আগের পর্ব- পর্ব ১

সত্যি বলতে কী, পুরোনো কালের সেইসব সহজ-সরল দাওয়াই আজকালকার এসব ‘আধুনিক’ ডিসপেন্সারির কেরামতির চাইতে অনেক বেশি কাজ দিত।
যাক গে। সে-কথা এখন থাক। কী হল তাই বলি। আধঘণ্টাটাক একত্তর বসে তো যার যার অসুখবিসুখ নিয়ে জোর গুলতানি হল। ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠবার সময় আমার কী করুণ অনুভূতি হয় সেইসব কথা আমি সবই জর্জ ও উইলিয়াম হ্যারিসকে খুলে বললাম। তারপর জর্জ বলল বিছানায় শুতে যাবার সময় তার হাজারো যন্ত্রণার কাহিনি। একটা তোয়ালে পেতে তার ওপর দাঁড়িয়ে, অসামান্য ধুরন্ধর অভিনয়ের মাধ্যমে জর্জ সে-কাহিনির একটা দৃশ্যরূপও ফুটিয়ে তুলল আমাদের সামনে।
ছোকরার ধারণা, ওর কোনও অসুখ করেছে। বেশ ভয়াল অসুখ। তবে, আদতে ওর কোনও অসুখবিসুখই নেই, বুঝলেন কিনা!
তা কথাবার্তা চলতে-চলতেই হঠাৎ মিসেস পপেট্স্ দরজায় টোকা দিয়ে বললেন, খাবার তৈরি; আমরা এখন খাব কি না। শুনে আমরা ভারি বিষণ্ণ হেসে বললাম, কায়ক্লেশে দু-এক টুকরো মুখে দেবার চেষ্টা অন্তত করব। সেটা জরুরি, কারণ হ্যারিস কোত্থেকে শুনে এসেছে যে পেটে দু-এক টুকরো রুটি থাকলে নাকি রোগের প্রকোপটা একটু কম হয়। যা হোক, খানিক বাদে মিসেস পপেট্স্ খাবারের ট্রে নিয়ে এলেন। আমরা তার থেকে খানিক স্টেক আর দু-এক কুচি পেঁয়াজ নিয়ে নাড়াচাড়া করলাম, খানিক রাবার্ব দেয়া পেস্ট্রি চিবোলাম।
আমার শরীরটাই বোধ হয় সবার মধ্যে একটু গুরুতর রকম খারাপ ছিল। নইলে মাত্র আধঘণ্টা ধরে খাওয়া চালাতে না চালাতেই কারও খিদে ফুরিয়ে যায়! আর তারপর, কী বলব, এক টুকরো চিজ অবধি আর মুখে দেবার রুচি হল না।
কোনোমতে খাওয়াদাওয়ার দায়টা সেরে, গ্লাস-ভরতি পানীয় আর বুক-ভরতি চুরুটের ধোঁয়া ভরে আমরা ফের আমাদের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত আলোচনাটাকে চালু করলাম। ঠিক কী, বা কী কী অসুখে আমাদের ধরেছে সেইটে নিয়ে কেউ নিশ্চিত হতে না পারলেও আলোচনা থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার উঠে আসছিল— তা হল, সেই রোগ বা রোগদের উৎস হল আমাদের অতিরিক্ত খাটুনি।
“আসলে বিশ্রাম দরকার আমাদের। বুঝলে?” হ্যারিস তার নিদান হাঁকল।
“হুম। বিশ্রাম, আর হাওয়া বদল।” জর্জ মতামত জানাল, “মাথাটাকে অতিরিক্ত খাটাবার ফলে শরীরের যাবতীয় কলকব্জার ওপরেই প্রবল চাপ পড়েছে বলে মনে হয়। এক্ষেত্রে পরিবেশের বদল আর চিন্তামুক্ত কালহরণ বিধেয়। এতেই ফের মনের ভারসাম্য ফিরে আসবে আমাদের।”
জর্জের এক তুতো ভাই আছে। সে বোধ হয় ডাক্তারি পড়ে। অতএব ডাক্তারি ঢংয়ে অভিমত জানানোর অধিকার জর্জের আছে।
জর্জের কথায় সায় দিয়ে আমি বললাম, “ঠিক তাই। একটা শান্ত, নির্জন, পুরোনো ধাঁচের জায়গা খুঁজে বের করা হোক। শহরের এই উন্মত্ত জনতার থেকে দূরে… রৌদ্রে ঝিম ধরে থাকা কোনও অজ গ্রামের অলিগলিতে হেঁটে বেড়াব আমরা… স্বপ্ন দেখব আহা… প্রায় ভুলে যাওয়া কোনও নির্জন জায়গা, পরিরা যাকে যত্নে লুকিয়ে রেখেছে চোখের আড়ালে… পৃথিবীর গর্জন যেখানে পৌঁছোয় না… সময়ের কোনও এক উত্তুঙ্গ চূড়ায় পাখির মতো ঘাপটি মেরে বসে থাকা এক দেশ… সেখান থেকে উনিশ শতকে কলরোল শোনায় যেন দূরাগত অবছায়া প্রতিধ্বনি…”
শুনে হ্যারিস বলে, “আছে, আছে! এমন জায়গা আছে যেখানে লোকে সন্ধে আটটায় শুতে চলে যায়। যেখানে মুদিখানা যেতে দশ মাইল হাঁটতে হয়। তবে সেরকম ধ্যাদ্ধেড়ে গোবিন্দপুর না যেতে চাইলে সেক্ষেত্রে জাহাজে করে সমুদ্রে ঘুরতে গেলেও একই ফল পাওয়া যাবে।”
শুনে আমি কঠোর আপত্তি জানালাম। দু-মাস কি তিনমাসের জন্য হলে সমুদ্রযাত্রায় মজা আছে। কিন্তু এক সপ্তাহের জন্য সমুদ্রযাত্রা ব্যাপারটা বেশ বিষাক্ত ব্যাপার। কেন, সেটা ভেঙে বলি।
ধরো তুমি এক সপ্তাহের জন্য সমুদ্রে বেড়াতে গেলে। রওনা হলে সোমবার। বুকে অনেক আশা, বেজায় ফুর্তি করবে গোটা ট্রিপ জুড়ে। অতএব পাড়ে দাঁড়ানো ছোকরাদের হাত-টাত নেড়ে বিদায় দিয়ে ফেললে ঝটপট। তারপর মোটকা একখানা পাইপ জ্বালিয়ে ডেকের ওপর এমন স্টাইলে হাঁটাচলা শুরু করলে যেন রবার্ট কুক, সার ফ্রান্সিস ড্রেক আর ক্রিস্টোফার কলম্বাস— তিনজনকে একসঙ্গে চটকে লুচি বেলে তোমার সৃষ্টি হয়েছে। এরপর, মঙ্গলবার তোমার মনে হবে, জাহাজটা না চড়লেই ভালো হত। বুধ-বৃহস্পতি-শুক্র তুমি টের পাবে তুমি মরে গেছ। শনিবার সকালে তুমি কষ্টেসৃষ্টে একটু চা মুখে ঠেকাতে পারবে। রবিবার মোটামুটি সমুদ্রপীড়া থেকে সেরে উঠে তুমি শক্ত খাবার খেতে শুরু করবে ফের। তারপর, সোমবার আসতেই থলে আর ছাতা হাতে এসে জাহাজের গলুইয়ের কাছে লাইন দেবে নেমে যাবার জন্য।
আমার এক জামাইবাবু একবার এরকম একটা ছোটো সমুদ্রযাত্রার চেষ্টা করেছিলেন। লন্ডন থেকে লিভারপুলের একটা রিটার্ন টিকিট কেটে তিনি জাহাজে চেপে বসলেন। তারপর লিভারপুল যখন পৌঁছোলেন তখন ওসব ঘোরা-টোরার কথা তাঁর মাথা থেকে বিলকুল উবে গিয়েছে। তখন তাঁর একটাই স্বপ্ন, একটাই সাধনা— টিকিটের রিটার্ন অংশটা যে-কোনো মূল্যে বেচে দিয়ে অব্যহতি পাওয়া।
বহু চেষ্টাচরিত্র করে সে-যাত্রা সেই টিকিট উনি বেচতে পেরেছিলেন; তবে সে একরকম বিনি পয়সাতেই বলা যায়। কিনেছিল এক জন্ডিসে ধরা চেহারার ছোকরা। দিয়েছিল মাত্র আঠারো পেন্স। তাকে নাকি ডাক্তারে বলেছে স্বাস্থ্য ফেরাতে সমুদ্রের কছে যেতে আর অনেক ব্যায়াম কসরত এইসব করতে।
“সমুদ্রের কাছে! সে আর বলতে! কাছেই সমুদ্র পাবে। অনেক সমুদ্র!” বলতে বলতে জামাইবাবু তার হাতে টিকিটটা গুঁজে দেন। তারপর বলেন, “রইল ব্যায়ামের কথা, ডাঙায় আর কতটুকু ব্যায়াম করবে তুমি! জাহাজে একবার চেপে দেখো কেবল! যতক্ষণ চলবে ততক্ষণ এইসান ব্যায়াম করাবে যে পালাবার পথ পাবে না।”
এই বলে জামাইবাবু নিজে ট্রেনে চেপে লন্ডনে পালিয়ে আসেন।
আর একবার আর এক বন্ধু এক হপ্তার সমুদ্র সফরে গিয়েছিল; তা জাহাজে উঠতে রাঁধুনি এসে বলে, সে যতবার খাবে ততবার আলাদা আলাদা পয়সা দেবে, নাকি সাতদিনের চার বেলা খাওয়ার টাকা একবারে অগ্রিম মিটিয়ে দেবে। বলা বাহুল্য, দ্বিতীয়টা অনেক সস্তা। মাত্রই আড়াই পাউন্ড। রাঁধুনিও তাকে সেটাই নিতে পরামর্শ দিয়েছিল। অতএব বন্ধু প্যাকেজ অফারটাই নিয়ে নিল। মেনু জানা গেল— সকালে মাছ আর গ্রিল করা মাংস, দুপুর একটায় চার কোর্সের লাঞ্চ, সন্ধে ছ’টায় স্যুপ, মাছ, পাঁঠা, মুরগা, স্যালাড, মিঠাই, চিজ আর আইসক্রিম পেস্ট্রি-টেস্ট্রি দিয়ে ডিনার, আর সবশেষে রাত দশটা নাগাদ সামান্য মাংস দিয়ে হালকা একটা সাপার। শুনে বন্ধু আর দ্বিরুক্তি না করে প্যাকেজ অফারটা নিয়ে নেয়। সে বেজায় খাইয়ে ব্যক্তি। কাজেই আড়াই পাউন্ড সে আড়াই দিনের ভেতরেই উশুল করে নেবে, এ আত্মবিশ্বাস তার ছিল।
জাহাজ রওনা দেবার পরপরই লাঞ্চ এল। বন্ধুটি খেয়াল করল, তার ততটা খিদে নেই। অতএব সামান্য সেদ্ধ মাংস, স্ট্রবেরি আর ক্রিম দিয়ে সে পিত্তরক্ষা করল। তারপর সারা বিকেলটা জুড়ে তার মাংস আর স্ট্রবেরির এমন ঢেঁকুর উঠতে থাকল যেন সে কতকাল ধরে কেবল ওই একই খাবার খেয়ে যাচ্ছে। সন্ধে ছ’টার সময় যখন ডিনার তৈরি বলে খবর এল, তখন দেখা গেল সে-খবরে তার কোনও উৎসাহ নেই। তবু, আড়াই পাউন্ডের আরও খানিক উশুল করা দরকার, এই কর্তব্যবোধ থেকেই সে কোনোমতে দড়িদড়া ধরে টাল সামলাতে সামলাতে ডিনার খেতে গেল। সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতেই তার নাকে এল গরম মাংস ও পেঁয়াজের মধুর সুবাস, সঙ্গে মাছ আর সবজির তরতাজা ঘ্রাণ। তাকে দেখে রাঁধুনি এগিয়ে এসে প্রশ্ন করল, “কী খাবেন, স্যার?”
জবাবে সে কোনোমতে বলল, “আমাকে ওপরে নিয়ে চলো।”
তখন রাঁধুনির লোকজন তাকে ধরে ধরে ডেকের ওপরে এনে রেলিংয়ের ধারে দাঁড় করিয়ে দিয়ে চলে গেল। সে শরীর কুঁচকে সমুদ্রের ওপরে মুখ বাড়াল।
এর পরের ক’টা দিন আমার বন্ধুটি এক সরল ও সাত্ত্বিক জীবন যাপন করেছিল। তার খাদ্য ছিল পাতলা পাতলা ক্যাপ্টেনের বিস্কুট (মানে ক্যাপ্টেনগুলো পাতলা নয়, ক্যাপ্টেনের বিস্কুটগুলো পাতলা আর কি।) আর সোডা। সেটুকুও অবশ্য বেশিক্ষণ পেটে থাকতে রাজি হচ্ছিল না তার।
কয়েকটা দিন এ অবস্থা চলবার পর শনিবার আসতে দেখা গেল বন্ধুটি ফের নিজ-পায়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। সেদিন তাকে পথ্য দেয়া হল খানিক পানসে চা আর শুকনো একটা টোস্ট। সোমবার বন্ধুটি মহানন্দে খানিক মুরগির সুরুয়া খেল। তারপর মঙ্গলবার তাকে বন্দরে নামিয়ে দিয়ে জাহাজ যখন ধোঁয়া ছড়তে ছাড়তে দিগন্তে মিলিয়ে যাচ্ছে, বন্ধুটি তখন সেদিকে আঙুল উঁচিয়ে বলেছিল, “ওই যে আমার দু-পাউন্ডের খাবার যায়… হায়!”
তবে তার দাবি, যাত্রাটা সাতের বদলে আট দিনের হলেই সে টাকাটা নির্ঘাত পুষিয়ে দিত।
অতএব, আমি সমুদ্রযাত্রার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ জানালাম। না না, আমার এ নিয়ে নিজস্ব কোনও ভয় নেই। আপত্তিটা আমি জানিয়েছিলাম কেবল জর্জের কথা ভেবে। জর্জ অবশ্য নিজে খুবই আত্মবিশ্বাসী ছিল যে সমুদ্রযাত্রায় তার কোনও সমস্যাই হবে না। তবে সে আমার ও হ্যারিসের ব্যাপারে গভীর চিন্তায় আছে বলে জানায়। কারণ, তার বিশ্বাস সমুদ্রে পা দিলেই আমাদের দুজনের শরীর বিগড়োবে।
জর্জের দুশ্চিন্তার জবাবে হ্যারিস জানায় যে, সমুদ্রে গেলে লোকের কেন সমুদ্রপীড়া হয় এইটা তার কাছে এক দুর্লঙ্ঘ্য রহস্য। কারণ, সে নাকি কখনও চেষ্টা করেও নিজেকে সমুদ্রপীড়া ধরাতে পারেনি। এই বলে সে আমাদের তার ইংলিশ চ্যানেল পার হবার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কাহিনি শোনায়। সে-বার নাকি চ্যানেলের সমুদ্র এমনই উত্তাল ছিল যে সমুদ্রপীড়ায় অসুস্থ যাত্রীদের বার্থের সঙ্গে মোটা মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতে হচ্ছিল। শেষমেশ জাহাজে নাকি সে এবং ক্যাপ্টেন এই দুজন মানুষ বাদে আর সকলেই সমুদ্রপীড়ায় কাবু হয়ে পড়ে। আর, মাঝে মাঝে নাকি এমনকি ক্যাপ্টেনও শুয়ে পড়ছিল। তখন নাকি সে একলা সুস্থ মানুষ হিসেবে জাহাজের দায়িত্ব নিচ্ছিল।
আজব ব্যাপারটা হল, ডাঙায় কখনও কারও সমুদ্রপীড়া হয় না। সমুদ্রে গেলে গাদা গাদা লোক পাবেন যাদের এ অসুখ হচ্ছে। কিন্তু ডাঙায় এসে হাজারটা লোককে জিজ্ঞাসা করুন, দেখবেন এমন একটা লোকও পাচ্ছেন না যে বলবে তার সমুদ্রপীড়া হয়েছে কখনও। প্রশ্ন হল, এই যে জাহাজে জাহাজে এত হাজার হাজার লোকের এ অসুখ হয় বলে দেখি, ডাঙায় এসে সে-লোকগুলো লুকোয় কোথা? এ এক বিরাট রহস্য।
ইয়ারমাউথ-এর ফেরি জাহাজে একটা লোককে একবার দেখেছিলাম অবশ্য। বেশিরভাগ লোকজন যদি তার মতো হত, তাহলে অবশ্য রহস্যটা আর রহস্য থাকে না। ঘটনাটা ঘটেছিল সাউথ-এন্ড জেটির কাছাকাছি। জাহাজের একটা পোর্ট হোলের ভেতর দিয়ে সে বেশ বিপজ্জনকভাবে বাইরের দিকে ঝুঁকে ছিল। দেখে আমি কাছে গিয়ে তার কাঁধ দুটো ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বললাম, “আরে করো কী? ভেতরদিকে সরে এসো! আর একটু হলেই সমুদ্রে পড়ে মরবে যে!”
তাতে সে একচুলও না নড়ে অবরুদ্ধ স্বরে বলল, “হে ঈশ্বর, তাই যেন হয়! আর যে পারি না!”
শুনে আমি তাকে সেইখানে ছেড়ে দিয়ে সরে এলাম।
এর হপ্তা তিনেক বাদে বাথ-এর এক হোটেলের কফি রুমে দেখি সে বসে আছে। সঙ্গে দু-একটা শাগরেদ। তাদের সে সমুদ্রযাত্রার রহস্য, রোমাঞ্চ, বীরত্ব এইসব নিয়ে ভারি জ্ঞানদান করছে। সেই শুনতে শুনতে এক নরমসরম ছোকরা জিজ্ঞেস করল, “কখনও সমুদ্রে গিয়ে শরীর খারাপ হয়নি?”
শুনে সে জবাব দিল, “ওই মানে একবার হর্ন অন্তরীপ পেরোতে গিয়ে সামান্য গা গুলিয়েছিল। জাহাজটা পরের দিন উত্তাল সমুদ্রের আঘাতে ধ্বংস হয়ে যায়।”
শুনে আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম, “সাউথ-এন্ড জেটির কাছাকাছি এলাকায় কদ্দিন আগে আপনি সমুদ্রে ডুবে মরবার প্রার্থনা জানাচ্ছিলেন না? কেন বলুন তো?”
“সাউথ-এন্ড জেটি?” লোকটা কেমন অবাক মুখে আমার দিকে ঘুরে তাকাল।
“হ্যাঁ! ইয়ারমাউথের ফেরি জাহাজে, হপ্তা তিনেক আগে!”
“ওহো, হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে বটে!” বলতে বলতে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।— “ওদিন বিকেলে মাথাটা বেজায় ধরেছিল বুঝলেন কি না! বোধ হয় লাঞ্চে বেশি আচার খাওয়ার ফল। এত নামজাদা একটা ফেরি, তাদের লাঞ্চে এত কুচ্ছিত আচার! আপনি কখনও খেয়ে দেখেছেন?”
সমুদ্রপীড়া আটকাবার একটা দুর্ধর্ষ কৌশল আমি আবিষ্কার করেছি। ব্যালেন্স করা। কায়দাটা হল, দুলন্ত জাহাজের বুকে সবসময় নিজেকে উল্লম্ব, মানে খাড়া রাখতে হবে। এদিক-ওদিক ঝুঁকলে চলবে না। এবারে, ধরুন জাহাজ ঢেউয়ের ধাক্কায় তার নাকটা আকাশের দিকে তুলছে। আপনি তখন সামনের দিকে শরীরটাকে ঝুঁকিয়ে ফেলুন। নাক যত উঠবে আপনিও ততই ঝুঁকবেন। উপুড় হয়ে ঝুঁকতে ঝুঁকতে ডেকের গায়ে নাকটা ঠেকিয়ে ফেলুন। ফলে আপনি পৃথিবীর সাপেক্ষে উল্লম্ব রয়ে গেলেন। আবার যখন জাহাজের পেছন দিকটা ঢেউয়ের ধাক্কায় ওপর দিকে খাড়া হয়ে উঠতে থাকবে, আপনি তখন তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ডেকে দাঁড়িয়ে পেছন দিকে ঝুঁকতে থাকবেন। জাহাজ যত পেছন তুলবে, আপনিও ততই চিত হয়ে পেছন দিকে আরও বেশি ঝুঁকবেন ও এইভাবে নিজেকে পৃথিবীর সাপেক্ষে উল্লম্ব রেখে চলবেন। যতদিন জাহাজে থাকবেন, এই পদ্ধতিতে ক্রমাগত নিজেকে উল্লম্ব রেখে চললেই আর সমুদ্রপীড়া হবে না।
মুশকিল হল, এই পদ্ধতিটা ভালো বটে, তবে সপ্তাহ খানেক দূরস্থান, দু-এক ঘণ্টার বেশি একে চালিয়ে যাওয়াটা হয়তো কঠিন হবে। তবে পদ্ধতিটা বেজায় বৈজ্ঞানিক।
খানিক বাদে জর্জ বলল, “তাহলে সমুদ্রের বদলে নদীতে যাওয়া যাক।”
এ-বিষয়ে তার যুক্তি হল, এতে তাজা বাতাস পাওয়া যাবে। ব্যায়াম হবে। নিত্যনতুন দৃশ্যপটের পরিবর্তন আমাদের চেতনাকে তাজা রাখবে (এমনকি হ্যারিসের বিলীয়মান চেতনার যে সামান্য অংশ এখনও অবশিষ্ট আছে, সেটুকুকেও)। তাছাড়া নৌকা বাইবার কঠোর পরিশ্রম আমাদের খিদে ফিরিয়ে দেবে। রাতের ঘুম আরও প্রগাঢ় হবে ইত্যাদি।
শুনে হ্যারিস বলল, “জর্জ এমনিতেই যতটা ঘুমোয়, তাতে অন্তত ঘুম বাড়াবার জন্য তার আর অতিরিক্ত পরিশ্রমের কোনও দরকার নেই। এছাড়া, তার ঘুমের পরিমাণ খুব বেশি বৃদ্ধি পাওয়া অসম্ভবও বটে, কারণ শীত হোক কি গ্রীষ্ম, একটা দিনে চব্বিশ ঘণ্টার বেশি সময় থাকে না। তবে হ্যাঁ, যদি সে সেই বৃদ্ধিটুকু অর্জন করতে পারে তবে আমাদের নদীপথে ভ্রমণে একটা বিরাট সুবিধে হয়ে যাবে। খাওয়ার মুখ একটা কমবে; কারণ মৃত মানুষ খায় না।”
হ্যারিস আরও বলল, নদীপথে ভ্রমণ তার খুবই পোষাবে। (অবশ্য এতে পোষাপুষির কী আছে তা আমার বুদ্ধির বাইরে, কারণ নদী তো আর বেড়াল নয়!) তবে যা বুঝতে পারছিলাম, তাতে নদীভ্রমণ ব্যাপারটা সবাইকেই মোটামুটি পুষিয়ে যায়। আমার নিজেরও তাই। জর্জের তো বটেই, কারণ নদীভ্রমণের প্রস্তাবটাই তো তার মাথা থেকে বেরিয়েছে। এ বিষয়ে জর্জের উদ্দেশে প্রশংসাসূচক কয়েকটা কথা আমাদের মুখ দিয়ে বের হয়ে এল, কিন্তু তার সুরটায় কোথাও একটা বিস্ময় প্রকটভাবে লুকিয়েছিল— সেটা হল, জর্জ কেমন করে একটা এমন খাসা আইডিয়া দিয়ে ফেলতে পারল!
শুধু একজনই এই প্রস্তাবটাকে সমর্থন করেনি। সে হল আমাদের মন্টমোরেন্সি। জলপথে তার ভক্তি কোনোকালেই বিশেষ ছিল না। তার না-বলা বক্তব্যটা সংক্ষেপে এই—
তোমাদের পছন্দ সে ঠিক আছে বন্ধুগণ, কিন্তু আমার এ প্ল্যান বিলকুল না-পসন্দ। কী, করবটা কী গিয়ে? প্রাকৃতিক দৃশ্য-টৃশ্য আমার লাইনের ব্যাপারই নয় মোটে। তাছাড়া, ধরো যেতে যেতে একটা রসালো ইঁদুরের দেখা পেলাম। তোমরা সেজন্য নৌকো থামাবে? তারপর ধরো নৌকোয় শুয়ে একটু চোখ বুজেছি, তখন তোমরা এটা সেটা করতে গিয়ে নৌকো দিলে উলটে। তখন ঘুমের মধ্যে বেঘোরে মরব যে! তাই এ বিষয়ে আমার মতামত চাইলে বলব, বিলকুল বোকার মতো একখানা মতলব পাকাচ্ছ তোমরা, হ্যাঁ।
ক্রমশ
ছবি-জয়ন্ত বিশ্বাস