জয়ঢাকের অভিযান লাইব্রেরি- এভারেস্ট-এরিক শিপটন(অনু-বাসব চট্টোপাধ্যায়) অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ(অনু তাপস মৌলিক) কন-টিকি অভিযান- থর হেয়ারডাল (অনু-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়)
সব পর্ব একত্রে-পর্ব ১, পর্ব ২, পর্ব ৩, পর্ব ৪, পর্ব ৫, পর্ব ৬

স্বেন হেডিন একাধারে একজন সুইডিশ ভূগোলবিদ, টপোগ্রাফার, অভিযাত্রী, ফটোগ্রাফার ও চিত্রশিল্পী। ১৮৬৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারিতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে জন্মগ্রহণ করেন। মৃত্যু: ২৬ নভেম্বর, ১৯৫২, স্টকহোম।
এই আত্মজীবনীতে নিজের জীবনভর অভিযাত্রার দুর্ধর্ষ সব অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেছেন হেডিন। রোমহর্ষক উত্তর মেরু অভিযানের নায়ক সুইডিশ অভিযাত্রী নর্দেনস্কিওল্ডকে দেখে অনুপ্রাণিত হন এবং পনেরো বছর বয়সেই ভবিষ্যতে উত্তর মেরু অভিযাত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। পরে তাঁর অভিযাত্রার গতিমুখ পরিবর্তিত হয়ে এশিয়ার দিকে ধাবিত হয়। নিয়তির ফেরে কাস্পিয়ান সাগরতীরের ঝড়ের শহর বাকুতে আসেন আর সেখান থেকেই যাত্রা শুরু করেন এশিয়ার পথে। শুরু হয় রাশিয়া, ককেশাস আর পারস্য হয়ে প্রায় সমগ্র এশিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অর্জন। বাধাবিঘ্ন বিপত্তির সম্মুখীনও হন প্রচুর। তুলে ধরেন দেশীয় সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূগোল আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিবরণ। গবেষণার নিরিখে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই লেখাচিত্র তারই সাক্ষ্য বহন করে। MY LIFE AS AN EXPLORER স্ভেন হেডিনের অসামান্য সৃষ্টি। ১৯২৬ সালে কাসেল অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড-এর হাত ধরে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়।
॥ সতেরো॥
তুষার অধিপতির বিরুদ্ধে কঠিন সংগ্রাম
মুজতাগ-আতার চতুর্দিকের অঞ্চলের একটা মানচিত্র তৈরির মনস্থ করলাম আমি। পরিচারকের দল আর ক’জন কিরগিজ বন্ধুদের নিয়ে ‘লিটল ব্ল্যাক লেক’ কারা-কুলের তীরে হাজির হলাম গিয়ে। উৎকৃষ্ট এক কম্বলের ইয়ুর্ট খাটানো হয়েছে সেখানে আমার জন্যে। পড়শিরা টক দুধ, তাজা দুধ, কুমিস (ঘোটকীর গেঁজানো দুধ) আর ভেড়া এনে দিল। দিনভর কাজ চলে। সন্ধেতে কিরগিজেরা আমাদের দেখতে আসে। আমি তাদের মুখে এ-দেশের গল্প শুনি। জোর বাতাস দিলে বা বৃষ্টি নামলে তখন ভেতরে বসে নোট লিখি, নয়তো কিরগিজদের ছবি আঁকি।

একদিন ফারগানা থেকে সঙ্গে আনা আমাদের পাহারাদার কুকুরটা গেল পালিয়ে। ক’দিন পর দলের সঙ্গে কারা-কুলের কাছে ঘুরে বেড়াচ্ছি, এমনি সময় হলদেটে-সাদা কাহিল এক কিরগিজ কুকুর এসে উদয় হল কোত্থেকে। ইসলাম বাই আর অন্যেরা মিলে পাথর ছুড়ে খেদিয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু পাক মেরেই ফিরে আসছিল সে। শেষে আমি বাধা দিলাম, থাকুক সঙ্গে। বেশ খানিকটা মাংস আর হাড়গোড় খেতে দেওয়া হল একে। অল্প ক’দিনেই আমাদের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠল ব্যাটা। নাম রাখা হল ইয়োলদশ, অর্থাৎ সহযাত্রী। সর্বক্ষণ আমার তাঁবুটি পাহারা দেয়, বড়ো বিশ্বস্ত সঙ্গী। পরবর্তী দশ মাস ধরে সে-ই ঘনিষ্ঠতম বন্ধু ছিল আমার। এক পাও ওকে ছাড়া কোত্থাও নড়তাম না আমি। তবে বড়ো দুঃখজনকভাবে সেও একদিন ছেড়ে চলে গেল আমাদের। সে অবশ্য অন্য গল্প, পরে বলছি।
মুজতাগ-আতার চারদিকে কিরগিজেরা নিজেদের ভেড়া, চমরী আর ঘোড়া চরায়। প্রত্যেক পরিবারেরই নির্দিষ্ট গ্রীষ্ম আর শীতকালীন চারণভূমি রয়েছে। জাতে মুসলমান হলেও তাদের মেয়েরা পর্দা করে না। মাথায় পাগড়ির মতো উঁচু একটা মস্তকাবরণ রাখে কেবল। নিজস্ব পশুদের লালনপালন নিয়েই তাদের জীবন। সূর্য অস্ত গেলে ভেড়াদের তাড়িয়ে এনে খোঁয়াড়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। আধা বুনো কুকুর নেকড়েদের পাহারায় থাকে। ভেড়া পালনে কঠোর পরিশ্রম করে মেয়েরা। ছানাদের যত্ন করে। জাব খাওয়ায়। পুরুষেরা বেশিরভাগ ঘোড়ার পিঠেই থাকে, একে অন্যের সাক্ষাতে যায়, কাশগরের বাজারহাটে ঘুরে, ঘোড়া আর চমরীদের দেখভালের তদারকি করে। ছেলেপিলেরা তাঁবুর চারধারে খেলে বেড়ায়। দেখতে শুনতে বেশ মিষ্টিটি। বাপের বুটজোড়া আর মাথায় ভেড়ার ছালের টুপি পরে পুরো উদোম আট বছুরে ছেলে সামনে দিয়ে হেঁটে যায়।
কুয়াশা আর ধোঁয়া ভেদ করে মুজতাগ-আতার উত্তর ঢাল ধরে এগিয়ে চলেছি আমরা। হিমবাহগুলো এখানে নীচে নামতে গিয়ে যেন থমকে গিয়েছে আচমকা। অসংখ্য আঙুলের মতো সারিক-কোল উপত্যকার ওপর ঝুলে আছে এক-একটা। এই পথে মাল টানা আর চড়ার জন্যে চমরীই নেওয়া হয়েছে কেবল। তবে এদের পিঠে চড়ে বেড়াতে গেলে খানিক ধৈর্যের প্রয়োজন। নাকে নোলকের মতো একখানা লোহার আংটা পরানো আছে বটে, এর রশি আবার গাইডের হাতে বাঁধা, তবুও যখন ইচ্ছে এদিক ওদিক রুখ দেয় ব্যাটারা।
উত্তুরে হিমবাহগুলো নিরীক্ষণের পর ক্যাম্প উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হল পাহাড়ের পশ্চিমে। এইবারে পায়ে হেঁটেই বেরিয়ে পড়লাম চারদিক খুঁটিয়ে দেখতে। চলেছি বিশাল আকৃতির বরফ-জমা সব ঝরনার পাশ ধরে। জানা গেল, ইয়াম-বুলাক আর ক্যাম্পার-কিশ্লাক হিমবাহে গিয়ে মিশেছে ওগুলো। পাশেই স্ফটিক স্বচ্ছ গলা বরফের ঝোরাগুলো নীলচে-সবুজ বরফের ওপর দিয়ে নাচতে নাচতে চলেছে। ইতিউতি গভীর ফাটল সব হাঁ করে আছে হিমবাহের গায়ে। আবার কোথাও দেখা গেল বিরাট বিরাট সব পাথরের চাঁই যেন মালভূমি বানিয়ে করে রেখেছে হিমবাহের মাঝে। দারুণ লাগে দেখতে।
৬ আগস্ট সূর্য উঠতে দেরি, ইয়াম-বুলাক হিমবাহের উত্তরে খাড়া এক খাঁজ ধরে নামতে শুরু করলাম আমি। সঙ্গে পাঁচ কিরগিজ আর সাতটা চমরী। চমৎকার আবহাওয়া। বেলা আটটার মধ্যে মন্ট ব্ল্যাংক-এর চুড়ো থেকেও বেশি উচ্চতায় পৌঁছে গেলাম আমরা। ১৬,০০০ ফুট ওপরে উঠে তবেই তুষার-রেখার (স্নো লাইন) দেখা পেলাম। তারপর থেকে তুষারের গভীরতা বেড়েই চলেছে। উপরিতলটা শক্ত হয়ে আছে জমে। ধীরে ধীরে এগোচ্ছে দল। চমরীগুলো ক্ষণে ক্ষণে দাঁড়িয়ে পড়ে দম নেয়। দুটো তো এমনই কাহিল হয়ে পড়ল যে ছেড়েই দিতে হল।
চলতে চলতে আবারও এক খাঁজের ধারে এসে হাজির হলাম। ঠিক নীচে ১২,০০০ ফুটের ইয়াম-বুলাক হিমবাহ। আরও হাজার খানেক ফুট ওপরে উঠেই মোল্লা ইসলাম আর দুজন কিরগিজ হাল ছেড়ে দিয়ে তুষারের ওপরেই কেতরে পড়ল। এইবারে দলে রইল আর মাত্র দুজন। তাদের আর দুটো মাত্র চমরী নিয়ে এগিয়ে গেলাম আমি। অনন্ত তুষারে এই অকর্মের পাহাড় চড়ায় বড়ো বাগড়া দিতে লাগল চমরী দুটো।
২০,১৬০ ফুট ওপরে উঠে এইবারে টানা এক বিশ্রামের প্রয়োজন হয়ে পড়ল আমাদের। চমরী দুটোও দেখি জিহ্বা বার করে হেদাচ্ছে। শ্বাস তো টানছে না, যেন কাঠ চেরাইয়ের কারখানায় করাত চলছে, এমনি শব্দ। আমাদেরও মাথাব্যথা শুরু হয়েছে প্রত্যেকেরই। সেখানেই বসে পড়ে তুষার খেতে শুরু করলাম আমরা। হুঁশ হল, আরও হাজার দু-এক ফুট উঠি যদি, অবশ্যই সঙ্গে খাবারদাবার আর তাঁবু থাকা উচিত তখন। তাছাড়া ২০,০০০ ফুট ওপরে রাত্রিবাসের প্রস্তুতিও চাই। আবার আসব মনস্থ করে সেদিনকার মতো ক্যাম্পে নেমে এলাম আমরা।
১১ আগস্ট তারিখে ফের একবার হিমবাহের পথ ধরে পাহাড় বাইতে শুরু করলাম। চাল-তুমাক হিমবাহের ঠিক দক্ষিণে আচমকাই এক খাড়া ঢাল, ওটা ধরেই উঠছি এইবারে। সঙ্গে নিয়েছি ছোটো একখানা কম্বল-তাঁবু। আর আছে খাদ্য ও জ্বালানি। ১৭,০০০ ফুট অবধি বেয়ে উঠে লম্বা বিশ্রামের দরকার হয়ে পড়ল এইবারে। দলের চমরী আর কিরগিজেরা থকে গিয়েছে।
দীর্ঘ সময় ধরে একটা গর্জন উঠছিল গোটা উপত্যকা জুড়ে। উপত্যকাটা এমনিতেই গভীর। তার ওপর এই কানফাটানো গর্জনের কোনায় কোনায় প্রতিধ্বনি। আসছে কোত্থেকে এই শব্দ? হিমবাহ করিডরের উত্তরে ঘিরে থাকা উল্লম্ব সব খাঁজ থেকে। এই পাহাড়ের উঁচুর দিকটা সম্ভবত বরফে ঢাকা। পাথুরে দেওয়ালের মাথায় মাথায় সব জমা হয়। তারপর নিজের চাপে নিজেই এসে হিমবাহে ভেঙে পড়ে। বিরাট বিরাট বরফের চাঙড় সব পিছলে এসে উঁচিয়ে থাকা পাথরে পড়ে সাদা সাদা গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে নিমেষে। ফেনিল স্রোতের ধারা যেন।
ওদিকে চারটে বুনো ছাগল দেখি এখানকার তুষার স্তরটুকু পেরোতে প্রচণ্ড ভয় পাচ্ছে। খানিকক্ষণ আগেও দেখেছি, হালকা ছাই ছাই ইয়াব্বড়ো দুই নেকড়ে শক্ত বরফের ওপর জোর তাড়া করল ছাগলের পালটিকে। কিন্তু এইখানটায় এসে থমকে গেল ওরাও।
পথে এইবারে বরফের চাঙড়ের ওপর দু-ফুট পুরু তুষার। আগের চাইতে বড়ো কঠিন হয়ে পড়ল বেয়ে ওঠা। দুই আঁটি সমতলের ঝাড় বাঁধা ছিল একটা চমরীর পিঠে। কাঠের মতোই পোক্ত। কিরগিজেরা ওগুলোকে তেরেস্কেন বলে। তো আমাদের মোল্লা ইসলাম সেইটিকে নিয়ে আগে আগে পথ দেখিয়ে চলেছে। হঠাৎ দেখি সেই চমরী উধাও। অদৃশ্য কোন ফাঁদে গিয়ে পা দিয়ে ফেলেছে। সবাই মিলে দৌড়ে গিয়ে দেখি পেছনের ডান পা, শিং আর তেরেস্কেনের আঁটি আটকে গিয়ে ঝুলে আছে আপদ। গজ খানেক চওড়া এক খাঁজের ওপর জমা তুষারে পড়েছে গিয়ে। ঠিক পেছনেই হাঁ করে আছে অন্ধকার এক অতল গহ্বর। ভাগ্যিস ব্যাটা নড়াচড়া করেনি একদম, নয়তো হারিয়ে যেত অতলে। কিরগিজেরা তাড়াতাড়ি চমরীটার পেট বেড় দিয়ে দড়ি বাঁধল একটা। অন্য চমরীগুলো তখন জান-প্রাণ দিয়ে টেনে তুলল একে।

অত্যন্ত সাবধানে ধীরে ধীরে ফের এগোতে লাগলাম আমরা। আরও একটা চমরীও ডুবেই যাচ্ছিল প্রায়। সঙ্গী কিরগিজদের একজনও মরতে মরতে বেঁচে ফিরেছে কোনোমতে পাথরের এক ধার ধরে ঝুলে পড়ে। আকাশ-নীল বরফের দুই খাড়া ঢালের মধ্যে গভীর এক ফাটলের পাশে এসে দাঁড়ালাম আমরা। তিন থেকে চার গজ চওড়া মুখ, সাত গজ গভীর। যতটুকু চোখ যায়, দু-দিকে বিস্তৃতি তার। আরও সাবধান হতে হল এইবারে। আর না এগোনোর সিদ্ধান্ত হল এখানেই। ১৯,১০০ ফুট ওপরে দাঁড়িয়ে আছি এখন।
ক্যাম্পে ফিরে আরও একবার বেয়ে ওঠবার মনস্থ করলাম। ইয়াম-বুলুক হিমবাহের উত্তরে ঢাল ধরে যাব এইবারে। সে-পথে আগে আরও দুইবার গিয়েছি আমরা।
২০,১০০ ফুট অবধি বেয়ে উঠতে গোটা একদিন সময় লাগল আমাদের। অতল খাদের ধার বেয়ে আগেও উঠেছি সেখানে। চমরীগুলো বেদম হয়ে পড়ল বেজায়। আর এগোব কি না মনস্থির করতে পারছিলাম না তক্ষুনি। ফলে রাতটা এখানেই বিশ্রাম নিয়ে পরদিন সকালে বেরিয়ে পড়াই সিদ্ধান্ত হল।
তুষার ফুঁড়ে লাঠির মতো বেরিয়ে থাকা ক’টা স্লেট পাথরে বেঁধে রাখা হল চমরীদের। ছোট্ট একটা ইয়ুর্ট খাটিয়ে ক’টা পাথরের সঙ্গে বেঁধে ফেলা হল। ভেতরে আগুন জ্বালানোর পর দেখা গেল চোখ জ্বালা করছে। চারদিক চাপা থাকায় ধোঁয়া বেরোতে পারছে না। দমবন্ধ লাগছে। আগুন ঘিরে তুষার গলে গিয়ে জল থইথই করছে। বাইরে বয়ে গিয়ে এই সন্ধেতেই আবার বরফ হয়ে যাচ্ছে মুহূর্তে। দুজন কিরগিজ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। কিছুটা বেশি বাতাস খেলছিল খানিকটা নীচে। ওখানেই নামিয়ে দিলাম তাদের। এদিকে আমাদের প্রত্যেকেরই পার্বত্য পীড়া শুরু হয়েছে—কান ঝনঝন, শুনতে পাই না ঠিক, নাড়ির বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে, শরীরের তাপমাত্রাও নেমেছে খানিকটা আর অনিদ্রা।
সূর্য ডুবতে বসেছে। তার বেগুনি আভাটুকুও ধীরে ধীরে বিদায় নিল মুজতাগ-আতার পশ্চিম ঢালে একসময়। তারপর দক্ষিণের হিমবাহের পাথুরে দেয়াল বেয়ে চাঁদ উঠল যখন, ইয়ুর্ট ছেড়ে অন্ধকারে বেরিয়ে এলাম তক্ষুনি। কী বলব, গোটা এশিয়া জুড়ে দেখা এ এক অন্যতম অপূর্ব দৃশ্য।
গিরিশৃঙ্গের মাথায় মাথায় চিরতুষারের গোটা অঞ্চল, হিমবাহ পুষ্ট অববাহিকা, হিমবাহের উৎসমুখ—সব রুপোলি আলোয় ভেসে যাচ্ছে। তবে বরফধারার গভীর খাঁজগুলো সব মিশমিশে কালো, অতলের আঁধার বিদ্যমান। তুষারের ওপর হালকা মেঘের আনাগোনা। অসংখ্য প্রেত যেন নেচে বেড়াচ্ছে আকাশে। পাহাড়ে এসে বেঘোরে মারা পড়া কিরগিজদের প্রেতাত্মাই হবে হয়তো। ফেরেশতাদের সঙ্গে পৃথিবীর অন্ধকার ছেড়ে জন্নতের আলো মেখে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথবা কে জানে, সেই জাদু নগরী জনাইদারের ভাগ্যবান বাসিন্দাও হতে পারে, অসীম এই তুষারক্ষেত্রের পূর্ণ আলোয় ‘তুষার পর্বতের অধিপতি’-কে ঘিরে প্রদক্ষিণ করে চলেছে অবিরাম।
আমরা তখন চিম্বোরাজোর সম উচ্চতায় দাঁড়িয়ে আছি প্রায়। কিলিমাঞ্জারো, মন্ট ব্ল্যাংক বা বলা ভালো চার-চারটে মহাদেশের সমস্ত পর্বতশৃঙ্গের চাইতেও উঁচুতে। এক এশিয়ার উচ্চতম শৃঙ্গটি আর আন্দিজ শুধু আমাদের চাইতে ওপরে। পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট এইখান থেকে আর ৮,৯৮০ ফুট উঁচুতে মাত্র। উপস্থিত যে অলৌকিক সৌন্দর্য আমার সামনে উন্মোচিত হয়ে আছে তা অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। মনে হচ্ছে অসীম এক মহাকাশের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছি আমি আর রহস্যময় সব জগতেরা তাকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে অনন্তকাল ধরে। যেন পা ফেললেই পৌঁছে যেতে পারি গ্রহ-নক্ষত্রের বুকে। সেখানে ইচ্ছে হলে পৃথিবীতে দাঁড়িয়েই চাঁদটাকে ছুঁয়ে দিতে পারি। মাধ্যাকর্ষণের দাস সেই পৃথিবী যে অনন্তকাল ধরে নিজের অক্ষে ঘুরে চলেছে এই কৃষ্ণকালো মহাকাশে।
সাদা তুষারের বুকে আমাদের তাঁবু আর চমরীদের ছায়া পড়েছে স্পষ্ট। পাথরে বাঁধা পশুগুলো নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে, তবে জাবরকাটার অদ্ভুত এক শব্দ উঠছে মাঝে মাঝে। নীচের পাটির দাঁত আর ওপরের মাড়ির অবিরাম ঘর্ষণের ফল। সঙ্গে খানিক পরপরই নড়াচড়ার ফলে খুরের চাপে তুষার ভাঙার মড়মড় শব্দ। আর তাদের শ্বাসের শব্দ তো আরও ভয়ংকর। ফোঁস ফোঁস করে নাকের ছিদ্র দিয়ে যেন বাষ্পের মেঘখণ্ড বেরোয় অবিরাম।
বিরাট দুই পাথরের ফাঁকে কিরগিজেরা আগুন জ্বেলেছিল, সেও নিভে এল। এই প্রতিকূল আবহাওয়ায় বিধ্বস্ত পর্বতারোহীরা সব বিড়বিড় করতে করতে মুখ নামিয়ে এনে শরীর গুটিয়ে শুয়ে পড়ে। কপালখানা ছুঁয়ে থাকে তুষারে।
ছোট্ট এই তাঁবুতে একটু ঘুমিয়ে নেবার বিফল চেষ্টা করলাম আমি। শীত মাত্রাতিরিক্ত ছিল না অবশ্য (১০ ডিগ্রি মাত্র), কিন্তু আমার পশমের কোটটা সিসের মতো ভারী হয়ে উঠল। শ্বাসকষ্টও হচ্ছিল খুব। ফলে উঠে বসতে হচ্ছিল বার বার।
ভোর হয়নি তখনও। কীসের এক গর্জন ভেসে এল কানে। মাত্রাটা বেড়েই চলেছে ধীরে ধীরে। আর সকাল হতে না হতেই একটা ঝড় এসে আছড়ে পড়ল আমাদের ক্যাম্পে। দেখতে দেখতে তুষার ঘূর্ণির দুর্ভেদ্য এক মেঘপুঞ্জ এসে ঘিরে ফেলল আমাদের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল ঝড় থামার অপেক্ষায়। একটা লোকও কিচ্ছুটি মুখে তুলছে না, প্রত্যেকেরই মাথাব্যথা। ভাবছি দুর্যোগটা থেমে গেলেই চুড়োর দিকে বেরিয়ে পড়ব তড়িঘড়ি। কোথায় কী, তার দাপট দেখি বেড়েই চলেছে উত্তরোত্তর। হতোদ্যম হয়ে বসে রইলাম অগত্যা। বসে বসে দুর্বুদ্ধি চাপল মাথায়। কিরগিজদের দুঃসাহস যাচাই করতে চমরীদের পিঠে মালপত্র তোলার আদেশ দিলাম, এই ঝড়েই বেরিয়ে পড়ব। মেনেও নিল সবাই। তারপর যেই না আমাদের নীচের ক্যাম্পে ফিরে যাবার কথা বললাম, অমনি খুশি আর কৃতজ্ঞতায় চকচক করে উঠল তাদের চোখ।
নীচে নামছি। দুজন মাত্র লোক সঙ্গে। মস্ত এক কালো চমরীর পিঠে আমি, হাতির শক্তি গায়ে তার। নিজের ইচ্ছেমতো পথ চলেছে সে, কোনোরকম বাধা বা নির্দেশ দিচ্ছি না আমি। তীব্র ঘূর্ণিতে মুখের সামনে হাতখানা মেলেও কিচ্ছুটি দেখা যাচ্ছে না। ওদিকে কখনও ধীর হেঁটে, কখনও লাফিয়ে চলেছে চমরী। এক ঝাঁপে অনেকটা পথ পিছলে যাচ্ছে তুষারের ওপর। যেন তীব্র স্রোতের মাঝে ডলফিনের মতো ডুব দিয়ে ভেসে উঠছে আবার। প্রাণপণে হাঁটু চেপে বসে আছি, কখন ছিটকে পড়ি জিন থেকে, পেট মোচড় দেওয়া এমন ঝাঁকুনি। ঝাঁপের তালমতো ইয়াকের পিঠে শুয়ে পড়ছি আর পরক্ষণেই তার শিংজোড়া আমার পেটে টের পাচ্ছি। যাক, তুষার ঝড়টা কাটিয়ে পেছনে ফেলে এলাম একসময়। ক্যাম্পেও নেমে এলাম নিরাপদেই। এই ক্যাম্পের উচ্চতা ১৪,৯০০ ফুট, সিয়েরা নেভাদার মাউন্ট হুইটনির চুড়োর সমান।

তুষার-পর্বত অধিপতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম শেষ হল আমার। এই পর্বতে আমার উৎসাহ ফুরিয়েছে, এইবারে ফের পামিরস্কি পোস্টে ঝটিতি এক সফরে যাব বলে মনস্থ করলাম। কিন্তু রাশিয়ার সীমান্ত পেরোতে হবে চিনাদের চোখ বাঁচিয়ে। সামান্য সন্দেহ হলেই এই অঞ্চলে আর ফেরত আসতে দেবে না। অতএব আমার ঝোলা-কম্বল রইল দূরে এক কিরগিজ ইয়ুর্টে, আর দুজন লোক নিয়ে মাঝরাতে রওনা হয়ে গেলাম আমি। সুতোর মতো দুর্গম এক গোপন পথ ধরে রাশিয়ার সীমান্তে চলেছি। চাঁদের আলোয় দূরে দূরে কিরগিজদের নিঝুম তাঁবু-গাঁ চোখে পড়ে। ভাগ্যিস ওদের কুকুরগুলো সাড়াশব্দ করেনি কোনও। তুষার ঘূর্ণির মাঝেই মুস-কুরাউ গিরিপথ পাড়ি দিয়ে নিরাপদেই একসময় রাশিয়ার মাটিতে পা রাখলাম আমরা।
বেশ কঠিন ছিল পথটা। আমার কুকুর ইয়োলদশের থাবায় ফোস্কা পড়ে গেছিল, ফলে মোজা পরাতে হল পায়ে। এসব বিচ্ছিরি পোশাকআশাকে আবার ঘোর আপত্তি তার। পেছনের পা দুটো ওপরে তুলে কেমন উবু হয়ে হাঁটে। বার বার এতে পেছন দিকে উলটে পড়ছিল সে। তখন তিন পায়ে দৌড় শুরু করল পালা করে পেছনের এক পা তুলে।
ক্যাপ্টেন সাইতসেফ এবং আরও দুজন অফিসারের সঙ্গে পামিরের বিরাট এক অংশে ঘুরে বেরিয়েছি আমি। দারুণ সুন্দর এক আল্পাইন লেক ইয়েশিল-কুলের তীরে তাঁবু ফেলে থেকেছি। তারপর চুপিচুপি চিনা ভূখণ্ডে ফিরে এসেছি আবার। পৌঁছে শুনি চিনেরা নাকি খবর নিচ্ছিল আমার, সন্ধানও চালিয়েছে নাকি। ওদিকে যে কিরগিজ লোকটির কাছে আমার বাক্স-প্যাঁটরা রেখে গিয়েছিলাম, তার তো প্রাণ উড়ে যাবার দশা ভয়ে। বুদ্ধি করে এক পাথুরে জমিতে দুই পাথরের মাঝে সেসব লুকিয়ে এসেছে নিজের ওপর সন্দেহ এড়াতে। ৩০ সেপ্টেম্বরে যেদিন কারা-কুলের পুব পাড়ে আমার ইয়ুর্ট খাটানো হল ফের, ততদিন অবধি কাকপক্ষীতেও টের পায়নি যে গুনে গুনে বারোটি দিন আমি কাটিয়ে এসেছি রাশিয়ার ভূখণ্ডে।
আমার হেড কোয়ার্টার কাশগরে ফিরে যাবার আগে একটা কাজ বাকি রয়ে গিয়েছিল তখনও। এই লেকের শব্দ রেকর্ড করতে চাইছিলাম আমি। কিন্তু একটা নৌকোর চিহ্নও দেখতে পেলাম না কোথাও। কিরগিজেরা কেউই দেখা দূরে থাক, নৌকো কী জিনিস শোনেইনি কখনও। অগত্যা কাঠ আর কাগজ দিয়ে নৌকোর একটা মডেল বানিয়ে দেখাতে হল এদের। পাশাপাশি আসল একখানা নৌকো বানাতে লেগেও পড়লাম ইসলাম বাইকে সঙ্গে নিয়ে।
একটা ঘোড়ার আর একটা ভেড়ার ছাল একত্রে সেলাই করে নিয়ে পাঁজরের খাঁচায় ছাউনি দেওয়া হল। অন্য হাড়গোড় কাজে লাগিয়ে দাঁড় ও মাস্তুল বানানো হল। হাল হিসেবে জুতে দেওয়া হল একটা কোদাল। দারুণ একখানা নৌকো তৈরি হয়ে গেল শেষ অবধি। খাঁজকাটা বোঁচা সার্ডিন টিনের মতো দেখতে হল অনেকটা। ডানে (স্টারবোর্ড), বাঁয়ে (পোর্ট) আর পেছনে (স্টার্ন) ছাগলের মোটা চামড়া বেঁধে দেওয়া হল ব্যালেন্স ঠিক থাকে যাতে। দেখেশুনে বড়ো মজা পেলাম। মনে হচ্ছিল প্রাগৈতিহাসিক কোন প্রাণী বসে তা দিচ্ছে নিজের ডিমে। একজন কিরগিজ বলে কিনা, নৌকো জিনিসটা দেখতে এমনতর হয় কল্পনাও করতে পারেনি সে। ওদিকে তোগদাসিন বেগ দেখেই হাঁ হাঁ করে উঠল— “একদম মারা পড়বে সাহেব, এ-জিনিস জলে নামলেই ডুবে যাবে। তার চেয়ে দু-দিন রোসো, লেকের জল জমে যাক।”
আমি কি আর ওসব শোনার পাত্র? এই নৌকাই কী সুন্দর বয়ে নিয়ে চলল আমাকে। সঙ্গে আসা তুরদু নামের কিরগিজটিও নৌকো বাইতে শিখে গেল অনায়াসে। নৌকো জলে নামাবার আগে লোকজন সব দেখতে এসেছিল ভিড় করে। স্ত্রী-পরিবারসুদ্ধ চুপচাপ লেকের পাড়ে দাঁড়িয়ে আমাদের কাণ্ডকারখানা দেখছিল সবাই। নিশ্চয়ই ভেবেছে আমি পাগল হয়ে গেছি নির্ঘাত। অপেক্ষায় ছিল ওই ফটিকের মতো টলটলে জলে কখন ডুবে মরি।
বিভিন্ন দিক ধরে লেকের জলে চারদিক ঘুরে বেড়ালাম আমি। লেকের সবচাইতে লম্বা পথটি ধরলাম একদিন, দক্ষিণ থেকে উত্তরে। দক্ষিণ তীর থেকে রওনা হয়ে বেশিদূর এগোতেও পারলাম না, দখিনা বাতাসের এক ঘূর্ণিঝড় এসে আছড়ে পড়ল আমাদের ওপর। নৌকা টলোমলো। পাহাড়ের মতো সাদা ফেনার ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে এক-একটা। এদিকে বেয়াড়া চমরীর মতো থেকে থেকে লাফিয়ে উঠছে নৌকো। প্রাণপণে হাল ধরে বসে রইলাম আমি। এমনি সময় পেছনের গলুইটা ডুবে গেল হঠাৎ। আর তক্ষুনি উত্তাল এক ঢেউ এসে আমার ওপর দিয়ে গিয়ে আছড়ে পড়ল নৌকোর আধাআধি। একদিকের ছাগলের মোটা চামড়াটা ঢিলে হয়ে গেল তখন আর বুনোহাঁসের মতো ভাসতে লাগল ঢেউয়ের মাথায় মাথায়। এদিকে হিমশীতল এক-একটা ঢেউ এসে বার বার ভিজিয়ে দিচ্ছে আমাদের। তুরদু প্রাণ ভিক্ষার প্রার্থনা শুরু করল, আর আমি ওই কোদালের হালটুকু দিয়ে ঢেউ আটকাবার চেষ্টা করে চলেছি প্রাণপণে। নৌকো তখন একটু একটু করে ডুবছে। ওদিকে বাতাসের দাবড়ানি খেয়ে স্টারবোর্ডে বাঁধা ছাগলের চামড়াটাও পি পি ডাক তুলেছে বাঁশির শব্দে। সাংঘাতিক বিপদের মুখে তখন আমরা। অতল জলের খাদ হাঁ করে আছে সামনে। পাড় অবধি কি ভেসে যেতে পারব আর? নাকি তোগদাসিন বেগের কথাই সত্যি হতে চলেছে শেষে? কিরগিজেরা দেখি কেউ ঘোড়ায় চড়ে, কেউ দৌড়ে এসে ভিড় জমাচ্ছে লেকের পাড়ে, দুই অভাগার এই সলিলসমাধি স্বচক্ষে চাক্ষুষ করবে বলে। যাই হোক, ঠাঁই-টাই পেয়ে একসময় পাড়ে উঠে এলাম কোনোমতে। ভিজে চুপ্পুস।

আর একদিন সন্ধের মুখে গিয়ে নামলাম লেকে। উত্তরের পাড়টা ছেড়ে শ-কতক ফুট এগিয়েছি মাত্র, অমনি উত্তুরে বাতাসে ভর করে দানবের মতো ঝড় আছড়ে পড়ল লেকের জলে। ঝুপ করে অন্ধকার নেমে রাত হয়ে গেল। তবে ভাগ্যিস সেদিন চাঁদ ছিল আকাশে। দাপিয়ে ঝাঁপিয়ে ঝড়টাও বন্ধ হল কিছুক্ষণ পর। চোখ চেয়ে দেখি ইসলাম বাই আগুন করেছে লেকের তীরে। পথ হারানো নাবিকের আচমকা বাতিঘর নজরে এলে যেমনটা হয়, তেমনই ধড়ে প্রাণ ফিরে পেলাম যেন। এর মধ্যেও মাপ নিতে ভুলিনি লেকের। শব্দের প্রতিধ্বনিতে সবচাইতে গভীর মাপ পেলাম ৭৯ ফুট।
তারপরও বার বার তুষার-ঝড় আর শিলাবৃষ্টিতে আটক থেকেছি তাঁবুতে। কিরগিজেরা তখন দেখা করতে আসত, একঘেয়ে লাগেনি। নিজেদের দুঃসাহসিক অভিযান আর অভিজ্ঞতার গল্প বলত। কখনো-বা সুখদুঃখের কথা কইত। ওদিকে এক ছেলে সুন্দরী নেভ্রা খানের প্রেমে পড়েছে। কিন্তু মেয়ের বাপকে কলিম (কন্যাপণ) দেওয়ার ক্ষমতা নেই। আমার কাছে হাত পেতে দাঁড়াল এসে। এদিকে আমি নিরুপায়। ওসবে খরচা করবার মতো পয়সা তো নেই আমার কাছে।
ততদিনে গোটা পামিরে গুজব ছড়িয়েছে যে এক ইউরোপবাসী এসে ঘাঁটি গেড়েছে। সে হরিণের মতো লাফিয়ে মুজতাগ-আতা ডিঙোয়, বুনোহাঁসের মতো লেকের জলে চরে বেড়ায়। কথাটা ফুলে-ফেঁপে দিকে দিকে চাউর হতে সময় নিল না। সম্ভবত আজও সেখানে কান পাতলে শোনা যাবে এইসব গালগল্প।
কিরগিজদের সঙ্গে এক্কেবারে মিলেমিশে গিয়েছি ততদিনে। বেরিয়ে গেলাম যেদিন, বিদায় জানাতে এসে গলা বুজে আসছিল তাদের। এ ক’দিনে এদেরই আপনজন হয়ে গিয়েছিলাম যে। লাগামছাড়া জীবন তাদের, কিন্তু তাতে প্রাণ নেই। তীব্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর আর্থিক সংকটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই জীবন কেটে যায় বেচারাদের। তারপর একদিন কবরে চলে যায়। সেই সাদামাটা গম্বুজের তলায় বসে কোনও পীর হয়তো ঝিমোন বসে বসে।
নতুন এক পথে কাশগরে ফিরে এলাম এইবারে। বসে বসে এ-যাবৎ আমার সন্ধান-বৃত্তান্তের হিসেবনিকেশ ও নোট লেখার কাজ সারলাম এখানে।
৬ নভেম্বর তারিখে কনসাল পেত্রোভস্কির খাওয়ার ঘরের টেবিলে ফুটন্ত সামোভার ঘিরে বসে আছি সবাই। এমনি সময় এক কসাক ডাকিয়া ঢুকল হন্তদন্ত হয়ে। একটা টেলিগ্রাম তুলে দিল কনসালের হাতে। অল্প কথায় খবর এল যে তৃতীয় আলেকজান্ডার পরলোক গমন করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল সবাই। রাশিয়ানরা বুকে ক্রস আঁকল। স্বভাবতই স্পষ্টত শোকাহত হয়ে পড়ল সবাই।
দেখতে দেখতে বড়দিন এসে গেল আবার। মি. ম্যাকার্টনি, ফাদার হেনড্রিকস আর আমার স্বদেশী হোগলান্ডের সঙ্গেই কাটালাম দিনটা। হোগলান্ড একজন মিশনারি। অল্প ক’দিন আগেই পরিবার সমেত এসে পৌঁছেছে কাশগরে। মাঝরাতে ফাদার হেনড্রিক বেরিয়ে গেলেন দলবল নিয়ে নিজের ছোট্ট বসত ঘরটিতে ক্রিসমাস উদযাপন করবেন বলে। দুটো জিনিসই তো তাঁর সম্বল, মদের পিপে আর একপ্রস্থ ক্রুশবিদ্ধ যিশু। বেশ মায়া হল আমার একা মানুষটির ওপর। এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে সুপ্ত জনপদের পথে একা হেঁটে চলেছেন নিজের গন্তব্যে।

ক্রমশ