শুভায়ন বসুর আগের গল্প- গল্প-তেরো তারিখ শুক্রবার

বাসে উঠে জানালার ধারের সিটটা ফাঁকা আছে দেখেই মনটা খুশি হয়ে গেল সায়ন্তনীর। কপাল ভালো, মনে মনে বলল ও, আজকের গোটা দিনটাই যেন এমনি ভালোভাবে কাটে। ইন্টারভিউটার ওপর ওর অনেক কিছু নির্ভর করছে। একটা ম্যাসিভ স্যালারি জাম্প, আর সেই সঙ্গে স্ট্যাটাসও। ছোট্ট অনামি অফিসটার ততোধিক ছোটো একটা কিউবিকলে আটকে থেকে, আর ঘেমো বসের বকবকানি শুনতে শুনতে মাথা ধরে যায় রোজ, আর ভালো লাগছে না। ও এবার একটু উড়তে চায়।
সিটে গুছিয়ে বসে সবে ব্যাগটাকে কোলের ওপর রেখেছে, অমনি পেছন থেকে কে যেন ডেকে উঠল, “মা।”
“কে?”
ঘাড় ঘুরিয়েও ও কাউকে দেখতে পেল না। পেছনে এক বয়স্কা মহিলা জানালার বাইরে উদাসভাবে তাকিয়ে রয়েছেন, আর তাঁর পাশের ভদ্রলোক চশমার আড়ালে অল্প ঢুলছেন।
গলাটা একটা বাচ্চা ছেলের। কিন্তু কোথায় কে? মনের ভুল ভেবে ব্যাগ থেকে পার্সটা বের করে বাসভাড়ার টাকাটা বার করতে গেল সায়ন্তনী। হঠাৎ ওর কানে কানে সেই গলাটা আবারও বলে উঠল, “মা, শু-শুনতে পাচ্ছ না? আমি।”
আবার ঘুরে ফিরে সবদিক দেখেও কাউকে দেখতে পেল না সায়ন্তনী। অবাক কাণ্ড! এ তো আশেপাশের কারও কাজ নয়। তাছাড়া কথাটা কানের কাছে এসে কেউ যেন ফিসফিস করে বলছে। এবার ও একটু ভয়ও পেল।
হঠাৎই সেই বাচ্চার গলাটা ওর কানে কানে বলতে লাগল, “মা, নে-নেবে যাও বা-বাস থেকে। নেবে যাও।”
ছেলেটা একটু তোতলা, আর কথাগুলো কানের ভেতর থেকে উচ্চারিত হয়ে যেন মাথার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। দিনদুপুরে ভূতুড়ে কাণ্ড। উশখুশ করে সায়ন্তনী। পাশে সবে বসা এক গোমড়া ভদ্রলোক একটু বিরক্ত হয়ে তাকান। তবে কি কথাগুলো ও একাই শুনছে? নাকি ওর মনের ভুল? অথচ এত স্পষ্ট কথা!
নাছোড়বান্দা গলাটা এবার অনুনয় করে বলে, “মা শি-শিগগির নেমে যাও পরের স্ট-স্ট-স্টপে। বা-বাস থেকে নেমে যাও মা।”
কে ওকে মা বলছে! বিয়েই হয়নি সায়ন্তনীর। সবে তো মাস কমিউনিকেশনটা পাশ করে এই বছরই চাকরিতে ঢুকেছে। এসব ভাবতে ভাবতে অস্বস্তিতে বাস থেকে তড়িঘড়ি নেমেই পড়ে ও। পরের স্টপেই। টেনশনে গলা দিয়ে আওয়াজ বের হয় না। কন্ডাক্টরকে বাসভাড়া দিয়ে পয়সা ফেরত নিতেও সেদিন ভুলে যায়।
বাস থেকে নামতেই গলাটা ফের কানে কানে বলে ওঠে, “এবার ওই বাঁ-বাঁদিকের রাস্তাটায় ঢু-ঢুকে পড়ো মা।”
মন্ত্রমুগ্ধের মতো হুকুম তামিল করে চলে সায়ন্তনী। রাস্তাটায় ঢুকে ও ফুটপাথ ধরে হাঁটতে থাকে আর পরবর্তী নির্দেশের জন্য কান খাড়া করে অপেক্ষা করে থাকে। ব্যাপারটা ভূতুড়ে হলেও ও কেমন যেন একটা আকর্ষণও বোধ করে বাচ্চাটার প্রতি। একটু চলার পর আবার গলাটা বলে, “এ-এবার ওই সামনের বা-বাড়িতে ঢুকে পড়ো, আর সো-সোজা চলে যাও তি-তি-তিনতলায়।”
তাই করে সায়ন্তনী।
কিন্তু এ কোথায় এসে পড়ল? এ তো একটা নামকরা নার্সিংহোম। তারই তিনতলায় এম.আর.আই-এর ফ্লোরে চলে এসেছে ও। বাচ্চাটা আবার বলে, “মা, তো-তোমার ব্রে-ব্রেন স্ক্যান করিয়ে নিতে হবে। এ-এখনই করিয়ে নাও।”
সায়ন্তনী সব অক্ষর অক্ষরে মেনে চলে। ও যেন কারও হাতের পুতুল। অবাক বিস্ময়ে ও দেখে, রিসেপশনিস্ট ঠিক তখন ওরই নাম ডাকছে, আর তার পরেই টেকনিশিয়ানরা ওকে ঢুকিয়ে দেয় এম.আর.আই রুমে। সায়ন্তনী দেখে, সেখানে সবরকম ফর্মালিটি আগে থেকেই করা রয়েছে। সায়ন্তনী তখনও ভাবছিল, যা ঘটছে তা কি সত্যি? না স্বপ্ন? কিন্তু অবিশ্বাসই-বা করে কী করে? গলাটা ওর কানে ভরসা জোগায়। বলে ভয় না পেতে। মা, মা করে ডেকে মন জয় করে নেয়। সায়ন্তনীও কেমন যেন এক বাৎসল্যের ভাবনায় ডুবে যায়। বাচ্চাটার সঙ্গে কথা বলতে খুব ভালো লাগে। শুধু যদি একটি বার দেখতে পাওয়া যেত!
বাচ্চাটা বলে, “মা, তোমার একটা ছোটো টিউমার হয়েছে ব্রেনে। এক্ষুনি অপারেশন করাতে হবে। না-হলে ব্যাপারটা খারাপ হবে।”
একটু বাদে সায়ন্তনীকে চেম্বারে ডেকে এম.আর.আই রিপোর্টটা দেখতে দেখতে চিন্তিত মুখে ডক্টর ব্যানার্জি বলেন, “খুব ঠিক সময়ে চলে এসেছেন, ম্যাডাম। তবে ভয়ের কিছু নেই, একটা ছোট্ট মেটাস্ট্যাটিক টিউমার আছে, এখনই ওটা অপারেট করতে হবে। আর একটুও দেরি করা যাবে না। বাড়ির লোককে নিয়ে আসেননি কেন? এক্ষুনি আসতে বলুন।”
সায়ন্তনী অবাক হয়ে দেখে, অপারেশনের সব ফর্মালিটি রেডি, এমনকি প্যাকেজের টাকাও আগে থাকতেই মেটানো হয়ে গেছে ।
সায়ন্তনীর বাবা-মা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে সব দেখে ভীষণ অবাক হয়ে যান। ইন্টারভিউ দিতে বেরিয়ে কেউ ব্রেন টিউমার অপারেশন করাতে নার্সিংহোমে ভরতি হয়ে যায় নাকি? ওঁরা বার বার সায়ন্তনীকে জিজ্ঞেস করেন, ওঁদের কাউকে কিছু না জানিয়ে ও কী করে এই ডিসিশনটা একা একা নিয়ে নিল? এতগুলো টাকাই-বা কীভাবে মেটাল? কোনও জবাব দিতে পারে না সায়ন্তনী। ও তখন ঘোরের মধ্যে। ডক্টরও ওঁদের উত্তেজিত হতে বারণ করেন। সায়ন্তনী কিছুতেই সেই তোতলা ছেলেটার কথা কাউকে বলতে পারে না। ভূতুড়ে গলার কথা কেউ বিশ্বাসই করবে না। ওর নিজের কাছেই এখনও কোনোকিছুই স্পষ্ট নয়।
ক’দিন পরেই একেবারে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরে সায়ন্তনী। নার্সিংহোমটি সেরা আর ব্রেন সার্জন ড. ব্যানার্জিও খুবই নামকরা। মাত্র ক’দিনের জন্য এসেছিলেন এ-দেশে, তারপরই আবার বিদেশে চলে গেছেন। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সায়ন্তনী আর ওর বাবা-মা। কিন্তু সায়ন্তনীর মনটা খারাপ। সেই দিনের পর থেকে গলাটা বেবাক হাওয়া হয়ে গেছে। আর কোনও নির্দেশ, উপদেশ বা অনুরোধ আসে না সেই অজানা বাচ্চাটার কাছ থেকে। মা ডাকটাও আর শুনতে পায় না সায়ন্তনী। বড়ো ভালোবাসা, বড়ো টান ছিল ডাকটার মধ্যে।
বছর দশেক পরের কথা। একটা ভালো এডিটোরিয়াল হাউসের উঁচু পোস্টে এখন কাজ করে সায়ন্তনী। বিয়েও করেছে বেশ কয়েক বছর। কৌশিক বড়ো একটা এফ.এম.সি.জি কোম্পানির জয়েন্ট ডিরেক্টর। ওদের একমাত্র ছেলে সৌভিক। সৌভিক একটু তোতলা।
জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস