অমিত দেবনাথের আরো গল্প- ওরা, অতলের ইশারা মূল-আর্থার কোনান ডয়েল, আসল নকল-বিল প্রনজিনি, নয় মাইল হাঁটা হ্যারি কেমেলম্যান, দখল ফিলিপ কে ডিক, ফাদার ম্যাকক্লেসফিল্ডের কাহিনি -রবার্ট হিউ বেনসন, ইংরিজি গল্প-ভয়ানক এক রাতের গল্প কোনান ডয়েল–নাইট অ্যামং দ্য নিহিলিস্ট, ইংরিজি গল্প-আগে আমার কথা শোন জন ম্যাকলে, ইংরিজি গল্প -একটা লোকে্র গল্প ডাবলিউ ডাবলিউ জ্যকব্স্, ইংরিজি গল্প-আর কিছুক্ষণ ডব্লিউ এফ হার্ভে-আগস্ট হিট, ইংরিজি- পোড়া বাড়ি ভিনসেন্ট ও’সুলিভান, ইংরিজি-সাইন অব ৪০০রয় ম্যাকার্ডেল,ইংরিজি-এক সন্ধ্যায় শার্লক হোমসের সঙ্গে জেমস ম্যাথিউ ব্যারি।, ইংরিজি জোর বরাত-শিয়ার্লাকস্ট্যানলি জ্যাক রুবিনস্টাইন, ইংরিজি- কাপড়-মেলা দড়ির রহস্য ক্যারোলিন ওয়েলস , সুমাত্রার দানব ইঁদুর , বিদেশি গল্প–শার্লক হোমস ও ড্রুড রহস্যএডমণ্ড লেস্টার পিয়ার্সন। অনুঃ অমিত দেবনাথ, হারানো হিরের রহস্য জর্জ এফ ফরেস্ট, কথোপকথন- আর্থার চ্যাপম্যান, বিড়ম্বিত মধুচন্দ্রিমা, হ্যালোউইন ম্যান, কাঠচেরাই কলের ভূত

ছবিটা এইরকম—
সন্ধে হয়ে এসেছে। গনগন করে জ্বলছে ফায়ার প্লেসের আগুন। একদিকে লইস পিসি চা করছে, কেটলি চামচের ঠুনঠুন আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে; অন্যদিকে বসে ঠাকুমা নীলচে রঙের একটা উলের মোজা বুনছে। চেয়ারে বসে আছে স্যাম এবং আমি আর হ্যারিয়েট তার হাঁটুর কাছে বসে ঘ্যানঘ্যান করছি— স্যাম, একটা গল্প বলো না!
এ হল আমাদের ছোটবেলার গল্প। তখন কিছুই ছিল না। না কোনও পত্রিকা, না কোনও দৈনিক সংবাদপত্র যাতে ধারাবাহিক লেখা থাকত। সপ্তাহে একদিন বস্টন থেকে ‘দি কলাম্বিয়ান সেন্টিনেল’ (The Columbian Sentinel) নামের খবরের কাগজটা আসত বটে এবং তাতে সামান্য কিছু খবর আর সম্পাদকীয় থাকতও, কিন্তু তাতে আমাদের প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মনের মতো বিষয় যেমন চিত্রকাহিনি, গল্প-উপন্যাস বা কবিতা এসব কিছুই ছিল না। তখন আমাদের ওল্ডটাউনে কোনও থিয়েটার বা অপেরা ছিল না, কোনও পার্টি হত না, বল নাচের আসরও বসত না। অনুষ্ঠান বলতে হয়তো ছিল বার্ষিক ভোট বা থ্যাংকস গিভিং-ডে-র উৎসব পালন। কাজেই, যখন শীতকাল আসত, সূর্য পাটে বসত বিকেল সাড়ে চারটেয়, সামনে থাকত সুদীর্ঘ অন্ধকার রাত, তখন বিনোদনের বিষয়টা জরুরি হয়ে উঠত। সেই সময় চিমনির পাশে বসে জমিয়ে গল্প বলাটাও একটা শিল্প এবং কৃতিত্ব হিসেবেই গণ্য হত। সমাজে তখন সময়ের সঙ্গে পালটাতে থাকা বহু গল্পকথা আর রহস্য প্রচলিত ছিল। দাউদাউ করে বাড়া-কমা আগুনের চুল্লির পাশে বসে সেইসব গল্প আর রহস্যকথা শুনত মনোযোগী শ্রোতারা, আর গল্পের সাময়িক বিরতির স্তব্ধতাগুলো ভরাট হত ঝিঁঝিঁপোকার ডাকে।
বয়স্করা গল্প বলত ছোটোদের পুরোনো দিনের গল্প, আর কতরকম বিষয়— যুদ্ধ, অভিযান আর জঙ্গলের গল্প, রেড ইন্ডিয়ানদের হাতে বন্দি হওয়া আর পালানোর গল্প, ভাল্লুকের গল্প, প্যান্থারের গল্প, র্যাটল সাপের গল্প, ডাইনি আর জাদুকরদের গল্প, আশ্চর্য সব কল্পনা, অদৃষ্ট আর দুর্বিপাকের গল্প।
ম্যাসাচুসেটসের সেই আদিম দিনগুলোতে বাতাসে মিশে থাকত গভীর বিশ্বাস। নিউ ইংল্যান্ড (New England)-এর দুই-তৃতীয়াংশই তখন ঘন অরণ্যে ঢাকা, যার ফাঁকফোকর দিয়ে বয়ে যেত রহস্যময় শীতের ঝোড়ো হাওয়া—অদ্ভুত শব্দ, গোঙানি আর চিৎকারকে সঙ্গে নিয়ে। ভয়ংকর আটলান্টিক লোহা বাঁধানো পাড় ধরে আছড়ে ফেলত গোঙাতে থাকা ঢেউগুলোকে। সে যেন বুঝিয়ে দিত, যেসব কণ্ঠ আগেকার দিনের নিশ্চিন্ত সভ্য জীবনের কথা বলতে চায়, তাদেরও সে এই ঢেউয়ের মতোই আছড়ে ফেলবে আর মুখ বন্ধ করে দেবে; চিরকালের মতো বন্দি করে রাখবে এই বিজন প্রদেশে। কাজেই, সেই সময় একজন উঁচুদরের গল্প বলিয়ে সবার কাছেই বিশেষ কদর পেত। অবধারিতভাবেই তার স্থান হত ফায়ার প্লেসের সামনের চেয়ারটায়। বাচ্চারা গল্প শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে বসে থাকত তার চারপাশে। আর আশেপাশের যত পুরোনো শহর আছে, তার মধ্যে সেরা গল্প বলিয়ের নাম ছিল স্যাম লসন।
“কী হল স্যাম, বলো।” বড়ো বড়ো নীল চোখ মেলে রীতিমতো বায়না জুড়ে দিল হ্যারিয়েট। স্যামের ওপর তার অটল ভক্তি।— “এমন গল্প বলবে, যেটা একদম অন্যরকম হবে সবার চেয়ে।”
স্যাম একদৃষ্টে আগুনের দিকে তাকিয়ে ছিল। ওর উচ্চারণটা একটু অন্যরকম, তবে বুঝতে খুব একটা অসুবিধে হয় না। এবার বলল, “জানি বাবা, অনেক অদ্ভুত ঘটনা জানি আমি। সেসব যদি বলি, লোকে অবশ্য
বিশ্বাস করবে কি না জানি না।”
“বলো, এক্ষুনি বলো।” আমরা সমস্বরে বলে উঠলাম।
“এমন গল্প বলব না, ভয়ে হাত-পা পেটের ভেতর সেঁধিয়ে যাবে।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, ভয় পাবো না আরও কিছু! আমাদের ভয় দেখানো অত সহজ নয়।” আমরা বললাম।
কিন্তু স্যামকে তো আমরা চিনি। ঘ্যানঘেনে ব্যাপারটা যতক্ষণ বিরক্তির পর্যায়ে না যাবে, ততক্ষণ সে মুখই খুলবে না। সে বড়ো চিমটেটা দিয়ে অগ্নিকুণ্ডের কাঠগুলোকে খুঁচিয়ে এমনভাবে কয়লার আগুনটাকে চারদিকে ছড়িয়ে দিতে শুরু করল, যেন ওইটাই এখন সবচেয়ে বড়ো কাজ।
“একটু জোরে বোলো, স্যাম।” লইস পিসি বাসন ধুতে ধুতে ঘাড় ফিরিয়ে বলল। গল্প শোনার আগ্রহ কারোরই তো কম নয়!
“ব্যস্ত হয়ো না মিস লইস,” বলল স্যাম লসন, “আগে আগুনটাকে ঠিক করি, দেখছ না কাঠগুলো টুকরো হয়ে গেছে।” বলেই সে ঝুঁকে পড়ল ফায়ার প্লেসের সামনে। একটা ঝাড়ন দিয়ে ঝাঁট দিতে লাগল সেখানটায়। আগুনের আঁচে উজ্জ্বল লাগছিল ওর রোগা চর্বিহীন শরীরটা।
চুল্লির ওপর, নীচ আর আশপাশটা ভালো করে ঝাড়ন দিয়ে পরিষ্কার করল সে। ঝাড়ন চালানোর হাওয়ায় ছাইয়ের গুঁড়োগুলো আবার উড়ে উড়ে আসছিল, সেগুলো সে জ্বলন্ত চুল্লির দিকেই সরিয়ে দিচ্ছিল আবার। ফলে তার আঙুলের ডগাগুলো লাল হয়ে উঠল। তারপর বলল সে, “এইবার মোটামুটি কাজটা হেপসির মতো হল। আমি অবশ্য সবসময় চুল্লির আশপাশটা ঝেড়ে দিই। আগুন জ্বালালে ওটাও করা উচিত। হেপসির কাছে অবশ্য এটা কোনও গুরুত্বপূর্ণ কাজই নয়। সারাক্ষণই আমাকে এই কাজ করতে দেখে তো। সাধে কি যাজক লথ্রপ সাহেব তাঁর অনুশাসনে বলেছেন, রোজকার কাজের কোনও দাম পাওয়া যায় না!”
“স্যা-অ্যা-অ্যা-অ্যাম, গল্পো-ও-ও-ও!” আমরা এবার নাছোড় হয়ে প্রায় তার ঘাড়ে মাথায় উঠে তাকে বসিয়ে দিলাম চেয়ারে।— “গল্প বলো শিগগির!”
“বাবা রে বাবা, কী দস্যি এই দুটো!” বলল স্যাম, “প্রত্যেকদিন নতুন গল্প শোনা চাই! এত গল্প আমি পাব কোথা থেকে? আর পারি না বাবা! তা, কীসের গল্প শুনবে আজ?”
এখন, স্যামের গল্প আমরা এত ঘনঘন শুনতাম, যে এর প্রত্যেকটাই ছিল আমাদের মুখস্থ, দাঁড়ি-কমা সমেত। কাজেই যখনই তার পুনরাবৃত্তি ঘটত, আমরা তার পান থেকে চুন খসলেই তাকে চেপে ধরতাম।
তবে সেগুলো এতই আকর্ষণীয় ছিল যে পুরোনোই হত না। সেই গল্পগুলোই আমরা বার বার শুনতাম, চমকে উঠতাম, ভয় পেতাম এবং শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোতের নেমে যাওয়া অনুভব করতে করতে তার হাঁটু আঁকড়ে ধরতাম।
আজকের রাতটাও গল্প শোনার জন্য একেবারে আদর্শ। সাংঘাতিক ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। পাগল হাওয়ার ধাক্কায় আমার ঠাকুরদাদার এই বাড়িটা যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। ভয়াবহ আওয়াজ হচ্ছে ঝড়ের, শোঁ শোঁ করে। চিমনি বেয়েও নেমে আসছে সেই শব্দ। এ-বাড়ির প্রতিটি দরজা— রান্নাঘরের, সেলারের, বাইরের, ভেতরের— কাঁপছে থরথর করে, ঠকঠক করে, যেন প্রতিটি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে শীতে কুঁকড়ে যাওয়া একটা করে প্রেতাত্মা; তারা ভেতরে ঢুকে আগুনের একটু ওম আর আরাম পেতে চাইছে।
“তা, কী শুনবে আজ?” বলল স্যাম।
“ ‘নেমে আয়, নেমে আয়’-টা।” আমরা সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলাম। এই গল্পটা, আমাদের মতে এ-ক্লাস।
“আজকে কিন্তু ভয় পেলে চলবে না।” গেরামভারি চালে বলল স্যাম।
“আমরা কখনও ভয় পাই না।” আবার আমাদের সমস্বরে জবাব।
“সেলারে নামতেও ভয় পাবে না তো?” স্যাম চোখের কোনা দিয়ে আমাদের দেখতে দেখতে বলল, “নীচে নামার পর মোমবাতি নিভে গেলেও না তো?”
“আমি পাব না।” আমি বললাম, “আমি ভয় কাকে বলে জানি না।”
“শোনো তাহলে।” বলল স্যাম, “এটা আমি শুনেছিলাম ক্যাপ্টেন এব সইন-এর কাছ থেকে। তখন আমার বয়স ছিল তোমাদের মতোই।
“দারুণ লোক ছিলেন এই ক্যাপ্টেন এব। তোমাদের ঠাকুরদাদা চিনতেন তাঁকে। মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি ছিলেন ডেডহ্যাম (Dedham) চার্চের সহকারী যাজক বা ডিকন (Deacon)। ব্রিটিশদের সঙ্গে যখন যুদ্ধ শুরু হয়, তখন তিনি ছিলেন লেক্সিংটন (Lexington)-এ। তিনি বহুবছর এখান থেকে বস্টন (Boston)-এ গাড়ি নিয়ে যাতায়াত করেছেন। বিয়ে করেছিলেন লোইস পিবোডিকে, যিনি ছিলেন তোমাদের ঠাকুরদাদার খুড়তুতো বোন। এই গল্প আমি আবার লোইসের কাছ থেকেও শুনেছি, ও কিচ্ছু ভুলত না।
“ক্যাপ্টেন যেভাবে আমাকে বলেছিলেন, সেও ঠিক সেভাবেই আমাকে বলেছিল, কাজেই এ-গল্প আমার আর ভোলার জো নেই। সে যদি আমি মাথুসেলাহ্ (Mathuselah)-র মতো ন’শো বছর বাঁচি, তাহলেও।
“তখন, স্প্রিং আর ফল-এর সময়। একটা লোক পিঠের ঝোলায় মালপত্র নিয়ে প্রায়ই এখানে আসত। তার নাম ছিল জেহিয়েল লম্মেদিউ। সে যে কোথা থেকে আসত, কেউ জানত না। বেশি কথাও বলত না সে, তবে মহিলা মহলে বেশ জনপ্রিয় ছিল। মেয়েরা যে কাকে পছন্দ করবে, আর কাকে নয়— এ কেউ বলতে পারে না। এই লোকটাও ছিল অতিসাধারণ— চোখ-মুখ দেখে মনে হত তার দুঃখের আর শেষ নেই; লিকলিকে রোগা চেহারা, সরু সরু হাত-পা, পেটটা যেন ঠেলে বেরিয়ে এসেছে— তাও সব মেয়ে তার জন্য অস্থির। আর এটাই ঘটনা যে মেয়েরা তার আসার আশায় দিন গুনত, আর ভালো ভালো বিস্কুট, পাই এইসব বানিয়ে রাখত সে এলেই তাকে উত্তম চা সহযোগে আপ্যায়িত করবে বলে। আর একটা কথাও বেশ ছড়িয়ে পড়ল যে তার সঙ্গে ফেব অ্যান পার্কারের প্রণয় চলছে। অথবা ফেব অ্যান পার্কারই তার প্রেমে পড়েছে, এও হতে পারে।
“যাই হোক, এসবের মাঝেই আচমকা লম্মেদিউর আসা বন্ধ হয়ে গেল। কেন কেউ জানে না, শুধু তাকে আর দেখা গেল না। শোনা গেল, ফেব অ্যান পার্কার একটা চিঠি পেয়েছে, তাতে লম্মেদিউ লিখেছে যে সে থ্যাংকস গিভিং-এর সময় আসছে, কিন্তু আসেনি। সে আর কখনোই আসেনি, পরের স্প্রিংয়ের সময়ও না। তখন বিভিন্ন মন্তব্য শোনা যেতে লাগল। কেউ বলল সে মরে গেছে, কেউ বলল সে কানাডায় চলে গেছে, কেউ বলল সে দেশে ফিরে গেছে।
“যাই হোক, ফেব অ্যান অবশ্য বুদ্ধিমতী মহিলার মতোই কাজ করল, লম্মেদিউর কথা আর বেশি না ভেবে বিজা মসকে বিয়ে করে ফেলল। তার কথায়, সবকিছু তো আর সবার হাতে থাকে না, যা হয় ভালোর জন্যই হয়। কাজেই কিছুদিনের মধ্যেই সবাই লম্মেদিউর কথা প্রায় ভুলেই গেল।
“ভাবলে অবাক লাগে, কত তাড়াতাড়ি মানুষ মানুষকে ভুলে যায়! তবে কেউ তো আর চিরকাল থাকে না, জগৎ-সংসারের কাজকর্ম চলতে থাকে নিজের মতো করেই। সবাই ভেবেছিল, লম্মেদিউর খবর নিশ্চয়ই কোনো না কোনো সময় পাওয়া যাবে। তা, সে-খবর শেষ পর্যন্ত পাওয়াও গেল।
“সেটা ছিল মার্চের উনিশ তারিখ। ক্যাপ্টেন এব সইন ঘোড়া আর গোরুর পাল নিয়ে বস্টনের দিকে রওনা হয়েছেন। কিন্তু কী বলব, সেদিন যেরকম ভয়াবহ তুষার-ঝড় উঠেছিল, সেরকম ঝড়ের কথা এখানকার বয়োবৃদ্ধরাও স্মরণ করতে পারেন না। বরফ যেন সূচের মতো বিঁধছিল মুখে, হাওয়া যেন কেটে ফেলছিল নাকের ডগা! ক্যাপ্টেন এবের মতো সাহসী আর শক্তিশালী লোক এ-তল্লাটে আর দুটি ছিল না। মেনে (Maine)-র মতো প্রদেশে তিনি জঙ্গল কেটে কাঠ চালান করেছেন, দিনের পর দিন সেখানে ক্যাম্প করে থেকেছেন। একজন মানুষের পক্ষে যা যা করা সম্ভব, তিনি তাই করতে পারতেন। কিন্তু এই মার্চ মাসের ঝড় মাঝে মাঝে এমন ভয়ানক হয়ে ওঠে যে সহ্য করা মুশকিল হয়ে ওঠে। ক্যাপ্টেন বলতেন, ঝড় যদি একদিক থেকে আসে, সে যত বেগেই আসুক, তাকে মিনিট পাঁচেক সামলে নেওয়ার ক্ষমতা তাঁর আছে। কিন্তু সেই ঝড় যদি চারদিক থেকেই আসতে থাকে, তাহলে নিজেকে ঠিক রাখা মুশকিল।
“আর সেই ঝড় সারাদিন ধরে চলার পর সন্ধের মুখে ক্যাপ্টেন রাস্তা হারিয়ে ফেললেন। রাত যখন নামল, তখন তিনি বুঝতেই পারছিলেন না তিনি কোথায় আছেন। পায়ের নীচে তখন শুধু জল আর কাদা, হাওয়ার সঙ্গে এত বরফ উড়ছে যে এক ফুট দূরত্বের কিছুও দেখা যাচ্ছে না। ঘটনা হল, তিনি নিজের অজান্তেই বস্টনের রাস্তা হারিয়ে শেরবার্ন (Sherburn)-এ, যেখানে ক্যাক স্প্যারক-এর মিল রয়েছে, একেবারে তার সামনে গিয়ে উঠলেন।
“তোমাদের ঠাকুরদাদা চিনতেন এই ক্যাক স্প্যারককে। মোদোমাতাল আর বজ্জাত, ওই বনের মধ্যে একা থাকত, কাঠচেরাই কল আর গম কল চালাত। তবে বরাবর কিন্তু সে এরকম ছিল না। যখন তার বয়স কম ছিল, তখন সবাই তাকে খুব ভালোবাসত। তার বউ ছিল শেরবার্নেরই ডিকন অ্যামোস পেটেঙ্গাল-এর মেয়ে, তাকেও সবাই খুব মান্যিগন্যি করত।
“কিন্তু কী জানো, যে বছর ক্যাকের বউ মারা গেল, তখন থেকেই সে রবিবারের চার্চে যাওয়া ছেড়ে দিল। টিদিং-মেন (Tithing-men) বা সিলেক্টমেন (Selectmen)— কেউ ওর এই অভ্যাস পালটাতে পারল না। আর যখন কেউ ঈশ্বর-বন্দনাকে অবহেলা করে, তখন সে যে আরও কী কী করবে, তা কেউ বলতে পারে না। ভাবতে পারো, যখন বাকি সবাই সুন্দর পরিষ্কার পোশাক পরে রবিবারে প্রার্থনা করছে, তখন এই লোকটা নোংরা জামাকাপড় পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে বা মাছ ধরছে! তবে এর ফল তো ভালো হয় না, যেমন এর হয়েছিল।”
এখানে একটু থেমে ঘরের এক কোনায় বসা আমার ঠাকুরদাদার দিকে তাকিয়ে স্যাম চোখ টিপল। ভাবটা এমন, দেখো হে, গল্পের মাঝখানে কেমন একটা নীতিবাক্য জুড়ে দিলাম!
“ক্যাপ্টেন এব যখন সেই মিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন, তখন সন্ধে নেমে এসেছে এবং তুষার-ঝড় আরও বেড়েছে। তিনি বুঝতে পারলেন, পরিস্থিতি খুব খারাপের দিকে যাচ্ছে। তিনি দেখলেন, সামনে একটা জোড়া-হুড়কোর দরজা, তার পেছনে ঘন জঙ্গল। ক্যাপ্টেন বুঝতে পারলেন, তিনি সবক’টা পশুকে নিয়ে ঠিকমতো ভেতরে ঢুকতে না ঢুকতেই পুরো অন্ধকার হয়ে যাবে। তখন ভাবলেন, একটা ঘোড়া নিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখবেন সামনে কী আছে। অতএব তিনি গোরু আর বলদগুলোকে বাইরে রেখে শুধু ঘোড়াটা নিয়ে হুড়কো খুলে বেড়ার ভেতরে ঢুকে সামনে এগোতে লাগলেন— কোথায় যাচ্ছেন, কিছুই না জেনে।
“খানিকক্ষণ পরে গাছপালার মধ্যে দিয়ে আলোর ঝিলিক দেখা গেল। তারপর তিনি এসে দাঁড়ালেন ক্যাক স্প্যারকের মিলের সামনে।
“চারপাশের ছায়াছবি অবশ্য মন ভারী করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। একে তো ওই ঘন জঙ্গল, চারদিক অন্ধকার, তার ওপর বৃষ্টির জল পাথর বেয়ে নেমে আসছে মোটা ধারায়, সামনে একটা পুকুরই তৈরি করে ফেলেছে বলা যায়। ভীষণই বন্য পরিবেশ, আর কোথাও একটি জনপ্রাণীও নেই। যাই হোক, ক্যাপ্টেন তাঁর ঘোড়ার চাবুকের হাতলটা দিয়ে দরজায় দু-বার ঠোকা মেরেই ভেতরে ঢুকে পড়লেন।
“ভেতরে জ্বলছে গনগনে আগুন, আর ক্যাক তার পাশেই বসে আছে, হাতের কাছেই রাম (Rum)-এর জগ। খুব মদ খেলেও লোকটার মধ্যে কিছু গুণ ছিল। এমনিতে সে ভদ্র ছিল, আর কথাবার্তা ভালোই বলত। সে ক্যাপ্টেনকে অভ্যর্থনা জানাল।
“ ‘ক্যাক ভায়া,’ বললেন ক্যাপ্টেন এব, ‘এই ঝড়ে বরফমাখা হয়ে পথ হারিয়ে তোমার কাছে এসে পড়লাম।’
“ ‘বিলক্ষণ! তাতে আর হয়েছে কী,’ বলল ক্যাক, ‘কাল সকাল অবধি এখানে থাকো।’
“বলে একখানা টিনের লন্ঠন নিয়ে ক্যাপ্টেনকে সঙ্গে করে বেড়ার ধারে গিয়ে বলল ক্যাপ্টেন তার পশুগুলোকে মিলের ছাউনির নীচে নিয়ে গিয়ে রাখুক। অতএব ক্যাপ্টেন পশুগুলোকে সেখানে রাখলেন, গাড়িটাকেও টেনে নিয়ে গেলেন ভেতরে। ঝড় তখন প্রচণ্ড হয়ে উঠেছে।
“তবে এর জন্য বিশেষ চিন্তা ছিল না। ক্যাকের কাছে প্রচুর চেরাই কাঠ ছিল, যাতে আগুন নিভু নিভু হয়ে এলেও বড়ো করে ধরানো যায়। আর সাহস জোগানোর ক্ষেত্রে গনগনে হয়ে জ্বলতে থাকা আগুনের চাইতে বড়ো সঙ্গী আর কেউ নেই। ক্যাকের কাছে অনেকটা তাড়ি (Toddy) ছিল। তার কিছুটা কেটলিতে ফুটিয়ে নেওয়া হল, তারপর তাদের সময় কাটতে লাগল ভালোই। ক্যাক আবার দারুণ গল্প বলিয়ে, আর শোনা ছাড়া ক্যাপ্টেনেরও তখন আর কিছু করার ছিল না। সুতরাং আড্ডা এমন জমে উঠল যে কিছুক্ষণ বাদে-বাদেই ‘বহুত খুব’, ‘আহা আহা’ আর অট্টহাস্য শোনা যেতে লাগল। বাইরে ঝড়ের আওয়াজ, ভেতরে ওইরকম হাসি। সে যেন এক ধুন্ধুমার কাণ্ড। ঠিক সেই সময়, তখন মাঝরাত, দরজায় একটা জোরালো ঠকঠক শোনা গেল, যেন কেউ দরজা ধাক্কাচ্ছে।
“ ‘আরে! কীসের আওয়াজ?’ চমকে উঠে বলল ক্যাক। তারা বুঁদ হয়ে গল্পগুজব আর হাসিঠাট্টায় মেতে ছিল, তার মাঝখানে হঠাৎ করে ওইরকম শব্দ, আর ওইরকম দুর্যোগের রাতে, চমকানো তো স্বাভাবিক।
“কিন্তু মিনিট খানেক কান পেতে থাকার পরও চিমনির মধ্যে দিয়ে বয়ে আসা ঝড়ের শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ শোনা গেল না। ক্যাক যখন আবার তার গল্পটা শুরু করতে যাচ্ছে, আবার দরজায় ধাক্কা। এবারে এমন জোরে, যেন দরজাটা কেউ ভেঙেই ফেলবে।
“ ‘জ্বালালে দেখছি!’ বলল ক্যাক, ‘দেখা যাক, এই দুর্যোগে শয়তান এলেও তাকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা যায় না।’ বলে দরজাটা খুলতেই দেখা গেল সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক এবং অদ্বিতীয় কেচুরি। ঠাকুমার কাছে নিশ্চয়ই কেচুরির গল্প শুনেছ। ও মাঝে মাঝে চার্চে আসত, ওর স্বামী ছিল খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত—যাকে বলে প্রেইং ইন্ডিয়ান (Praying Indian), কিন্তু কেচুরি ছিল সাংঘাতিক। একটা বনবেড়াল বা প্যান্থারকেও চেষ্টা করলে পোষ মানানো যায়, কিন্তু কেচুরিকে অসম্ভব। সে মাঝে মাঝে মিটিংয়ে আসত, রেড ইন্ডিয়ানদের বসার জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় বসত। যখন যাজক লথ্রপ আর তাঁর স্ত্রী আসতেন, সবাই উঠে দাঁড়াত। কিন্তু কেচুরি উঠত না। সে বসে-বসেই চোখের কোনা দিয়ে তাঁদের লক্ষ করত। সবাই বলত, ওর গলার নেকলেসটা নাকি র্যাটল সাপের লেজ আর বনবেড়ালের দাঁত দিয়ে তৈরি। ও মাঝে-মাঝেই ওই নেকলেস আর ওই ধরনের অন্যান্য সব জিনিস দিয়ে আওয়াজ করত খড়মড় করে, আর তখন নাকি তাকে এক্কেবারে সাপের মতোই লাগত— সেই আদি শয়তান সাপ। আমি নিজেও তাকে দেখেছি, নির্দিষ্ট জায়গায় বসে চোখ টেরিয়ে টেরিয়ে লেডি লথ্রপকে দেখছে। তার ফুলে ওঠা ঘাড়ের বাদামি চামড়া আর চোখ দেখলেই ভয় লাগত। মনে হত, যে-কোনো মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়বে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে। লেডি লথ্রপ ছিলেন সদয় মহিলা। যখন প্রার্থনা সভা শেষ হত, তখন অন্য সবার মতো কেচুরির দিকে তাকিয়েও তিনি মাথা নুইয়ে মিষ্টি করে হাসতেন, কিন্তু কেচুরি তাতে পাত্তাও দিত না। কেচুরির বাবা ছিল মার্থা’স ভিনিয়ার্ড (Martha’s Vineyard)-এর একজন দুর্দান্ত পাওয়াও (Powwow)— আদিম রেড ইন্ডিয়ানদের মধ্যে যারা নাচগান করে আর বাজনা বাজায়, তাদের একজন। লোকে বলত, বাচ্চা বয়সেই কেচুরিকে নাকি আলাদা করে রাখা হয়েছিল শয়তানের উপাসক করে তোলার জন্য। সে যাই হোক, মোদ্দা কথা, ওকে কখনোই অন্য সবার মতো সভ্য করে তোলা যায়নি। দু-একবার ওকে লথ্রপ সাহেবের কাছে আনা হয়েছিল ওকে শিক্ষিত করে তোলার জন্য, কিন্তু যাজক লথ্রপ বহু চেষ্টা করেও ওকে দিয়ে কথা বলাতে পারেননি। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল, যেন কেউ জোর করে চেয়ারে বসিয়ে রেখেছে। লোকে তো বলে, আগের দিন হলে এত সহজে কেচুরি পার পেত না, কিন্তু যাজকের দয়ার শরীর, তিনি ওকে ওর মতো থাকতে দিয়েছিলেন। সবাই ভাবত কেচুরি আসলে ডাইনি, আর যদি তা নাও হয়, তাহলেও ওর অন্তত কিছু অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা আছে, সেই জন্য কেউ ওকে ঘাঁটাত না, বরং সমঝে চলত। তাই দরজা খুলে ক্যাক যখন দেখল কেচুরি দাঁড়িয়ে আছে, সে একেবারে চমকে উঠল। ক্যাপ্টেন এব বলেছিলেন, এরকম ভয় পেতে তিনি আর কাউকে দেখেননি।
“ঝড়-জল-বরফে ভিজে কেচুরির বাদামি রঙের শরীরটা কুঁচকে তখন একেবারে একটা ন্যাতানো কুমড়ো লতার মতো হয়ে গেছিল। কিন্তু তার সাপের মতো চোখ থেকে যেন আগুন বেরোচ্ছিল, যা দেখলে বুকের ভেতরটা শুকিয়ে যায়, মাথা ঘোরে বনবন করে। লোকে বলত, যদি কেচুরি কারোর ওপর একবার রেগে যায় তো বুঝতে হবে তার সময় ঘনিয়ে এসেছে। কাজেই, কেচুরি যদি কারোর দরজায় ধাক্কা মারে— সে দিন বা রাতের যে-কোনো সময়ই হোক না কেন, বুদ্ধিমানের কাজ হল তাকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া। তবে সবাই জানত, সে কখনোই ভালো খবর নিয়ে আসত না। যখনই সে এরকম ভূতাবিষ্ট অবস্থায় কোথাও আসত, সে আসত ঝড়ের বেগে, কাজ হওয়া পর্যন্ত থাকত, আর ঠিক যখন যাওয়ার সময় হত, তখনই যেত— তার আগেও নয়, পরেও নয়। কেচুরি ইংরেজি জানত, বুঝতে পারত, বলতেও পারত— কিন্তু সবসময়ই তাতে একটা তাচ্ছিল্যের ভাব। আর সে যখন ঘোরাঘুরি করত, তখন ইন্ডিয়ান ভাষায় সারাক্ষণ কীসব বিড়বিড় করত আর চোখ পিটপিট করে তাকাত, যেন তাকে কারা সব ঘিরে রয়েছে, যাদের অন্য কেউ দেখতে পাচ্ছে না এবং তারা কেউ শুভ নয়। এইসব কারণে, ওর আশেপাশে যারা থাকত তারা সবাই সাবধান থাকত, যাতে কোনোক্রমেই তাদের ব্যবহার খারাপ না হয়।
“অতএব ক্যাক তাকে ভেতরে আসতে বলল, কিন্তু জিজ্ঞেসই করল না সে কোথা থেকে এসেছে বা কেন এসেছে। কেচুরির বাড়ি এখান থেকে পাক্কা বারো মাইল, তার বেশি ছাড়া কম নয়। যেভাবে বরফ পড়ছে, তাতে কেচুরির কোমর অবধি ডুবে যাওয়ার কথা। আর ক্যাপ্টেন এব বলেছেন রাস্তার কোনও চিহ্ন নেই, সুতরাং কাল সকালেও যে কেউ এখানে এসে উঠতে পারবে, সেরকমও কোনও সম্ভাবনা নেই।”
“তাহলে ও সেখানে এল কী করে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“ঝড়ে দেখোনি শুকনো পাতা উড়তে? ক্যাপ্টেন এব বলেছিলেন, ও যেন ঝোড়ো হাওয়াতেই ভর করে এসেছিল। আর আমিও নিশ্চিত যে ঝড়ই ওকে উড়িয়ে এনেছিল। যাই হোক, ক্যাক তো ওকে ভেতরে এনে ভালো জায়গায় বসাল, এক মগ তাড়ি গরম করে দিল। কিন্তু কেচুরি ঘরের ভেতরে ঢোকার পরই ওদের কথাবার্তা বন্ধ হয়ে গেছিল, কারণ কেচুরি চেয়ারে বসেই দুলতে শুরু করেছিল। এক চুমুক করে তাড়ি খাচ্ছিল, আর বিড়বিড় করে কীসব বলতে বলতে চিমনিটার দিকে তাকাচ্ছিল।
“ক্যাপ্টেন এব বলেছিলেন তিনি আর কখনও এরকম বীভৎস আওয়াজ শোনেননি, সেদিন ঝড়ের দাপটে সেই চিমনির মধ্যে যেরকম আওয়াজ হচ্ছিল। ক্যাকও এমন ভয় পেয়েছিল যে তার দাঁতে দাঁত লেগে যাওয়ার আওয়াজ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছিল।
“কিন্তু ক্যাপ্টেন এব অন্য ধাতের মানুষ, কোনও মহিলার ভয়ে কথাবার্তা থামিয়ে দেওয়ার পাত্র তিনি নন— সে ডাইনিই হোক বা অন্য কিছু। কাজেই যখন তিনি দেখলেন কেচুরি বিড়বিড় করছে আর চিমনির দিকে তাকাচ্ছে, তিনি বললেন, ‘কী, কেচুরি, ওদিকে কী দেখছ? কিছু দেখলে বলে ফেলো, মনের মধ্যে জমিয়ে রেখো না।’
“এমনিতেই তিনি জমাটি লোক ছিলেন, তার ওপর আবার পেটে তাড়ি পড়েছে, অতএব দিল খুশ। আর তখনই তাঁর মনে হল অন্যরকম কিছু একটা ঘটতে চলেছে, কারণ কেচুরির হাসিটা ঠিক সুবিধের মনে হচ্ছে না। তার চোখ দুটো যেন জ্বলছিল। তারপর সে ঘাড় দোলাল, সাপের লেজ আর হাড়ের তৈরি মালাটা বেজে উঠল খড়মড় করে। তারপর সে চিমনির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘নেমে আয়, নেমে আয়, কে আছিস নেমে আয়!’
“একটা গোঙানি আর খড়মড় খচখচ আওয়াজ পাওয়া গেল, তারপর চিমনি দিয়ে জুতো পরা একজোড়া পা সোজা নেমে এসে দাঁড়াল আগুনের সামনে, যার রুপোলি ফিতে বাঁধা বকলসটা আগুনের আলোয় চকচক করছে। ক্যাপ্টেন এব বলেছিলেন, তিনি জীবনে এত ভয় পাননি। আর ক্যাক তো স্রেফ নেতিয়ে পড়ে আছে চেয়ারের ওপর।
“তারপর কেচুরি উঠে দাঁড়াল। তার লাঠিটা চিমনির দিকে উঁচিয়ে আরও জোরে বলল, ‘নেমে আয়, নেমে আয়, কে আছিস নেমে আয়!’
“বলা মাত্রই নেমে এল একজোড়া ফরসা পা, দাবনা থেকে গোড়ালি পর্যন্ত, সোজা এসে জুড়ে গেল জুতো পরা পায়ের সঙ্গে। সেই পায়ে পরা আছে ডুরি ডুরি মোজা আর চামড়ার পাজামা।
“ ‘চালিয়ে যাও, কেচুরি,’ বললেন ক্যাপ্টেন এব, ‘আর কী আছে দেখা যাক।’
“কেচুরি তাঁর কথা শুনল বলে মনে হল না। সে তখনও কাঠের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে যাচ্ছে, ‘নেমে আয়, নেমে আয়, কে আছিস নেমে আয়!’
“আর নেমে এল একটা মানুষের শরীর, বাদামি কোট আর হলুদ জামা পরা, কিন্তু তার হাত নেই। আবার কেচুরি তার লাঠিটা চিমনির দিকে উঁচিয়ে বলে উঠল, ‘নেমে আয়, নেমে আয়!’ আর নেমে এল একজোড়া হাত, চমৎকারভাবে জুড়ে গেল দু-পাশের যথাস্থানে। কিন্তু এখনও এটা কে বোঝা যাচ্ছিল না, কারণ এর মাথা নেই। এটা অবশ্যই একটা মানুষের শরীর, তবে কবন্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
“ ‘ওহে কেচুরি,’ বললেন ক্যাপ্টেন এব, ‘এ তো খুব গণ্ডগোলের ব্যাপার মনে হচ্ছে। তুমি ওর পুরোটা নিয়ে এসো, দেখা যাক কী ব্যাপার।’
“তখন কেচুরি দারুণ জোরে বলে উঠল, ‘নেমে আয়, নেমে আয়, কে আছিস নেমে আয়!’
“আর নেমে এল একটা মানুষের মাথা, শরীরটার সঙ্গে যথাস্থানে জুড়ে গেল এবং দেখামাত্র চিনতে পারলেন ক্যাপ্টেন এব— এ হল জেহিয়েল লম্মেদিউ।
“ক্যাকও বিলক্ষণ চিনত তাকে এবং দেখামাত্রই সে চেয়ার-টেয়ার উলটে মুখ থুবড়ে পড়ে গেছে মেঝের ওপর। ‘ভগবান বাঁচাও, ভগবান বাঁচাও,’ বলে চিৎকার করছে।
“কিন্তু ক্যাপ্টেন এব তখন গণ্ডগোলের আঁচ পেয়েছেন। ভয় না পেয়ে তিনি ওকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায় ছিলে তুমি? আমাদের কাছে কী চাও?’
“সে অবশ্য কিছুই বলতে পারল না, শুধু গোঁ গোঁ করতে করতে চিমনির দিকটা দেখিয়ে দিল। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে চেষ্টা করছে কথা বলার, কিন্তু পারছে না। বুঝতেই পারছ, ওইরকম বিচিত্র অবস্থায় কেউই কথা বলতে পারে না। আর তখনই উঠল এক ভয়ানক ঝোড়ো বাতাস, তার ঝাপটায় খুলে গেল দরজা, মনে হল এক ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় ঘরের ভেতর ঢুকে উড়িয়ে তাড়িয়ে বের করে নিয়ে গেল ঘরের আগুন আর সব ধোঁয়া। তার সঙ্গেই উঠল দারুণ তীক্ষ্ণ এক চিৎকার আর গোঙানির আওয়াজ। রয়ে গেল শুধু অন্ধকার। তারপর যখন সব শান্ত হল, দেখা গেল কেচুরি আর লম্মেদিউ উধাও হয়েছে, আর মেঝেয় পড়ে ক্যাক কাতরাচ্ছে আর গোঙাচ্ছে, যেন এক্ষুনি সে অক্কা পাবে।
“ক্যাপ্টেন এব তাকে ধরে তুললেন। তারপর আগুন জ্বেলে ক্যাকের শুশ্রূষার ব্যবস্থা করলেন। কারণ, তার অবস্থা সত্যিই খারাপ হয়ে এসেছিল। তারপর তার মুখ দিয়ে সবই বেরিয়ে এল, অনুতাপে জ্বলছিল তো, কীভাবে সে আর তার বাপ মিলে টাকাপয়সার জন্য লম্মেদিউকে খুন করেছিল, কীভাবেই-বা তারা ওর দেহটাকে চিমনির ভেতরে লুকিয়ে রেখেছিল— সব। ক্যাক বলেছিল, ওই ঘটনার পর থেকে সে একদিনের জন্যও শান্তি পায়নি, আর তাই সে লোকজনের সঙ্গে মেশা বন্ধ করে দেয়, প্রার্থনাতেও যেত না। বুঝতেই পারছ, পাপী মন কখনও প্রার্থনা করতে পারে না।
“যাই হোক, ক্যাক এর দু-একদিনের মধ্যেই মারা যায়। ক্যাপ্টেন এব শেরবার্নের ধর্মযাজক আর একজন সিলেক্টম্যানকে ডেকে এনেছিলেন। তাঁরা এসে ওর দায়িত্ব নেন। ক্যাক সত্যিই অনুতপ্ত ছিল ওর কৃতকর্মের জন্য। যাজক ক্যারিলও ওর সঙ্গেই প্রার্থনা করলেন, যাতে ও শান্তি পায়। এইভাবে, বলতে গেলে একেবারে মরণের দোরগোড়ায় এসে ও যেন কিছুটা শান্তি পেল। ও মনেপ্রাণে চাইছিল যাতে ওর বিচার হয়, আর বিচারে যেন ওর ফাঁসি হয়, কারণ তাহলেই সবকিছু সমান সমান হবে। ও যাজককে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিল, যেন ওর মৃত্যুর পর মিলটা ভেঙে ফেলা হয় আর ওকে গোর দেওয়া হয়। তাঁরা তা-ই করেছিলেন।
“যে আটজন মিলে ভাঙাভাঙির কাজ করেছিল, ক্যাপ্টেন এবও ছিলেন তাদের মধ্যে। চিমনিটা ভাঙা হতেই বেরিয়ে এসেছিল লম্মেদিউর কংকাল।
“তাহলে, দেখতেই পাচ্ছ, পাপ কখনও চাপা থাকে না। আর এতে সাহায্য করেছে ঝড়, বৃষ্টি, বরফ, আদিম রেড ইন্ডিয়ান— সবাই।”
“আমি এই গল্প আগেও শুনেছি। আমার এটা কোনোদিন বিশ্বাস হয় না।” ফস করে বলে উঠল লইস পিসি।
“সে কী কথা, লইস!” বলল ঠাকুমা, “ক্যাপ্টেন এব সইন কিন্তু নিয়মিত চার্চে যেত, আর খুব মানী লোক ছিল!”
“আমি তো সেটা অস্বীকার করছি না।” বলল লইস পিসি, “তবে আমার মতে, দুজনে প্রচুর পরিমাণে মদ্যপান করে ঘুমিয়ে পড়েছিল, আর ঘুমের ঘোরে খেয়াল দেখেছিল। এরকম কোনও ঘটনা যদি আমার চোখের সামনে ঘটেও, আমি বিশ্বাসই করব না। শুধু ভাবব, আমি ভুল দেখেছিলাম, ব্যস।”
“শোনো লইস, আমি যদি তুমি হতাম, তাহলে কখনোই এরকম স্যাডিউসি (Sadducee)-মার্কা কথাবার্তা বলতাম না।” বলল ঠাকুমা, “সব যদি বাজে কথাই হবে, তা হলে ড. কটন ম্যাথার (Cotton Mather)-এর লেখা ‘ম্যাগনিলি’ (Magnalia)-তেও সব ভুলভাল কথা লেখা আছে!”
“আসলে,” কয়লাগুলোর ওপর ঝুঁকে পড়ে আগুনের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবতে ভাবতে বলল স্যাম লসন, “জগতে অনেক কিছুই আছে, যা সত্যি; আবার অনেক কিছুই আছে, যা সত্যি নয়। কিছুই বিশ্বাস করলাম না, অথবা সবই বিশ্বাস করলাম— এর কোনোটাই ঠিক নয়। আমার ঠাকুরদা বলত, ‘জীবনে সুখ আর শান্তি পেতে গেলে মাঝামাঝি রাস্তায় তোমাকে হাঁটতেই হবে।’ আমারও তাই মত।”
লইস পিসি দেখলাম একমনে সেলাই করছে।
“ছেলেরা,” বলল স্যাম, “চলো, নীচে গিয়ে আপেলের জুস বানিয়ে আনি।”
এক ঝুড়ি বোঝাই আপেল নিয়ে নীচে যাওয়ার পর জুস বানাতে বানাতে স্যাম ফিসফিস করে রহস্যময় গলায় বলল, “ছেলেরা, শুধু তোমার পিসিকে জিজ্ঞেস করবে, সে রুথ সালিভান-এর সম্বন্ধে কী জানে।”
“সে আবার কী?” “আহ্! জিজ্ঞেস করেই দেখো না! যারা বলে যে তারা ভূতপ্রেত দত্যিদানো এইসব বিশ্বাস করে না, তাদের কাছেও এইরকম ঘটনা অন্তত একটা হলেও পাওয়া যাবে। শুধু জিজ্ঞেস করো। নামটা মনে রাখবে, রুথ সালিভান।”