সন্ধ্যা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য প্রতিযোগিতা২০২২- সেরা প্রবন্ধ-তৃতীয় স্থান- বাউড়ি জাতির ইতিহাস-চৈতালী রায়-বর্ষা২০২৩

সন্ধ্যা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য প্রতিযোগিতা ২০২২- জয়ী প্রবন্ধগুলো- প্রথম স্থান- প্রভু দাও মোরে আরো চেতনা, যুগ্ম দ্বিতীয় স্থান- ভ্রাম্যমান বেচুবাবুর সঙ্কট,যুগ্ম দ্বিতীয় স্থান-মুণ্ডু ছাড়া বাঁচব নাকি, তৃতীয় স্থান- বাউড়ি জাতির ইতিহাস, চতুর্থ স্থান- এন্টিকাইথেরা দ্বীপের মহাকাশ যন্ত্র, পঞ্চম স্থান-একটি ব্যর্থ আর্কটিক অভিযান, ষষ্ঠ স্থান-ফারাওয়ের রান্নাঘর

probondhobauri

বাউড়ি জাতির ইতিহাস মানেই এক উপেক্ষিত, লাঞ্ছিত ও বঞ্চনার ইতিহাস।

কোনও একটি অঞ্চল অনুপ্রবেশের ফলে দখল হওয়ার আগে সেই অঞ্চলের বাসিন্দাদের আদিবাসী বলা হয়। যুগে যুগে এরা সমাজে নানাভাবে উপেক্ষিত, লাঞ্ছিত ও বঞ্চনার শিকার হয়েছে। যখন এসব অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে নিজেদের অধিকারের সপক্ষে তারা কথা বলেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা দমন, নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছে।

ভারতে এদের উচ্ছেদ করার পেছনে মূল কারণ হল খনি ও কলকারখানা নির্মাণ। সরকার অন্যায়ভাবে আদিবাসীদের জমি কেড়ে নিয়ে তুলে দিয়েছে শিল্পপতিদের হাতে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, অন্তত ১৭টি রাজ্য থেকে ১০ লাখেরও বেশি বনবাসী উপজাতি ও অন্যান্য জনজাতি পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করা হোক।

২০০৬ সালের বনভূমি অধিকার রক্ষা আইনে বলা হয়েছে, যেসব উপজাতি পরিবার বংশপরম্পরায় অরণ্য-ভূমিতে বাস করছে, চাষাবাদ করছে এবং সেখান থেকেই তাদের জীবিকা নির্বাহ করছে, সেখানে তাদের থাকার অধিকার আছে। আইন প্রণয়নের দিন পর্যন্ত গ্রামবাসীরা যে যেখানে বাস করছে, সে বা তারা জমির মালিক বলে গণ্য হবে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিভিন্ন রাজ্য সরকার নানা অজুহাতে জমির মালিকানা পত্র, যাকে পাট্টা বলে, তা দিতে গড়িমসি করে। ফলে নিরক্ষর বনবাসী পরিবারগুলোর পক্ষে এ-সংক্রান্ত নথিপত্র জোগাড় করা সম্ভব না হওয়ায় তাদের জমির মালিকানা স্বত্ব খারিজ হয়ে যায়।

এইরকমভাবে আদিবাসীদের বনভূমি আবাস কেড়ে নিয়ে খনি, বাঁধ, কারখানা হয়েছে। তারা পেয়েছে শুধু অবিচার আর বঞ্চনা।

হাজার বিশ্বাসঘাতকতা পেরিয়ে তারা অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে ব্রাহ্মণ্যবাদের চক্রান্তের বিরুদ্ধে, সমাজের বিরুদ্ধে, আর্য সভ্যতার বিরুদ্ধে।

গোবর্ধন দিকপতির বাউড়ি, চোর বাউড়ি, নেশাখোর বাউড়ি, প্রকৃতি প্রেমিক বাউড়ি, দেশের আদি বাসিন্দা বাউড়ি—যাদের ভাষা একসময় বাংলা ছেড়ে বিদেশেও বলা হত।

পাঁচটি মহাদেশে বসবাসকারী ৫০০০ আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যে মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কোটি। ভারতে প্রায় ১০ কোটি।

বাউড়ি একপ্রকার হিন্দু তপশীলি জাতি বিশেষ। নৃতত্ত্বের বিচারে এদের মূলত আদি অস্ট্রেলীয় বা প্রোটো অস্ট্রেলীয় নরগোষ্ঠীরই সর্বাধিক সংমিশ্রণ ঘটেছে। যারা ভেডদিড নামেও পরিচিত বলে বিশেষজ্ঞ নীহাররঞ্জন রায় উল্লেখ করেছেন। ভারতীয় বর্ণ ব্যবস্থায় এঁরা নিম্ন বর্গীয়। পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চলের বাঁকুড়া, বীরভূম, পশ্চিম বর্ধমান ও আরও অন্যান্য জেলায় বাউড়িরা বাস করে। এরা বাউজি, বাভুরি, ভই, বাউরিয়া, বুনা, কালিয়া, কান্দি, খোদালো, কোঠিয়া, বউড়ি ইত্যাদি নামেও পরিচিত।

আসানসোলে প্রতিটি মহকুমায় দুর্গাপুরের পর থেকে বরাকর অবধি অজয় ও দামোদরের উভয় তীরে বাউড়িদের বসবাস। এরাই কয়লাখনির প্রথম দক্ষ শ্রমিক ‘মালকাটা’ নামে পরিচিত।

বাউড়ি শব্দের প্রকৃত অর্থ যাযাবর। অর্থাৎ অনুমেয় যে, বাউড়িরা সুদূর অতীতে যাযাবর ছিল।

২০০১ সালের জনগণনা অনুযায়ী বাউড়িদের সংখ্যা ১,০৯১,০২২ জন। এরা পশ্চিমবঙ্গের তপশীলি জাতি সংখ্যার মোট ৫.৯ শতাংশ।

বাউড়িদের মধ্যে মাত্র ৩৭.৫ শতাংশ সাক্ষর। এর মধ্যে পুরুষ সাক্ষরতার হার ৫১.৮ শতাংশ এবং নারী সাক্ষরতার হার ২২.৭ শতাংশ। মাত্র ৪.৭ শতাংশ বাউড়ি মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়েছে অথবা বিদ্যালয় শিক্ষা সমাপ্ত করেছে।

বাউড়িরা নয়টি উপজাতিতে বিভক্ত। যথা—মল্লভূমিয়া, শিকড়িয়া বা গোবরিয়া, পঞ্চকোট, মোলা বা মুলো, ঢালিয়া বা ঢুলো, মালিয়া বা মলুয়া, ঝাটিয়া বা ঝেটিয়া, কাঠুরিয়া, পাটুরিয়া।

বাউড়িদের কয়েকটি উপবর্ণ নির্দিষ্ট অঞ্চলের সীমার মধ্যে বসবাস করত। মল্লভূমিয়া, মালুয়া ও সম্ভবত মোলারা মল্লভূমের (প্রাচীন মধ্য ও দক্ষিণ বাঁকুড়া) বাসিন্দা ছিল। শিকড়িয়ারা বাস করত শিখরভূম অর্থাৎ কাঁসাই ও বরাকর মধ্যবর্তী অঞ্চলে। ঢুলিয়ারা বাস করত ঢলভূম অর্থাৎ বর্তমান খাতড়া মহকুমা অঞ্চলে। পঞ্চকোটিরা ছিল পুরুলিয়া জেলার পঞ্চকোট এস্টেটের বাসিন্দা।

সমাজে উচ্চ বর্ণের লোকেরা সমাজ অধিগ্রহণ করলে এদের ছোঁয়া অপরাধ, পাপ বলে গণ্য হয়। মন্দিরে তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়। এভাবে ধীরে ধীরে সমাজের মূল স্রোত থেকে তারা আলাদা হয়ে পড়ে।

এই আধুনিক সমাজেও বর্ণ প্রথা বিলুপ্ত হয়নি। অনেক জায়গায় পুকুর, নলকূপ, মন্দিরে বাউড়ি ও অন্যান্য নীচু জাতের মানুষের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। হুড়ার দিকে বহু গ্রামে এখনও ব্রাহ্মণদের আলাদা পুকুরঘাট আছে।

বাউড়িদের উৎপত্তির বিষয়ে ঐতিহাসিক তথ্য হিসাবে রোমিলা থাপার তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘বাউড়ি ল্যান্ড’ এবং বাউড়ি জনগোষ্ঠীর নাম সর্বপ্রথম জানতে পারা যায় মেগাস্থিনিসের লেখা বিখ্যাত ‘ইন্ডিকা’ (INDIKA) নামক গ্রন্থ থেকে। খ্রিস্টপূর্ব ৩০৪ অব্দে মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের রাজসভায় সেলুকাসের দূত হিসাবে মেগাস্থিনিস পাটলিপুত্রে অনেক বছর ছিলেন এবং ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থান পরিভ্রমণ করেন। সেই সময় ‘ইন্ডিকা’ গ্রন্থটি লেখেন। মেগাস্থিনিসের আমলের উবেরি (Uberrae) জাতি হল এ-কালের বাউড়ি গোষ্ঠী।

মেগাস্থিনিসের বর্ণনা থেকে একটি বিষয়ে স্পষ্ট বলা যায়, Parthalis বলতে তিনি অজয় ও গঙ্গার মিলন বিন্দুকেই উল্লেখ করেছিলেন। এই স্থানের বিস্তৃতি নিয়ে নানা মত থাকলেও ওই মিলনস্থল অর্থাৎ বর্ধমান যে ওই অঞ্চলের রাজধানী ছিল সে-কথা ঐতিহাসিকগণ নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নিয়েছেন।

বাউড়িদের উৎপত্তির ইতিহাস নিয়ে পণ্ডিতমহলে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। বাউড়ি জাতির উৎস সম্বন্ধে ড. মিহির চৌধুরী কামিল্যা তাঁর গ্রন্থে বলেছেন, রাঢ়ের একটি প্রাচীন জাতি বাউড়ি। এদের আদি বাস হাজারিবাগ।

যজ্ঞেশ্বর চৌধুরী তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, রাঢ়ের দুর্ধর্ষ জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে বাউড়ি জাতির স্থান অন্যতম।

রিসলে, ওল্ডহ্যাম উভয়েই বাউড়ি উপগোষ্ঠীকে অনার্য গোষ্ঠী সম্ভূত বলে অনুমান করেছেন।

দুঃখভঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, ‘বাউড়ি’ শব্দটি বহিরাগত।

কার্লে ডালটনের মতে, সামাজিক মিলন-মিশ্রণের ফলে বাউড়িরা নিম্নগামী হয়েছে।

লোকমুখে প্রচলিত কিছু পৌরাণিক কাহিনি আছে যা তারা বিশ্বাস করে থাকে।—

১) স্বর্গের বাগান থেকে খাদ্য চুরি করার অপরাধে অভিশপ্ত হয়ে তাদের সমাজে পদচ্যুতি হয়।

২) পৌরাণিক মতে, বাউড়িদের গুরু ছিলেন বাহক ঋষি অথবা ঋক মুনি। একদিন এক বিয়েবাড়ি থেকে ফেরার পথে বাউড়িরা তাঁর পালকি বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে নেশা করে গুরদেবের অপমান করে। তাঁরই অভিশাপে সমাজে তাদের নিম্নবর্ণ রূপে স্থান হয়।

৩) সিংহের অভিশাপে দেবী দুর্গার শরীর থেকে স্নান-কালে নির্গত নোংরা যেখানে যেখানে জমে, সেখানে সেখানে একপ্রকার কালো মানুষের সৃষ্টি হয়—তারাই বাউড়ি।

বাঁকুড়ার বাউড়িদের উৎপত্তি বিষয়ে প্রচলিত আছে, পরশুরামের ক্রোধ থেকে বাঁকুড়ার ক্ষত্রিয়রা একুশ বার নিজেদের রক্ষা করে জঙ্গলে পালিয়ে যায়। পরশুরাম যাতে চিনতে না পারেন তার জন্য পাগল সেজে বাস করতে শুরু করে। পরশুরাম তাদের বাউড়া অর্থাৎ পাগল ভেবে ছেড়ে দেন যা সময়ক্রমে লোকমুখে বাউড়ি বলে উচ্চারিত হতে থাকে।

আবার অন্য মতে, পরশুরামের ভয়ে এই অঞ্চলের ক্ষত্রিয়রা জঙ্গলে এক বাউড়ি মহারাজের আশ্রিত হয়ে বসবাস শুরু করে। তাঁর কোনও উত্তরাধিকারী না থাকায় ক্ষত্রিয়দের হাতে সব দায়িত্ব তুলে দেন। এরা বাউড়ি হিসাবে প্রসিদ্ধ হয়।

পৌরাণিক গল্পগুলো বাউড়িদের সামাজিক অবনতি, তাদের উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন, সেই সঙ্গে তারা যে ক্ষত্রিয় ছিল সেটাই তুলে ধরেছে।

দেশজ উপজাতি-সমূহ যখন হিন্দুধর্মে দীক্ষিত হয়ে হিন্দু সমাজে অনুপ্রবেশ করে, তখন তারা সকলেই এক-একটি উপকথা সৃষ্টি করে নিজেদের গৌরবান্বিত করবার চেষ্টা করে। তবে বর্তমান জাতি বিন্যাস ব্যবস্থিত হবার পূর্বে এ-সকল অন্ত্যজ জাতি-সমূহের সমাজে যে অন্য রূপ ছিল তা সহজেই অনুমেয়।

আদি গঙ্গার দুই তীরে সমুদ্রের মোহনা পর্যন্ত প্রাচীন সভ্যতার বহু চিহ্ন পাওয়া গেছে। সামুদ্রিক প্লাবন, বিধ্বংসী ঝড়, ভূমির অবনমন এবং নদীর গতিপথ পরিবর্তন ইত্যাদির কারণে এই সকল জনবসতি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে লুপ্ত হয়ে গেছে। দক্ষিণবঙ্গের এ-সকল অঞ্চলে নরগোষ্ঠীগুলির বাস ছিল প্রধানত অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় গোষ্ঠীর লোকের। কাওড়া, বাগদি, হাড়ি, ডোম, বাউড়ি ইত্যাদি সম্প্রদায় এদেরই বংশধর। অর্থাৎ বাউড়িদের বিস্তৃতি শুধুমাত্র জঙ্গলে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাউড়ি জন্মলগ্ন থেকে নগর সভ্যতার একটি অংশ ছিল।

বাউড়িদের প্রধান অবস্থান রাঢ় অঞ্চলে। প্রধানত ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম, বর্ধমান, মেদিনীপুর ইত্যাদি অঞ্চলে বাউড়ি দেখতে পাওয়া যায়। এই গোষ্ঠীর মানুষজন বাউড়ি পদবি হিসেবে ব্যবহার করা বেশি পছন্দ করে; এই আত্মাভিমান ও নিজেদের বংশের প্রতি ভালোবাসা বাউড়িদের মধ্যে পূর্ণমাত্রায় লক্ষ করা যায়।

এদের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যটি গড়ে উঠেছে মূলত আদি অস্ট্রেলীয় উপাদান দিয়ে। যেমন—গায়ের রঙ কালো, মাথার চুল ঢেউ খেলানো, ঠোঁট ঈষৎ পুরু, নাক চওড়া ও মোটা, মাথার আকার লম্বা বা মাঝারি। সর্বপ্রধান নৃতাত্ত্বিক উপাদান আদি অস্ট্রেলীয় ও খুব স্বল্প পরিমাণে দ্রাবিড় ঐতিহ্য—এই দুইয়ের সমন্বয়ে জনগোষ্ঠীকে খোঁজে নিতে অসুবিধা হয়নি।

১৯৩১-এর পরবর্তী অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বাউড়িরা প্রোটো অস্ট্রালয়েড শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। মানব বিজ্ঞানী হাটন বহিরাগত তত্ত্বের পক্ষে বলতে গিয়ে বাংলা ও বিহারের বাভারিয়া ও বাওয়ারিয়া শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত একটি শ্রেণি হিসেবে গণ্য করেন। ক্রুক বাউড়িদের বাওয়ারিয়া শ্রেণির মানুষ বলে উল্লেখ করেছিলেন। বাওয়ারিয়া হল দ্রাবিড়ীয় সভ্যতায় উত্তর ভারতে বসবাসকারী, যাদের প্রধান কাজ ছিল লুন্ঠন ও শিকার।

এই সমস্ত মানব বিজ্ঞানী ছাড়া অনেকে বাউড়িদের আর্য নিম্নশ্রেণি, অনেকে বাগদিদের অংশজাত বলে বর্ণনা করেছেন, যারা চুয়ার বিদ্রোহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। চুয়ার বিদ্রোহ দমন করা হলে তারা চুয়ার উপজাতি হয়ে ভাগ হয়ে যায় এবং কৃষি, লুন্ঠন ইত্যাদি কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে।

বাউড়ি জাতি হল সহিষ্ণু, পরিশ্রমী, সহজ, সরল। এদের জীবনযাত্রা খুব কষ্টের; প্রাচীন জীবিকা পশু শিকার, চাষ করা, পালকি বাহক ও জমিদারদের লেঠেল হিসেবে নিযুক্ত হত। পরবর্তীকালে কয়লা খাদানের শ্রমিক, রাজমিস্ত্রি, মুটে, মজুর, আরও পরে সরকারি পদেও অনেকেই কাজ করছে। যদিও সংখ্যায় তা নগণ্য। তবুও দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে বাউড়ি সমাজ অন্যান্য আদিবাসীদের মতো নিজেকে উন্নত করতে সচেষ্ট হয়েছে।

বাঙালিদের মতোই ভাত, ডাল, মাছ, মাংস (শূকর, গোরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, পাখি, ইঁদুর) ডিম, বিলিতি পোড়া, পান্তাভাত, নানারকমের শাক এদের খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত।

সাধারণভাবে পুরুষেরা লুঙ্গি বা ধুতি, জামা, পাঞ্জাবি পরে; নারীরা শাড়ি। তবে আধুনিক পোশাক পরিচ্ছদ সম্পর্কে প্রায় সব যুবক-যুবতীরাই সচেতন। ফলে অন্যান্য সম্প্রদায়ের মতো চুড়িদার, পায়জামা, শাড়ি, পায়ে জুতো পরে।

অলংকার হিসেবে তারা সাধারণ ইমিটেশনের গয়না ব্যবহার করে। কানে অলংকার খুব কম মূল্যের, নাকের দু-দিকে ছিদ্র করে গয়না পরে, পায়ে তোড়া, পায়ের আঙ্গুলে আঙট পরে। নারী-পুরুষ উভয়েই উল্কি পরে। যুবক-যুবতীরা কপালে, চিবুকে, হাতে, বুকে উল্কি পরে।

এদের সমাজে গুটকা, পান মশলা, মদ ও নানাবিধ নেশা করার রেওয়াজ প্রচলিত।

বাউড়িরা পুরুষ নিয়ন্ত্রিত সমাজ, পৈতৃক সম্পত্তিতে পুরুষরাই অধিকারী। এরা সাঁওতাল, ভূমিজ, ভুঁইয়াদের অস্পৃশ্য মনে করে।

মানব বিজ্ঞানী রিসলে তাঁর Tribes of the Castes of Bengal, vol.1 (Calcutta, 1891) 78 – 82 গ্রন্থে শিকারিয়া বা গোবরিয়া বাউড়িদের উপজাতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

শাসমলের মতে, টুঙ্গ ও গোবরিয়া দুই ভিন্ন উপজাতি শ্রেণি।

প্রধানত টুংভূম এলাকায় টুঙ্গ উপজাতির বসবাস, গোবরিয়া শ্রেণির বসবাসের নির্দিষ্ট কোনও অঞ্চল নেই। গোবরিয়া বাউড়ি এঁটো স্থান গোরুর গোবর দিয়ে পরিষ্কার করে; ঝেঁটিয়া বাউড়ি এঁটো স্থান ঝাঁট দিয়ে দেয়। শিকারিয়া বাউড়ি শিকারের কাজে নিযুক্ত থাকত। পাথুরিয়া শ্রেণি পাথর ভাঙার কাজ, কাঠুরিয়া শ্রেণি কাঠ কাটত বলে তাদের নামকরণ এরূপ হয়ে থাকতে পারে। তুর্কি বাউড়িরা তুর্কি শাসনকালে মহারাজের সেবাকাজে নিযুক্ত থাকত।

অধিকাংশ মতানুসারে, বাউড়িরা চিরকাল পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত একটি শ্রেণি। হয়তো পশ্চিম কোনও অঞ্চলে সৃষ্টি হলেও ধীরে ধীরে তারা পূর্বদিকে সরে আসতে থাকে। সেই প্রসারণকালে তারা বৌদ্ধধর্মের সংস্পর্শে এলে ধর্মান্তরিত হয় এবং ধীরে ধীরে আদিবাসী তকমা বিলুপ্ত হয়ে যায়। হয়তো তাই অনেকে তাদের নিম্ন আর্য শ্রেণি অথবা বহিরাগত শ্রেণি হিসেবে ভুল করেছেন।

বাউড়িদের সংস্কৃতিতে দেব-দেবতা ছিল সন্ন্যাসী, গ্রাম দেবতা, লৌকিক দেবদেবীর প্রাধান্য। তাদের প্রধান উপাস্য দেবতা গাছ, পাথর, পাহাড়ের পাশাপাশি মনসা বরাম, চণ্ডী প্রভৃতি।

বাউড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষের বন্য যুগ থেকেই তাদের নিজস্ব আদিম তন্ত্র ধর্ম ছিল। পরবর্তীকালে ‘বুদ্ধং শরণম্‌ গচ্ছামি’-র মন্ত্র তাদের কাছের হয়ে উঠেছিল; তারা বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হয়। বাউড়িরা হিন্দুধর্মকে ত্যাগ করেনি, হিন্দুরাই তাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে। আর্যরা হিন্দুধর্মের মধ্যে মানুষকে উঁচু-নীচু জাতের মধ্যে বিভক্ত করে রেখেছে, বাউড়িরা ভেদাভেদের ধর্মনীতি মেনে নিতে পারেনি। হিন্দুদের সঙ্গে অনেক মিল থাকলেও তারা আদি ধর্মে হিন্দু ছিল না। হিন্দুদের কোনও ধর্মেই বাউড়িদের উল্লেখ পাওয়া যায় না। পরবর্তীকালে বাংলা থেকে বৌদ্ধধর্ম ধ্বংসের পর তারা হিন্দুধর্মের সংস্পর্শে আসে এবং এই ধর্মে দীক্ষিত হয়।

জাত বিভাজনে বাউড়িরা চার প্রকার—মহাভই, তনহারা, ঘুমুরা ও বুনা।

বাউড়িদের প্রতীক বা টোটেম লাল পৃষ্ঠ বিশিষ্ট সারস, কুকুর, কানা বক বা নীল বক। এছাড়াও শাল মাছ, কচ্ছপ, চাদমুড়া মাছ, চিতি সাপ ইত্যাদির কথাও প্রচলিত ছিল। এদের কাছে কুকুর খুব আদরণীয়। এরা কুকুরকে মারে না। কুকুর গোত্র পশ্চিমবঙ্গীয় বাউড়িদের মধ্যে লক্ষ্য করা গেছে।

বাউড়ি তথা সমগ্র আদিবাসী সমাজে নাচ, গান ও মেলার ভূমিকা বিশাল। এদের নাচগুলি হল নাটুয়া নাচ, ছৌ নাচ, ঝুমুর নাচ, লেটো নাচ, দাশাই নাচ ইত্যাদি।

চুয়ার নামে কোনও আদিবাসী, জাতি বা উপজাতি বাস্তবে নেই। চুয়ার বলতে সমাজের নীচু শ্রেণিদের বোঝানো হয়। এর অর্থ হল ইতর বা নীচ। আসলে বাউড়িরা সামাজিক সিঁড়িতে সবচেয়ে নীচের শ্রেণিতে অবস্থান করত এবং এই বিদ্রোহ বাউড়িদের দ্বারা সংগঠিত হয়েছিল বলে এই বিদ্রোহ চুয়ার বিদ্রোহ নামে খ্যাত হয়।

১৭৯৩ সালে কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু হলে কর আদায়ের চাপে স্থানীয় ভূস্বামী ও জমিদাররা প্রজাপালক থেকে ক্রমশ প্রজা উৎপীড়নকারী হয়ে উঠলেন। এর জন্য তাঁদের নিজস্ব লেঠেল বাহিনী তৈরি হল। ১৮৩০-এর পর ভারতের শাসনভার পাকাপাকিভাবে ব্রিটিশ কোম্পানির হাতে চলে যাওয়ার পর এই লেঠেল বাহিনীর লাঠিয়াল ও চৌকিদাররাই ধীরে ধীরে হয়ে উঠল বাংলার ডাকাত। ব্রিটিশ সরকারের ডাকাতি কমিশনের রিপোর্টগুলিতেও এই বক্তব্যের সমর্থন খুঁজে পাওয়া যায়।

১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে চুয়ার বিদ্রোহে বাউড়িদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। গোবর্ধন দিকপতি ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দের ইংরেজ প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, শাসন, শোষণ ও স্থানীয় জোতদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সূচনা করেছিলেন।

১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে দেওয়ানি লাভের পর কোম্পানির নজর পড়ল মেদিনীপুর জেলায়। এই অঞ্চলটি নুন উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করার জন্য ম্যালকমকে পাঠানো হয়। তিনি খবর পান, আলিবর্দি ও মারাঠাদের মধ্যে ঝামেলার সময় থেকে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের জমিদাররা খাজনা দেয় না। এই জমিদারদের সঙ্গ দিয়ে চলেছে জঙ্গলের বহু জমিদার। তৎকালীন জঙ্গলমহল অঞ্চলটি বর্তমান মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বর্ধমানের কিছু অংশ এবং সমগ্র পুরুলিয়ার অন্তর্গত ছিল।

ভবিষ্যতে কোম্পানির সৈন্যদের অত্যাচারে জঙ্গলমহলের শান্তি ধীরে ধীরে বিঘ্নিত হতে শুরু করে। সিপাহিরা পুরুষদের ওপর অমানবিক অত্যাচার করে। নারীদের শ্লীলতাহানি করা হয়। নিরীহ গ্রামবাসীরা জঙ্গলে পালিয়ে যেতে শুরু করলে তাদের ওপর গুলিবর্ষণ হয়; মানভূমের মাটি রক্তে লাল হয়ে ওঠে। কলঙ্কিত বিশ্বাসঘাতকতার জঙ্গলমহলের ইতিহাস লেখা হয় রানি শিরোমণির হাত ধরে।

১৭৯৯-এর আন্দোলনকে জে. সি. প্রাইস চুয়ার বিদ্রোহ বলে আখ্যা দিয়েছেন; যার মূলে ছিল বাউড়ি ও অন্যান্য ভূমিজ সম্প্রদায়, পাইক ও সর্দার।

ওই বছর এপ্রিল মাসে গোবর্ধন দিকপতি (বাউড়ি সম্প্রদায়ভুক্ত) শিলদায় দুটি গ্রাম জ্বালিয়ে এই বিদ্রোহের সূচনা করেন। কর্ণগড়ে রানি শিরোমণির আশ্রয়ে থাকা চুয়ারদের তিনি সংগঠিত করেছেন। ১৭৯৮-এ প্রায় চারশো জন চুয়ারকে নিয়ে চন্দ্রকোনা থানা এলাকার বিভিন্ন জায়গা, জোতদারদের বাড়ি, সরকারি অফিস লুঠ করেন। পরে তাঁর বাহিনী নানাদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তিনি ১৫০০ চুয়ার নিয়ে প্রায় ৩০টি গ্রাম আক্রমণ করেন এবং তাদের সম্পূর্ণরূপে অগ্নিসাৎ করে ফেলেন। এইভাবে লেলিহান অগ্নিশিখার গ্রাসে ভয়ানক অগ্নিস্তূপ নির্মিত হয়ে চলছিল।

শেষে চুয়াররা বুঝতে পেরেছিল, জমিদারদের পূর্ণ সহযোগিতা ছাড়া তাদের এই আন্দোলন সফল হবে না। রানি শিরোমণি তাদের পক্ষে ছিলেন না। তবুও ব্রিটিশরা বিশ্বাস করতে না পেরে তাঁর দুর্গের মধ্যেই তাঁকে বন্দি করেছিল। নায়ক আঁচল সিং, গোবর্ধন দিকপতি ও নিমাই সর্দার পরবর্তীতে গ্রেপ্তার হন এবং ফাঁসির মঞ্চে শহিদ হন।

বক্সারের যুদ্ধের পর ভারত সম্পূর্ণ পরাধীন হয়ে গেল ব্রিটিশের কাছে। বাউড়িদের নেতৃত্বে অধিকারের দাবিতে দু-বার ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলন হল, তবুও তা আড়ালে থেকে গেল। ১৮৫৭-র সিপাহি বিদ্রোহকে বলা হল ভারতের স্বাধীনতার প্রথম বিদ্রোহ।

যুক্ত পারিবারিক নীতি মেনে বাউড়ি সমাজ আজও জীবিত আছে। বাড়ির ছেলেমেয়েদের সন্তানসন্ততিরাও একই ছাদের নীচে বাস করে। ঘরজামাই বাউড়িদের মধ্যে সাধারণ হলেও বাবার সম্পত্তির ওপর মেয়েদের কোনও অধিকার নেই। কম বয়সে বিবাহের প্রচলন দেখা যেত। সম্বন্ধ করানোর ক্ষেত্রে ঘটকের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। বর বা কনের অভিভাবকগণ পাত্রপাত্রী নির্বাচন করেন। প্রেম বিবাহ, আসুরিক বিবাহ অথবা বউ বদলের প্রবণতাও এদের বিবাহের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। রক্তের সম্পর্কের মধ্যে বিবাহ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। বিবাহের ক্ষেত্রে জাত ও গোত্র বিচার অবশ্যই করা হয়। পণপ্রথা এদের সমাজে এখনও প্রচলিত। কনেপক্ষকে বরপক্ষ এক টাকা দিয়ে মেয়ে কিনে নেওয়ার প্রথা আছে। সাধারণত বিবাহযোগ্য ছেলের বয়স ছিল ১০ – ২৫ এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে ৫ – ১৫ বছর। তাদের পারিবারিক অনুষ্ঠান বিশ্লেষণ করলে কিছু তথ্য উঠে আসে—

১) কোনোরকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণ প্রয়োজন হত না।

২) দেনাপাওনা তাদের বিবাহের একটি অঙ্গ ছিল।

৩) সহমরণ প্রথা তাদের সমাজে ছিল না।

৪) স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা বিবাহের প্রচলন এ-সমাজে বহুদিন ধরেই বিরাজমান।

৫) বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা লক্ষ করা গেলেও, স্বামী স্ত্রীকে কোনোপ্রকার খোরপোষ দিতে বাধ্য নয়।

৬) বিধবা বিবাহ করলে বা বিচ্ছেদের পর স্ত্রী দ্বিতীয় বিয়ে করলে তাকে সাঙ্গা বলে।

৭) সমাজে পুরুষদের পাশাপাশি স্ত্রীর সম্পূর্ণ স্বাধীনতা লক্ষ করা যায়।

৮) নিজেদের পছন্দের ছেলে বা মেয়ে না পেলে তারা বিবাহ করতে বাধ্য নয়।

৯) স্ত্রীকে স্বামীর ঘর চালানোর জন্যে সম্পূর্ণভাবে এই সমাজ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিয়ে থাকে।

১০) অন্নপ্রাশনের ব্যবস্থা থাকলেও সেখানেও ব্রাহ্মণের কোনও ভূমিকা থাকত না।

তবে প্রথম বিয়ে করা বউয়ের মর্যাদা স্বতন্ত্র। এমন কয়েকটি পবিত্র, গম্ভীর ও দায়িত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান আছে যাতে বিবাহিতা বধূর উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সাঙ্গা করা বউ অথবা ধরা বউয়ের ক্ষেত্রে সে মর্যাদাটুকু দেওয়া হয় না।

বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে ‘মানু’ শ্রেণির বাউড়িকেই প্রাধান্য দেওয়া হয় বেশি। মান্য শব্দ থেকে মানু কথাটি এসেছে। এরা যে-কোনো শ্রেণির বাউড়িদের কন্যা গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু স্বশ্রেণির কন্যাকে অন্য কোনও শ্রেণির হাতে সমর্পণ করলে এদের কৌলীন্য থাকে না। অপর শ্রেণি স্ব স্ব প্রধান। মানু শ্রেণির একটিমাত্র গোত্র হল কাশ্যপ।

মুসলমানদের এরা জাতি হিসেবে গণ্য করত না। সম্ভবত সেই কারণেই বৌদ্ধ ও হিন্দুধর্ম গ্রহণ করলেও তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি। কোনও বাউড়ি মহিলা কোনও মুসলিম পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে পড়লে তাকে সমাজচ্যুত করা হয়। সমস্ত সম্পর্ক ত্যাগ করলেও সেই নারীকে সমাজে ফিরিয়ে নেওয়া হয় না। অপরদিকে বাউড়ি পুরুষ ইসলামি মহিলার সঙ্গে সম্পর্কে লিপ্ত হলে তাকেও সমাজচ্যুত করা হয়। তবে মহিলার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ত্যাগ করে উপযুক্ত কারণ দেখালে তাকে সমাজে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

আসলে দুর্বল আর্থ-সামাজিক কাঠামো, সচেতনতার অভাব, আর্থিক অসচ্ছলতার জন্য এরা প্রায় একই জায়গায় অবস্থান করছে। সুদীর্ঘকাল যাবৎ মানুষের জীবনে মরণে এরা দুটি গুরুদায়িত্ব পালন করে আসছে এবং এর থেকে একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ সবার মুখে শোনা যায়—‘আসতেও বাউড়ি, যেতেও বাউড়ি।’ বাউড়ি অধ্যুষিত এলাকায় জন্মকালে প্রসূতির কাছে ধাইমার জন্য বাউড়ি জননীদের ডাক পড়ে। সেদিন থেকে প্রায় একমাস পর্যন্ত প্রসূতি ও জাতকের গুরুদায়িত্ব বহন করে এই বাউড়ি নারীসমাজ। মৃত্যুর পর শ্মশানের সমস্ত ভারী কাজ ওদের দ্বারাই নিষ্পন্ন হয়।

প্রায় প্রতি গ্রামেরই এক প্রান্তে বাউড়ি পাড়ার একটি ছবি দেখা যায়—অপরিচ্ছন্ন ভাঙাচোরা ঘর, স্তূপীকৃত ভাঙা হাঁড়িকুড়ি, শূকরের আনাগোনা, হাঁস-মুরগির ডাক। ক্ষেত্র সমীক্ষায় দেখা গেছে বাঁকুড়া জেলার অধিকাংশ গ্রামের বাউড়িরা ছ’মাস ‘পুব’ চলে যায়, অর্থাৎ বাঁকুড়া ছেড়ে চাষাবাদে ভালো, যেমন বর্ধমান, হুগলি ইত্যাদি জেলায় চাষের কাজ (ধান লাগানো, ধান ঝাড়া ইত্যাদি) করতে চলে যায়। এটি তাদের ভাষায় ‘পুব যাওয়া’ বলে। এভাবে আজও তারা নিজেদেরকে সমাজের অন্যতম জায়গায় নিয়ে যেতে পারেনি। তবে কৃষিকাজ, দৈহিক ক্ষমতা, রাজনীতি, খেলাধুলা, এবং কিছুটা শিক্ষাক্ষেত্রে বর্তমানে এদের পারঙ্গমতা বোধ উল্লেখযোগ্য। এদের এই আর্থ-সামাজিক পরিকাঠামো উন্নত করতে হলে সর্বপ্রথম এদের শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসতে হবে। আত্মমর্যাদার বোধ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

এরা অশরীরী—যেমন পরি, জলপরি, অপদেবতা, ভূতপ্রেত, চিড়িগুনী, পেত্নী, রাক্ষস, রূপকথায় প্রচলিত দৈত্য দানব, ডাইনি, অভিভাবক আত্মায় বিশ্বাসী। ফলে কোনও মানুষ অসুস্থ হলে তারা ওঝা বা তান্ত্রিকের কাছে যায়। বিভিন্ন কৌশলে, মন্ত্রের দ্বারা মানুষটির মধ্যে থেকে ভূত ছাড়ানোর ব্যবস্থা করে। অপশক্তির প্রতি বিশ্বাসের ফলে চিকিৎসাবিজ্ঞান থেকে সরে গিয়ে নিজেদের ওঝা ও তান্ত্রিকমুখী করে তুলেছিল। আজও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এর ব্যতিক্রম নয়।

বর্তমান অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাউড়ি সমাজ যে ওঝাদের কাছে যেত, তারা গাছগাছড়া ব্যবহার করত, তার দ্বারা বহু রোগ নিরাময়ের ক্ষমতা ছিল। বিভিন্ন গাছের দ্বারা জ্বর, সর্দি, কাশি থেকে পেটের নানা সমস্যা, জন্ডিস, চোখের ছানি ইত্যাদি সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

১) রাজ ধনেশ পাখি থেকে নির্গত তেল অ্যাজমা ও বুকের ব্যথার চিকিৎসায় ব্যবহার হত।

২) Andrographis paniculata-র পাতাগুলো গুলির মতো করে চিবিয়ে খেতে হত। জ্বর তথা ম্যালেরিয়ায় ব্যবহৃত হত।

৩) Aerva lanata-র পাতা, Nigella sativa-র বীজ, Piper nigrum-এর ফল, তালমিছরি Allium Sativum-এর কোয়া, Solanum melongena-র মূল এবং Capsicum frutescens-এর ফল মাসিকের যন্ত্রণায় একসঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ানো হত।

৪) A. paniculata অ্যান্টি-ম্যালেরিয়াল হিসেবে ব্যবহৃত হত।

৫) Justicia adhotoda ব্যবহৃত হত কাশির জন্য। এতে উপস্থিত vasicinone কাশির ক্ষেত্রে উপকার করত।

৬) Staphylococcus aureus সর্দি, কাশি, ব্রঙ্কাইটিস, অ্যাজমার চিকিৎসায় ব্যবহার হত।

৭) Mikania cordata-র ব্যবহার কাটা ও ছড়া আঘাতের ক্ষেত্রে।

৮) Terminalia cuneata-র ব্যবহার হত হৃদরোগের ক্ষেত্রে।

এছাড়াও অনেকরকম গাছগাছড়ার ব্যবহার প্রচলিত ছিল বাউড়ি সমাজে। বর্তমানে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে, ঘরোয়া বিশ্বাসের ওপর তাদের চিকিৎসাশাস্ত্র গড়ে উঠলেও প্রতিটির মধ্যেই একটি বৈজ্ঞানিক গুণ বর্তমান।

ধর্ম ছেড়ে কর্মের ভিত্তিতে যুগ যুগ ধরে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম, বর্ধমান, মেদিনীপুর, মানভূমের উৎসবগুলোকে তারা আপন করে নিয়েছে।

সংস্কৃতি বলতে বোঝায় সুরুচিপূর্ণ এক জীবনযাপন প্রণালী যা মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে। নানাপ্রকার পরিবর্তন যখন মানুষকে পাশবিক করে তুলেছে; তখন একটি উপজাতি শ্রেণি নিজের পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখে নিজেকে করে তুলেছে একটি জাতির সমান। শুধুমাত্র নিজেদের নিয়মের মধ্যে থেকেও বেঁচে থাকার লড়াই করে চলেছে।

 

তথ্যসূত্র:

১) পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি, বিনয় ঘোষ, ১ম খণ্ড পৃ. ৩৯৯।

২) বাউড়ি জাতির ইতিহাস, দুঃখভঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়।

৩) The Tribes and Castes of Bengal, vol.1, H.H. Rishley, P. 78।

৪) The Bauris of West Bengal, K.C. Sashmal, P. 53।

৫) Tribes Politics and State System in the pre Colonial Eastern India North Eastern India, Dr. Surajit Sinha, P. 82।

৬) রাঢ়ের জনজাতি ও লোকসংস্কৃতি, ড. মিহির চৌধুরী কামিল্যা, পৃ. ৬৮।

৭) The Bauris of West Bengal, K.C. Sashmal (preface)।

৮) তদেব, পৃ. ১৯।

৯) District Bankura Cencus, 1961, P. 126।

১০) রাঢ় সভ্যতা, সুনীল দাস, পৃ. ২৮।

১১) Description Ethnology of Bengal, Delton, P. 328।

১২) ভারতবর্ষের ইতিহাস, রোমিলা থাপার, পৃ. ৪৯।

১৩) ভারতের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, অতুল সুর, পৃ. ১৯৩।

১৪) তদেব, পৃ. ১৯৫।

১৫) বাউড়ি সম্প্রদায়ের উৎপত্তির ইতিহাস ও ঐতিহাসিক পর্যালোচনা, ড. বিধান মুখোপাধ্যায়।

১৬) ইতিহাসের বাউড়ি, সন্দীপ দাস।

১৭) https://www.google.com/amp/s/amp.dw.com।

১৮) https://Shodhganga, inflibnet.ac.in।

১৯) আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩ মে ২০১২।

২০) হুগলীর ডাকাত: একটি আর্থ-সামাজিক পর্যালোচনা (A Study on Dacoits of Hooghly), গবেষণা ও লেখা শঙ্খশুভ্র গঙ্গোপাধ্যায়।

২১) Reports on the Suppression of Dacoity in Bengal [John Gray, ‘Calcutta Gazette Office’. 1857]

Bengal Administrative Reports.

২২) https://www.ncbi, nlm, nih. gov/pmc/articles/PMC3902534।

২৩) দ্বিতীয় খণ্ড, অঞ্জলি বসু সম্পাদিত (২০০৪)। সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান। কলকাতা, সাহিত্য সংসদ। পৃ. ৯৮।

২৪) “Freedom Fighters of Midnapore Govardhan Dikpati”। midnapore.in। সংগ্রহের তারিখ ১১ মার্চ, ২০১৭।

২৫) Mckindle. J.W.1960; 194n, 195n; MAJUMDER SHASTRI, SURENDRANATH, 1927; 174।

 

Leave a Reply