টাইম মেশিন-একটি পুরোনো রেল স্টেশন আর অন্য এক জালিয়ানওয়ালাবাগের গল্প-রোজি সিং-বসন্ত ’২৬

এই লেখকের আগের লেখা যারা হারায় রূপকথায়

বিদায়বেলার বর্ষার আকাশ আর বকুল ফুলের ঘ্রাণ সন্ধের কাছাকাছি সময়টাকে ব্যাকুল করে তুলল। প্রগাঢ় শান্তি আর নিস্তব্ধতা চারদিকে। খানিক আগে অল্প বৃষ্টি হয়েছে। বড়ো বড়ো গাছেদের গায়ে সেই বৃষ্টি ছাপ। ছোট্ট একটি লাল রঙের অতি পুরোনো রেল স্টেশন জনপ্রাণীহীন, ঝোপঝাড়ে ঘেরা। কিন্তু তার মায়াময় রূপ আমায় আবিষ্ট করে ফেলে। স্টেশনের নির্জনতা অতিক্রম করে একটু দূর থেকে ভেসে আসছে ক্ষীণ সুর। অতিবৃদ্ধ, জীর্ণ পোশাক, কোলের কাছে ঝুলি, হাতে একতারা— আপনমনে গাছের নীচে বসে গাইছে, ‘তুমি যে গিয়াছ বকুল বিছানো পথে।’

ছোট্ট এই রেল স্টেশনটি ধন্য করে দিয়েছেন এক দেবদূত। যিনি এই পথ দিয়ে গিয়েছিলেন সুদূর চিকাগো শহরে। বিশ্বধর্ম সম্মেলনে উদাত্ত কণ্ঠে আমেরিকার ভাইবোনদের উদ্দেশে হিন্দু ধর্মের দর্শন এবং সকল ধর্মের মূলকথা এক তা বলেছিলেন। তাঁর দেশ ভারতবর্ষ সাম্য, সহিষ্ণুতা ও সম্প্রীতির দেশ। স্বামী বিবেকানন্দের মুখে সেই দিন হিন্দু ধর্ম ও তার দর্শন শুনে বিশ্ববাসী ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল হয়। ফিরেছিলেনও এ-পথ দিয়ে। জাহাজ থেকে নেমে শিয়ালদাগামী ট্রেনের অপেক্ষায় তিনি বিশ্রাম নিয়েছিলেন স্টেশনের একটি ঘরে। এর অনতিদূরে এক স্মৃতিসৌধ, জাহাজের আকারে তৈরি হর্ম্য— এক রক্তাক্ত সময়ের সাক্ষ্য বহন করছে। দিব্যজ্যোতি ঘিরে থাকে প্রাঙ্গণে।

আদিগন্ত-বিস্তৃত অনন্ত জলরাশির মধ্যে একদিন তিনশো ছিয়াত্তর জন যাত্রী নিয়ে হংকং থেকে কানাডার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল ‘কোমাগাতামারু’ নামের একটি জাহাজ। যাত্রীদের মধ্যে বেশি সংখ্যায় ছিল শিখ, কিছু মুসলিম এবং কিছু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। সময়টা প্রথম বিশ্বযুদ্ধকাল—১৯১৪ সাল। যিনি এই পুরো যাত্রার আয়োজন করেছিলেন, তিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত কানাডা-নিবাসী একজন কন্ট্রাক্টর। কাজের সূত্রে তিনি নানা দেশ ঘুরে বেড়াতেন এবং ব্রিটিশ শাসিত এলাকায় ভারতীয় শ্রমিকদের দুরবস্থা দেখে কিছু স্বজাতীয়কে রুজিরুটির ব্যবস্থা করে দিতে কলম্বিয়ায় নিয়ে যাবার কথা ভাবলেন। কোমাগাতামারু হংকং থেকে সাংহাই ও ইওকোহামা হয়ে পৌঁছল কানাডার ভ্যাঙ্কুভার বন্দরে। যাত্রীরা রোজগারের নতুন পথ ও নতুন জীবনের দিশা দেখতে পেয়েছিল। তারা অনেক আশা ও উৎসাহ নিয়ে এ-পথে পা বাড়িয়েছিল। কিন্তু জাহাজ থেকে যাত্রীদের নামতে দেওয়া হল না। কারণ, কানাডা সরকারের ইমিগ্রেশন আইন। এই আইন মান্য করে মাত্র চব্বিশজন যাত্রী নামতে পারল। বাদবাকি জাহাজে আটকে রইল। এই ইমিগ্রেশন আইন ছিল খুবই কঠোর, বিশেষ করে এশীয়দের জন্য। কোমাগাতামারু জাহাজের যাত্রীরা আশাহত হয়ে পড়ল। ওদিকে জাহাজ বন্দর ছাড়ছে না দেখে পুলিশ ভরতি দুটি লঞ্চ কানাডা সরকার পাঠালে জাহাজের যাত্রীরা বিক্ষোভ শুরু করল। ভ্যাঙ্কুভারে বসবাসকারী ভারতীয়রা তাদের সঙ্গে দেখা করতে এবং তাদের সাহায্য করতে চাইলে তা তৎক্ষণাৎ নাকচ হয়ে গেল। বন্দিদশায় কাটল দুটি মাস। মাঝে ঘটে যাওয়া সব দুঃখজনক ঘটনা কানাডা সরকার অগ্রাহ্য করে গেল। অবশেষে একটি যুদ্ধ জাহাজ পাঠিয়ে কোমাগাতামারুকে কানাডা বন্দর থেকে উৎখাত করে কানাডা সরকার জয়ের হাসি হাসল।

http://www.rarehistoricalphotos.com

শ্রান্ত, ক্লান্ত, অভুক্ত ও বিপর্যস্ত যাত্রীসহ কোমাগাতামারু পৌঁছল বজবজে। তখন সদ্য শেষ হয়েছে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব, দুর্গাপুজো। আগেই ঠিক হয়েছিল, এইসব যাত্রীদের কলকাতা বা অন্য কোথাও না নিয়ে গিয়ে বজবজ রেলপথে পাঞ্জাব নিয়ে যাওয়া হবে। এতদিনের বন্দিদশা ও অজানা উদ্বেগ নিয়ে কিছু শিখ যাত্রী হঠাৎ রেললাইন ধরে হাঁটতে থাকল কলকাতা অভিমুখে, হাতে তাদের ‘গ্রন্থ সাহেব’। কিন্তু ভাগ্যহত মানুষগুলো এবার পড়ল ব্রিটিশ শাসকদের নিষ্ঠুর অত্যাচারের কবলে। মিস্টার ইস্টউড তাদের বিপ্লবী মনে করে পুলিশবাহিনী নিয়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তারপর বিষয়টি অনুধাবন করে গুরুদিৎ সিংকে আলাপ আলোচনার জন্য আলাদাভাবে ডাকা হলে তিনি দল ছেড়ে যেতে রাজি হলেন না। শিখরা একজোট হয়ে রুখে দাঁড়াল। ইস্টউড তার মধ্যে গুরুদিৎ-এর কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে লাগলেন। এভাবে ক্রমশ ধস্তাধস্তি ইত্যাদির মধ্যে চলল গুলি। নিমেষে তা পরিণত হল দাঙ্গা ও লড়াইতে। মুহূর্তে রেল স্টেশনের ঠিক পাশের একটুকরো সবুজ জমি হয়ে উঠল রক্তিম। কেউ দিশাহীনভাবে ছুটতে থাকে, কেউ নদীপথে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে, কেউ ক্ষুধা ও আচ্ছাদনহীনতায় পাগলের মতো হয়ে যায়। ছিন্নভিন্ন মৃতদেহের স্তূপ আর রক্তে ভেজা ‘গ্রন্থ সাহেবের’ ছেঁড়া পৃষ্ঠার ওপর হেমন্তের বিষণ্ণ রাত নেমে আসে অতি দ্রুত।

ইংরেজদের মধ্যেও নিহত হন কয়েকজন। পাঁচ জন অফিসার আহত হন। কোমাগাতামারুর যাত্রীদের মধ্যে আহতের সংখ্যা গোনা যায় না। আর এই যাত্রার যিনি ছিলেন উদ্যোক্তা দলপতি বাবা গুরুদিৎ সিং একুশ জন শিখ-সহ পলাতক হন।

সময়ের সমুদ্রে সবকিছু মিশে যায় একদিন। বজবজের মাটিতে প্রথম যুদ্ধ হয়েছিল নবাব সৈন্য ও ইংরেজদের মধ্যে এবং দ্বিতীয় যুদ্ধ হল শিখ ও ইংরেজদের। সেদিনের এই ইঙ্গ-শিখ দাঙ্গা দিয়েই মহাযুদ্ধের সলতে পাকানো শুরু হয়ে গিয়েছিল।

তারপর কেটে গেছে অনেকগুলো দশক। শীত, বর্ষা, বসন্ত এসেছে ঘুরেফিরে। স্বাধীন ভারতে নতুন একটি রেল স্টেশন তৈরি হল বজবজে। পুরোনোটি রইল তার নিজস্ব গৌরবে, অতলান্ত স্মৃতির অন্তরালে।

অনেক পরে, কানাডা সরকার ক্ষমা চেয়ে ভ্যাঙ্কুভারের কানাডা প্লেসটিকে ‘কোমাগাতামারু’ নামে চিহ্নিত করে। অপরদিকে, সেই সবুজ রক্তিম জমিতে জাহাজ আকৃতির স্মৃতিসৌধ বানিয়ে বজবজ রেল স্টেশনটিকে ‘কোমাগাতামারু বজবজ’ নামে নামাঙ্কিত করা হয়। যদিও ততদিনে ব্যবধান দাঁড়িয়েছে একশো বছরের বেশি সময়। এই স্মৃতিসৌধ আজ এক তীর্থস্থান। পুরোনো রেল স্টেশন আর এই সৌধ আছে নিঃসঙ্গ পাশাপাশি যাপনে।

অসীম নীরবতা আর বড়ো বড়ো বৃক্ষঘেরা নির্জন এ স্থানে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামে তাড়াতাড়ি। কয়েকজন শিখ রমণী সৌধে আলো জ্বেলে দিয়ে গেছেন। তাঁরা এ-স্থানকে গুরুদোয়ারার মান্যতা দেন।

তাড়াতাড়ি উঠে হাঁটতে থাকি। বৃষ্টিভেজা পাতায় ঢাকা পায়ে চলা পথে একদল জাতীয়তাবাদীর পায়ের ছাপ। দূরে কালীবাড়ি খেয়াঘাটে জ্বলে উঠেছে অজস্র আলো। সেখানে জাহাজ নোঙর করা থাকে অনেক সময়। তার ছায়া পড়ে জলে। ঝুলি কাঁধে, হাতে একতারা নিয়ে বৃদ্ধ ভিক্ষুক কখন আমার পিছু নিয়েছে জানি না। শুনলাম তখনও গুনগুন করছে— ‘নিয়ে গেছ হায় একটি কুসুম, আমার কবরী হতে, তুমি যে গিয়াছ বকুল বিছানো পথে।’

 

Leave a Reply