভা ফ্যাকাশে হলুদ বর্ণের। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ধাতব হাইড্রোজেন স্তরে বিদ্যুৎ প্রবাহ শনির চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে। শনির চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি বৃহস্পতির তুলনায় প্রায় কুড়ি ভাগের এক ভাগ। শনির বায়ুপ্রবাহের গতি ঘণ্টায় প্রায় ১,৮০০ কিলোমিটার (১,১০০ মাইল) পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
বায়ুমণ্ডল
শনির বাইরের বায়ুমণ্ডল আয়তন অনুসারে প্রায় ৯৬.৩% আণবিক হাইড্রোজেন এবং ৩.২৫% হিলিয়াম দ্বারা গঠিত। এছাড়াও এই বায়ুমণ্ডলে রয়েছে অতি ক্ষুদ্র পরিমাণে অ্যামোনিয়া, অ্যাসিটিলিন, ইথেন, প্রোপেন, ফসফিন ও মিথেন। ওপরের স্তরের মেঘ মূলত অ্যামোনিয়া স্ফটিক দ্বারা গঠিত আর নীচের স্তরের মেঘ সম্ভবত অ্যামোনিয়াম হাইড্রোসালফাইড (NH₄SH) অথবা জলীয় বাষ্প দ্বারা তৈরি। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি শনির ওপরের বায়ুমণ্ডলে মিথেনের ফোটোলাইসিস ঘটায়, যার ফলে একাধিক হাইড্রোকার্বন রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়। এর ফলে উৎপন্ন পদার্থসমূহ ঘূর্ণিপ্রবাহ (eddies) ও বিস্তারের মাধ্যমে নীচের দিকে নেমে আসে। এই ফোটো-রসায়নিক চক্র শনির বার্ষিক ঋতুচক্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ক্যাসিনি মহাকাশযান শনির উত্তর অক্ষাংশে কিছু মেঘীয় বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করেছিল, যেগুলোর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘স্ট্রিং অব পার্লস’। এগুলো গভীর স্তরের মেঘে সৃষ্ট মেঘমুক্ত অঞ্চল বা ফাঁকা জায়গা।
মেঘের বেষ্টনী
শনির বায়ুমণ্ডলে বৃহস্পতির মতোই ব্যান্ড বা দাগের প্যাটার্ন দেখা যায়। তবে শনির ব্যান্ডগুলো তুলনামূলকভাবে ফিকে এবং বিষুবরেখার কাছে প্রশস্ত। এই ধরনের মেঘরাশির বেষ্টনী সৃষ্টির কারণ শনির সকল অংশের ঘূর্ণনের বেগ সমান নয়। মেঘের এই বেষ্টনীগুলির মধ্যে যেগুলির রঙ হালকা, তাদের বলা হয় ‘জোনস’ (Zones), আর যেগুলির রঙ অপেক্ষাকৃত গাঢ়, সেগুলিকে বলা হয় ‘বেল্টস’ (Belts)।
শনির মেঘের উপাদানগুলি গভীরতা ও চাপের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। ওপরের মেঘস্তরে, যেখানে তাপমাত্রা প্রায় ১০০–১৬০ K এবং চাপ ০.৫–২ বার, সেখানে মেঘ অ্যামোনিয়া বরফ দ্বারা গঠিত। আর নীচের স্তরে, যেখানে চাপ ১০ থেকে ২০ বার এবং তাপমাত্রা ২৭০–৩৩০ K, সেখানকার মেঘস্তর জলের ফোঁটা ও অ্যামোনিয়ার জলীয় দ্রবণ দ্বারা গঠিত। এই দুটি স্তরের মাঝে রয়েছে জলের বরফের মেঘ এবং একটি অ্যামোনিয়াম হাইড্রোসালফাইড (NH₄SH) বরফ অঞ্চল। এই অঞ্চলের তাপমাত্রা ১৮৫–২৭০ K এবং চাপ প্রায় ২.৫ বার থেকে শুরু করে ৯.৫ বার পর্যন্ত।
বিরাট সাদা দাগ
শনির বায়ুমণ্ডল সাধারণত শান্ত ও মসৃণ। তবে মাঝে মাঝে বৃহস্পতির মতো দীর্ঘস্থায়ী ডিম্বাকৃতি ঝড় ওঠে। ১৯৯০ সালে হাবল স্পেস টেলিস্কোপ শনির বিষুবরেখার কাছে একটি বিশাল সাদা মেঘের সন্ধান দিয়েছিল। ১৯৯০ সালের এই ঝড়কে ‘গ্রেট হোয়াইট স্পট’ বলা হয়। এই ধরনের ঝড় প্রতি শনিগ্রহীয় বছরে অর্থাৎ প্রায় ৩০ পৃথিবী বছর অন্তর উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্মকালীন অয়নান্তের সময় দেখা যায়। এর আগে ১৮৭৬, ১৯০৩, ১৯৩৩ এবং ১৯৬০ সালে গ্রেট হোয়াইট স্পট দেখা গিয়েছিল। সর্বশেষ ঝড়টি দেখা গিয়েছিল ২০১০ সালে। এটি বিশাল আকার ধারণ করেছিল। এছাড়া শনির দক্ষিণ মেরুতে একটি উষ্ণ ধ্রুবীয় ঘূর্ণিঝড় (polar vortex) লক্ষ করা যায়।
ষড়ভুজাকৃতি মেঘ প্যাটার্ন
ভয়েজার মহাকাশযানের তোলা ছবি থেকে বিজ্ঞানীরা শনির উত্তর মেরু ঘূর্ণিঝড়ের চারপাশে প্রায় ৭৮° উত্তর অক্ষাংশে এক স্থায়ী ষড়ভুজাকৃতি তরঙ্গ প্যাটার্ন খুঁজে পেয়েছেন। ষড়ভুজটির প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪,৫০০ কিমি (৯,০০০ মাইল), যা পৃথিবীর ব্যাসের চেয়েও বড়ো। এই পুরো কাঠামোটি প্রতি ১০ ঘণ্টা ৩৯ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে একবার ঘূর্ণন করে। এর উৎপত্তি নিয়ে বহু জল্পনা রয়েছে। অধিকাংশ বিজ্ঞানীর মতে, এটি শনির বায়ুমণ্ডলের একটি স্থায়ী তরঙ্গ প্যাটার্ন।
চৌম্বকমণ্ডল
শনির একটি অন্তর্নিহিত চৌম্বক ক্ষেত্র রয়েছে। এটি একটি সরল ও সমমিত আকৃতির। বিষুবরেখায় এর শক্তি প্রায় ০.২ গস (২০ μT), যা বৃহস্পতির চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রায় কুড়ি ভাগের এক ভাগ। ধারণা করা হয় যে বৃহস্পতির মতো শনির চৌম্বক ক্ষেত্রও এর তরল ধাতব হাইড্রোজেন স্তরের বিদ্যুৎ প্রবাহ (metallic-hydrogen dynamo) দ্বারা উৎপন্ন হয়। এই চৌম্বকমণ্ডল সূর্য থেকে আসা সৌর বায়ুর কণাগুলো প্রতিহত করতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এর ফলে পৃথিবীর মতো শনির চৌম্বকমণ্ডলেও অরোরা তৈরি হয়।
প্রাকৃতিক উপগ্রহ
২০২৫ সালের মার্চ মাসে আবিষ্কৃত ১২৮টি উপগ্রহ ধরে বর্তমানে শনির মোট গ্রহের সংখ্যা ২৭৪টি। এই নব আবিষ্কৃত উপগ্রহগুলি ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন (IAU)-এর দ্বারা স্বীকৃত হয়েছে। এছাড়াও শনির বলয়ের মধ্যে ৪০–৫০০ মিটার ব্যাসের শতাধিক চাঁদের মতো খণ্ড বা মুনলেটস খুঁজে পাওয়া গেছে। যদিও এগুলিকে প্রকৃত উপগ্রহ হিসেবে গণ্য করা হয় না। ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে নাসা বিজ্ঞানীরা ঘোষণা করেন যে শনির ‘এ-বলয়’ এর মধ্যে একটি নতুন চাঁদ গঠনের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর ছবি ২০১৩ সালের ১৫ এপ্রিল ক্যাসিনি তুলেছিল। শনির বৃহত্তম উপগ্রহের নাম ‘টাইটান’ এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম উপগ্রহটি হল ‘রিয়া’।
শনির বলয়

খালি চোখে শনি গ্রহকে অন্য গ্রহদের মতো দেখালেও, দূরবীনে একে দেখায় অপরূপ সুন্দর। এই সৌন্দর্যের প্রধান কারণ গ্রহটির বলয়গুলি (rings)। এই বলয়গুলি নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে প্রায় ৬,৬৩০ কিমি থেকে ১,২০,৭০০ কিমি পর্যন্ত প্রসারিত এবং এর গড় পুরুত্ব মাত্র ২০ মিটার (৬৬ ফুট)। এগুলি মূলত জলীয় বরফ দ্বারা গঠিত হলেও এর সঙ্গে মিশে আছে সামান্য পরিমাণ থোলিন এবং প্রায় ৭% এর মতো অ্যামরফাস কার্বন। বলয়ের কণাগুলির আকার ধূলিকণার মতো ক্ষুদ্র দানা থেকে শুরু করে ১০ মিটার পর্যন্ত বড়ো।
বলয়ের বয়স নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। একদল বিজ্ঞানী মনে করেন, এগুলো প্রাচীন এবং শনির সঙ্গে একসঙ্গে গঠিত। অন্যদিকে, আর একদল বিজ্ঞানী মনে করেন, এগুলো খুবই নবীন, প্রায় ১০০ মিলিয়ন বছর আগে গঠিত হয়েছে। সম্ভবত ‘ক্রাইসালিস’ নামের এক ধ্বংসপ্রাপ্ত উপগ্রহের অবশিষ্টাংশ এগুলি। শনির প্রধান বলয়গুলিকে সাতটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে— এ-বলয়, বি-বলয়, সি-বলয়, ডি-বলয়, ই-বলয়, এফ-বলয় এবং জি-বলয়। শনির প্রধান বলয়গুলির বাইরে, প্রায় ১.২ কোটি কিমি (৭.৫ মিলিয়ন মাইল) দূরে একটি বিরল বলয় আছে। একে ফিবি-বলয় বলা হয়।
উপসংহার
শনি গ্রহ আকাশের বিস্ময় হলেও মানবমনে তা হয়ে উঠেছে ভয়, ভক্তি ও আশ্রয়ের প্রতীক। কখনও তিনি কঠোর ন্যায়বিচারক, কখনও সময়ের প্রতীক ক্রোনস, আবার কখনও কৃষির দেবতা স্যাটার্ন। আকাশের এই দূরবর্তী গ্রহ মানবসমাজের কল্পনা, পৌরাণিক চেতনা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে, আজও তার প্রভাব কুসংস্কার, জ্যোতিষ ও আচার-অনুষ্ঠানে স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
তথ্যসূত্র: https://en.wikipedia.org › wiki › Saturn https://www.britannica.com › Science › Astronomy https://en.wikipedia.org › wiki › Rings_of_Saturn https://www.space.com › ... › Solar System › Saturn https://kids.nationalgeographic.com › space › article
এই লেখকের অন্যান্য বিজ্ঞানবিষয়ক প্রবন্ধ
ধ্রুবতারা ধ্রুব নয়, মহাকাশে আমরা কোথায়, বিস্ময় ভরা ‘আদ্রা’ নক্ষত্র, সৌড়ঝড়ের আঘাতে টালমাটাল পৃথিবী, কৃষ্ণগহ্বর, পিঙ্গল বামন, সূর্য, সৌরকলঙ্ক, মহাকাশের ভূতুড়ে আলো, কোয়াসার, মহাকাশের অচেনা বস্তু-পালসার, মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ (অশ্বিনী থেকে রেবতী) – (১), মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-২, মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-৩, মহাবিশ্বে মহাকাশে-আকাশগঙ্গার ভবিষ্যৎ, মহাবিশ্বে মহাকাশে-মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-৪, মহাবিশ্বে মহাকাশে-মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-৫,চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-৬, অগস্ত্য-বাতাপি উপাখ্যান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান, মহাবিশ্ব সৃষ্টির গোড়ার কথা, মহাবিশ্বে মহাকাশে- নক্ষত্র সৃষ্টির রহস্য, মহাবিশ্বে মহাকাশে-নক্ষত্রের শেষ দিন, মহাবিশ্বে মহাকাশে- চাঁদের ভবিষ্যৎ, মহাবিশ্বে মহাকাশে তারাজগতের সৃষ্টি রহস্য, মহাবিশ্বে মহাকাশে তারাজগতের প্রকারভেদ, মহাবিশ্বে মহাকাশে – বিচিত্র গ্যালাক্সি, ১১-এর জালে নিল আর্মস্ট্রং, মহাবিশ্বে মহাকাশে-গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে-বুধ গ্রহ, মহাবিশ্বে মহাকাশে-গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে-শুক্র গ্রহ, মহবিশ্বে মহাকাশে-আমাদের বাসভূমি পৃথিবী, মহবিশ্বে মহাকাশে-চাঁদ, মঙ্গলগ্রহ, ফোবস, ইউরোপা, গ্যানিমিড, ক্যালিস্টো
জয়ঢাক প্রকাশন থেকে এই লেখকের লেখা মহাবিশ্বে মহাকাশে বইটি কিনতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন
বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে