
পদার্থবিদ্যায় নতুন ভোর
১৯১১ সাল। ব্রাসেলস, বেলজিয়াম।
বিশ্বের বাছাইকরা উনত্রিশ জন বিজ্ঞানী একত্র হয়েছেন বেলজিয়ামের ব্রাসেলস শহরে। উপলক্ষ্য, এক মহাসম্মেলন— সলভে কনফারেন্স।
লবণ ব্যবসায়ী আর্নেস্ট সলভে বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক গবেষণায় একজন উৎসাহী পুরুষ। কয়েকবছর আগেই ডাচ পদার্থবিদ হেন্ড্রিক লোরেঞ্জ এবং পিটার জিম্যান (১৯০২ সালে) নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন (সেই আবিষ্কারকে আজকের দিনে পদার্থবিজ্ঞানের যে-কোনো ছাত্র জিম্যান এফেক্ট বলে জানে)। কোনও বস্তু থেকে নির্গত আলোর বর্ণালি কেমন করে চুম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে দিয়ে গেলে বেঁকে যায়, সেই পরীক্ষা করেছিলেন জিম্যান এবং কেন বেঁকে যায়, সেই তত্ত্ব সাজান লোরেঞ্জ। শেষোক্ত বিজ্ঞানী আবার একটি চার্জযুক্ত কণা যখন তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রের মধ্যে দিয়ে চলে যায়, তার ওপর বল কেমনভাবে কাজ করে (লোরেঞ্জ ফোর্স) অঙ্ক কষে বুঝিয়ে দিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের জগতে বেশ খ্যাতি পেয়েছেন।
প্রফেসর লোরেঞ্জ আর্নেস্ট সলভেকে প্রস্তাব দিলেন— বিশ্বের সব দেশে যুগান্তকারী সব কাজ হচ্ছে পদার্থবিদ্যায়, কর্মরত বিজ্ঞানীদের নিয়ে একটি সম্মেলন করলে কেমন হয়?
সলভে উদ্যোগী পুরুষ, এককথায় মেনে নিলেন লোরেঞ্জের প্রস্তাব। আগেই তাঁর হাতে গড়ে উঠেছিল সলভে ইন্সটিটিউট, যেখানে সমাজবিজ্ঞানের চর্চা হত। ১৯১১ সাল থেকে শুরু হল পদার্থবিদ্যার সলভে সম্মেলনের আয়োজন। অনুষ্ঠানের সব দায়িত্ব বর্তাল প্রফেসর হেন্ড্রিক লোরেঞ্জর ওপরেই। বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রতিভাশালী পদার্থবিদদের তালিকা প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে সম্মেলনের আলোচনার বিষয়বস্তু, এমনকি তাঁদের যাতায়াত, ভিসা, বাসস্থানের বন্দোবস্ত— সব কাজের ভার একা হাতে সামলালেন লোরেঞ্জ স্বয়ং। যাবতীয় ব্যয়ভার কাঁধে তুলে নিলেন আর্নেস্ট সলভে।
উনবিংশ শতাব্দীর সেই সন্ধিক্ষণে পদার্থবিদ্যার জগৎ এক অনন্য বাঁক নিচ্ছিল। বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক গবেষণা করছিলেন ব্ল্যাক বডি রেডিয়েশন নিয়ে। কোনও উত্তপ্ত বস্তু থেকে যে তাপশক্তি বিকিরিত হয়, তা অবিচ্ছিন্ন নয় বলে তিনি এক তত্ত্ব দেন। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, উত্তপ্ত বস্তু (ব্ল্যাক বডি) থেকে এক-একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের ফোটন কণা নির্গত হয়। আলো একটি তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ তা বিজ্ঞানীরা জানতেন। এটিও জানা ছিল যে, তাপও একটি তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ, যাকে চোখে দেখা যায় না, যাকে বলা হয় ইনফ্রারেড-রে। প্ল্যাঙ্কের মতবাদ বৈপ্লবিক ছিল। আলোর ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন উঠল। আগে মনে করা হত আলো একটি তরঙ্গ, যা সরলরেখায় চলাচল করে। কিন্তু প্ল্যাঙ্কের তত্ত্ব অনুযায়ী আলোর কণা ধর্মও আছে। জন্ম নিল কোয়ান্টাম মেকানিক্স। এবার পদার্থবিজ্ঞান চলতে শুরু করল অন্য ধারায়, নিউটনের ক্লাসিকাল মেকানিক্স থেকে কোয়ান্টাম জগতে।
১৯০৫ সালে আইনস্টাইনের ফটো-ইলেকট্রিক এফেক্টের ব্যবহারিক পরীক্ষা প্রমাণ করে দিল, প্ল্যাঙ্কের মত সঠিক ছিল। তাহলে আলো কী? তরঙ্গ, না কণা? কোন পরিস্থিতিতে সে কোন রূপ ধারণ করবে, তা নির্ভর করছে সে কীভাবে মানুষের চোখে পড়বে তার ওপর, কীভাবে ধরা দেবে তার ওপর। নব্য চিন্তাধারা চিরকালই সমাজে আলোড়ন তোলে, এই ক্ষেত্রেও তাই হল। কিন্তু প্ল্যাঙ্ক এবং আইনস্টাইনের কাজ বিশ্বজুড়ে পদার্থবিদ্যার গবেষণায় এক নতুন উদ্যম সৃষ্টি করল। তরুণ বিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জগতে বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যেতে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে লাগলেন।
প্রথম সলভে সম্মেলনের ঠিক আগেই আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিকতা তত্ত্ব, যা স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটি বলে পরিচিত, প্রকাশ করেছেন। সেখানে তিনি তাঁর বিখ্যাত ভর ও শক্তির সামঞ্জস্য সূত্র (E=mc2) উপস্থাপন করেছেন। এরপরই তাঁর জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটির ওপর গাণিতিক তত্ত্বও দিয়েছেন। জগতজোড়া তাঁর নাম। তখনও নোবেল পুরস্কার তিনি পাননি এবং ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ‘বাজে বকছেন’ বলে নোবেল কমিটি তাঁকে পুরস্কার দেবার যোগ্য ব্যক্তি বলে মনে করেনি।
এই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে প্রফেসর লোরেঞ্জ সলভের কাছে পদার্থবিদ্যার সম্মেলন করার প্রস্তাব দেন। সম্মেলনে পৃথিবীর বাছাইকরা আমন্ত্রিত পদার্থবিদদের আলোচনাসভা শুরু হল ব্রাসেলস-এ। আঠারো জন বিজ্ঞানী ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, হল্যান্ড, বেলজিয়াম এবং ডেনমার্ক থেকে যোগ দিলেন এই সম্মেলনে। ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক, মেরি কিউরি, আইনস্টাইন, লোরেঞ্জ, ওয়েন, নারন্স্ট, রাদারফোর্ড-এর মতো নামকরা বিজ্ঞানীরা যোগ দিলেন, যাঁদের মধ্যে অনেকেই নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন।
সম্মেলনে বিজ্ঞানীদের প্রত্যেকের বক্তৃতার টাইপ করা কপি তিনটি ভাষা— ইংরেজি, জার্মান ও ফরাসিতে লিখে প্রত্যেককে বিলি করা হল। কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়েই সরগরম হয় এই সম্মেলন। সম্মেলনের কথা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল সংবাদমাধ্যমের প্রচারে।

এরপর বিশ্বজুড়ে বদলে যেতে লাগল রাজনৈতিক পরিবেশ। লেগে গেল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। যার ফলে প্রভাব পড়ল সলভে সম্মেলনের ওপর। ১৯১৩ সালে ঠিক যুদ্ধের আগে দ্বিতীয় সলভে সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। বিষয় ছিল, পদার্থের গঠন। তিরিশ জন পদার্থবিদ অংশগ্রহণ করেন এই সম্মেলনে। কিন্তু সম্মেলনের শেষে বিজ্ঞানীদের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় জার্মানি বেলজিয়াম আক্রমণ করে বসায়। যুদ্ধ শেষে আবার শুরু হয় সলভে সম্মেলন। তবে পঞ্চম সম্মেলনের গুরুত্ব হয়ে দাঁড়ায় অপরিসীম।
১৯২৭ সাল। ব্রাসেলস, বেলজিয়াম।
১৯২৭ সালে যে পঞ্চম সলভে সম্মেলন হয়, তার তাৎপর্য বিজ্ঞানের জগতে অপরিসীম এবং এই সম্মেলন নতুন দিগন্তের সূত্রপাত ঘটায়। এই সম্মেলনের বিষয় ছিল, ইলেকট্রন এবং ফোটন। প্রথম থেকে পঞ্চম— প্রতিটি সম্মেলনে চেয়ারম্যান ছিলেন লোরেঞ্জ।
কোয়ান্টাম মেকানিক্স তখন দুই তরুণ পদার্থবিদ— জার্মানির এডউইন শ্রডিঙ্গার এবং ইংল্যান্ডের পল ডিরাকের হাতে গাণিতিক রূপ নিয়েছে। তরুণ ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী ডি ব্রগলি তাঁর পি.এইচ.ডি-র গবেষণায় আলোর তরঙ্গ এবং কণা ধর্মের গাণিতিক ব্যাখ্যা দিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছেন। কণা আর তরঙ্গ আলাদা করা যাচ্ছে না। পরমাণুর নিউক্লিয়াসের চারদিকে ইলেকট্রন বনবন করে কক্ষপথে পাক খাচ্ছে বলে ধারণা দিয়েছিলেন রাদারফোর্ড তাঁর অ্যাটমিক মডেলে। শ্রডিঙ্গার বললেন, ইলেকট্রন কক্ষপথে ঘুরছে— এই ধারণা সঠিক নয়। ওইসব জায়গায় ইলেকট্রনকে পাবার সম্ভাবনা বেশি এবং ইলেকট্রনেরও তরঙ্গের মতো ধর্ম আছে, অর্থাৎ ফোটনের সঙ্গে তার আছে যথেষ্ট মিল।
এই আধুনিক গবেষণার পটভূমিকাতে জমে উঠল সলভে সম্মেলন। তর্কবিতর্ক চলতে লাগল। জার্মান পদার্থবিদ ডক্টর ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ, বয়স মাত্র ছাব্বিশ, তিনি সম্মেলনের প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠলেন। সুদর্শন হাইজেনবার্গ তাঁর বিখ্যাত অনিশ্চয়তা তত্ত্ব নিয়ে বক্তৃতা করলেন। তাঁর মতে, ইলেকট্রনের মতো ক্ষুদ্র কণার অবস্থান এবং গতির পরিমাপ একই সঙ্গে সঠিকভাবে করা যাবে না; একটি যদি অভ্রান্তভাবে মাপা যায়, আর একটি একবারেই ভুল মাপ দেবে। আইনস্টাইন রেগে গিয়ে বলে উঠলেন, “ভগবান পাশা খেলেন না।”
প্রফেসর নিলস বোর ছিলেন উদার-হৃদয় মুক্তমনা বিজ্ঞানী। তিনি তরুণদের জায়গা করে দিতে পিছপা নন। হাইজেনবার্গের সমর্থনে উঠে দাঁড়িয়ে তিনি আইনস্টাইনকে বললেন, “দয়া করে ভগবানকে কী করতে হবে, তার নির্দেশ দেবেন না, ওঁকে বলতে দিন।”
আইনস্টাইন এবং বোর দুজনেই খুব বন্ধু ছিলেন, কিন্তু তর্কের বেলায় কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলতেন না। হাইজেনবার্গের বক্তব্য অন্য বিজ্ঞানীদের উদ্বুদ্ধ করল।
ডিরাক, হাইজেনবার্গ এবং শ্রডিঙ্গার কোয়ান্টাম মেকানিক্সের দুনিয়া খুলে দিলেন পদার্থবিজ্ঞানীদের জন্য। এক নতুন দিশা নির্দেশিত হল বিজ্ঞানের জগতে। যে উনত্রিশ জন বিজ্ঞানী এই সম্মেলনে যোগ দেন, তাঁদের মধ্যে আঠারো জন এই সম্মেলনের আগে বা পরে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হওয়ায় তাঁদের গ্রুপ ছবিকে পৃথিবীর সবচাইতে বুদ্ধিদীপ্ত ছবি বলে মনে করা হয়।

প্রচুর বিতর্কের সৃষ্টি হলেও বিজ্ঞানীরা বোরের প্রস্তাবিত আণবিক মডেলকেই প্রাধান্য দিলেন সম্মেলন শেষে। কিন্তু এই সময়টাতেই আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি তত্ত্বের বহু সমালোচক তৈরি হয়ে গিয়েছে বিশ্বের দুটি দেশ জার্মানি ও রাশিয়ায়। জার্মানিতে রিলেটিভিটি তত্ত্বকে ইহুদি বিজ্ঞান বলে দাগিয়ে দেওয়া হতে থাকে। রাশিয়ায় জোসেফ স্ট্যালিনের আদেশে আইনস্টাইনের যাবতীয় গবেষণা পদার্থবিদ্যার পাঠ্য বিষয়ের বাইরে রাখতে বলা হয়, কারণ স্টালিনের মতে, আইনস্টাইনের সব কাজ বাস্তব জগতের সঙ্গে মিলমিশ খায় না এবং এই কারণেই তা কমিউনিস্ট ভাবধারার পরিপন্থী। কিন্তু বেশিরভাগ বিজ্ঞানীদের কাছে এবং সাধারণের কাছেও আইনস্টাইনের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
পঞ্চম সলভে সম্মেলনের পর দেশে ফিরে গিয়ে অংশগ্রহণকারী বিজ্ঞানীরা যাঁর যাঁর নিজস্ব কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেও তাঁরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখলেন এবং সেই কারণেই দ্রুত বিকশিত হতে লাগল পদার্থবিদ্যার জগৎ।
১৯৩০ সাল। বার্লিন, জার্মানি।
বার্লিনের কাইজার উইলহেম ইন্সটিটিউটের পিচঢালা পাকা রাস্তা দিয়ে প্রায় ছুটে হেঁটে যেতে যেতে বিশাল বাড়িটার দিকে মাঝে-মাঝেই নজর ফেলছিলেন বত্রিশ বছরের তরুণ এক পদার্থবিদ। দুই দশক আগে প্রতিষ্ঠিত বার্লিনের এই বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করছেন নানা প্রতিভাশালী বিজ্ঞানী। যে বাড়িটার দিকে আপনমনে হাওয়ায় ভেসে হেঁটে চলেছিলেন পদার্থবিদ লিও জিলার্ড, এটি অবশ্য কাইজার উইলহেমের রসায়ন বিভাগ। সপ্তাহে এইখানে একটি মাত্র ক্লাস নিতে হয় অধ্যাপক লিওকে। বিষয়, আণবিক পদার্থবিদ্যা ও রসায়নের সমস্যাবলি।
ছাত্রছাত্রীদের পড়াতে ভালোই লাগে স্বল্পভাষী অধ্যাপকের। বয়সে তরুণ এবং এখনও ব্যাচেলর বলে ছাত্রীদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা খুব। কিন্তু বিজ্ঞানীটির সেদিকে যেন কোনও মনই নেই। মাথায় একটাই চিন্তা, এইসব অল্পবয়সি পড়ুয়াদের মধ্যে থেকে প্রকৃত বিজ্ঞান সচেতন কয়েকজনকে নিয়ে একটা দল গড়বেন তিনি। সেই দলটার নাম দিয়েছেন ‘বান্ড’। ইংরেজি করলে শব্দটা হয়ে যাবে বন্ড, অর্থাৎ লিওর ইচ্ছে, আধুনিক বিজ্ঞানে শিক্ষিত এক বিজ্ঞানীদের দল গড়বেন তিনি, যারা লড়বে নতুন সমাজ গড়বার জন্য। লিও বুঝতে পারছেন, পৃথিবীর রাজনৈতিক পরিবেশ বদলে যাচ্ছে দ্রুত। অবিলম্বে কিছু একটা না করলে দেরি হয়ে যাবে, তখন আর কিছুই করার রইবে না।
ইন্সটিটিউটের দরজা দিয়ে ঢুকতে যেতেই আর এক পদার্থবিদের নজরে পড়ে গেলেন লিও।
“গুড মর্নিং, লিও! তোমার ক্লাস তো ভালোই চলছে শুনলাম। ছেলেমেয়েরা খুব উৎসাহ নিয়ে ক্লাস করছে জানাল অটো হান।” বলে লিওর পাশে হাঁটতে লাগলেন অধ্যাপক লিজ মেইটনার।
“কিন্তু পাকা চাকরি তো আর হচ্ছে না, ম্যাম! ক’দিন এইভাবে চলবে জানি না।” উদাস হয়ে যায় লিওর গলা।
গম্ভীর হয়ে যান লিজ। বলেন, “জার্মানিতে গত বছর দশ লক্ষ বেকার ছিল। এই বছর নাকি সেই সংখ্যা লাফিয়ে পঞ্চাশ লক্ষ ছুঁয়েছে। ইন্সটিটিউটে যন্ত্রপাতি কেনার জন্যও কোনও অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না। মন্দার বাজারে ব্যবসায়ীরা গবেষণার জন্য বরাদ্দ কমিয়ে দিচ্ছে। আর জানোই তো, কাইজার উইলেহেম ইন্সটিটিউটের খরচের অনুদান খুব সামান্যই আসে সরকারি তহবিল থেকে। কাজকম্ম সব শিকেয় তুলে দিতে হবে মনে হচ্ছে। তুমি তো শ্রডিঙ্গারের সঙ্গে নাকি লেকচার দিচ্ছ আজকাল, সেখান থেকে কিছু অর্থ পাওয়া যায়?”
“হ্যাঁ, তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার কিছু আধুনিক গবেষণা নিয়ে লেকচার হয় সেখানে। সামান্য কিছু জুটে যায় বরাতে। এডউইন শ্রডিঙ্গার খুব ভালো কিছু কাজ করছেন। তাঁর সঙ্গ পেতে ভালোই লাগে, অনেক কিছু নতুন জানতে পারি।”
অস্থির দেখায় লিও জিলার্ডকে। গলা নামিয়ে লিজকে জানান, “প্রফেসর আইনস্টাইনের সঙ্গে আমি পেটেন্ট করেছি ম্যাম, তা ছাড়া নিজস্ব পেটেন্টও আছে। তার থেকে কিছু অর্থপ্রাপ্তি হয় বলেই গ্রাসাচ্ছাদন হয়ে যাচ্ছে। তবে বেশিদিন মনে হয় জার্মানি-বাস কপালে নেই আমার। চেষ্টা করছি আমেরিকা চলে যাবার। আইনস্টাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, যদি প্রিন্সটনে আমার জন্য অধ্যাপনার কাজ জুটিয়ে দিতে পারেন। যদি না হয়, তবে ভাবছি রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ব।”
লিওর দিকে অবিশ্বাসের হাসি ছুড়ে দিয়ে লিজ নিজের পরীক্ষাগারে ঢুকে পড়েন। লিও চলে যান ক্লাস-রুমে।
পাকাপাকি চাকরির জন্য কাইজার উইলহেম ইন্সটিটিউট অফ কেমিস্ট্রিতে দরখাস্ত জমা দিয়েছিলেন লিও জিলার্ড। বিভাগীয় প্রধান অটো হানের দপ্তরে ডাক পড়ল একদিন। হানের ঘরের ভারী কাঠের দরজা ঠেলে কিঞ্চিৎ দ্বিধান্বিত হয়েই ঢুকে পড়লেন লিও। হান একটি আরামকেদারায় বসে একটা জার্নালে চোখ বোলাচ্ছিলেন। দরজা খোলার শব্দে সেদিকে না তাকিয়েই বসতে ইশারা করলেন লিওকে। বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল, অপরপক্ষ থেকে সাড়াশব্দ না পেয়ে অসহিষ্ণু হয়ে উশখুশ করতে করতে ঘরের চারদিকে নজর ফেলতে লাগলেন লিও।
শীতকাল শেষ হয়ে বসন্ত এসে গিয়েছে, কিন্তু ঘরের মধ্যে এখনও শৈত্য। ফার্নেস জ্বলছে না।
নিস্তব্ধতা ভেঙে এবার হানের গলা শোনা গেল, “পদার্থবিদ হয়ে রসায়ন বিভাগে আবেদন করলে কেন? তোমার বায়োডাটায় দেখলাম সাইক্লোট্রোন যন্ত্রের একটা পেটেন্টও আছে। আবার ডক্টরেট করেছ তাপগতিবিদ্যায়… স্ট্যাটিস্টিক্যাল থার্মোডায়নামিক্স ছিল বিষয়… সব গুলিয়ে যাচ্ছে হে। ব্যাপারটা একটু খুলে বলো দেখি।” পূর্ণ দৃষ্টিতে লিওর দিকে তাকালেন অটো হান। তারপর পাইপে তামাক ভরতে উঠে গেলেন পাশের টেবিলে।
ধড়ে প্রাণ এল লিওর। কথা বলতে বলতে খুব সহজ হয়ে গেলেন প্রফেসর অটো হান। লিও লক্ষ করেন, হানের দৃষ্টিতে প্রশ্রয়ের ছোঁয়া।
“রেডিও কেমিস্ট্রি এখন আমার আগ্রহের বিষয়, স্যার। আসলে জীবন শুরু হয়েছিল ইঞ্জিনিয়ারিং দিয়ে। বুদাপেস্ত থেকে পালাতে হয়েছিল ভিয়েনা। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং ভালো না লাগায় সব ছেড়ে দিয়ে যুদ্ধে যাই। ফিরে এসে অস্ট্রিয়ায় রাজনৈতিক পালাবদল হলে চলে আসি জার্মানি। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা নিয়ে ডক্টরেট করি ম্যাক্স ভন লাউয়ের কাছে। তবে বেশ অনেকদিন ধরে মনে হচ্ছে যেন পারমাণবিক গবেষণায় অনেক কিছু সম্ভাবনা আছে, মানে আমি হয়তো কিছু করে দেখাতে পারি… হয়তো বুঝিয়ে ঠিক বলতে পারছি না…”
লিওকে আশ্বস্ত করেন হান— “লিজের সঙ্গে কাজ করছ তো! সে নিজেও একজন ভালো পদার্থবিদ। আমরা দুজনেই বহুদিন ধরেই রেডিও অ্যাক্টিভ আইসোটোপ নিয়ে কাজ করে চলেছি। তবে কাইজারে তোমার পাকা চাকরি হওয়া মুশকিল আছে। লন্ডন বা নিউ ইয়র্কে অনেক কাজ হচ্ছে। আসলে বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে অনেক পরিবর্তন এসে গিয়েছে। সেই জার্মানি আর নেই। দারিদ্র্য আর হতাশা এখন দেশজুড়ে। তোমার মতো প্রতিভাশালী বিজ্ঞানীর এখানে জায়গা পাওয়া ভার। অথচ দেখো, বেশিরভাগ আধুনিক আবিষ্কার জার্মানিতেই হয়ে গিয়েছে। এখন তো ডক্টর আইনস্টাইন সারা পৃথিবীর গর্ব।”
“আমি ওঁর সঙ্গেও বহু সময় কাটিয়েছি, স্যার! উনি আমাকে খুব স্নেহ করেন। আমরা দুজনে মিলে একটা নতুন যন্ত্র বানিয়েছি। নতুন ধরনের রেফ্রিজারেটর, যাতে কোনও মুভিং পার্টস নেই, কাজেই দুর্ঘটনা ঘটার কোনও সম্ভাবনাই নেই। আপনি তো জানেন রেফ্রিজারেটর থেকে কীসব ভয়াবহ মৃত্যু হয়েছে আগে।”
“হ্যাঁ, ব্যাপারটা বেশ শোরগোল তুলেছিল কাগজে। অত বড়ো বিজ্ঞানী যখন তোমাকে স্নেহ করেন, তখন তো তোমার কাজ জুটে যাওয়া উচিত বিশ্বের যে-কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে। কাইজার উইলেহেম সোসাইটির অধ্যক্ষ উনি। তাঁর অধীনেই আমাদের এই ইন্সটিটিউট। তবে কাইজারে ওঁর প্রভাব ক্রমশ কমে আসছে। এখন তো আমেরিকা সফর করছেন। দেখে নাও, যদি ওঁর একটা চিঠির জোরেই কাজ হয়ে যায়!” লিওকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন অটো হান।
শুকনো মুখে লিও বলেন, “না, স্যার। খুব একগুঁয়ে লোক, আপনি জানেন তো! আগে চেষ্টা করেছিলাম। ম্যাথেমেটিকাল ফিজিক্স পড়াতে চেয়েছিলাম। মনোনয়নের চিঠির ওপর লিখে দিয়েছিলেন, তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার অধ্যাপনার চাইতে লিও জিলার্ড অনেক বেশি দক্ষতা দেখাতে পারবে পরীক্ষাগারে ফলিত পদার্থবিদ্যায়। হল না চাকরি। কাইজার উইলেহেমেও পড়াই তো তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যাই!”
“কিন্তু প্রফেসর শ্রডিঙ্গার তো তোমার খুব প্রশংসা করেন। সপ্তাহে একদিন বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচার দাও শুনেছি। হয়তো ভালোই পড়াও, কিন্তু যা করতে চাও, তাতেই মন দাও। আমি এখনও বুঝে উঠতে পারিনি কোন বৈজ্ঞানিক কাজ তোমাকে খুশি করতে পারে।” সামনে থেকে একটা মোটা বই তুলে নিয়ে এবার কঠিন প্রশ্নটা ছুড়ে দেন প্রফেসর হান, “রাজনীতি করতে অস্ট্রিয়ায়? কমিউনিস্ট ছাত্র সংগঠনে কাজ করেছ কিছুদিন, কী তাই তো?”
একটুও অবাক না হয়ে লিও জিলার্ড বলেন, “হ্যাঁ, সেই জন্যই তো আমাকে ভিয়েনা থেকে পালাতে হয়েছিল। জার্মানি আমাকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছে। এর জন্য আমি কৃতজ্ঞ।”
“আর সেইটেই হয়েছে কাল। বললাম না, সে জার্মানি আর নেই? ন্যাশনাল সোশালিস্টরা ক্ষমতাবান হচ্ছে ক্রমশ। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে তাদের লোক ঢুকে পড়ছে। কাইজার ইন্সটিটিউটই-বা বাদ যায় কেন? আচ্ছা, এখন এসো। কাইজার ইন্সটিটিউটে তোমার চাকরি পাকা হবার সম্ভাবনা অন্তত আমি দেখি না। ওপর থেকে নানা প্রশ্ন জুড়ে তোমার আবেদন ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে যাবার আগে জেনে রেখো, আমি ব্যক্তিগতভাবে ইহুদি বিদ্বেষী নই। ধর্মের ভিত্তিতে মানুষে মানুষে বিভাজন আমি পছন্দ করি না। তুমি ইহুদি হলেও আমি তোমার সাফল্য কামনা করি।”
একদিন বিকেলে ক্লাস শেষ হতে না হতেই লিজ মেইটনার লিও জিলার্ডকে ডেকে নিলেন তাঁর পরীক্ষাগারে। লিও ঘরে ঢুকে দেখলেন লিজ বেসিনে নিজের হাত ধুচ্ছেন। লিওকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিয়ে লিজ হেসে বলেন, “চলো, একটু বাইরে পায়চারি করে আসি। সময় আছে নিশ্চয়ই হাতে কিছুক্ষণ?”
লিও জানেন, লিজের কিছু কথা অবশ্যই আছে, যার জন্য তিনি তাঁকে ডেকে নিয়েছেন। তিনি লিজের পাশে হাঁটতে থাকেন।
“কথা হয়েছে হানের সঙ্গে? ভরসা দিলেন চাকরির?”
“নাহ্, বরং বললেন আমেরিকা বা অন্য কোথাও চেষ্টা করতে। ওপর থেকে নাকি অনেক প্রশ্ন করে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে আমার আবেদনপত্র। কাইজারে স্থায়ী চাকরির ওপর এখন নানা বিধিনিষেধ।”
“ওসব কিচ্ছু নয়। ইহুদিদের জার্মানিতে আর জায়গা হবে না। প্রফেসর স্টার্ক অটো হানকে সরিয়ে নিজেই কাইজার উইলেহেম ইন্সটিটিউটের রসায়ন বিভাগের প্রধান হবার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ওপর মহলে। প্রফেসর আইনস্টাইন খুব সম্ভব আর বেশিদিন এই ইন্সটিটিউটের অধ্যক্ষ থাকবেন না। যত শীঘ্র সম্ভব অন্য দেশে চাকরি নিয়ে চলে যাও।”
“জোহানেস স্টার্কের কথা বলছেন? যিনি নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন হাইড্রোজেন অ্যাটমের স্পেক্ট্রাল লাইনস আবিষ্কার করার জন্য? তিনি যে হিটলারের ন্যাশনাল সোশালিস্ট পার্টিকে সমর্থন করেন জানতাম না তো!”
“জানলে এবার। সমর্থন শুধু করেন তাই নয়, তিনি দলবল পাকিয়ে কাইজার থেকে সব ইহুদি বিজ্ঞানীদের তাড়াবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। শুনলাম তাঁর সাকরেদ হয়েছেন পদার্থবিদ প্রফেসর ফিলিপ লেনার্ড। পৃথিবীটা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে লিও! একদিকে ইহুদি, আর একদিকে ক্রিশ্চানরা। স্টার্ক এই দ্বিতীয় শ্রেণির বিজ্ঞানীদের বলেন, এরিয়ান সায়েন্টিস্ট। সব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ওঁদের হাতেই নাকি হয়েছিল।” হাঁটতে হাঁটতে বিষণ্ণ দেখায় লিজ মেইটনারকে।
“কিন্তু জার্মানিতে তো এ-যাবৎ বহু বিজ্ঞানী নোবেল পেয়েছেন, যাঁরা ইহুদি ধর্মের। তাঁরা ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামান না। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীরা এখন জার্মানিতে। ফিলিপ লেনার্ড তো প্রফেসর আইনস্টাইনের ফটো-ইলেকট্রিক এফেক্টের প্রমাণ দিয়েছেন তাঁর পরীক্ষাগারে। সেই জন্যই তিনি নোবেল পান। তবু এত জাতিবিদ্বেষ?” ক্ষোভে ফেটে পড়েন লিও জিলার্ড।
সামান্য হেসে দাঁড়িয়ে পড়েন লিজ মেইটনার। শ্রান্ত দেখায় তাঁকে।— “মজার ব্যাপার হল, প্রফেসর লেনার্ড কিন্তু তোমার শহর, মানে বুদাপেস্ত থেকেই এসেছেন। চলো, ওই সামনের বেঞ্চটাতে বসে কথা বলি। তাহলে ব্যাপারটা এই হল যে, অটো হান তোমাকে কোনও ভরসা দিতে পারেননি।” প্রসঙ্গ ঘোরানোর চেষ্টা করেন লিজ।
“আমি একটা নতুন সংগঠন খোলার কথা ভাবছি, প্রফেসর লিজ। সমমনস্ক বিজ্ঞান চিন্তকদের নিয়ে একটা দল। নইলে কীভাবে ঠেকানো যাবে পৃথিবীর সামনে উদয় হওয়া এই বিপর্যয়?”
“তুমি তো কমিউনিস্টদের মতো কথা বলছ দেখছি! রাজনীতিতে যাবার পরিকল্পনা নেই তো?” চোখ পাকিয়ে প্রশ্ন করেন লিজ।
“যদি পদার্থবিদ্যায় এঁটে উঠতে না পারি, তবে না-হয় রাজনীতিটাই করলাম।”
একটু থেমে লিও জিলার্ড আবার বলেন, “ছাত্র অবস্থায় ভিয়েনাতে জড়িয়ে পড়ি রাজনীতিতে। এরপর সেখানে ফ্যাসিবাদীরা শাসন ক্ষমতা দখল করে। আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে পর্যন্ত দেওয়া হয় না। পুলিশের খাতায় কমিউনিস্ট বলে নাম ওঠে। কিন্তু আমি জন আন্দোলনের সমর্থক ছিলাম মাত্র। তারপর পালিয়ে আসি জার্মানি। আর সেই জার্মানি থেকেই হয়তো আজ আবার পালাতে হবে অন্য কোথাও।” দীর্ঘশ্বাস পড়ে লিও জিলার্ডের।
লিজ ও লিও কেউই কিছুক্ষণ কোনও কথা বলেন না। তারপর লিজ পরিস্থিতি বদলে দিতে কণ্ঠস্বরে উৎসাহ ঢেলে বেঞ্চ থেকে উঠে পড়ে বলেন, “তোমার তো পরিবারের দায়দায়িত্ব নেই, তাই ঘরে ফেরার তাড়াও নেই মনে হয়। এসো, আমার ঘরে কফি খাই চলো। বাইরে বসে থাকলে ঠান্ডা লাগবে।”
লিও জানেন, লিজ নিজেও অবিবাহিত। প্রফেসর অটো হানের সঙ্গে নাকি তাঁর একটা রোম্যান্টিক সম্পর্ক আছে। সে থাকুক, তাতে লিওর কিছু আসে-যায় না। কিন্তু যে প্রশ্নটা তাঁর মাথায় ঘুরছে, সেটা লিজকে জিজ্ঞেস করার এই হচ্ছে উপযুক্ত সময়। কফি খাওয়াতে তাই বিন্দুমাত্র অসম্মতি প্রকাশ করেন না লিও জিলার্ড।
কাইজার উইলেহেম ইন্সটিটিউটের রসায়ন বিভাগের প্রকাণ্ড বাড়িটার পাশে আর একটা ছোট্ট বাড়ি আছে, যার ভূতলেই প্রফেসর মেইটনার আশ্রয় নিয়েছেন। লিওকে বসার ঘরে রেখে লিজ রান্নাঘরে গিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই নিয়ে আসেন দুই কাপ কফি। ততক্ষণে লিও রুম ফার্নেসের কাঠে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। লিজ সেদিকে তাকিয়ে বলেন, “তুমি তো বেশ কাজের ছেলে হে! এই জন্যই লোকে বলে, তুমি নাকি দু-দণ্ড স্থির হয়ে বসার ধৈর্য রাখো না।”
“বলে নাকি? তা হবে। তবে ডক্টর লিজ, আমি কিন্তু নতুন গবেষণায় হাত দিতে চাই। না না, তাত্ত্বিক বিষয় নয়, একেবারে পরীক্ষাগারে কাজে পুরোপুরি মন দিতে চাই। আর সেই জন্যই আপনার সঙ্গে কাজ করতে চাই।” প্রস্তাব দিয়ে লিজের দিকে তাকিয়ে থাকেন লিও।
কফির কাপে লম্বা চুমুক দিয়ে লিজ বলেন, “তা বেশ। লেগে পড়ো কাল থেকেই। কিন্তু আগে বলো, মাথায় কোন বিষয় ঘুরছে, যা নিয়ে তুমি কাজ করার আগ্রহ রাখো।”
“একটা কথা জিজ্ঞেস করি ডক্টর লিজ, অ্যাটমকে ভাঙা কি অসম্ভব? আর যদি সম্ভব হয়, তবে তার থেকে কি শক্তি পাওয়া যাবে? প্রফেসর আইনস্টাইন কিন্তু ভরের যে শক্তিতে রূপান্তর সম্ভব, সে-কথা জানিয়েছিলেন। আর যদি তা সম্ভব হয়, তবে কি বিধ্বংসী বোমা বানানো যাবে অ্যাটমকে ভেঙে?”
আগ্রহী হয়ে উত্তর দেন লিজ, “অ্যাটম নিজে থেকে যে ভেঙে যায়, তাকেই তো তেজস্ক্রিয়তা বলা হয়! তাহলে ভাঙা কেন যাবে না? প্রফেসর রাদারফোর্ড বহুকাল ধরে এই জাতীয় কাজ করে চলেছেন। অপেক্ষাকৃত কম ভরের নিউক্লিয়াসকে ভাঙার চেষ্টা করে চলেছেন তিনি অনবরত। রাদারফোর্ড না হলে অন্য কেউ হয়তো সফল হবেন। হবেনই একদিন। কিন্তু একটা কথা বলি চুপিচুপি, প্রফেসর রাদারফোর্ড নাকি নিজেও বিশ্বাস করেন না যে অ্যাটমকে আদৌ ভাঙা সম্ভব। তিনি যে আলফা পার্টিকল ছুড়ে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা করছেন, সে সবই কিন্তু পরমাণুর গঠন বোঝার জন্য। আমার নিজস্ব ধারণা, পরমাণু অবশ্যই ভাঙা যাবে, তা থেকে শক্তি পাওয়াও সম্ভব। কিন্তু বোমা? সেটা কীভাবে? আর হঠাৎ বোমার কথা কেন, গবেষক? সেই বোমা নিয়ে করবে কী?”
প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে লিও জিলার্ড লিজের দিকে সম্পূর্ণ অন্য প্রশ্ন ছুড়ে দেন, “আপনি এইচ. জি. ওয়েলস-এর লেখা ‘দ্য ওয়ার্ল্ড সেট ফ্রি’ পড়েছেন, ডক্টর লিজ?”
লিওর প্রশ্নে হঠাৎ যেন আঘাত পান লিজ।— “গল্পের বই? না তো! আমার ঘরের কোনায় যে পিয়ানোটা রাখা আছে, ওটা একটু আধটু বাজাই বটে, তবে সাহিত্যে একেবারেই মন নেই।”
লিজের মুখে ব্যঙ্গাত্মক হাসি দেখে লজ্জা পান লিও। তাঁর মনে হয়, লিজ মেইটনার ওকে নির্ঘাত পাগল ঠাওরেছেন। তিনি লিজকে আশ্বস্ত করার জন্য বলেন, “সংগীত আমারও প্রিয়। তবে ঘর ছেড়ে বহুদিন একা থাকার অভ্যেসে গল্প-উপন্যাস পড়ার আগ্রহ জন্মেছে অনেকদিন। আর ম্যাম, গবেষণার সঙ্গে ওয়েলসের লেখা এই উপন্যাসটার সম্পর্ক আছে বইকি! উনি এই বইতে এক অসাধারণ যুদ্ধের বর্ণনা দিয়েছেন, যাতে পৃথিবী ধ্বংস হবার ইঙ্গিত আছে। আর সেই ধ্বংসের বীজ বুনেছে মানুষ নিজেই; আণবিক বোমা বানিয়ে যুদ্ধে মেতেছে, শেষ হয়ে গিয়েছে মানবসভ্যতা। পৃথিবীর সেই শেষ দিন বড়ো ভয়ংকর। আজ যে পরিস্থিতিতে বিশ্ব দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাতে নির্ঘাত কেউ এমন একটা হাতিয়ার বানিয়ে ফেলবে।”
লিওর কথা শুনে ভীত হয়ে পড়েন লিজ মেইটনার। তাঁর ক্ষুরধার বুদ্ধি মুহূর্তে বুঝে যায় লিও কী বলতে চাইছেন।
“তোমার কাছে বইটি থাকলে আমায় পড়তে দিও, ডক্টর জিলার্ড। ওয়েলসের অন্য অনেক বই যথেষ্ট সাড়া তুলেছিল জানি, কাগজে সেই নিয়ে লেখালেখিও হয়েছিল। তবে সে-সব হল সায়েন্স ফিকশন, আসল সায়েন্সের সঙ্গে তফাত থাকতে পারে।”
“আবার মিলে যেতেও পারে, ডক্টর লিজ। আমি ওয়েলসের সঙ্গে দেখা করেছি বইটা পড়ার পর। প্রশ্ন করেছি, ইংরেজি থেকে অন্য কোনও ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদ করার অনুমতি তিনি দেবেন কি না। খুব বুঝেশুনে কথা বলেন ওয়েলস, তাই আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে গিয়েছেন। জিজ্ঞেস করেছি আণবিক বোমার এমন আইডিয়া তাঁর মাথায় এল কী করে। কিন্তু তিনি তো বিজ্ঞানী নন, সাহিত্যিক; কাজেই সেই উত্তরও তাঁর কাছ থেকে পাইনি।”
“তাঁকে কোথায় পেলে? বার্লিনে তাঁকে কেউ পছন্দ করে না তাঁর রাজনৈতিক মতামতের জন্য।”
“লন্ডনে। আমার এক বন্ধুকে ধরে অতিকষ্টে তাঁর সঙ্গে নৈশভোজের সুযোগ পেয়েছিলাম একদিন। কথা বলে বুঝেছিলাম, তিনি শুধু গল্পই লেখেননি, গভীরভাবে বিশ্বাস রাখেন নিজের ভবিষ্যৎ দৃষ্টির ওপর। আর একটা কথা ঠিক, তিনি বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকায় গড়ে ওঠা নতুন বিশ্ব নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত।”
কথা শেষ করে লিজ মেইটনারের সম্মতি নিয়ে উঠে পড়েন লিও জিলার্ড। তাঁকে ফিরতে হবে অনেকটা পথ। লিজ তাঁকে ডিনার করে যেতে বললে লিও সসম্মানে লিজকে জানান, তাঁকে ফিরে যেতে হবে বার্লিনের ভাড়া করা বাসায়।
লিজ মেইটনারের কাছ থেকে বিদায় নেবার আগে লিও আণবিক কণা ছুড়ে নিউক্লিয়াস ভেঙে ফেলার জন্য ঠিক এক বছর আগে তাঁর পেটেন্ট করা সাইক্লোট্রন যন্ত্রের ব্যর্থতার কাহিনি জানাতে ভোলেন না। লিজ চমকে উঠে বলেন, “এর কিছুদিন বাদেই তো লরেন্স তাঁর পেটেন্ট করে স্বীকৃতিও পেয়েছেন। শুনেছি এক কোম্পানি সেই পেটেন্ট কিনে লরেন্সকে বরাত দিয়েছে আরও বড়ো যন্ত্র বানাবার। তাহলে তোমার করা পেটেন্ট তো কাগজেই থেকে গিয়েছে! যন্ত্র বানালে না কেন?”
লিজ বিস্মিত হলেও লিও জিলার্ড শান্ত গলায় বলেন, “আবার এক যন্ত্র বানাবার উদ্যমটা নিজের বুকের ভিতর টের পাইনি বলেই হয়তো। আইনস্টাইনের সঙ্গে বানানো রেফ্রিজারেটরই-বা কোন কাজে এল? আরও উন্নতমানের রেফ্রিজারেটর তৈরি হয়ে গেল কয়েকবছর আগেই। জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানি বেশ লাভ করছে এই ধরনের যন্ত্র বাজারে ছেড়ে। যাক, অনেক দেরি হয়ে গেল ডক্টর লিজ। এবার বিদায় নেব। কফির জন্য ধন্যবাদ।”
***
আজ শনিবার। সপ্তাহের ঠিক এই দিনটিতে লিও জিলার্ডরা তিন বন্ধু মিলিত হন একটি বিশেষ রেস্তোরাঁয়। বাকি দুজন হলেন ভন নিউম্যান এবং আইগেন উইগনার। তিনজনের মধ্যে সবচাইতে বড়ো মিল হল, সবাই হাঙ্গেরির বুদাপেস্ত শহরের মানুষ। এঁরা তিনজনেই বার্লিন শহরে পড়াশুনো করে বড়ো হয়েছেন এবং সবাই প্রায় সমবয়সি।
রেস্তোরাঁতে ঢুকেই লিওর চোখে পড়ল, তাঁর দুই বন্ধু ইতোমধ্যেই পানপাত্র নিয়ে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন। গা থেকে ভারী কোটটা খুলে চেয়ারের মাথায় রেখে লিও বসতেই সবাই উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। নিউম্যান এবং উইগনার আমেরিকার প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাক পেয়েছেন পড়াবার। উইগনার পদার্থবিদ, কিন্তু নিউম্যান গণিতের একজন দক্ষ অধ্যাপক। দুই বন্ধু বার্লিন ছেড়ে চলে যাবে বলে লিও জিলার্ডের একটু একা লাগছে। কিন্তু মনের ভাব তিনি খুব কাছের মানুষের কাছ থেকেও আড়াল রাখতে পারেন। তবে এই শনি সন্ধ্যার আড্ডাটা মিস করতে হবে ভেবে মনখারাপ তো হচ্ছেই লিওর।
“তাহলে চললে তোমরা বার্লিন ছেড়ে?” লিওর গলার স্বর যেন সামান্য কেঁপে যায়।
দুই আমেরিকা যাত্রাকারী বন্ধু নিজেদের হাতের পানপাত্র নাড়াচাড়া করতে থাকেন।
নিউম্যান মুখ খোলেন।— “জার্মানিতে আর ইহুদি বিজ্ঞানীদের ভবিষ্যৎ নেই হে, কী আর করা যাবে? এবার নিজের জন্য চেষ্টা করো দেখি। সবাই মিলে না-হয় নিউ জার্সি শহরে আবার কোনও রেস্তোরাঁয় জমিয়ে আড্ডা দেব। শুনেছি ওখানকার মেয়েরা খুব সুন্দরী!”
উইগনার নিউম্যানের কথায় হেসে উঠে বলেন, “ওই এক রোগই তোমাকে খেল। সুন্দরীদের প্রতি তোমার দুর্বলতার কাছে অঙ্কের সমীকরণ হার মেনেছে।”
“আরে কী মুশকিল! আমি যে ওদের মধ্যেই খুঁজে পাই নানা গাণিতিক সমাধান। সে তোমরা বুঝবে না। সবাই কি আর লিও জিলার্ডের মতো কাঠখোট্টা বিজ্ঞানী হতে পারে?” হেসে ওঠেন নিউম্যান।
“হ্যাঁ, যেদিন থেকে প্রফেসর আইনস্টাইনের পাল্লায় পড়েছে, সেদিন থেকেই বারোটা বাজিয়েছে নিজের। গুরু যেমন আত্মভোলা, চ্যালাও তাঁকে নকল করছে। নইলে গের্ডার মতো ডাকসাইটে সুন্দরী বান্ধবী পেয়েও কাইজারে উইলেহেমে বুড়ি প্রফেসরের ল্যাবে যৌবন নষ্ট করে কেউ?” নিজের রসিকতায় দুলে দুলে হাসতে থাকেন উইগনার।
“গের্ডা কেন, কোনও রোম্যান্টিক সম্পর্কে জড়িয়ে আমি এই মুহূর্তে নিজের বিপর্যয় ঘটাব, এমন দুর্মতি আমার হয়নি। তবে প্রিন্সটনে আমিও আবেদন করব ভাবছি।”
ওয়েটার খাবারের অর্ডার নিতে তিনজন প্রফেসরের দিকে এগিয়ে আসছিল। সেই দিকে তাকিয়ে নিউম্যান বলেন, “আজ সব খাবারের দাম আমি দেব। কেউ পকেটে হাত দেবে না।”
“হ্যাঁ, অবশ্যই তোমাদের দুজনের মধ্যে একজনই দেবে। পেটেন্ট থেকে যদি ভুল করে কোনও অর্থ এসে পড়ে, সেদিন না-হয় আমিই…” হা হা করে হেসে ওঠেন লিও জিলার্ড।
“না না, যেদিন তোমার ওই বিপ্লবী দল—কী যেন নাম… বান্ড, জার্মানিতে ক্ষমতা দখল করবে, সেদিন না-হয় খাইও।” বলেই খাবারের অর্ডার দিতে থাকেন নিউম্যান।
উইগনার একটুও না হেসে গলা নামিয়ে লিওকে জানান, “এই দেশের অবস্থা কিন্তু ভালো নয়। জনি রসিকতা করে কথাটা বলল বটে, তবে তোমার রাজনৈতিক মতবাদ নিয়ে খুব বেশি আলোচনা করতে যেও না। বিজ্ঞানে তুমি অনেক স্বচ্ছন্দ, রাজনীতি তোমাকে কোথায় নিয়ে যাবে?”
“আমি তো চাই না কিছু হতে, দেশকালের গণ্ডিও বুঝতে চাই না। শুধু জানি যুদ্ধ লাগবে আর একটা, সত্যিই লাগবে এবং জার্মানি থেকেই শুরু হবে সেই ভয়ংকর যুদ্ধ।”
উইগনার হাত থেকে পানীয়র গ্লাস নামিয়ে টেবিলে রাখতে গিয়ে একটু যেন জোরেই শব্দ করে ফেলেন। তারপর প্রায় ফিসফিস করে বলেন, “আস্তে বলো, লিও। ন্যাশনাল সোশালিস্ট পার্টি তাদের চর লাগিয়ে রেখেছে সর্বত্র। সাবধান। এর চাইতে আমরা নিজেদের বর্তমান কাজ নিয়ে আলোচনা করি। সবার জন্য মঙ্গল হবে সেটাই।”
রাত বাড়তে থাকে। তিন বন্ধু মেতে ওঠেন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের পথ ভুল না ঠিক, তার চুলচেরা বিশ্লেষণে।
(জার্মানিতে থার্ড রেইকের গোড়াপত্তন)
১৯৩০ সাল। লিপজিক, জার্মানি।

লিপজিক শহরে জার্মান সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে সেদিন বেজায় ভিড়। ন্যাশনাল সোশালিস্ট বা নাৎসি পার্টির হাজার হাজার সমর্থক দলের স্বস্তিক চিহ্নওয়ালা পতাকা হাতে উল্লাসধ্বনি দিয়ে কোর্ট চত্বর গরম করে রেখেছে। আজ কোর্টে তিন সামরিক অফিসারের বিচারের রায় দেবেন জজ সাহেব। শুনানি প্রায় শেষ। শুধু সাক্ষ্য দিতে ডাকা হয়েছে রুডলফ হিটলারকে। তাঁর সাক্ষ্য-শেষে রায়। পুলিশ ভিড় সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে। উকিলরা বিরক্ত হচ্ছেন সমর্থকদের পাশবিক উল্লাসে। এখনও রায়দান হয়নি, তাতেও কী উল্লাস ওদের! ভাবটা যেন চিল্লিয়েই তিন সামরিক অফিসার, যারা জার্মান সামরিক বাহিনীতে নাৎসি পার্টির প্রচার চালাবার অভিযোগে ধৃত, তাদের সবাইকে ছাড়া পাইয়ে দেওয়া যাবে।
হিটলারের কালো গাড়িটা কোর্ট এলাকায় ঢুকতে দেখা গেল। ‘হেইল হিটলার’ আওয়াজ উঠল। সমর্থকরা এক অদ্ভুত কায়দায় স্যালুট জানাল হিটলারকে। গাড়ি থেকে নামতেই দেহরক্ষীরা চারদিক থেকে ঘিরে ধরল নাৎসি পার্টির নেতাকে। স্যালুটের জবাবে গর্বিত নেতা কপালে হাত ঠেকিয়ে স্যালুট জানালেন সামরিক কায়দায়। দাম্ভিক পদক্ষেপে কোর্ট রুমে ঢুকে পড়লেন হিটলার। দলে দলে সমর্থকরা সেদিকে ধাবিত হল। ব্যাটন নিয়ে পুলিশের দল তেড়ে গেল সেই দিকে। সমর্থকদের মধ্যে অনেকেই হাতিয়ার নিয়ে কোর্টে ঢুকে পড়েছে দেখে রক্তক্ষয়ের আশঙ্কায় দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার সংযত হতে নির্দেশ দিলেন পুলিশ বাহিনীকে।
ডাক পড়তে কাঠগড়ায় দাঁড়ালেন হিটলার। বিচারক তাঁর হাতের কাগজে চোখ বুলিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলেন হিটলারকে, “সামরিক বাহিনীতে ইস্তেহার বিলি করার আদেশ ছিল এই তিনজন অভিযুক্তর বিরুদ্ধে? যদি তেমনটা সত্যি হয়, তবে কারণ জানান। সামরিক বাহিনীতে যে কোনও রাজনৈতিক পার্টির প্রচার করা নিষিদ্ধ, সেটা বলে দেবার দরকার নেই বলেই মনে হয়।”
বিচারক তাঁর বক্তব্য শেষ করতেই হিটলারের মুঠি শক্ত হল। সামনে কাঠের রেলিংয়ের ওপর দুই মুঠি ঠুকে তিনি বলতে শুরু করলেন, “এমন কোনও নির্দেশ দেবার প্রমাণ আশা করি নেই। নাৎসি পার্টি দেশভক্ত। তারা জার্মানিকে আবার স্বমহিমায় ফেরাতে চায়। হ্যাঁ, যে ইস্তেহার এই তিন অফিসার বিলি করেছিল, তারা সবাই দেশের সেবায় জীবন উৎসর্গ করেছে। যদি ন্যাশনাল সোশালিস্ট পার্টির মতো তারা সামরিক বাহিনীতে ছড়িয়ে দিতে চায়, তাতে জার্মানির কল্যাণ হবে বলেই আমার মনে হয়। প্রতিটি খাঁটি জার্মান রক্তের মানুষের উচিত আজ দেশ বাঁচাতে এগিয়ে আসা। কমিউনিস্টদের কারণেই বিশ্বযুদ্ধের হার মেনে নিয়ে আজ অর্থনীতিক অনগ্রসরতার ব্যাধি জার্মানিকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। দ্বিতীয় রেইক সম্পূর্ণ ব্যর্থ। তৃতীয় রেইক আমরা গড়ে তুলবই, আর ন্যাশনাল সোশালিস্টরা হবে সেই রেইকের পুরোধা।”
হিটলারের জ্বালাময়ী বক্তৃতায় করতালিতে ফেটে পড়ে কোর্ট রুম। ধমকে ওঠেন বিচারক— “এটা আপনার নির্বাচনী প্রচার নয়। যা জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, তার সংক্ষিপ্ত উত্তর দিতে হবে।” তারপর পুলিশের দিকে তাকিয়ে বলেন, “সমর্থকদের মুখগুলো বন্ধ রাখুন, নয়তো ওদের বার করে দিন। এভাবে বিচারসভা চলে না। হ্যাঁ, হের হিটলার, ইস্তেহারে লেখা আছে, প্রতিবাদীদের মুণ্ডু নাকি বালিতে গড়াগড়ি খাবে। এর অর্থ কী? আপনারা দেশে বিপ্লব আনতে চাইছেন কি?”
“বিপ্লব তো আসবেই। তবে সেই বিপ্লব কম্যুনিস্টদের কায়দায় আসবে না। ১৯১৮ সালের বিপ্লবের মতো হবে না তার চেহারা। যারা সেই বিপ্লবে গর্বিত হয়ে জার্মানির ভবিষ্যৎ তলিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, তাদের মুণ্ডু গড়াগড়ি গেলে আমার কীই-বা করার আছে? যদি গিলোটিন বানাতে হয়, বানাব; কিন্তু পিতৃভূমির অসম্মান আমি সহ্য করব না।”
করতালিতে ডুবে যায় হিটলারের গলা। বিচারক টেবিলে হাতুড়ি ঠোকেন। হিটলার একটা হাত ওপরে তুলে ধরতেই থেমে যায় সমর্থকদের উল্লাস।
বিচারকের নির্দেশে চেয়ারে গিয়ে বসে পড়েন হিটলার। বিচারকের রায়ে দেড় বছরের কারাবাস হয় তিন সামরিক অফিসারের। অসন্তুষ্ট হিটলার কোর্ট রুম থেকে বেরিয়ে চলে যান নিজের গাড়িতে। আবার জয়ধ্বনি ওঠে, ‘হেইল হিটলার।’
১৯৩১ সাল। রোম, ইতালি।
বহুতল বাড়িটার সবচাইতে ওপরের তলায় গালে হাত দিয়ে বসে আছেন লরা। তাঁর স্বামীর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরতে এখনও বহু দেরি। রোমের স্যাপিয়েঞ্জা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের ব্যস্ত অধ্যাপক এনরিকো ফের্মি হলেন সবচাইতে কমবয়সি শিক্ষক। তবে ঘরে ফেরার জন্য সময় তাঁর একেবারে নির্দিষ্ট। কাঁটায় কাঁটায় আটটা বাজলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যায়। বিধ্বস্ত শরীর নিয়েও হাসিমুখে ঘরে ঢুকেই হাতের ব্যাগটা লরার হাতে ধরিয়ে দিয়ে তাঁর রোজনামচা শুনতে তিনি ভোলেন না। সবকিছুই প্রফেসর ফের্মি সময় অনুযায়ী মেপে করতে অভ্যস্ত। লরা বলেন, এনরিকোর মাথায় ঘড়ি বসিয়ে ভগবান পাঠিয়ে দিয়েছেন পৃথিবীতে। সেই শুনে অধ্যাপক তাঁর স্বভাবসুলভ ছেলেমানুষি ভঙ্গিতে বলেন, “এই ব্রহ্মাণ্ডের ক্ষুদ্রতম কণারাও একেবারে নিয়ম মেনে চলে। আর আমার শরীর তো সেই অণু-পরমাণু দিয়েই তৈরি, সময়ের হেরফের ঘটলে চলবে কী করে? জীবন অনেক ছোটো, সময় হারিয়ে ফেললে কত কী জানতে পারব না!”
লরা এনরিকোর ছাত্রী ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভাগ্যিস পদার্থবিজ্ঞান তাঁর অন্যতম বিষয় ছিল, নইলে এমন এক আপনভোলা বিশ্বখ্যাত স্বামী কোথায় পেতেন তিনি? এনরিকো স্বভাবে মুখচোরা। বছর কয়েক আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ভ্রমণে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে পাহাড়ে বেড়াতে গিয়েছিলেন এক ঝাঁক তরুণ অধ্যাপক। ক্লাসের বাইরে সেই প্রথম এনরিকোর সঙ্গে কথা হয় লরার। শুধু লরার সঙ্গেই কেন এনরিকো এত কথা বলেছিলেন, সে নিয়ে বন্ধুরা হাসাহাসি করেছিল। এনরিকো সব ছেড়ে ভূতত্ত্ব বোঝাতে শুরু করেছিলেন লরাকে। একহারা চেহারার এনরিকোর বুদ্ধিদীপ্ত চোখ দুটো যে অসম্ভব আকর্ষণীয়, বুঝতে পেরে মনে মনে সেদিন লজ্জা পেয়েছিলেন লরা। পরে দুজনের আলাপ গাঢ় হতে থাকে ক্লাসের বাইরেও। নানা ছুতোয় এনরিকোর কাছে লরা ক্লাসের পড়া বুঝতে যেতেন। এনরিকো হেসে বলতেন, “আর যাই করো, গ্র্যাজুয়েশনের পর ফিজিক্স পড়ার ভুল করতে যেও না কিন্তু। বিষয়টা নিজেই লজ্জা পেয়ে ক্রমশ পিছিয়ে যাবে।”
লরা পড়াশুনোয় ভালোই ছিলেন, কিন্তু অধ্যাপক ফের্মি তা জেনেও উপহাস করতে ছাড়তেন না। সেই সময়েই হঠাৎ করে এনরিকোর নাম কাগজে বেরোয়। আদর্শ গ্যাসের নতুন সমীকরণ আবিষ্কার করেন এনরিকো। ইতোমধ্যে তিনি জার্মানির গটিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে এসেছেন। সেখানে আলাপ হয়েছে তরুণ পদার্থবিদ হাইসেনবার্গ, ম্যাক্স বর্ন, উলফগ্যাং পাওলির সঙ্গে। আইনস্টাইন এনরিকোর গবেষণায় এক নতুন দিক উদ্ভাসিত হওয়ায় যথেষ্ট প্রশংসা করেছেন তাঁর কাজের। ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী পল ডিরাক প্রায় একই কাজ করছিলেন। দুজনের কাজের নতুন ধারাকে নাম দেওয়া হল হচ্ছে ফের্মি-ডিরাক স্ট্যাটিস্টিক্স।
এনরিকো আবার নতুন উদ্যমে নিজের অন্যান্য গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু খাওয়ার টেবিলে লরাকে শুনতে হয়, ইতালির বিশ্ববিদ্যালয়ে উপযুক্ত গবেষণাগার পাওয়া যাচ্ছে না, তৈরি করা নাকি আরও মুশকিল। ইতোমধ্যে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার এক মোটা বই লিখে ফেলেছেন এনরিকো। অভিভাবকতুল্য ইতালি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক কর্বিনো নাকি পাকাপাকিভাবে জার্মানি চলে যেতে পরামর্শ দিয়েছেন এনরিকোকে।
দরজায় বেল বাজতে গৃহ পরিচারিকা বয়স্ক মহিলা দৌড়ে গেলেন। লরা এখন অন্তঃসত্ত্বা। তাই হঠাৎ করে উঠে যাওয়া বা চকিতে কোনও কাজ করা তাঁর বারণ। এনরিকোর হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে টেবিলের ওপর রেখে পরিচারিকাটি ফায়ার প্লেসে কয়লা ঠুসে দিতে চলে যায়। আজ যেন এনরিকোকে একটু বেশি খুশি মনে হচ্ছে।
“দুটো জিনিস জীবনে অসম্ভব বলে মনে হত। একটা হল বিয়ে করা, সেটা তো হয়েই গিয়েছে। আর একটা হল, একটা গাড়ি কেনা। সেটাও আজ করে ফেললাম, বুঝলে। তাহলে পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু নেই, কী বলো?” এনরিকোর মুখে বিজয়ীর হাসি।
উত্তেজিত লরা বলেন, “গাড়িটা চালাবে কে শুনি? এত ভালো স্পোর্টসম্যান হয়েও গাড়ি তো চালাতে পারো না!” হাসতে হাসতে প্রায় সোফাতে শুয়ে পড়েন লরা।
এনরিকো নির্বিকার।— “কেন? যে বিয়ে করেছে আমাকে, সেই-ই সেটা চালাবে! আর আমার জীবনের কক্ষপথে শুধু একটাই ইলেকট্রন থাকতে পারে, এটা নিশ্চয়ই নতুন করে বলে দিতে হবে না? আমার গ্যাস ইকুয়েশনেও পাওলি ইক্সক্লুশন প্রিন্সিপল লাগিয়েছি। মনে আছে নিশ্চয়ই পাওলির সেই বিখাত থিওরির কথা? পরমাণুর কক্ষপথে একই কোয়ান্টাম নাম্বারের তকমা লাগানো দুটো ইলেকট্রন থাকতে পারে না। অসাধারণ কাজ করেছেন উলফগ্যাং পাওলি। যাই হোক, যা বলতে চাইছি তা হল, তুমিই হচ্ছ আমার কক্ষপথের একমাত্র ইলেকট্রন। এখন একটু কফি খেয়ে নেওয়া যাক। আরও কথা আছে। গাড়ি কাল এসে যাবে। আমি শিখে নেবার চেষ্টা করে দেখব, তবে তার আগে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”
খাওয়ার টেবিলে বসে আসল কথাটা পাড়লেন এনরিকো। বছর তিনেক আগে ইতালির একাদেমি অফ সায়েন্সের সভ্যপদ পেয়েছিলেন তিনি। যে-কোনো বিজ্ঞানীর জন্য এটি হচ্ছে সর্বোচ্চ সম্মান। কিন্তু এনরিকো তাতে একটুও খুশি ছিলেন না সেদিন। লরাকে বলেছিলেন, এই ধরনের সম্মানের পিছনে থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। প্রধানমন্ত্রী মুসোলিনির সিলমোহর পেতে হয় এই পদে মনোনীত প্রার্থীর। প্রফেসর কর্বিনের হাত নিশ্চয়ই ছিল সবকিছুর অন্তরালে। এনরিকো এই জাতীয় খ্যাতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তাঁর কাছে বৈজ্ঞানিক গবেষণা হচ্ছে একমাত্র অভীষ্ট। এনরিকো লরাকে বুঝিয়েছিলেন, সম্মাননীয় পদের সঙ্গে হয়তো জড়িয়ে যাবে শাসকদের মনোমত গবেষণার কাজ। আরও বলেছিলেন, বিশ্বযুদ্ধের পর কীভাবে বদলে যাচ্ছে ইউরোপের রাজনীতি এবং অর্থনীতি। তিনি অনেকটাই শঙ্কিত হয়েছিলেন সেদিন। তবে তিন বছর আগে তাঁকে প্রতিশ্রুত মাসোহারা আজ অবধি পাওয়া যায়নি।
“একাদেমি অফ সায়েন্স আমার বেতন বাড়িয়ে দিয়েছে। এই তিন বছরে সেই প্রতিশ্রুত বেতন তো পাইনি। এতদিনে কর্তৃপক্ষের টনক নড়ল কেমন করে কে জানে। খুশির খবর হল, সব বকেয়া অর্থ মিটিয়েও দিয়েছে। এই কারণেই নতুন গাড়ি কেনা হচ্ছে।” খাবারে মন দিলেন এনরিকো।
খুব স্বাভাবিকভাবেই লরা খুশিতে প্রায় চেঁচিয়ে উঠে বললেন, “আমাদের আসন্ন সন্তানটি তাহলে খুবই পয়মন্ত, বলো?”
এনরিকো হাসেন, “অবশ্যই! কিন্তু খরচ করবে সামলে। হয়তো আমাকে আবার আমেরিকা বা জার্মানি পাড়ি দিতে হতে পারে কাজের জন্য। যদি স্কলারশিপ না পাই, তবে গাঁটের কড়ি খরচ করতে হবে।”
“জার্মানি গেলে হয় না? আমেরিকা যেতে আমার একটুও ভালো লাগবে না। সে-বার যখন তোমাকে মিচিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ওপর বক্তৃতা দেবার জন্য ডেকে নিয়ে গিয়েছিল, আমার নিউইয়র্ক শহর একদম ভালো লাগেনি। তার চাইতে আমাদের এই রোম অনেক ভালো শহর বাপু। একটু প্রাচীনপন্থী মানুষজন বাস করে, নিত্য তাদের মধ্যে ঝগড়া লেগেই থাকে, তবু নিজের দেশ বলে কথা!”
“এই দেশ তো আমারও দেশ! আমেরিকাতে যে-পরিমাণ কাজ হচ্ছে এবং তা এত বেশি দ্রুত যে কেউ রোমে বসে কল্পনাও করতে পারবে না সে-কথা। ইংরেজি ভাষাটাই রপ্ত করে উঠতে পারিনি। তাও যে যেতে চাইছি, তার একটা কারণ তো আছেই।” হাত ধুতে বেসিনের দিকে চলে যান এনরিকো।
“আমি তো ইংরেজি বলতেই পারিনি সে-বার। তাই তো ভয় হয়। নেহাত তোমার বন্ধু স্যাম ইংরেজির ভুল ধরিয়ে দিয়েছিলেন বক্তৃতার শেষে।”
“স্যাম, মানে স্যামুয়েল গাউটস্মিটের কথা বলছ? খুব বুদ্ধিদীপ্ত ছেলে, আমারই বয়সি। তবে ও কিন্তু হল্যান্ডের মানুষ। আমেরিকাতে পড়াশুনো করেছে বলে ইংরেজি শিখে ফেলতে অসুবিধা হয়নি। আর ডক্টর এহরেনফেস্টের কথা ভুলে গেলে? দুজনেই আমার খুব বন্ধু হয়ে গিয়েছে। হ্যাঁ, মাঝে-মধ্যে ওদের সঙ্গে কথা হয় চিঠির মাধ্যমে। এদের মতো বিজ্ঞানীদের জন্য জানতে পারি ইউরোপে কোন কোন কাজ হচ্ছে। ভাবছি স্যাম গাউটস্মিটকে রোমে বক্তৃতা দেবার জন্য আমন্ত্রণ জানাব। খুব ভালো বক্তৃতা করে।” হাই তোলেন এনরিকো।
“এই ছুটির দিনে তাহলে শুরু হচ্ছে তোমার গাড়ি চালাবার ক্লাস। এখন তো পারিশ্রমিকও পাওয়া যাবে আশা করা যায়। বেতন বেড়ে গিয়ে আমাদের অবস্থার উন্নতি হয়েছে।” হাসতে হাসতে বলেন লরা।
এনরিকোর মাথার ঘড়ি ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে। তিনি চলেন বিছানায় ক্লান্ত শরীর ঢেলে দিতে।
১৯৩১ সাল। ক্যালিফোর্নিয়া, আমেরিকা।
রেশমি চুলের গোছা সামলাতে সামলাতে দূর রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল তেইশ বছরের সুন্দরী মেলবা। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সে পদার্থবিদ্যায় ডক্টরেট করছে। বিষয়, কোয়ান্টাম ইলেক্ট্রো-ডায়নামিক্স। হস্টেলের রাস্তাটা এই সকালে বেশ নির্জন। শীতকাল কেটে গিয়ে এখন বসন্তর আগমন ঘটছে। গাছেদের ঝরা পাতা হিমেল হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে রাস্তায়। গায়ের জ্যাকেটটার জিপার তুলে দিল মেলবা। তার পিএইচ.ডি-র গাইড ভদ্রলোক একটু খ্যাপা গোছের। গতকাল কোয়ান্টাম তত্ত্ব নিয়ে মেলবা কিছু প্রশ্ন করতেই দূরে উদাস দৃষ্টি মেলে প্রফেসর রবার্ট বললেন, “একটু ব্যস্ত আছি। আগামীকাল ছুটির দিন। সকাল সাতটার সময় হস্টেলের সামনে দাঁড়িয়ে থেকো, আমি তোমাকে গাড়িতে তুলে নেব। লং ড্রাইভে যেতে যেতে আলোচনা করে নেওয়া যাবে।”
মেলবা জানে, তার হস্টেলের বন্ধুরা আজ যথেষ্ট ঈর্ষা করবে তাকে, কারণ প্রফেসর জুলিয়াস রবার্ট ওপেনহাইমার একজন অত্যন্ত স্মার্ট তরুণ। তবে তাঁকে ‘জুলিয়াস’ বলে কেউ ডাকলে তার কপালে শনি লেখা আছে। এই নামটা অধ্যাপকের প্রচণ্ড অপছন্দের। বন্ধু অধ্যাপকেরা নাকি আড়ালে ইচ্ছে করেই তাঁকে এই নামে ডাকে। বেচারা নামের প্রথমটা মুছেও ফেলতে পারছেন না।
অধ্যাপক ওপেনহাইমার যে দুর্দান্ত পড়ান তা নয়, অসাধারণ তাঁর বোর্ড ওয়ার্কও। যে-কোনো বিষয়ে একেবারে গোড়া থেকে বুঝিয়ে বলতে ভালোবাসেন, তবে যদি আলাদা করে তাঁর সঙ্গে কেউ নিভৃতে কথা বলে। কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যায় ইতোমধ্যেই একটা গবেষণা পত্র লিখে হইচই ফেলে দিয়েছেন— বর্ন-ওপেনহাইমার হাইপোথেসিস। অবশ্য মেলবার মনে যেসব প্রশ্ন ছিল, তা এই বিষয়ের ধারেকাছেও নয়।
দূর থেকে প্রবল বেগে আগুয়ান ডক্টর ওপেনহাইমারের গাড়িটা দেখতে পেয়ে হাত নাড়ে মেলবা। ক্যাঁচ শব্দ করে গাড়ি থামে। মেলবা গাড়িতে উঠে সৌজন্য সম্ভাষণ সেরে বলে, “প্রফেসর, আপনি তো গাড়ি বড্ড জোরে চালান!”
চোখের কোনা দিয়ে মেলবার দিকে তাকিয়ে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে শীর্ণ হাতের মুঠো শক্ত করে ওপেনহাইমার বলেন, “দ্রুততাই জীবন। সময় বড়ো কম হাতে। তবে ভয় পেও না, আমি আগে অনেক জোরে গাড়ি চালাতাম, অ্যাক্সিডেন্টের পর থেকে আস্তে চালাই। ইয়ে, আমি কিন্তু সিগারেট খাই গাড়িতে বসেই, তোমার আপত্তি নেই তো?”
মেলবা অধ্যাপকের শেষ প্রশ্ন এড়িয়ে যায়।— “অ্যাক্সিডেন্ট মানে? কোথায়? চোট-টোট…”
হাসেন ওপেনহাইমার।— “নিউইয়র্কে হয়েছিল গতবছর। আমার তেমন চোট লাগেনি, তবে বেশি আঘাত লেগেছিল আমার বান্ধবীর। তখন সবে জার্মানি থেকে ফিরেছি। পুলিশ আমার পরিচয় পেয়ে কেসটাকে বেশি এগিয়ে নিয়ে যায়নি।
“আর বান্ধবীর কী হল?” জিজ্ঞাসু হয়ে পড়ে মেলবা।
“আ… তা বলতে বাধা নেই, সে আমার সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক রাখেনি। যাক গে, তোমার প্রশ্নগুলো এবার করে ফেলো। একে একে উত্তর দিতে থাকি।”
মেলবার খুব অদ্ভুত লাগে প্রফেসরকে। চোখ দুটো তাঁর বড়ো বেশি চঞ্চল। বান্ধবীকে বসিয়ে গাড়িতে অ্যাক্সিডেন্ট করাটা যেন তিনি ভুলে যেতে চাইছেন।
“শ্রডিঙ্গার, না হাইসেনবার্গ— কার কোয়ান্টাম তত্ত্ব আমাদের সঠিক দিশা দেখাবে, প্রফেসর?”
ওপেনহাইমার সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে সামনের ছাইদানিতে গুঁজে দিয়ে বলেন, “দুজনেই হয়তো ঠিক। তবে হাইসেনবার্গের অ্যাপ্রোচ আমার অনেক সহজ বলে মনে হয়। ম্যাট্রিক্স মেথডে যদি কেউ স্বছন্দ হয়, তাহলে সে হাইসেনবার্গকে বেশি ভালোবাসবে। সে বড়ো মজার মানুষও। আমি গটিঙ্গেনে তার সঙ্গে খুব আড্ডা দিতাম। ওর আনসারটেইনিটি প্রিন্সিপল অবশ্যই ওকে বিখ্যাত করেছে, কিন্তু পদার্থবিদ্যার নানাদিক ওর হাতে চমক দেখাবে, আমি নিশ্চিত।”
“প্রফেসর রাদারফোর্ড নাকি ওঁকে খুব স্নেহ করেন? কিন্তু হাইসেনবার্গ তো ফলিত বিজ্ঞানে কাজ করেন না!”
“উত্তর দেওয়া কঠিন। হাইসেনবার্গ অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং দক্ষ বিজ্ঞানী। ও যে ফলিত বিজ্ঞানে রুচি রাখে না, এমন বলা ঠিক নয়। আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একেবারেই উলটো। ল্যাবরেটরিতে কাজ করতে বললে আমার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করে। একবার ক্যাভেন্ডিস ল্যাবরেটরিতে কাজ করতে হয়েছিল পিএইচ.ডি-র জন্য। আর রাদারফোর্ডের সঙ্গে কাজ… অধ্যাপক আমার ওপর চটে লাল। তিনি ল্যাবের বাইরে প্রায় আমাকে বার করে দেন আর কী! খেপে গিয়ে আমাকে ল্যাবে একটা কোর্স করতে আদেশ দেন। আমি যোগ দিই, কিন্তু আমার হাতে উপর্যুপরি ল্যাবের যন্ত্রপাতি নষ্ট হতে থাকায় প্রফেসর রাদারফোর্ড আমাকে নিষ্কৃতি দেন। অবশ্য আমার অঙ্ক কষার ক্ষমতা দেখে তিনি পরে আমাকে স্নেহ করতে শুরু করেন, প্রশ্রয়ও দিতেন।”
“প্রফেসর হাইসেনবার্গের একটা বক্তৃতার আয়োজন করা যায়, স্যার?”
“ভালো প্রস্তাব। আমি দেখি কোনও ফান্ড জোগাড় করা যায় কি না। অসাধারণ অভিজ্ঞতা হবে ছাত্রছাত্রীদের। ধন্যবাদ আমাকে মনে করিয়ে দেবার জন্য।”
মেলবার প্রশ্নগুলোর একে একে উত্তর দিতে থাকেন তরুণ প্রফেসর। এর মাঝেই সে অধ্যাপককে আস্তে গাড়ি চালাতে বলেছে বেশ কয়েকবার, তাতে কাজও হয়েছে। ওপেনহাইমার নিজে থেকেই বলেন, “এই গাড়িটা আমার বাবা আমাকে কিনে দিয়ে বলেছেন যেন আর অ্যাক্সিডেন্ট না করি। বাবা খুব অদ্ভুত মানুষ। তিনি চিরকালই চেয়েছেন, আমার চলাফেরা যেন দ্রুত হয়ে ওঠে। খুব ছোটবেলায় তিনি আমাকে ঘোড়া চড়ায় উৎসাহ দেন, আবার গ্র্যাজুয়েশন হয়ে যাবার পর আর পাঁচটা বাবা যেমন পার্টি দেন, আমার বাবা তেমন নন, আমাকে একটা নৌকো কিনে দেন।”
“নৌকো? কেন?” প্রশ্ন করে মেলবা।
“জল আমাকে আকর্ষণ করত। খেলাধুলোয় ভালো ছিলাম। নিউইয়র্কে আমাদের বাড়ির পাশে ছিল মস্ত এক সরোবর। বাবার দেওয়া নৌকো চালিয়ে আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম।” হঠাৎ খুব উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন প্রফেসর ওপেনহাইমার।
ছোট্ট পাহাড়ের মাথার রাস্তায় পৌঁছে যেতে গাড়ি থামান ওপেনহাইমার। বলেন, “দ্যাখো, শহরটা কী সুন্দর দেখাচ্ছে এখান থেকে। তোমাকে খুব ক্লান্ত লাগছে, মেলবা। বরং তুমি একটু বসো, বিশ্রাম নাও, আর আমি একটু পায়চারি করে আসি। বাই দ্য ওয়ে, তুমি কি স্মোক করো? ইচ্ছে করলে আমার সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা তুলে নিতে পারো নিশ্চিন্তে।”
“না, প্রফেসর। তবে কোথায় যাচ্ছেন এখন?”
“বেশি দূরে নয়। এই একটু হেঁটে আসি সামনে থেকে। জায়গাটা বেশ সুন্দর, তাই না?”
হেঁটে চলে যান ওপেনহাইমার। মেলবা সেই দিকে তাকিয়ে ভাবে, তাকে উনি সঙ্গে নিলেন না কেন? ভদ্রলোক সত্যিই খুব অদ্ভুত। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমে চোখ জুড়িয়ে আসে মেলবার। ভোরবেলা ওঠার অভ্যেস তার নেই। গাড়ির সিটে মাথা ঢলে পড়ে মেলবার।
জানালায় ঠকঠক আওয়াজ শুনে গাড়ির কাচের দিকে তাকায় মেলবা। একজন মধ্যবয়স্ক পুলিশ ইশারায় তাকে গাড়ির কাচ নামাতে বলেন।
“এনি প্রবলেম?” একটু রুক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করেন পুলিশ অফিসার।
“একদমই না, অফিসার। আমার সঙ্গী কাছেই কোথাও আছেন, সমস্যা হয়নি কিছু।”
পকেট থেকে নোটবুক বার করে গাড়ির নম্বর লিখে নিতে নিতে সঙ্গীর নাম জিজ্ঞেস করেন অফিসার। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চক্ষু স্থির হয়ে যায় মেলবার। বেলা অনেক হয়ে গিয়েছে। কতক্ষণ যে সে ঘুমচ্ছিল কে জানে। প্রফেসর ওপেনহাইমারই-বা কোথায়? ওয়াকিটকিতে কিছু কথা বলেন পুলিশ অফিসার। তারপর গাড়ির চাবি খুলে নিয়ে মেলবাকে পুলিশের গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়।
মেলবাকে হস্টেলে নামিয়ে দিয়ে পুলিশের গাড়ি ছুটে চলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি কোয়ার্টারসের দিকে। একজন পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিকিউরিটিকে জিজ্ঞেসাবাদ করে প্রফেসর রবার্ট ওপেনহাইমারের বাড়িতে বেল বাজান। পুলিশের কাছ থেকে সবটা শুনে নিজের কপাল চাপড়ে তিনি বলে ওঠেন, “মাই গড! আমি সেই যে লম্বা ওয়াকে গিয়েছিলাম, তারপর সব ভুলে মেরে দিয়ে হেঁটেই বাড়ি ফিরেছি। রাস্তায় অবশ্য একজন পরিচিত লোক আমাকে লিফট দিয়েছিল, নইলে হয়তো আগামীকাল ফিরে আসতাম। আচ্ছা, আমার গাড়িটা কি এখন পুলিশ থানায়? ঠিক আছে, সময়মতো ফেরত দিয়ে যাবেন। এখন আসুন, আমাকে ঘুমোতে যেতে হবে।”
পুলিশ দুজন নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করতে থাকেন। তবে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে যে এমন পাগলের নানা নমুনা ছড়িয়ে আছে, তা তাঁদের জানা।
১৯৩১ সাল, বার্লিন।
বার্লিনের মোজস্ট্র্যাস স্ট্রিটে গের্ডা ফিলিপসবর্নদের নতুন কেনা বাড়ির বসার ঘরে বসে লিও জিলার্ড গের্ডাকে বললেন, “আরও একবার প্রফেসর আইনস্টাইনকে একটা চিঠি লিখতে হবে তোমাকে আমার জন্য।”
সুন্দরী গের্ডা তার ঘাড় অবধি ছাঁটা কালো চুল ঝাঁকিয়ে বলে উঠল, “আমাকে তোমার সেক্রেটারি পেয়েছ নাকি? তাহলে জীবনসঙ্গিনী করে নিচ্ছই-বা না কেন?”
“গের্ডা, তুমি জানো আমার স্থায়ী চাকরি নেই। তোমরা উচ্চবিত্ত মানুষ। তোমার বাবা নেহাত ভদ্রলোক বলেই এখনও আমাকে সহ্য করেন। লন্ডনে তোমাদের যে বাড়ি আছে, তাতে স্বছন্দে আমাকে অতিথিশালায় জায়গা দিয়েছিলেন অনেকদিন। আমার জীবনের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা তোমার অনুচিত হবে। জার্মানিতে বেশিদিন বসবাস করা আমার মতো হাঙ্গেরিয়ান ইহুদির পক্ষে আদৌ সম্ভব হবে কি না জানা নেই। আমি তো দুটো সুটকেস প্যাক করে রেখেছি, যাতে সময়মতো পালাতে সুবিধা হয়। আমার চিঠিটা লিখে দিয়ে উপকৃত করো। আগেও তো তুমি আমার জন্য আইনস্টাইনকে চিঠি লিখে দিয়েছ! জানোই তো, উনি জার্মান ভাষায় চিঠি পড়তে পছন্দ করেন, আর আমি জার্মান ভাষায় লিখলে চিঠির অর্থ কী হয় কে জানে।”
গের্ডা উঠে যায় জানালার কাছে। লম্বা সুঠাম একজন খেলোয়াড়ের মতো দৃপ্ত দেখায় তার পদচারণা। লিও বলেন, “এই যে কাগজ-কলম নাও। লেখো যে আমেরিকায় আমার পর্যটক ভিসা বদলে যেন কাজের জন্য ভিসা দেওয়া হয়। তিনি যেন আমেরিকার কন্স্যুলকে একটা সুপারিশ পত্র লিখে দেন এই মর্মে।”
গের্ডা ভ্রূ কুঁচকে প্রশ্ন করে, “আর কাজটা কে দেবে শুনি?”
“উইগনার। আমার সঙ্গে কথা হয়েছে তার। প্রিন্সটনে কাজ পাওয়া যেতে পারে পড়ানোর। দেখাই যাক।”
“পালাতে চাইছ তাহলে? সত্যিই আমেরিকা চলে যাবে বলে ঠিক করেছ? আমাদের যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল, তার ইতি এখানেই?” দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে টেবিলের কাগজের ওপর ঝুঁকে পড়ে লিখতে থাকে গের্ডা। তার দ্রুত কলম চালানোর দিকে তাকিয়ে লিও জিলার্ড স্বপ্ন দেখেন আমেরিকা পাড়ি দেবার।
লেখা শেষ করে কাগজ ভাঁজ না করেই গের্ডা জানায়, “আমিও চললাম দেশ ছেড়ে। তোমার এই চিঠিটা লেখাই ছিল আমার সিদ্ধান্ত নেবার ওপর সিলমোহর।”
বিস্মিত হন লিও।— “কোথায় যাবে তুমি! মানে…”
হঠাৎ ঘরের গুমোট ভাব কাটিয়ে খিলখিল করে হেসে ওঠে গের্ডা।— “তোমার পিছন পিছন আমেরিকায়, আর কোথায়?” লিও জিলার্ডের হতভম্ব মুখের দিকে তাকিয়ে গের্ডা তাঁকে আশ্বস্ত করে, “ভয় নেই। আমার সঙ্গে ঘর বাঁধতে বলব না আর। আমি যাচ্ছি ভারতে।”
“ভারতে কেন? সেখানে যে ব্রিটিশ শাসন! সেখানে পড়তে যাবে?”
“আজ্ঞে না। সেখানে স্কুলগুলো এখনও অনেক পিছিয়ে। ভারতের রাজধানী হচ্ছে দিল্লি। আমার সঙ্গে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত জাকির হোসেন। সে দেশে ফিরে গিয়েছে। দিল্লিতে নাকি একটা বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে বলছে। আমি ঠিক করেছি, সেই দরিদ্র দেশের ছেলেমেয়েদের পড়াব। বাকি জীবনটা দিব্যি চলে যাবে।”
“আচ্ছা, আমি পারি না ভারতে গিয়ে অধ্যাপনা করতে?”
“এবার কে কার পিছু নিতে চাইছে লিও? না, তোমার মতো পদার্থবিজ্ঞানীর কাজ ইউরোপ-আমেরিকাতেই জুটতে পারে, ভারতের মতো ব্রিটিশ কলোনিতে কখনোই নয়। নিশ্চিন্তে চলে যাও আমেরিকা। কাজের চাইতে প্রেম বড়ো হতে পারে না। আর আমাদের মধ্যের সম্পর্কটা বোধ হয় বন্ধুত্বেরই ছিল। পিছুটান রেখো না। চিঠিটা ডক্টর আইনস্টাইনকে পাঠিয়ে দিও। উনি নিশ্চয়ই কিছু কাজ জুটিয়ে দেবেন তোমার জন্য।”
প্রিয়জন বিয়োগের ব্যথা আজ লিও জিলার্ডের বুকে। কিন্তু গের্ডা ছাড়াও তাঁর জীবনে অনেক বড়ো কিছু অপেক্ষা করে আছে, তিনি টের পান। নিজের জীবন নিয়ে গের্ডার পদক্ষেপ তাঁকে মেয়েটির প্রতি সম্ভ্রম জাগিয়ে তোলে।
নীরবে চিঠিটা টেবিল থেকে কুড়িয়ে নেন লিও। তারপর পিছনে না তাকিয়ে এগিয়ে যান দরজার দিকে। বেশ বুঝতে পারেন, এই তাঁর গের্ডার সঙ্গে শেষ দেখা।
(ক্রমশ)
জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর