ধারাবাহিক অভিযান-খোটানের বালুসমাধিতে(এপিসোড ১৮)-অরেলস্টাইন-অনু-অরিন্দম দেবনাথ-বসন্ত ২৬

জয়ঢাকের অভিযান লাইব্রেরি- ভারেস্ট-এরিক শিপটন(অনু-বাসব চট্টোপাধ্যায়)  অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ(অনু তাপস মৌলিক) কন-টিকি অভিযান- থর হেয়ারডাল (অনু-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়)

এই ধারাবাহিকের আগের পর্ব- পর্ব ১, পর্ব ২ পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব ৫ পর্ব ৬, পর্ব ৭, পর্ব ৮ পর্ব৯, পর্ব ১০, পর্ব ১১ পর্ব ১২, পর্ব ১৩, পর্ব ১৪, পর্ব ১৫, পর্ব ১৬

obhijjaankhotancover

স্যার অরেল স্টাইন ছিলেন একজন ব্রিটিশ পুরাতাত্ত্বিক। ১৮৬২ সালের ২৬ নভেম্বর তাঁর জন্ম হাঙ্গেরিতে। তিনি ব্রিটিশ সময়কালে নানা ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় নিযুক্ত ছিলেন। তিনি মধ্য এশিয়ায় একাধিক প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানে নেতৃত্ব দেন। তিনি শুধু একজন প্রত্নতাত্ত্বিকই ছিলেন না, ছিলেন একজন নৃতাত্ত্বিক, ভূগোলবিদ, ভাষাবিদ এবং জরিপকারী। ডানহুয়াং গুহা থেকে উদ্ধারকরা পুথি এবং পাণ্ডুলিপির সংগ্রহ মধ্য এশিয়ার ইতিহাস এবং বৌদ্ধধর্মের শিল্প ও সাহিত্যের অধ্যয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তাঁর অভিযান এবং আবিষ্কারের উপর বেশ কিছু বই লিখেছিলেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রাচীন খোটান, সেরিন্ডিয়া এবং আভ্যন্তরীণ এশিয়া বিষয়ক বই। সংস্কৃত থেকে রাজতরঙ্গিণীর ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন তিনি। চিরকুমার অরেল স্টাইন ১৯৪৩ সালের ২৬ অক্টোবর কাবুলে দেহত্যাগ করেছিলেন। এই নিবন্ধে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়ে চলেছে তাঁর তাকলামাকান মরুভূমির প্রত্নতাত্ত্বিক খোটান অভিযানের কথা।

শেষ পর্ব

জালিয়াত আখুন

খোটানে ফিরে আটদিন দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছিল চরম ব্যস্ততা আর নানা ঘটনার মধ্যে দিয়ে। উঠেছিলাম খোটানের নর-বাগের নিয়াজ হাকিম বেগের বাগান বাড়িতে। পাঁচ বছর আগে ডঃ হেডিনও মরু অভিযান সেরে এই বাগান বাড়িতেই কয়েকদিন বিশ্রাম নিয়েছিলেন। মরুর হলুদ-ধূসর বালিটিলার পর চোখকে আরাম দেওয়া বাগানে ফুটে থাকা ফুল আর গাছের কচি সবুজ পাতা চিনা তুর্কিস্তানে বসে লাহোরের মোঘল গার্ডেনের কথা মনে পড়িয়ে দিচ্ছিল। মরুভূমির প্রবল ঠাণ্ডায় দীর্ঘদিন থাকার ফলে ব্রংকাইটিসের মতো হয়েছিল। কাশতে কাশতে নাজেহাল হয়ে যাচ্ছিলাম। তাই হাওয়া এড়াতে দরজা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে থাকতে হচ্ছিল দিনের অনেকটা সময়। বিশ্রাম খুব বেশী মাত্রায় দরকার হলেও পুরোপুরি শুয়ে থাকা সম্ভব হচ্ছিল না। মরুভূমির নানা ধ্বংসস্তূপ থেকে সংগ্রহ করে আনা হাজারো নমুনা সুদূর লন্ডনে পাঠানোর জন্য  নতুন করে প্যাক করাতে হচ্ছিল। এছাড়াও এতবড় অভিযান শেষের পর অসংখ্য রিপোর্ট লেখা পাওনা-গণ্ডা মেটানোর কাজ তো ছিলই।

আমার ভাগ্য ভালো যে অসুস্থতা সত্ত্বেও খোটানে পৌঁছনোর পরের দিন আম্বান প্যান ডারিনের সঙ্গে ওনার ইয়ামেনে দেখা করতে যেতে পেরেছিলাম। উনি আমাকে পুরনো বন্ধু হিসেবে স্বাগত জানিয়ে অভিযানের কথা জানতে চেয়েছিলেন একজন পণ্ডিত সহকর্মীর মতো। সানন্দে সংক্ষেপে পুরো অভিযান সম্পর্কে জানিয়েছিলাম বিচক্ষণ পন্ডিত মানুষটিকে।  

পরদিন আম্বান এসেছিলেন আমার অস্থায়ী ডেরায় ধ্বংসস্তূপ থেকে খনন করে পাওয়া প্রত্নসামগ্রী দেখবার জন্য। ওনার কৌতূহল মেটাতে কিছু নমুনা আমি সাজিয়েই রেখেছিলাম। প্যান ডারিন শুধু একজন পণ্ডিত মানুষই নন, চিনা ইতিহাস সম্পর্কে নিঃসন্দেহে ওনার জ্ঞান অগাধ। যে সব প্রাচীন নথি ও ভাস্কর্য আবিষ্কৃত হয়েছিল উনি ধরে ধরে তার বয়সকাল, গুরুত্ব ও চরিত্র নিয়ে আলোচনা  শুরু করেছিলেন। ইতিহাস সম্পর্কে প্রবল উৎসাহ ও পড়াশুনা না থাকলে এই ধরণের আলাপচারিতা সম্ভব নয়। আমি যখন প্রোফেসার বিহলারের “ইন্ডিয়ান প্যালিওগ্রাফি” বইয়ের ছবির কথা বলে পাণ্ডুলিপি থেকে কিভাবে তার সময়কাল নির্ধারণ করা সম্ভব  বলতে শুরু করি তখন প্যান ডারিন চিনা অক্ষর পরিবর্তনের নানা ধাপ লিখে বর্ননা করেন। ওনার সঙ্গে আলোচনা করার সময় দোভাষীর উপস্থিতি অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিল, মনেই হয়নি একজন উচ্চপদস্থ চিনা আধিকারিকের সঙ্গে কথোপকথন চলছে। মনে হয়েছিল যেন কোন সহকর্মীর সঙ্গে কাজ করে চলেছি।

প্যান ডারিনের শুধু একটা কথাতে আমি ভীষণ বিব্রত হয়ে পড়েছিলাম। জানতে চেয়েছিলেন তাকলামাকান মরুভূমির বালির নীচ থেকে উদ্ধার করা সমস্ত নথি আর ভাস্কর্যের নমুনা আমি পশ্চিমে নিয়ে গেলে উনি উরুমচির ফু-তাই বা গভর্নর-জেনারেলকে এই অভিযানের ফলাফল সম্পর্কে কি দেখাবেন বা বলবেন! আমি জানতাম প্যান ডারিন ব্যক্তিগত ভাবে উৎসাহ নিয়ে সমস্ত অনুমতি ও সহযোগিতা না পাইয়ে দিলে ভয়ংকর মরুর বুকে আমার বৈজ্ঞানিক অভিযান চালান সম্ভব হত না। আমি ওনাকে বলেছিলাম লন্ডনে পৌঁছে যতটা বেশী পরিমাণে সম্ভব নথি, ভাস্কর্যের ছবি এবং পরবর্তীকালে আমার বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ‘প্রাথমিক রিপোর্টের’ কপিও পাঠিয়ে দেব যা উনি ফু-তাইকে দেখাতে পারবেন। “কিন্তু এগুলো তো প্রতিলিপি হবে!” এই উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেও উনি আমার সীমাবদ্ধতা বুঝতে পেরে চুপ করে গিয়েছিলেন।      

খোটানে আমার শেষ দিনগুলো কেটেছিল প্রাচীন প্রত্নসামগ্রী নিয়ে জালিয়াতির অনুসন্ধানে। এই অনুসন্ধানের সাফল্য আমাকে শুধু আনন্দই দেয়নি অনেক পণ্ডিত সহকর্মীও হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন। জালিয়াতি ধরে ফেলায় খোটান অঞ্চল থেকে কলকাতা সহ লন্ডন, প্যারিস আর সেন্ট পিটার্সবার্গের অনেক সংগ্রহশালা ও প্রত্নতত্ত্ব সংগ্রাহকের ঘরে ঠাঁই পাওয়া অজানা অক্ষরে ও ভাষায় লেখা পাণ্ডুলিপি আর ব্লক-প্রিন্ট নিয়ে বিভ্রম কেটে গিয়েছিল।  আমার অভিযানের আগে এই অঞ্চল থেকে “উদ্ধার” করা প্রত্নতত্ত্বের সত্যাসত্য নিয়ে মনে সন্দেহ ছিল। এই পাণ্ডুলিপিগুলোর মধ্যে খরোষ্ঠী, ভারতীয় ব্রাহ্মী, মধ্য-এশীয় ব্রাহ্মী, তিব্বতী, চীনা অক্ষর ও ভাষা দেখলেও অজানা অক্ষর বা ভাষা শনাক্ত করতে পারিনি। আমার অভিযান থেকে যে অবস্থায় ও স্থান থেকে নানা পান্ডুলিপি ও লেখার উপকরণ উদ্ধার হয়েছিল তার সঙ্গে বিক্রীত ‘পাণ্ডুলিপির’ উদ্ধারীকৃত স্থানের গল্পের কোন মিল ছিল না।   

আমার স্থির বিশ্বাস ছিল ১৮৯৫-৯৮ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে কেনা এই জাল পাণ্ডুলিপিগুলো সরবরাহের পেছনে সরাসরি হাত ছিল খোটানের ‘ধন-সন্ধানী’ ব্যবসায়ী ইসলাম আখুনের। আমি প্রথমবার খোটানে পৌঁছতেই সে গা ঢাকা দিয়েছিল। কিছুদিন আগেই ক্যাপ্টেন ডেইসি ও মিস্টার ম্যাকার্টনির আনা অন্য প্রতারণার অভিযোগের ভিত্তিতে খোটান কর্তৃপক্ষ ইসলাম আখুনকে শাস্তি দিয়েছিল। তাই আমার সঙ্গে কোন ছলচাতুরী করার সাহস ও দেখায়নি। কোন সন্দেহ নেই ও লুকিয়ে থাকার ফলে বিশাল মরুর মাঝে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষে অভিযান চালাতে আমাকে কোন অসুবিধার সম্মুখীন বা ভুল পথে চালিত হতে হয়নি। ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া বিপুল পাণ্ডুলিপির নমুনা সামনে রেখে আমি চলে যাবার আগে একবার এই ‘অজানা অক্ষর ও ভাষা’র বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে ইসলাম আখুনের মুখোমুখি হতে চাইছিলাম – কারন ওর হাত দিয়েই ইউরোপ সহ নানা জায়গায় শিক্ষিত ও প্রত্নতত্বে উৎসাহী ব্যক্তিদের মধ্যে জাল পাণ্ডুলিপি ছড়িয়েছে।   

আমার মনের কথা আম্বান প্যান ডারিনকে বলতেই উনি ইসলাম আখুনকে ধরে আনার হুকুম দিয়েছিলেন। ২৫ এপ্রিল সকালে ইসলাম আখুনকে আমার সামনে হাজির করা হয়েছিল। চিরাতে সে ‘হাকিম’ হয়ে পুরো শীতকালটা বসে ছিল। ও আসা করেনি যে ওকে ধরা হবে। কিছুদিন আগে আমি চিরাতে গেলেও খোটান ছাড়ার পর থেকে ওর সম্পর্কে কোথাও কোন কিছু জানতে চাইনি ইচ্ছে করে, যাতে ও মনে করে আমি ওর সম্পর্কে উৎসাহী নই। যে বেগ ওকে পাকড়াও করেছিল সে ওর চিরার ডেরা এবং খোটানের বাড়ি থেকে কিছু কাগজের বান্ডিল বাজেয়াপ্ত করে এনেছিল। এই কাগজগুলো ছিল কৃত্রিমভাবে নতুন কাগজকে পুরনো রূপ দেওয়া ব্লক প্রিন্ট, যার মধ্যে ‘অজানা-অক্ষর’ ছাপা ছিল এবং এগুলো কাশগড় থেকে বিক্রি হওয়া পাণ্ডুলিপি বা ব্লকপ্রিন্টের অবশিষ্ট। 

জেরাতে অনেক তথ্য বের হয়ে আসছিল। কাগজের বান্ডিল ছাড়াও আরও কিছু নথিপত্র নিয়ে এসেছিল বেগ। তারমধ্যে ছিল ১৮৯৭ সালের জুলাই মাসের সুইডিশ সংবাদপত্র, সভেনস্কা মরগনহ্লাদেটের দুটি বড় পাতা, আমি জানি কি ভাবে এই কাগজ খোটানে পৌঁছেছিল। কিন্তু সেটা অন্য গল্প। এই সংবাদপত্রের একটি পাতা সুন্দরভাবে কাপড়ের ওপর মোড়ানো ছিল। কাগজের পাতায় একজন চিনে বসবাসকারী সুইডিশ ধর্মপ্রচারকের বসে থাকার অস্পষ্ট ছবি ও তলায় চিনা হরফে ভদ্রলোকের নাম ছিল। সেই ছবিকে নিজের বলে দাবী করে এবং জাল পরিচয় পত্র দেখিয়ে কেরিয়ার দক্ষিণে অশিক্ষিত তাঘলিক ও পাহাড়িদের কাছে নিজেকে মিস্টার ম্যাকার্টনির প্রতিনিধি হিসেবে জাহির করে ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে হুনজা আক্রমণকারীদের দ্বারা অস্তিত্বহীন বন্দী দাস মালিকদের খুঁজে বের করার নামে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় শুরু করছিল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তার চালাকি ধরা পড়ে যায় এবং মিস্টার ম্যাকার্টনির উদ্যোগে খোটান ইয়ামেন তাকে শাস্তি দেয়।

১৯৯৮ সালে কাশগড়ের ইউরোপীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ‘পুরনো বই’ সত্যি আসল কিনা নিয়ে সন্দেহ দেখা দেওয়ায় ইসলাম আখুন তার রোজগারের অন্যতম পথ ‘প্রাচীন বইয়ের’ ব্যবসা ছেড়ে ‘হাকিম’ হয়ে বসে রোগ বালাইয়ের চিকিৎসা শুরু করে। একটি ফরাসি উপন্যাসের অংশ যা সম্ভবত ডুট্রেইল ডি রাইনস অথবা গ্রেনার্ড ছেড়ে গেছিলেন আর কিছু ফার্সি লেখার টুকরো পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু সেগুলো সে জাল বইয়ের জন্য নতুন অক্ষর তৈরির কাজে লাগাত না এমনি কাছে রেখে দিয়েছিল তা জানার সময় পাইনি।

এই বহুমুখী প্রতিভার সঙ্গে মোলাকাত করতে করতে নিজেকে অভিযাত্রী নয় মনে হচ্ছিল যেন আমি বিচার ব্যবস্থার অংগ। আমার অস্থায়ী আবাসে একটা ‘কাছারি’ তৈরি করা হয়েছিল ইসলাম আখুনকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য। ইসলাম আখুন খুব পরিতপ্ত এইরকম ভাব দেখিয়ে প্রথমেই মিস্টার ম্যাকার্টনির প্রতিনিধি সেজে জোচ্চুরি করার কথা স্বীকার করে নিয়েছিল। স্বীকার করে নিয়েছিল ১৮৯৮ সালে ক্যাপ্টেন ডেইসির হাতের লেখা নকল করে জাল কাগজ দেখিয়ে আফগান আকসাকাল বদরুদ্দিনের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কথা। কিন্তু জাল বইয়ের কথা উঠতে প্রথম থেকেই সে বলে আসছিল সে ‘জাল’ বই সম্পর্কে কিছু জানে না। বলে আসছিল সে মরুভূমি থেকে অন্য কেউ তুলে নিয়ে আসা ‘বই’ বা ‘নথি’ বিক্রি করেছে – সে জাল না আসল তা তার জানার কথা না, যারা বই কিনেছে তারা দেখেই কিনেছে। ইউরোপিয়ান মধ্যে পুরনো জিনিসের কদর দেখে যাদের কাছ থেকে সে এগুলো পেয়েছিল তাদেরকে আরও যোগাড় করে নিয়ে আসতে বলে। কিন্তু সে নাকি যারা এগুলো নিয়ে আসত তাদের সম্পর্কে কিছু জানত না। তাদের খোঁজ জানতে চাইলে ও বলেছিল হয় তারা মরে গেছে না হলে অন্য কোথাও চলে গেছে।

কিন্তু আমি প্রথম থেকেই নিশ্চিন্ত ছিলাম যে ও মিথ্যে বলেছে। প্রশ্নের ফাঁদে জর্জরিত হয়ে অবশেষে সে স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে কয়েকজন মিলে তারা জাল ‘পুরনো বই’ বানাত। সে ছাড়াও আরও তিনজন তার সঙ্গে ছিল। তাদের একজন মুহাম্মদ তারি ইয়ারকন্দে আর একজন মোল্লা মুহাম্মদ সিদ্দিক আকসুর দিকে পালিয়ে গেছে আর তৃতীয় জন মারা গেছে।   

ইসলাম আখুন অবশ্য সহজে মুখ খোলেনি, আমি তাকে কথা দিয়েছিলাম সে যদি সব খুলে বলে তবে জাল বই নিয়ে আম্বানের ইয়ামেনে কোন নালিশ আমি করব না। আমি জানতাম যদি সে সহজে মুখ না খোলে এবং তার বই জাল করার ঘটনা প্রমাণিত হয় তাহলে চিনের কড়া আইন তাকে কঠিনতম শাস্তি দেবে, – যে শাস্তির কোন মুল্য আমার কাছে নেই। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ন হচ্ছে তার বিক্রি করা নথি ও বইগুলো যে জাল সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। দীর্ঘ জেরায়  ইসলাম আখুন বারবার দাবী করেছিল যে সে নিজে কোনদিন কোন ধ্বংসস্তূপে যায়নি বা সেখান থেকে কিছু তুলে আনেনি।

প্রথমে আমি তার এই দাবী নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাইনি, কারন আমার হাতের সময় কমে আসছিল। তৃতীয়বার আমার সামনে যখন ওকে আনা হয়েছিল তখন ঘর ভর্তি সাক্ষীর সামনে ওকে মরুর ধ্বংসস্তূপে যাওয়া নিয়ে আবার চেপে ধরেছিলাম। প্রথমে বারবার অস্বীকার করলেও আমি ১৮৯৫-৯৮ সালে  ডঃ হোয়েমলের তাকলামাকান অভিযানে ওর কথার রিপোর্ট এবং মিস্টার ম্যাকার্টনির কাছে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া জবানবন্দির কথা উল্লেখ করতে ধূর্ত লোকটা তোতলাতে শুরু করেছিল। আমার এই আক্রমণের জন্য কোনভাবেই প্রস্তুত ছিল না ইসলাম আখুন। কাশগড়ে ‘প্রাচীন পুঁথি’ বিক্রির সময় ওর দেওয়া বই সহ নানা প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহের অভিযানের বর্ননার ওপর ভিত্তি করেই ভূপ্রকৃতির বিবরণ সহ সরকারি রিপোর্ট তৈরি হয়েছিল কয়েক বছর আগে। যে রিপোর্ট আমার কাছে ছিল। রিপোর্টগুলো থেকে অনুবাদ করে শোনাতে সে হতভম্ব হয়ে পড়েছিল।  ও বুঝে গিয়েছিল আগে নিজের দেওয়া বক্তব্যের জালে ও জড়িয়ে গেছে তাই জাল জুয়াচুরিতে জড়িত থাকার কথা লুকিয়ে লাভ নেই। যখন সে নিশ্চিত হয়েছিল যে আমি ওকে শাস্তি দেওয়াব না তখন সে বলতে শুরু করেছিল জুয়াচুরির তার হাত পাকানোর গল্প।

সাম্পুলার কাছে একটি নির্জন মাজারে উপরে উল্লিখিত তিনজনকে প্রথম পাণ্ডুলিপি ‘লিখতে’ দেখে সে। অসাধারণ স্মৃতিশক্তির মালিক ইসলাম আখুন ডঃ হোর্নলের রিপোর্টে থাকা প্রতিটি পান্ডুলিপির ছবি ধরে ধরে ব্যাখ্যা করে ব্লক প্রিন্ট করে – ‘প্রাচীন পুঁথি’ সৃষ্টির কথা। অজানা অক্ষরগুলোর অধিকাংশই তার সৃষ্টি। ১৮৯৪ সালের আগে সে খোটানের গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্রাচীন মুদ্রা, সিল মোহর সহ নানা জিনিস সংগ্রহ করে কাশগড়ে গিয়ে সাহেবদের বিক্রি করত। আফগান ব্যবসায়ীদের থেকে সে জানতে পারে ভারতের নানা অংশে পাওয়া প্রাচীন পান্ডুলিপি নিয়ে সাহেবদের উৎসাহের কথা। তুর্দি সহ আরও কিছু ধনশিকারি কাছ থেকে সে প্রথম দান্দান-উইলিকের আসল প্রাচীন পাণ্ডুলিপি পায়। কিন্তু অলস প্রকৃতির ধুরন্ধর ইসলাম আখুনের কোন ইচ্ছে ছিল না ধূসর মরুর মাঝে কষ্টকর যাত্রা করে পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের। তখন সে ওপরে উল্লিখিত তিনজনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বেশ কিছু ‘প্রাচীন’ পুঁথি ‘বানানোর’ ছক কষা শুরু করে যা সাহেবদের বোকা বানিয়ে ভয়ংকর মরুর মাঝে অভিযানের গল্প বলে সহজেই বিক্রি করা যাবে।  

ইব্রাহিম মোল্লা নকল ‘প্রাচীন পুঁথি’ বানানোর নাটের গুরু ছিল। সে মূলত রাশিয়ানদের কাছে এই বই বিক্রি করত আর ইসলাম আখুন বই বিক্রি করত ব্রিটিশ ও অনান্যদের কাছে। আমি খোটানে পৌঁছনোর পর রাশিয়ান আর্মেনিয়ান ভদ্রলোক ইব্রাহিম মোল্লার কাছ থেকে কেনা বার্চ গাছের ছালের ওপর লেখা পাণ্ডুলিপির সত্যতা যাচাই করাতে আমার কাছে নিয়ে এসেছিলেন। এই বইতে কিছু গ্রিক – আর রাশিয়ান বর্নমালার সঙ্গে অদ্ভুত সাদৃশ্যযুক্ত অক্ষর দেখেছিলাম। ইব্রাহিম মোল্লা সামান্য হলেও রাশিয়ান ভাষা জানাত। সেই বিদ্যে ও কাজে লাগিয়েছিল অজানা অক্ষর তৈরি করতে। ইসলাম আখুনের গ্রেপ্তারির খবর পেতেই ইব্রাহিম মোল্লা গা ঢাকা দিয়েছিল ফলে ওর সঙ্গে মোলাকাতের কোন সুযোগ হয়নি।   

ইসলাম আখুন জাল বইটি ১৮৯৫ সালে প্রথম কাশগড়ে মিস্টার ম্যাকার্টনির কয়েকদিন অনুপস্থিতিতার সুযোগে তার অফিসের দায়িত্বে থাকা মুন্সি আহমদ দীনকে বিক্রি করেছিল।  এই বইটি দান্দান-উইলিক থেকে উদ্ধার করা সত্যিকারের প্রাচীন পাণ্ডুলিপি থেকে টানা (cursive)  ব্রাহ্মী অক্ষরকে অনুকরন করে লেখা হয়েছিল। যদিও লেখার অক্ষরে ধারাবাহিকতা ছিল না, কিন্তু তা সত্ত্বেও কিছু সময়ের জন্য এই পাণ্ডুলিপি ইউরোপের পণ্ডিত বিশেষজ্ঞদের বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়েছিল।  ডঃ হোর্নলের ‘রিপোর্ট অন সেন্ট্রাল-এশিয়ান অ্যান্টিকুইটিজ’এর দ্বিতীয় রিপোর্টে এই পাণ্ডুলিপিগুলো ‘কোডিস’ (codice) হিসেবে উল্লেখিত হয়েছে। যদিও বর্তমানে এগুলো ব্রিটিশ মিউজিয়ামে ইসলাম আখুনের ‘জালিয়াতি’র নিদর্শন হিসেবে পাণ্ডুলিপি বিভাগে আলাদা করে রাখা
হয়েছে। ডঃ হেডিনের ‘থ্রু এশিয়া’র জার্মান সংস্করণে ‘প্রাচীন খোটান’ পাণ্ডুলিপির অংশে এই ‘জাল’ পুঁথির ছবি ছাপা হয়েছে।  

   

কাশগড় এবং বদরুদ্দিনের মাধ্যমে লাদাখ আর কাশ্মীর থেকেও এই ধরণের ‘জাল’ বইয়ের জন্য ভালো দাম পাওয়া যেতে পারে বুঝে জালিয়াতরা মরিয়া হয়ে উঠেছিল। ইসলাম আখুন টের পেয়ে গিয়েছিল ইউরোপিয়ানরা বইয়ের প্রাচীনত্ব বা সততা না বুঝেই যে কোন মুল্য দিতে প্রস্তুত। কারন কেউ এই লিপি পড়তে বা লিপির তারতম্য ধরতে সক্ষম হয়নি। ফলে তারা রীতিমত গোপন কারখানা খুলে নিজেদের ইচ্ছেখুশি মতো ‘অজানা অক্ষর’ বানিয়ে বই বানাতে শুরু করে দিয়েছিল। তাই ‘ব্রিটিশ সংগ্রহে’ থাকা কম পক্ষে কয়েক ডজন বই ‘প্রাচ্য বিশেষজ্ঞ’দের কাছে গেলেও ‘অজানা অক্ষর বা লিপি’র কল্যানে কেউ তার পাঠোদ্ধার করে উঠতে পারছিল না।

হাতে পাণ্ডুলিপি লেখা খুব শ্রমসাধ্য ও সময় সাপেক্ষ হওয়াতে জালিয়াতরা কাঠের ব্লক বানিয়ে বই ছাপা শুরু করেছিল। চীনা তুর্কিস্তানে কাঠের ব্লক থেকে মুদ্রণ ব্যাপক ভাবে প্রচলিত থাকায় কাঠের ব্লক বানাতে ওদের খুব একটা অসুবিধা হয়নি। ১৮৯৬ সালে প্রথম ‘পুরনো পুঁথি’ ছাপা শুরু করেছিল জালিয়াতরা। এবং প্রায় ৪৫টি এই পুঁথির কথা ডঃ হোর্নলের প্রথম প্রতিবেদনে ছবি সহ ছাপা হয়েছিল। প্রতিটি মোটা পুঁথিই ছিল অসাধারণ বৈচিত্র্যের অধিকারী।

ইসলাম আখুন বুঝে গিয়েছিল আমার কাছে কোনকিছু লুকিয়ে ছাড় পাবে না। ফলে আমার জানার উৎসাহ দেখে সে জালিয়াতির কৌশলগুলো বিশদে ব্যাখ্যা করেছিল। বিশেষ করে জাল পুঁথি তৈরি করতে কাগজকে প্রাচীন রূপ দেওয়ার পদ্ধতি। খোটান তুর্কিস্তান কাগজ শিল্পের বড় কেন্দ্র হওয়াতে যে কোন আকারের ও ধরণের কাগজ পাওয়াতে কোন অসুবিধা হয়নি। খোটানে তৈরি কাগজ প্রথমে তোঘরাক গাছ থেকে তৈরি ‘তোঘরুঘা’ দ্রবনে চুবিয়ে হলুদ বা হালকা হালকা বাদামী রঙ করা হত, তারপর সেগুলো জলে ধুলে তারমধ্যে একটা ছোপ ছোপ দাগ আসত ফলে মনে হত অনেক প্রাচীন কাগজ। 

কাগজ তৈরি হয়ে গেলে তার ওপর হাতে লিখে বা ব্লক প্রিন্ট করে ছাপা হত ‘প্রাচীন অজানা অক্ষর,’ তারপর সেই সেগুলো আগুন জ্বেলে তার পাশে ঝুলিয়ে দেওয়া হত যাতে করে তার ওপর ধোঁয়ার কার্বন জমে সেগুলোর মধ্যে সত্যিকারের ‘অতি প্রাচীন’ ভাব ফুটে ওঠে। ফলে অনেক সময় এই কাগজগুলো আংশিকভাবে ঝলসে বা পুড়ে যেত। কলকাতায় পাঠান বেশ কিছু খোটানের প্রাচীন পাণ্ডুলিপিতে এইধরনের পোড়ার দাগ দেখেছিলাম।  

জাল পাণ্ডুলিপি তৈরিতে সিদ্ধহস্ত হলেও গোল বেঁধেছিল এগুলো বাঁধানোর ক্ষেত্রে। যা নিয়ে জালিয়াতরা মাথা ঘামানোর খুব একটা প্রয়োজন অনুভব করেনি। পান্ডুলিপিগুলো ওরা তামার গোঁজ দিয়ে বা কাগজ পাকিয়ে বাঁধাই করত যা ছিল ইউরোপিয় পাণ্ডুলিপির অনুকরণ। এই বাঁধাই দেখেই সন্দেহ পাকতে শুরু করেছিল সংগ্রহকারীদের মধ্যে। বাঁধানো বইয়ের মধ্যে এরা মরুর মিহি বালি এমন ভাবে মাখিয়ে দিত যেন মনে হয় এগুলো সত্যি সত্যি বালির তলায় চাপা পড়ে ছিল বহুকাল। আমার পরিষ্কার মনে আছে ১৮৯৮ সালে কাশ্মীরে এক সংগ্রাহকের কাছে পৌঁছন এই বই পরীক্ষা করতে আমাকে কাপড়ের ব্রাশ ব্যবহার করতে হয়েছিল। 

আমার জেনে ভালো লাগছিল যে জালিয়াত ও জালিয়াতি দুটোই ধরা পড়েছিল। আমি নিশ্চিত ভাবে ইউরোপে আমার সতীর্থদের বলতে পারব  ‘habemus confiteniem reum’ আমাদের কাছে জালিয়াতির সেরা সাক্ষী আছে – স্বীকারোক্তি করা আসামী নিজেই, যে স্বীকারোক্তি পেতে আমাকে কোন বিচার ব্যবস্থার সাহায্য নিতে হয়নি। যদি ইসলাম আখুন পরবর্তী ক্ষেত্রে অনুরূপ স্বীকারোক্তি নাও দেয় আমার অনুসন্ধান ও তার বিশ্লেষণ থেকে পন্ডিতেরা নিজেরাই জালিয়াতি ধরতে পারবেন। দান্দান-উইলিক ও এন্ডারের আবিষ্কারের পাশাপাশি ইসলাম আখুনদের কাজ পাশাপাশি রাখলেই জালিয়াতি পরিষ্কার ধরা যাবে। শুধু রঙ এবং কাগজের উপাদানের সাতন্ত্রতাই নয় সংরক্ষণের অবস্থা ও অনান্য নানা বিষয় কখনই জালিয়াতদের কাজে উপস্থিত ছিল না। উপস্থিত ছিল না লিপির ধারাবাহিকতা যা সমস্ত প্রাচীন নথিতে দেখা যায়। জালিয়াতরা কোন ভাবেই প্রাচীন লিপির ওপর পটুতা অর্জন করতে পারেনি।

তিন বছর আগে করা ইসলাম আখুন তার শাগরেদদের প্রমাণিত জুয়াচুরির জন্য আমি কোন  শাস্তি দাবী করব না জেনে প্যান ডারিন স্বস্তি পেয়েছিলেন। এমনিতেই প্যান ডারিন পাপীদের ক্ষমা করার ও ধার্মিক মনোভাবের জন্য জনসাধারণের কাছে প্রিয় ছিলেন। আমি ওনাকে বলেছিলাম যে ইসলাম আখুনের শাস্তির দাবী আমার কাজের অংশ নয়। আমি জানতাম জালিয়াতির প্রমাণ দিয়ে বিচার চাইলে ‘চিনা ফৌজদারি’ বিষয়টি হালকা ভাবে নেবে না এবং সম্ভবত চরম শাস্তি দেবে। পান্ডুলিপি জালিয়াতির জন্য না হলেও ক্যাপ্টেন ডেইসির হাতের লেখা নকল করে বদরুদ্দিনের কাছ থেকে জালিয়াতি করে টাকা নেবার অভিযোগে তাকে দীর্ঘদিন গলায় কাঠের বেড়ি পরে থাকতে হয়েছিল পাশাপাশি মিস্টার ম্যাকার্টনির প্রতিনিধি হিসেবে দাবী করার জন্য শারীরিক শাস্তির সঙ্গে কারাদণ্ডও ভোগ করতে হয়েছিল।

ইসলাম আখুনের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথন থেকে এটা বলতে পারি খোটানবাসীদের তুলনায় সে অনেক বুদ্ধিমান ও প্রবল রসবোধের অধিকারী। ছিপছিপে চেহারা তীক্ষ্ণ চোখের অধিকারী ইসলাম আখুন কাশ্মীরি বংশোদ্ভূত কিনা নিশ্চিত হতে পারিনি। সৎ বৃদ্ধ তুর্দির প্রতি তার সহাস্য মন্তব্য  “মরুভূমি থেকে বের করার মতো কিছুই নেই,” আমি আজও ভুলতে পারিনি। ডঃ হোর্নলের রিপোর্টের সঙ্গে মুদ্রিত তার ‘জাল’ পাণ্ডুলিপির ছবি দেখে সে উচ্ছ্বসিত হয়ে গিয়েছিল। ‘জালিয়াতি’টা কি করে নিখুঁত করা যেত সেই ব্যাপারে সে বারবার জানতে চাইছিল। আমি নিশ্চিত, সুযোগ পেলে অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার কোন সুক্ষ জালিয়াতিতে মাততে চাইবে সে। আমি এই মোলাকাতের কয়েক মাস পর ইউরোপের এক বিখ্যাত লাইব্রেরিতে ইসলাম আখুনের ব্লক-প্রিন্টেড জাল নথি সযত্নে রক্ষিত দেখেছিলাম। ইসলাম আখুন এই খবর জানেল ভীষণ খুশি হতো।  

আমি স্মারক হিসেবে ইসলাম আখুনের কাছে জাল বই তৈরিতে ব্যবহার করা কিছু সরঞ্জাম চেয়েছিলাম যা ও সানন্দে আমার হাতে তুলে দিতে রাজী হয়েছিল। তার সমস্ত জবানবন্দি নথিভুক্ত করার পরে তাকে ইয়ামেন থেকে জেল মুক্ত করা হয়েছিল। ছাড়া পাবার পর ও বাড়ি থেকে কাগজের নমুনা ও ব্লক সহ বেশ কিছু সরঞ্জাম নিয়ে এসে আমার হাতে তুলে দিয়েছিল। ইসলাম আখুনের গ্রেপ্তারের খবর শহরময় ছড়িয়ে পড়েছিল ফলে ওর পক্ষে পালিয়ে যাওয়া সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সব ধরণের সরঞ্জামের নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

জেরায় অস্বীকারকে – স্বীকার করার কথা শহরময় ছড়িয়ে পড়ায় ইসলাম আখুন ভেঙে পড়েছিল। তার তেজী ভাব আর অবশিষ্ট ছিল না। তাকে আমি কথা প্রসঙ্গে বলেছিলাম তার মতো একজন বুদ্ধিমান মানুষের উচিত না খোটানের সহজ সাধাসিধে মানুষদের মধ্যে থাকা। কথাটা ওর মনে গেঁথে গিয়েছিল হয়ত। আমি খোটান ছেড়ে আসার একদিন আগে আমার কাছে এসে তাকে সঙ্গে করে ইউরোপে নিয়ে যাবার আবেদন পত্র নিয়ে হাজির হয়েছিল। আমি রাজী হয়নি, কি প্রত্যাশা সে আমার কাছে করেছিল জানা নেই কিন্তু জালিয়াতি করার জন্য এক বিরাট ক্ষেত্র তার সামনে খুলে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।                      

খোটান মরূদ্যানে শেষের দিনগুলো

খোটান ছাড়ার আগে আমি সবার কাছ থেকে ব্যক্তিগত ভাবে বিদায় নিতে চাইছিলাম, তাই ২৭ এপ্রিল প্যান ডারিনের সঙ্গে ইয়ামেনে দেখা করতে গেছিলাম। যিনি প্রকৃত অর্থেই আমার বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। অবসরের দিন ঘনিয়ে আসা পুরনো ঘরানার মানুষটি পাশ্চাত্য প্রভাবে প্রভাবিত না হয়েও আমার বৈজ্ঞানিক অভিযানের গুরুত্ব বুঝতে পেরে সব রকম সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। প্রশাসক হিসেবে এই জ্ঞানী বৃদ্ধ মানুষটি কখনও কঠোর হয়ে ওঠেননি, ওনার শান্ত, ক্ষমা ও ধৈর্যশীল ব্যক্তিত্বের আমি অনুরাগী হয়ে উঠেছিলাম।     

ইয়ামেন থেকে ফিরেছিলাম খোটান বাজারের মধ্যে দিয়ে। ‘পুরনো শহরের’ শনিবারের বাজারের দিন গলিগুলো থিকথিক করছিল ক্রেতা আর বিক্রেতার ভিড়ে। ছেঁড়া ছাউনির মধ্যে দিয়ে পড়া রোদ, আলো আঁধারিতে রকমারি পন্যগুলোকে মোহময় করে তুলেছিল। খোটানিদের হাতে তৈরি পুরনো ধাঁচের কিছু পোশাক আমি স্মারক হিসেবে কিনেছিলাম। যদিও অ্যানিলিন রঙের ব্যবহারে প্রাচ্যের নিজস্বতা অনেকটাই চাপা পড়ে গেছে।

খোটানের রাজধানী একটি ছোট জায়গা। কেনাকাটা সেরে শেষ বসন্তে ঘুরে বেড়ান মসজিদের পাশের রাস্তা দিয়ে ছবির মতো শহরটায় ইতস্তত ঘোড়া ছুটিয়ে বেড়িয়েছিলাম। দীর্ঘদিন নির্জন মরুতে কাটানোর পর নীল আকাশ, সবুজে ছাওয়া পথঘাট আর এতো মানুষের দেখা পেয়ে এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল।       

চারদিন আগেই রাম সিং অভিযানের সব মালপত্র সহ রওনা দিয়েছিল ইয়ারকান্দের দিকে। তাই ঝাড়া হাত পায়ে পরদিন সকালে নার-বাগ থেকে নিঃশব্দে রওনা হব ভাবলেও তা হয়ে ওঠেনি। স্থানীয় পরিচিতরা প্রায় সবাই এসেছিল আমাকে বিদায় জানাতে। অধিকাংশই চাইছিল আমি চলে যাবার আগে তাদের ও তাদের পরিচিতদের জন্য ওষুধ দিয়ে যাই। বাকী ছিল ‘টিপস’ দেওয়ার পালাও। চিনা তুর্কিস্থানে ইউরোপের হোটেলগুলোর মতোই সবাই তাদের পরিষেবার জন্য মজুরী ছাড়াও ‘টিপস’ আশা করে। আমার শিবির দেখভাল করা ইয়ামেনের পরিচারক, যারা নানা প্রাচীন জিনিস সংগ্রহে বা সেই সম্পর্কিত খবর পেতে সাহায্য করেছিল সে সমস্ত লোকজন, মালপত্র সহ পরিবহণে সাহায্যকারী ‘ইউজ-বাশি’দের নগদে টিপস দিতে অনেক সময় চলে গিয়েছিল। টিপস দেওয়াটা খুব খরচবহুল হলেও সবার হাসিমুখ আমাকে তৃপ্তি দিয়েছিল।

খোটানের প্রাচীন রাজধানী ইয়োটকান সহ আরও কিছু জায়গা শেষবারের মতো না দেখে আমি খোটান ছাড়তে চাইছিলাম না। শেষ নভেম্বরে শীতের শুরুর সময় যে পথ দিয়ে গেছিলাম সেই একই পথ ধরে গিয়েও দুই ঋতুর পার্থক্যটা ধরতে পারছিলাম। নভেম্বরের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন কনকনে ঠাণ্ডা নিঝুম পরিবেশ পুরোটাই বদলে গিয়ে প্রাণোচ্ছল হয়ে উঠেছে চারদিক। পথের ধারের গ্রাম ঘিরে চাষের ক্ষেতের সবুজ লুসার্ন গাছগুলো ঝকঝকে রোদ্দুরে হাওয়ায় দুলছিল। রাস্তার ধারের সার সার পপলার, উইলো আর মালবেরি গাছগুলো ভরে উঠেছিল কচি পাতায়। ক’দিন আগেই অপ্রত্যাশিত বৃষ্টি হয়েছে এই অঞ্চলে। ফলে ক্ষেতের ফসল আর বাগানের গাছগুলোর পাতায় জমে ওঠা ধুলো ধুয়ে গিয়ে গাছগুলোকে আরও সবুজ করে তুলেছিল। পুরো মরূদ্যানটি যেন আমাকে শেষ বিদায় দিতে অপরুপ সাজে সেজে উঠেছিল।  হালালাবাদ পার হয়ে খোলা মাঠের সামনে পৌঁছতে পুরো পর্বতমালা দু-হাত ছড়িয়ে দেখা দিয়েছিল। উলুঘাট দাওয়ান ও কৌরুক-কুজ যেখানে আমাদের ‘ট্রাঙ্গুলেশান স্টেশান’ বসিয়েছিলাম সেটাও দেখা যাচ্ছিল। শুধু তাই নয় কারাকাশ নদীর জলের উৎসের বরফ ঢালগুলোও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। নভেম্বরে যে রুক্ষ  পাহাড় আমাদের নাজেহাল করে ছিল বিদায়কালে সেই কুয়েন-লুয়েন পর্বতমালাই মরুভূমির প্রান্তে অপরূপ সাজে সেজে দাঁড়িয়ে। অদ্ভুত এই স্মৃতি ক্যামেরায় নয়, মণিকোঠায় ধরে রাখার।  

ইয়োটকানে ইজবাশির সুন্দর বাগানে তাঁবু খাটিয়ে লেগে পড়েছিলাম ঘুরে ঘুরে নদীখাতের বিভিন্ন স্তরের পলির নমুনা সংগ্রহে। এর আগে নদী খাত থেকে পেয়েছিলাম অনেক প্রাচীন মুদ্রা, সিল মোহর, টেরাকোটা সামগ্রী আর পেয়েছিলাম সোনার ছোট একটি বানরের বসা মূর্তি।

ইয়োটকান থেকে ২৯ এপ্রিল সকালে রওনা দিয়েছিলাম খোটান মরূদ্যানের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের কারা-কাশ অঞ্চলের দিকে। আগে এই জায়গাটি দেখা হয়নি। আরও একটি কারন হল দারোগা ইসমাইল। অভিযানের সাফল্যে তার প্রশ্নাতীত ভূমিকার জন্য আমার সুপারিশে আম্বান ওকে ওর জন্মস্থান কার-কাশের বেগের পদে উন্নীত করেছিল। ইসমাইল আমাকে তার বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও জন্মভিটে দেখাতে চাইছিল। সে, আফগান আকসাকাল বদরুদ্দিন খান ও তুর্দি খোটানে আমার শেষ কয়েকদিনের সঙ্গী হয়েছিল। 

সুন্দর ঝকঝকে আবহাওয়া পথচলাকে মনোরম করে তুলেছিল। সকালেই পার হয়েছিলাম জাওয়া থেকে খোটান যাবার পথের ধারের বড় জনপদ বোরাজান। দিনটা ছিল সোমবার। স্থানীয় হাটের দিন। পথের দু’পাশ থিকথিক করছিল আশপাশ অঞ্চলের গ্রামবাসী সহ ব্যবসায়ীদের ভিড়ে। এই ব্যবসায়ীদের অধিকাংশ গতকালের কারা-কাশের সাপ্তাহিক বাজারে হাজির ছিল তাদের পন্য নিয়ে। ভোর না হতেও তারা চলে এসেছে এই বাজারে। এখান থেকে চলে যাবে বিজিন। বদরুদ্দিন এই সব বাজারে নিয়মিত যায়। সে জানাল এই বাজার খোটান মরূদ্যানের নানা জনপদে নির্দিষ্ট দিনে বসে, যাতে করে অঞ্চলবাসীর খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহে কোন অসুবিধা না হয়। জায়গাগুলো হল খোটান, ইউরুং-কাশ, সাম্পুলা, ইমাম মুসা কাসিম, বিজিন আর কারা-কাশ। এমন বৃত্তে বাজারের দিন নির্দিষ্ট হয়েছে যাতে ব্যবসায়ীরা ঘোড়ায়টানা গাড়িতে করে সহজেই এক বাজার থেকে আর এক বাজারের সহজেই পৌঁছতে পারে।

এই ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্থানীয় ছাড়াও অনেক ভিনদেশী ছিল। – কাবুলি, বাজাউরি, বেলুচিস্তানের পিশিন থেকে আসা পুরুষ এবং প্রচুর আন্দিজানি, ছিল কাশ্মীরিও। বদরুদ্দিন এই ব্যবসায়ীদের অধিকাংশকেই চেনে। কাশ্মীরিদের সঙ্গে ওদের ভাষায় কথা বলতে গিয়ে টের পেয়েছিলাম কয়েক পুরুষধরে ইয়ারকন্দে থাকার ফলে ওরা নিজের মাতৃভাযা ভুলে গেছে। ফলে আমার কথার কোন উত্তর দিতে পারেনি। শুধু কাশ্মীরিরাই নয় অধিকাংশ আফগানরাও ভুলে গেছে পার্সিয়ান ও পুস্তু। স্থানীয় ভাষাতেই স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠেছে তুর্কিস্থানে বেড়ে ওঠা বর্তমান প্রজন্ম।

দুপুরের খানিক পরে কারাকাশ নদী পার হয়ে পৌঁছেছিলাম কারা-কাশ শহরে। নদীর নামেই শহরের নাম। প্রাণবন্ত সুন্দর করে সাজানো শহরের ইসলাম বেগের এক আত্মীয়ের বাগানবাড়িতে আমাকে নিয়ে তোলা হয়েছিল। কি ভাবে আমাকে অভ্যর্থনা আর সেবা করবে ভেবে উঠতে পারছিল না গৃহকর্তা ও তার পরিবার। ওই বাগানে আমি গভীর রাত পর্যন্ত নৃতাত্ত্বিক উদ্দেশ্যে স্থানীয় ব্যক্তিদের চেহারার মাপজোক নিয়েছিলাম। ইসলাম বেগের সহায়তায় নথিভুক্ত করেছিলাম স্থানীয় প্রশাসন, কর ইত্যাদি সম্পর্কে আকর্ষণীয় কিছু বিষয়।

৩০ এপ্রিল ছিল খোটানে আমার ঘোরাঘুরির শেষ দিন। দিনটা কাটিয়েছিলাম ইসলাম বেগের আনা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মরূদ্যানের পশ্চিমে মরুকোল ঘেঁষা ‘কারা-ডোব’ নামের এক ধ্বংসস্তূপে। কারা-ডোবে পৌঁছতে আমাদের গ্রামীণ খোটানের বাহারুম-সু অঞ্চলের একের পর উর্বর চাষজমি আর ফলের বাগানের ধার দিয়ে যেতে হয়েছিল। কায়েশ, মাকুয়া এবং কুয়া, কারাকাশ নামের একের পর এক জলের ধারায় পুষ্ট এই অঞ্চল। দিনটি যথেষ্ট গরম হলেও কষ্ট হচ্ছিল না। দূর পাহাড়ের দৃশ্য ধোঁয়াশায় ঢেকে ছিল। প্রায় সাত মাইল ঝোপঝাড়-ঢাকা বালুকাময় সমভূমি আর ছোট টিলা ঘোড়ার পিঠে চেপে পার হয়ে পৌঁছেছিলাম কারা-ডোবে। 

প্রায় এক বর্গ মাইল জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে ভাঙা মাটির পাত্রের টুকরো। ধ্বংসস্তুপের ঠিক মাঝখানে একটা ভাঙা ইটের ঢিবি, নিঃসন্দেহে অতি প্রাচীন ও সম্ভবত কোন স্তপার ভিত্তি ছিল। বেশ কিছু শক্ত ভাঙা মূর্তির টুকরো মাটি থেকে বের হয়ে ছিল। হয়তো কোন প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ লুকিয়ে বালির তলায়। এখান থেকে মোটা বালির উঁচু টিলার মধ্যে দিয়ে প্রায় মাইল চারেক পথ পার হয়ে ইয়াওয়ার জলধারার পাশের উলুখাগড়ার ভরা জলাভূমি পার হয়ে জাওয়া গ্রামের প্রান্তে তাঁবু খাটিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল যেন ঈশ্বর আমাকে মরু থেকে বিদায়ের আগে উপহার হিসেবে তাঁর আরও একটি বাসস্থান দর্শন করালেন। 

মে মাসের প্রথম দিন খোটান ছেড়ে রওনা দিয়েছিলাম পশ্চিমের পথে। ইউরোপে ফেরত যাওয়ার আনন্দের পাশাপাশি মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল এতদিনের লড়াইএর বিশ্বস্ত সাথীদের চির বিদায় জানাতে। জানি আর কোনদিন দেখা হবে না আমাদের। জাওয়া থেকে বিদায় নিয়েছিল তুর্দি, যার মরুভূমির অভিজ্ঞতা অভিযানে পদে পদে কাজে লেগেছে। আমি ওকে যে অর্থ দিয়েছিলাম তা সারা জীবন ধরে মরু থেকে ধন সংগ্রহ করে এনেও ও উপার্জন করতে পারেনি। তুর্দির ইচ্ছে অনুসারে প্যান ডারিনের কাছে ওর জন্মস্থানের গ্রামে ওকে  ‘মিরাব’ বা সেচের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিযুক্ত করার সুপারিশ করেছি। কারন ‘তাকলামাকানের আকসাকাল’ মরুর জন্য অনেক বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। ছেড়ে আসার সময় বিনয়ী বৃদ্ধ লোকটির দু’চোখ থেকে নেমে আসা জলের ধারার দৃশ্য সহজে ভোলার নয়।   

ইসলাম বেগ আর বদরুদ্দিন খান আমাকে তারবুগাজ পর্যন্ত সাথ দিয়েছিল। এখানে মরুর ধারের এক নির্জন লঙ্গরে আমার রাত কেটেছিল। দু’জন বিদায় নিতে আমি একাকি ‘কবুতর মন্দিরের’ দিকে চলতে চলতে খোটান অভিযানের ফলাফলের কথা ভাবছিলাম। প্রায় মাস সাতেক আগে যখন এখানে এসেছিলাম তখন নিশ্চিত ছিলাম না বালির সমুদ্রে আমার অভীষ্ট লক্ষের দেখা পাব কিনা। এখন আমি নিশ্চিন্ত মনে ফিরে যাচ্ছি – যা আশা করেছিলাম তার থেকেও মরুভূমি আমাকে অনেক বেশী পুরস্কৃত করেছে। মনে পরে গেল হিউয়েন-সাং কথিত রীতির কথা।  তিনি শুনেছিলেন কবুতর মন্দিরের পাশের ঢিবির ইঁদুরেরাও একসময় পবিত্র কবুতরের মতোই সন্মান লাভ করত। “ঢিবি অতিক্রম করার সময় এদের পূজো করে প্রার্থনা করলে তা ফলে যায়… যারা এই ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানগুলি পালন করে তাদের বেশিরভাগ ইচ্ছেই পূরণ হয়।” আমি পবিত্র  কবুতরদের পুজো বা প্রার্থনা কোনটাও করিনি,  কেবল আমার কাজটা করে গেছিলাম। সাফল্য এসেছিল। তবু মন্দিরে পৌঁছে প্রথমেই কবুতরদের দেবার জন্য এক বস্তা ভুট্টা কিনেছিলাম। 

 

খোটান থেকে লন্ডনে

খোটান থেকে যাত্রা শুরু করে কাশগড় হয়ে রাশিয়ান তুর্কিস্থান হয়ে ইউরোপে যাওয়ার গল্প ছোট আকারে বলা যেতেই পারে।

ছ’দিন ধরে মরুঝড় আর বৃষ্টি সামলে পৌঁছেছিলাম ইয়ারকন্দে – ওখানে আমার ক্যারাভান আগেই নিরাপদে পৌঁছে গিয়েছিল। ইয়ারকন্দে বসে যখন মহাজনদের পাওনা গণ্ডা মেটচ্ছিলাম তখন প্রবল বৃষ্টি হয়েই চলেছিল – বহু বছর এই অঞ্চলের লোকেরা এ’রকম বৃষ্টি দেখেনি। দু’দিন ধরে প্রায় অঝোরে বৃষ্টি হয়েছিল। মরূদ্যানের সব রাস্তাগুলো জলা হয়ে গিয়েছিল। অজস্র মাটির বাড়ি ভেঙে পড়েছিল।  ইয়ারকন্দে যেখানে আমি ছিলাম সেই বাড়ির মাটির ছাদ ফুটো হয়ে এমনভাবে জল পড়ছিল যে আমার ভয় হচ্ছিল এত পরিশ্রম করে মরুর বালির নীচ থেকে উদ্ধার করে আনা প্রত্ন সামগ্রীগুলো না ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সে যাই হোক টানা বৃষ্টি আবহাওয়াকে ঠাণ্ডা করে দিয়েছিল ফলে মাত্র তিনদিনে প্রায় ১৪০ মাইল পথ পার হয়ে কাশগড় পৌঁছতে পেরেছিলাম।  

১২ মে প্রায় আট মাস পরে আবার ফিরে এসেছিলাম চিন্নি-বাগে মিস্টার ম্যাকার্টনির বাসভবনে। অভিযান নিয়ে কথা যেন শেষ হচ্ছিল না। অভিযান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা সামগ্রীগুলো মিস্টার ম্যাকার্টনিকে দেখাতে পেরে আমারও আনন্দের সীমা ছিল না। বিশ্রামের পাশাপাশি কাজেরও শেষ ছিল না। কলকাতা থেকে যাত্রা শুরুর আগে আমার অনুরোধে ভারতের সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তর সেন্ট পিটার্সবার্গের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে রাশিয়ান তুর্কিস্তান হয়ে ইউরোপে ফিরে আসার জন্য ট্রান্স-ক্যাস্পিয়ান রেলওয়ে ব্যবহার করতে চাওয়ার সম্মতি ইতিমধ্যেই অনুমিত হয়েছিল। শুধু তাই নয় অনুমতি পাওয়া গিয়েছিল প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহগুলো রাশিয়ার ভেতর দিয়ে রেলে করে ইংল্যান্ডে নিয়ে আসার। দীর্ঘ যাত্রা শুরু করার আগে আবার নতুন করে সব প্যাক করিয়ে প্রত্ন সামগ্রী ছাড়া জরিপের যন্ত্র ও অনান্য সরঞ্জাম সাব-সার্ভেয়ার রাম সিং এর দায়িত্বে হুনজা হয়ে ভারতে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা ছাড়াও দুই দলের আলাদা আলাদা যাত্রাপথের জন্য নতুন করে পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। গত আট মাসে অভিযানের জন্য কেনা উট আর পোনিগুলো ভালো দামে বিক্রি করে দিয়েছিলাম। যে দামে পোনিগুলো কিনেছিলাম প্রায় সেই দামেই বিক্রি করে দিয়েছিলাম। আর উটগুলো বিক্রি করে কেনা দামের তিন চতুর্থাংশ পেয়েছিলাম। রাশিয়ার দিকের পরিবহণ মরসুম পুরো দস্তুর শুরু হয়ে গেলে কেনা দামের থেকেও বেশী দামে পশুগুলোকে বিক্রি করা সম্ভব হত। এই দাম প্রমাণ করে কঠিন মরু অভিযানে পশুদের যত্ন আমরা সঠিক ভাবে নিয়েছিলাম। যাইহোক অভিযানের জন্য বরাদ্দ সরকারি অর্থ থেকে অনেকটাই ফেরত দিতে পেরেছিলাম। 

কাশগড়ে রাশিয়ার ইম্পেরিয়াল কনসাল-জেনারেল এম. পেট্রোভস্কির সহায়তায় আমার কাজ অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘদিন তুর্কিস্থানে সরকারি কাজে থাকার ফলে মিস্টার পেট্রোভস্কির ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের প্রতি স্বভাব আগ্রহ জন্মেছিল। তিনি আমার অভিযানের অভিজ্ঞতা উৎসাহ নিয়ে শুনেছিলেন এবং প্রত্ন নিদর্শন যাতে নির্বিঘ্নে ইংল্যান্ডে পৌঁছতে পারে সে বিষয়ে সব রকম ব্যবস্থা নেবার আশ্বাস দিয়েছিলেন।  

এই অঞ্চলের মুখ্য সামরিক অধিকর্তা তাও-তাইএর সঙ্গে ফেরার আগে বেশ কয়েকবার দেখা করেছিলাম। কোন সন্দেহ নেই আমি যেখানেই গেছি,  ওনার হুকুমে সেখানকার চিনা প্রশাসনের কর্তারা সবরকম সহযোগিতা করেছেন। অভিজ্ঞ বৃদ্ধ বন্ধুসুলভ প্রশাসক মানুষটি ব্যক্তিগত ভাবে অভিযানের ফলাফল জানার জন্য উৎসুক ছিলেন। বৃদ্ধ ব্যক্তিটি বারবার বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন এই অভিযানে তিনি কোন সাহায্য করেননি স্বয়ং ঈশ্বর করেছেন। তিনি আরও বলেছিলেন আমরা দু’জন আগের কোন জন্মে নিশ্চই কোন মহান বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর সংস্পর্শে ছিলাম তাই এতো বছর পরে ভয়ংকর মরু সমুদ্রের তলা থেকে বিপুল আধ্যাত্মিক ঐশ্বর্যের খোঁজ পেয়েছি। ওনার অবসর গ্রহনের সময় ঘনিয়ে এসেছিল, ইচ্ছে ছিল অবসর গ্রহণের পর কোন বৌদ্ধ মঠে জীবনের বাকি দিনগুলো কাটাবেন। যদিও তাঁর শেষ ইচ্ছে পূরণ হয়নি, খবর পেয়েছিলাম অসুস্থতা এবং বার্ধক্যের কারণে তিনি আমি কাশগড় ছেড়ে চলে আসার এক বছরের মধ্যেই অবসর গ্রহনের আগেই মারা যান।  

প্রায় চোদ্দ দিন ধরে বারোটা বড় বড় মজবুত বাক্স বানিয়ে সমস্ত প্রত্নবস্তুগুলো তারমধ্যে নিরাপদে ভরে সেগুলো পাঠানো হয়েছিল রাশিয়ান কনস্যুলেটে শুল্ক পরীক্ষার জন্য। রাশিয়ান কনস্যুলেট বাক্সগুলোয় ইম্পেরিয়াল ঈগলের সিলমোহর মারার পর কাশগড় থেকে লন্ডনের মাঝে কোন সামরিক বা শুল্ক পোস্ট সিল ভেঙে সেগুলো খুলে দেখার প্রয়োজন বোধ করেনি।

কাশগড় ছাড়ার দিন আমার ঠিক আগে আগেই সাব-সার্ভেয়ার রাম সিং ভারতের দিকে রওনা হয়ে গিয়েছিল। রাম সিং শুধু জরিপের কাজটি নির্ভুলভাবে করেনি, আমার প্রত্নতাত্ত্বিক কাজের সঙ্গে মনেপ্রানে জড়িয়ে পড়েছিল। মরু পাহাড়ের কঠিন যাত্রার ক্লান্তি হাসিমুখে মেনে নিয়েছিল। শিবির পরিচালনায় ওর ভূমিকা কোনভাবেই অস্বীকার করার নয়। 

আমার আশ্রয়দাতা ও সকল শুভাকাঙ্ক্ষীদের থেকে বিদায় নিতে অনেকটাই সময় লেগিয়েছিল। সকলের আতিথেয়তা ও সহযোগিতা কোনভাবেই ভোলার নয়। সার্ভে অফ ইন্ডিয়া, বিশেষ করে এর বর্তমান প্রধান, কর্নেল সেন্ট জি. গোর, সি.এস.আই.-এর প্রতি আমি বিশেষ ভাবে কৃতজ্ঞ রাম সিংএর মতো একজন সুপ্রশিক্ষিত একজনকে সহকারী হিসেবে আমার অভিযানে পাঠানোর জন্য। রাম সিংএর সঙ্গে তার রাজপুত সহকারী যশবন্ত সিংএর কথাও বলতে হয়, – সেও হাসিমুখে  নিষ্ঠাভরে তার দায়িত্ব পালন করেছিল। এই দু’জনেই আমার ফক্স টেরিয়ার কুকুর ‘ইওলিচ বেগ’কে খুব ভালোবাসত। মরু-পাহাড়ের কঠিন পথ পার হলেও দীর্ঘ রেলযাত্রার ধকল যদি সামলাতে না পারে ভেবে ওকে এই দু’জনের সঙ্গে ভারতে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। এর কয়েক মাস পর নভেম্বরের এক রাতে ওর সঙ্গে আবার দেখা হয়েছিল পাঞ্জাবের এক রেল স্টেশনে। আমি পৌঁছনোর কিছুদিন আগে থাকতেই ও অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, তারপর আমার দেখা পেতেই দিনকয়েকের মধ্যেই আবার চনমনে হয়ে ওঠে। কিন্তু আমাকে মাসখানেকের মধ্যেই অফিসিয়াল কাজে ইংল্যান্ডে ফিরতে হয়। প্রভুর সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা বা যে কারনেই হোক আবার অসুস্থ হয়ে পরে আমার অনুপস্থিতার সময় প্রিয় আল্পাইন কাশ্মীরেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে ‘ইওলিচ বেগ।’

শ্রীনগর ছাড়ার ঠিক এক বছর পর, ১৯০১ সালের ২৯শে মে, আমি কাশগড় থেকে ফারঘানার নিকটতম রাশিয়ান শহর ওশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। আমার ক্যারাভানের বহর অনেক ছোট হয়ে গিয়েছিল। ছটা শক্তপোক্ত পোনির পিঠে প্রত্নসামগ্রীভরা বাক্সগুলো চাপান হয়েছিল, আর একটা পোনি আমার ব্যক্তিগত মাল বহন করছিল। পোনিগুলোর দেখভালকারী লোক ছাড়া শুধুমাত্র সাদাক আখুন আমার সঙ্গে চলছিল। মরুভূমির দুষ্টু আত্মাদের (চরস খাওয়ার প্রলোভন থেকে) থেকে মুক্তি পেয়ে ও আবার শান্তশিষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কাশগড় থেকে ওশ পর্যন্ত যেতে সাধারণত আঠারো দিন লাগে। কিন্তু আমি সময় বাঁচাতে ভোর থেকে শুরু করে অনেক রাত পর্যন্ত ঘোড়ার পিঠে বসে বা হেঁটে এই দূরত্ব পার করেছিলাম দশ দিনে। 

গত সপ্তাহের প্রচণ্ড বৃষ্টি আর পাহাড়ের বরফ গলতে শুরু করায় পথের পাশ দিয়ে বয়ে চলা কিজিল-সু নদী উপচিয়ে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। রাশিয়ান সীমান্তে আলাইয়ের দিকে এগোতে এগোতে খালি ভয় হচ্ছিল জলের তোড়ে সঙ্গের সব জিনিসপত্র পোনি সহ ভেসে না যায়। আমাদের ভাগ্য ভালো অতি সতর্কতার সঙ্গে এগোনোর ফলে কাশগড় থেকে রওনা হবার পাঁচ দিনের মাথায় সন্ধ্যেবেলা রাশিয়ান সীমান্ত চৌকি ইরকেশতামে পৌঁছেছিলাম। সীমানা পার হতেই পুরো পরিবেশটাই বদলে গিয়েছিল। রাশিয়ান কাস্টমসের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা এম. ডোচেঙ্কো আমাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে চিনা সীমান্ত থেকে কয়েকশ গজ দূরের কসাক গ্যারিসনের দুর্গের নীচে অবস্থিত সুনির্মিত এক আরামদায়ক বাড়িতে নিয়ে তোলেন। বাড়িতে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে আমি ইউরোপে পৌঁছনোর অনুভূতি টের পেয়েছিলাম।

পরদিন সকালে যাত্রা শুরু করার পরপরই চারপাশের দৃশ্যও বদলে গিয়েছিল। কিজিল-সু উপত্যকার রুক্ষ পাথুরে জমি ছেড়ে পৌঁছে গেছিলাম ঘাসে ভরা আলপাইন ঢালে। পুরু হয়ে নরম তুষার জমে থাকার কারনে এই সময় তেরেক পাস হয়ে ওশে যাবার পথ বন্ধ থাকে।  তাই আমাকে আলাই নদী পার হয়ে তারিম এবং অক্সাসের মাঝ বরাবর কিছু জলাশয়ের ধার ঘেঁষে অনেক ঘুর পথে সমুদ্রতল থেকে ১২০০০ ফুট  উঁচু টাউন-মুরুন পাস হয়ে এগোতে হয়েছিল। রাতটা কেটেছিল প্রবল তুষারপাত আর ঝোড় হাওয়ায় শীতে কাঁপতে কাঁপতে। পরের দিনও আবহাওয়া খুব খারাপ ছিল ফলে পামিরের মাউন্ট কাউফম্যান এবং ট্রান্স-আলাই পর্বতের উঁচু শৃঙ্গগুলো দেখার সুযোগ পাইনি।

কিরগিজরা এখনও তাদের পশুর পাল নিয়ে চারণভূমিতে আসেনি। আরও বরফ গলার অপেক্ষায় আছে ওরা। সঙ্গে খাবার বেশী না থাকায় যে ভাবেই হোক তালদিক পাস পার হয়ে উত্তরের দিকের সমভূমিতে পৌঁছতেই হবে ঠিক করে জোর কদমে চলা শুরু করেছিলাম। বেশ খানিকটা চলার পর পৌঁছেছিলাম গুলচা থেকে পামিরের পথে সুপরিচিত রাশিয়ান দুর্গ ‘পামিরস্কি পোস্ট’এ যাবার রাস্তায়। কিন্তু পুরো রাস্তাটাই বরফে ঢাকা পরে ছিল, সঙ্গে শুরু হয়েছিল ভয়ংকর তুষারঝড়। ইরকেশতামের শুল্ক আধিকারিক একজন সাহসী রুশ মুসলিমকে আমাদের পথ প্রদর্শক হিসেবে সঙ্গে দিয়েছিল। সে না থাকলে তুষারঝড়ের মধ্যে পথ চিনে এগোন সম্ভব হত না। দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে সমস্ত মালপত্র সহ নিরাপদে অনেক রাতে পৌঁছেছিলাম ওচ-টোবের নির্জন কিরগিজ ব্লকহাউসে।  

এখান থেকে তিনদিন যাত্রা করার পর পৌঁছেছিলাম মনোরম গুলচা নদী উপত্যকায়। পাহাড়ের নীচু ঢাল ভেষজ গাছ ও ফুলে ছাওয়া আর ওপরের ঢালে পাইনের বন আমাকে কাশ্মীরের কথা মনে পড়িয়ে দিচ্ছিল। গুলচা উপত্যকা ও তা পার হয়ে আলাই নদীর ধার ধরে হাঁটার সময় বেশ কিছু কিরিগিজ পরিবারের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। উট ও পোনির পিঠের ওপর বেছান সুক্ষ কাজ করা কার্পেটের ওপর বসা ঝলমলে পোশাক পরা পুরুষ-মহিলাদের নিয়ে লটবহর সহ একের পর এক ক্যারাভান চলেছিল তাদের গ্রীষ্মকালীন আবাস আলাই নদীর ধারে ‘ইয়েলাকে।’

৭জুন অতি সমৃদ্ধ ফারঘানা উপত্যকা পার করে সন্ধ্যে নাগাদ ওশে পৌঁছেছিলাম। ইউরোপিয় প্রশাসনের ভাবধারায় অতি যত্নে তৈরি করা চাষের ক্ষেত আর পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা একের পর এক গ্রাম নিয়ে ফারঘানা উপত্যকা। মাত্র বছর পঁচিশ আগে রাশিয়ান জেনারেল স্কোবেলেফ ফারঘানা প্রদেশ দখল করে রাশিয়ান তুর্কিস্থানের অংশ করে তুলে সেনানিবাস তৈরি করেন।   

ফারঘানা জেলার প্রধান কর্নেল জায়তসেফ আমাকে ওশে অভ্যর্থনা জনিয়েছিলেন। ওনার অফিসের বাইরে আমাকে স্বাগত জানাতে মিং-বাশি এবং কিরগিজ প্রধানরা অপেক্ষা করছিল। এতো গন্যমান্য ব্যক্তিদের একসঙ্গে উপস্থিতি ভারতীয় সীমান্ত জেলার ‘কাছারি’র কথা মনে পড়িয়ে দিচ্ছিল। এখান থেকে বাড়িতে টেলিগ্রাফ করতে পেরে বুঝে গেছিলাম যে আমি সত্যিই পশ্চিমের সীমানায় পৌঁছে গেছি।  

ওশে একদিন বিশ্রাম নিয়েছিলাম। এখানেই সাদাক আখুন বিদায় নিয়েছিল। ছিন্ন হয়ে যাওয়া ভারতীয় তাঁবু ও অনান্য সরঞ্জাম অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাওয়ায় এখানে ফেলে দিয়েছিলাম। ওশ থেকে ঘণ্টা চারেক উর্বর সমভূমির মধ্যে দিয়ে গাছের ছায়া ঢাকা পথ ধরে পৌঁছেছিলাম আন্দিজানে। এই শহর ট্রান্স-ক্যাস্পিয়ান রেলওয়ের টার্মিনাস ষ্টেশন। ‘মস্কভিয়া নুমের’ হোটেলের আরামদায়ক বিছানা আর চেয়ার আমাকে দীর্ঘদিন পর ইংরেজ মফস্বল শহরের অনুভূতি দিয়েছিল।

পূর্ব ইউরোপের রাশিয়ান ভাগের বাণিজ্যিক শহর আন্দিজানের রেল স্টেশন পর্যন্ত চওড়া রাস্তার দু’পাশে সুসজ্জিত দোকান, বাড়িঘর আর অফিসের সারি। বিকেলে চার্চের মাঠে সুসজ্জিত সৈন্যবাহিনী সামরিক ব্যান্ড বাজায়। রাশিয়ান দখলের অনেক আগে থেকেই ফারঘানা প্রদেশের আন্দিজান গুরুত্বপূর্ন বানিজ্যিক কেন্দ্র ছিল। রেল যুক্ত হবার পর সেই গুরুত্ব বেড়ে আরও বেড়ে গেছে। রাস্তার দু’পাশের দোকানগুলোতে ইউরোপিয়ান, রাশিয়ান আর চিনা তুর্কিস্থানে উৎপাদিত পন্যের ঢল দেখে মনেই হয় না গত বছর ভয়াবহ ভূমিকম্পে শহরটা প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। মধ্য এশিয়ার প্রায় প্রতিটি জনজাতির উপস্থিতি শহর জুড়ে। এখানেই দেখা হয়েছিল কাশগরের এক ‘হাজি’র সঙ্গে। বছর খানেক আগে কাশ্মীরের শ্রীনগরে এক তুর্কি সরাইখানায় আমার সঙ্গে তার আলাপ হয়েছিল। সে চলেছিল বম্বে। মক্কায় হজ করে মিশর ও কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) ঘুরে কৃষ্ণ সাগর এবং ক্যাস্পিয়ান হয়ে স্বদেশে ফেরার জন্য রেলপথকে বেছে নিয়েছিলেন কাশগরি হাজি। ওর সঙ্গে দেখা হবার পর মনে হয়েছিল পৃথিবীটা কত ‘ছোটো’ হয়ে গেছে – এমনকি প্রাচ্যের জন্যও! 


১১ জুন ট্রান্স-ক্যাস্পিয়ান রেলে চেপে বসেছিলাম প্রত্নসামগ্রী নিয়ে ইউরোপের পথে। যাত্রা পথে মার্গিলান এবং সমরকন্দের প্রাদেশিক রাজধানীতে সাময়িক বিরতির সুযোগে এশিয়ার একটি অংশের ঐতিহাসিক ও প্রাচীন সংস্কৃতির খানিক ঝলক দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট প্রদেশের দুই গভর্নর জেনারেল চাইকোভস্কি এবং মেডিনস্কি আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন স্থানীয় জাদুঘরে সংগৃহীত প্রাচীন জিনিসপত্র দেখাতে। রাশিয়ান ভাযা জানা না থাকলেও স্থানীয় কর্মকর্তাদের যে সৌজন্য এবং সদিচ্ছার কোন অভাব ছিল না তা স্বীকার করতেই হয়। তৈমুরের আমলের অতুলনীয় স্থাপত্য নিদর্শন ভোলার নয়। মুঘল গার্ডেন দেখতে দেখতে বারবার কাশ্মীরের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। 

মার্ভে সাময়িক বিরতি আমাকে ইরানের মাটি ছোঁয়ার সুযোগ দিয়েছিল। গোক-টেপের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দিয়ে রেলপথ নিয়ে যায় ক্রাসনোডস্কে। সেখান থেকে ক্যাস্পিয়ান পার হয়ে বাকুতে যাই। তারপর পেট্রোভস্ক, রোস্টফ, পোডভোলোকজিস্কা, ক্রাকো, বার্লিন হয়ে দীর্ঘ ক্লান্তিকর রেলযাত্রার শেষে ২ জুলাই লন্ডনে পৌঁছই।

মরুভূমির বালির তলা থেকে উদ্ধার করা পুরাকীর্তিগুলিকে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে জমা করে খুব তৃপ্তি পেয়ছিলাম। কঠোর পরিশ্রমের পুরষ্কার ছিল এই মানসিক তৃপ্তি। পুরাকীর্তি ও আমার তোলা প্রায় আটশো ছবির নেগেটিভ ও প্লেটগুলো দীর্ঘযাত্রাতেও অটুট ছিল।

এই পুরাকীর্তিগুলো ঠিকমতো সাজিয়ে তার ক্যাটালগ তৈরি করাটা ছিল কঠিন কাজ। ভারত সরকার এই কাজের জন্য আমাকে এক বছরের জন্য ইংল্যান্ডে ডেপুটেশন দিয়েছিল। কিন্তু এই সময়ে কাজ না শেষ হাওয়ায় সেক্রেটারি ফর স্টেটস (ইন্ডিয়া) তা আরও ছ’সপ্তাহের জন্য বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমার বন্ধু মিস্টার এফ. এইচ. অ্যান্ড্রুজের একান্ত সহযোগীতা আর পরিশ্রমে এই সময়ের মধ্যে ‘প্রাথমিক প্রতিবেদন’ (Preliminary Report) তৈরি করতে পেরেছিলাম।

সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে ভারতে পাঞ্জাবের স্কুল পরিদর্শকের কাজে ফিরে আসার প্রস্তুতি শুরু করে দিলেও অধিকাংশ সময়টা কাটাতাম ব্রিটিশ মিউজিয়ামের বেসমেন্ট আমার সংগ্রহ করে আনা পুরাতত্ত্বগুলোর মাঝে। আর খালি মনে হত আবার যদি ফিরে যেতে পারতাম মরুভূমির মাঝে অপার শান্তির ভূমিতে!   

প্রাচ্যের নানা স্থানের ধ্বনিগত নাম এবং বানান আন্তর্জাতিক প্রাচ্যবিদদের কংগ্রেস দ্বারা অনুমোদিত এবং ভারতীয় সরকারি প্রকাশনাগুলির জন্য সরলীকৃত আকারে গৃহীত ধ্বনিগত লিপ্যন্তর পদ্ধতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। 

খেলার পাতায় সমস্ত ধারাবাহিক অভিযান একত্রে

Leave a Reply