ধারাবাহিক অভিযান-খোটানের বালুসমাধিতে(১১শ পর্ব)-অরেলস্টাইন-অনু-অরিন্দম দেবনাথ-বর্ষা ২০২৪

জয়ঢাকের অভিযান লাইব্রেরি- ভারেস্ট-এরিক শিপটন(অনু-বাসব চট্টোপাধ্যায়)  অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ(অনু তাপস মৌলিক) কন-টিকি অভিযান- থর হেয়ারডাল (অনু-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়)

এই ধারাবাহিকের আগের পর্ব- পর্ব ১, পর্ব ২ পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব ৫ পর্ব ৬, পর্ব ৭, পর্ব ৮ পর্ব৯, পর্ব ১০

obhijjaankhotancover

স্যার অরেল স্টাইন ছিলেন একজন ব্রিটিশ পুরাতাত্ত্বিক। ১৮৬২ সালের ২৬ নভেম্বর তাঁর জন্ম হাঙ্গেরিতে। তিনি ব্রিটিশ সময়কালে নানা ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় নিযুক্ত ছিলেন। তিনি মধ্য এশিয়ায় একাধিক প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানে নেতৃত্ব দেন। তিনি শুধু একজন প্রত্নতাত্ত্বিকই ছিলেন না, ছিলেন একজন নৃতাত্ত্বিক, ভূগোলবিদ, ভাষাবিদ এবং জরিপকারী। ডানহুয়াং গুহা থেকে উদ্ধারকরা পুথি এবং পাণ্ডুলিপির সংগ্রহ মধ্য এশিয়ার ইতিহাস এবং বৌদ্ধধর্মের শিল্প ও সাহিত্যের অধ্যয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তাঁর অভিযান এবং আবিষ্কারের উপর বেশ কিছু বই লিখেছিলেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রাচীন খোটান, সেরিন্ডিয়া এবং আভ্যন্তরীণ এশিয়া বিষয়ক বই। সংস্কৃত থেকে রাজতরঙ্গিণীর ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন তিনি। চিরকুমার অরেল স্টাইন ১৯৪৩ সালের ২৬ অক্টোবর কাবুলে দেহত্যাগ করেছিলেন। এই নিবন্ধে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে চলেছে তাঁর তাকলামাকান মরুভূমির প্রত্নতাত্ত্বিক খোটান অভিযানের কথা।

একাদশ পর্ব

গোসরিঙ্গা পর্বত

পুরাকীর্তি সন্ধানের প্রস্তুতি

চালমাকাজানের জেড পিটস

ইয়োটকান—খোটানের প্রাচীন রাজধানীতে

obhijaan89 (1)

১১ নভেম্বর আট মাইল পথ পার হয়ে পৌঁছেছিলাম কারা-কাশ নদীর বাঁ-পাড়ে উজাত নামের এক গ্রামে। ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন ধূসর চারধার লন্ডনের অনুভূতি এনে দিয়েছিল। আশেপাশের পাহাড় থেকে শুরু করে সব দৃশ্য যেন কেউ তুলি দিয়ে মুছে দিয়েছে। কুয়াশা আর ধুলোভরা বাতাসের দৌলতে আধমাইল দূরের কিছু দেখা যাচ্ছিল না। এখানেই তাঁবু খাটিয়েছিলাম আমরা।

এই পাহাড়ি অঞ্চল কোহমারি নামে পরিচিত। উলুঘাট পর্বতমালা এখানে সমতলে মিশেছে। এম. ডুট্রুইল ডি রিন্সের সহচর, এম. গ্রেনার্ড কোহমারিকে হিউয়েন সাং বর্ণিত পবিত্র পাহাড় গোসরিঙ্গা বলে সনাক্ত করেছিলেন। হিউয়েন সাং গোসরিঙ্গাকে বৌদ্ধ খোটানের একটি বিখ্যাত তীর্থস্থান হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন। এখানের এক মঠে বসেই নাকি শাক্যমুনি ‘আইনের প্রয়োজনীয়তা’-র বিষয় প্রচার শুরু করেছিলেন। এর পাশের গুহায় এক প্রাজ্ঞ পূজারি ‘আরহাত’ বাস করতেন মৈত্রেয় বুদ্ধের আগমনের অপেক্ষায়।

উজিত গ্রামের উলটোদিকে নদীর ডানপাশে মুহম্মদ মাজার। সাধক ‘মহেব খোয়াজা’-র বিশ্রাম-স্থান। যা নিয়মিত পূজিত হয়। খোটানের বাসিন্দারা এখানে নিয়মিত তীর্থযাত্রায় আসেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন, সাধু মহেব খোয়াজার কৃপায় তাদের নদীতে বছরভর জল থাকবে ও ফসল ভালো হবে। বর্তমানে এই মাজার সরকারি অর্থে পোষিত। আম্বান প্যান-ডারিনও কিছুদিন আগে এই তীর্থস্থান পরিভ্রমণ করে গেছেন।

মহান পরিব্রাজক হিউয়েন সাং যে গুহাটির কথা বলেছিলেন তা গোসরিঙ্গা পাহাড়ের চূড়ার ফুট পঞ্চাশ নীচে এখনও বিরাজমান। মাজারের পাশ দিয়ে পাথরের স্তূপ পেরিয়ে পৌঁছতে হয় সে-গুহায়। গুহাটি চল্লিশ ফুট গভীর আর আট থেকে দশ ফুট উঁচু। প্রচলিত প্রবাদ, পূজারিকে কিছু কাফের এখানে গুহার ভেতর হত্যা করেছিল স্রেফ ধোঁয়া তৈরি করে। গুহার দেওয়ালে এখনও ধোঁয়ার কালো চিহ্ন বর্তমান। পাথরের দেওয়ালের গায়ের গুহায় উঠতে হয় একটি মই বেয়ে। হিউয়েন সাং এক কিংবদন্তির কথা শুনেছিলেন, এই গুহার মুখ নাকি পাথর পড়ে আড়াল হয়ে গেছিল যাতে করে আরহাতের উপস্থিতি কেউ টের না পায়।

শুধু হিউয়েন সাংয়ের বর্ণনায় থাকার জন্য নয়, ‘কোহমারি’ গুহা নামে পরিচিত এই গুহার প্রতি আমার আকর্ষণ ছিল খানিক অন্য কারণেও। এই গুহা থেকে খরোষ্ঠী অক্ষরে প্রাচীন ভারতীয় ভাযায় লেখা কিছু বার্চ গাছের বাকলের পুথির টুকরো পাওয়া গেছিল বলে দাবি করা হয়। যা বর্তমানে ‘ডুট্রুইল ডি রিন্স এম.এস’ নামে পরিচিত। এম. গ্রেনার্ডের বিবরণে পাওয়া যায়, তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীকে এই পাতার টুকরো ‘কোহমারি’ গুহা থেকে এনে বিক্রি করেছিল স্থানীয় একজন মানুষ। যদিও এম. গ্রেনার্ড বা তাঁর সঙ্গী ব্যক্তিগতভাবে ‘কোহমারি’ গুহায় যেতে পারেননি ধর্মীয় কারণে স্থানীয়ভাবে বাধা আসায়। এই পাণ্ডুলিপি যে ঠিক কোনখান থেকে আনা হয়েছিল তা স্পষ্ট নয়।

আমি কিন্তু গুহা পরিদর্শনে কোন বাধা পাইনি। বরং স্থানীয় মোল্লারা হাসিমুখেই আমাকে ‘ভারতীয়’ তীর্থ দর্শনে নিয়ে যেতে প্রস্তুত ছিল। ভালো করে গুহা পরীক্ষা করে আমি নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম যে ওই পাণ্ডুলিপি ওখান থেকে পাওয়া যায়নি। ফরাসি অভিযাত্রীদের এখানে আসার কথা স্থানীয়দের ভালোভাবে মনে থাকলেও গুহায় পাণ্ডুলিপি পাওয়ার বিষয়ে কেউ কিছু বলতে পারেনি। একই ধরনের পাণ্ডুলিপি কাশগরে রাশিয়ানদেরও বিক্রি করা হয়েছিল। সম্ভবত স্থানীয় ধন-সন্ধানীরা পাণ্ডুলিপিকে এমনভাবে গুহার সঙ্গে মিশিয়ে গল্প তৈরি করেছিল যাতে করে আসল জায়গার সন্ধান অজানা থাকে।

এই গুহা পরিদর্শনকালে স্থানীয় খোটান উপাসনার রীতির সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ পেয়েছিলাম। দেখলাম, সে যতই ধার্মিক হোক না কেন, এখানকার উপাসনালয়ে ঢোকার জন্য পায়ের জুতো খোলে না। যদিও সচরাচর জুতো খুলেই ধর্মীয় স্থানে প্রবেশের রীতি। শীত এখানে ভয়ংকর। জুতো খোলা বিশেষ করে এইসময় এখানে দুঃস্বপ্ন। ভারতীয় মন্দির বা মসজিদে ঢোকার সময় পুরোহিতদের সঙ্গে সাঁট করে, ইউরোপিয়ানদের পক্ষে জুতো না পরে হাঁটা যে কতটা অসুবিধাজনক বুঝিয়ে জুতো পরে ঢোকার অনুমতি পেতাম, এখানে আমাকে জুতো পরে মাজারে বা গুহায় ঢুকতে কোনও কচকচানিতে যেতেই হয়নি।

আঙুর বাগানে ঘেরা উজাত একটি বড়ো গ্রাম। এখানকার বেদানা আর শুকনো আঙুর চালান যায় আকসু, কাশগর এবং তুরফানের বাজারে। শীতের পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আঙুরলতার ডালপালা মাটির প্রলেপে ঢেকে রাখার কাজ শুরু হয়ে গেছিল। উজাতের লোকেরা নরম স্বভাবের আর ঐতিহ্য ধরে রাখায় বিশ্বাসী। আমার ধারণা, যেভাবে আঙুরলতা সযত্নে মাটির প্রলেপের আচ্ছাদনে কঠোর শীতের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে, তা এই ঐতিহ্যের কারণেই।

উজাতেই আমার কাছে কাশগর হয়ে এসে পৌঁছেছিল বহু প্রত্যাশিত একগুচ্ছ চিঠি। চিঠিগুলো এসেছিল আমার বাড়ি ও ভারত থেকে। এর কিছু জরুরি উত্তর পাঠানোর দরকার ছিল যা আমি সেরে নিয়েছিলাম উজাতে বসেই। ১৫ নভেম্বর খোটানে ফেরার জন্য যাত্রা শুরু করি। কোহমারি পর্বতের প্রান্ত থেকে কালো ছোটো ছোটো পাথরের টুকরো ভরা পথ দিয়ে এসে পৌঁছই কোসা নামে এক গ্রামে। গ্রামের আশেপাশে সেচ সমৃদ্ধ চাষের উর্বর জমি। পপলার আর উইলো গাছের সার পাতা ঝরিয়ে শীতের আগমন ঘোষণা করে দিয়েছিল। আর ধুলোঝড় স্বাগত জানিয়েছিল গ্রামের রাস্তায়।

পুরাকীর্তি সন্ধানের প্রস্তুতি

খোটানে কয়েকদিন বিশ্রাম প্রয়োজন ছিল দলের লোকজন ও পনিদের ক্লান্তি দূর করে চাঙ্গা করে তোলার জন্য। তা ছাড়া আমার দলের কিছু লোক যারা মাস খানেক সময় ধরে খোটানের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নানা পুরাকীর্তি সংগ্রহ করে নিয়ে খোটানে পাঠিয়েছিল, সেগুলো পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেবার দরকার ছিল। আমি খোটানে এসে পৌঁছবার পরপরই আমার পাঠানো লোকেরাও ফিরে আসতে শুরু করেছিল। ইউরুং-কাশ ক্যান্টনের একটি গ্রামের তুর্দি নামের এক অভিজ্ঞ ধন-শিকারির নেতৃত্বে আমার লোকেরা মরুর নানা অঞ্চলে গিয়েছিল পুরাকীর্তির নমুনা সংগ্রহে।

Sand-buried ruins of Khotan : personal narrative of a journey of

তুর্দি নিজে গিয়েছিল সবচাইতে দূরে দান্দান-উইলিক-এ (হাঁতির দাঁতের ঘর)। যেসব নমুনা এরা সংগ্রহ করে নিয়ে এসেছিল, তা পরীক্ষা করে আমি নিঃসন্দেহ হয়েছিলাম, মরুর এই বিস্তৃত অঞ্চল একসময় বৌদ্ধদের উপাসনাক্ষেত্র ছিল। সংগ্রহ করে আনা পুরাকীর্তির মধ্যে কয়েকটি চুনের প্লাস্টারের (ফ্রেস্কো) টুকরোর মাঝে ভারতীয় ব্রাহ্মী অক্ষর খোদিত ছিল। মরুর গভীরের যেখান থেকে এই পুরাকীর্তি সংগ্রহ করে আনা হয়েছিল তা খোটান থেকে উত্তরপূর্বে ১০ দিনের পথ। ড. হেডিন তাঁর ‘কেরিয়া দরিয়া’ যাত্রায় এই ধ্বংসস্তূপ দেখেছিলেন, সেই অভিযানের কথা উনি লিখেছিলেন ‘তাকলামাকানের প্রাচীন শহর’ গ্রন্থে। আমার লোকেদের ভাষ্যের সঙ্গে ড. হেডিনের বর্ণিত জায়গার হুবহু মিল। যদিও তিনি সেখানে পৌঁছেছিলেন মরূদ্যানের উত্তর প্রান্ত তাওয়াক্কেল হয়ে অন্য পথ ধরে। খোটানের আম্বান প্যান-ডারিনকে সংগ্রহীত ফলাফল সম্পর্কে জানাতে, উনি সঙ্গে সঙ্গে তাওয়াক্কেল-এর বেগকে খবর দিয়েছিলেন ড. হেডিনের অভিযানে যাওয়া দুই পথপ্রদর্শককে আমার কাছে পাঠাতে। ২০ নভেম্বর তাওয়াক্কেল-এর বেগ নিজে আহমদ মেরগেন এবং কাসিম আখুন নামের দুই পথপ্রদর্শককে সঙ্গে করে নিয়ে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন আমার কাছে। এই দুজনের সঙ্গে কথা বলে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েছিলাম দান্দান-উইলিক-এ অবস্থান সম্পর্কে। খনন কোথায় শুরু করব সে জায়গা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলাম নির্দ্বিধায়।

খোটানে ফিরে এসেই আমি আম্বানের সঙ্গে দেখা করে ধন্যবাদ জানাতে গেছিলাম। কারণ, ওঁর সক্রিয় সাহায্য না পেলে পাহাড়ে জরিপের কাজ করা সম্ভব হত না। ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে আমার আগামী মরু অভিযান নিয়েও কথা হয়েছিল; ওঁকে বলেছিলাম সংগ্রহ করে আনা প্রত্নতত্ত্বের নমুনার কথা যা এই অঞ্চলে একদা ‘তাং-সেং’-এর উপস্থিতির কথা প্রমাণ করে। ওঁর সঙ্গে দেখা করার ঠিক দু-দিন পর উনি আমার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে আমি ওঁকে তুর্দির সংগ্রহ করে আনা নমুনাগুলো দেখাই। উনি খানিক স্বস্তি পেয়েছিলেন এই দেখে যে মরু অভিযানে হারিয়ে যাওয়া তীর্থস্থান খুঁজে বের করার জন্য সঠিক লোকেরা আমার সঙ্গে থাকছে। ওঁর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাযা আমার ছিল না, কিন্তু আমার দোভাষী নিয়াজ দুর্দান্তভাবে আমার হয়ে ওঁকে আমার মনের কথা বলেছিল। বিদায় নেবার আগে আবারও তিনি সমস্তরকম সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছিলেন।

পাহাড় থেকে নেমে এসে আমি আবার গিয়ে তাঁবু খাটিয়েছিলাম আখুন বেগের বাগানে। এখানে কেউ আমাকে বিরক্ত করতে না এলেও শীতের হাওয়া কাবু করে দিচ্ছিল। পাহাড় থেকে নেমে আসার পর আখুন বেগের ঘরগুলো আমার দম-বন্ধ লাগছিল, তাই শীতে কষ্ট পেলেও তাঁবুতেই থাকব বলে ঠিক করে নিয়েছিলাম। পাহাড়ে অনেক জিনিস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেগুলোর জরুরি মেরামত প্রয়োজন ছিল। কামার, দর্জি, স্যাডলার এদের নিয়ে লেগে পড়েছিলাম ছিঁড়ে-ফেটে যাওয়া সব সারাই করে নিতে। বাগানে বসে আমার সামনেই সবকিছু মেরামত হচ্ছিল। প্রাচীন জিনিস যেমন সিলমোহর, মুদ্রা, মাটির পাত্র বিক্রি করার জন্য রোজই কিছু না কিছু লোক হাজির হত। কিন্তু একজন লোকও আমার কাছে প্রাচীন পুথি বিক্রি করার জন্য আসেনি। ওরা বোধ হয় বুঝে গেছিল যে প্রাচীন পুথি তৈরি করার কারবারের কথা আমি জেনে গেছি।

এখানে আমার দিনগুলো শুধু অভিযানের তদারকি বা প্রস্তুতিতেই কাটেনি, আমাকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল স্থানীয় লোকেদের চিকিৎসা করতে। স্থানীয় বেগ থেকে চাইনিজ অফিসিয়ালদের পাঠানো রোগীদের ফেরাতেও পারছিলাম না। আমার ‘ট্যাবলয়েড’-এর বিস্ময়কর কাজ দেখে আমাকে বড়ো মাপের হেকিম ধরে নিয়েছিল স্থানীয়রা। শুধু তাই নয়, আমার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো জেলা জুড়ে। রকমারি রোগী দেখে আমার মনে হয়েছে খোটান হল রোগের আখড়া। সব রোগের নিরাময় করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এখানে যদি কোনও সত্যিকারের ডাক্তার আসেন তাহলে যে তাঁর পসার দ্রুত জমে যাবে তাতে সন্দেহ নেই। যদিও তিনি উপযুক্ত ফি পাবেন কি না তাতে সন্দেহ আছে। কারণ, এই অঞ্চলের মানুষ দাতব্যই আশা করেন। যদিও আমার কাছে যারা চিকিৎসার জন্য আসত তারা অধিকাংশই দরিদ্র শ্রেণির মানুষ। অবাক লাগে, চাইনিজ অফিসিয়ালরা ভালোই জানেন যে বিপুল সংখ্যক দরিদ্র মানুষদের দাতব্য চিকিৎসা প্রয়োজন, কিন্তু সেই পরিষেবা দেবার কোনও উদ্যোগ আমার নজরে আসেনি।

obhijaan89 (4)

দীর্ঘ সময় মরূদ্যান থেকে বহুদূরে ভয়ংকর মরুর বুকে যে থাকতে হবে, তা নিশ্চিত হয়ে গেছিল। তাই যাত্রা শুরুর আগে খোটান মরূদ্যানের মধ্যে ঘুরে এই অঞ্চলের প্রাচীন ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পেতে চাইছিলাম। পাশাপাশি রাম সিংকে একা কুয়েন-লুয়েন পিক নং ৫-এর পুবদিকে পাঠাতে মনস্থ করেছিলাম যাতে করে আমাদের সাম্প্রতিক জরিপের মধ্যে থেকে যাওয়া কিছু ফাঁক ভরাট করা যায়। এর মধ্যে আছে ক্যাপ্টেন ডেইসির পোলু অঞ্চলে অভিযানকৃত কিছু পথ। রাম সিং তার কাজ শেষে মাস খানেক পর দান্দান-উইলিকে আমার দলের সঙ্গে যোগ দেবে বলে ঠিক হয়েছিল।

২৩ নভেম্বর আমাদের দুই দল খোটান ছেড়ে যমদা গ্রাম পর্যন্ত একসঙ্গে গিয়ে আলাদা হয়ে যায়। ইউরুং-কাশ নদীর ধারের এই গ্রামে আগে এসেছিলাম কারাংঘুটাঘ যাবার পথে। যমদা গ্রামে সেই রাত কাটিয়েছিলাম। গ্রামের মানুষজন বিশেষ করে পূর্বপরিচিত ছোটোখাটো চেহারার ওয়াং-দালোইয়ের অভ্যর্থনা মন ভরিয়ে দিয়েছিল। পিকিং থেকে এসে গত দশ বছর ধরে ওয়াং-দালোই এই গ্রামে থেকে ইউরুং-কাশ নদী থেকে জেড পাথর সংগ্রহ করে বিক্রি করে। ওয়াং জেড মাইনিং করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সফল হয়নি। আমার দোভাষী জানিয়েছিল, ওয়াং বিশ্বাস করে যে জেড পাথর বিক্রি করে সে একদিন অনেক অর্থ জড়ো করতে পারবে আর ফিরে যাবে পিকিং-এ। আমি টের পেয়েছিলাম, এই অঞ্চল সম্পর্কে ওয়াং অনেক কিছু জানে। বিশেষ করে ইউরুং-ক্যাশের বাঁদিকের অঞ্চল সম্পর্কে। তা ছাড়া সে খানিক তুর্কি জানাতে আমার কথাবার্তা চালাতে সুবিধা হয়েছিল। পরদিন সকালে এমন একটি জায়গার ওপর দিয়ে গিয়েছিলাম যেখানে নদীর কিনারায় প্রায় এক বর্গকিলোমিটার জায়গা জুড়ে পড়ে ভাঙা প্রাচীন মাটির পাত্রের টুকরো। এমনকি তাং রাজবংশ সময়কালের প্রাচীন মুদ্রা পর্যন্ত নজরে এসেছিল, কিন্তু কাঠামোগত কোনও নিদর্শন খুঁজে পাইনি।

মাইল ছয়েক পেরিয়ে আমরা এমন এক জায়গায় পৌঁছেছিলাম যেখানে নদীর বুকে বা ধারে জেড পাথর পাওয়া যায়। নদীর বাঁ ধারে আধমাইল মতো নুড়িভরা সমতল গিয়ে মিশেছে এক পাথুরে ঢালে। ইউরুং-কাশ স্রোতবাহিত এই নুড়ি-পাথরের সাম্রাজ্য ঘেঁটেই মেলে মূল্যবান জেড পাথর। প্রাচীনকাল থেকেই এই জেড পাথর খোটান অঞ্চলকে পুরো পুবে বিখ্যাত করে রেখেছে। খোটানের জেড পাথরের চাহিদা ও দাম সবচাইতে বেশি। প্রাচীন খোটানের খ্যাতির যা ইতিহাস পাওয়া যায়, তার পেছনে এই জেড পাথরের ভূমিকা অনেকটাই।

চালমাকাজানের জেড পিটস

খানিক উৎসাহ নিয়ে জেড পাথরের খোঁজে নদীর কিনারায় খোঁড়া গর্তগুলো খানিক হাতিয়ে দেখেছিলাম। কোনও মানুষের দেখা নেই, গর্তগুলোও অধিকাংশ বুজে গেছে উড়ে আসা মরুবালিতে। কিন্তু চালমাকাজান পৌঁছতেই নজরে এসেছিল সদ্য খোঁড়াখুঁড়ির চিহ্ন। এখানেও নদীর কিনারা থেকে ভাঙা প্রাচীন মৃৎপাত্র, কাচের টুকরো আর ধাতুর গলিত অংশ পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে। বিস্তৃত অঞ্চলের মাঝখানে পাথরের একটা ছোটো ঢিবি আমার নজর কেড়েছিল। ওর গোল আকৃতি দেখেই বুঝেছিলাম এটি ‘স্তুপা’ না হয়ে যায় না। ভালো করে পরীক্ষা করে নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম বৌদ্ধ মঠের অস্তিত্ব। আমার দুর্ভাগ্য, আমার আগেই এই মঠের অস্তিত্ব টের পেয়েছিল ধন শিকারিরা; একটা লম্বা খোঁড়া গর্ত তাদের কাজের প্রমাণ রেখে গেছে। মাপজোক করে দেখেছিলাম, ঢিবির ব্যাস প্রায় আটানব্বই ফুট আর মাটি থেকে ফুট পনেরো উঁচু। খানিক খোঁড়াখুঁড়ি করে দেখেছিলাম, ধ্বংসস্তূপের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল অসমান পাথর দিয়ে, আর তার ওপর বৃত্তাকার দেওয়াল তৈরি হয়েছিল মাটি আর পাথর মিশিয়ে।

একসময় এখানে যে ছোটো জনপদ ছিল এবং তা গড়ে উঠেছিল এই জেড মাইনিংকে ভিত্তি করে—এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। নদীর বামপাশের জেড খনন এখনও নিয়মিত হয়। এখান থেকে মাইল দেড়েক হেঁটে পৌঁছেছিলাম সিরিক-টোঘরাকের জেড খুঁজিয়েদের ডেরায়। এখানে নদীর কিনারার বালি-পাথর সরিয়ে জেড খুঁজে পাওয়ার বর্গকার বা আয়তাকার খাদগুলো নয় নয় করেও দশ থেকে কুড়ি ফুট গভীর। যদিও বড়ো আকারের জেড পাথর খুব কমই জোটে, কিন্তু এই বিশাল আকৃতির খাদানের রূপ, খোটান ও তুর্কিস্থানের শহুরে ‘বাইস’ বা লগ্নিকারীদের এখানে টেনে আনার জন্য যথেষ্ট। লগ্নিকারীরা এখানে হতদরিদ্র কৃষকদের নিয়ে এসে কুড়ি থেকে তিরিশ জনের দল তৈরি করিয়ে জেড খননের কাজ করায়। বিনিময়ে খাবার, জামাকাপড় আর মাসে ছয় খোটান টাঙ্গা (ভারতীয় মুদ্রায় দু-টাকা মতো) পায়। খনন করে যেসব পাথর পাওয়া যায় তাতে শ্রমিকদের কোনও অধিকার থাকে না, তবে বিশেষক্ষেত্রে কখনো-সখনো পুরস্কারস্বরূপ কিছু অতিরিক্ত অর্থ জুটে যায়। তবে ওয়াং-দালোইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এই খনিতে লগ্নিকারকদের টাকা ডুবেই যায়, ফেরত পায় না প্রায় কিছুই। তবে একেবারে যে কিছুই মেলে না তা নয়, মাঝে মাঝে বড়ো জেড পাথরের টুকরোও বেরিয়ে আসে খাদান থেকে। এক লগ্নিকারীর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল; তিনি জানিয়েছিলেন, গত তিন বছরে খনিতে তিরিশ ‘ইয়াম্বাস’ (রুপোর বার) খরচ করে প্রায় একশো ‘ইয়াম্বাস’ কামিয়েছেন—ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় তেরো হাজার টাকার কাছাকাছি।

Sand-buried ruins of Khotan : personal narrative of a journey of

এই জেড খননের ওপর চাইনিজ কর্তৃপক্ষ কোনোরকম নিয়ন্ত্রণ জারি করেনি। যদিও খননকারীদের মধ্যে কোনও বিবাদও নেই। কোনও খনি-খাদই কুড়ি ফুটের বেশি গভীর নয়। আমার ধারণা, এর বেশি খুঁড়লে সেখানে জল জমে কাজ বন্ধ হয়ে যাবে—এটা এরা ভালোই জানে। জেড খননের কাজ শুধু নদী সমতলেই সীমাবদ্ধ। যেখানে নদী পাহাড়ের সীমায় সেখানে কেউ খননের কাজ করেনি। ছোটো ছোটো দলে নদী কিনারায় খননের কাজ হয়ে চলেছে। খনি খননের দলকে স্থানীয় ভাষায় ‘কুমাট’ বলে। এই শীতের সময় এখানে প্রায় শ-দুয়েক মানুষ কাজ করে চলেছে। গরমকালে এই সংখ্যাটা দ্বিগুণেরও বেশি হয়।

জেড খননকারী ছাড়াও গরমের সময় আরও একদল জেড-সন্ধানী এখানে হাজির হয়। তবে তারা নদীর ধারে বালি-পাথর সরিয়ে জেড খোঁজে না, হিমবাহ গলা জলে বা বর্ষায় প্লাবিত হয়ে যাওয়া নদী তীরে ওরা চাইনিজ প্রাচীন ইতিহাসে বর্ণিত ঢঙে বালি-পাথর ছাঁকনিতে চেলে মাছ-ধরার কৌশলে জেড পাথর খুঁজে ফেরে। তখন পুরো যমদা উপত্যকা ছেয়ে যায় খোটান মরূদ্যান থেকে ভাগ্য অন্বেষণে আসা কৃষকের ভিড়ে। খুব কম লোকের ভাগ্যেই শিকে ছেঁড়ে। কিন্তু শতাব্দী প্রাচীন প্রথা একইরকমভাবে এখনও বহমান।

ইয়োটকান—খোটানের প্রাচীন রাজধানীতে

২৫ নভেম্বর খোটানের প্রাচীন রাজধানী ইয়োটকানে পৌঁছই। এর আগে অক্টোবর মাসে এই জায়গাটা একবার আমি ঘুরে গেছিলাম। এখানে আসার পথে বর্ষার জলে সৃষ্ট দুটো গভীর নদীখাত পার হতে হয়েছিল। সারাবছর জল না থাকলেও বর্ষায় ভরে যায় এই নদীখাতগুলো। খাতের কিনারা খুব খাড়া হলেও আমার পনি নদী খাতে নেমে উঠেও এসেছিল অক্লেশে। দলের আগে নদী পার হয়ে আসার সময় মালপত্রবোঝাই উটগুলো নদী পার হতে পারবে কি না এ-প্রশ্ন আমার মাথায় আসেনি। ইয়োটকানে পৌঁছে ইজবাশির বাড়ির কাছে তাঁবু খাটানোর একটা উপযুক্ত জায়গা বেছে ইজবাশির বাড়িতে অপেক্ষা করছিলাম দলবলের জন্য। সচ্ছল ইজবাশি আমাকে যে ঘরে নিয়ে বসিয়ে ছিলেন সেই ঘরটি খুবই আরামদায়ক। ঘরের এককোণে আগুন জ্বলছিল। মেঝে ঢাকা খোটানের বিখ্যাত পুরু রঙিন কার্পেটে। আমার সময় দ্রুত মজায় কেটে যাচ্ছিল ইওলচি বেগ আর ইজবাশির খুদে লাল টকটকে গালের ছেলের সঙ্গে খেলা করতে করতে।

সন্ধে গড়িয়ে ঘন অন্ধকার নেমে আসার পর এসে হাজির হয়েছিল আমার এক উটচালক। উটচালকের সঙ্গে উট না থাকাতে খানিক অবাক হয়েছিলাম। আমি অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষায় ছিলাম আমার তাঁবু আর ব্যাগের জন্য। উটচালক জানিয়েছিল নদীর বুক থেকে মালপত্রসহ উটগুলোকে খাড়া পাড় বেয়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ইজবাশি সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু লোক পাঠিয়ে দিয়েছিলেন উটগুলোকে নদীর পাড়ে তুলে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে। আমার সন্দেহ হয়েছিল, যাদের পাঠানো হয়েছিল, সেই সরল সাধাসিধে লোকগুলো কতটা কী করতে পারবে তা নিয়ে। খানিক এগিয়ে দেখি যা ভেবেছিলাম তাই, লোকগুলো অন্য কিছু লোকের ওপর দায়িত্ব দিয়ে ইজবাশির বাড়ি থেকে সামান্য এগিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। রাত দশটা নাগাদ আমার লোকজন উটের দল নিয়ে হাজির হয়েছিল। ওরা চেষ্টা করেছিল আমার ব্যক্তিগত মালপত্রসহ উটটাকে আগে পাঠানোর, কিন্তু সেটা একটা নালা পার হতে গিয়ে মালপত্রসহ উলটে জলে পড়েছিল। সেটাকে যখন টেনে তোলা হয়েছিল ততক্ষণে আমার মালপত্র সব ভিজে গেছে। রাতের খাবার খেতে খেতে প্রায় ভোর হয়ে গেছিল আর রাতে ঘুমোতে হয়েছিল একটা কম্বল জোগাড় করে। নদীর খাড়া ঢাল আমার উটগুলোর কাছে খানিক বাধা হয়ে দাঁড়ালেও আমার অভিযানে এদের ভূমিকা অপরিহার্য  ছিল।

মরুর মাঝে এই নদীখাত যদি সৃষ্টি না হত, তাহলে খোটানের পুরোনো রাজধানীর অস্তিত্ব যে কতকাল বালির তলায় চাপা পড়ে থাকত বা কোনোদিন জানা যেত কি না কে জানে! ইয়োটকান গ্রামসংলগ্ন চাষের ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া চিলতে নদীর নাম ‘ইয়োটকান ইয়ার’। গ্রামের বৃদ্ধরা জানিয়েছিল, ইয়াকুব বেগের অধীনে নিযুক্ত গভর্নর নিয়াজ হাকিম বেগ প্রথম এই প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষের খানিকটা খুঁড়ে বের করেন।

আচমকাই খুঁজে পাওয়া গেছিল এই প্রাচীন শহরের অস্তিত্ব। নিয়াজ হাকিম বেগ গভর্নর হয়ে আসার বছর তিনেক পর ১৮৬৬ সালে ইয়োটকানের মরূদ্যানে চাষের ক্ষেতে জলের জোগান বাড়ানোর জন্য কারা-কাশ নদীর জল বয়ে নিয়ে আসা খালকে গভীর করে কেটে একটা ‘ইয়ার’-এ (নদীতে) পরিণত করার কাজ শুরু করেছিলেন। এই খাল শুরু হয়েছে ইয়োটকানের পশ্চিমে মাইল দেড়েক দূরের পাহাড়ের গোড়ায় চালবাশ নামের এক গ্রামের পাশ থেকে। ওখানেই আছে এক জলাভূমি। খাল গভীর করার কাজ শুরু হতে এক শ্রমিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা অসংখ্য পুরোনো দিনের মাটির পাত্রের মাঝে একটুকরো সোনা দেখতে পায়। মাটির পাত্র শ্রমিকদের কাছে কোনও আকর্ষণীয় বস্তু না হলেও সোনা পাওয়াটা চমকপ্রদ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে শ্রমিকরা সোনা আর জেড পাথর খোঁজায় মত্ত হয়ে পড়ে। খবরটা গভর্নরের কানে পৌঁছতে সময় নেয়নি।

নিয়াজ হাকিম একজন করিৎকর্মা প্রশাসক ছিলেন। তিনি শহর থেকে বেশ কিছু জেড খননে অভিজ্ঞতা আছে এমন লোককে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। যেসব জমি মালিকের জমিতে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলছিল তাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করেছিলেন এইভাবে যে, মূল্যবান যা সামগ্রী খননকারী পাবে তার অর্ধেক মুল্য পাবে জমির মালিক আর অর্ধেক পাবে খননকারী। মাটি খুঁড়লেই তো হবে না, সেই মাটি ধুয়ে চালার জন্য প্রয়োজন ছিল প্রচুর জলের। খালের বুক ও তার আশেপাশের আয়তাকার অঞ্চল গভীর থেকে গভীরে পৌঁছচ্ছিল। সোনা আর জেডের খোঁজে খাল গভীর হতে হতে ২০ থেকে ৩০ ফুট গভীর হয়ে গেছিল, আর পাশের জলাভূমির জল সব এসে পড়েছিল খালেতে। জলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়ায় খননের পুরো জায়গা জলমগ্ন হয়ে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ বন্ধ হয়ে গেছিল। জলাভূমি বাঁচাতে আবার মাটি ফেলে খালের উচ্চতা বাড়াতে হয়েছিল। কিন্তু খোঁড়াখুঁড়ির ফলে বার হয়ে এসেছিল পুরোনো শহরের অস্তিত্ব। গ্রামের লোকেরা জানিয়েছিল, এই খোঁড়াখুঁড়ির আগে পুরো অঞ্চলটা প্রায় সমতল ছিল, এমনকি নদীর কিনারাও এত খাড়া ছিল না, তার চাইতে বড়ো কথা প্রাচীনকালে এখানে যে একটা বড়ো শহর ছিল তাও টের পায়নি তারা।

Sand-buried ruins of Khotan : personal narrative of a journey of

এর আগে ইয়োটকানে যেসব বিদেশি পর্যটক স্বল্প সময়ের জন্যে এসে ঘুরে গেছেন এবং এখানকার ‘মাটিতে ভয়াবহ ধ্বংসলীলা’ চলে বলে বর্ণনা করেছেন, তাঁরা সম্ভবত এই অঞ্চলের ভয়ংকর বন্যা প্রবণতা ও তার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে এই মন্তব্য করেছেন। যা অবশ্যই সত্যি। কিন্তু আমার জরিপ ও অভিমত বলে, প্রায় দেড় মাইল জায়গা জুড়ে সোনা খুঁজে বের করার জন্য গভীর খননের ফল এই অঞ্চলের ভয়াবহ ধ্বংসলীলা। সোনা খুঁজিয়েরা আজও সমানভাবে সক্রিয়। শুধু সোনা নয়, এইখানে খনন করে পাওয়া পাথরে খোদিত মূর্তি, কারুকাজ করা মাটির পাত্র, প্রাচীন মুদ্রা বিক্রি করে ভালোই উপার্জন করে ধন-সন্ধানীরা। আমি এখান থেকে পাওয়া খানিক সোনার টুকরোর নমুনা সংগ্রহ করেছিলাম। যদিও এখানে সোনার গহনা বা মুদ্রা পাওয়া যায় বা গেছে বলে গ্রামবাসীরা স্বীকার করেনি, কিন্তু এটা স্বীকার করা হয় যে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করার সময় ভালো পরিমাণে সোনা পাওয়া গেছিল—সোনা ছিল মূলত পাত বা দানার আকারে। আমি ইয়োটকান থেকেই একটি ছোটো সোনার তৈরি নিখুঁত বাঁদরের মূর্তি সংগ্রহ করেছিলাম যা খনন শুরু হবার কালে পাওয়া; যদিও আমার ধারণা, কোনও কারণে এসব পেলেও এরা তা কাউকে জানাতে চায় না, বরং তা সঙ্গে সঙ্গে গলিয়ে ফেলে।

বিশাল অঞ্চল জুড়ে সোনার ছড়াছড়ি অবিশ্বাস্য বলে মনে হতেই পারে। এসেছে কোথা থেকে এতো সোনা, বিশেষ করে সোনার পাত! চৈনিক তীর্থযাত্রী ফা-হিয়েন তার খোটান সফরের বর্ণনায় (আনুমানিক ৪০০ খ্রিস্টাব্দে) এর উত্তর দিয়ে গেছিলেন অনেকটাই। শুধু বৌদ্ধ মন্দির, মঠ ও মূর্তিতেই নয়, দালানকোঠা অলংকরণে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত সোনার পাতের উপস্থিতির কথা তিনি বলে গেছেন। এই কাঠামোগুলো কালের গতিতে ভেঙে চুরমার হয়ে বালির তলায় চাপা পড়ে গেলে সোনার পাত ও সোনার দানা বালি আর মাটিতে গিয়ে মিশেছে, যা এখন বালি চেলে ধোয়ার ফলে বেরিয়ে আসছে অন্যান্য সামগ্রীর সঙ্গে।

এখানে মাটির নীচের স্তর যা থেকে সোনার টুকরো পাওয়া যাচ্ছে তা মূলত পচনশীল আবর্জনার স্তূপ থেকে।

Sand-buried ruins of Khotan : personal narrative of a journey of

ভাঙাচোরা প্রাচীন মাটির পাত্র, প্রাণীর হাড়, ছাই, কাঠ আর ঘরবাড়ি কাঠামোর টুকরো মাটির নীচের স্তর জুড়ে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মাটির তলায় চাপা পড়ে রয়েছে এইসব সামগ্রী। বছরের পর বছর ধরে পলি আর বালি জমা হয়েছে এক ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরের ওপর। তামার মুদ্রা যেসব পাওয়া গেছে তাতে রয়েছে নানা ভাষিক দেশীয় শাসকদের প্রতীক। তাতে যেমন রয়েছে প্রাচীন ভারতীয় খরোষ্ঠী অক্ষর, তেমনি চিনা অক্ষরও। মাটির তলা থেকে বেরিয়ে এসেছে তাং রাজবংশের বর্গাকার মুদ্রা যা ৬১৮ – ৯০৭ খ্রিস্টাব্দকালীন সময়ে প্রচলিত ছিল।  পাললিক শিলায় পরিণত হওয়া মাটির স্তরের হালকা বাদামি রঙ প্রমাণ করে, এই স্তর বহু শতাব্দী প্রাচীন। নদীর দক্ষিণে আর পশ্চিমে এই স্তরের শুরু মাটির পাঁচ থেকে আট ফুট গভীরে। কিন্তু খননকৃত এলাকার উত্তরে, যেখানে প্রাচীন জিনিসপত্র যেমন টেরা-কোটা মূর্তি, সিলমোহর ইত্যাদি পাওয়া গেছে সেখানে এই স্তরের শুরু তেরো থেকে চৌদ্দ ফুট গভীরে। এটা স্পষ্ট, গভীরতার তারতম্য এসেছে সময়ের দীর্ঘতার জন্য। শুধু তাই নয়, মাটির পাত্র, হাড়ের টুকরো ইত্যাদি এক-একজায়গায় এক-এক পরিমাণে পাওয়া গেছে। যদিও একদিক থেকে দেখতে গেলে পুরো অঞ্চল জুড়ে প্রাপ্ত পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে একটা সামঞ্জস্য আছে। কিন্তু কোথাও কোনও ইমারতের ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন পাওয়া যায়নি—না এখন, না সাম্প্রতিক অতীতে। এতে করে ধরে নেওয়া যেতে পারে যে এই অঞ্চলে ইমারত তৈরির জন্য উপযুক্ত পাথর পাওয়া যায়নি। ফলে এই অঞ্চলে ঘরবাড়ি নির্মিত হয়েছিল রোদে শুকানো ইট, কাদামাটি আর কাঠ দিয়ে। এমনকি এখনও খোটানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ঘরবাড়ি নির্মাণে মূলত এইসব ইমারত সামগ্রীই ব্যবহার করা হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চাষের কারণে খনন করা সেচ খালের কল্যাণে মাটির আদ্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মাটি আর কাঠে তৈরি বাড়িঘর দ্রুত তার শক্তি হারিয়েছে। আবার এরকমও হতে পারে আকস্মিক কোনও বিপর্যয়ে প্রাচীন শহরটি ধ্বংস হয়ে গেছিল এবং অঞ্চলের বাসিন্দারা সব ছেড়েছুড়ে চলে গিয়েছিলেন। কালের গর্ভে চলে গিয়েছিল পুরো শহর। যদিও মাটির তলায় প্রাপ্ত ধ্বংসাবশেষের নমুনা পরীক্ষা করে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারিনি।

পুরো ধ্বংসাবশেষ নয় থেকে চোদ্দ ফুট গভীর পলিমাটির স্তরের তলায়। ওপরের স্তরে যেখানে মাটির রঙ হালকা সেখানে কোনও পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন মেলেনি, মিলেছে আরও গভীর স্তর থেকে। পুরো বিষয়টাই আমাকে আগ্রহী করে তুলেছিল। ইয়োটকান পরিদর্শন করা আমার পূর্ববর্তী ইউরোপীয় পর্যটকরা দাবি করে গেছেন, এখানে শহর ধ্বংস হবার মূলে বন্যা। কিন্তু খনন করা খাতগুলো বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে পরীক্ষা করে আমার এ-কথা মনে হয়নি। বন্যা এই শহর ধ্বংসের কারণ নয়। খাদের মাটিতে বন্যা বা ধারাবাহিক বন্যার ফলে যে স্তরবিন্যাস হয় তার বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই।

Sand-buried ruins of Khotan : personal narrative of a journey of

তাহলে একটা গোটা শহর বা জনপদ মাটির তলায় চাপা পড়ার কারণ কী হতে পারে! আমার মতে, এত বড়ো জনপদ মাটির তলায় চাপা পড়ে গেছে নদীর পলি জমে। খোটান-সহ তুর্কিস্থানের সব জায়গায় চাষবাস পুরোপুরি সেচের ওপর নির্ভরশীল। ইয়োটকানের চাষের ক্ষেতে বসন্ত আর গ্রীষ্মে নদী থেকে সেচ খালের মাধ্যমে জল পাঠানো হয়। আর এখানে নদীর জল প্রচুর পরিমাণে পলি বয়ে নিয়ে আসে পাহাড় থেকে। আর জলের সঙ্গে বয়ে আসা পলি জমতে থাকে ক্ষেতের উপরিতলে। বিশাল পরিমাণ পলি যেমন চাষের জমিকে সমৃদ্ধ করে, তেমনি জমির উচ্চতাও বাড়িয়ে দেয়। শয়ে শয়ে বছর ধরে পলি বিশেষ করে নদীর তীরবর্তী অংশে জমতে জমতে চাপা দিয়ে দিয়েছে সবকিছু।

ইয়োটকান সম্পর্কিত আমার পর্যবেক্ষণ আমার তত্ত্বকে সমর্থন করবে বলে আমার ধারণা। পুরো মরূদ্যান অঞ্চলে দেখেছি প্রধান রাস্তাগুলো আশপাশ থেকে যথেষ্ট নীচু। বিশেষ করে যখন সেই রাস্তা চাষের জমির মধ্যে দিয়ে গেছে। যদিও সেই রাস্তা যখন গ্রামের মধ্যে দিয়ে বা অনুর্বর অংশ দিয়ে গেছে, সেই পথ আবার আশেপাশের জমির সঙ্গে প্রায় একই উচ্চতায় আছে। ভালো করে নজর করলেই বোঝা যাবে, আশেপাশের চাষ-জমি উঁচু হয়ে যাওয়া বা রাস্তা নীচু হয়ে যাওয়ার কারণ প্রাকৃতিক হতে পারে না। চাষের জমিতে পলি জমে সেই জমিকে উঁচু করেছে আর অন্য দিকে পলি না জমার ফলে রাস্তা হয়ে গেছে নীচু। শুধু রাস্তাই নয় পুরোনো কবরস্থানগুলোর অবস্থানও চাষের জমির উচ্চতা থেকে নীচে। যেহেতু কবরস্থান বা মাজারে জল জমতে দেওয়া হয় না, তাই সেগুলোর উচ্চতা বাড়েনি।

ইয়োটকানের মধ্যে দিয়ে এঁকে-বেঁকে নদী গিয়েছে পশ্চিম থেকে দক্ষিণে। আর সোনা খুঁজিয়েরা যেসব জায়গায় কাজ করেছিল বা করছে, সে-সব মিলিয়ে পুরোনো শহরের অবস্থান সম্পর্কে খানিক ধারণা তৈরি হয়েছিল। নদীর ধারে অনেক জায়গাতেই সামান্য খুঁড়ে খনন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, কারণ পর্যাপ্ত পরিমাণে সোনা পাওয়া যায়নি। বর্তমানে নদীর পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল জুড়ে যেখানে সোনা খোঁজার কাজ অবিরত হয়ে চলেছে এবং প্রভূত পরিমাণে সোনা পাওয়াও যাচ্ছে সেই অঞ্চলের কাছাকাছি মাটির তলায় পুরোনো শহরের অবস্থান হওয়ার সম্ভবনা অতি প্রবল। নদীর পুবদিক থেকে কোনও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া যায়নি। তাই শহরের অবস্থান সেদিকে হওয়ার সম্ভবনা নেই।

ইয়োটকানের মাটির নীচে লুকায়িত শহরটি যে খোটানের পুরোনো রাজধানী, তাতে সন্দেহ নেই। ফরাসি অভিযাত্রী এম. গ্রেনার্ড এ-কথাটি কিছুদিন আগেই বলেও গেছেন। এই পুরোনো শহরের তত্ত্ব শুধুমাত্র গ্রামবাসীদের কথার ওপরেই ভিত্তি করে নেই। নেই শুধুমাত্র মাটির তলা থেকে পাওয়া পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকেও; এই শহরের উপস্থিতির কথা বলে গেছেন স্বয়ং হিউয়েন সাং। তিনি এই অঞ্চলের বেশ কিছু বুদ্ধমন্দির পরিদর্শন করেছিলেন বলেও তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন।

২৮ নভেম্বর সকালবেলা আমি ইয়োটকানের পশ্চিমের গ্রামগুলোর দিকে যাত্রা শুরু করি প্রাচীন শহরের অবস্থান সনাক্ত করার আশায়। প্রথমেই যাই ইয়োটকান থেকে পশ্চিমে ৫ – ৬ লি দূরের (এক মাইলের থেকে খানিক বেশি) ‘সা-মো-জোহ’ নামের এক তীর্থস্থানে। এখানে অবস্থিত এক স্তূপ মহান পরিব্রাজক দর্শন করেছিলেন। এই স্তূপটি তৈরি হয়েছিল এক আরহাতের প্রতি সম্মান জানাতে। যিনি এক বৌদ্ধ রাজাকে বিশেষ অলৌকিক শক্তি দ্বারা রক্ষা করেছিলেন। একশো ফুটেরও বেশি উঁচু এই স্তূপের নীচে বুদ্ধের দেহের অংশ প্রোথিত হয়েছিল বলে কথিত। ফা-হিয়েনও এই মঠ পরিদর্শন করে তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে লিখেছিলেন—‘মহামান্য বুদ্ধের সম্মানে তৈরি এক অনন্যসাধারণ মঠ।’ আমার আগের অভিজ্ঞতা থেকে আমি বুঝে গেছিলাম, চাষের জমির মাঝে  মঠের ধ্বংসাবশেষ বলে আর কিছু পাওয়া যাবে না, খানিক রোদে শুকনো ইট ছাড়া।

প্রাচীন শহরের দেহের ওপরকার খোঁড়াখুঁড়ি অংশ ছাড়িয়ে পশ্চিমে আধা মাইল দূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গোটা তিরিশেক বাড়ি নিয়ে এসকেন্ট গ্রাম। গ্রামে পৌঁছেই সবার প্রথমে হানা দিয়েছিলাম স্থানীয় মাজারে। দেখেছি, যে-কোনো গ্রামেই খবর সংগ্রহের প্রাথমিক উৎস হল মাজার বা উপাসনাক্ষেত্রগুলো। মাজারটাকে ঘিরে ছিল অনেকগুলো কবরস্থান। গ্রামে গিয়ে আমি সবচাইতে আনন্দ পেয়েছিলাম ‘সোমিয়া’ নামটি শুনে। আমি নিশ্চিন্ত ‘সা-মো-জোহ’ অপভ্রংশে ‘সোমিয়া’ হয়েছে। কয়েকজন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল গ্রামের উত্তর-পূর্ব কোণে চাষের জমির ধারে। একটা ফুট পাঁচেক ঢিবিকে গ্রামের লোকেরা পূজা করে।

Sand-buried ruins of Khotan : personal narrative of a journey of

গ্রামের সবচাইতে বৃদ্ধ মানুষটি ঢিবির ধারে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, প্রাচীন কালে এটি একটি মঠ ছিল বলে সবাই শুনে এসেছেন। গ্রামের লোকেরা এটিকে সোমিয়ার ঢিবি বলে জানেন। প্রায় নব্বই বছরের কুঁজো হয়ে যাওয়া বৃদ্ধটি জানিয়েছিলেন, তিনি তাঁর বাপ-ঠাকুরদার কাছ থেকে শুনে এসেছেন, এই জায়গাটি এতই পবিত্র ভূমি যে তার আশেপাশের জমিতে লাঙল ছোঁয়ানোর কথা চিন্তাতে আনাও পাপ। কোন এক সাধু এই মাটির তলায় বিশ্রাম নিচ্ছেন, তাঁর বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটলে গ্রামের অমঙ্গল হতে পারে। ঢিবিটি ‘সোমিয়া’ নামেই পরিচিত। বৃদ্ধ ও তাঁর স্ত্রী-সহ গ্রামের সবাই জানিয়েছিলেন, গ্রামের লোকেরা এই ঢিবির পাশ দিয়ে গেল প্রার্থনা না করে যান না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই রীতি চলে আসছে।

ঐতিহ্য মেনে সম্মান প্রদর্শন করে এলেও ঢিবির তলায় শায়িত সাধকের নাম অজানাই থেকে গেছে। কিন্তু তিনজন ‘মোল্লা’ যারা এই গ্রামের মাজারকে পবিত্রতার বাঁধনে বেঁধে রেখেছেন, তাঁদের নাম গ্রামে বৃদ্ধ থেকে তরুণ সকলের জানা। সোমিয়ার ঢিবির মতো খানিক আতঙ্কের জায়গা এই অঞ্চলে আর কোথাও নেই বলে জানিয়েছিল গ্রামবাসীরা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, পূজিত হওয়া সোমিয়া নামের নামহীন ঢিবিই বৌদ্ধযুগের ‘সা-মো-জোহ’ তীর্থক্ষেত্র।

দিনভর খোঁজাখুঁজির পর মহান চিনা তীর্থযাত্রীর বলা আরও একটি পবিত্র স্থানের খোঁজ পেয়েছিলাম। হিউয়েন সাং এই প্রাচীন শহরের দশ লি (দু-মাইল) দক্ষিণ-পশ্চিমে ‘তি-কিয়া-পো-ফো-না’ নামের একটি মঠ দেখেছিলেন। সেখানে বুদ্ধের একটা বিশাল মূর্তি ছিল। এই নামের মঠের কোনও অস্তিত্ব আর না থাকলেও হিউয়েন সাং উল্লেখিত অঞ্চলে ‘বোওয়া-কাম্বর’ নামে একটি সমাধি দেখতে পেয়েছিলাম। খোটানের নানা প্রান্ত থেকে যাত্রীরা আসেন বোওয়া-কাম্বর-এ প্রার্থনার জন্য। গাছপালা দিয়ে ঘেরা এটি একটি বর্গাকার সমাধিক্ষেত্র এবং আশেপাশের মাটির স্তর থেকে প্রায় বারো ফুট নীচে অবস্থিত। ‘আলি পাদশাহ্‌’-র অনুগামী বলে কথিত এক সাধুর বিশ্রামস্থল বলে পরিচিত এই সমাধিক্ষেত্র। মাটির বর্তমান উপরিস্তরের অনেক নীচে থাকা এই সমাধিক্ষেত্র প্রমাণ করে এর প্রাচীনত্ব।

সন্ধে নেমে আসায় আমাকে ফিরতে হয়েছিল, না-হলে কোসা নামের গ্রামে গিয়ে ইমাম মুসা কাসিমের মাজার একবার দেখে আসতাম। যদিও উজাত গ্রামে যাওয়ার পথে এর আগে কোসায় গিয়েছিলাম। ইয়োটকানের দক্ষিণে এর অবস্থান দেখে আমার ধারণা, হিউয়েন সাংয়ের পর্যটন বৃত্তান্তে বর্ণিত বিরোচনা-সংহারামার স্থান নিয়েছে এই মাজার, যা প্রাচীন খোটানের বৌদ্ধধর্মের অন্যতম মঠ ছিল। ইয়োটকান থেকে এর দূরত্ব মাইল তিনেকের সামান্য বেশি। খোটানের প্রাচীন রাজধানী থেকে দশ লির মতো দূরত্বে এই মঠের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেছিলেন হিউয়েন সাং। যদিও খোটানের রাজধানীর ব্যাপ্তি ঠিক কতটা ছিল জানা যায়নি।

২৯ নভেম্বর কনকনে ঠান্ডার কুয়াশাভরা সকালে ইজবাশিকে বিদায় জানিয়ে ইয়োটকান ছেড়ে খোটান ফিরে আসার জন্য যাত্রা শুরু করি। আসল মরুযাত্রার প্রস্তুতি আবার ঝালিয়ে নেবার দরকার। ইয়োটকান থেকে মাইল দু-এক যাবার একটা সেতু পার হতে হয়েছিল। ইয়োটকান আর কারা-কাশ নদীর মিলিত জলের ধারা গিয়েছে সেতুর তলা দিয়ে। স্রোত যথেষ্ট গভীর। আমরা যে-পথে এসেছিলাম, সে-পথ দিয়ে না ফিরে খানিক অন্য পথ ধরেছি। নদীর ও-পাড়ে হালালাবাদ নামের এক বিশাল গ্রাম। এই গ্রামটি ভালো করে দেখার জন্য মুখিয়ে ছিলাম। কারণ, এই গ্রামে এমন অনেক স্থানীয় ঐতিহ্য মেনে চলা হয় যা চলে আসছে দেশের প্রাক-মহম্মদ শাসকদের সময়কাল থেকে। গ্রামের মাঝামাঝি প্রায় এক বর্গমাইল জায়গা জুড়ে এক বিশাল জলাভূমি যা এইডিং-কুল নামে পরিচিত। এই জলাভূমি উত্তরে ইউরুং-কাশের সঙ্গে যুক্ত।

এইখানে ইব্রাহিম মোল্লা নামে এক অত্যন্ত বুদ্ধিমান, শিক্ষিত ও ধার্মিক ব্যক্তিকে আমাকে সব ভালো করে দেখিয়ে ও বুঝিয়ে দেবার জন্য ইসলাম বেগ খুঁজে বের করেছিল। ছিয়াশি বছর বয়স ইব্রাহিম মোল্লার। কিন্তু মনেপ্রাণে তরুণ ও শারীরিক দিক থেকে সক্রিয়। আরামদায়ক উজ্জ্বল সিল্ক ও পশমের পোশাক পরে ছিলেন উনি। কোরান পাঠ ও তীর্থযাত্রা ছাড়াও আরামদায়ক জীবনকে উনি সমান গুরুত্ব দিয়েছেন একই সঙ্গে। ইব্রাহিম মোল্লার সংগ্রহে তুর্কি ভাযায় লেখা বেশ কিছু ‘তাযকিরা’ ছিল যা উনি খোটানের বিভিন্ন মাজারের ইমামদের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। উনি সেগুলো দেখিয়ে এবং তার শ্লোক পাঠ করে শুনিয়েছিলেন, যা প্রমাণ করে এই হালালাবাদ একসময় খোটানের কিংবদন্তি বিধর্মী শাসকের ‘খালখাল-আই-চিন-উ-মাচিন’ রাজধানী ছিল। লিখিত জনশ্রুতি বলে, চারজন ইমাম ও তাঁদের অনুগামীরা মিলে এই ইসলাম বিরোধী শাসককে হত্যা করে তাঁর শহরকে ধ্বংস করেছিলেন। সেই চার ইমামের পবিত্র শরীর হাশার এক বিখ্যাত মাজারে বিশ্রামরত। হালালাবাদের জলাভূমির প্রায় আধ-মাইল পশ্চিমে ‘কুম-ই-শাহিদান’-এর মাজার হল সেই স্থান যেখানে ইমামদের তিনশো ষাট অনুগামী বিধর্মী শাসককের সঙ্গে লড়াইয়ে শহিদ হয়েছিলেন।

ইব্রাহিম মোল্লার মতে, ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে কাশগর ও খোটানের শাসক মির্জা আবু-বকর এই স্থানটি গুপ্তধন পাওয়ার আশায় খনন করেছিলেন এবং সেই কাজ করার জন্য খাল খুঁড়ে জল এনেছিলেন যাতে করে খননকারী শ্রমিকরা মাটি ধুয়ে সোনা ও অন্যান্য সামগ্রী খুঁজে বের করতে পারে, ঠিক যেরকম এখন ইয়োটকানে করা হয়। তবে সে-সব খননের কোনও চিহ্ন এখন আর অবশিষ্ট নেই, ফলে এই জনশ্রুতির ঐতিহাসিক ভিত্তি বিচার করা কঠিন। মির্জা আবু-বকরের কর্মকাণ্ডের খোঁজ অনেকটাই ‘তারিখ-ই-রশিদি’-তে উল্লেখিত। তাঁর ভাগনে মির্জা হায়দারের বেশ কিছু আকর্ষণীয় পদক্ষেপের কথাও তারিখ-ই-রশিদিতে পাওয়া যায়, যার মধ্যে নানা স্থানে গুপ্তধনের সন্ধানে খননের কথাও আছে। কিন্তু হালালাবাদ সেই জায়গাগুলোর একটি কিনা তা খনন না করে শুধুমাত্র লোককথার ওপর নির্ভর করে নিশ্চিন্তভাবে বলা সম্ভব নয়। নদীর পাড় পরীক্ষা করে আমার মনে হয়েছে এই নদী প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি, কোনও ইট বা কৃত্রিম খননের নিদর্শন আমার নজরে আসেনি।

শীত জাঁকিয়ে চেপে বসেছে। মরুযাত্রার চূড়ান্ত প্রস্তুতি শেষবারের মতো ঝালিয়ে নিতে খোটানে আশ্রয় নিয়েছিলাম তোখতা আখুনের বাগানে। আমার অভিযানের রিপোর্টগুলো ইউরোপে পাঠানোর জন্য দ্রুত শেষ করে ফেলছিলাম, সঙ্গে চলছিল ব্যাগপত্র পরীক্ষা করে সেগুলো মেরামত করে ঠিকঠাক প্যাক করার কাজ। যতটা সম্ভব ওজন হালকা রাখার চেষ্টা করছিলাম, উটগুলোর সাময়িক দেখভালের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিলাম আফগান ব্যবসায়ী বদরুদ্দিন খানের ওপর। মরুযাত্রার অপ্রয়োজনীয় মালপত্রও তুলে দিচ্ছিলাম বদরুদ্দিনের গুদামে। এই কাজটা করতে হচ্ছিল খুব হিসেব কষে, সবই মনে হচ্ছিল ‘লাগতে পারে’। প্রবল শীতে মরুর মাঝে বিশেষ করে শীত পোশাকের ঘাটতি আমাদের চরম বিপদে ফেলে দিতে পারে।

খেলার পাতায় সমস্ত ধারাবাহিক অভিযান একত্রে

Leave a Reply