সন্ধ্যা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য প্রতিযোগিতা ২০২২- জয়ী প্রবন্ধগুলো- প্রথম স্থান- প্রভু দাও মোরে আরো চেতনা, যুগ্ম দ্বিতীয় স্থান- ভ্রাম্যমান বেচুবাবুর সঙ্কট,যুগ্ম দ্বিতীয় স্থান-মুণ্ডু ছাড়া বাঁচব নাকি, তৃতীয় স্থান- বাউড়ি জাতির ইতিহাস, চতুর্থ স্থান- এন্টিকাইথেরা দ্বীপের মহাকাশ যন্ত্র, পঞ্চম স্থান-একটি ব্যর্থ আর্কটিক অভিযান, ষষ্ঠ স্থান-ফারাওয়ের রান্নাঘর

গ্রিস আর ক্রিট-এর মাঝে, ভূমধ্যসাগরের ছোট্ট একটা প্রায় নির্জন দ্বীপে স্পঞ্জ শিকারিরা তাদের ছোটো ছোটো জাহাজ আর নৌকো নিয়ে ঘুরে বেড়াত। জায়গাটা পাহাড়ঘেরা। সমুদ্রসৈকতের খুব কাছেই জলের নীচে স্পঞ্জ খুঁজতে টুপ করে ডুব দিত ডুবুরিরা। মিনিট দুয়েকের ডুব, তারপর তারা উঠে আসত স্পঞ্জ জোগাড় করে। বাজারে এই জিনিসটার বেশ চাহিদা ছিল। চড়া দামে সেই স্পঞ্জ বিক্রি হত গ্রিস আর তার সংলগ্ন দ্বীপগুলোতে।
১৯০০ সালে একদিন এক স্পঞ্জ শিকারি দল পড়ল ঝড়ের মুখে। ভূমধ্যসাগরের এই অঞ্চলে যখন-তখন ঝড় ওঠে। এগোনো বিপদজনক মনে করে স্পঞ্জ শিকারিরা নৌকো ভেড়ায় নির্জন সেই দ্বীপে। তারপর ঝড় থেমে যেতে তারা এদিক-ওদিক সন্ধান করতে থাকে উপযুক্ত জায়গার, যেখান থেকে পাওয়া যেতে পারে স্পঞ্জ। এক ডুবুরি কাছেপিঠে স্পঞ্জ খুঁজে না পেয়ে আরও একটু এগিয়ে যায় পাহাড়ের কোনায়। ডুব দিয়ে সে দেখে জলতল অনেক নীচে। সমুদ্রের এত গভীর তলদেশে ডুব দিয়ে স্পঞ্জ আনতে যাওয়া মানে নিজের প্রাণসংশয় হওয়ার তীব্র সম্ভাবনা। কিন্তু স্বচ্ছ জলের নীচে হঠাৎ তার চোখে পড়ে কয়েকটা মানুষের মৃতদেহ। ভয় পেয়ে তড়িঘড়ি সে তার কোমরে বাঁধা দড়ি ধরে টান মারে। দড়ির অপর প্রান্তে নৌকোয় সতর্ক সাথী তাকে টেনে তোলে। ডুবুরি নৌকোয় উঠে জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে জানায়, জলের নীচে সে কয়েকটা লাশ দেখেছে। সাথী ডুবুরিরা কেউ হেসে ওঠে অবিশ্বাসে, আবার কেউ কেউ বলে—হতেও পারে, হয়তো কোনও জাহাজডুবি হয়ে মানুষ মরেছে।
স্পঞ্জ ডুবুরিদের দলপতি দিমিত্রিও কন্তো ছিল খুব সাহসী আর অভিজ্ঞ। সমুদ্রের নীচে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে সে নিজেই নেমে যায় জলের তলায়। দেখতে হবে ব্যপারটা ঠিক কী! সত্যি সত্যি কি মানুষ মরে তলিয়ে গেছে জলের তলায়?
তখনও ডুবুরিদের পোশাক এত উন্নত ছিল না। শ্বাস নেবার জন্য ডুবুরিরা মাথায় একটা মস্ত পিতলের হেলমেট পরে নিত—তাতে লাগানো থাকত একটা লম্বা নল, যার সাহায্যে কয়েক মিনিটের জন্য জলের তলায় থাকা যেত। কোমরে দড়ি বেঁধে ডুব দিত তারা। শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে কষ্ট হলে বা বিপদ বুঝলে দড়ি ধরে মারো টান! তারপর সঙ্গীরা তাকে টেনে তুলত।
কন্তো পঞ্চাশ-ষাট মিটার নীচে নেমে একবারের চেষ্টাতেই যা বুঝেছিল তা হল—লাশ বলে তার সঙ্গী যা ভেবেছিল, আসলে সেগুলো সব মানুষের মূর্তি। খুব কষ্ট করে দু-চার বার ডুব দিয়ে সে একটা মূর্তির ভাঙা হাত জোগাড় করে আনে। সেই হাত ছিল ব্রোঞ্জের তৈরি।
দলপতি কন্তো বেশ চালাক ছিল। সে কয়েকদিন ধরে জলের তলায় লোক নামিয়ে বেশ কিছু মূর্তি উদ্ধার করে। ডুবুরিদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, জাহাজের অনেক ভাঙা টুকরোও জলের তলায় পাহাড়ের ঢালে জমা হয়ে আছে। স্পঞ্জ শিকার মাথায় ওঠে। ডুবুরিদের দলপতি এথেন্স শহরে গিয়ে কর্তাদের সবকথা খুলে বলে মোটা পুরস্কারের আশায়।
খবরটা পাঁচকান হতে সময় লাগে না। গ্রিসের টেলিগ্রাফ অফিস তারবার্তায় খবরটা ফাঁস করে দিয়ে জানায়—কাইথেরা দ্বীপের কাছে এন্টিকাইথেরা দ্বীপে জলের তলায় আবিষ্কার হয়েছে এক গুপ্তধন। খবরটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করলেও গ্রিস সরকার গুপ্তধন পাওয়ার খবরকে একেবারেই আজগুবি বলে উড়িয়ে দেয়।
এথেন্সের এক প্রফেসরকে ডুবুরিদের দলপতি কন্তো সব খুলে বলতে তিনি যোগাযোগ করেন গ্রিসের শিক্ষামন্ত্রী স্পিরিডন স্টেইস-এর সঙ্গে। শিক্ষামন্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে কন্তোকে বলেন, “লোকজন নিয়ে জলে নেমে পড়ো, দেখো আর কী কী খুঁজে পাও। টাকাপয়সা নিয়ে চিন্তা কোরো না। কাজ হলে সব মিটিয়ে দেওয়া হবে।”
মন্ত্রীর আশ্বাস বলে কথা! তাঁর আদেশ অনুযায়ী নৌবাহিনী থেকে এক বিরাট জাহাজ জোগাড় হয়ে গেল জলের তলায় ডুব দিয়ে ভাঙা জাহাজের অবশেষ আর মালপত্র ডাঙায় তুলে আনবার জন্য। এন্টিকাইথেরা দ্বীপের এই অঞ্চলে জলের উপরে আর নীচে চারদিকে পাথুরে পাহাড়ে ভরতি। কাজেই সে-জাহাজ ঢুকলই না ওই অঞ্চলে। ছোটো ছোটো নৌকোর সাহায্য নিয়ে কন্তো আর তার দলবল জাহাজে তুলে আনল আশ্চর্য সব জিনিস—ব্রোঞ্জ আর মার্বেলের তৈরি নানা পাত্র, ভাঙা মূর্তির টুকরো, একটা মূর্তির আস্ত মাথা, জাহাজের খোলের কাঠের ভাঙা টুকরো-টাকরা—আরও কত কী!

একদিন ডুবুরিরা তুলে আনল ব্রোঞ্জের তৈরি এক মূর্তি—দেহের ঊর্ধ্বভাগ প্রায় অক্ষত, শুধু নীচের দিকের অংশ উধাও। ধুয়ে-টুয়ে দেখা গেল, সেটি সুদর্শন এক গ্রিক যুবকের মূর্তি। উদ্ধার হল আরও অনেক টুকরো। সব সযত্নে রেখে দেওয়া হল বাক্সে আরও অনেক কুড়িয়ে আনা ভাঙা টুকরোর সঙ্গে।
হপ্তাখানেক পরে ছোট্ট একটা ছয় ইঞ্চি কাঠের টুকরোর মধ্যে লাগানো ব্রোঞ্জের একটা ভাঙা অংশ তুলে এনে জাহাজে রাখল এক ডুবুরি। সামরিক এক অফিসার রে রে করে উঠল—“তোরা যা পাচ্ছিস তুলে আনছিস! এই ভাঙা নোংরা জিনিসটা হয়তো কোনও জাহাজ বা নৌকো থেকে কেউ ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। শুধু শুধু এই জিনিস তোলার মানে হয় না। যা, এটা যেখানে ছিল, সেখানেই ফেলে দে।”
সারা বিশ্বের ভাগ্য সেদিন সুপ্রসন্ন ছিল। আর-এক স্টেইস সেদিন জাহাজে উপস্থিত ছিলেন। তিনি হলেন এথেন্সের সংগ্রহশালার অধিকর্তা, ভ্যালেরিও স্টেইস। চেঁচামেচি শুনে ভদ্রলোক এগিয়ে এসে ভাঙা অংশটা ভালো করে ধুয়ে খুঁটিয়ে দেখে বুঝলেন, মূর্তিগুলোর সঙ্গে এর সম্পর্ক আছে। তাই সযত্নে ছোট্ট জিনিসটা তুলে রাখলেন জাহাজে।
সব উদ্ধার করা জিনিস নিয়ে যাওয়া হল এথেন্সের সংগ্রহশালায়। ছোট্ট কাঠের টুকরোয় আটকানো ব্রোঞ্জের ময়লা জিনিসটা অনাদৃত হয়ে পড়ে রইল। এদিকে ডুবুরিদের খুঁজে পাওয়া সেই যুবকের অর্ধেক মূর্তি নিয়ে মানুষের উৎসাহের সীমা নেই। প্রত্নতাত্ত্বিকের ডাক পড়ল মূর্তির রহস্য উদ্ঘাটনে। তিনি রায় দিলেন, এ-মূর্তি হল গ্রিসের হেলেনিস্টিক শিল্পকলার এক অনবদ্য সৃষ্টি, যার আনুমানিক বয়স খ্রিস্টের জন্মের তিন শতকের আগে। ভাঙা টুকরো জুড়ে দিয়ে গড়ে তোলা হল পূর্ণাঙ্গ অবয়ব—নাম রাখা হল ‘ইফাবে’।
এর মধ্যে আরও ব্রোঞ্জ আর কাচের তৈরি পাত্র, মূর্তির ভাঙা হাত পায়ের টুকরো ইত্যাদি উঠে এল। পাওয়া গেল আরও তিনটি কাঠের টুকরোয় আটকানো ব্রোঞ্জের পাত। মোট চারটি একই ধরনের জিনিস দেখে এবার ভ্যালেরিও স্টেইস আবার নড়েচড়ে বসলেন। তিনি আগে পাওয়া খণ্ডটা আর অন্য খণ্ডগুলো খুব মন দিয়ে পরীক্ষা করলেন। নাড়াচাড়া করতে গিয়ে একটা খণ্ড গেল ভেঙে। স্টেইস ভাবলেন সর্বনাশ হল। কিন্তু ছোট্ট টুকরোটা ভেঙে যেতে বেরিয়ে পড়ল তার ভিতরের রূপ। ব্রোঞ্জের পাতটায় অনেকগুলো দাঁত দেখা গেল। দেখা গেল কাঠের সঙ্গে আটকে আছে কয়েকটা গোল চাকতি, একেবারে গায়ে গায়ে লেগে। আরও খুঁটিয়ে দেখতে নজরে এল ব্রোঞ্জের পাতের উপর খোদাই করা কিছু পুরোনো গ্রিক ভাষায় লেখা লিপি, যা তার বোধগম্য হল না। স্টেইস বুঝে গেলেন যে, এ যে-সে জিনিস নয়, নির্ঘাত কোনও যন্ত্রের ভাঙা অংশ। তবে কি মূর্তির সঙ্গেই জাহাজডুবি হয়ে সমুদ্রে তলিয়ে গিয়েছিল গ্রিকদের আবিষ্কৃত কোনও যন্ত্র?
বিচিত্র যন্ত্রের রহস্য সন্ধানে
বিংশ শতাব্দীর গোড়াতে সবাই জানত যে, খ্রিস্টের জন্মের আগেই গ্রিসে অনেক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হয়েছে। এই সময়কালটা গ্রিসে বিজ্ঞান আর শিল্পকলা বিকাশের ক্ষেত্রে সবচাইতে উত্তম ছিল। ‘হেলেনিস্টিক পিরিয়ড’ বলে খ্যাত এই সময় ইউক্লিড আর আর্চিমিডিস রেখে গেছেন তাঁদের অসাধারণ সব বৈজ্ঞানিক অবদান। তাই গ্রিসে তৈরি উন্নতমানের যন্ত্র আবিষ্কারে বিস্ময়ের তেমন কিছু না থাকলেও উৎসুক হওয়ার মতো ব্যাপার তো অবশ্যই ছিল।
ইতিমধ্যে ডুবুরিদের অনুসন্ধানে সমুদ্রের নীচ থেকে পাওয়া গেল অনেকগুলো দুই হাতল লাগানো বিশেষ ধরনের বাসন, যা থেকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলে দিতে পারলেন জাহাজডুবির আনুমানিক সময়। গ্রিকরাই হেলিনিস্টিক পিরিয়ডে এমন বাসন ব্যবহার করত। তাহলে তো খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের যন্ত্র এটা! কিন্তু প্রশ্ন উঠল, কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল সেইসব জিনিস, আর কারাই-বা নিয়ে যাচ্ছিল? বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বললেন, গ্রিস থেকে সম্পদ লুট করে দস্যুরা নিয়ে চলেছিল অন্যদেশে বেচে দেবার জন্য; আবার কেউ বললেন, গ্রিস থেকে অন্যত্র ব্যবসার কারণেই এইসব মূল্যবান সম্পদ নিয়ে যাবার সময় জাহাজ ডুবে যায়।

যাই হোক, বিজ্ঞানীদের নজর আবার ঘুরল আগে খুঁজে পাওয়া সেই খুব সাধারণ কাঠ আর ব্রোঞ্জ দিয়ে তৈরি ছোট্ট খণ্ডগুলোয়। টুকরোগুলো নতুন করে পরিষ্কার করা হল। বহুবছর ধরে সমুদ্রের তলায় জলে পড়ে থেকে তাদের গায়ে চুনা পাথরের প্রলেপ পড়ে গিয়েছিল। সাবধানে সবচাইতে বড়ো খণ্ডটির উপর থেকে চুনা পাথরের স্তর সরাতেই দেখা গেল কাঠের গায়ে একটা ব্রোঞ্জের গোল চাকতি, তার পরিধিতে কতগুলো দাঁত। কিন্তু সেই চাকতিটা ভাঙা থাকায় মোট ক’টা দাঁত লাগানো হয়েছিল জানা গেল না। এই চাকতিটা আবার লেগে ছিল উপরের দিকের একটা ছোটো চাকতিতে। এখানেও ব্রোঞ্জের পাতের উপর দেখা গেল পুরোনো গ্রিক ভাষায় লেখা কিছু লিপি। চাকতির উপরদিক নির্দেশ করার মতো একটা রডও যেন দেখা গেল।
যা বোঝা গেল তা হল, কোনও এক যন্ত্রের অনেকগুলো ভাঙা অংশ উদ্ধার হয়েছে এবং সবক’টির মধ্যে রয়েছে দাঁতওয়ালা চাকতি। কিন্তু কীভাবে দেখা যাবে খণ্ডগুলোর ভিতরে কী আছে? দেখতে গেলে যন্ত্র ভেঙে খানখান করতে হবে। তাহলে হারিয়ে যাবে সব রহস্য। ভিতরে কী আছে না জানতে পেরে স্টেইস অনুমান করে নিলেন, এটি কোনও ঘড়ির যন্ত্রাংশ অথবা একটা ‘এস্ট্রোলেব’, যা দিয়ে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান অনুযায়ী রাশিফল নির্ণয় করত গ্রিকরা।
যন্ত্রটির ব্যাপারে আলোচনা করতে করতে সংশয় দেখা দিল বিজ্ঞানীদের মধ্যে—তবে কি গ্রিস দেশ এতটাই উন্নত ছিল যে দু-হাজার বছর আগে উন্নত বিজ্ঞানের সাহায্যে তারা এক অভূতপূর্ব যন্ত্র আবিষ্কার করে ফেলেছিল?
প্রতিটি আবিষ্কার সমাজে বেশ জলঘোলা করে। এইক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হল না। প্রশ্ন উঠল—দু-বছর ধরে সংগ্রহশালার পণ্ডিত আর বিজ্ঞানীরা কী করছিল? কেন তারা এই রহস্যের সমাধান করতে পারেনি? চাপানউতোরের মীমাংসা হল না। মাঝে কেটে গেল অনেক সময়, শুরু হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এথেন্সের সংগ্রহশালার সব মূল্যবান সংগ্রহ সরিয়ে দেওয়া হল মাটির তলায় এক গুপ্ত কক্ষে, যাতে শত্রুপক্ষের হাতে পড়ে সেসব নষ্ট হয়ে না যায়। এন্টিকাইথেরার রহস্যময় যন্ত্র কিছুদিনের জন্য রইল অন্তরালে।
যুদ্ধ থেমে যেতে অনেক বিজ্ঞানী আবার সেই যন্ত্রের ছবি খুঁটিয়ে দেখে মাথা ঘামাতে লাগলেন রহস্যভেদে। পড়ার চেষ্টা হল যন্ত্রে খোদিত গ্রিক লিপি। কিন্তু খুব বেশিদূর কেউ এগোতে পারল না। এন্টিকাইথেরা দ্বীপের যন্ত্রটি অন্ধকার ঘরে অপেক্ষা করতে লাগল, কখন তার রহস্যভেদ করে আধুনিক মানুষ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে বিশ্বশান্তির পরিবেশ ফিরে আসার পর গ্রিসের আশেপাশে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলগুলিতে তত্ত্বতল্লাস শুরু হল জাহাজডুবির আরও কোনও চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় কি না সমুদ্রের তলদেশে। অনুসন্ধান করে শুধু এন্টিকাইথেরাই নয়, ভূমধ্যসাগরের আরও অনেক জায়গায় সমুদ্রের তলায় এমনই সব ভাঙা জাহাজ আর প্রাচীন জিনিস উদ্ধার হল। ততদিনে কার্বন ডেটিং পদ্ধতিতে গাছের বয়স নির্ণয় করার পদ্ধতি আবিষ্কার হয়েছে। এন্টিকাইথেরার জাহাজের ভগ্নাংশের কাঠ তুলে তার কার্বন ডেটিং করে জানা গেল, জাহাজের আনুমানিক বয়স খ্রিস্টের জন্মের ২৬০ থেকে ১৮০ বছর আগে। তারপরেই ডুবেছে জাহাজ, সম্ভবত আরও কিছু বছর পরে। আগেও প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এই সময়টিই নির্ধারণ করেছিলেন।
বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় ভাগে সামুদ্রিক প্রত্নতত্ত্বে অগ্রগতি হবার আর এক কারণ হল ডুবুরির পোশাকের পরিবর্তন। আগের মতো মাথায় হেলমেটের বোঝা নিয়ে মিনিট কয়েকের জন্য আর ডুব দিতে হত না। জলের তলায় অন্তত ঘণ্টা খানেক টিকে থাকা যায়, এমন পোশাক ততদিনে বাজারে এসে গেছে। আধুনিক সরঞ্জাম নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে ডুব দিয়ে এন্টিকাইথেরা দ্বীপের সেই স্পঞ্জ শিকারির খুঁজে পাওয়া জাহাজডুবির জায়গাতে পাথর সরানোর কাজ শুরু হল। বিজ্ঞানীরা যা অনুমান করেছিলেন তাই—পাওয়া গেল আরও অনেক জাহাজি জিনিস। পাওয়া গেল কিছু রুপোর মুদ্রা। এই মুদ্রা জাহাজের উৎস সম্বন্ধে রহস্যের চাদর খুলে দিল। রুপোর মুদ্রায় পাওয়া গেল খোদাই করা কিছু লিপি। তাতেই উদ্ধার হল মুদ্রা তৈরির আনুমানিক সাল, আর জানা গেল সেই মুদ্রা ব্যবহার হত পুরোনো গ্রিক শহর পারগামন-এ। তবে এখনকার মতো একেবারে স্পষ্ট করে মুদ্রা তৈরির সময়কাল দু-হাজার বছর আগে লেখা হত না। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিকরা মুদ্রাগুলো পরীক্ষা করে সহজেই বলে দিলেন এই মুদ্রা আনুমানিক ৮৫ থেকে ৭৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে চালু ছিল। মুদ্রা তৈরির সময় থেকে জাহাজডুবি হতে যদি ২০ – ২৫ বছর লাগে, তবে জাহাজডুবির সঠিক সময় ৭০ – ৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ।
বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের অনুসন্ধানে জানা গেল, এশিয়া মাইনর থেকে রওনা দিয়েছিল রোমের এক জাহাজ। গ্রিস তখন খুবই শক্তিশালী দেশ, প্রচুর তার ঐশ্বর্য ও বৈভব আর রোম এক উঠতি দেশ, সবে তার সভ্যতার পেখম মেলতে শুরু করেছে। লড়াই ঝগড়া রোজ লেগেই থাকত গ্রিসের সঙ্গে। হয়তো গ্রিস থেকে লুট করে নিয়ে সেই হরিলুটের বাতাসা রোমে নিয়ে যাবার তালে ছিল কিছু লোক। কিন্তু এন্টিকাইথেরা দ্বীপের কাছে এসে জলের তলায় পাথরে গুঁতো খেয়ে সেই জাহাজ ফুটো হয়ে ডুবে যায় সব সম্ভার নিয়ে।
প্রত্নতাত্ত্বিক রহস্যভেদে কোনও একটা নির্দিষ্ট যুক্তি সহজে গ্রাহ্য হয় না সমাজে, আর খুঁজে পাওয়া কিছু মুদ্রা আর ভাঙা পাথর বলে দিতে পারে না জাহাজ ঠিক কী উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল! অনেকে বললেন, এমনও তো হতে পারে যে, জাহাজটা একটা পণ্য জাহাজ ছিল। তাই সে কেনাকাটি সেরে পশরা সাজিয়ে চলেছিল আপন দেশে। প্রশ্ন উঠল, আর ওই চাকতি লাগানো যন্ত্রটা কীজন্য জাহাজে উঠেছিল? উত্তর খুঁজে না পেয়ে একজন তো বলেই বসল, খারাপ হওয়া ঘড়ি বা এস্ট্রোলেব অন্যদেশে যাচ্ছিল সারাই হতে। অনেকে সেই যুক্তি শুনে হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলল, উন্নত দেশ গ্রিস অন্য দেশে সারাইয়ের জন্য কোন দুঃখে যন্ত্র পাঠাতে যাবে!
যন্ত্র কেন জাহাজে চড়েছিল, সে-উত্তরের চাইতেও বেশি প্রয়োজনীয় ছিল যন্ত্রের উদ্দেশ্য ঠিক কী ছিল, আর কে সেই যন্ত্র বানিয়েছিল?
আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে যন্ত্রের কার্যকারিতার অনুসন্ধান
বেশ কিছু বছর পর যন্ত্রটি আবার মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এল এক পদার্থবিদের হাত ধরে। তরুণ পদার্থবিজ্ঞানী প্রফেসর ডেরেক এস. প্রাইস ধাতু-পদার্থবিদ্যায় কাজ করে ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়ে তখন সিঙ্গাপুরের এক কলেজে অঙ্কের অধ্যাপনা করছেন। পড়িয়ে তাঁর মন ভরছে না, নতুন কিছু করতে হবে। খুব উৎসাহ বিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে কাজ করবেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে দরখাস্ত জমা করলেন আবার এক ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য। বিষয়—বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির ইতিহাস। দরখাস্ত মঞ্জুর হল। তিনি কাজ শুরু করলেন। হঠাৎই একদিন তাঁর নজর পড়ল এন্টিকাইথেরা দ্বীপ থেকে পাওয়া সেই ঘড়ি বা এস্ট্রোলেব-এর কতগুলো ছবির উপর। তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল যে কোনও বস্তুর আভ্যন্তরীণ গঠন দেখতে এক্স-রে বা গামা-রে ব্যবহার করা যেতে পারে।
প্রাইস এথেন্সের সংগ্রহশালাকে চিঠি লিখলেন যাতে যন্ত্রের টুকরোগুলো তারা কেমব্রিজের পরীক্ষাগারে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু বেঁকে বসল গ্রিসের সরকার—তাদের দেশের মূল্যবান সম্পত্তি তারা বাইরের দেশে পাঠাবে না। সংগ্রহশালা জানাল, বাইরে এই ভঙ্গুর টুকরোগুলো বাক্সবন্দি করে পাঠালে কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না। এরপর প্রাইস নিজে গিয়ে এথেন্সের সংগ্রহশালায় টুকরোগুলো চাক্ষুষ করলেন আর মাপজোক করেও ফেললেন।
বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখক আর্থার সি. ক্লার্ক প্রাইসের কাজের কথা জানতে পেরে উৎসাহিত হয়ে বিজ্ঞানের ম্যাগাজিন ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’-এর সম্পাদককে চিঠি লিখে বলেন, প্রফেসর প্রাইসকে এন্টিকাইথেরা দ্বীপের রহস্যময় যন্ত্র নিয়ে এক প্রবন্ধ লিখতে বলুন। সায়েন্টিফিক আমেরিকান-এর ডাকে সাড়া দিয়ে প্রাইস লিখে ফেলেন এক চাঞ্চল্যকর প্রবন্ধ। আরও বেশি করে মানুষ জানতে পারল গ্রিকদের সেই যন্ত্রের কথা।
এরপর প্রাইস-এর চেষ্টায় এথেন্সের আর-এক পদার্থবিদ, ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ’-এর বিজ্ঞানী হারালাম্বো কারাকালো একটা পেল্লায় গামা-রে মেশিন সংগ্রহশালায় পাঠিয়ে দেন যন্ত্রাংশগুলোর আভ্যন্তরীণ ছবি তোলার জন্য। কিন্তু তেমন কিছু ফল না পেয়ে অত্যাধুনিক এক্স-রে মেশিন পাঠিয়ে নিজেই তিনি ছবি তোলেন। খুলে যায় রহস্যের জট।
অসংখ্য এক্স-রে দিয়ে তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে প্রাইস তাঁর লেখা প্রবন্ধ ‘গিয়ারস ফ্রম দ্য গ্রিকস’-এ লেখেন, যন্ত্রটি আসলে একটি ক্যালেন্ডার কম্পিউটার, যার হাতল ঘুরিয়ে সূর্য আর চাঁদের গতিবিধি আগে থেকে জানা যেত। এর ফলে সহজেই যে-কোনো বছরের মাস আর দিনের হিসেব রাখা যেত। জানা যেত অন্য গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধিও।
প্রাইস দেখেন সবচাইতে বড়ো খণ্ডটিতে ২৭টা দাঁতওয়ালা চাকা বা গিয়ার আছে, যারা সবাই একে অপরের সঙ্গে সমান্তরালভাবে লাগানো। প্রতিটি গিয়ার পরস্পরের সঙ্গে ব্রোঞ্জের রড দিয়ে জোড়া। গিয়ারে দাঁতের সংখ্যা গুনে তবেই জানা যায় তার উদ্দেশ্য। কিন্তু অসুবিধা হল, অনেক দাঁতই ছিল ভাঙা। তবে অনুমান করা খুব কঠিন কাজ ছিল না। একটি চাকতির এক-চতুর্থাংশে কতগুলো দাঁত আছে গুনে নিয়ে বাকিটা হিসেব করে ফেলেন প্রাইস।
প্রাইসের কাজ অনেক বিজ্ঞানীকে খুশি করতে না পারায় আবার নতুন করে ভাবনা-চিন্তা শুরু হয় এই যন্ত্র নিয়ে। লন্ডনের বিজ্ঞান-যাদুঘরের অধ্যক্ষ মাইকেল টি. রাইট ঘড়ি-যন্ত্রের বিশারদ এক পদার্থবিদ ছিলেন। ১৯৭৫ সাল থেকে তিনি যাতায়াত শুরু করেন এথেন্সের সংগ্রহশালায়। কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ এলান ব্রমলে তাঁকে সহায়তা করেন। ততদিনে প্রয়োগবিজ্ঞান শাখায় প্রভূত উন্নতি হয়ে গেছে। এক্স-রে ব্যবহার করে ত্রিমাত্রিক ছবি (এক্স-রে টমোগ্রাফি) তোলা সম্ভব হচ্ছে। এরপর কম্পিউটারের সাহায্যে মডেলিং করার পদ্ধতিও এই দুই বিজ্ঞানী জুটি ব্যবহার করেন। রাইট এই যন্ত্রের একটি বাস্তবিক মডেলও বানিয়ে ফেলেন।
প্রভূত গবেষণার মধ্যে দিয়ে মাত্র চারটি ভাঙা টুকরোর উপর অনুসন্ধান চালিয়ে এখনও পর্যন্ত যা জানা গিয়েছে তা হল, একটি কাঠের ছোট বাক্সের মধ্যে রাখা এই যন্ত্রে হাতল ঘোরালে ঘুরে যেত বাক্সের ভিতরে লাগানো নানা চাকা। বাক্সের বাইরে ডায়ালের উপর লাগানো নির্দেশক দেখিয়ে দিত সূর্য চাঁদ বা অন্য গ্রহ একটি বিশেষ দিনে কোথায় অবস্থান করছে। এই অবস্থান বুঝে গ্রিকরা খুব সম্ভবত বন্যা খরা বা অন্য মহামারির ভবিষ্যতবাণী করত।
গ্রিকরা ক্যালেন্ডার হিসেবেই যন্ত্রটিকে ব্যবহার করত, কিন্তু সেই ক্যালেন্ডার ছিল মিশরিয় ক্যালেন্ডার। জানা যেত বছরের কোন সময়ে হবে সূর্য আর চন্দ্রগ্রহণ। ১৯ বছরের হিসেবে চলত এই ক্যালেন্ডার, অর্থাৎ ১৯ বছর পর আবার নতুন পর্যায় শুরু হত, চাঁদ সূর্য আর পৃথিবী একই অবস্থানে ফিরে আসত।

এন্টিকাইথেরা দ্বীপের কাছে পাওয়া এই মহামূল্যবান ঐতিহাসিক যন্ত্রের উপর এখনও কাজ চলছে। হয়তো আরও অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে সেই যন্ত্রে, যা এখনও পর্যন্ত রয়ে গিয়েছে অজানা। তবে এই যন্ত্রের উপস্থিতি আজকের দিনের সভ্য মানুষের দম্ভ ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে, যে দম্ভ মনে করে বর্তমানের সভ্যতাই আধুনিক। কালের গ্রাসে হয়তো এমন অনেক অসাধারণ সভ্যতা হারিয়ে গিয়েছে চিরতরে, আবার নতুন করে গড়ে উঠেছে বিজ্ঞান।
তথ্যসূত্র ও ছবিঋণ–
1) A Portable Cosmos, Revealing the Antikythera Mechanism, Scientific Wonder of the Ancient World Alexander Jones, Oxford University Press, 2017
2) The Antikythera Mechanism, Charles River Editors. The Antikythera Mechanism: The History and Mystery of the Ancient World’s Most Famous Astronomical Device, Charles River Editors, Kindle Edition.
3) The Astonishing History of the Antikythera Mechanism, The World’s Oldest Computer, by Gina Dimuro, December 2021, https://allthatsinteresting.com/antikythera-mechanism
অ সাধারণ … অনেক নতুন কিছু জানা গেল
খুব ভালো লাগলো