সম্পূর্ণ উপন্যাস-কোলোপিসের আতঙ্ক-অরিন্দম দেবনাথ-বসন্ত’২৬

অরিন্দম দেবনাথ-এর সমস্ত লেখা

সিঙ্গাপুর থেকে মালয়েশিয়ার বোর্নিও দ্বীপপুঞ্জের অংশ সাবা প্রদেশের শহর কোটা কিনাবালুর এয়ারপোর্টে পৌঁছতে পাক্কা দু-ঘণ্টা দশ মিনিট লেগেছিল। এয়ারপোর্টে ভুকুর কলেজের বন্ধু রোহিত অপেক্ষায় ছিল। রোহিত মালয়েশিয়ার এক টিম্বার কোম্পানিতে চাকরি করে। পোস্টিং বোর্নিওর কোটা কিনাবালুতে। ওর কাজ হল জঙ্গলে গিয়ে কাটার উপযোগী গাছ বাছাই করে, সেগুলো কাটিয়ে বিভিন্ন করাতকলে পাঠানো। গাছ কাটানোর কাজটা করতে ওর একদম ভালো লাগে না। কিন্তু তবুও এই কাজটা করার জন্য এই কারণেই ও এখানে পড়ে আছে যে, না-হলে কাঠ কাটিয়ের দল কোনোকিছু না দেখে এক ধার থেকে ছোটো গাছগুলোকে কেটে ফেলবে। রোহিতের বোর্নিওর জঙ্গলে পড়ে থাকার আর একটা কারণ এই জঙ্গলের অসাধারণ সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্য। প্রাণীজগৎ, আদিম উপজাতি, রকমারি গাছপালা মাখানো নিঃশব্দ অ্যাডভেঞ্চার ওর কাজটা জুড়ে।

কিনাবালু ন্যাশনাল পার্কের সীমানা-ঘেঁষা কোলোপিস নদীর ধার ধরে গাছ কাটার ইজারা নিয়েছে রোহিতদের কোম্পানি। সাধারণত রোহিত জঙ্গলে যাবার আগেই অ্যাডভান্স পার্টি গিয়ে স্থানীয় লোকজন জোগাড় করে অস্থায়ী শিবির বানিয়ে জঙ্গলে কাঠ কাটার জন্যে স্থানীয় লোক ঠিক করে।

এবার ওদের অ্যাডভান্স টিম পড়েছে মুশকিলে। কিছুতেই গাছ কাটার লোক জোগাড় করা যাচ্ছে না। কিছুদিন ধরে ওখানকার নদীর ধারের গ্রামগুলো থেকে লোকজন উধাও হয়ে যাচ্ছে। নদীর জল থেকে নাকি বাদামি আঁশওয়ালা একটা দানো উঠে লোকজন মুখে করে নিয়ে আবার নদীতে ফিরে যাচ্ছে। দানোর মুখটা নাকি তেলের বড়ো ড্রামের মতো মোটা।

রোহিতের কোম্পানি লোক পাঠিয়েছিল ব্যাপারটা ঠিক কিনা জানার জন্যে। সে ফিরে এসে বলেছে ঘটনাটা ঠিক, গত কয়েক দিনে আটজন লোক নিখোঁজ হয়েছে। তারপরই গ্রামগুলো খালি হয়ে গেছে। সবাই পালিয়েছে গ্রাম ছেড়ে। এমনকি দুজন ছাড়া অ্যাডভান্স পার্টির বাকি লোকজনও আর সাইটে থাকতে রাজি হয়নি। চাকরি চলে যাবার ভয় দেখিয়ে কোনোরকমে ওদের ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে। তবে ওরাও যে-কোনোদিন পালাবে। এদিকে রোহিতের কোম্পানির হেড অফিস থেকে চাপ আসছে, যে করেই হোক কাঠ কাটার কাজ শুরু করতে হবে। রোহিত স্পটে গিয়ে ব্যাপারটা ঠিক কী ঘটছে বুঝতে চাইলেও অফিসের কেউ সঙ্গে যেতে চাইছে না। ওর অফিসের অধিকাংশ কর্মীই স্থানীয় বাসিন্দা এবং এরা সবাই ভূতপ্রেত, দৈত্য-দানোতে বিশ্বাসী।

রোহিতের হঠাৎ মনে পড়ে যায় ওর কলেজের বন্ধু ভুকুর কথা। হেড অফিসে যোগাযোগ করে ভুকুর সম্পর্কে সব জানিয়ে ভুকুকে যাবতীয় খরচা দিয়ে স্পটে নিয়ে যাবার অনুমতি আদায় করে নিতে বেশি সময় লাগেনি রোহিতের।

বটানিতে মাস্টার্স করার পর পিএইচ.ডি করে ভুকু। ওর গবেষণার বিষয় ছিল ‘পিচার প্ল্যান্ট’ – মাংসাশী গাছ। রোহিত আর ভুকু মিলে অনেকদিন নাগাল্যান্ডের জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়েছে পিচার প্ল্যান্ট নিয়ে গবেষণা করার সময়। ভুকুর মতো সাহসী, জঙ্গলপ্রিয় মানুষ রোহিত আর দেখেনি। তাই মানুষ নিখোঁজ ও দানোর রহস্য ভেদ করতে ভুকুর কথাই প্রথম মনে হয়েছিল রোহিতের।

ভুকু একটি কলেজের বটানির অধ্যাপক। ইরাগাঁও পাহাড়ের কোলে ভুতুরা গ্রামে ভুকুর জন্ম ও বড়ো হয়ে ওঠা। ছোটোবেলা থেকেই ভুকুর গাছপালা ও জীবজন্তুর প্রতি অসীম ভালোবাসা। ওর স্কুলের বন্ধুরা বিশ্বাস করত যে ভুকু গাছপালা ও জন্তুজানোয়ারের ভাষা বুঝতে পারে। বাড়ি থেকে স্কুলে যাবার পথে জঙ্গলের অনেক পাখি ভুকুর কাঁধে এসে বসত। ওর হাত থেকে খাবার খেত। এমনকি জঙ্গলের ভাল্লুকরা পর্যন্ত ওকে কিছু করত না। ও-ই বরং ভাল্লুকের দলে ঢুকে তাদের সঙ্গে খেলা করত। খেলাধুলো ও পড়াশুনা, সবেতেই স্কুলে ফার্স্ট হত ভুকু। তারপর কলেজ ও ইউনিভার্সিটির সব পরীক্ষাতেও প্রথম হয়ে এসেছে। ভুকুর আরও একটি গুণ আছে। ও খালি হাতে সাপ ধরতে ওস্তাদ।

***

ইমিগ্রেশনের ফর্মালিটি মিটিয়ে, লাগেজ নিয়ে এয়ারপোর্টের বাইরে আসতেই ভুকুকে জড়িয়ে ধরেছিল রোহিত। প্রায় পাঁচ বছর পরে দেখা দুই বন্ধুর। যদিও নিয়মিত ফোনে কথা হয় দুজনের। জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির গাছের সন্ধান পেলে তার ছবি তুলে ভুকুকে পাঠিয়ে দিত রোহিত। তারপর ফোনে আর মেলে সেই গাছের বর্ণনা দিতে দিতে রোহিত কাহিল হয়ে যেত। তবুও নতুন কোনও গাছের খোঁজ, বিশেষত সেই গাছ যদি কার্নিভোরাস বা মাংসাশী হয়, তার খবর পাঠাতে দ্বিধা করত না।

ভুকুকে অনেকবার বোর্নিওতে আসতে বলেছিল রোহিত। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও ভুকুর আর আসা হয়ে ওঠেনি। এবার ভুকুর কলেজে সামার ভ্যাকেশন চলছে শুনে একদম সরাসরি প্লেনের টিকিট পাঠিয়ে দিয়েছিল রোহিত। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও ভুকুকে দানোর গল্প ও মানুষ উধাও হয়ে যাবার কথা বলেনি। কে জানে এসব শুনে যদি বিগড়ে গিয়ে না আসে!

গাড়িতে আসতে আসতে ভুকু রোহিতের কাছে তাদের ট্যুর প্রোগ্রাম সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল। ভুকুর আর তর সইছে না জঙ্গলে যাবার।

ভুকুকে সোজা নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে তুলেছিল রোহিত। রোহিতের ফ্ল্যাট থেকে দক্ষিণ চিন সমুদ্রের ঝলক দেখা যায়।

আপার কোলাপিস নদী উপত্যকার জঙ্গল যে-কোনো বটানিস্টের স্বপ্ন। কত ধরনের পিচার প্ল্যান্ট যে এখানে পাওয়া যায়। বাহারি গাছগুলো নিমেষে টেনে নেয় পোকামাকড়, প্রজাপতি এমনকি ছোটোখাটো পাখি। সাধারণ ট্যুরিস্ট খুব একটা কেউ এখানে আসে না। কথিত যে, এই জঙ্গলে নাকি অসাধারণ সুন্দর একধরনের মোটা লতানো গাছ আছে যা বড়ো বড়ো জন্তজানোয়ারকে জড়িয়ে ধরে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ছিবড়ে করে দিতে পারে। দুর্গম এই জঙ্গলের অধিকাংশটাই এখনও অনাবিষ্কৃত।

রোহিত ভুকুকে বলল, “আমরা কাল ভোরে রওনা দেব। এখান থেকে পাঁচ ঘণ্টা গাড়িতে, তারপর কোলাপিস নদী ধরে উত্তরের পথে। সব ব্যবস্থা করাই আছে— মোটর বোট, টেন্ট, দোভাষী, এক মাসের খাবারদাবার, স্যাটেলাইট ফোন, এমনকি একটা বন্দুকও সঙ্গে নেওয়া হচ্ছে আপদে বিপদে কাজে লাগতে পারে ভেবে।

“তোর জন্যে আরও একটা সুখবর।” বলে ঘরের এক কোণ থেকে একটা বড়ো বাক্স বের করল রোহিত।— “এটা দেখ। একটা সোলার ব্যাটারি চার্জার। জঙ্গলের মধ্যে আমরা একটা লাইট জ্বালাতে পারব, ল্যাপটপ চালাতে পারব, এমনকি ক্যামেরার ব্যাটারিও চার্জ দিতে পারব। যদিও ক্যাম্প সাইটে জেনারেটর থাকে।”

“যদি সূর্যের আলো পাই।” হাসতে হাসতে বলল ভুকু।— “শুনেছি আপার কোলাপিস ভ্যালিতে সারাবছরই টিপটিপ করে বৃষ্টি হয়। আর গাছপালাগুলো নাকি এত ঘন যে সূর্যের আলো জমিতে পৌঁছয় না!”

“ঠিকই শুনেছিস, কিন্তু একটা সমস্যা হয়েছে।” রোহিত বলল।

“ট্রিপ ক্যানসেল?” অবাক হয়ে ভুলু জানতে চায়।

“না না, ট্রিপ ক্যানসেল হবে কেন? লোয়ার কোলাপিসে, কিনাবালু ন্যাশনাল পার্কের বাইরে আমাদের কোম্পানি অনেক বড়ো জঙ্গলজুড়ে গাছ কাটার ইজারা নিয়েছে। সাধারণত আমরা স্থানীয় লোকই নিয়ে থাকি গাছ কাটার জন্যে। সঙ্গে আমাদের লোকেরাও থাকে ইলেকট্রিক করাত নিয়ে। কিন্তু আমরা চার-পাঁচজনের বেশি কাঠুরে পাঠাই না। আমাদের অ্যাডভান্স টিম গিয়ে স্থানীয় লোক নিয়োগ করে, অস্থায়ী শিবির বানায় থাকার জন্যে। লোকাল ইকনোমিক ডেভলপমেন্টের জন্যে এটা আমরা করে থাকি। কিন্তু এবার ওরা ওখানে পৌঁছে কোনও লোক জোগাড় করতে পারেনি। গ্রামের পর গ্রাম ফাঁকা। ওখানে নাকি এক ভয়ানক প্রাণী এসে উপস্থিত হয়েছে। আটটা লোক কয়েক দিনের মধ্যে ওই দানোর পেটে গেছে। দানোর ভয়ে নদীর ধারের গ্রামের পর গ্রাম ফাঁকা করে সব লোকজন পালিয়েছে। শুধু কয়েকজন করে বয়স্ক লোক পড়ে আছে গ্রামগুলোতে। স্থানীয় লোকজন ওই দানোটাকে ড্রাগন বলছে। একবার ওখান হয়ে তারপর আমরা আপার কোলাপিস রিভার ভ্যালিতে যাব।”

ভুকু চুপ করে সব শুনছিল। রোহিতের কথা শেষ হতে বলল, “আমি কয়েক দিন আগে বি.বি.সি-তে এরকম একটা খবর শুনেছিলাম। বোর্নিওর জঙ্গলে অজানা দানোর হানা। কয়েক দিনে আটজন মানুষ উধাও। ইন্টারেস্টিং! আমার কোনও আপত্তি নেই।”

***

খুব ভোরবেলা রোহিতদের কোম্পানির একটা ল্যান্ড রোভার গাড়িতে করে রওনা হল ভুকু আর রোহিত। গাড়িতে আগে থেকেই খাবার, টেন্ট লোড করে রাখা ছিল। ভুকুরা শুধু ওদের নিজেদের ব্যাগগুলো গাড়িতে তুলল। রোহিত সঙ্গে নিল বন্দুক ও কার্তুজের ব্যাগটা।

গাড়ি চালাচ্ছে এক মালয় ড্রাইভার। লোকটা কানে ভালো শোনে না। তার ওপর কানে শোনার যন্ত্রটাও নাকি বিগড়েছে। গাড়ি চালাতে চালাতে ভুকু আর রোহিতকে উদ্দেশ করে একাই ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে কথার তুবড়ি ফুটিয়ে চলেছিল লোকটা। ভুকু আর রোহিত আপার কোলাপিস নদীর জঙ্গলে বেড়াতে যাবে জেনে ওর গ্রামের কথা শোনাতে শুরু করেছিল।

ভুকু মন দিয়ে শুনছিল ড্রাইভারের কথা। এদের জানতেই তো এতদূর আসা। লোকটার আসল বাড়ি ইন্দোনেশিয়ান বোর্নিওর মারাং জেলার বারিত নদীর ধারে তুম্বাং গ্রামে। ঘন জঙ্গলের মাঝে ওদের গ্রামের বাড়িগুলো সব কাঠের খুঁটির ওপর। ওর পূর্বপুরুষরা হেড হান্টার ছিল। তবে বহুবছর হল হেড হান্টিং পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ওদের গ্রামের লোকেরা এখন জঙ্গল কেটে চাষের জমি বানিয়েছে। সেখানে সূর্যমুখী ফুলের চাষ করে তেলকলগুলোকে বিক্রি করে ওরা। ধানও ফলে ওদের জমিতে। নদীতে মাছ ধরে। জঙ্গল থেকে শুয়োর, বনমোরগ শিকার করে খাওয়ার জন্য। তবে প্রত্যেক বাড়িতে মানুষের মাথার খুলি ঝুলতে দেখা যায়। পূর্বপুরুষদের স্মৃতি। সবার বাড়িতেই দু-একটা করে পারাং নামের লম্বা দা আছে। এই দিয়ে মানুষের মাথা কাটা হত।

আরও একটা মজার গল্প শুনিয়েছিল মালয় ড্রাইভারটি। ফসল তোলা শুরু হবার আগে ‘গাওয়াই দায়েক’ অনুষ্ঠানের দিন এক মজার খেলা খেলা হয় তাদের গ্রামে। ‘ছাই বাঁশ’ করে দেখাতে হয়। যে আগে বানাতে পারে সে জেতে এবং সেদিনের জন্য সে গ্রামের রাজা হয়। পাতার মুকুট পরিয়ে তাকে বসানো হয় একটা হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ারে। সেদিন গ্রামের সবাইকে নজরানা দিয়ে হয় বিজয়ীকে।

‘ছাই বাঁশ’ কথাটা ভুকু আগে শোনেনি। রোহিতকে জিজ্ঞেস করতে সেও কিছু বলতে পারল না। ড্রাইভারকে বারকয়েক জিজ্ঞেস করে কোনও উত্তর না পেয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছিল ভুকু। লোকটা কানে একবারেই শোনে না। পরে সুযোগ পেলে জানতে হয়ে বিষয়টা।

সমুদ্রের ধার ধরে খানিক এগোনোর পর রাস্তাটা ঢুকে পড়ল জঙ্গলের মধ্যে। দু-পাশে সবুজ আর সবুজ। মাঝে মাঝে দু-একটা গ্রাম আসছে। কাঠের বাড়িঘরের পাশাপাশি অনেক পাকা বাড়িও আছে গ্রামগুলোয়। প্রায় সব গ্রামেই ইলেকট্রিক আছে। রাস্তার দু-পাশে চাষের ক্ষেতও প্রচুর। পাহাড়ে ধাপ কেটে কেটে তৈরি চাষের জমি।

ঘণ্টা দু-এক চলার পর গাড়িটা গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মারিমারি নামের এক গ্রামে। এটা আসলে একটা ভিলেজ মিউজিয়াম। পর্যটকদের জন্যে এই গ্রামটা। এই গ্রামে এলে পর্যটকরা প্রাচীন বোর্নিওর ঘরবাড়ি, জীবনযাত্রা, নাচগান, শিকারের কলাকৌশলের একটা ঝলক দেখতে পান। পর্যটন দপ্তর খুব সুন্দরভাবে গ্রামটাকে সাজিয়েছে।

কিন্তু ভুকুরা গ্রাম দেখার জন্য নামল না গাড়ি থেকে। বরং এই গ্রাম থেকেই একজন লোক গাড়িতে উঠল। সারা গায়ে উল্কি কাটা, ছোটো চুল, চ্যাপ্টা নাক, পাঁচ ফুটের সামান্য বেশি লম্বা লোকটার গায়ের রঙ ফরসা। পরনে জিনসের প্যান্ট আর গোল গলা ছোটো হাতা গেঞ্জি, পায়ে হাঁটুর নীচ পর্যন্ত উঁচু চামড়ার বুট। কোমরে গোঁজা একটা ইঞ্চি ছ’-এক লম্বা আঁকাবাঁকা ছুরি। ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে, একটা বড়ো ব্যাগ পায়ের কাছে রেখে লোকটা নিজের বুকে হাত রেখে একসার ধপধপে সাদা দাঁত বের করে ভুকু ও রোহিতের দিকে তাকিয়ে বলল, “মাই নেম রুস্নি, ল্যাঙ্গুয়েজ ট্রান্সলেটর অ্যান্ড ইয়োর গাইড। নো পবলেম, আই নো কোলোপিস রিভার অ্যান্ড পিপুল, দে ভেরি গুড। নো পবলেম।”

ভুকু ও রোহিত নিজের নাম বলল। মাথা নাড়িয়ে রুস্নি বলল, “নো পবলেম।”

‘নো পবলেম’ বলাটা লোকটার বোধ হয় মুদ্রাদোষ, অথবা হয়তো লোকটার ইংরাজি শব্দের ভাঁড়ার কম। তাই ওই শব্দটা দিয়ে কথা অর্ধেক বলে শেষ করে। লোকটাকে ভালো লেগে গেল ভুকুর। রুস্নিকে রোহিতের অফিস থেকে ওর বস ঠিক করে দিয়েছে। লোকটার যেমনি সাহস, তেমনি নাকি মানুষের সঙ্গে মেশার ক্ষমতা। রোহিতের বস রোহিতকে লোকটার ছবি দেখিয়ে বলছিলেন, খুব কম সময়ে কাউকে বন্ধু বানিয়ে নিতে পারে এই রুস্নি। রোহিত এই অঞ্চলে প্রথম যাচ্ছে, তাই যাতে কোনোরকম অসুবিধা না হয় সেটা নিশ্চিত করতে তিনি নিজে সব আয়োজন করছেন। কিন্তু রোহিতকে দু-দিন আগে পর্যন্ত ওঁর ইনভলভমেন্টের ব্যাপারটা বুঝতে দেননি। রোহিতের বসের, রোহিতের বয়সি একটা ছেলে আছে। তাই উনি রোহিতকে ওঁর ছেলের মতোই ভালোবাসেন। উনি নিজেও এবার জঙ্গলে যেতে চেয়েছিলেন রোহিতদের সঙ্গে, কিন্তু দু-দিন আগে পড়ে গিয়ে পা ভেঙে হাসপাতালে ভরতি হওয়াতে সেই পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়েছে।

মারিমারি গ্রাম থেকে গাড়িটা ছাড়ার একটু পরে নিজের কোমর থেকে আঁকাবাঁকা খাপ সমেত ছুরিটা বের করে ভুকুর দিকে এগিয়ে দিয়ে রুস্নি বলেছিল, “সি, সেক্রেড ওয়েপন, আই ক্যারি অলওয়েজ। ‘কারিস’ উই কল। ফ্রম মাই গ্র্যান্ডফাদার, নো পবলেম।”

ভুকু হাত বাড়িয়ে খাপসুদ্ধু ছুরিটা নিয়ে দুটো ক্লিপ খুলে খাপের বাক্সটা থেকে সেগুন কাঠের হাতল লাগানো ছুরিটা বের করে দেখেছিল। আঁকাবাঁকা, ফিনফিনে অস্ত্রটা যথেষ্ট ভারী এবং খুব ধারালো। ছুরিটার মাঝখানটা উঁচু আর দু-পাশে ঢাল। ধারালো দু-পাশ দিয়ে আঘাত হানা যায়। ফলাটায় হাত দিয়ে ধার পরীক্ষা করতে যেতে রুস্নি বলে উঠেছিল, “কেয়ারফুল, আই হান্ট উইথ দিস, নো পবলেম।”

ছুরিটা খাপ-বাক্সে ঢুকিয়ে রুস্নিকে ফেরত দিতে দিতে ভুকু জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি ছাই বাঁশ জানো কি?”

“একটু একটু জানি, কিন্তু পুরোটা নয়। বাঁশকে এমনভাবে পোড়াতে হয় যাতে বাঁশটা পুড়ে গেলেও ওর ছাইটা এমনভাবে থেকে যায় যে দেখলে মনে হবে ছাই দিয়ে তৈরি বাঁশ। তুমি ছাই বাঁশের কথা জানলে কী করে? এগুলো তো লোকাল উৎসবে কোনো-কোনো গ্রামে খেলার মতো করে হয়। অনেক কায়দা লাগে ছাই বাঁশ বানাতে। সবাই পারে না। হাওয়া আটকে আধকাঁচা বাঁশের টুকরো পোড়াতে হয়। হাওয়া লাগলে ছাই জমবে না, ভেঙে যাবে। তাছাড়া বাঁশ আগুনে চট করে ফেটে যায়। ভেতর থেকে গাঁট ছেঁটে ফেলতে হয়, একদিনের রাজাও সহজে হওয়া যায় না। কোনও ম্যাগাজিনে পড়েছ বুঝি?”

ভুকু মুচকি হেসে চুপ করে যায়। ড্রাইভারের কথা আর বলে না। যে লোকটা কানে শোনে না তাকে বেশি না ঘাঁটানোই ভালো।

ছুরিটা কোমরে গুঁজে ব্যাগ থেকে একটা বাঁশের বাঁশি বের করে ঠোঁটের ফাঁকে না গুঁজে সেটা ওপরের ঠোঁট আর নাকের ফুটোর মধ্যে ধরে নাকের ফুটো দিয়ে হাওয়া ছেড়ে বাজাতে লাগল রুস্নি। অদ্ভুত মায়াবী সুর আর বাঁশি বাজানোর ধরন। জঙ্গল পাহাড়ের জন্যেই যেন এই সুরের সৃষ্টি। ভুকুর মনে হল, বাঁশির এই সুর শোনার জন্যে এই লোকটার সঙ্গে সারাজীবন থেকে যাওয়া যেতে পারে।

মারিমারি গ্রাম ছাড়ার ঘণ্টা তিনেক পর পিচের রাস্তা ছেড়ে গাড়িটা ঢুকল একটা মাটির রাস্তায়। রাস্তার মুখে জঙ্গলের দিকে তিরচিহ্ন দিয়ে লেখা আছে— ‘কোলাপিস রিভার পোর্ট-১১,’ ১০ কিলোমিটার, রিভার বেড অ্যান্ড বাম্পি রোড অ্যাহেড।

একটু এগোনোর পর বাম্পি রোড কী টের পাওয়া গেল। রাস্তা কোথায়! শুধু বালি আর পাথরের টুকরো। খানিক পর পর আসছে এক-একটা ঝোরা। গাড়ি চলছে হাঁটু সমান জলের মধ্যে দিয়ে। সামনে একটা টিলা দেখা যাচ্ছে। রাস্তাটা গেছে ওই টিলার দিকে। একটা গাড়ি আসছে ঘোরানো পথটা ধরে। গাড়ি দুটো পাশাপাশি হতে দাঁড়িয়ে গেল। দুই ড্রাইভার আর রুস্নি মিলে কথা বলল খানিক। তারপর উলটোদিক থেকে আসা গাড়িটার ড্রাইভার হাত নাড়িয়ে চলে গেল। ওরা নিজেদের মধ্যে কী কথা বলল বোঝা গেল না। কানে শুনতে না পাওয়া ভুকুদের গাড়ির ড্রাইভারও-বা কী বুঝল কে জানে, কিন্তু এটা বোঝা গেল, সামনে কিছু একটা হয়েছে।

রুস্নির কাঁধে হাত রেখে রোহিত জিজ্ঞেস করল, “এনি প্রবলেম?”

রুস্নি বলল, “লিটিল পবলেম। মেনি এলিফ্যান্ট নিয়ারবাই, উই গো স্লোলি, নো পবলেম।”

কোটা কিনাবালু শহর ছাড়ার পর আর কিছু খাওয়া হয়নি। এখানে রাস্তার যা হাল তাতে পেটে কিছু থাকলে ঝাঁকুনিতে বার হয়ে যেত। দু-পাশে বড়ো বড়ো গাছের জঙ্গল। জঙ্গল এত ঘন যে ভেতরের খুব একটা কিছু দেখা যাচ্ছে না। রাস্তাটাও সোজা নয়। ঘন ঘন বাঁক। সামনে কী আছে আন্দাজ করা মুশকিল। তবে বাঁচোয়া, সন্ধে নামতে এখনও ঢের দেরি।

খানিক আগে বাজানো বন্ধ করে বাঁশিটা কোলের ওপর রেখে দিয়েছিল রুস্নি। ওটা আবার নাকের নীচে লাগায় সে। সুরটা এইবারে অন্যরকম। কেমন যেন ঝিম ধরানো।

ভুকুদের গাড়িটা আস্তে আস্তে এগোতে লাগল। ভুকু আর রোহিত ভুলে গেল সামনে হাতির পালের উপস্থিতির কথা। ড্রাইভারও কেমন যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো গাড়ি চালাচ্ছে। সব কথা থেমে গেছে ওর। বাঁশির সুর সমস্ত ভয় যেন মন্ত্রের মতো শুষে নিচ্ছে।

টিলাটা বেয়ে নামতে একটা ছোটো নদী এল। গাড়িটা গড়িয়ে নেমে পড়ল জলে। এসব নদীতে জল থাকে না খুব একটা। গাড়িগুলো গোঁ গোঁ করতে করতে জল পার হয়ে যায়।

নদীটা পার হয়ে খানিক এগোতে দেখা গেল সামনে রাস্তার ওপর অনেক হাতির নাদা পড়ে। একটা গাছকে রাস্তার ওপর উপড়ে ফেলে রেখে গেছে হাতির দল। গাড়িটা দাঁড়িয়ে গেল। গাছ না সরালে এগোনো যাবে না।

দরজা খুলে নামলো রুস্নি। পেছন পেছন ভুকু এবং রোহিতও। তিনজন মিলে সবে গাছটাকে সরাতে শুরু করেছে, এমন সময় জঙ্গল থেকে গাছের ডাল ভাঙার শব্দ শোনা গেল। ঘাড় ঘোরাতে দেখা গেল, অনেকগুলো হাতি গাছপালার আড়ালে ডাল ভাঙছে। আর একটা দাঁতাল দলটা থেকে একটু দূরে শুঁড় উঁচু করে কান দুটো দু-পাশে ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে। হাতিগুলো ভারতীয় হাতির থেকে আকারে ছোটো। ভুকু জানত, এই দেশে জঙ্গল খুব ঘন বলে এখানে প্রাণীর শরীরের আকৃতি ছোটো হয় যাতে সহজেই জন্তুজানোয়ার গাছের ফাঁক দিয়ে চলাফেরা করতে পারে। প্রকৃতির কী আজব সৃষ্টি, প্রাণীদের চেহারাও তৈরি হয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে— মনে মনে ভাবে ভুকু।

রুস্নির বাঁশিটা ওর কোমরে গোঁজা ছিল। বাঁশিটা বের করে আবারও একটা অন্যরকম সুর বাজাতে লাগল রুস্নি। ভুকু আর রোহিত দেখল, দাঁতালটা আস্তে আস্তে ওর শুঁড়টা নামিয়ে নিল আর কান দুটো নাড়াতে নাড়াতে পা ভাঁজ করে বসে পড়ল যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে। বাঁশি বাজাতে বাজাতে সামনের দিকে হাঁটতে লাগল রুস্নি। ইতোমধ্যে গাছ সরিয়ে রাস্তা সাফ করে গাড়িতে উঠে বসেছে ভুকু আর রোহিত। গাড়িটা আস্তে আস্তে এগোতে লাগল রুস্নির পেছন পেছন। খানিক পর বাঁশি থামিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ল রুস্নি।

রুস্নির দিকে তাকিয়ে থাকল ভুকু। গাড়িতে উঠে ঘুমিয়ে পড়েছে রোহিত। একটু আগে বাঁশির সুর শুনে ভুকুর শরীরটাও ঝিমঝিম করে উঠেছিল, ঘুমে ভারী হয়ে এসেছিল চোখ দুটো। ভাগ্যিস, ড্রাইভার কানে ভালো শোনে না!

রুস্নি ভুকুর মনের কথাটা বুঝতে পেরেছিল। ও ভুকুর দিকে ঘুরে হাসতে হাসতে বলল, “ম্যাজিক্যাল ফ্লুট ফ্রম মাই গ্র্যান্ডফাদার, নো পবলেম।”

গাড়িটা কোলাপিস রিভার পোর্টে পৌঁছল বিকেল পাঁচটা নাগাদ। সূর্য লাল বল হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে কোলাপিস নদীতে। একটা বড়ো কাঠের জেটি নদীর কিনারায়। নদীর পাড় ঘেঁষে কাঠের মোটা মোটা খুঁটির ওপর কয়েকটা খড়ে ছাওয়া বাঁশের ঘর। একটা বড়ো মালবাহী স্টিমার জেটির সঙ্গে বাঁধা। কয়েকটা নৌকোও রয়েছে ঘাটে নোঙর ফেলে। শুধু কোনও মানুষের দেখা নেই।

ভুকুদের গাড়ির ড্রাইভার কয়েকবার হর্ন বাজানোর পর আধো অন্ধকার ফুঁড়ে হাজির হয়েছিল একটা লোক। সবাইকে গাড়ির ভেতর থাকতে বলে একা গাড়ি থেকে নামল রুস্নি। দুজনে খানিক কথা হল, তারপর এসে সবাইকে গাড়ি থেকে নামতে বলল। লোকটার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল রোহিত ও ভুকুর।— “আওয়ার বোটম্যান কাহু। নাইট কামিং, এভরি ওয়ান ইনসাইড। আমরা সামনের ওই লং হাউসে রাত কাটাব। জিনিসপত্র গাড়িতে থাক, শুধু স্লিপিং ম্যাট নিয়ে নাও। একটা নদী-দানোর গল্প ছড়িয়েছে চারদিকে, তাই একটু অন্ধকার নামলে খোলা জায়গায় থাকতে চাইছে না কেউ।”

গাড়ি থেকে নিজের রুকস্যাক নামিয়ে পিঠে নিয়ে নিল ভুকু আর রোহিত। তারপর কাহুর পেছন পেছন চলতে লাগল চারজন। নদীর ঢেউ ভাঙার শব্দকে ছাপিয়ে থেকে থেকে একটা পাখির গম্ভীর ডাক শোনা যাচ্ছে। রুস্নি বলল, “ওটা প্যাঁচা ডাকছে। রাতে আরও অনেক পশুপাখির ডাক শুনতে পাবে। ভুলেও রাতে ঘরের বাইরে বেরিও না। অনেক সময় লেপার্ড এসে হানা দেয়।”

কোলাপিস রিভার পোর্ট-১১-র ধারের লং হাউসটা আসলে একটা স্থানীয় হোটেল। ব্যাবসার খাতিরে যারা এখানে আসে, প্রয়োজনে তারা দু-এক রাত কাটায় এই লং হাউসে। খাবারও পাওয়া যায় এই লং হাউসে। মূলত জঙ্গলের কাঠ নদীপথে করাত কলে চালান যায় এই পোর্ট থেকে। আর শহর থেকে খাবার, পোশাক-আশাক ও প্রসাধনী সামগ্রী নিয়ে এসে নদীর ধারের গ্রামগুলোতে বিক্রি করে বাইরের ব্যবসায়ীরা।

লং হাউসের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল একটা বেঁটে করে মানুষ, এই লং হাউসের মালিক। ঘরের ভেতর কয়েকটা হ্যারিকেন জ্বলছে টিমটিম করে। আধো অন্ধকারে পথ দেখিয়ে ঘরের এক কোনায় নিয়ে গিয়ে খড়ের ওপর ত্রিপল বিছানো একটা জায়গা দেখাল লং হাউসের মালিক।

কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে ভালো করে লং হাউসটা দেখল ভুকু। আধো অন্ধকারে ভালো করে কিছু দেখা যাচ্ছে না। ভুকু আন্দাজ করল, লং হাউসটা নয় নয় করেও সত্তর ফুট লম্বা আর কুড়ি ফুট চওড়া। ওরা ছাড়াও ঘরে আরও জনা কুড়ি লোক শুয়ে বসে আছে। ঘরের শেষ প্রান্তে একটা কাঠের টেবিল আর তার দু-পাশে কাঠের বেঞ্চ।

ঘণ্টা খানেক পরে লং হাউসের মালিক এসে জানাল রাতের খাবার তৈরি হয়ে গেছে, ওরা যেন ঘরের কোনার ওই কাঠের টেবিলে চলে আসে।

দশ মিনিট পরে কাঠের টেবিলে গিয়ে বসল ভুকুরা। ঘরের সিলিং থেকে তারে বাঁধা একটা হ্যারিকেন ঝুলছে টেবিলটার মাঝখানে। অনেকগুলো চিনামাটির প্লেট রাখা ছিল টেবিলটার ওপর। ভুকুরা বসতে প্লেটে খাবার সার্ভ করল লং হাউসের মালিকের সঙ্গে থাকা একটা লোক। গরম ভাত আর মাছসেদ্ধ। মাছটা কী বুঝতে পারল না ভুকু, কিন্তু দারুণ খেতে।

রোহিত রুস্নিকে বলল, “দেখো তো নদীর দানো সম্পর্কে এরা কিছু জানে কি না।

 লং হাউসের মালিক রুস্নিকে জানাল, তারা নদীর দানোর কথা শুনেছে, কিন্তু সঠিক কিছু জানে না। নদীর দানোর ঘটনাটা যেখানে ঘটেছে, সেটা এখান থেকে নদীতে একদিনের পথ। তবে ঘটনাটা সত্যি। অনেকগুলো মানুষ ওই দানোর পেটে গেছে। ওই দানোর ভয়ে স্টিমার আসাও কমে গেছে কিছুদিন ধরে। এমনকি এই পোর্টেও সন্ধে নামতে না নামতে সবাই স্টিমার আর নৌকো ছেড়ে লং হাউসে চলে আসছে রাত কাটাতে।

***

রুস্নির ধাক্কায় ঘুম ভাঙল ভুকুর।— “গুড মর্নিং। উঠে পড়ো, আমাদের রওনা দিতে হবে।”

রোহিত তখনও ঘুমোচ্ছিল। রোহিতকে ডেকে তুলল ভুকু। লং হাউসের এককোণে একটা বড়ো টিনের ড্রামে জল ও একটা টিনের কৌটো রাখা ছিল। তা দিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে সব জিনিসপত্র গোটানো হয়ে গেলে লং হাউসের মালিককে খাবারের দাম ও রাতে লং হাউসে থাকার ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল রোহিত ও ভুকু। রাতে জেটিতে দাঁড়িয়ে থাকা স্টিমারটা চলে গেছে। রুস্নি, গাড়ির ড্রাইভার আর বোটের চালক কাহু মিলে গাড়ি থেকে মালপত্র বের করে বোটে রেখে দিয়েছে। বেশ কয়েকজন লোক ঘোরাঘুরি করছে জেটির আশেপাশে। ভুকু আর রোহিত বোটে উঠতে বোটটা ছেড়ে দিল। ড্রাইভার ফিরে যাবে কোটা কিনাবালুতে। রোহিত স্যাটেলাইট ফোনে খবর দিলে গাড়িটা আবার এখানেই আসবে ওদের নিয়ে যেতে।

কোলাপিস নদীটা এখানে খুব চওড়া। নদীতে স্রোতের টান ও খুব। মোটর বোটের চালক কাহু সামান্য ইংরেজি জানে। সে বলল, “একটু নজর রাখো, অনেক ডলফিন দেখতে পাবে।”

নদীর দু-পাশে বালির চড়া, তারপর জঙ্গল আর জঙ্গল। জঙ্গল ছাড়িয়ে পাহাড়ের আভাস দেখা যাচ্ছে। ঘণ্টা চারেক চলার পর নদীতে কয়েকটা ছোটো ছোটো নৌকো দেখা গেল। নৌকোগুলো মাছ ধরার, কিন্তু নৌকোতে কেউ নেই। দূর থেকে দেখা গেল একটা লম্বা খুঁটি নদীর ধারের মাটিতে পোঁতা। একটা কাপড়ের টুকরো উড়ছে খুঁটির মাথায়। কাহু বলল, “একটা গ্রাম আসছে।”

নদীর ধার ঘেঁষে কয়েকটা কাঠের বাড়ি। নদীর পাড়ে দুজন লোক দাঁড়িয়ে। ভুকুদের বোট মাঝ-নদী দিয়ে ভটভট আওয়াজ করতে করতে এগিয়ে চলল।

আরও ঘণ্টা দু-এক যাওয়ার পর নদীর ধারে অনেক কাঠের বাড়িঘর দেখা গেল। কিন্ত এবার কোনও মানুষজনের দেখা পাওয়া গেল না। পরপর এরকম আরও কয়েকটা গ্রাম এল। দূর থেকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল গ্রামগুলোতে কোনও মানুষ নেই। নদীর ধারে অনেক ডোঙা নৌকো উলটো করে রাখা।

খানিক এগোতে নদীর দু-পাশে পাহাড় দেখা যেতে লাগল। পাহাড়ের ঢালে ঘন জঙ্গল। নদীর মাঝে জেগে রয়েছে ছোটো ছোটো দ্বীপ।

নৌকায় উঠে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছিল রুস্নি। এতক্ষণে উঠে চোখ কচলে চারদিক দেখে বলল, “আমরা প্রায় এসে গেছি।”

নদীটা সামনে বেঁকে গেছে। বাঁক ঘুরতে নদীর বাঁদিকে নজরে এল পাহাড়ের ঢালে অনেকগুলো খাকি রঙের তাঁবু। নৌকোটা পাড়ে ভিড়তে দুটো লোক প্রায় ছুটতে ছুটতে আসতে লাগল তাঁবুর দিক থেকে। কাহু লাফ মেরে নৌকো থেকে নেমে নদীর পাড়ে মাটিতে গেঁথে থাকা একটা মোটা অ্যাঙ্করের সঙ্গে নৌকোটা বেঁধে ফেলল। কাহুর পেছন পেছন রুস্নি, রোহিত আর ভুকুও লাফ দিয়ে নৌকো থেকে নামল।

লোক দুটো কাছে এসে রোহিতকে বলল, “নমস্তে, স্যার।”

দুজনেই রোহিতের চেনা। ওদের অন্য এক অফিসের স্টাফ। দুজনই দক্ষিণ ভারতীয়। একজনের নাম কে. টি. নায়ার, আর একজনের নাম এন. স্বামী। নায়ার হল ক্যাশিয়ার কাম ক্লার্ক আর স্বামী মেশিন মেইন্টেনেন্স করে। জঙ্গলে বড়ো বড়ো গাছ কাঠতে ইলেকট্রিক করাত ও জেনারেটর লাগে, তাই জঙ্গলের বেস ক্যাম্পে একজন মেশিন মেইন্টেনেন্সের লোক থাকে সবসময়। নায়ার এবং স্বামী দুজনেই অ্যাডভান্স টিমের সঙ্গে এসেছিল। ভুকু, রুস্নি আর কাহুর সঙ্গে নায়ার ও স্বামীর পরিচয় করিয়ে দিল রোহিত। বলল, ভুকু কলকাতা থেকে আসছে, ও একজন বটানিস্ট। একটা কলেজে পড়ায়। আপার কোলোপিসের পিচার প্ল্যান্ট দেখতে এসেছে। তার আগে কয়েকদিন ওদের সঙ্গে এই জঙ্গলে বেড়াবে।

নায়ার কিছু একটা বলার জন্যে ছটফট করছিল। ভুকুদের মালপত্র সব নামানো হয়ে গেলে নায়ার বলে উঠল, “স্যার, গতকাল সন্ধেবেলা ক্যাম্পের কয়েকজন মোটর বোটটা নিয়ে পালিয়েছে। আমরা দুজনই শুধু ক্যাম্পে পড়ে আছি। গতকাল আমরা আবার কাছের একটা গ্রামে গেছিলাম কাঠ কাঠার জন্যে লোক খুঁজতে। ওই গ্রামের লোকজন সবে গ্রামে ফিরতে শুরু করেছিল। কিন্তু প্রায় এক মাস পর দানোটা আবার গতকাল ভোরে ওই গ্রামে হানা দিয়ে একটা বুড়ো লোককে নদীর পাড় থেকে মুখে নিয়ে জলে তলিয়ে গেছে। স্যার, চলুন আমরাও চলে যাই। স্যার, যেখানে ঘটনাটা ঘটেছে সেটা এখান থেকে মাত্র দু-ঘণ্টা মতো লাগে মোটর বোটে যেতে। দানোটা এখানে এসেও হানা দিতে পারে যে-কোনো সময়।”

রুস্নি নায়ার কী বলছে বুঝতে না পারলেও আন্দাজ করতে পারল আবার কিছু একটা ঘটেছে। ও রোহিতের দিকে তাকিয়ে বলল, “এনি পবলেম?”

রোহিত নায়ার যা যা বলেছে সেটা ওকে বলল। তারপর রুস্নিকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কী করবে? তুমিও কি ওদের মতো পালিয়ে যেতে চাও?”

রুস্নি একগাল হেসে কোমর থেকে ছুরিটা হাতে নিয়ে বলল, “সেক্রেড নাইফ, নো পবলেম।”

রোহিত ভুকুর দিকে তাকাল। ভুকু বলল, “নদীর দানো না দেখে আমি এই জঙ্গল ছেড়ে যাচ্ছি না।”

জিনিসপত্র কাঁধে নিয়ে সবাই ক্যাম্পে চলল।

ক্যাম্পটা খুব সুন্দরভাবে সাজানো। অনেকগুলো তাঁবু গোল করে খাটানো। ক্যাম্পের ঠিক মাঝে কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি একটা বড়ো টেবিল। বেশ কয়েকটা ফোল্ডিং চেয়ার-টেবিল ঘিরে। এমনকি ইলেকট্রিক লাইটও রয়েছে ক্যাম্পে। একটা জেনারেটর রাখা আছে খানিক দূরে।

ভুকু রোহিতকে বলল, “হ্যাঁ রে, তোদের এই ক্যাম্পটা তো যে-কোনো টুরিস্ট রিসর্টকেও হার মানিয়ে দেবে। এত আয়োজন করিস কী করে?”

রোহিত বলল, “একবার গাছ কাটা শুরু হয়ে গেলে অনেকদিন টানা থাকতে হয় জঙ্গলে। তাই সবাইকে কমফোর্টেবল রাখাটা জরুরি। কাঠ কাটা শুরু হয়ে গেলে বার্জে চেপে আরও যন্ত্রপাতি আসবে। জঙ্গল থেকে গাছের গুঁড়ি টেনে নদীর ধারে নিয়ে আসতে আসবে ট্র্যাক্টর। নদীর ধার ভরতি হয়ে যাবে কাটা গাছে। তারপর ওই গাছগুলো নদীতে ভাসিয়ে ভালো করে দড়ি দিয়ে বেঁধে বার্জ দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে অন্য জায়গায়।”

নায়ার চা বানিয়ে নিয়ে এসেছিল। চা খাওয়া হলে ভুকু আর রোহিত একটা তাঁবুতে ওদের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিল। সবক’টা তাঁবুর ভেতর ক্যাম্প খাট পাতা আছে। রুস্নি আর কাহু অন্য একটা তাঁবুতে গেল। কাহু খুব করিতকর্মা, পরিস্থিতিটা বুঝে নিজেই রান্নার দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে। কারণ, রান্না করার লোকটাও কাল পালিয়েছে।

রোহিত আর ভুকু নায়ারকে ডেকে নিল নিজেদের তাঁবুতে। নায়ার প্রচণ্ড ঘাবড়ে আছে। এর আগে অনেকবার জঙ্গলে গিয়ে গাছ কাটিয়েছে, কিন্তু এরকম পরিস্থিতির সামনে কোনোবার পড়েনি ও।

ভুকু বলল, “দানোর ব্যাপারটা একটু বলবে?”

নায়ার বলল, “গতকাল আমরা যে গ্রামটায় গেছিলাম, সেখানেই মাস দু-এক আগে ঘটনাটার শুরু। ওই গ্রামের লোকেরা জঙ্গল কেটে আবাদ করে চাষের ক্ষেত বানিয়ে সূর্যমুখী ফুলের চাষ করে। ফুলের বীজগুলো ব্যবসায়ীরা ওদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে যায় তেল বানাবে বলে।

“ওই গ্রামটা একদম নদী-ঘেঁষা। ওরা নদী থেকে রোজ মাছ ধরে নিজেদের খাওয়ার জন্যে। পরপর কয়েকদিন গ্রামের কয়েকজন উধাও হয়ে যায়। প্রথমে কেউ বুঝতে পারেনি কী হচ্ছে। ভেবেছিল, বোধ হয় গ্রামের লোকজন জঙ্গলে শিকার করতে গিয়ে লেপার্ডের পেটে গেছে। তারপর গ্রামের একজন একদিন দেখে একটা বিশাল মুখ নদীর জল থেকে উঠে নদীর পাড়ে খেলা করতে থাকা একটা বাচ্চাকে চোখের নিমেষে মুখে পুরে আবার নদীর জলে তলিয়ে গেল। হলদে বাদামি রঙের বিশাল মুখটা নাকি তেলের ড্রামের মতো মোটা।

“মোট আটজন নিখোঁজ হয়ে যাবার পর ওই অজানা দানোর ভয়ে গ্রাম খালি করে সব পালিয়েছিল জঙ্গলের ভেতর। শুধু ওই গ্রাম কেন, আশেপাশে যত নদীর ধারের গ্রাম আছে সবাই গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে। কয়েকদিন আগে নদী বেয়ে যাওয়া একটা বার্জের মাঝিদের কাছে খবর পাই, ওই গ্রামে নাকি লোকজন ফিরতে শুরু করছে, তাই গাছ কাটানোর লোক জোগাড় করতে আমারা ওই গ্রামে গেছিলাম। গিয়ে দেখি গ্রাম পুরো ফাঁকা। শুধু কয়েকজন বয়স্ক অসুস্থ লোক পড়ে রয়েছে গ্রামে। ওদের কাছেই শুনি, দানোটা আবার ফিরে এসেছে আর একটা বুড়ো লোককে নদীর ধার থেকে মুখে তুলে নিয়ে গেছে।”

ভুকু বলল, “কাল ওই গ্রামে যাব। চল এখন আশেপাশের জঙ্গলটা একটু ঘুরে আসি।”

নায়ার বলল, “ঠিক আছে, স্যার।”

সারা বিকেল ধরে ক্যাম্পের আশেপাশের জঙ্গলটায় চষে বেড়াল ভুকু আর রোহিত। মূলত সেগুন গাছের জঙ্গল।

রোহিত বলল, “এই সেগুন কাঠের অনেকটাই চেরাই হয়ে চালান যায় ভারতবর্ষে।”

ভুকুর নজর পড়ে আছে গাছের ডালে ঝুলে থাকা অর্কিডের দিকে। কতরকম ফুল যে ফুটে আছে! ঘুরতে ঘুরতে একটা লতানো গাছ দেখল ভুকু। পুরো গাছটা বেগুনি আর ফুলগুলো সবুজ। ঠিক যেন নর্মাল গাছের উলটো। গাছের পাতা, লতার রঙ বেগুনি আর ফুল সবজ। এইরকম কোনও গাছের কথা ও আগে শোনেনি। রোহিতকে ডেকে গাছটা দেখাল ভুকু। রোহিত বলল, ও এতদিন ধরে বোর্নিওর জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু এরকম সবজে ফুলওয়ালা বেগুনি গাছ আগে দেখেনি। অনেকগুলো ছবি তুলল ভুকু। খোঁজ লাগাতে হবে গাছটার।

***

পরদিন ভোরে মোটর বোটে দানো গ্রামের দিকে চলল ভুকুরা। ভুকু বলেছিল নায়ার আর স্বামীর যাবার দরকার নেই, ওরা বরং ক্যাম্পে থাক। কিন্তু ওরা দুজনে থাকতে চাইল না ক্যাম্পে।

ঘণ্টা খানেক চলার পর নদীর ধারের গ্রামটায় পৌঁছল ওরা। বড়ো বড়ো অনেক বোল্ডার আছে নদীর ধারে। নদীর ধারের উঁচু পাড়ে যদি কিছু ঘরবাড়ি না থাকত, তবে এখানে যে একটা গ্রাম আছে তা বোঝা যেত না।

বোটটাকে নদীর কিনারায় বেঁধে সবাই মিলে চলল গ্রামটা লক্ষ্য করে। সবার আগে আগে চলল রুস্নি। একটা খালের ওপরকার সেতু পার হয়ে গ্রামে ঢুকতে হয়। সেতু পার হলেই একটা উঁচু শক্তপোক্ত কাঠের গেট। গেটটা খোলাই ছিল, তাই গ্রামে ঢুকতে কোনও সমস্যা হয়নি।

গ্রামটায় ঢোকার মুখে অনেকগুলো কাঠের গুঁড়ি পড়ে। রুস্নি বলল, “তোমার সবাই এখানে বসো। আমি আগে একটা চক্কর মেরে আসি।”

কোমর থেকে বাঁশিটা বের করে বাজাতে বাজাতে গ্রামের ভেতর ঢুকে গেল রুস্নি। বাঁশিটার অদ্ভুত সুর গ্রামের মধ্যে পাক খেতে লাগল। কাঠের গুঁড়িগুলোর ওপর বসে থাকতে থাকতে দলের সবার চোখ ঘুমে ভারী হয়ে এল। তারপর মাটির ওপর শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল সবাই।

রুস্নির ধাক্কায় ঘুম ভাঙল ভুকুর। ধড়মড় করে উঠে বসল ভুকু। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। রোহিত, নায়ার, স্বামী, কাহু সবাই মাটির ওপর শুয়ে ঘুমোচ্ছে। ঠিক কী হয়েছিল মনে করতে পারল না ভুকু।

“নো পবলেম, ম্যাজিক্যাল ফ্লুট ফ্রম মাই গ্র্যান্ডফাদার।” বলে হাত বাড়িয়ে ভুকুকে মাটি থেকে টেনে তুলল রুস্নি।

তবে কি বাঁশির সুর ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল সবাইকে? নাহ্‌, কাউকে বলা যাবে না। একে সবাই দানোর ভয়ে কাঁপছে, তার ওপর যদি বাঁশির ব্যাপারটা শোনে…

সবাই ঘুম ভেঙে উঠে বসলে রুস্নি বলল, “আমি পুরো গ্রামটা ঘুরে নিয়েছি। মাত্র পাঁচজন বুড়ো লোক ছাড়া কেউ নেই। ওরা সবাই ঘুমোচ্ছে। চলো, যাবে নাকি গ্রাম দেখতে?”

সবাই মিলে গ্রামের ভেতরে গেল। বাড়িগুলো সব একই ধাঁচের। গাছের খুঁটির ওপর কাঠের পাটাতন। তার ওপর কাঠের দেওয়াল আর কাঠের চাল, খড় চাপানো। সবক’টা বাড়িতেই একফালি করে বারান্দা। বাড়িগুলো মাটি থেকে দু-ফুট করে উঁচু এবং নীচটা ফাঁকা। গ্রামের ভেতরটা খুব পরিষ্কার।

ভুকু রুস্নিকে বলল, “গ্রামের লোকেদের সঙ্গে কথা বলাটা খুব জরুরি। গ্রামের মোড়লকে খুঁজে বের করতে হবে।”

“দেখা যাক, এতক্ষণে লোকগুলোর ঘুম ভেঙে যাবার কথা।” রুস্নি বলল।

রুস্নি ওর বাঁশিটা বের করে অন্য একটা সুর তুলল। জাদু আছে রুস্নির বাঁশির সুরে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সবাই ওর পেছন পেছন চলতে লাগল।

গ্রামের মাঝখানে অনেকটা খোলা জায়গা। তার একপ্রান্তে একটা বড়ো পাথর। কয়েকটা গাছের গুঁড়ি পাথরটাকে ঘিরে। রুস্নি বাঁশি বাজাতে বাজাতে একটা গাছের গুঁড়ির ওপর বসল। সবাইকে ইশারা করে বসতে বলল, কিন্তু বাঁশি বাজানো বন্ধ করল না। খানিকপর দেখা গেল এক এক করে পাঁচজন বয়স্ক লোক এসে উপস্থিত হল খোলা জায়গাটায়। তার মধ্যে একজন গিয়ে বসল ওই পাথরটায়, আর বাকিরা গাছের গুঁড়ির ওপর। রুস্নি এবার ওর বাঁশি বাজানো থামাল। তারপর ভুকুর কানে ফিসফিস করে বলল, “পাথরের ওপর বসা লোকটাই মনে হয় গ্রামের মোড়ল।”

খানিক থম মেরে বসে থাকার পর যেন হুঁশ এল লোকগুলোর। পাথরের ওপর বসা লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “হু আর ইউ?”

রুস্নি এগিয়ে গিয়ে বলল, “আমরা জঙ্গলে কাঠ কাঠতে এসেছি। তোমাদের গ্রামে কি জঙ্গল থেকে কাঠ কাটার লোক পাওয়া যাবে?”

লোকটা খানিক ভুরু কুঁচকে সবাইকে দেখল। তারপর নায়ার আর স্বামীর দিকে তাকিয়ে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলল, “তোমরা দু-দিন আগে এসেছিলে না?”

ঘাড় নাড়ল নায়ার।

“লোক পাবে কোথা থেকে? এই জঙ্গলে দানো এসেছে। সব মানুষজন খেয়ে ফেলছে। নদীর ধার থেকে গোরু, ছাগল, মানুষ মুখে করে নিয়ে নদীর জলে ডুবে যাচ্ছে।”

ভুকু জঙ্গলের মাঝের মালয় গ্রামে সারা গায়ে উল্কি কাটা বৃদ্ধের মুখে ইংরেজি শুনে চমকে উঠেছিল। রুস্নি ভুকুর মুখের দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধের সঙ্গে খানিক মালয় ভাষায় কথা বলে জানাল, “এই লোকটা অনেকদিন কুয়ালা লামপুর শহরে ছিল, তাই ইংরেজি ভালোই জানে।”

ভুকু বলল, “আমার নাম ভুকু। আমি ইন্ডিয়াতে একটা কলেজে পড়াই। এই বন্ধুদের সঙ্গে জঙ্গল দেখতে এসেছি। আমাদের দানোর ব্যাপারটা একটু বলবেন? আমাদের সঙ্গে শক্তিশালী বন্দুক ও গুলি আছে, আপনাদের সাহায্য করতে চাই।”

লোকটা বলল, “আমার নাম মুরুং, আমি এই গ্রামের মোড়ল। তোমরা গুলি-বন্দুক দিয়ে কিছু করতে পারবে না। আমারও তো একটা বন্দুক আছে। দানোটাকে দেখে গুলিও চালিয়েছিলাম, কিন্তু ওটার কিছু হয়নি। একের পর এক গ্রামের লোক দানোটার পেটে যাবার পর সবাইকে জঙ্গলের ভেতরে পাঠিয়ে দিয়েছি। গ্রামের কয়েকজন লোক অসুস্থ থাকায় ওদের দানোর মুখে ছেড়ে আমি গ্রাম ছাড়তে পারিনি। বেশ কিছুদিন দানোটা আসেনি বলে সবাইকে আবার গ্রামে ফিরে আসতে বলেছিলাম। কিন্তু দানোটা আবার এসে হানা দিয়েছে। আমাদের এই গ্রাম অন্য কোথাও সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে।”

“কিন্তু সেখানেও তো দানো হানা দিতে পারে?” ভুকু বলল।

“সেটা কি আর ভাবিনি? দানোটা তো জলের দানো। আঘাত হানে শুধু নদীর ধারে।” মোড়ল বলল।

“আপনি কি নিশ্চিত যে এটা নদীর দানো?”

“নদীর ধার ছাড়া ওই দানোটা যখন অন্য কোথাও হানা দেয়নি, তখন নদীর দানো ছাড়া কী বলব?”

“কিন্তু এই নদী ধরে তো অনেক নৌকো যায়, তাদেরও কি দানো আক্রমণ করেছে?” ভুকু বলল।

“না করেনি, কিন্তু করতে কতক্ষণ?”

“আপনাদের এই গ্রামটা কতদিনের পুরোনো?”

“তা হবে অনেকদিনের। আমি তো এই গ্রামেই জন্মেছি। আমি ছোটো থাকতেই কুয়ালা লামপুর শহরে চলে যাই এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে। ওখানে একটা স্কুলে কিছুদিন পড়াশোনাও করেছি। তারপর হঠাৎ বাবা মারা গেলে আবার ফিরে আসি গ্রামে।” মোড়ল বলল।

“দানোটা কতদিন ধরে গ্রামে আক্রমণ শুরু করেছে?”

“সেটাই তো মজা। মাত্র মাস দু-এক আগে পর্যন্ত জঙ্গল থেকে মাঝে-মধ্যে দু-একটা লেপার্ড গ্রামে হানা দিত, এছাড়া আর কোনও জন্তুজানোয়ারের ভয় ছিল না। হঠাৎ করেই একদিন একটা বাচ্চা নদীর ধার থেকে খেলতে খেলতে উধাও। আমরা ভেবেছিলাম কোনও লেপার্ড হয়তো বাচ্চাটাকে ধরে নিয়ে গেছে। তার পরদিন আবার একটা লোক নদীর ধার থেকে মাছ ধরতে গিয়ে উধাও। পরপর কয়েকজন এভাবে প্রতিদিন নদীর ধার থেকে উধাও হওয়ার পর আমরা নদীর দানোটাকে দেখতে পাই।

“জল থেকে হঠাৎ উঠে এসে একটা বাচ্চাকে কপ করে মুখে পুরে নিমেষে জলে তলিয়ে যায় জলের দানো। ওই সময় আমি কাছাকাছি বন্দুক নিয়ে নদীর ধারে পাহারা দিচ্ছিলাম। দানোটাকে দেখতে পেয়ে গুলি চালাই। কিন্তু দানোটার কিছুই হয়নি। দানোটাকে দেখার পর গ্রামের লোকদের বাঁচাতে ওদেরকে পাঠিয়ে দেই জঙ্গলের ভেতরে আর আমি থেকে যাই অসুস্থ কয়েকজনের সঙ্গে।”

“আপনি নিশ্চিত যে, গুলি দানোর গায়ে লেগেছিল?” বলল ভুকু।

“একদম নিশ্চিত। আমি লক্ষ্যভ্রষ্ট হই না।”

“দানোটাকে দেখতে কেমন বলতে পারেন?”

“এক ঝলক দেখেছি। তেলের পিপের মতো মোটা লম্বা গলা। গায়ে হলুদ বাদামি আঁশ। জলের ভেতর থেকে গলা বের করে একটা বাচ্চাকে মুখে তুলে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে জলে ডুব দিয়েছিল দানোটা। গলাটাই যদি এত বিশাল হয় তাহলে ওর শরীরটা কত ভয়ানক হতে পারে বুঝতে পারছ?”

দলের বাকি সবাই এতক্ষণ চুপচাপ বসে শুনছিল মোড়ল ও ভুকুর কথোপকথন। মুখ খুলল রুস্নি, “একটা দানো গ্রামের এতগুলো বাচ্চা-বুড়োকে মুখে করে নিয়ে চলে গেল আর তোমরা সেই দানোটাকে খুঁজে বের করে ওকে মারবে না? কেমন শিকারির জাত তোমরা?”

মোড়ল বলল, “গ্রামের সব মানুষের মতে, ওই দানোটা আসলে কোনও অশরীরী। অশরীরীর সঙ্গে লড়াই করা যায় না।”

“তাহলে তোমরা সব জঙ্গলের ভেতর গিয়েই থাকো। আমরাই ধরব দানোটাকে।” বলে কোমরের বাক্স-খাপ থেকে বাঁকানো ছুরিটা বের করে আস্তে আস্তে দু-পাশে হেলাতে লাগল রুস্নি।

নাচের ছন্দে দুলতে থাকা ছুরিটার দিকে খানিক মন্ত্রমুগ্ধের তাকিয়ে রইলেন বৃদ্ধ মোড়ল। রুস্নি ছুরি নাড়ানো বন্ধ করে কোমরের বাক্স-খাপে ঢুকিয়ে রাখার পর বৃদ্ধ বললেন, “আমাকে কী করতে হবে বলো। দানোকে না ধরলে মৃত আত্মারা শান্তি পাবে না।”

“বেশ।” ভুকু বলল, “আপনাদের গ্রামটা একটু ঘুরে দেখতে পারি, আর আশেপাশের জঙ্গলটা?”

“চলো, আমি নিয়ে যাচ্ছি তোমাদের। আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছে। কেন জানো? আমরা জঙ্গলের লোকরা অতিথিদের আপ্যায়ন করি, রক্ষা করি প্রাণ দিয়ে। কিন্তু এখন না পারছি তোমাদের আপ্যায়ন করতে, উলটে আমাদের রক্ষা করতে তোমাদের বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছি।”

সমস্ত গায়ে উল্কি কাটা বৃদ্ধের, বলিরেখা ভরা মুখে চোখের কোনায় জল টলটল করে ওঠে। একসময় নরমুণ্ড শিকার করে বেড়ানো উপজাতির এক মোড়লের চোখে জল দেখে আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না ভুকু। এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বৃদ্ধের দুটি হাত।— “এখন এসব বলার সময় নয়। একদিন আপনাদের গ্রামের সব লোকজন মিলে ঠিক আনন্দ করব। দানোকে ধরতে আমাদের একসঙ্গে লড়তে হবে।”

***

বাঁশপাতা আর কাঠ দিয়ে তৈরি ঘরগুলো সব কাঠের গুঁড়ির ওপর তৈরি। নীচ থেকেই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, প্রতিটি বাড়িতেই আছে একটা লম্বা বাঁশ-কাঠের বারান্দা। বারান্দা থেকে একটা কাঠের সিঁড়ি নেমে এসেছে। নাগাল্যান্ডের জঙ্গলে এ-ধরনের অনেক বাড়ি দেখেছে ভুকু। ছোটো ছোটো জন্তু যাতে বাড়ির তলা দিয়ে অবাধে যাতায়াত করতে পারে, তাই এই ব্যবস্থা। উঠোনে ঘুরে বেড়াচ্ছে মুরগি আর হাঁসের পাল। গোটা কয়েক গোরু আর কুকুরও নজর এড়াল না ভুকুর। জীবন্ত গ্রামটায় সব আছে, মানুষজন ছাড়া। বাড়িগুলো ছাড়িয়ে খানিক পরিষ্কার জমি, সেখানে কিছু ধানের গাছ। তারপর পুরো গ্রামটা বেড় দিয়ে একটা খাল। বুঝতে অসুবিধা হয় না, খালটা খোঁড়া হয়েছে গ্রামটাকে বুনো জন্তুদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। খালটার ও-পাশে ঘন জঙ্গল। দেশ-বিদেশের অনেক জঙ্গলে ঘুরেছে ভুকু। এমনকি ওদের নিজের গ্রামও জঙ্গলের মাঝে। কিন্তু এই জঙ্গলের সঙ্গে আগে দেখা জঙ্গলের যেন কোনও তুলনাই হয় না। গাছের মাথাগুলো প্রায় মেঘ ছুঁয়েছে। মোটা মোটা লতা ঝুলছে গাছগুলো থেকে। চারপাশ কালচে সবুজ। গাছের গুঁড়িতে পুরু শ্যাওলা জমে আছে। ফার্ন হয়ে আছে ডালে ডালে। কে জানে ভুকুর স্বপ্নের পিচার প্ল্যান্ট এখানে আছে কি না।

গ্রামের পেছনে জঙ্গলের দিকেও রয়েছে খালের ওপরে একটা কাঠের সেতু। গ্রামের দিকের অংশে দুটো লম্বা মোটা গাছের গুঁড়ি পোঁতা। গুঁড়ির মাথাগুলো ইংরেজি V অক্ষরের মতো করে কাটা। চামড়া দিয়ে মোড়া V-র ভেতর দিয়ে দুটো মোটা লম্বা পাকানো লতার দড়ি, খালের ও-পাড়ের কাঠের সেতুর প্রান্তে বাঁধা। দড়ির অন্য দুই প্রান্ত গ্রামের দিকের লম্বা খুঁটির গায়ে জড়ানো। বৃদ্ধ মোড়ল দেখালেন, চাইলে লতার দড়ি টেনে সেতুটা তুলে নেওয়া যায়। এতে সহজে লেপার্ড বা অন্য জন্তু চট করে গ্রামে ঢুকে পড়তে পারে না। মূলত হাতি আটকানোর জন্য খাল। খালটা আবার নদীর সঙ্গে জোড়া, তাই মাছও পাওয়া যায় এই খালে।

সেতু পার হয়ে জঙ্গলে ঢোকার খানিক পর ভুকুদের নজরে এল একপাল ওরাংওটাং গাছের ডালের মাথায় বসে ওদের দিকে তাকিয়ে। একটা হর্নবিল বিশাল ঠোঁট নিয়ে প্রায় ভুকুদের মাথা ছুঁয়ে উড়ে গেল খং খং করে ডেকে। নানা রঙের ফুল ফুটে আছে। ভুকুর চোখ খালি খুঁজে বেড়াচ্ছে কলশির মতো দেখতে পাতাওয়ালা গাছ। অনবরত ছবি তুলে যাচ্ছিল ভুকু। শুধু রোহিত চুপ করে আছে। কাঠ কাটার লোক না পাওয়া গেলে মুশকিল। অনেক অর্ডার এসে আছে কাঠ চেয়ে।

***

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যেখান দিয়ে ভুকুরা হাঁটছিল, সেখানে পায়ে চলার নিশান স্পষ্ট। ঘন ঝোপের মধ্যে দিয়ে এ-পথে যে রোজ যাতায়াত চলে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। মোড়লও বার বার সাবধান করছিলেন এদিক-ওদিক না যেতে। যে-পথে উনি যাচ্ছেন, ঠিক সেখান দিয়েই যেতে। ভুকু আর নিজের সন্দেহটা চেপে রাখতে পারল না। সরাসরি মনের সন্দেহটা জানান দিল মোড়লকে।

“ঠিকই ধরেছ, এই পথ দিয়ে আমরা জঙ্গলের আরও গভীরে যাই। একদিন তোমাদেরও নিয়ে যাব। খানিক এগিয়ে নদীপথে যেতে হবে। ওখানে আছে আমাদের পূর্বপুরুষদের বানানো গাছ-গ্রাম— গাছের ওপর ঘর বানিয়ে থাকি। আর এই যে ঝোপের ওপর চলার দাগগুলো দেখছ, এগুলো ওরাংওটাংয়ের চলার দাগ। আমরা ওদের আমাদের মতোই মানুষ মনে করি। ওরাই আমাদের এই জঙ্গলে বাঁচিয়ে রেখেছে।

“ভাবছ, কী করে? কেন তোমাদের বার বার জঙ্গলে এদিক-ওদিক যেতে মানা করছি জানো? এই জঙ্গলের অর্ধেক গাছ রাক্ষুসে। ওই যে দূরের সুন্দর ফুলগুলো দেখছ, ওগুলো পোকা, পাখি সব খায়। এগুলোর কথা সবাই জানে। জানে না শুধু কিছু লতার কথা। গাছের ডাল থেকে ঝুলে থাকা মোটা লতাগুলো ওদের সামনে দিয়ে কিছু গেলেই হঠাৎ করে দুলে উঠে জড়িয়ে ধরে। তারপর ময়াল সাপের মতো পাক মারতে থাকে শিকারের শরীরে। ওই লতাগুলোর গায়ে ভরতি কাঁটা। শিকারের শরীর থেকে সব রক্ত চুষে শরীরটা ফেলে দেয়।”

ভুকু চমকে উঠে রোহিতের দিকে তাকায়। এইরকম একটা রক্তচোষা লতার কথা কোন একটা ট্র্যাভেল ম্যাগাজিনে পড়েছিল যেন! তবে কি সে সেই জায়গায় এসে পৌঁছে গেল নাকি?

“আমাদের দেখাতে পারবেন সেই গাছ?” রোহিত বলে ওঠে।

“সেই গাছ এখানে নেই। আছে জঙ্গলের আরও ভেতরে। জঙ্গলের যেখানে ওই গাছ থাকে, সেখানে ওরাংওটাংরা যায় না। যেখানে ওরা নেই, সেখানে আমরাও যাই না। সেই জন্যই বলেছিলাম, ওরাই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। দানো ধরা পড়লে আমাদের সেরা শিকারিকে তোমাদের সঙ্গে পাঠিয়ে সেই গাছ দেখিয়ে আনব। সে নিজে দেখেছে ওই রক্তচোষা গাছের কীর্তি। এবার ফেরা যাক। আলো কমে আসছে।”

গ্রামে ফিরে কী মনে হওয়াতে ওদের ক্যাম্পের কাছে জঙ্গলে ঘুরতে গিয়ে নজরে আসা বেগুনি পাতার সবজে ফুলওয়ালা লতার ছবিটা মোড়লকে দেখাতেই চমকে উঠল মোড়ল।— “এই গাছ কোথায় দেখলে?”

“আমাদের ক্যাম্পের কাছের জঙ্গলে।”

“খবরদার, এ-লতার কাছেও যেও না। আমি আমার দাদুর সঙ্গে জঙ্গলে গিয়ে একবারই এই লতা দেখেছিলাম। আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে। দাদু বলেছিলেন, ‘চিনে রাখ গাছটাকে, এ-গাছ যেখানে থাকে তার আশেপাশে অনেক দৈত্যের মতো প্রাণীও দেখতে পাবি। ওই সবুজ ফুলের মধু পেটে চলে গেলে সে কিছুদিনের মধ্যেই রাক্ষসের মতো বড়ো হয়ে যায়।’ দাদু আরও বলেছিলেন, খুব বেশিদিন বাঁচে না লতাগুলো। একরকম কালো ফল হয়। ফল হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে মরে যায় লতাগুলো। তারপর ওই রাক্ষস হয়ে যাওয়া জন্তুগুলোও শুকিয়ে মরে যায়। যদিও বহুবছর পরপর এইরকম লতা আর ফুল দেখা যায়।”

শুনে অবাক হয়ে গেল ভুকু। এত বছর ধরে উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে ঘাঁটছে, অথচ এরকম কোনও গাছের কথা শোনেনি। পৃথিবীর আনাচ-কানাচে যে কত রহস্য লুকিয়ে আছে!

গ্রামে ফিরতে ফিরতে বিকেল প্রায় চারটে হয়ে গেল। গ্রামের বাকি চার বৃদ্ধ খাল থেকে বড়শি দিয়ে মাছ ধরছিল। ওই চার বৃদ্ধের সঙ্গে রুস্নির সাহায্যে কথা বলে দানো সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য পেল ভুকু। ওই দানো নাকি পরপর কয়েকদিন হানা দিয়ে আবার উধাও হয়ে যায়। আবার হানা দেবার সময় হয়ে এসেছে।

ভুকুরা কোনোরকম প্রস্তুতি ছাড়াই এসেছিল। ভুকু তার দলের কাছে প্রস্তাব করল যে সে, রোহিত আর রুস্নি গ্রামে থেকে যাবে। দলের বাকি সবাই মোটর বোট নিয়ে ক্যাম্পে ফিরে যাক। শুনেই প্রায় কান্না জুড়ে দিয়েছিল নায়ার আর স্বামী। ভুকু আর রোহিত না গেলে ওরা কিছুতেই ক্যাম্পে ফিরবে না। দানো ওদের খেয়ে নিলে ওদের পরিবার শেষ হয়ে যাবে।

খানিক চিন্তা করল ভুকু। এতজন এই গ্রামে থাকা যাবে না। এতগুলো বাড়ি খালি পড়ে আছে, তাতে থাকার অসুবিধা না হলেও এতগুলো লোকের খাবার জোটানো মুশকিল হয়ে পড়বে। তাছাড়া এই রহস্যঘেরা জঙ্গলে ওরা প্রায় নিরস্ত্র। সম্বল বলতে রুস্নির বাঁশি আর দোফলা একটা ছুরি। চাইলে হয়তো মোড়লের কাছ থেকে কিছু দা পাওয়া যেতে পারে। এতে একটা অজানা ভয়ংকর প্রাণীর টক্কর নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। বরং ক্যাম্পে ফিরে বন্দুক, গুলি, খাবারদাবার আর সোলার ব্যাটারি চার্জারটা নিয়ে আসা দরকার। যদিও স্যাটেলাইট ফোনটা সঙ্গেই আছে। কিন্তু এটা এখন কোনও কাজেই লাগছে না। শুধু সকালে একবার রোহিতের বসের ফোন এসেছিল। রোহিত পুরো পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলতে তিনি নিজেই প্লাস্টার করা পা নিয়ে চলে আসতে চাইছিলেন। রোহিত অনেক বুঝিয়ে ওঁকে থামিয়েছে। তবে রোহিতের বস বার বার করে বলে দিয়েছেন, অযথা ঝুঁকি নেবার দরকার নেই। প্রয়োজনে সাইট বন্ধ করে ফিরে যেতে।

দু-দিনের মধ্যে ওরা গ্রামে এসে দিন কয়েক থাকবে বলে মোড়লের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বোটে গিয়ে বসল। বোটে ওঠার আগে এক বুড়ো এগিয়ে এসে ভুকুদের বোটে খানকয়েক মাছ তুলে দিল। লালচে রঙের মাছগুলো দেখতে অনেকটা রুই মাছের মতো। কাহু মাছগুলো দেখে বলে উঠল, “টেস্টি!”

ভুকুরা যখন ক্যাম্পে ফিরে এল তখন প্রায় সন্ধে ছ’টা। অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। তবে আকাশে চাঁদ থাকায় অন্ধকার অত ঘন নয়। বোট থেকে নেমেই স্বামী ছুটল জেনারেটর চালাতে। একটা প্যাঁচা বসে ছিল নদীর ধারে পোঁতা বড়ো খুঁটির ওপর। আলো জ্বলে উঠতেই উড়ে গেল সেটা।

মে মাস। হিসেবমতো গরমকাল। কিন্তু ভুকুর খানিক ঠান্ডা-ঠান্ডাই লাগছিল। ক্যাম্পের ব্যবস্থাপনা চমৎকার। একটা জলের ট্যাংক ক্যাম্প সাইটের ঠিক মাঝখানে কতগুলো খুঁটির ওপর বসানো। নদীর জল পাম্পে গিয়ে সোজা উঠছে ট্যাংকে। আর সেই ট্যাংক থেকে জল চালান যাচ্ছে প্রতিটি তাঁবুর সঙ্গে লাগানো টয়লেটে।

রোহিত টয়লেট থেকে স্নান সেরে এসে ভুকুকে বলল, “স্নান করবি না? স্নান সেরে নে, সারাদিনের ধকল দূর হয়ে যাবে।”

ভুকু ওর ল্যাপটপটা স্যাটেলাইট ফোন দিয়ে কানেক্ট করে গুগল খুলে বসেছে।

“দাঁড়া, আগে দেখি এই বেগুনি লতাটার কোন হদিস পাই কি না। গুগল লেন্স দিয়ে ছবিটা আপলোড করে খুঁজে যাচ্ছি, এখনও কোনোকিছু পাইনি। বুড়ো ঠিকই বলেছিল, মনে হয় এই লতার হদিস কেউ এখনও পায়নি। স্যাম্পল নিয়ে গিয়ে ল্যাবে টেস্ট করতে হবে। হতে পারে এই লতায় এমন কিছু ভিটামিন বা প্রোটিন আছে যা শরীরে ঢুকলে শরীরকে ফুলিয়ে বড়ো করে রাক্ষসের আকার দেয়।”

“তুই বুড়োর কোথায় বিশ্বাস করলি? জঙ্গলের লোকেরা কত গপ্পো ছাড়ে।”

“না রে, জঙ্গলের লোকেরা মিথ্যে বলে না। আর মোড়ল যে লতানো রক্তখেকো লতার কথা বলল, সেটাও মিথ্যে নয়। আমি কোথাও একটা পড়েছি এই লতার কথা। যে করেই হোক ওই লতার সন্ধান পেতেই হবে। আমাজনের জঙ্গলে নাকি এ-ধরনের গাছ আছে। আসলে আমরা যতই হামবড়া ভাব দেখাই, এই বিশ্বের কতটুকুই-বা জানি। আমাদের থেকে এই লোকগুলো এই গ্রহের নানা রহস্য অনেক বেশি জানে। রহস্যগুলো রহস্যই থাকা ভালো, বুঝলি। না-হলে আমাদের মতো কিছু স্বার্থপর লোক প্রকৃতির নিজস্ব তালকে নষ্ট করে দেবে।”

“তাল! বুঝলাম না।” রোহিত বলে।

“দেখ, এই পুরো ব্রহ্মাণ্ডই এক ছন্দসমতার ফল। সবকিছুই সৃষ্টি হয়েছিল কোনও না কোনও কারণে। এক এক জায়গায় এই ছন্দসমতা এক-একরকম। বরফের রাজ্যে যে ছন্দ চলে সেটা মরুতে চলে না। তৃণভূমিতে যে ছন্দ চলে তা এই জঙ্গলে অচল। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সমতার অঙ্ক আলাদা আলাদা…”

“স্যার, টি।” কাহু খুব করিতকর্মা ছেলে। এসেই লেগে পড়েছে ওর কাজে। চা আর মাছভাজা নিয়ে এসে হাজির।

“চল, খেয়ে নেওয়া যাক। জব্বর খিদে পেয়েছে। তা রাতে কী খাওয়াবে, কাহু?” চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে রোহিত জানতে চায়।

“রাইস অ্যান্ড ফিশ কারি স্যার, লটস অফ ফিস।”

***

“মর্নিং, স্যার!”

কাহুর ডাকে ঘুম ভাঙে ভুকুর। ধড়মড় করে উঠে বসে ভুকু। রোহিতও উঠে পড়েছিল কাহুর গলার শব্দে।

চা খেতে খেতে ভুকু রোহিতকে বলল, “জানিস, কাল রাতে আমার এক অস্ট্রেলিয়ান বটানিস্ট বন্ধু রবার্টকে ওই বেগুনি লতার গাছটার ছবি-সহ এখানে যা যা ঘটেছে তা জানিয়ে মেল করেছিলাম। মোড়লবুড়োর ওই লতা নিয়ে গল্পের কথাও শুনিয়েছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে ও আমাকে জানিয়েছে, যে করেই হোক ওর খানিকটা স্যাম্পল চাই। ল্যাবরেটরিতে টেস্ট করতে হবে ওই ফুলের নির্যাস। হতে পারে বিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত খুলে যাবে। বোর্নিওর জঙ্গল একটা অজানা খনি। কত কিছু যে এই জঙ্গলে লুকিয়ে আছে।”

“ঠিকই বলেছিস। আমি তো প্রতিবছরই জঙ্গলে কয়েক মাস করে কাটাই, কিন্তু এরকম কোনও লতা দেখিওনি, এরকম গল্পও শুনিনি। আসলে কাঠ কাটানো নিয়ে ব্যস্ত থাকি, জঙ্গলের আসল বাসিন্দাদের সঙ্গে খুব কমই এভাবে মোলাকাত হয়। সরকারও চায় না আমরা কোনোভাবে জঙ্গলবাসীদের বিরক্ত করি।” রোহিত বলে।

“কাল ওই বুড়োর কথা শোনার পর থেকে কেন জানি না আমার মনে হচ্ছে, এই দানোর পেছনে ওই লতার ভূমিকা আছে।”

“কীরকম?” রোহিত জানতে চায়।

“আমি শিওর নই। আমি মনেপ্রাণে চাই না এই লতার স্যাম্পল নিয়ে যেতে। একবার এই লতার কথা রাষ্ট্র হয়ে গেলে দলে দলে বটানিস্ট ঝাঁপিয়ে পড়বে এখানে। জঙ্গল তাঁর নিজস্বতা হারাবে। আমি জঙ্গল-পাহাড়ের ছেলে। আমি ভালোই জানি বাইরের মানুষ একটা জঙ্গলের কতটা ক্ষতি করতে পারে। রবার্টকে এই লতা নিয়ে কোনও কথা কাউকে না জানাতে অনুরোধ করেছি। মেলটা পাঠানোর পর মনে হয়েছিল, বড়ো ভুল হয়ে গেছে লতার কথা প্রকাশ করা। কিন্তু যা করে ফেলেছি তাত আর শোধরাতে পারব না।”

“কিন্তু ধরে নিচ্ছিস কেন এখানে লোক এলে জঙ্গলটা নষ্ট হয়ে যাবে? হতে পারে…”

“লোক আসা শুরু হলেই এখানে হোটেল হবে, জীববৈচিত্র্য নষ্ট হবেই হবে। আসলে এই জঙ্গলগুলো পৃথিবীর ফুসফুস। সব নষ্ট হয়ে গেলে… যাক গে, পরে ভাবব। বাইরে চল। লতাটা ভালো করে দেখতে হবে। তাছাড়া ওই গ্রামে থাকার সব প্রস্তুতিও নিতে হবে। কাল থেকে ওই গ্রামে ঘাঁটি গাড়তে হবেই হবে।”

তাঁবু থেকে বাইরে বেরিয়ে রুস্নিকে দেখল ভুকু। লোকটার শুধু সাহসই নেই, বাঁশির সুর তুলে তাতে মানুষ-সহ জন্তুজানোয়ারকে ঘুম পাড়িয়ে দিতে পারে। সুর শুনিয়ে হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার মতো পেছনে পেছনে টেনে নিয়ে যেতে পারে। যদিও দলের সবাই এখনও ওর এই ক্ষমতাটা টের পেয়েছে বলে মনে হয় না। রোহিতও বোধ হয় বুঝতে পারেনি।

রুস্নি ভোরবেলায় উঠেই নদীতে বড়শি ফেলে বেশ কিছু মাছ ধরে ফেলেছে। রুস্নির হাতে বড়শি দেখে মাথায় একটা চিন্তা ঝলক দিয়ে উঠল ভুকুর।— “রুস্নি, তোমার বড়শিগুলো দেখতে পারি?”

“শিওর, স্যার। মাছ ধরবেন?” একগাল হাসে রুস্নি।

কাঁধের ঝোলা থেকে একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের বাক্স বের করে রুস্নি।— “সি, ডিফারেন্ট সাইজ। ইয়ু ক্যান ক্যাচ বিগ ফিশ অলসো। নো পবলেম।”

বড়শিগুলো দেখে ঝট করে একটা ছবি ঝিলিক দিল ভুকুর মাথায়। খানিক চিন্তা করে স্বামীকে ডাকল ভুকু।— “তোমার কাছে তো অনেক যন্ত্রপাতি আছে, কয়েকটা এর থেকে কয়েকগুণ বড়ো মাপের বড়শি বানাতে পারবে?”

রুস্নির বড়শির বাক্স থেকে একটা ইঞ্চি দু-এক লম্বা বড়শি তুলে দেখাল ভুকু।— “আজই চাই। কাল থেকে আমরা সবাই ওই গ্রামে গিয়ে কয়েকদিন থাকব। তার জন্য যা যা লাগবে সঙ্গে নিতে হবে। খাবারদাবার, বন্দুক, গুলি…” কাহু, নায়ার, আর যা যা লাগবে দেখে গুটিয়ে নাও। রোহিত থাকবে তোমাদের সঙ্গে। আমি আর রুস্নি এখন একটু জঙ্গলে ঢুকব।”

কথাগুলো বলে নদীর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে ভুকু। কতকগুলো নদীর ডলফিন জলের ওপর দিয়ে সার দিয়ে ভুস করে লাফিয়ে উঠে আবার ডুবে যাচ্ছে। এই দৃশ্য দেখতে অনেক পর্যটক আসে কোলাপিস নদীতে। যদি একবার বাইরের দুনিয়ার মানুষের কাছে সদ্য খোঁজ পাওয়া এই জীববৈচিত্র্যের কথা প্রকাশ পেয়ে যায়, তবে জঙ্গলের নিজস্বতার চরম ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। নাহ্‌, কাল রবার্টকে মেলটা করা উচিত হয়নি।

অনেক অনেক নুডুলসের প্যাকেট এসেছিল সঙ্গে। মাছ দিয়ে সেই নুডুলস বানিয়ে ফেলেছে কাহু। মাছ-নুডুলস কখনও এর আগে খায়নি ভুকু। এক চামচ মুখে দিয়েই চোখ বন্ধ হয়ে গেল আমেজে। নদীতে ধরা টাটকা মাছ আর ময়দার দড়ির মিশেল যে এত স্বাদু হতে পারে তা কোনোদিন আন্দাজ করতে পারত না, যদি না এই জঙ্গলে আসত। নুডুলসের ওপর ছড়িয়ে দেওয়া গোলমরিচের গুঁড়ো মালয় রাঁধুনির হাতের ছোঁয়ায় অন্য মাত্রা পেয়েছে। মাছ সেদ্ধ করে সেগুলো থেকে কাঁটা সরিয়ে ফেলে ঠিক নারকোলের মতো ছোটো চারকোনা কুচি করে খানিক নুডুলস রেখে তারপর সেই মাছের কুচিগুলো ছড়িয়ে আবার নুডুলস, তারপর আবার মাছের কুচি। একদম ওপরটা পুদিনা পাতা জাতীয় কোনও পাতা দিয়ে সাজানো। যে-কোনো স্টার হোটেলর রাঁধুনিকে টেক্কা দেবে নুডুলসের স্বাদ ও পরিবেশন সজ্জা।

ভুকু খানিকক্ষণ মুখে নুডুলস নিয়ে চোখ বুজে থাকার পর চোখ খুলে কাহুর দিকে দুটো আঙুল তুলে ‘ভি’ দেখাতেই হাসি ফুটে উঠল ওর মুখে। এতক্ষণ ও চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল ভুকুর প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। ও বুঝে গেছে, ভুকুই দলের অঘোষিত নেতা। তাই ভুকুকে খুশি রাখতে ও মনেপ্রাণে লেগে পড়েছে।

খাওয়া হতেই রুস্নিকে নিয়ে জঙ্গলে চলল ভুকু। প্রথমেই গেল বেগুনি লতার সবজে ফুলের গাছটার কাছে। ক্যাম্পের কাছেই একটা গাছের মোটা ডাল থেকে ঝুলে আছে পরজীবী লতাটা। এই দু-দিনেই ফুলের ঔজ্জ্বল্য অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। ফুলগুলোর ছবি তুলে ক্যামেরার মনিটরে সেগুলো বড়ো করে ভুকু দেখল, অনেকটা করবি ফুলের গড়নের ফুলগুলোর পাঁপড়ির ধারগুলো শুকিয়ে এসেছে। ঝরে পড়ার আগের অবস্থা। দু-একটা ঝরে যাওয়া ফুলের গোড়ায় কালচে বিন্দুর মতো ফলের আভাস। একটা ধূসর রঙের সাদা গলার ছোটো পাখি উড়ে এসে ঝুলন্ত বেগুনি লতাটাকে পায়ে আঁকড়ে একটা ফুল ঠোঁটে নিয়ে উড়ে যেতে পাখির দুলুনিতে একরাশ শুকনো সবুজ ফুল ঝরে পড়ল। ভুকু ফুল কুড়োতে এগিয়ে যেতেই গাছের উঁচু ডাল থেকে একটা কর্কশ শব্দ খং খং করে উঠল। ওপর থেকে একরাশ বিষ্ঠা বৃষ্টির ধারার মতো ছিটকে পড়ল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে।

যে গাছের নীচে ভুকুরা দাঁড়িয়ে লতানে গাছটা দেখছিল, সেই গাছের মাথায় ঝাঁকুনি তুলে যে পাখিটা আকাশে ডানা মেলল, তা দেখে রুস্নিও আঁতকে উঠল। এক ঝটকায় ডানহাত দিয়ে কোমরে গোঁজা দোফলা ছুরিটা বের করে নিল রুস্নি। তারপর হাতের ইশারায় ভুকুকে চুপ করে দাঁড়াতে বলে আকাশের দিকে তাকাল বাঁহাতটা চোখের সামনে তুলে সূর্যের আলোকে আড়াল করে। বলল, “ডোন্ট ওরি, সেক্রেড নাইফ উইল সেভ আস।” তারপর আকাশে উড়ন্ত পাখিটাকে দেখে বিড়বিড় করে বলল, “মাই গড, হোয়াট ইজ দিস! আই অ্যাম অ্যা জাঙ্গলম্যান, কিন্তু এইরকম রাক্ষসের মতো বিশাল পাখি দেখা তো দূরের কথা, শুনিওনি।”

ভুকুও চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল না। ও আকাশের দিকে তাক করে ক্রমাগত পাখিটার ছবি তুলে যাচ্ছিল। পাখিটার আকৃতি হর্নবিলের মতো। কিন্তু হর্নবিলের থেকে বহুগুণ বড়ো। ঠিক যেন রূপকথার রক পাখি। একটা হাতিকে অনায়াসে ঠোঁটে তুলে নিয়ে উড়ে যাবে। পাখিটা ওদের মাথার ওপর দিয়ে বার কয়েক চক্কর কেটে নদীর দিকে উড়ে গেল।

পাখিটা চলে যেতে ভুকু গাছের তলায় পড়ে থাকা সবজে ফুলের দিকে নীচু হয়ে হাত বাড়াতেই লাফিয়ে ওর হাতটা ধরে ফেলল রুস্নি।— “ছুঁয়ো না। ভুলে গেলে কাল মোড়ল কী বলেছিল? আমরা জঙ্গলের মানুষ, বুড়ো মানুষদের কথা মেনে চলি। বুড়ো যা বলেছে তা সত্যি হতেও পারে। পখিটার আকার দেখে কিছু বুঝলে না?”

“ঠিক বলেছ, এই জঙ্গলের অনেক রহস্যের পেছনে এই বেগুনি রঙের লতাটা আছে। তোমার কথা মেনে নিলাম রুস্নি। ফুল কুড়োচ্ছি না। কিন্তু তুমি কি আমাকে একটা ফুল নিতে দেবে গবেষণার জন্য?”

রুস্নি ওর পিঠের ঝোলা থেকে বড়শির বাক্সটা বের করে বড়শিগুলো হাতে তুলে এক এক করে এমনি ঢুকিয়ে দিল ব্যাগের মধ্যে। তারপর একটা বড়শিতে সুতো বেঁধে একটা ছোটো লাঠি কুড়িয়ে সেই লাঠির ডগা একটা ফুলের গোড়ায় চেপে ধরে বড়শিতে গেঁথে ফুলটাকে বাক্সের মধ্যে বড়শিসুদ্ধু ভরে ফেলে বাক্সের মুখটা বন্ধ করে দিল লাঠির ডগা দিয়ে।

ভুকু বাক্সটার দিকে হাত বাড়াতেই তেড়ে এল রুস্নি।— “ডোন্ট টাচ। ওয়েট।”

কাছেই জঙ্গলের মধ্যে খানিক ঘাসজমিতে ঘুরে বেড়াচ্ছিল কয়েকটা বুনো মোষ। সেগুলোর দিকে আস্তে আস্তে এগোতে লাগল রুস্নি। বুনো মোষের দলের দিকে এগোতে যে-কেউ কয়েকবার ভাববে। কিন্তু রুস্নির কোনও হেলদোল নেই।

রুস্নিকে দেখে খানিক মুখ তুলে কান খাড়া করে দলের সবচেয়ে বড়ো আকারের মোষটা একটা পা মাটি থেকে তুলে দাঁড়িয়ে রইল। কালো কুচকুচে মোষটার খুরের ঠিক ওপরটায় খানিক সাদা দাগ। যেন মোজা পরে আছে মোষটা। মোষটার বাঁকানো শিং দুটো কম করেও দু-ফুট করে লম্বা। শিং দুটোর মাঝখানে একগুচ্ছ সাদা লোম। ক্রমাগত জাবর কাটতে থাকা মোষটার মুখ দিয়ে লালা ঝরছিল। স্থির চাউনি দেখে দূর থেকেই গায়ে শিরশির করে উঠছিল ভুকুর।

মোষের দলটার কাছে যাবার আগে হাতের দোফলা ছুরি ‘কারিস’ দিয়ে একটা গাছের বড়ো গোল পাতা কেটে নিয়েছিল রুস্নি। মোষের দলটার মধ্যে ধীর পায়ে ঢুকে, মোষগুলোর পায়ের কাছে পড়ে থাকা একতাল গোবর পাতায় তুলে, যেভাবে গেছিল সেইরকম ধীর পায়েই ফেরত আসতে লাগল। বুনো মোষের দল রুস্নির উপস্থিতিতে একবারের জন্যও বিরক্ত হয়নি।

রুস্নি পাতাভরা গোবরের তাল ফেলে দিল ফুলভরা বাক্সটার ওপর। তারপর ভুকুর দিকে তাকিয়ে বলল, “সিলড। আর ভয় নেই। এটাকে এইভাবেই ক্যাম্পে নিয়ে রেখে দেব। তারপর ফেরার সময় অন্য একটা বাক্সে ভরে নিয়ে যাব। চিন্তা কোরো না। তবে একটাই অনুরোধ, এটাকে তুমি ধোরো না। কী থেকে কী হয় কিচ্ছু বলা যায় না। মোড়লের কথা মিথ্যে হবার নয়। চলো, এখন আরও খানিক জঙ্গলের ভেতর যাই।”

“সেই ভালো।” ভুকু বলল। ছোটোবেলায় ঠাকুমার কাছে শুনেছিল, কোনও কারণে সাপের মণি পেলে তা নাকি গোবর দিয়ে চাপা দিতে হয়, তাহলে সেই মণি আর সাপ খুঁজে পায় না। সব দেশের ঠাকুমা-দিদিমাদের গল্পগাথাই কি এক? মনে মনে ভাবে ভুকু।

একটু এগোতেই একটা সরু তিরতিরে জলের ধারা নজরে এল। রুস্নি বলল, “চলো, এই ধারা ধরে এগোই, তাতে পথ ভুল হবার সম্ভবনা থাকবে না। তবে তার আগে একটা ছোট্ট কাজ সেরে নিই।”

কয়েকটা গাছের আধ-শুকনো ডাল কেটে, গাছের লতা দিয়ে একটা একটা তিরের মতো বানিয়ে জলের ধারার ধারে পুঁতে দিল রুস্নি। তিরের মুখটা করে দিল যেদিক থেকে ওরা এসেছিল, সেদিকে।

“ফিরতে হবে তো।” মুচকি হেসে রুস্নি বলে।

ভুকু যত রুস্নির বিচক্ষণতা দেখে ততই অবাক হয়ে যায়। জঙ্গলে ঘোরার এইসব কলাকৌশল ওর মাথাতে আসেনি। নাহ্‌, রোহিতের বস ঠিক লোককেই সঙ্গে দিয়েছে।

জলের ধারার দু-ধারে মূলত সেগুনের জঙ্গল। এক-একটা নয় নয় করেও একশো কুড়ি-পঁচিশ ফুট লম্বা। এই গাছগুলোই কাটার জন্য জঙ্গলের ইজারা নিয়েছে রোহিতের কোম্পানি। জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে কোন গাছগুলো কাটা হবে সেগুলোই ঠিক করার কথা রোহিতের। পাহাড়ের ধাপ উঠে গেছে ধীরে ধীরে। কালচে আলো জঙ্গলের ভেতরে। না আলো, না অন্ধকার। জঙ্গলের আদিম গন্ধে ঘোর লেগে যায়। গাছের তলায় পুরু হয়ে ঝরা পাতা। একটা বিশাল মাপের গিরগিটি ওদের পায়ের শব্দে পাতার ওপর দিয়ে সড়সড় করে একটা গাছের গুঁড়ির খানিক ওপরে উঠে পা দিয়ে গাছের ছাল আঁকড়ে ঝুলে রইল। হলদেটে রঙের ওপর সবুজ, নীল, কমলা আর লালের আঁকিবুঁকি। গিরগিটিটার দিকে খানিক মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল ভুকু। ছোটোবেলায় ওর নিজের গ্রামের কাছের জঙ্গলে গিরগিটি অনেক দেখেছে। এমনকি ও যখন স্কুল ছুটির পর একা একা গাছের তলায় বসে থাকত, তখন গিরগিটিরা ওর গায়ে মাথায় উঠে পড়ত নির্ভয়ে। কিন্তু এত বড়ো গিরগিটি ও আগে দেখেনি। এত রঙের ছোঁয়াও ছিল না ওদের শরীরে। একবার মনে হচ্ছিল গিরগিটিটাকে ধরে মাথায় বসায়। কিন্তু চাইলেই তো আর জঙ্গলের প্রাণী ধরা যায় না। গিরগিটির গলার কাছটা ক্রমাগত ওঠানামা করছিল।

শুকনো পাতা ভাঙার আওয়াজ কানে আসতে ঘোর ভাঙে ভুকুর। দেখে এক দঙ্গল শুয়োর চুপ করে দাঁড়িয়ে ওদের দেখছে। শুধু একটা শূকরছানা দৌড়ে বেড়াচ্ছে। পাতা ভাঙার শব্দ উঠছে শূকরছানার দৌড়াদৌড়িতে। না-হলে আর কোনও শব্দ নেই। পুরো জঙ্গল যেন তপস্যায় মগ্ন।

জলের ধারার ও-পাশ থেকে একটা মট করে শব্দ হল। ভুকু চমকে তাকিয়ে দেখে, গাছের ফাঁকে একটা হাতির বাচ্চা শুঁড় উঁচু করে ওদের দিকে তাকিয়ে কান দোলাচ্ছে। আর তার পেছনে একটা দাঁতাল নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে। খানিক দূরে আরও অনেক হাতি।

রুস্নিও চুপ করে দেখেছে হাতির পালটাকে। হাতির পাল দেখে ভুকুর মনটা আনন্দে ভরে উঠল। আগে ওদের গ্রামের কাছে অনেক হাতির পাল আসত। কয়েকটা হাতির সঙ্গে রীতিমতো বন্ধুত্ব হয়ে গেছিল ওর। জঙ্গলে ঢুকে ও মুখের সামনে দু-হাত তুলে হাতির মতো করে ডেকে উঠত। কাছাকাছি হাতির পাল থাকলে ওদের দলের থেকেও সাড়া আসত। তারপর হাতির পালের মাঝে ঢুকে ওদের গায়ে শুঁড়ে হাত বোলাত ভুকু। গ্রামের লোক আর স্কুলের বন্ধুরা ভাবত, ভুকু জন্তুজানোয়ারের ভাষা জানে। ভুকু একটা ভাষাই জানে, ভালোবাসার ভাষা। আর ভালোবাসার ভাষাই ওকে জন্তুজানোয়ারের বন্ধু করে তুলেছিল।

ভুকুর অজান্তেই মুখের দু-পাশে হাত দুটো উঠে গেছিল। হাতির মতো ডেকে উঠতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল।

রুস্নির হাতে উঠে এসেছে ওর বাঁশি। বাঁশির মাহাত্ম্য ভুকু জানে। বাঁশির সুর শুনে ঘুমিয়ে পড়বে হাতির দল। রুস্নি বাঁশিতে ফুঁ দেবার আগেই ইশারায় বারণ করল ভুকু। তারপর রুস্নিকে কিছু বলার আগেই নালা পেরিয়ে চলে গেল হাতির দলের কাছে। আর সামলাতে পারেনি নিজেকে, ছোটোবেলার কথা মনে পড়ে গেছে ওর। মুখের সামনে দু-হাত নিয়ে হাতির মতো ডেকে উঠল ভুকু। ওর আওয়াজ শুনে হাতির পাল একসঙ্গে আওয়াজ করে উঠল। হরিণের পাল দৌড়ে পালিয়ে গেল। পালের গোদাটা শুঁড় তুলে এগিয়ে এসে ভুকুর সামনে দাঁড়াল। কান দুটো ক্রমাগত নড়ছে হাতিটার। ঘনঘন ডাক ছেড়ে চলেছে হাতিটা।

ভুকু আস্তে আস্তে করে হাতিটার লম্বা লম্বা পায়ে হাত বোলাতে লাগল। হাতিটার শুঁড়ে পেঁচিয়ে ধরল ভুকুকে। তারপর খানিক শূন্যে তুলে ধরে রেখে নামিয়ে দিল নীচে। ভুকু এগিয়ে গেল পালের দিকে। ও বুঝে গেছে, আর ভয় নেই।

***

হঠাৎ করেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। ক্যাম্পে ফিরতে ফিরতে অনেক দেরি হয়ে গেছে ভুকুদের। রুস্নি সাবধানে সবুজ ফুল রাখা প্লাস্টিকের বাক্সটা ক্যাম্পের ঠিক মাঝখানে একটা ছোটো গর্ত খুঁড়ে পুঁতে রেখেছে। ভীষণ সাবধানী ও।

দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে কালকের যাত্রার সব আয়োজন একবার খুঁটিয়ে দেখে নিচ্ছিল ভুকু। সবই প্যাক হয়ে গেছে, শুধু সোলার ব্যাটারি চার্জার আর স্যাটেলাইট ফোনটা প্যাক হয়নি। কাল সকালে নৌকোয় তুলে নিলে হবে। কিন্তু স্বামী একটা লোহার শক্ত তার দিয়ে যে কয়েকটা বড়শি বানিয়েছিল সেগুলো ঠিক হয়নি। বড়শির নীচের বাঁকটা এত বেশি হয়ে গেছে যে তা দিয়ে বড়ো মাছ আটকাবে না। ওকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, ওর কাছে যা যন্ত্রপাতি আছে তা দিয়ে বড়শি বানানো সম্ভব নয়।

ক্যাম্পে ফেরার পর থেকে রুস্নি একমনে কতগুলো গাছের ডাল নিয়ে কী যেন বানাচ্ছিল অনেকক্ষণ ধরে। খানিক আগে আবার কাহুকে নিয়ে জঙ্গলে ঢুকে গাছের অনেক সরু লতা নিয়ে এসে বান্ডিল বানিয়ে রেখেছে। সন্ধের আগে আগে একটা কাঠের টুকরো নিয়ে এসে ভুকুর হাতে দিয়ে বলল, “এটা দেখো, বড়ো মাছ ধরার বড়শি। কুমিরও ধরতে পারবে।”

কাঠের টুকরোটা হাতে নিয়ে চমকে উঠল ভুকু। কী অসাধারণ হাতের কাজ! বাংলার গ্রামে যে লোহার শলা দিয়ে মাছ গেঁথে তোলে, অনেকটা ঠিক ওইরকম। কাঠটার দু-দিকে বড়শির মতো ফলা। দু-ফলা আঁকশি। শুধু খানিক মোটা। লম্বা ডাণ্ডাটার মাথায় একটা সরু ফুটোও আছে সুতো বাঁধার জন্য। ভুকু জড়িয়ে ধরল রুস্নিকে। এরকম মাস্টারপিস লোক সে কমই দেখছে আগে।

রুস্নি মুখের সামনে ভুকুর হাতির ডাকের ভঙ্গিতে জড়ো করা হাতের মতো হাত করে বলে উঠল, “ইউ আর মাস্টার।”

নৌকায় মালপত্র ভরতি করে ওরা যখন রওনা হল তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। ক্যাম্পে অনেক বিস্কুট আর চকোলেট ছিল, তার অনেকটাই ভুকু আলাদা করে একটা বস্তায় প্যাক করিয়েছে গ্রামের মোড়লকে উপহার দেবে বলে।

স্বামী আর নায়ার চুপ করে নৌকোর এককোণে বসে আছে। আর রোহিত ওদের বোঝাবার চেষ্টা করছে যে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এতগুলো লোক ওরা, তাছাড়া সঙ্গে বন্দুক আর গুলিও আছে যথেষ্ট।

কাহু নৌকোর হাল ধরে গুনগুন করে সুর ভেঁজে যাচ্ছে। সুরটা অনেকটা বাংলার ভাটিয়ালি গানের ধাঁচের। মুখের ভাষা আলাদা হলেও মনের ভাষা তো সব জায়গায় এক। মনে মনে বলে ভুকু।

এই নদীপথ ভুকুদের চেনা। দু-দিন আগেই এই নদী বেয়ে গেছে ওরা। এর আগের দিন ভালো করে লক্ষ না করলেও আজ ভুকু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল নদীর দু-পাড়। অধিকাংশ জায়গায় নদীর কিনারা বেশ খানিকটা উঁচুতে। নৌকায় বসে কিছুই দেখা যায় না। শুধু বড়ো বড়ো গাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে নদীতটের খানিক দূর থেকে। একজায়গায় নদীর বাঁদিকে খানিক ঢালু পাড়। কাদাভরা পাড়ের ওপর দিয়ে গাছের গুঁড়ির মতো কিছু টেনে নিয়ে যাবার ছাপ স্পষ্ট। কতগুলো ছোটো ছোটো টিলা আর বোল্ডারে ভরতি জায়গাটা। কিন্তু গাছের আধিক্য কম। দু-একটা প্রায় ন্যাড়া গাছ দেখা গেল দূর থেকে। জায়গাটাকে ঘিরে রেখেছে নদীটা। একটা পাথুরে দ্বীপ হয়ে আছে জায়গাটা।

একটু এগোতেই পাথুরে দ্বীপটার উলটোদিকে নজরে এল খাড়া নদীর পাড়ে একটা বাঁশের ডগায় একটা সাদা কাপড়ের টুকরো পতাকার মতো উড়ছে। গত পরশু এইটা নজর এড়িয়ে গেছিল। কাহুকে বোট থামাতে বলল ভুকু। ঠিক তখনই রুস্নির নদীর জলে ফেলে রাখা কাঠের দোফলা বড়শি ঘিরে মাছের টুকরো বেঁধে রাখা গাছের লতার দড়িতে এক ঝটকা লাগল। আচমকা টানে প্রায় জলে টলে পড়তে পড়তে কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিল রুস্নি। জলে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছিল।

কাহু নদীর পাড়ে বোট ভেড়াতেই নৌকো থেকে গাছের লতা পাকানো দড়ির বান্ডিল পাড়ে ছুড়ে লাফ দিয়ে নৌকা থেকে নামল রুস্নি। নৌকা থেকে নেমে রুস্নির লতা-দড়িতে হাত লাগিয়েছে ভুকু আর রোহিত। তিনজনে মিলে ধরে রাখতে পারছে না দড়িটা। এত বড়ো কী মাছ হতে পারে? নাকি জলের দানো ধরা পড়েছে?

কাহু বোটটাকে নদীর পাশে একটা কাঠের ছোটো খুঁটি মাটিতে পুঁতে তাতে বেঁধে জলের ধারে হাতে পারাং নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। উত্তেজনায় কাঁপছিল সে। নায়ার হাতে বন্দুক তুলে চেষ্টা করছিল নদীর যেখানে জল উথালপাতাল করছিল, সেদিকে তাক করতে। স্বামী সমানে ‘শুট নায়ার, শুট” বলে চিল্লিয়ে চলেছিল।

একটা আসুরিক শক্তি নদীর মধ্যে টেনে নেবার চেষ্টা করছিল লতার দড়ি ধরে থাকা তিনজনকে। লম্বা লতা ছাড়তে ছাড়তে প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। প্রচণ্ড ঝাঁকুনি আর টানেতেও ছিঁড়ে যায়নি পাতলা কাঁচা লতা।

রুস্নি সমানে চিৎকার করে বলে চলেছে, “এ নদীর দানো না হয়ে যায় না। কোনোভাবেই ছাড়া যাবে না।”

দানোটা দু-বার জলের ওপরে ঘাই মেরেছে। একটা পিপের মতো মুখ নজর এড়ায়নি ভুকুর। অনেকটাই মোড়লের বলা জন্তুর মতো মুখ। তবে কি এটাই নদীর দানো? সে যাই হোক, জন্তুটাকে জ্যান্ত বা মৃত ধরতে পারলে নদীর পাড়ের মানুষগুলোর আতঙ্ক দূর হত।

জলের ওপরতলটা খানিক লাল হয়ে উঠেছে। জন্তুটা বড়শির খোঁচায় খানিক ক্ষতবিক্ষত হয়েছে বোধ হয়। ওর দিক থেকে টানটা খানিক কমে এসেছে। জলের ওপর কতগুলো সারি সারি দাঁতওয়ালা একটা মুখ ভেসে উঠেছিল ক্ষণিকের জন্য।

তিনজনে মিলে আস্তে আস্তে লতায় টান দিয়ে বড়শিতে বাঁধা জন্তুটাকে টেনে নিয়ে এসেছে প্রায় পাড়ের কাছে। জন্তুটার চেহারার আভাস পাওয়া যাচ্ছে ঘোলা জলে।

আবার একটা ঘাই মেড়ে হু হু করে জন্তুটা ছুট লাগাল। এক ঝটকায় গোছ বাঁধা জলে ভেজা লতাগুলো প্রায় ছিটকে গেছিল হাত থেকে। কাহু হাতের দা ছুড়ে ফেলে শেষ মুহূর্তে হাত না লাগালে জলের জন্তু জলেই থেকে যেত।

আবার জন্তুটাকে পাড়ের দিকে টেনে নিয়ে আসা শুরু হল। কাহু লতা ছেড়ে আবার ওর লম্বা হাত-দা পারাং নিয়ে জলের কিনারায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি কোনও কারণে জন্তুটা ছিটকে পাড়ে উঠে আক্রমণ করে, তাহলে পারাংয়ের এক ঘা বসিয়ে দিতে পারবে। একসময় এই পারাংয়ের এক এক কোপে ওর পূর্বপুরুষরা মানুষের মাথা নামিয়ে দিত।

জন্তুটা এবার যে কাবু হয়ে পড়েছে তাতে ভুল নেই। জলের ওপর ভেসে উঠেছে জন্তুটার পাখনা। লেজটা ঝাপটা মেরেছে বার কয়েক। আর যাই হোক, জন্তুটা যে বিশাল বড়ো কোনও মাছ তাতে ভুল নেই। ডলফিন তো নয়ই। কারণ, ডলফিনরা একজায়গায় দলবেঁধে থাকে। একটাও ডলফিন জলের ওপর লাফিয়ে ওঠেনি। তাছাড়া সম্ভবত এই দানো বা মাছটার উপস্থিতি টের পেলে জলের অন্য প্রাণীরা দূরে সরে যায়।

মাছটা জলের পাড়ে এসে আটকাতে জলে নেমে পড়েছে রুস্নি আর কাহু। নৌকোর ওপরে নায়ার আর স্বামী চিৎকার শুরু করে দিয়েছে— “খতম, খতম, মনস্টার খতম।”

এলিয়ে পড়া মাছটাকে দুজনে মিলে ডাঙায় তুলতে হিমশিম খাচ্ছে দেখে রোহিতকে লতাটা টেনে রাখতে বলে ভুকুও নেমে পড়েছে জলে। ভালো করে দেখে বুঝল, এটা একটা ক্যাটফিশ। কিন্তু এত বিরাট ক্যাটফিশ বোর্নিওর নদীতে এল কী করে? বছর কয়েক আগে নেপাল আর ভারত সীমান্তের কাছে কালিগঙ্গা নদীতে এক বিশাল ক্যাটফিশ ধরা পড়াতে হুলুস্থুল পড়ে গেছিল বিশ্বজুড়ে। গুজব রটেছিল, সেই মাছটা নাকি জলে নামা অনেক লোককে খেয়েও ফেলেছিল। যদিও তার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফুট দশেক মতো লম্বা মাছটার তিনশো কেজি ওজন ছিল। ভুকুর স্পষ্ট মনে আছে, দ্য টাইমসে পড়েছিল খবরটা।

কাছাকাছির মধ্যে এত বড়ো ক্যাটফিশ একমাত্র থাইল্যান্ডের মেকং নদীতে পাওয়া যায় বলে একটা বিজ্ঞান পত্রিকায় পড়েছিল ভুকু। কী করে এই নদীতে এত বড়ো ক্যাটফিশ এল ভেবে লাভ নেই। মাছটা এখনও মরেনি। ওর মুখের কাছ থেকে লতাটা কেটে মাছটাকে ছেড়ে দিতে বলল ভুকু। বড়শিটা গলার এত ভেতরে গেঁথে আছে যে বের করা সম্ভব নয়।

মাছটাকে ছেড়ে দেবার কথা শুনে লাফিয়ে উঠল রুস্নি। জলের দানো ধরা পড়েছে আর তাকে কিনা মাস্টার ছেড়ে দিতে বলছে? তাছাড়া এই মাছটা ওই গ্রামে নিয়ে গিয়ে মাছের লোভ দেখিয়ে জঙ্গলের ভেতর ঢুকে বসে থাকা লোকগুলোকে টেনে গ্রামে ফেরত নিয়ে আসা যাবে। তারপর জঙ্গলে কাঠ কাটার লোকের অভাব আর থাকবে না।

ভুকু বোঝাল, “মোড়লের কথা মনে করে দেখো, দানোটা ডাঙায় উঠে এসে ওর শিকার ধরেছিল। কোনও মাছ ডাঙায় উঠে আসতে পারে না। এটা আর যাই হোক জলের ওই দানোটা নয়। একে ছেড়ে দেওয়াই উচিত। আমরা তো আর শিকার করতে আসিনি। অযথা রক্তপাত আমার পছন্দ নয়। তাছাড়া এই মাছাটাকে দেখে যদি ওরা ধরে নেয় নদীর দানো ধরা পড়েছে, তারপর নদীর সত্যি দানো এসে কাউকে মেরে ফেলে, তাহলে কী হবে? ভেবে দেখো। বাকিটা এবার তোমাদের ইচ্ছে।”

খানিক থম মেরে দাঁড়িয়ে রুস্নি বলে উঠল, “ঠিক আছে মাস্টার, মাছটা ছেড়ে দিচ্ছি, কিন্তু বাঁচলে হয়।”

সবাই মিলে মাছটাকে খানিক গভীর জলে ঠেলে দিল। খানিক পর আর দেখা গেল না মাছটাকে।

নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে শুধু খুঁটির মাথায় পতপত করে উড়তে থাকা নিশানটাই নজরে আসছিল। মাছ অনেকটাই সময় কেড়ে নিয়েছে। পাড়ে না উঠলে ওখানে কী আছে বোঝা যাচ্ছে না।

একটু হাঁটাহাঁটি করতে নদীর খাড়া পাড়ে একটা পায়ে হেঁটে ওঠার মতো ঢাল নজরে এল ভুকুর। সেটার দিকে আঙুল দেখাতেই রুস্নি তরতর করে সেই ঢাল বেয়ে উঠে হারিয়ে গেল।

ঢালটার কাছে দাঁড়িয়ে ওপরে উঠবে কি উঠবে না ভাবছিল ভুকু। রোহিতও পিছনে এসে দাঁড়িয়েছিল।

“ভুকু, তুই শিওর, ওই মাছটা নদীর দানো ছিল না? দেখেছিস তো ওটার মুখটা তেলের পিপের মতো লাগছিল!” বলে রোহিত।

“আমি শিওর। প্রথমত, অত বড়ো মাছ নদীর ঢালু পাড়ের কাছে কখনোই আসবে না। দ্বিতীয়ত, মোড়ল জোর দিয়ে বলেছেন, দানোটা পাড়ে উঠে মুখে করে শিকার ধরে নিয়ে গেছে।”

“কুমির না তো? যে-নদীতে এত বড়ো মাছ থাকতে পারে, সে-নদীতে একটা বিশাল মাপের কুমির থাকতেই পারে। আর কুমির তো পাড়ে উঠে রোদ পোহায়। চুপচাপ কাঠের গুঁড়ির মতো হয়তো পাড়ে ঘাপটি মেরে পড়ে ছিল, যেই শিকার কাছে এসেছে কপ করে মুখে তুলে নিয়ে জলে ডুব দিয়েছে।”

“না রে, ব্যাপারটা এত সহজ নয়। এরা জল-জঙ্গলের বাসিন্দা। এদের জন্তুজানোয়ার চিনতে ভুল হবে না। একটা রহস্য কোথাও আছে, ধরতে পারছি না।”

“প্রায় বারোটা বাজতে চলল, ওই গ্রামে পৌঁছে রাতে থাকার ব্যবস্থা সারতে হবে। দেরি না হয়ে যায়। ওপরে উঠবি নাকি ভুকু?”

রোহিতের কথা শেষ হতে না হতেই শোনা গেল রুস্নির গলা।— “এম্পটি ভিলেজ, মাস্টার। টোটালি এম্পটি ভিলেজ।” বলতে বলতে নদীর পাড় বেয়ে নেমে এল রুস্নি।— “একটা কুকুর পর্যন্ত গ্রামে নেই, মাস্টার। দানোর ভয়ে সব পালিয়েছে।”

“এরকমই আশা করেছিলাম। নদীর অন্য পাড়টা কীরকম সমতল দেখেছ, ‘এক পাড় উঁচু তার নীচু তার পাড়ি।’ নদীর ধারের কাদায় ওরকম চওড়া হেঁচড়ানোর দাগগুলো কীসের হতে পারে বলে তোমার মনে হয় রুস্নি? নদী এখানে চওড়া না হলেও দেখো অন্য পাড়টাকে বেড় দিয়ে রেখেছে বলে মনে হচ্ছে। একটা পাথুরে দ্বীপ বনে আছে জায়গাটা। একবার স্যাটেলাইট ফোনের কানেকশন দিয়ে গুগলে জায়গাটার এরিয়াল ভিউ দেখার চেষ্টা করতে হবে।” একটানা কথা বলে খানিক থামল ভুকু।

রুস্নি কপালে হাত ঠেকিয়ে আলোকে খানিক আড়াল করে অন্য পাড়টা দেখতে লাগল। কাদার ওপরকার দাগটা নিঃসন্দেহে কিছু টেনে নিয়ে যাবার দাগ।

“মাস্টার, মনে হয় গ্রামের লোকেরা লগ টেনে তুলে দ্বীপের ভেতর জমা করেছে।” রুস্নি বলে।

“তাই কি? ভালো করে দেখো রুস্নি, ওই দাগের পাশে পায়ের চিহ্ন নেই। লগ টেনে তুলতে অনেক লোক লাগে।”

“স্যার, তবে কি ওটা দানোর…”

“ডোন্ট নো রুস্নি, লেটস মুভ।”

***

মোড়ল ও গ্রামের অবশিষ্ট ক’জন বৃদ্ধ ভুকুদের জন্য অপেক্ষা করছিল নদীর ধারে। ওদের নৌকো ভিড়তেই দু-হাত মাথার ওপর তুলে অনেকটা আশীর্বাদের ভঙ্গি করে মোড়ল বললেন, “তোমাদের জন্যই দাঁড়িয়ে আছি। আজকে ভোরে দানোটা এসেছিল। জলের বাইরে খানিক মুখ বাড়িয়ে বসে ছিল অনেকক্ষণ। তারপর ডুব মেরে যে কোন দিকে গেল বুঝতে পারিনি। তবে হলফ করে বলতে পারি, ওটা ড্রাগন না হয়ে যায় না। একসময় আমাদের দেশে অনেক ড্রাগন ছিল জানো তো। কোনোভাবে জঙ্গলের মাঝে বেঁচে ছিল একটা, সেটাই এসে সহজ খাবারের লোভ পেয়ে ঘনঘন আসছে শিকার ধরতে। লম্বা সরু জিভ বার বার বের করছিল মুখ থেকে। আমি একা নই, এরাও দেখেছে।” সাথীদের দিকে আঙুল দেখান মোড়ল।

ড্রাগন কথাটা শুনে থমকে দাঁড়ায় ভুকু। বোর্নিওর ড্রাগন নিয়ে সে বিশেষ কিছু শোনেনি। এয়ারপোর্টের বইয়ের দোকানে ড্রাগন নিয়ে একটা বইয়ের মলাট অবশ্য নজরে এসেছিল। ‘ড্রাগনস অফ কিনাবালু অ্যান্ড আদার স্টোরিস’ কভার দেখে ছোটোদের বই ভেবে আর উলটেপালটে দেখেনি। না-হলে এই ধরনের টপিকের বই পেলে সঙ্গে সঙ্গে কিনে নেয়। ড্রাগন আর ডাইনোসর নিয়ে নতুন ধরনের কোনও বই পেলে নিজের লাইব্রেরিতে রাখতে ছাড়ে না ভুকু। যতদূর মনে পড়ল, বোর্নিও পুরাণে ড্রাগন হল পাতালের দেবী। সবাইকে উনি রক্ষা করেন। তাই সেই ড্রাগন এসে লোকজন আর পশু মুখে নিয়ে চলে যাচ্ছে, এটা মিলছে না। কে জানে, নানা দেশে বিশেষ করে জঙ্গল-পাহাড়ের অধিবাসীদের মধ্যে নানা গল্প প্রচলিত, কতটুকুই-বা সে জানে।

“যেখানে দানোটা এসেছিল সেই জায়গাটা দেখাতে পারবেন?” ভুকু মোড়লকে বলে।

“কেন পারব না? ওই তো ওই জায়গাটায়। এসো আমার সঙ্গে।”

ভুকুদের নৌকাটা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখান থেকে মিটার তিরিশ দূরে ভুকুকে নিয়ে দাঁড় করালেন মোড়ল।— “এই দেখো, এখানে কাদাতে মুখ রেখে জলে শরীরটা ডুবিয়ে অনেকক্ষণ বসে ছিল দানোটা। আমি নিশ্চিত, ওটা জল-ড্রাগন না হয়ে যায় না। আমার ঘরে এসো একটা ড্রাগন দেখাব— মোটা মুখ, লম্বা জিভ, গিরগিটির মতো দেখতে চার পাওয়ালা। মায়ের করা কাপড়ের ওপর সুতোর কাজ।”

“আপনাদের বংশে কেউ ড্রাগন দেখেছে?”

“না হে, কেউ দেখেনি। সব কিছু কি দেখা যায়? ঈশ্বরকে কি কেউ দেখেছে? দেখেনি। তাহলে কি ঈশ্বর নেই? আমি জানি কেন তুমি এ-কথা বলছ। ভাবছ, জঙ্গলের লোক কী করে কাপড়-সুতোর কাজ শিখল। আমার মা মিশনারিদের কাছ থেকে সুতোর কাজ করা শিখেছিল, ওরা গ্রামে এসে শিখিয়ে যেত। ওরাই নানা উপকথার কথা শোনাত, আর সেই শুনে করা হাতের কাজ কে কতটা শিখল তার পরীক্ষা হত। বুঝলে?”

ভুকু টের পায়, কেউ ড্রাগন দেখেছে কি না— এই প্রশ্নটা মোড়ল ভালোভাবে নেননি। কিন্তু এতে জানা গেল যে এখানে মিশনারিরা শিক্ষাদানের কাজ চালিয়েছে বা চালায়।

মোড়ল যে জায়গাটায় দানোটা দেখেছিলেন, সেই জায়গার কাদা ভালো করে পরীক্ষা করে কোনও পায়ের দাগ দেখতে পেল না ভুকু। যদি প্রাণীটা বিশাল মাপের কুমিরও হয় তাহলে কাদাতে পায়ের ছাপ থাকত। ভেজা মাটিতে এত তাড়াতাড়ি ছাপ মেলানোর নয়। তাছাড়া কুমির হলে এরা ঠিক বুঝতে পারত। শুধু একটা জিনিস ভুকু কিছুতেই মেলাতে পারছে না, পিপে বা ড্রামের মতো মোটা শরীর। আবার গায়ে আঁশ আছে। ড্রাগনের গায়ে আঁশের মতো চামড়া থাকে, এটা পৌরাণিক ছবিতে সে দেখেছে। কী হতে পারে জন্তুটা?

নৌকা থেকে সব মালপত্র নামানো হয়ে গেছিল। ভুকু চাইছিল নদীর ধারে তাঁবু খাটিয়ে থাকতে, তাতে দানোটা এলে টের পাওয়া যাবে। কিন্তু মোড়ল কিছুতেই নদীর কিনারায় তাঁবু খাটাতে দিলেন না। শুধু তাই নয়, বললেন গ্রামে খালি ঘর আছে, সেখানেই থাকতে হবে ওদের, তাঁবু খাটানোর প্রয়োজন নেই। ওরা গ্রামের অতিথি, তাই ওদের নিরাপত্তার দায়িত্বও গ্রামের লোকেদের। মোড়ল ইতোমধ্যেই জঙ্গলের গভীরে এক বুড়োকে পাঠিয়েছেন কমবয়সি পুরুষদের ফিরে আসতে।

নৌকাটা নদীর ধারে শক্ত এক কাঠের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রুস্নি, মাঝি কাহু, নায়ার আর স্বামী মিলে হাতে হাতে মালপত্র নিয়ে তুলছিল গ্রামের ভেতর।

“আচ্ছা, এখান আসার পথে নদীর ধারে একটা গ্রাম দেখেছিলাম, যার বাইরে একটা সাদা কাপড়ের নিশান বাঁশের মাথায় উড়ছিল…”

ভুকুর কথা লুফে নেন মোড়ল।— “ওই গ্রামে এখন আর কাউকে পাবে না। সবার আগে ওই গ্রাম থেকেই মানুষ খেয়েছিল দানোটা। মাত্র দুটো পরিবার থাকত ওখানে।”

কপালে ভাঁজ পড়ে ভুকুর। ওই গ্রামটা খুব একটা কাছে নয়। মানে দানোর আক্রমণের পরিধি অনেকটা জায়গা জুড়ে। একটা বিষয়ে নিশ্চিন্ত, দানোটা জল ও ডাঙায় অবাধে চলতে পারে।

“ওই গ্রামের উলটোদিকে একটা পাথুরে দ্বীপ দেখেছি।”

“তোমাদের কোম্পানির আগে যারা এই জঙ্গল থেকে কাঠ কাটত, তারা ওইখানে গাছের গুঁড়িগুলো জমা করত, তারপর নদীতে ভাসিয়ে নিয়ে যেত।” রোহিতের দিকে তাকিয়ে বলেন মোড়ল।

“পাথুরে জমি হবার জন্য চাষ হয় না, তাই কেউ ওখানে থাকে না।”

চিন্তায় পড়ে ভুকু। কাদায় ভারী কিছু নদী থেকে ওপরে হেঁচড়ে ওঠার ছাপ স্পষ্ট। তবে কি রোহিতদের অগোচরে অন্য কোনও কোম্পানিও কাঠ কাটে এখানে? কাঠের চোরাকারবার চলে? তারপর মন থেকে চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলে। সরকারের সমস্যা, সরকার বুঝবে।

***

মোড়লের জন্য আনা উপহারগুলো ওঁর হাতে তুলে দিলেও, সেগুলো একপাশে সরিয়ে রেখেছিলেন উনি।— “আগে দানো মরুক, তারপর বড়ো উৎসব হবে। তখন সব খোলা হবে।”

মোড়লের কথাগুলো খুব ভালো লাগে ভুকুর। পাশাপাশি এটাও ভাবে, মোড়লমশাই ধরেই নিয়েছেন দানোর অত্যাচারের হাত থেকে ওরাই গ্রামবাসীকে বাঁচাতে পারবে। কতটুকুই-বা ক্ষমতা ওদের! দানোটা যে কী প্রকৃতির বা আকারের, সেটাই বোঝা যাচ্ছে না।

রাতে কাহু রেঁধেছিল ভাত আর মাছের ঝোল। মাছ যে কখন ধরেছিল কে জানে। খাওয়া হতে নদীর উঁচু পাড় ধরে রুস্নি আর রোহিতকে নিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছিল ভুকু। চাঁদনি রাত, আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারদিক। চাপচাপ সবজে অন্ধকার ভেদ করে ধোঁয়াটে সাদা রেখা চলে গেছে এঁকে-বেঁকে। নদীর জলের খানিক ওপরে জমে থাকা কুয়াশা বুঝিয়ে দিচ্ছিল জঙ্গলের মধ্যে ঠান্ডাটা ভালোই। মোটা জামাপাকড় পরে থাকায় ঠান্ডাটা খুব একটা টের পাচ্ছিল না ভুকুরা।

মোড়ল পইপই করে রাত্রে নদীর ধারে আসতে বারণ করেছিলেন ওদের। ওরা নদীর কিনারা থেকে দূরে থাকবে কথা দেবার পর মোড়ল শান্ত হয়েছিলেন। যতটুকু জানা গেছে, দানোর সব আক্রমণই হয়েছে ভোরের দিকে। তাই শেষ রাতের দিকেই দানোটা আসার সম্ভাবনা বেশি। পুরো দলটাকে নদী-পাড়ের নানা জায়গায় রাখতে চেয়েছিল ভুকু, কিন্তু নায়ার আর স্বামী একা থাকতে রাজি না হওয়ায় ওদের গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছিল। রোহিতের হাতে সঙ্গের বন্দুকটা ধরিয়ে দিয়েছিল ভুকু। রুস্নি বলেই দিয়েছিল, ওর নিজের অস্ত্র ওর জন্য যথেষ্ট। কাহু হাতে নিয়েছিল তার পারাংটা। ভুকু শুধু নিজের জন্য বড়ো টর্চটা রেখেছিল। ও নিশ্চিত ছিল, দানোটা নদী থেকে খুব একটা দূরে আসবে না।

বার বার মোড়লের একটা কথাই মনে আসছিল ভুকুর— ড্রাগন। সত্যি কি ড্রাগন আছে? যতদূর সে জানে, আজ পর্যন্ত ড্রাগন নামের প্রাণীর অস্তিত্ব পৌরাণিক কাহিনি ছাড়া আর কোথাও ধরা পড়েনি। ডাইনোসরের ফসিল পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া গেছিল এই বিশাল প্রাণীটির বিদ্যমানতার কথা। এই জাতীয় অনেক বিশালদেহী প্রাণী একসময় পৃথিবীতে ছিল, তা প্রমাণিত। এমনকি অনেকে বিশ্বাস করেন, এই জাতীয় প্রাণী পৃথিবীর অনাবিষ্কৃত কোনও অঞ্চলে লোকচক্ষুর আড়ালে এখনও বেঁচে থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু ড্রাগন শুধু রয়ে গেছে গল্পগাথায়। তবে কি সত্যি সত্যি ড্রাগন বেঁচে আছে এই গহিন জঙ্গলে? যদি সত্যিই তাই হয়, তবে বিজ্ঞানের এক নতুন অধ্যায় খুলে যাবে। উপকথা বলে, ড্রাগন মুখ থেকে আগুন ছোড়ে। ড্রাগন পূর্ব গোলার্ধের বহুদেশে পূজিত। ড্রাগনকে মূলত শুভ বলেই মানা হয়। চিন, জাপান, থাইল্যান্ড-সহ নানা দেশে যে-কোনো বড়ো উৎসবে ড্রাগন নাচ-সহ ড্রাগন কেন্দ্রিক নানা অনুষ্ঠান অপরিহার্য।

নদীর উঁচু পাড়ে দাঁড়িয়ে ঘুমের লেশমাত্র নেই ভুকুর চোখে। যদি সত্যি সত্যি ড্রাগন মানুষ মারার পেছনে থেকে থাকে তাহলে কোনোভাবেই সেটাকে মারা যাবে না, যেভাবেই হোক জ্যান্ত ধরতে হবে। কিন্তু দানোটা যে আসলে কী সেটাই বোঝা যাচ্ছে না। সঙ্গের বন্দুক দিয়ে যে দানোটা মারা যাবে না তা নিশ্চিত করে বলা যায়। সে বা রোহিত কেউই পেশাদার বন্দুক ছুড়িয়ে নয়, বন্দুক চালাতে পারবে মাত্র। রুস্নি তো বন্দুক ছুঁতেই চাইছে না। কাহু কতটা বন্দুকে ওস্তাদ তা জানা নেই। তাই ধরে নেওয়া যায়, দানোটা কাছে এলে বন্দুক দিয়ে শুধুমাত্র ওটাকে ভয় দেখানো সম্ভব।

সময়টা মে মাস হলেও রাতের জঙ্গলে ঠান্ডা জড়িয়ে থাকে বারো মাস। নদীর জলের ওপর সাদা ধোঁয়ার মতো কুয়াশা কালচে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এঁকে-বেঁকে চলে গেছে যতদূর নজর চলে। রোহিত মাটিতে পোঁতা একটা বাঁশে হেলান দিয়ে পাশে বন্দুক রেখে গায়ে চাদর জড়িয়ে ঘুমোচ্ছে। রুস্নি খানিক দূরে একটা ওলটানো নৌকোর পিঠের ওপর চেপে বসে শিস দিয়ে এক অদ্ভুত সুর ভাঁজছে। ভুকু রুস্নিকে বার বার করে বলে দিয়েছে ভুলেও সে যেন তার বাঁশি না বাজায়। দলের অন্য কেউ না টের পেলেও সে জানে বাঁশির সুরের জাদু। কোনও কারণে দলের সবাই ঘুমিয়ে পড়লেই হয়েছে। দানো এসে হয়তো নিঃশব্দে তাদেরই কাউকে তুলে নিয়ে যাবে। সবাইকে কাছাকাছি থাকতে বলে দিয়েছিল ভুকু, যাতে বিপদ এলে একসঙ্গে মোকাবিলা করা যায়। কাহুকে অনেকক্ষণ দেখতে পায়নি ভুকু। তবে এরা জঙ্গলের মানুষ, সহজে বিপদে পড়বে না।

পিঠে টোকা পড়তেই ঘুরে চমকে পেছনে ফিরে মোড়লকে দেখতে পেয়েছিল ভুকু। কখন যে মোড়ল নিঃশব্দে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, টের পায়নি সে।

“দানোটা আসছে।”

“কোথায়?”

“জলের ওপর ভালো করে দেখো, একটা রেখা এগিয়ে আসছে।”

সূর্যের হালকা হলদে আভা দেখা দিয়েছে পুব আকাশে। নদীর কুয়াশা ঢাকা জলতলে কিছুই নজরে আসে না ভুকুর।

“তোমার লোকেদের ডাকো। কেউ যেন নদীর ধারে না থাকে।”

মোড়লকে দেখে ওলটানো নৌকোর পিঠ থেকে নেমে এসেছিল রুস্নি। কাহুও এসে দাঁড়িয়েছিল চাপা অন্ধকার ফুঁড়ে। শুধু রোহিত গভীর ঘুমে ডুবে ছিল।

“বন্দুকটা কোথায়? ওটা আমায় দাও।”

মোড়লের কথায় রোহিতকে ঘুম থেকে তুলে ওর পাশে পড়ে থাকা বন্দুকটা নিয়ে আসে কাহু।

“তোমাদের দেখে তো মনে হয় না ভালো বন্দুক চালাতে পারো বলে। বন্দুকটা আমি নেব। বুড়ো হলেও তোমাদের থেকে আমার চোখের জোর অনেক বেশি। না-হলে জল কেটে যে কিছু আসছে সেটা টের পেতে।”

মোড়লের কথায় বন্দুকটা তাঁর হাতে তুলে দেয় ভুকু।

নদীর ধারে একটিও প্রাণী নেই। দানোটা কি তবে জল ছেড়ে ডাঙায় উঠবে শিকার খুঁজতে? নদীর কিনারা ধরে চলে বেড়ায় ভুকুর নজর। এখনও কিছু নজরে আসেনি তার।

“ওই দেখো।” মোড়ল আঙুল তুলে জল থেকে সামান্য দূরে পাড়ে তুলে রাখা কয়েকটা ডোঙার দিকে দেখান। কোনও ভুল নেই, একটা বড়ো কালো বর্শার ফলার মতো চ্যাপ্টা বস্তু জল থেকে কাদার ওপর নড়াচড়া করছে। পুরো শরীরটা যে জলে ডুবে তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। মনে মনে মোড়লের তারিফ না করে পারে না ভুকু। উনি না দেখালে দানোর অস্তিত্ব এত সহজে টের পেত না কেউ। আসল জঙ্গলের মানুষের ইন্দ্রিয় শক্তিই আলাদা।

“খাবার খুঁজছে। ডাঙায় উঠতে দাও দানোটাকে।” বলে ওঠেন মোড়ল।

“ঠিক বলেছেন, জন্তুটা যে কী সেটা আগে বোঝা দরকার। চেষ্টা করতে হবে জ্যান্ত ধরার।” ভুকু বলে।

“দানোর সঙ্গে অযথা সামনাসামনি লড়াই করার চেষ্টা না করাই ভালো। দূর থেকেই ওকে মারব। অনেক লোক মেরেছে দানোটা।”

“কিন্তু…” মোড়লের কথা শুনে প্রতিবাদ করতে গিয়েও নিজেকে সামলে নেয় ভুকু। এখন তর্কাতর্কি করে লাভ নেই। বরং দানোটা যে কী বস্তু সেটা দেখা দরকার।

বেশ খানিকক্ষণ ধরে কাদার ওপর স্থির হয়ে আছে জন্তুটার মাথাটা। রুস্নি একবার পাড় ছেড়ে নদীর জলের দিকে এগোবার মতলব করেছিল, কিন্তু মোড়লের হাতের ইশারায় সে-চেষ্টা করেনি। কুয়াশা ঘন হয়ে চেপে বসে আছে জলেও ওপর। সূর্যের তেজ না বাড়লে এই কুয়াশা কাটার আশা কম। পরিষ্কার বোঝা না গেলেও জন্তুটার মুখ দিয়ে যে একটা সরু বস্তু বার হয়ে এসে নড়ছে, এতে ভুল নেই।

“জিভটা দেখতে পাচ্ছ? এত বড়ো জিভ ড্রাগন ছাড়া আর কার হবে? আমার কথা মিলিয়ে নিও, এই জঙ্গলে এতদিন ড্রাগন লুকিয়ে ছিল…”

মোড়লের কথা কানে গেলেও অন্য কিছু ভাবে ভুকু। মিথিক্যাল বইতে ড্রাগনের যত ছবি দেখেছে বলে মনে পড়ে, সবক’টার মুখ ছুঁচলো, কিন্তু এটার মুখ নিঃসন্দেহে চ্যাপ্টা। এর থেকে পরিষ্কার আর কিছু দেখা যাচ্ছে না।

এক দমকা হাওয়ায় কুয়াশাটা পাতলা হয়ে যেতে আর কিছু দেখা গেল না। কালচে চ্যাপ্টা মুখটা যেন ঘন কুয়াশার সঙ্গেই মিলিয়ে গেছে। একটা বিষয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছিল ভুকু, নদীতে একটা এমন জন্তু আছে যা নিঃশব্দে এসে শিকার ধরে নিয়ে যায়।

হাতে ধরে থাকা রাইফেলটা রোহিতের জিম্মায় দিয়ে মোড়ল বলে ওঠেন, “দানোটা এখন আর আসবে না, চলো নদীর ধারে যাওয়া যাক।”

যেখানে দানোটা নদীর জল থেকে মাথা বের করে ছিল, সেই জায়গায় পৌঁছে ভুকু ভালো করে মাটি পরীক্ষা করে দেখে, কাদার ওপর প্রায় দু-ফুট চওড়া একটা হালকা তেকোনা দাগ। কপালে ভাঁজ পড়ে ভুকুর— যদি দানোর মাথাটা এত বড়ো হয় তবে শরীরটা না জানি কী বিশাল হবে! কিন্তু দানোটা যে দেখতে কীরকম সেটাই বোঝা যাচ্ছে না।

“মাস্টার, দাগটা ভালো করে লক্ষ করে দেখো, ঠিক ওই পাথুরে দ্বীপের কাদার ওপরকার দাগের মতো।” রুস্নি চাপা স্বরে বলে ওঠে।

“ঠিক বলেছ রুস্নি, আমরা যেগুলোকে গাছের গুঁড়ি টেনে তোলার দাগ ভেবেছিলাম, সেগুলো আসলে এই দানোটার শরীরের দাগ। তার মানে দানোটা জলে আর ডাঙায় দু-জায়গায় থাকতে পারে।” তারপর ভুকু মোড়লের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলে, “আর যাই হোক দানোটা ড্রাগন নয়। যদি আপনার মায়ের কাপড়ে সুতোর কাজ করা ড্রাগন হত, তাহলে কাদাতে পায়ের ছাপ থাকত। আমরা কোনও পায়ের ছাপ পাথুরে দ্বীপে দেখিনি। একবার আমাদের ওই দ্বীপে যেতে হবে, তবে তার আগে খানিক ঘুমিয়ে নেওয়া দরকার।”

***

ঘণ্টাতিনেক ঘুমিয়ে উঠে পড়েছিল ভুকু। মোড়ল না ডেকে তুললে অবশ্য ঘুম ভাঙত কি না সন্দেহ। যাতে ভুকুদের সঙ্গে ওই দ্বীপে না যেতে হয় সেই ভয়ে নায়ার আর স্বামী রান্নার ভার  নিয়ে নিয়েছিল। সবাইকে ডেকে তুলে তৈরি হয়ে নিতে বলল ভুকু। ডাল-চাল দিয়ে খিচুড়ি রেঁধে রেখেছিল নায়ার আর স্বামী, সবাই মিলে সেটা খেয়েই রেডি হয়ে নিয়েছিল।

ভুকু বারণ করলেও মোড়লও সঙ্গে যাবেন বলে জেদ ধরেছিলেন। রোহিত ভুকুকে বলল, “দেখ, ওঁকে সঙ্গে নেওয়াই ঠিক হবে। হাজার হোক উনি এই অঞ্চলের লোক, অঞ্চলটা ভালোভাবে চেনেন। চোখের দৃষ্টি তোর আমার থেকে অনেক বেশি। তা ছাড়া এই জঙ্গলে অনেক বিষাক্ত গাছপাতা আছে। এই বিষয়ে ওঁর জ্ঞান যে প্রচুর, তাতে ভুল নেই। না-হলে বেগুনি লতার সবুজ গাছের ছবি দেখে সেটার গুণ বা ভয়াবহতা আইডেন্টিফাই করে আমাদের সাবধান করতেন না।”

গ্রামের উপস্থিত কয়েকজন বুড়ো মানুষ আর নায়ার ও স্বামীকে বাদ দিয়ে সবাই মিলে ভুকুদের মোটর বোটে উঠেছিল। এক ব্যারেল ভরতি তেল রাখা আছে নৌকোর ওপর। হাজার কিলোমিটার চললেও শেষ হবে না।

সাদা পতাকা ওড়ানো গ্রামের কাছে পৌঁছতে মোড়ল বললেন, “উলটোদিকের দ্বীপের কাছে চলো, কিন্তু পাড়ে ভেড়াবে না।”

বোটম্যান কাহু নৌকার ইঞ্জিন বন্ধ করে নোঙর ফেলার তোড়জোড় শুরু করতে মোড়ল বাধা দিয়েছিলেন— “ইঞ্জিন বন্ধ করে ভাসতে থাকো, দানোটা দেখা গেলে ইঞ্জিন চালিয়ে সোজা ছুট লাগাবে। দানোটা খুব বেশি জোরে ছুটতে পারে বলে মনে হয় না।”

ভাসতে ভাসতে নৌকোটা জলের টানে দ্বীপ থেকে অনেকটাই দূরে চলে গেছিল। মোড়ল পেছনের দিকে মুখ করে পাথুরে দ্বীপটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন অনেকক্ষণ ধরে। হঠাৎ বললেন, “কাহু, নৌকোটা দ্বীপে ভেড়াও। সবার নামার দরকার নেই, আমি একাই নামব বন্দুক নিয়ে। শত হলেও তোমরা আমার অতিথি, তোমাদের বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারব না।”

নৌকা থেকেই দেখা যাচ্ছিল নদীর ঢালের কাদার ওপর চওড়া ঘষটানোর দাগ। ভারী মসৃণ কিছু টেনে তোলার চিহ্ন। দানোটা যে এই দ্বীপেই থাকে তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। নিছক অনুমানমাত্র। যেহেতু এই দ্বীপের কাছের গ্রামেই মানুষ মারার ঘটনা প্রথম হয়েছিল, তাই ধরে নেওয়া যায়, হয়তো এই নির্জন দ্বীপেই দানোটা ডেরা বেঁধেছে। মনে মনে ভাবে ভুকু, এই নদী-জঙ্গলের কোথায় যে দানোটা লুকিয়ে আছে সেটা খুঁজে বের করা অসম্ভব। দানোটা যে কী, সেটা বুঝতে পারলেও ওর বাসস্থান নিয়ে খানিকটা আন্দাজ লাগানো যেত। দ্বীপে নামলে অন্তত এটা পরিষ্কার হবে যে এটা বেআইনি কাঠ পাচারকারীদের আস্তানা কি না।

ভুকু মোড়লকে একা ছাড়েনি। রুস্নিও তার দোফলা ছুরিটা হাতে নিয়ে লাফ দিয়ে নেমেছিল। কাহু পারাংটা হাতে নিয়ে লাফ দিতে যাবে, তখন ভুকু বলে ওঠে, “সবার একসঙ্গে দ্বীপে না যাওয়াই ভালো। তুমি আর রোহিত বোটে থাকো, সেকেন্ড লাইন অফ ডিফেন্স হিসেবে। আমরা বিপদে পড়লে চিৎকার করে তোমাদের ডাকব। বোট রেডি রাখবে যাতে কোনও বিপদ হলে সঙ্গে সঙ্গে বোটে চেপে পালানো যায়। জানা তো নেই দানোটা কীরকম, ছুটে তাড়া করতে পারে কি না!”

পাড়টা নরম হলেও প্যাচপ্যাচে কাদার নয়। নরম মাটিতে পা বসে গেলেও আটকে যাচ্ছিল না। তাই মাটির গভীরে বসে থাকা দাগ ভুকুকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। কত ভারী বস্তু ভেজা বালিমাটির ওপর দিয়ে গেলে ওইরকম গভীর দাগ হতে পারে। মোড়ল হুকুম দিয়েছিলেন, ওঁর আগে আগে যেন কেউ যাবার চেষ্টা না করে।

ঢালু পাড়টা পার হয়ে ওরা তিনজন গিয়ে দাঁড়িয়েছিল দ্বীপের ওপর। চারপাশে বড়ো বড়ো পাথর আর ছোটো ছোটো ঝোপঝাড়। পাড় থেকে প্রায় একশো মিটার দূরে একটা লম্বা গাছ। এই গাছটা ছাড়া আর কোনও বড়ো গাছ নেই দ্বীপটায়। বড়ো বড়ো পাথরগুলো এমনভাবে একটার সঙ্গে লেগে দাঁড়িয়ে আছে যে সেখানে কিছু থাকলেও দুর থেকে কিছু বোঝার উপায় নেই। কয়েকটা কাঠের গুঁড়ি পড়ে আছে এদিক ওদিক। তার ওপর হয়ে থাকা লতাপাতার ঝোপ দেখে বোঝা যায়, এগুলো বহুকাল ধরে ওখানে রয়েছে। একটা বিষয়ে নিশ্চিত যে কোনও বেআইনি কাঠ কারবারিরা এখানে নেই। ‘তাহলে ধরে নেওয়া যায়, দানোটা এখানে আসে বা থাকে।’ মনে মনে ভাবে ভুকু।

অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা ছাড়া আর কিছু নেই দ্বীপটাতে। কোনও পাখি নেই, বড়ো গাছপালা নেই, ফুল নেই; এমনকি বাতাস বইবার শব্দও নেই। তিনজনে মিলে হাঁটতে হাঁটতে লম্বা গাছটার প্রায় কাছে চলে এসেছিল, এমন সময় মোড়ল ঘুরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ওঠেন, “পালাও! ছুট লাগাও নৌকার দিকে। জলদি!”

ভুকুদের দ্বীপের ঢাল বেয়ে নামতে দেখে ইঞ্জিন চালু করে দিয়েছিল কাহু।

“দানো তাড়া করেছে নাকি?” মুখের সামনে দু-হাত জড়ো করে চেঁচিয়ে ওঠে রোহিত।

নৌকার কাছে পৌঁছে মোড়ল বলেন, “দানো আছে, দানো আছে। সম্ভবত এই দ্বীপেই। দানোটা যে কী জানি না, কিন্তু দানো এল কী করে জানি।”

সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মোড়লের দিকে। বলে কী জঙ্গলের বুড়ো মানুষটা!— দানোটা কী না জানলেও দনোটা এল কী করে জানে!

“আগে এই জায়গাটা ছেড়ে সরে পড়া দরকার। তাড়াতাড়ি নৌকায় ওঠো, গ্রামে ফেরা যাক।”

***

গ্রামে ফেরার আগে পর্যন্ত সারাটা সময় নৌকোয় চুপ করে বসে ছিলেন মোড়ল। ভুকুও ওকে ঘাঁটায়নি। যখন সময় হবে তখন নিশ্চয়ই নিজে থেকেই মুখ খুলবেন।

নৌকা থেকে সবাই নামলে মোড়ল বললেন, “যাও, সবাই গিয়ে খেয়েদেয়ে বিশ্রাম করো। দানোটা হয়তো আরও কিছুদিন জ্বালাবে। তারপর নিজেই…” বলে চুপ করে যান।

“নিজেই? কী বলতে চান আপনি? কিছুদিন খাবার না পেলে নিজেই এখান থেকে চলে যাবে, তারপর অন্য কোথাও গিয়ে ডেরা বাঁধবে?” রোহিত বলে ওঠে।

“দেখো, আমি শুধু আমার ধারণা কথা বলেছি। এটা ঠিক, বেশিদিন বড়ো খাবার ছাড়া ওই দানোটার টিকে থাকা মুশকিল। তবে নিশ্চিত নই।”

“সেই ধারণার কথাই বলুন না।”

প্রসঙ্গ ঘোরান বৃদ্ধ মানুষটি।— “তোমাদের ওই জায়গাটা থেকে টেনে বের করে নিয়ে আসার কারণ কী জানো? তোমরা হয়তো ভালো করে লক্ষ করোনি গাছটা। করলে দেখতে পেতে…”

“কী?” প্রায় চিৎকার করে ওঠে ভুকু।

“আমার ভুল হতে পারে। বয়স হয়েছে। তবে দানো এক বা একের বেশিও হতে পারে। সত্যিটা যে কী, সেটা আমরা কেউ জানি না। তবে দানোটা বা দানোগুলোকে মারার চেষ্টা করতে হবে, না-হলে গ্রামে লোকজনকে ফিরিয়ে আনা যাবে না। আমাদের নদীর ধারে যেতেই হবে, আর সেখানে গেলেই ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থেকে ও ওর খাবার জোটাবে।”

“তার মানে দানোটা কী আপনি আন্দাজ করতে পারছেন।” ভুকু বলে।

“না, এখনও নয়। ওই দ্বীপে একসময় কাঠ কেটে জড়ো করা হলেও, বহুবছর ধরে তা বন্ধ আছে। জঙ্গল থেকে কাঠের সঙ্গে অনেক বিষাক্ত প্রাণী এসে আস্তানা গেড়েছিল ওই দ্বীপে। বিষাক্ত মাকড়সা, বিছে এইসব আর কি। এগুলো এত ছোটো যে পাথরের ফাঁকে লুকিয়ে থাকলে টের পাওয়া যেত না। ওগুলোর কামড়ে বেশ কিছু লোক মারা গেছিল। কিন্তু এই দানোটা সেই গোত্রের নয়। এটা গিলে খায়। কামড়ে খেলে দ্বীপের মাঝে কিছু হাড়ের টুকরো পাওয়া যেতই।”

ভুকুর মাথা শ্রদ্ধায় নীচু হয়ে আসে। মোড়লকে যা ভেবেছিল, তার থেকে অনেক উঁচু ভাবনার মানুষ উনি। ভুকু মোটেই এত কিছু তলিয়ে দেখেনি।

প্রায় সন্ধে হয়ে এসেছে। সবাই চুপ করে একসঙ্গে গ্রামে ঢোকে। নায়ার ছুটে আসে ওদের দেখে জিজ্ঞেস করে, “ফাউন্ড দ্য মনস্টার?”

রোহিত বলে, “খুব খিদে পেয়েছে নায়ার, কিছু রেডি আছে নাকি?”

“রাইস অ্যান্ড দাল, স্যার। ইজ ইট ওকে?”

“খুব চলবে।”

মোড়ল নিজের ঘরে ঢোকার আগে বার বার করে কাউকে নদীর দিকে যেতে বারণ করে গেলেন। সঙ্গে এও বলে গেলেন, “একটা কথা নিশ্চিত করে বলতে পারি, ওই দানোটা ওর ভারী শরীর টেনে গ্রামে আসতে পারছে না। শরীর খুব ভারী বলেই আজ পর্যন্ত গ্রামের মধ্যে এসে আক্রমণ করেনি। যা করেছে সব নদীর ধারে। জলেতে ওর শরীর হালকা হয়ে যায়, ফলে সাঁতার কাটতে পারে।”

ভুকু মোড়লের যত অ্যানালিসিস দেখছে, ততই অবাক হয়ে যাচ্ছে। এটা ভালোই বুঝে গেছে, ওদের সাহায্য চাইলেও দানো বধের ‘লিড’ মোড়ল নিজেই নিয়ে নিয়েছেন। ভুকু ছোটোবেলায় যতই জঙ্গলের মাঝে বড়ো হোক, সে-জঙ্গল আর এই জঙ্গলে অনেক পার্থক্য। এটা শুধু জঙ্গল নয়, জল-জঙ্গল। এখানে বইয়ের বিদ্যা নয়, অভিজ্ঞতা পদে পদে কাজে লাগে।

***

পরদিন সকালে ভুকুর ঘুম ভাঙে ছাগলের ডাকে। সে আর রোহিত ঘুমিয়েছিল একই ঘরে। রোহিত চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে দেখে ওকে না জাগিয়ে আলতো পায়ে নিঃশব্দে দরজার ঝাঁপ সরিয়ে বেরিয়ে এসে মোড়লকে দেখতে পায় ভুকু। মোড়লের সঙ্গে আরও চারজন গ্রামের বয়স্ক বৃদ্ধ বসে ছিল গ্রামে মাঝের খোলা জায়গার কাঠের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি বসার আসনের ওপর।

ভুকুকে দেখে মোড়ল বলে ওঠেন, “আজ সকালেও হানা দিয়েছিল দানোটা। ঠিক গতকালের মতোই কাদার ওপর মুখ রেখে বসে ছিল অনেকক্ষণ, তারপর আবার জলের তলায় মিলিয়ে গেছে। এখান থেকে ওই পাথুরে দ্বীপের দূরত্বটা অনেকটাই। আমার মনে হয় এতটা পথ এসে দানোটা হাঁপিয়ে উঠছে, পারছে না ডাঙায় উঠে খাবারের খোঁজ করতে। অন্য কোনোখান থেকে খাবার পাচ্ছে কি না সেটাও জানা সম্ভব হচ্ছে না। গ্রামে খবর নিতে পাঠানোর মতো কেউ নেই।”

“বলতে চান এই ক’দিনে দানোটা বুড়ো হয়ে গেছে বা ওর শক্তি কমে গেছে?”

“আমি কিছুই বলতে চাই না। তবে এটা সত্যি, অনেকদিন খাবার না পেয়ে থাকলে দানোটা দুর্বল হতে বাধ্য।”

“তাহলে আমাদের এখন কী করা উচিত? ভোরবেলা নদীর ধারে বন্দুক নিয়ে অপেক্ষা করা?”

“সেটা একদমই ঠিক হবে না। আমি মাঝরাত থেকে নদীর ধারে ছিলাম। দানোটা এতই নিঃসাড়ে এসেছিল যে পাড়ে মুখ তোলার আগে টের পাইনি। সে যদি নদীর জল থেকে আচমকা মুখ উঁচিয়ে কাউকে মুখে তুলে ডুব দেয়, আমরা কিছুই করতে পারব না। বন্দুকের গুলিতে ওর কিছু হবে বলে মনে হয় না।”

“তাহলে দানোটাকে তো অনেকদিন না খাইয়ে রেখেও মারা যায়!”

“কথাটা মন্দ বলোনি। আবার এটাও সম্ভব, ও বাঁচার তাগিদে অন্য কোথাও হানা দেবে। তারপর অনেকদিন ওর কোনও সাড়া না পেয়ে যখন গ্রামের সবাই ফিরে এসে নদীর ধারে যাবে, তখন এসে আবার আচমকা আঘাত হানবে।”

মোড়ল এবার অন্য বুড়ো লোকগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন যার ভাষা ভুকুর জানা নেই। ফলে কী যে কথা হচ্ছে না বুঝতে পেরে একটা গাছের গুঁড়ির ওপর চুপ করে বসে।

খানিক পরেই কাহু আর রুস্নিও এসে ভুকুর পাশে বসে। তারপর বুড়োদের আলোচনা কানে আসতেই উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ায়।

“ওরা কী বলছে বুঝতে পারছ মাস্টার?” রুস্নি ভুকুর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে।

“না!”

“শোনো, এই বুড়োগুলো মিলে ওই দানোটাকে মারতে চাইছে আমাদের বাদ দিয়ে।”

“সে কি, কেন?”

“যাতে আমরা বিপদে না পড়ি।”

“বুঝলাম না।”

“এই ছাগলটাকে টোপ বানিয়ে ওরা প্রথমে দানোটাকে ধরবে, তারপর তির ছুড়ে মারবে বলে ঠিক করছে।”

“বলো কী?”

“হ্যাঁ মাস্টার, এই জন্য এই বুড়ো লোকগুলো আজ জঙ্গলে লতা কাটতে যাবে।”

“লতা কাটতে?”

“হ্যাঁ, লতা কাটতে। শক্ত গাছের লতা। লতা দিয়ে লম্বা দড়ি পাকাবে। তারপর এই ছাগলটার গলায় দড়ির এক মাথা দিয়ে ফাঁস বানিয়ে পরিয়ে আজ রাতের বেলা রেখে দেবে নদীর ধারে, ওই ফাঁসের সঙ্গে বাঁধা থাকবে কতগুলো বড়শি। দড়ির আর এক প্রান্ত বাঁধা থাকবে একটা খুঁটির গায়ে। দানোটা ছাগলটা খেলেই বড়শিগুলো ওর গলায় বিঁধে যাবে, তখন দানোটা দড়ির প্রান্ত খোঁটার সঙ্গে বাঁধা থাকায় বেশিদূর যেতে পারবে না। বড়শি বেঁধা ব্যথায় ছটফট করতে করতে জলের ওপর মাথা তুলবে, তখন ওকে বিষ তির ছুড়ে মারা হবে।”

ভুকু ভাবতে থাকে তাদের কী করা উচিত। কয়েকজন বয়স্ক মানুষ নিজেদের প্রাণ হাতে নিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে দানোটা মারার চেষ্টা করবে, আর তারা ঘুমিয়ে থাকবে?

“রুস্নি, তুমি ওঁদের বলো, ওঁরা যা করতে চান করুন, কিন্তু আমরাও সঙ্গে থাকব। তোমাদের শিকার করার পদ্ধতি আমার জানা নেই। তবে আইডিয়াটা ভালো।”

রোহিত চোখ কচলাতে কচলাতে ওদের পেছনে এসে দাঁড়িয়ে সব শুনেছিল। সেও বলে উঠল, “যাই হোক না কেন, শেষ দেখে ছাড়ব।”

রুস্নি বুড়োদের কাছে গিয়ে ভুকুর কথা বলতে মোড়ল বলে উঠেছিলেন, “বেশ, তাই হবে।”

সকালের খাবার ছিল সেই এক— ভাত আর ডাল। খাওয়া হতেই নায়ার আর স্বামী ছাড়া সবাই জঙ্গলে ঢুকেছিল। নায়ার আর স্বামীও জঙ্গলে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু ভুকু ওদের বলে গ্রামে থেকে রান্না-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে।

বহু জঙ্গলে ঘুরেছে ভুকু— নিজের দেশের নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, অরুণাচলপ্রদেশে— কিন্তু এই জঙ্গলের মোহ যেন আলাদা। গ্রামঘেরা খালের ওপরের সেতুটা নামানোই ছিল, মোড়লের পেছন পেছন সেতুটা পার হয়ে এ-পাশে দাঁড়াতে মোড়ল বললেন, “তোমাদের এর আগে যেদিকে নিয়ে গেছিলাম, সেদিকে যাব না। যাব অন্যদিকে। যে লতা দরকার, সেগুলো ওদিকে ভালো পাওয়া যায়।”

মোড়ল ছাড়াও আরও একজন গ্রামের বৃদ্ধ ওদের সঙ্গে এসেছিলেন। মুখে উল্কি কাটা কোঁকড়ানো চামড়ার প্রায় হাড়ের ওপর চামড়ার মোড়কের লোকটি নাকি একসময় গ্রামের সেরা শিকারি ছিলেন। কথাটা কানে কানে বলেছিল রুস্নি। মালয় ভাষায় সে অনেক কথাই বলছিল মোড়ল আর অন্য লোকটির সঙ্গে। লোকটির কাঁধে ঝোলানো একটা লম্বা ব্লো পাইপ, আর পিঠের ঝোলায় লম্বা সজারুর কাঁটার মতো দেখতে তিন মিলিমিটারের মতো মোটা ইঞ্চি সাতেক লম্বা কাঠের শলা। সেগুলোর গায়ে আবার ইঞ্চি খানেক ছেড়ে ছেড়ে গোল গোল খাঁজ কাটা। শলার ডগাটা পেন্সিলের মতো ছুঁচলো, তাতে কালচে বেগুনি রঙের ছোঁয়া। এগুলো ঝোলায় পোরার আগেই ভুকুকে দেখিয়েছিলেন বৃদ্ধ শিকারি।

রুস্নি বলে দিয়েছিল, “ভুল করেও ওই ব্লো পাইপে ছোড়ার শলার ডগায় হাত ছুঁইয়ো না। ওগুলো বিষ মাখানো। এই বিষ এরা নিজেরাই বানায় রাবার গাছের আঠার সঙ্গে নানা পাতার রস মিশিয়ে। তারপর সেগুলো জ্বাল দিয়ে ঘন করে শলার ডগায় মাখিয়ে হালকা আগুনের তাপে শুকিয়ে নেয়। এমনি হাতে লাগলে ক্ষতি নেই, ভালো করে হাত ধুয়ে ফেললেই হল। কিন্তু কোনও কারণে রক্তে মিশে গেলে সামান্য সময়ের মধ্যে মৃত্যু। ব্লো পাইপ থেকে ছোড়া ওই মোটা লম্বা ছুঁচের মতো শলাগুলো সজোরে শিকারের শরীরের গভীরে ঢুকে ওদের রক্তে মিশে যায় আর শিকার ঢলে পড়ে। তারপর সেই শিকার তুলে নিয়ে এসে সেই তির বেঁধা জায়গা ঘিরে বেশ খানিকটা অংশ ফেলে দিয়ে মাংস ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করে গ্রামের সবাই মিলে সেদ্ধ করে বা পুড়িয়ে খায়।”

রুস্নি আরও বলেছিল, আজকাল আর ব্লো পাইপ দিয়ে তির ছুড়ে শিকার করার লোক বিশেষ একটা নেই, অনেক জোর লাগে শ্বাস দিয়ে তির ছুড়তে। প্রচুর প্র্যাকটিস না করলে তির ছোড়া যায় না। সে নিজে ব্লো পাইপ ছুড়তে জানলেও তা দিয়ে শিকার করার ক্ষমতা তার নেই। তাছাড়া ব্লো পাইপ দিয়ে শিকার করতে শিকারের খুব কাছে পৌঁছতে হয়। মূলত শুয়োর শিকার করা হয় এই ব্লো পাইপ দিয়ে। গ্রামের লোকেরা এখন বন্দুক ব্যবহার করে শিকার করতে।

পারাং দিয়ে গাছের ডাল আর লতাপাতা কাটতে কাটতে আগে আগে চলছিলেন মোড়ল। ওঁর ঠিক পেছনে পেছনে কাহু। বর্ষণ-বন হওয়ায় লতাপাতা খুব দ্রুত বাড়ে এখানে। পুরু হয়ে থাকা পচা পাতার ওপর পায়ের আওয়াজ প্রায় শোনাই যাচ্ছিল না। এই পচা পাতাই গাছের খাদ্য। গাছের ডালে সামান্য দুলুনিতেই জেগে উঠছিল খুদে খুদে পোকার দল। এমনভাবে পাতা বা গাছের সঙ্গে মিশে থাকে এরা যে ভালো করে নজর না করলে দেখা মুশকিল। মনে হয়ে যেন ওটা গাছ বা পাতারই অংশ। পাতার ওপর ওদের শুঁড়, পা বা ডানার নড়াচড়া দেখলে তবেই বোঝা যায় যে কিছু একটা জীবন্ত প্রাণী ওখানে আছে। অজস্র প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। জঙ্গলের হৃদপিণ্ডের ধুকপুকোনি যেন এরাই। আর সব নিথর নিশ্চুপ।

দড়ির মতো পেঁচিয়ে গাছের ডাল থেকে নামা একটা লতার দিকে কাহু আঙুল দেখাতে সরু লিকলিকে সবুজ লালচে ঠোঁটের সাপটা দেখতে পেয়েছিল ভুকু। সামনে চলা মোড়ল আড়াআড়ি দুলতে থাকা একটা মোটা লতায় ডানহাত দিয়ে পারাংয়ের কোপ মারতেই মোড়লের খালি পিঠের ওপর লাফিয়ে নেমেছিল একটা ফুট দু-এক লম্বা আঙুলের মতো মোটা মেটে রঙের একটা সাপ। কাহু কিছু বলার আগেই অদ্ভুত কায়দায় বাঁহাত ঘুরিয়ে পিঠ থেকে টেনে নামিয়েছিলেন মোড়ল। তারপর সামনের একটা গাছের ডালে ছেড়ে দিয়েছিলেন।

ভুকু আগে থেকেই জানত, বর্ষণ-বনের অধিকাংশ সাপ বিষাক্ত নয়। মূলত এরা ছোটো ছোটো পোকা খায়। বনের বাস্তুতন্ত্র বাঁচিয়ে রাখতে এইসব পোকামাকড়ের ভূমিকা অসীম।

একটা ছোটো ঢালের মাথায় উঠতে জলের ওপর জল পড়ার শব্দটা কানে এসেছিল। পায়ে চলা পথের দু-পাশের কাটা গাছের ডালপালা জানান দিচ্ছিল, এখানে মানুষ মাঝে-মাঝেই হানা দেয়।

ঢালের ওপর উঠে মোড়ল চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন দলের সবার পৌঁছানোর জন্য। সবাই প্রায় লাইন করে একসঙ্গেই পৌঁছেছিল। জঙ্গলের অলিখিত নিয়ম— দল বেঁধে থাকো আর এক লাইনে চলো। আগের জন তোমার পদক্ষেপ যে সঠিক তা জানিয়ে দিয়ে গেছে।

দাঁড়াতেই মশা ছেঁকে ধরেছিল। মোড়ল ছাড়াও গ্রামের আর একজন যে বৃদ্ধ মানুষ সঙ্গে এসেছিলেন, তিনি তরতর করে ঢাল বেয়ে নেমে কতগুলো ঘাসপাতা ছিঁড়ে এনে সবার হাতে ধরিয়ে দিয়ে ইশারায় ডলে গায়ে-মুখে ঘাসের রস মেখে নিতে বলেছিলেন। ঘাসপাতা ডলতেই পাওয়া যাচ্ছিল সিট্রোনেলার গন্ধ। পাতার রস গায়ে মাখতে মশাগুলো গায়ের কাছে উড়ে বেড়ালেও শরীরে বসছিল না।

মোড়ল কাহুকে মালয়ে কিছু বলতে সে আনন্দে দু-হাত তুলে লাফিয়ে উঠেছিল। তারপর মোড়লের পিঠে দড়ি দিয়ে ঝোলানো বেঁটে লাঠিটা হাতে নিয়ে মোড়লের কোমরে বাঁধা থলিটা খুলে নিজের কোমরে বেঁধে ভুকুকে বলেছিল, “আজ রাতে তোমাদের মাছ খাওয়াবই খাওয়াব।”

রুস্নি শিস দিয়ে কাহুর দিকে তাকিয়ে হাত নাড়তে সে দৌড় লাগিয়ে ঢাল বেয়ে নেমে গাছের আড়ালে হারিয়ে গেছিল। রুস্নি ভুকুকে বলে, “এই ঢাল থেকে নেমে বাঁদিকে একটু গেলেই একটা ছোটো ঝরনা আছে। সেখানে প্রচুর মাছ। মোড়লমশাই কাহুকে ছোটো ব্লো পাইপ আর তির দিয়েছে মাছ ধরার জন্য।”

মোড়লের পিঠে বাঁধা ছোটো লাঠিটা যে একটা ব্লো পাইপ, সেটা ভুকু বুঝতেই পারেনি এতক্ষণ।

“বিষ মেশানো তির দিয়ে মাছ মারবে?”

“না মাস্টার, এগুলো ছোটো ব্লো পাইপ, তিরে বিষ মেশানো থাকে না। তুমিও চেষ্টা করলে এই ব্লো পাইপ ছুড়ে মাছ মারতে পারবে, এত মাছ এখানে। কিন্তু মোড়ল বলছে, আমরা সবাই এখন ঝরনার ধারে যেতে পারব না, সময় নেই, আমাদের লতা কাটতে যেতে হবে। দানোটা মারতে দাও, একদিন তোমাদের নিয়ে ব্লো পাইপ দিয়ে মাছ শিকার করব।”

ঢাল থেকে ডানদিকে ঝরা পাতার পুরু আস্তরণের ওপর দিয়ে গাছের ডালপালা ছাঁটতে ছাঁটতে মোড়লের পেছন পেছন এগোচ্ছিল পাঁচজন। পচা পাতায় প্রায় হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যাচ্ছিল সবার। ডালপালা না কেটে এক পাও এগোনো সম্ভব নয় এই জঙ্গলে। কুয়াশামাখা ঘন মাকড়সার জালে আটকে ছোটো ছোটো রঙবেরঙয়ের অজস্র পোকা। নিঃসাড়ে আলো-আঁধারিতে ঘাপটি মেরে থাকা বিশাল মাপের কালচে চেহারায় হলুদ মুখের মাকড়সা জালে টান পড়তে চকিতে উঠে যায় জালের ওপর পানে। গাছ লম্বা হয়ে উঠে গেছে আকাশ ধরতে আর সেগুলো থেকে নেমে এসেছ অজস্র লতা। নানা রঙের অর্কিড হয়ে আছে গাছের শ্যাওলাধরা ডালপালায়। অদ্ভুত রঙের সব ফুল ফুটে আছে অর্কিডের মাঝে। সূর্যের আলো বোধ হয় এখানের মাটি শেষবারের মতো ছুঁয়েছিল এই জঙ্গল জন্মের সময়। ভুকুর হাতের ঘড়ি বলে দিচ্ছে, এখন দুপুর সাড়ে বারোটা, কিন্তু জঙ্গলের অন্ধকার বলছে এখন সন্ধে পার হওয়া রাত। আলো নেই, অথচ আছে।

ইচ্ছে করেই ক্যামেরা আনেনি ভুকু। এই জঙ্গলের খোঁজ যেন ভুলেও পৃথিবীর অন্য লোকেরা না পায় তাই সে ক্যামেরা ক্যাম্পে রেখে এসেছে। সে জানে, না জানার অপার খনি এই অঞ্চল। ভুল করে বেগুনি লতার ছবি পাঠিয়ে সে তার মহা ভুল বুঝতে পেরেছিল। এই জঙ্গলের গাছপাতার নোটও সে রাখতে চায় না, যাতে কোনোভাবেই অভিযাত্রীর নামে একদল মানুষ এখানে এসে তাদের লোভী প্রচার যন্ত্রের মাধ্যমে এই প্রকৃতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে না পারে। অন্তত তার নিজের কাছে সে সৎ থাকতে চায়।

ঘাড়ের কাছে সুড়সুড় করে উঠতে সেখানে হাত দিতে ঘাড়ের কাছটা ভিজে ওঠে ভুকুর। হাতটা সামনে এনে তাকাতেই দেখে রক্তে মাখামাখি হয়ে আছে আঙুলগুলো। ভুকুর রক্তে মাখা আঙুল নজরে আসতে সামনের এক খোলা জায়গার দিকে ছুটে যান গ্রামের বৃদ্ধ মানুষটি। খোলা জায়গাটায় ঝরা পাতা পড়ে থাকলেও একটা বড়ো বৃত্ত জুড়ে কোনও গাছ নেই। মাটির কতগুলো উঁচু ঢিবি। সেখান থেকে খানিক মাটি ভেঙে নিয়ে এসে ভুকুর ঘাড়ে ঘষে দিয়ে তিনটে রক্ত খেয়ে মোটা হয়ে যাওয়া জোঁক বের করে নিয়ে আসেন বৃদ্ধ। ভুকু বুঝতে পারে, ওই মাটিগুলো  আসলে খনিজ লবণ। বৃদ্ধ আঙুল তুলে পাতা আর মাটি দেখান ভুকুকে। অজস্র জোঁক কিলবিল করছে জায়গাটায়। মোড়ল সবাইকেই মাটি ঘষতে বলেন গায়ে।

নিস্তব্ধ জঙ্গলে একটা পাখির ডাকও শোনা যাচ্ছিল না। মাটির ওপর পুরু হয়ে জমে থাকা পচা পাতা চলার আওয়াজকে শুষে নিচ্ছিল। শুধু ডালপাতা কাটার আওয়াজ উঠছিল থেকে থেকে। আচমকাই গাছের ডালে হুটোপুটির আওয়াজ হতে ইশারায় সবাইকে দাঁড়াতে বলেন মোড়ল। “এসে গেছি।” বলে সামনের দিকে ওরাংওটাং ঝুলতে থাকা কতগুলো লতা দেখান আঙুল দিয়ে।— “এই লতা দিয়ে দড়ি পাকিয়ে হাতিকে বেঁধে রাখলেও সে ছিঁড়তে পারবে না।”

গোটা দশেক ওরাংওটাংয়ের পরিবার লতা ধরে দোল খেতে খেতে খ্যাঁ খ্যাঁ করে চিৎকার করছিল। গাছের ডাল থেকে ঝুলছিল সরু সরু অসংখ্য লতা। বটানিস্ট হয়েও লতাগুলো চিনতে পারল না ভুকু।

“এর আগে আমরা আর যাই না। আমার পূর্বপুরুষদের নিষেধ আছে। শুনছ না, বন পাহারাদাররা আমাদের সাবধান করছে!” বলে ওরাংওটাংয়ের দলটাকে দেখান মোড়ল।

“নিষেধ কেন?” জানতে চায় ভুকু।

“আমি এর আগে যাইনি কখনও। বড়োদের নিষেধ মেনে চলি আমরা জঙ্গলের মানুষরা। তবে দাদুর কাছে শুনেছিলাম, এর আগে সুন্দর দেখতে বিশাল বড়ো বড়ো ফুল অনেকটা জায়গা জুড়ে পড়ে থাকে। সেই ফুলগুলো নাকি এত বড়ো যে তুমি তার ওপর শুয়ে থাকতে পারবে। ওই ফুলগুলো থেকে সুন্দর গন্ধ বার হয়। এত সুন্দর গন্ধ যে কাছে না গিয়ে থাকতে পারবে না। ওই গন্ধ বহুদূর থেকে টানতে থাকে। ফুলের কাছে গিয়ে সেগুলো ছুঁলেই পাঁপড়িগুলো সঙ্গে সঙ্গে গুটিয়ে ওর মধ্যে তোমাকে পুরে নেবে। পরে সেই পাঁপড়ি খুললে তোমার শরীরের কয়েকটা হাড় পাওয়া গেলে যেতেও পারে।”

ভুকুর মনে পড়ে, এই ধরনের গাছের কথা সে শুনেছে। বোর্নিও ছাড়াও এই ধরনের মাংসাশী গাছের গল্প শোনা যায় আমজনের জঙ্গল ঘিরে।

“ওই দেখো।” একটা বেঁটে কাঠের খুঁটির দিকে আঙুল তুলে দেখান মোড়ল। খুঁটির মাথার ঠিক ফুট খানেক নীচে দুটো বাঁশ আড়াআড়ি বাঁধা, আর খুঁটির মাথায় একটা মানুষের মাথার খুলি বসানো। আড়াআড়ি করে বাঁধা বাঁশে সরু সরু বাঁশের টুকরো দিয়ে নকশামতো বানানো।— “জঙ্গলের আদিবাসীদের জন্য আলাদা আলাদা এলাকা ভাগ করা থাকে, যাতে শিকার করা নিয়ে বা অন্য কারণে লড়াই না বাধে। তাই আমরা কেউ অন্যের অঞ্চলে ঢুকি না। ওই যে বাঁশের গায়ে নকশামতো দেখছ, ওটা আমাদের জাতের চিহ্ন। এই দেখো।” বলে নিজের কাঁধের উল্কি দেখান মোড়ল। দেখান বৃদ্ধের কাঁধের অনুরূপ চিহ্ন, অবিকল বাঁশের গায়ে তৈরি নকশার মতো।

এখনও পর্যন্ত মোড়ল নরমুণ্ড শিকার নিয়ে কিছু বলেননি বলে ভুকুর খুব ইচ্ছে থাকলেও জানতে চায়নি। দানোটা ধরতে বা মারতে পারলে তখন না-হয় শোনা যাবে, ভাবে ভুকু।

ওরাংওটাংগুলো গাছের উঁচু ডাল থেকে আরও উঁচুতে গিয়ে উঠছিল। এখানে গাছগুলো কম করেও একশো ফুটের কাছাকাছি লম্বা। ভুকু রোহিতকে জিজ্ঞেস করল, “হ্যাঁ রে, তোদের কোম্পানি এখানে গাছ কাটে না?”

“না। যেখানে কাছাকাছি গ্রাম আছে, সেখানে গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া হয় না। এখানে গাছ কাটলে সেই গাছ টেনে নদীর ধারে নিয়ে যেতে কত কিছু ধ্বংস করতে হবে ভাবতে পারিস? মোড়লের মুখে শুনলি না, মাংসাশী ফুলের গল্প! এখানে মেশিন ঢুকলেই সব ছারখার হয়ে যাবে। আমাদের কোম্পানিও চায় না যে-কোনোভাবে কাঠ কেটে জঙ্গল থেকে টাকা কামাতে। মনে করিস না এখানে যা দেখছি সবকিছু প্রকাশ করে দেব। দানো মারতে পারলে সেটা জানাতে হবে ঠিকই, কারণ দানোর খবর সংবাদমাধ্যমে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু কোনোভাবে জঙ্গলের এই ফুলের কথা শহুরে লোকেদের কানে গেলে দলে দলে লোক ছুটে আসবে এখানে। খাঁচায় ঘিরে ফুল দেখানো হবে, অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমের নামে মশা আর জোঁকের কামড় খাওয়ানো হবে, ব্লো পাইপ দিয়ে মাছ শিকার করে সেই মাছ তুলে দেওয়া হবে টুরিস্টদের প্লেটে। রমরম করে বেড়ে উঠবে স্থানীয় অর্থনীতি, মোবাইল টাওয়ার বসবে, লং হাউস স্টাইলের হোটেল হবে। খুন করা হবে স্থানীয় রীতিনীতি আর মানুষের সরলতাকে।”

এতগুলো কথা টানা বলে হাঁপিয়ে উঠছিল রোহিত। অন্যদিকে রুস্নি তার দোফলা ছুরি নিয়ে লতা বেয়ে গাছে উঠতে শুরু করেছিল। রুস্নির ছুরির কোপে লম্বা লম্বা লতা খসে পড়ছিল ওপর থেকে। ভুকু একটা লতা হাতে তুলে টেনে দেখল লতা এত শক্ত যে টেনে ছেঁড়া অসম্ভব, অথচ ধারালো কিছুর কোপে কেটে যাচ্ছে অনায়াসে। ঠিক যেন প্লাস্টিকের দড়ি— কাঁচির চাপে মুহূর্তে কেটে যায়, কিন্তু টেনে ছেঁড়া যায় না।

বেশ কিছু লতা কেটে গাছ থেকে নেমে এসে চটপট করে গোল গোল করে কয়েকটা লতার ছোটো বান্ডিল বানিয়ে ফেলেছিল রুস্নি। একটা বান্ডিল কাঁধে তোলার পর ভুকু টের পেল যে লতাগুলো সরু দেখতে হলেও বেজায় ভারী।

ফেরার পথে ঢালের মুখে দাঁড়িয়েছিল কাহু। লতাপাতা দিয়ে একটা ঝোলামতো বানিয়ে নিয়েছিল সে। ঝোলার মুখটা খুলে ধরতে দেখা গেল ঝোলাটা বোঝাই ছোটো ছোটো মাছে। বৃষ্টি পড়ছিল টিপটিপ করে, যা এই জঙ্গলে সবসময় হতেই থাকে। পাশাপাশি মেঘ নেমে এসেছিল গাছপালার মাথায়। বিকেল গড়াতেই তাই হালকা অন্ধকার নেমে এসেছিল। কাঁপানো ঠান্ডা না হলেও, মিঠে শীত চেপে বসেছিল শরীরে।

দলের সামনে মোড়ল আর পেছনে রুস্নি— ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে সবাই ফিরে এসেছিল গ্রামে। সাধারণত এই সময় ঘরে ফেরা পাখিদের কলতান শোনা গেলেও কোনও শব্দ শোনা যাচ্ছিল না। প্রকৃতি যেন শ্বাস বন্ধ করে বসে আছে।

খালের ওপর সাঁকোটা ফেলাই ছিল, সবাই গ্রামে ঢুকতেই সাঁকোটা দড়ি টেনে তুলে নিয়েছিলেন মোড়ল। এই জঙ্গলে এসে এখনও পর্যন্ত কোনও লেপার্ড বা হিংস্র প্রাণীর দেখা পায়নি ভুকু। কিন্তু গ্রামের অলিখিত নিয়মে সন্ধে হবার আগেই সাঁকো তুলে ফেলতে হয়।

লতার বোঝাগুলো নিয়ে ফেলা হয়েছিল গ্রামের মাঝখানের খোলা জায়গাটায়। মোট পাঁচটা বান্ডিল এসেছিল। গ্রামে থেকে যাওয়া অবশিষ্ট বয়স্করা সঙ্গে সঙ্গে বসে গেছিলেন লতার বান্ডিল খুলে দড়ি পাকাতে। মোট পাঁচটা করে লতা পাকিয়ে দড়ির আকার দিচ্ছিলেন বৃদ্ধরা। কয়েক মিলিমিটার মোটা হলেও এই লতার শক্তি আগেই বুঝে গেছিল ভুকু। নিজে না দেখলে এই লতা যে এত শক্তিশালী হতে পারে বিশ্বাস করত না। ওরাংওটাংগুলো যেভাবে এই সরু লতায় দোল খাচ্ছিল, তা প্রচুর ভার বহনে সক্ষম না হলে ছিঁড়ে যেত।

রাত নেমে এসেছিল। সঙ্গে বৃষ্টিও শুরু হয়েছিল জাঁকিয়ে। মোড়ল বললেন, “সবাই খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে নাও। রাতের অন্ধকারে কিছু করা যাবে না, ভোর হলে দানোর জন্য ফাঁদ পাতা যাবে।”

কাহু এসেই আঁশ ছাড়িয়ে পেট গেলে মাছ পরিষ্কার করে আগুনে সেঁকা শুরু করে দিয়েছিল। ছোটো ছোটো মাছগুলো অনেকটা চারাপোনা মাছের মতো দেখতে। সারাদিন অভুক্ত থাকার পর গরম খিচুড়ি আর তার সঙ্গে সদ্য আগুনে সেঁকা গোলমরিচ আর নুন ছড়ানো মাছ সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দিয়েছিল। দানোটার একটা ব্যবস্থা করতে পারলে নিজে ব্লো পাইপ দিয়ে মাছ ধরবে, মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিল ভুকু।

বৃষ্টির ঠান্ডা জড়ানো শরীরে পেটভরা খাবার পড়তেই চোখ জড়িয়ে আসছিল সবার ঘুমে। রাতজাগা একটা প্যাঁচার গম্ভীর কুকু ডাক বৃষ্টির আওয়াজকে ছাপিয়ে উঠছিল। ঝিঁঝিঁপোকার সঙ্গে কট্টর কট্টর ডাক আসছিল ঘরের চালার কাঠ-পাতার ভেতর থেকে। দেওয়ালে আর মেঝেতে মোমবাতির আলোয় অজস্র ক্ষুদে ক্ষুদে আর রঙবেরঙের পোকার ঝলসে ওঠা চোখের নাড়াচাড়া আদিম পৃথিবীর রূপকে সাজিয়ে তুলেছিল।

ভুকুর সঙ্গে এক ঘরে থাকা রোহিত বলে উঠেছিল, “হ্যাঁ রে ভুকু, ঘরে আবার সাপ-টাপ নেই তো? টর্চ জ্বালিয়ে একবার চেক করে নেব নাকি?”

“চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়। যা ঘুম পাচ্ছে, ঘরে এসে দানো তুলে নিয়ে গেলেও কিছু টের পাবি না।”

“সেটা ঠিক। আসলে জঙ্গলের মধ্যে যখন ক্যাম্প করে থাকি তখন মশারি টাঙিয়ে শুই, তাই একটু অস্বস্তি লাগছিল।”

***

ছাগলের ডাকে ঘুম ভাঙলে ঘর থেকে বার হয়ে আসে ভুকু। সারারাত অঝোরে বৃষ্টি হয়ে বন্ধ হলেও ঘরের চালার পাতায় জমে থাকা জল টুপটুপ করে ঝরে পড়ছিল। ছাগলটা গ্রামের মাঝের খোলা জায়গাটায় বাঁধা থাকলেও কাউকে দেখতে পেল না ভুকু। ছাগলটা ছিল কোথায়? গ্রামে তো ছাগল চরাবার মতো কেউ নেই! হয়তো গ্রামের পেছন দিকে কোনও গোয়াল আছে পশুগুলোকে বেঁধে রাখার জন্য। গ্রামের পুরোটা এখনও ঘুরে দেখা হয়নি।

বসার কাঠের গুঁড়ির বেঞ্চের পাশে গোল করে রাখা লতা দিয়ে পাকানো দড়ির বান্ডিল। হালকা হওয়া বইছিল, ফলে সকালের কুয়াশার চাদর সরে গেছিল। সামনের গাছের ডালে দুটো ভেজা শালিক বসে ছিল। কপালে দুই হাত উঠে গেছিল ভুকুর। সেই ছোটোবেলা থেকে ঠাকুমার শেখানো অভ্যেস, ঘুম থেকে উঠে দুই শালিক দেখলে দিন ভালো যায়। দুই শালিক দেখলে প্রণাম করাটা ঠাকুমাই শিখিয়েছিল।

ভুকু তাকিয়ে থাকে শালিক দুটোর দিকে। মাঝে মাঝে ডানা ঝেড়ে জল ঝরাচ্ছিল পাখি দুটো। তারপর ঘাড় বেঁকিয়ে শরীরের মাঝে মুখ গুঁজে ঠোঁট দিয়ে ঘষে যাচ্ছিল বুকের ধূসর ছোটো পালকগুলো।

“গুড মর্নিং মাস্টার, ইওর টি।”

এত সকালে জঙ্গলের মাঝে কেউ চা এনে মুখের সামনে ধরবে আশা করেনি ভুকু।

“দেখলাম আপনি বাইরে এসে বসেছেন, তাই চা বানিয়ে ফেললাম।” কাহু বলে।

“তোমার কি মনে হয়, আমরা দানোটা ধরতে পারব? দানোটা কী হতে পারে বলে তোমার মনে হয়, কাহু?”

“ড্রাগন, মাস্টার, ড্রাগন। ড্রাগন ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না। এই জঙ্গলে যে কী আছে আর কী নেই কেউ জানে না। ড্রাগন হল পাতালের দূত, তাকে আমরা মারতে পারব না। রোজ একটা করে পশু ঈশ্বরের দূতকে দিয়ে খুশি করলেই তো হল। তাহলে আর মানুষ মারবে না। শুনেছি ড্রাগন কয়েকশো বছর জলের তলায় গুহার মধ্যে ঘুমিয়ে থাকে, তারপর ঘুম ভেঙে উঠে কিছুদিন পেট ভরে খেয়ে আবার গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। ড্রাগন মানুষের ক্ষতি করে না, রক্ষা করে। তাই তো আমরা ড্রাগনের পুজো করি। এইসব গ্রামের লোকেরা নিশ্চয়ই ড্রাগনের পুজো করেনি, তাই ড্রাগন হানা দিয়েছে। শিওর দানোটা জল-ড্রাগন, তাই জলের ভেতর দিয়ে এসে জলের ধারেই হানা দেয়।”

“তুমি ড্রাগন দেখেছ, কাহু?”

“না, মাস্টার। তবে আমাদের গ্রামের এক মনেস্ট্রিতে ড্রাগনের মূর্তি দেখেছি। সরু চেহারা, পিঠের ওপর কাঁটা কাঁটা, ছুঁচলো মুখে লম্বা জিভ, গায়ে মাছের মতো আঁশ ভরতি।”

কাহুর বাকি কথা আর কানে যায় না ভুকুর। সে মনে মনে ভাবে, বোর্নিওতে বৌদ্ধদের সংখ্যা খুব কম, মূলত মুসলিম-প্রধান দেশ। এখানে জঙ্গলের মাঝের গ্রামে মনেস্ট্রি? যদিও এর আগে মোড়ল বলেছিলেন যে মিশনারিরা এসে কাপড়ের ওপর সূচ-সুতো দিয়ে তাঁর মাকে ড্রাগনের ছবি বানানো শিখিয়েছিল। মানে ড্রাগনের মিথ এই অঞ্চলে আছে। এখানে ড্রাগন হল পাতালের দেবতা, জলে থাকে। তবে কি দানোটা কোনও সরীসৃপ বা মাছ, যা স্বল্প সময়ের জন্য ডাঙায় বেঁচে থাকতে পারে কই মাছদের মতো? এই নদীতে যে বিশাল বিশাল মাছ আছে, তার প্রমাণ দু-দিন আগেই ওরা পেয়েছে। হতে পারে এমন কোনও মাছ যা জলের তলার কোনও গুহায় বহুবছর ঘুমিয়ে ছিল, এখন ঘুম ভেঙে খাবার খুঁজছে— হাইবারনেশনে যাওয়া প্রাণীদের মতো। সমুদ্রের গভীরেও তো এরকম অনেক মাছ আছে। যাই হোক না কেন, দানোটা জঙ্গলের কোনও বানানো গল্প নয়, এর উপস্থিতি আছে। সবাই নিজের চোখে দেখেছে। শুধু প্রাণীটা যে কী তার আঁচ পাওয়া যাচ্ছে না।

সবাই এসে জড়ো হয়েছিল খোলা জায়গাটায়। নদী থেকে গ্রামে আসার ঢাল বেয়ে এক হাঁটু কাদা মেখে মোড়ল ও আরও চার বৃদ্ধ এসে বসেছিলেন পাথরের বড়ো টুকরোর ওপর।

“আজ দানোটা আসেনি। নদীর ধারে খাবার না পেয়ে অন্য কোনও গ্রামে হানা দিল কি না বোঝা যাচ্ছে না।” বলে ওঠেন মোড়ল।— “তবে আজ ভোরে আসেনি বলে যে আর আসবে না এমন ভাবা ঠিক হবে না।”

মোড়লের বিচক্ষণতায় মুগ্ধ হয় ভুকু।

“চলো সবাই মিলে নদীর ধারে ফাঁদ পেতে আসি। দূর থেকে পালা করে সবাইকে নজর রাখতে হবে।” বলে মালয় ভাষায় রুস্নি আর কাহুকে কিছু বলতেই দুজনে মিলে লতার দড়ির বান্ডিলের পাক খুলে সোজা করতে থাকে। সোজা করার পর দেখা গেল, খুব বেশি হলে পঞ্চাশ ফুট মতো লম্বা হবে লতার দড়িটা।

“রাইফেলটা সঙ্গে নিয়ে নাও।” ভুকুকে লক্ষ্য করে বলেন মোড়ল।— “বলা যায় না, ফাঁদ পাতার সময় হানা দিতে পারে দানোটা।”

চার বৃদ্ধ দড়ি সোজা করার ফাঁকে তির-ধনুক বের করে নিয়ে এসেছিলেন। মানুষ সমান লম্বা ধনুকগুলো যে দূর থেকে শিকার করার, সেটা না বলে দিলেও বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না ভুকুদের। দুটো ছোটো ধনুক ছিল, সেগুলো রুস্নি আর কাহু কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়েছিল।

একটা লম্বা ঝুরির মধ্যে সরু কাঠের ফলার তিরের সঙ্গে কয়েকটা লোহার ফলার তিরও ছিল। প্রতিটি তিরের মাথায় হালকা বাদামি রঙের ছোঁয়া। সেগুলো যে বিষ মাখানো ওই রঙ, তার প্রমাণ। কয়েকটা খালি তূণীরের মধ্যে মাপ করে তির ভরে দুটো রুস্নি আর কাহুকে দিয়ে বাকিগুলো নিজেদের পিঠে চাপিয়ে নিয়েছিলেন চার বৃদ্ধ ও মোড়ল।

“এগুলো তোমরা চালাতে পারবে না, এগুলো আমাদের জঙ্গলের মানুষদের জন্য। তিরের মাথায় বিষ মাখানো আছে, ওগুলো ছুঁয়ো না। চলো সবাই মিলে এই দড়িটা নদীর ধারে টেনে নিয়ে যাই।” মোড়লের কথা শুনে সবাই দড়িতে হাত লাগাতে যেতে নায়ারকে লক্ষ্য করে মোড়ল বলেন, “তুমি বরং ছাগলের দড়িটা ধরে ওটাকে নিয়ে চলো।”

সরু লতার দড়ি একা দু-হাত দিয়ে টানতে গিয়ে টের পায়, কেউ একা এই দড়ি টেনে নিয়ে যেতে পারবে না। সারারাত বৃষ্টিতে ভিজে আরও ভারী হয়ে উঠেছিল লতার বোঝা। মোড়লের ইশারায় সবাই মিলে টানতে টানতে নদীর ধারে পোঁতা নৌকা বাঁধবার একটা শক্ত খুঁটির কাছে নিয়ে গোল করে পাক দিয়ে রাখে দড়িটা। রুস্নি আর কাহুকে নিয়ে মোড়ল খুঁটির সঙ্গে লতার দড়ির এক প্রান্ত ফাঁস দিয়ে বাঁধে। লতা শক্ত হলেও যে খুব নমনীয় সেটা, সহজেই খুঁটির গায়ে পাক মারতে দেখে বুঝে যায় ভুকু।

ছাগলের গলায় বাঁধা শণের দড়ির সঙ্গে লতার দড়ি পাকিয়ে বেঁধে দিয়ে সবাইকে উঁচু পাড়ের দিকে উঠতে ইশারা করেন মোড়ল। ছাগলটার গলায় শণের ফাঁসে লম্বা বড়শির মতো কতগুলো বাঁকানো তার ঝুলছিল।

“আমাদের পালা করে পাহারা দিতে হবে। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, দানোটা এমন কিছু যা আমাদের চেনা। দানোর আকার পেলেও সেটা আসলে কোনও দানো নয়, কিন্তু দানো।”

মোড়লের কথা শুনে চুপ করে থাকে ভুকু। কী বলতে চায় লোকটা?

“তার মানে আপনি জানেন দানোটা কী?” চাপা স্বরে জানতে চায় রোহিত।

“না, জানি না। তবে আন্দাজ করতে পারছি মাত্র।”

“তা হলে বলছেন না কেন?”

“বলছি না কারণ, ওই দেখো।” ছাগলটা উধাও হয়ে গিয়ে লতার দড়িটা বান্ডিলটা থেকে পাকানো লতার দড়ি প্রচণ্ড টানে জলের ভেতর ঢুকে যাচ্ছিল দ্রুত। কোন ফাঁকে যে দানোটা এসে ছাগলটা টেনে নিয়ে জলের তলায় নিয়ে গেছিল কথা বলতে বলতে টের পায়নি কেউ। চার বৃদ্ধ কাঁধ থেকে লম্বা ধনুকগুলোর এক প্রান্ত মাটিতে স্পর্শ করে তির ছুড়তে যেতে হাত তুলে থামালেন মোড়ল।— “কোনও লাভ নেই তির ছুড়ে। জলের তলায় দানোটা কোথায় আছে জানা নেই। বরং অপেক্ষা করো কখন দানোটা মাথা তোলে। দড়ির ফাঁসে আটকানো শিকার নিয়ে ও বেশি দূর যেতে পারবে না।”

লতার দড়ির পাকটা খুলতে খুলতে গোড়ায় এসে থেমেছিল। মোড়ল সবাইকে নিয়ে নদীর উঁচু পাড় থেকে জলের ধারে নেমে এসেছিলেন দ্রুত। চার বৃদ্ধ ধনুক মাটিতে ঠেকিয়ে ছিলাতে তির জুড়ে জলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। খানিক দূরে জলের মাঝে সামান্য বুড়বুড়ি উঠলেও কোনও আলোড়ন দেখা যাচ্ছিল না। জলের তলায় আলোড়নহীনভাবে তলিয়ে দানোটা।

মোড়ল ভুকুদের বন্দুকটা হাতে নিয়ে ছিলেন এতক্ষণ। এবার সেটা রোহিতের হাতে ধরিয়ে রুস্নি আর কাহুকে নিয়ে খুঁটিতে বাঁধা লতার দড়িতে টান দিতে সেটা উঠে আসতে লাগল। কোনও সন্দেহ নেই, আর যাই হোক দড়ির আরেক প্রান্তে কিছু আটকে নেই। বড়শি থেকে টোপ গিলে মাছ পালিয়ে গেলে যা হয়, ঠিক সেইরকমভাবে টান পেতে উঠে আসতে লাগল লতার দড়িটা। রুস্নি আর কাহুর সঙ্গে ভুকু, নায়ার আর স্বামীও হাত লাগিয়েছিল দড়ি টানতে। দড়ি জল থেকে তুলতে দেখা গেল, ছাগলের গলায় বাঁধা শণের দড়ি ছেঁড়া সামান্য অংশ লেগে আছে লতার দড়ির গায়ে।

ছেঁড়া দড়ির মাথা হাতে নিয়ে সামান্য সময় চিন্তা করে মোড়ল বলেন, “তাড়াতাড়ি মোটর বোটে ওঠো সবাই, ওই পাথুরে দ্বীপে যেতে হবে।”

***

নৌকোয় বসে একটিও কথা বলেননি মোড়ল। চুপ করে জলের দিকে তাকিয়ে রাইফেলটা হাতে নিয়ে বসে ছিলেন। পাথুরে দ্বীপের কাছে পৌঁছতে রাইফেলটা হাতে নিয়ে নৌকো থেকে নেমে ঢালের ওপর ঘষটানোর দাগগুলো দেখতে থাকলেন। বালিমাটিতে কাদা না থাকা সত্ত্বেও অজস্র চওড়া ভারী জিনিস টেনে নিয়ে যাবার মতো দাগ স্পষ্ট। এর আগে ভুকুরা এসে দেখে গেছে এটা কাঠ পাচারকারীদের আস্তানা নয়, তবুও গুঁড়ি টেনে তোলার মতো গভীর দাগ এল কী করে এটা বুঝে উঠতে পারেনি। ঢালু জায়গা বেয়ে ওপরে উঠতে নুড়ি-পাথরের মাঝে হারিয়ে গেছিল সব দাগ।

মোড়ল সবাইকে ইশারায় দাঁড়াতে বলে রাইফেল হাতে ধীরে ধীরে একা এগিয়ে যেতে লাগলেন দ্বীপের একমাত্র বড়ো গাছটার দিকে। প্রায় একশো মিটার দূর থেকে উনি কী করছেন বোঝা না গেলেও মাটিতে ঝুঁকে পড়ে যে কিছু দেখছিলেন তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।

ভুকুর অবাক লাগছিল দ্বীপটায় অন্য কোনও প্রাণীর অস্তিত্ব নেই দেখে। কেন নেই, এই প্রশ্নটা এর আগে এই দ্বীপে এসে ভুকুর মাথায় খোঁচা মেরেছিল। এখন যেন সেই প্রশ্নটা আরও বড়ো হয়ে উঠছে। তবে কি অন্য কোনও প্রাণী থাকলেও দানোটা সব খেয়ে শেষ করে দিয়েছে? কিন্তু ছোটো পাখি বা গিরগিটি একটা দানো কি খাবে?

মোড়ল গাছের কাছ থেকে সরে এসে রাইফেলটা উঁচিয়ে বড়ো বড়ো পাথরের বোল্ডারের কাছে ঘোরাঘুরি করছিলেন। ভুকু আর থাকতে না পেরে এগিয়ে গেছিল মোড়লের দিকে।

“একটা জিনিস লক্ষ করেছ, দ্বীপটায় অন্য কোনও প্রাণী নেই, বা থাকলেও হয়তো আমাদের চোখে পড়েনি?” মোড়লের কথা শুনে চমকে ওঠে ভুকু। একটু আগেই এই প্রশ্নটা ওর মাথাতেও এসেছিল।

“আমার ধারণা, ছিল। শুধু ছিলই না, সেগুলোও বিশাল আকার ধারণ করেছিল। আর সেগুলো খেয়েই দানো অনেকদিন কাটিয়ে দিয়েছিল।”

“বুঝলাম না।” ভুকু বলে।

“তোমাকে সামান্য সূত্র দিচ্ছি, দেখি বুঝতে পারো কি না। আসলে আমি জানতে চাই আমার আর তোমার চিন্তা একই পথে হাঁটে কি না।”

“বেশ।”

“বেগুনি পাতার সবজে ফুলের একটা ছবি তুমি আমায় দেখিয়েছিলে, ঠিক?”

চমকে ওঠে ভুকু।— “তার মানে বলতে চান সেই ফুলের মধু কোনও কারণে কোনও জন্তুর পেটে চলে যাওয়াতে সেই জন্তু দানো হয়ে গেছে?”

“ঠিক তাই। তোমার আর আমার ভাবনাটা একই পথে চলছে, কিন্তু ধরতে পারছি না দানোটা কী হতে পারে।”

“আপনার কি মনে হয় কোনও এক জন্তু অন্য কোনও জঙ্গল থেকে কোনোভাবে ফুলের মধু খেয়ে চেহারা বড়ো হয়ে যাওয়াতে এই দ্বীপে এসে আস্তানা গেড়েছে?”

“গাছের মাথায় ফুলের মধু কীসে খায়?”

“সাধারণত মৌমাছি বা পাখি।”

“ঠিক। সেই কারণে রাক্ষুসে পাখির কথাই আমি শুনেছি আমার দাদুর মুখ ত্থেকে। এই জঙ্গলে বহু ছোটো পাখি আছে যেগুলো পোকা খায়, আর মৌমাছি ওদের প্রিয় খাদ্য।”

“বেশ। বাকিটা আমি বলি। বেগুনি লতার সবুজ ফুলের মধু খাওয়া কোনও মৌমাছিকে একটা পাখি খায়, তারপর সেই পাখিটাকে কোনও কারণে কোনও প্রাণী খেয়ে সেটার চেহারা বড়ো হতে হতে দানো হয়ে যায়, ঠিক?”

“না, বিষয়টা অত সহজ নয়। দানোটা মাংসাশী এবং জলের তলায় থাকতে পারে। কিছু পাখি মাংসাশী হলেও চট করে পাখিদের পাখি শিকার করে খেতে দেখা যায় না। কয়েক জাতের পাখি অবশ্য পাখি শিকার করেও খায়। বনের মোরগ আর ময়ূরকে অন্য প্রাণী শিকার করলেও এদের মৌমাছি খেতে দেখিনি।”

“তাহলে?”

“তুমি বোধ হয় ভালো করে ওই লম্বা গাছটা লক্ষ করোনি। করলে দেখতে পেতে, ওই গাছে বেগুনি লতায় সবুজ ফুল হয়ে আছে। ওই ফুল দেখেই তোমাদের দ্বীপ ছেড়ে পালিয়ে আসতে বলেছিলাম। কে বলতে পারে কোনোভাবে ওই ফুলের মধু আমাদের কারও পেটে চলে যাবে না!”

“তাহলে কোনও পাখি দানো হয়ে গেছে?”

“না। পাখি হবে না। সবুজ ফুলের মধু খাওয়া পাখিকে কিছু খেয়ে সেটা দানো হয়েছে। কিন্তু সেই জন্তুটা যে কী সেটাই ধরতে পারছি না। তবে একটা কথা বলে রাখি, ফুলগুলো শুকোতে শুরু করেছে। দাদুর কথা যদি ঠিক হয়, দানো হয়ে যাওয়া জন্তুটার তবে মরার সময় হয়ে এসেছে।”

নৌকো থেকে চার বৃদ্ধ-সহ সবাই নেমে এসে মোড়লের কথা শুনছিল। রোহিত বলে ওঠে, “তাহলে তো আর কথাই নেই। দানোটার পেছনে আর সময় নষ্ট করার দরকার নেই, আপনি আপনার গ্রামের লোকেদের ডেকে পাঠান, আমরা গাছ কাটার কাজ শুরু করি।”

“বিষয়টা এত সহজভাবে নিও না। আমি কোনোভাবেই আমার একটা লোকেদের প্রাণ যাবার ঝুঁকিও নিতে পারব না। দানোটা ফুল শুকিয়ে গেলেই মরে যাবে কি না জানি না। ফুল ফোটা থেকে ফুল শুকিয়ে যাওয়া মানে একটা সময়কাল। এই সামান্য সময়কালের মধ্যে একটা প্রাণীর শরীর এত বড়ো হওয়া…” একটু থেমে আবার বলতে শুরু করেন মোড়ল, “বার বার একটা কথাই বলছি, দানোটা যে কী সেটাই এখনও পর্যন্ত আমরা জানতে পারিনি।”

মোড়লের কথা শুনে মাথা নাড়ে ভুকু। জঙ্গলের একজন মানুষ যেভাবে বিষয়টা নিয়ে এত গভীরভাবে ভেবে তা সমাধানের চেষ্টা করছে, তা বিশ্বাস করা কঠিন। মোড়ল যে সত্যি একজন নেতা তাতে সন্দেহ নেই।

চার বৃদ্ধ তির-ধনুক হাতে চারপাশটা ঘুরে দেখতে দেখতে দ্বীপের ঠিক মাঝখানে পড়ে থাকা শ্যাওলাধরা মোটা কাঠের লগগুলোর কাছ থেকে মালয় ভাষায় চিৎকার করে কিছু বলতে মোড়ল দ্রুত হাঁটা লাগিয়েছিলেন ওইদিকে। দুটো লগের মাঝখানে পড়ে ছিল কিছু ডিমের খোসা। ডিমটা যথেষ্ট বড়ো ছিল তাতে সন্দেহ নেই। রুস্নি হাত বাড়িয়ে তুলতে যেতেই বারণ করেন মোড়ল— “কোনও ফাঁকফোকরে হাত গলাবে না। কোথায় কী লুকিয়ে আছে জানি না কেউ।”

“তা হলে সত্যিই কি ড্রাগন? এগুলো কি ড্রাগনের ডিম?” ফিসফিস করে বলে ওঠে রোহিত।

“ড্রাগন হলে কি আর কাঠের গুঁড়ির ফাঁকে ডিম পাড়ত? বোকা বোকা কথা বলিস না রোহিত। হতে পারে কোনও লিজার্ড। মনিটর লিজার্ড। এখানে তো লিজার্ডের অভাব নেই। এখনও পর্যন্ত না দেখলেও শুনেছি ছোটোখাটো কুমিরের আকারের হয় এই লিজার্ডগুলো।” ভুকুর আওয়াজে রাগ ঝরে পড়ে।

“আমি একটা কথা ভাবছি। দানো হয়ে যাওয়া প্রাণীটা সম্ভবত ডিম ফুটেই বার হয়েছিল, জন্মের পর সামনে এসে বসা সদ্য সবুজ ফুলের মধু খেয়ে আসা পাখিটাকে মুখে পুরে নিয়েছিল।”

মোড়লের কোথায় সায় দিয়ে ঘাড় নাড়ে ভুকু।

“আমার ধারণা, প্রাণীটা এত বড়ো শরীর ধারণ করেছে যে একটা ছাগলে ওর দীর্ঘ সময়ের জন্য খিদে মিটবে না, ও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে খাবার খুঁজতে বেরোবে। সম্ভবত আবার হানা দেবে আমাদের গ্রামের পাশে। প্রাণীটার শরীর এত ভারী হয়ে গেছে যে এবার জলে ভেসেই ও যাবে।”

“তাহলে কি আমরা গ্রামে ফিরে গিয়ে অপেক্ষা করব দানোটাকে মারার?” রোহিত জানতে চায় মোড়লের কাছে।

“না। জলের মধ্যে ওকে মারা যাবে না। নদীর কিনারা থেকে একটু দূরে টোপ পাতলে হয়, তাতে দানোটাকে পাড়ে উঠতে হবে। কিন্তু আলো থাকতে থাকতে যে ওকে দেখা যাবে এমন তো নয়, অন্ধকারে নিশানা করে প্রাণীটা মারার কথা মাথায় না রাখাই ভালো। মনে রেখো, নদীতে প্রচুর মাছ। দানোটা নিশ্চয়ই মাছও খায়। না খেলে যতদিন গ্রামের কাছে খাবার পায়নি, ততদিন ওর বেঁচে থাকা মুশকিল হত। যা বুঝেছি, ভারী শরীর নিয়ে জঙ্গলে ঢুকে খাবার জোগাড় করা প্রাণীটার পক্ষে সম্ভব হয়নি, তাই ও গ্রামে হানা দেয় সহজ খাবারের খোঁজে। না-হলে জঙ্গলে খাবারের অভাব আছে নাকি?”

ভুকু নিজের মতামত না জানিয়ে মোড়লের নির্দেশ জানতে চায়।— “তাহলে কী করা উচিত?”

“দানোটা খানিক আগেই খেয়েছে, আবার খাবার খোঁজার আগে বিশ্রাম নিচ্ছে। এই ফাঁকে আমাদের মারতে হবে ওটাকে।”

“দানোটাই-বা আছে কোনখানে? দেখতে পেলে তবে না মারব!” রুস্নি উত্তেজিত হয়ে ওঠে।

“এখানে ওকে মারার কথা ভাবছি কেন জানো? আর যাই হোক প্রাণীটা যে ভারী শরীর নিয়ে  দ্রুত চলতে পারে না, এতে ভুল নেই। তাই আমরা যদি ওর সামনাসামনি পড়ে যাই, পালিয়ে যেতে পারব। প্রথমে দানোটাকে খুঁজে বের করতে হবে। এখনও যখন আমরা প্রাণীটা কী বুঝতে পারিনি, তাই ধরে নিতে হবে ওর লুকিয়ে থাকার ক্ষমতা অসীম। ডিম ফুটে যদি প্রাণীটা বার হয়ে থাকে তাহলে সরীসৃপ না হয়ে যায় না। পাখি হলে জলে ডুব দিয়ে এত পথ যেতে পারত না। আবার লিজার্ড হলে ওর পায়ে নখ থাকত। মাস্টারের কথায়, কোনও নখের চিহ্ন নদীর পাড়ে দেখা যায়নি। প্রাণীটা বুকে হেঁটে যায়, তাই কাদায় ঘষটানোর দাগ ছাড়া অন্য কোনও দাগ দেখা যায়নি।”

“তা হলে দানোটা কি সাপ— ময়াল?” ভুকু বলে ওঠে।

“আমারও তাই ধারণা।” উত্তর দেন মোড়ল।— “তবে দানোটাকে খুঁজে বের না করা পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যাবে না। দানোটা জমির ওপর নেই, আবার থাকতেও পারে। এখানে পাথরের ফাঁকে অনেক ছোটো ছোটো গুহা, সম্ভবত সেখানেই ঢুকে বিশ্রাম নিচ্ছে দানোটা। অন্ধকার গুহার ভেতরে ঢুকে খোঁজা সম্ভব নয়। তোমাদের মোটর বোট থেকে খানিক তেল পাওয়া যাবে মাস্টার?”

“অবশ্যই তেল দেওয়া যাবে। এক ব্যারেল এক্সট্রা তেল আছে সঙ্গে।” বোটম্যান কাহু উত্তর দেয়।

“কাঠ চিরে কিছু কাঠের ডান্ডা বানাও।” রুস্নিকে নির্দেশ দেন মোড়ল।— “দেখো, দ্বীপটা ছোটো হলেও পাথরের গুহা প্রচুর। খুব ছোটো মুখের গুহায় বড়ো দেহ নিয়ে দানোটা ঢুকে বিশ্রাম নেবে বলে মনে হয় না। আলো পড়তে এখনও ঢের বাকি। তেলে ডান্ডা ভিজিয়ে আগুন জ্বালিয়ে একটা একটা করে গুহার ভেতর ছুড়ে দেখতে হবে দানোটা আছে কি না। এই দ্বীপের গুহাগুলো ছোটো ছোটো, কাজেই একটু সময় ভেজা কাঠে তেলের আগুনে যা ধোঁয়া হবে তাতে দানোর বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা প্রবল।

“রুস্নি কাঠ কাটতে থাকুক আর আমরা পাথরের গুহার কাছগুলো ঘুরে দেখি। একসঙ্গে কেউ থাকব না, কিন্তু সবাই সবাইকে লক্ষ রাখব যাতে কেউ বিপদে পড়লে অন্যরা লড়াই দিতে পারি।” মোড়লের আদেশ শুনে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিল ভুকু। একজন সত্যিকারের সেনাপতির অধীনে যুদ্ধে চলেছে তারা।

চার-পাঁচ হাত ব্যবধান রেখে পাথরের ফাঁকফোকরগুলো নজর করছিল সবাই। ভুকুর হাতে রাইফেল তুলে দিয়ে হাতে ছোটো আকারের তির-ধনুক তুলে নিয়েছিলেন মোড়ল। সামনে থেকে শিকার করতে এই ধনুকের নাকি জবাব নেই।

পাথরগুলোর গায়ে পুরু শ্যাওলা জমে। বালি আর নুড়ি-পাথরে কোনও চিহ্ন খোঁজা অসম্ভব। নুড়ি-পাথরে পা ঘষটানোর আওয়াজ ছাড়া শুধু রুস্নির পারাং দিয়ে কাঠ কাটার শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। কিছু কালো বড়ো পিঁপড়ে ছাড়া অন্য কোনও প্রাণী নজরে আসেনি ভুকুর। জঙ্গলের মাঝের পাথুরে দ্বীপটায় যেন প্রাণীদের প্রবেশ নিষেধ। এমনকি একটা পাখিও নেই। টিপটিপ করে বৃষ্টি লেগেই আছে। হাওয়া না চললে ঠান্ডা লাগে না, এই যা স্বস্তি। ভেজা জামাকাপড় গায়েতেই শুকোচ্ছে, তবে অসুস্থতার কোনও লক্ষণ নেই কারও মধ্যে।

হঠাৎ শিসের শব্দে চমকে উঠে ভুকু দেখে কতগুলো বড়ো বড়ো পাথরের সামনে হাত তুলে দাঁড়িয়ে চার বৃদ্ধের একজন। শব্দটা উনিই করেছিলেন। সবাই ছুটে যেতে উনি হাত দিয়ে দেখালেন পাথরের গা। প্রথমে কী দেখাচ্ছেন না বুঝলেও একটু পরে নজর করে পাথরের নীচু অংশে শ্যাওলা জমে নেই, কিছুর ঘষা খেয়ে শ্যাওলাগুলো উঠে গেছে। অন্তত ফুট দেড়েক জায়গা জুড়ে শ্যাওলার চিহ্ন নেই। পাথরগুলোর ফাঁক দিয়ে ঢালু গর্ত নেমে গেছে নীচের দিকে। গুহাটার মুখে অল্প মাটি থাকায় সেখানে জমে ওঠা কাদায় পুরু হয়ে কাটা গভীর মসৃণ চিহ্ন। কোনও সন্দেহ নেই দানোটা আছে এই গুহার ভেতর।

ভুকুর হাত থেকে রাইফেলটা নিয়ে রোহিত গুহার ভেতর তাক করতে বাধা দিয়ে উঠলেন মোড়ল।— “ওটা এখন আমাদের আক্রমণ করেনি, তাই ওকে মারাটা ঠিক হবে না। ফুল শুকিয়ে এসেছে মানে ওর আয়ুও শেষ হয়ে এসেছে। নিজে থেকে ও দানো হয়নি। ওর মাংসও হয়তো আমরা খেতে পারব না। ভারী শরীর নিয়ে জঙ্গলে গিয়ে ওর পক্ষে খাবার জোগাড় সম্ভব হয়নি বলে দানো হয়ে ওঠা প্রাণীটা হানা দিত গ্রামে। আমরা বরং এই গুহা মুখটা পাথর দিয়ে বন্ধ করে দিই। যে ক’দিন বাঁচবে গুহাবন্দি হয়েই থাকুক প্রাণীটা।”

সবাই মিলে হাত লাগিয়ে পাথর গড়িয়ে গুহামুখ বন্ধ করে বোটে চেপে গ্রামের দিকে ফেরার পথে ভুকু ভাবছিল মোড়লের কথা। অনায়াসে একজন মানুষ কী করে বলে উঠতে পারেন— ‘ও আমাদের এখন আক্রমণ করেনি, ওকে মারাটা ঠিক হবে না।’ তাহলে এই হল জঙ্গলের প্রাণের কথা। দানোটা যে আসলে কী ছিল তা অনুমান করলেও নিশ্চিত হওয়া গেল না।

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply