বনের ডায়েরি-পাখি দেখা- ইউরেশীয় গুলিন্দা- অলোক গাঙ্গুলী- বসন্ত ’২৬

আগের পর্ব ধনেশ, মাছরাঙা, মুনিয়া, কাজল পাখি , দোয়েল-কোকিল-ময়নাবুলবুল, বকপাখি, মোনাল দেখার গল্প,পাঁচ বউয়ের কাহিনি, ঘুঘুর বাসা, টুনটুনি,বাঁশপাতি, মোহনচূড়া , হাট্টিমাটিমটিম থেকে হটিটি, রামগাংড়া, ডাহুক কেন ডাকে, বাদামি কোকিল, পাপিয়া, পাতি জলমুরগি, প্যাঁচা, পানডুবি, নীলকণ্ঠ, কাস্তেচরা, চাতক, কালো মথুরা, কস্তুরা, চটক, কমলাকণ্ঠি চুটকি, হিমালি ঝোপশ্যামা, বাদামি ডানার কোকিল

ইউরেশীয় গুলিন্দা (Eurasian Curlew, বৈজ্ঞানিক নাম: Numenius arquata) হল একধরনের বড়ো জলচর পাখি, যা লম্বা বাঁকানো ঠোঁট এবং সাদা পিঠের জন্য পরিচিত। এটি সাধারণত ইউরোপ থেকে সাইবেরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে পাওয়া যায় এবং শীতকালে দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকায় পরিযায়ী হয়। বাংলাদেশে ও পশ্চিমবঙ্গে এটি ‘বড়ো গুলিন্দা’ বা ‘চোপ্পা’ নামেও পরিচিত এবং এটি বিপন্নপ্রায় একটি প্রজাতি।

বৈশিষ্ট্য

আকার ও গঠন: এটি একটি বড়ো আকারের পাখি, যার একটি দীর্ঘ, নীচের দিকে বাঁকানো ঠোঁট থাকে।

রঙ: এদের পিঠ সাদা এবং শরীরের অন্যান্য অংশ হালকা বাদামি ও সাদা রঙের হয়।

লিঙ্গ পার্থক্য: পুরুষ ও স্ত্রী দেখতে একইরকম হলেও, প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী পাখির ঠোঁট পুরুষদের চেয়ে বেশি লম্বা হয়।

আবাসস্থল ও প্রবাস:

আবাস: ইউরোপের ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ থেকে সাইবেরিয়া পর্যন্ত এদের মূল আবাসস্থল।

শীতকালীন প্রবাস : শীতকালে এরা আফ্রিকা, দক্ষিণ ইউরোপ এবং দক্ষিণ এশিয়াতে পরিযায়ী হয়।

স্থানীয় নাম: বাংলা ভাষায় একে ইউরেশীয় গুলিন্দা, বড়ো গুলিন্দা, চোপ্পা বা সাদা কাষ্ঠচূড়া বলা হয়।

সংরক্ষণ অবস্থা:

ইউরেশীয় গুলিন্দা বর্তমানে আই.ইউ.সি.এন (I.U.C.N. – International Union for Conservation of Nature) দ্বারা ঘোষিত ‘বিপন্নপ্রায়’ (Near-Threatened) তালিকায় রয়েছে এবং ভবিষ্যতে বিপন্ন প্রজাতিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি আছে।

বড়ো গুলিন্দা উপকূলীয় এলাকা, কাদা-চর, বেলাভূমি, হ্রদ, চারণভূমি, বাদা বন, জলাভূমি, ধানক্ষেত ইত্যাদিতে একাকী কিংবা ছোটো বা মাঝারি ছোটো দলে বিচরণ করে। কাদামাটিতে ধীরে ধীরে হেঁটে লম্বা চঞ্চুর সাহায্যে কাদার নীচের নরম স্তর থেকে কেঁচো, চিংড়ি, শামুক-ঝিনুক ইত্যাদি খুঁজে খায়। প্রজনন মৌসুমে ফড়িং, উভচর প্রাণী এবং ইঁদুরও খেতে পারে। আকাশে ওড়ার সময় ‘কারলু-উ…’ শব্দে ও প্রজননকালে ‘উক-উক-উক’ শব্দে ডাকে।

মার্চ থেকে জুলাই প্রজননকাল। এ-সময় মূল আবাস এলাকার উন্মুক্ত মাটি বা ঘাসের মধ্যে সামান্য একটু গর্তের মতো করে তাতে পুরুষ পাখি মাটির ঢেলা ইত্যাদি দেয়। আর স্ত্রী সরু ঘাস ও ঝরা পালক দিয়ে বাসার গদি বানায়। ডিম পাড়ে তিন থেকে ছয়টি, রঙ গাঢ় দাগছিট-সহ বাদামি-জলপাই। ডিম ফোটে ২৭ থেকে ২৯ দিনে। স্ত্রী-পুরুষ দুজনে মিলেমিশে ডিমে তা দেয়। ছানারা উড়তে শিখে ৩২ থেকে ৩৮ দিনে। আয়ুষ্কাল প্রায় পাঁচ বছর।

এরকমই দেখতে আরও একটি পাখি দেখা যায়, নাম ছোটো অথবা নাটা গুলিন্দা। ইংরেজিতে ইউরেশীয় উইমব্রেল (Eurasian Whimbrel, বৈজ্ঞানিক নাম: Numenius phaeopus) নামে পরিচিত। এটি মূলত লম্বা ঠোঁটযুক্ত একধরনের সামুদ্রিক বা উপকূলীয় পাখি, যা সুন্দরবন ও ভারতের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চলে দেখা যায় এবং পোকামাকড় ও ছোটো প্রাণী খায়।

বৈশিষ্ট্য ও পরিচিতি:

পরিচয়: এটি Curlew প্রজাতির একটি ছোটো সদস্য, যা তার বাঁকানো লম্বা ঠোঁটের জন্য পরিচিত।

আবাসস্থল: প্রধানত উপকূলীয় অঞ্চল এবং জলাভূমিতে এদের দেখা মেলে, বিশেষত সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ মাসের মধ্যে।

খাদ্য: এরা মূলত পোকামাকড়, ছোটো কাঁকড়া এবং অন্যান্য অমেরুদণ্ডী প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে।

অন্যান্য নাম: এদেরকে ‘নাটা গুচরন্দা’ নামেও ডাকা হয়।

সংক্ষেপে, ‘নাটা গুলিন্দা’ বলতে ইউরেশীয় উইমব্রেল (Eurasian Whimbrel) পাখিটিকে বোঝানো হয়, যা বাংলার একটি পরিচিত সামুদ্রিক পাখি।

এই দুই গুলিন্দাই একই গোত্রের পাখি, তবে আলাদা প্রজাতির— আকারে কেবল বড়ো ও ছোটো। পরের গুলিন্দার সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার সৌভাগ্য এখনও হয়ে ওঠেনি। এখন পর্যন্ত কেবল বড়ো পাখিটির দেখা পেয়েছি দু-জায়গায়। প্রথমবার আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের হ্যাভলক দ্বীপে। উপকূল থেকে পাখিটি বহুদূরে ছিল। কলকাতা থেকে উড়ানে পোর্ট ব্লেয়ার যাওয়ার জন্য সঙ্গে করে ভারী বড়ো লেন্সটি আর নেওয়া হয়নি ওজন কম রাখার জন্য। যখন পাখিটি দেখতে পেলাম, ভীষণ হতাশ হয়েছিলাম আর লেন্সটি সঙ্গে করে না নেওয়ার জন্য নিজেকেই দোষারোপ করছিলাম। কিন্তু কথায় বলে, ‘গতস্য শোচনা নাস্তি’, অর্থাৎ যা হয়ে গেছে তা নিয়ে আপসোস করে লাভ নেই। ইংরেজি প্রবাদ বলে, No use crying over spilled milk। আমারও সেই অবস্থা। অন্য কিছু অপ্রাসঙ্গিক সঙ্গে না নিয়ে বরং লেন্সটা যদি নিয়ে আসতাম, তাহলে আজ আর আপসোস থাকত না। পরবর্তীকালে আবার একই ভুল করেছিলাম রাজস্থানের মাউন্ট আবুতে। সেখানে একটি ভালুক ও সঙ্গে দুটি ছানার ছবি তুলতে অক্ষম হলাম লেন্স সঙ্গে না নিয়ে যাওয়ার জন্য। প্রথম কাণ্ডটি ঘটেছিল ২০২০ সালে জানুয়ারি মাসে আর দ্বিতীয়টি ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে। তারপর থেকে যথেষ্ট সাবধান হয়েছি। এবার থেকে সঙ্গে রাখি অন্য একটি লেন্স যা সর্বক্ষেত্রেই কাজে লাগে। ওজনও গড়পড়তা, এমনকি বিমানে ভ্রমণ করলেও ওজন নিয়ে কোনও সমস্যা হবে না।

উপকূলীয় এলাকা বলতে দু-বার এর মধ্যে মুম্বইয়ে আরব সাগরের ধারে ঘুরে এলাম, তবে তেমন কিছু চোখে পড়ল না। একমাত্র পশ্চিমি ঘাটে মালসেজ নামে পাহাড়ি গিরিপথে এক হ্রদে কিছু মরাল পাখি (ফ্লেমিঙ্গো) দেখা পেলাম। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে আরার পাড়ি দিলাম আমাদের রাজ্যের উপকূলে— মন্দারমণি ও তাজপুরে। তিন রাত কাটিয়েছিলাম সেখানে। প্রথম দিন দেখা পেলাম ছোটো নথজিরিয়া পাখির (লিট্টিল রিংগড প্লোভার – Little Ringed Plover)। বড়ো গুলিন্দার কথা তখন মাথায় ছিল না। ভুলেই গিয়েছিলাম যে এটা শীতকাল আর পরিযায়ী পাখিদের এই সময় উপকূলে দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। পরের দিন খুব সকালে একটা টোটো ভাড়া করে সবাই মিলে বেরিয়ে পড়লাম সমুদ্রের পার ধরে। কিছু নৌকা পাড়ে উলটে রাখা আছে আর তার ওপরে বসে রয়েছে বেশ কিছু সাদা বুক মাছরাঙা। টোটোচালক জানাল, সামনেই মোহনা আর তার ও-পারে তাজপুর। এখনও পর্যন্ত মন্দারমণি ও তাজপুর যে প্রাণীর জন্য বিখ্যাত, সেটার দেখা পাইনি— লাল কাঁকড়া। টোটোচালকের কাছে জানতে চাইলাম, লাল কাঁকড়ার দেখা পাওয়া যাবে কি না। সে জানাল যে তাজপুরে দেখা যায়, কিন্তু মন্দারমণিতে অনেক কমে গেছে। কিছুটা মোহনার দিকে গেলে দেখা যেতে পারে। কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসাবে আমার মনে হয়েছে, আগের দিন বিকেলে এখানে সমুদের ধার দিয়ে বড়ো এস.ইউ.ভি ও এ.টি.ভি [SUV (Sports Utility Vehicle) & ATV (All Terrain Vehicle)] গাড়ি চলতে দেখেছি। সমুদের ঢেউয়ের সঙ্গে চলে আসা অনেক সামুদ্রিক প্রাণী এই গাড়ি চাকার তলায় পড়ে পিষ্ট হয়। এইসব উপকূলস্থল হল দ্বিমুখী তলোয়ারের মতো, অর্থাৎ যার ভালোমন্দ দুই দিকই আছে। ভালো দিক হল, পর্যটক সমাগমে এখানকার মানুষের রুজি-রোজগারের পথ খুলেছে, আর মন্দ দিক হল, জীববৈচিত্র্য বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা যেমন মন্দারমণি থেকে লাল কাঁকড়া প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

মোহনার কাছে পৌঁছে কিছু লাল কাঁকড়ার দেখা পেলাম আর সঙ্গে পেলাম এক বিপন্নপ্রায় পরিযায়ী পাখি— ইউরেশীয় গুলিন্দা অথবা বড়ো গুলিন্দা। এত কাছ থেকে দেখতে পাওয়ার এই প্রথম সুযোগ এল। গুলিন্দা শোনা গেছে একাই বিচরণ করতে বেশি ভালোবাসে। এই গুলিন্দা জলের মধ্যেই বিচরণ করছিল। তার লম্বা ঠোঁট জলের মধ্যে ডুবিয়ে শিকার ধরছিল। অদ্ভুত সুন্দর দেখতে এই পাখি আর চমৎকার তার বাঁকানো ঠোঁটের আকার। আমরা সকলেই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলাম এই পাখিটির দিকে আর ভাবছিলাম বিপন্নপ্রায় এই পাখিটির করুণ দশা। [ছবি-১] আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এই পাখি আর দেখতে পাবে কি না সন্দেহ আছে। ভাবতে অবাক লাগে যে পাখি দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে সুদূর ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ আর রাশিয়ার ইউরাল ও ভোলগা নদীর তীর থেকে পারস্য উপসাগর হয়ে উড়ে এখানে চলে আসে। [ছবি-২, ছবি-৩] ওই দুটি দেশ গুলিন্দার প্রজনন স্থানও। এই পরিযায়ী পাখি যেন আমাদের দেশে বেড়াতে এসে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে লক্ষ রাখা আমাদের কর্তব্য। মনে রাখতে হবে, আমাদের সকলকে দায়িত্বশীল পর্যটক হতে হবে। যে-কোনো স্থানে বেড়াতে গেলে কেবলমাত্র পদচিহ্ন ছাড়া আর কিছুই ফেলে আসব না, আর সঙ্গে নিয়ে আসব মধুর স্মৃতি, যেমন মন্দারমণি আর তাজপুরের বালিতে জলের তলায় চাপা পড়ে ছিল আমাদের পদচিহ্ন আর আমাদের সঙ্গে এল ইউরেশীয় গুলিন্দা ও সমুদ্রতীর ভরতি লাল কাঁকড়ার ঝাঁক।

বনের ডায়েরি সব লেখা একত্রে

Leave a Reply