সন্ধ্যা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য প্রতিযোগিতা ২০২২- জয়ী প্রবন্ধগুলো- প্রথম স্থান- প্রভু দাও মোরে আরো চেতনা, যুগ্ম দ্বিতীয় স্থান- ভ্রাম্যমান বেচুবাবুর সঙ্কট,যুগ্ম দ্বিতীয় স্থান-মুণ্ডু ছাড়া বাঁচব নাকি, তৃতীয় স্থান- বাউড়ি জাতির ইতিহাস, চতুর্থ স্থান- এন্টিকাইথেরা দ্বীপের মহাকাশ যন্ত্র, পঞ্চম স্থান-একটি ব্যর্থ আর্কটিক অভিযান, ষষ্ঠ স্থান-ফারাওয়ের রান্নাঘর

১৮৫৭ সালের মধ্যভাগে যখন সিপাহি বিদ্রোহ ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তিতে বড়োসড়ো আঘাত হেনে বসেছে, ভারত থেকে ইংল্যান্ডে এসে পৌঁছাচ্ছে একের পর এক গভীর উদ্বেগজনক খবর, তার মধ্যেও কিন্তু রাজধানী লন্ডন দিব্যি জমজমাট। ভারতীয় নেটিভদের বিদ্রোহের আঁচ সাগর পেরিয়ে ভিক্টোরিয়ান ইংল্যান্ডের সাধারণ জীবনযাত্রাকে কোনোভাবেই ব্যাহত করতে পারেনি। ৪ জুলাই ১৮৫৭, লন্ডনের রিজেন্ট স্ট্রিটের গ্যালারি অব ইলাস্ট্রেশনে সাজো সাজো রব। মহারানি ভিক্টোরিয়া স্বয়ং এসেছেন নাটক দেখতে। সঙ্গে এসেছেন রানির স্বামী প্রিন্স কনসর্ট অ্যালবার্ট, বেলজিয়ামের রাজা প্রথম লিওপোল্ড যিনি রানির মামাও বটে; আর এসেছেন বেশ কিছু সভাসদ—ব্রিটিশ লর্ড ও লেডিরা। নাটকটি বেশ নতুন, ওই বছরের গোড়াতেই প্রথমবার অভিনীত হয়েছে। জনপ্রিয় লেখক উইলকি কলিন্সের লেখা এই নাটকটির নাম ‘দ্য ফ্রোজেন ডিপ’। মাত্র সাত মাসেই নাটকটি বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছে। তার একটা বড়ো কারণ অবশ্যই নাটকের প্রধান দুই অভিনেতা। নায়ক ফ্র্যাঙ্ক অ্যাল্ডার্সলির চরিত্রে অভিনয় করছেন লেখক কলিন্স নিজেই আর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিচার্ড ওয়ার্ডুরের চরিত্রে আছেন কলিন্সের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সেই সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক চার্লস ডিকেন্স।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান থেকে জানা যায় যে মহারানি ভিক্টোরিয়া নাটকটি খুবই উপভোগ করেন। নাটকের পরে তিনি আলাদা করে অভিনেতা ডিকেন্সের সঙ্গে দেখা করে তাঁর ভালো লাগার কথা জানান। মহারানির এরকম প্রশংসা পেয়ে ডিকেন্স অভিভূত হয়েছিলেন অবশ্যই, তবে একই সঙ্গে নিশ্চয়ই তাঁর মনে পড়ছিল ঠিক কী কারণে এই নাটকের সঙ্গে তিনি জড়িয়ে পড়লেন। সত্যি কথা বলতে কী, নাটকটি কলিন্স লেখা শুরু করলেও ডিকেন্স তাতে এত বেশি পরিবর্তন আনেন যে নাটকটা অনেকটাই তাঁর হয়ে ওঠে। ‘দ্য ফ্রোজেন ডিপ’ উইলকি কলিন্স আর চার্লস ডিকেন্সের যৌথ রচনা বললেই বোধহয় সঠিক হয়। অভিনয়ের নেশা ডিকেন্সের বরাবরই ছিল, কিন্তু জন ফ্র্যাঙ্কলিনের ব্যর্থ আর্কটিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে লেখা এই নাটকটিতে তাঁর জড়িয়ে পড়ার পিছনে ছিল অন্য এক বিশেষ কারণ। ফ্র্যাঙ্কলিনের সঙ্গী ব্রিটিশ অভিযাত্রীদের ওপর নেমে আসা ক্যানিবালিজম বা নরখাদকতার ‘অপবাদ’-এর তীব্র প্রতিবাদ হিসেবে ডিকেন্স ইতিমধ্যেই বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখে ফেলেছিলেন তাঁর নিজের পত্রিকায়। কিন্তু প্রবন্ধের পাঠক চিরকালই কম, ডিকেন্সের মতো খ্যাতনামা লেখকের প্রবন্ধও বেশি পাঠক পড়ে না। যখনই কলিন্সের থেকে উনি শুনলেন যে বন্ধু আর্কটিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে একটি নাটক লিখতে চলেছে, একটি সুযোগ এসে গেল তাঁর হাতে। নিজের লেখার ব্যস্ততার মাঝেই ‘দ্য ফ্রোজেন ডিপ’ নিয়ে মেতে গেলেন যাতে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে যে শ্বেতাঙ্গ ইংরেজরা চরম প্রতিকূল পরিস্থিতেও ক্যানিবালিজমের মতো ঘৃণ্য কাজ করতে পারে না; নিজেদের সভ্যতার আদর্শ বুকে নিয়ে তাঁরা বরং আত্মবিসর্জন করে নাটকের প্রতিনায়ক রিচার্ড ওয়ার্ডুরের মতো। কী ছিল এই নরখাদকতার ‘অপবাদ’ যা ডিকেন্সের মতো লেখককে এত বিচলিত করে তুলেছিল? কে বা কারা এই অপবাদ ছড়িয়ে দেয়? আদৌ কি এটা অপবাদ ছিল, নাকি এর পিছনে যথেষ্ট সত্যও ছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের প্রথমেই ফিরে দেখতে হবে জন ফ্র্যাঙ্কলিনের ১৮৪৫ – ১৮৪৮-এর সেই ব্যর্থ আর্কটিক অভিযানের ইতিহাস।
আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে সহজতর যোগাযোগের জন্য কানাডার আর্কটিক অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে উত্তর-পশ্চিম সমুদ্রপথ সন্ধানের অভিযান চলছিল বেশ কিছু সময় ধরে। ঊনবিংশ শতকের প্রথমদিকে ইউরোপের মানুষের কাছে যখন প্রাচ্যে পৌঁছাবার একের পর এক পথ খুলে গেছে, তখনও কানাডার আর্কটিক অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে প্রাচ্যে প্রবেশ করার উত্তর-পশ্চিম সমুদ্রপথ অনাবিষ্কৃতই থেকে গেছিল। একই সঙ্গে প্রায় অজানা আর্কটিক অঞ্চলে অভিযানের আগ্রহও দেখা দিতে শুরু করে ইউরোপীয়, বিশেষত ব্রিটিশ অভিযাত্রীদের মধ্যে। বিশ্বজুড়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই বেশ সফলভাবে শুরু হয়ে গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ জাঁকিয়ে বসেছে—যদিও আমেরিকা স্বাধীন হয়ে সেই সাম্রাজ্যবাদের ভিত্তিতে সজোরে ধাক্কা দিয়েছে। এমতাবস্থায় নতুন সমুদ্রপথ বা বসবাস যোগ্য ভূমির আবিষ্কার করে তার উপর দ্রুত ব্রিটিশ অধিকার কায়েম করার উদ্দেশ্য ব্রিটিশ পার্লামেন্ট উঠে পড়ে লাগে। আর এই কাজে সবথেকে উদ্যোগী হয়ে ওঠেন নৌ-দপ্তরের উচ্চপদস্থ আধিকারিক স্যার জন ব্যারো। ব্যারোর আমলেই উত্তর-পশ্চিম সমুদ্রপথ সন্ধানের একের পর এক অভিযান সংঘটিত হয়। কখনও জন রসের নেতৃত্বে, কখনও উইলিয়াম প্যারি বা জর্জ ব্যাকের নেতৃত্বে এবং অবশ্যই কয়েকবার জন ফ্র্যাঙ্কলিনের নেতৃত্বে। রস, প্যারি বা ব্যাকের অভিযানগুলি শুধু ব্যর্থই হয়েছিল তা নয়, প্রায় প্রতিটিতেই অভিযাত্রী দলকে যেরকম প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় যে সেগুলোর প্রত্যেকটি নিয়ে আলাদা করে অ্যাডভেঞ্চার গল্প লেখা যায়। তবে আমাদের আলোচ্য এখানে শুধুই জন ফ্র্যাঙ্কলিনের অন্তিম আর্কটিক অভিযান—যে অভিযান থেকে ১২৯ জনের দলের একজনও ফিরে আসতে সক্ষম হয়নি।
জর্জ ব্যাকের আর্কটিক অভিযানের ব্যর্থতার প্রভাবেই হয়তো ব্রিটিশ আর্কটিক অভিযানে সাময়িক বিরতি পড়ে কিন্তু জন রসের ভাইপো জেমস ক্লার্ক রসের ১৮৩৯ – ১৮৪৩-এর অত্যন্ত সফল অ্যান্টার্কটিক অভিযানের পর ব্যারো আবার উঠে পড়ে লাগেন উত্তর-পশ্চিম সমুদ্রপথ খুঁজে পাওয়ার অভিযানকে সফল করতে। ১৮৪৪ সাল নাগাদ ব্যারো দৃঢ় সংকল্প নেন যে বছর পঁচিশ আগে তিনি উত্তর-পশ্চিম সমুদ্রপথের সন্ধানের যে প্রচেষ্টা শুরু করেছিলেন তাকে যেভাবেই হোক দ্রুত পরিণতি দিতে হবে। তিনি আশঙ্কা করছিলেন যে ব্রিটিশরা পূর্ব বা পশ্চিমদিকের দরজাগুলো অত সফলভাবে খুলে দেবার পর উত্তরেরর এই সামান্য চৌকাঠ যদি পেরোতে না পারে তাহলে তারা সারা বিশ্বের মজার খোরাক হবে। ব্যারোর হাতে তখন রয়েছে সদ্য অ্যান্টার্কটিক অভিযান করে আসা এক সফল নেতা—জেমস ক্লার্ক রস আর তাঁর দুই জাহাজ—এরেবাস ও টেরর। জাহাজ দুটি পাওয়া গেলেও রসকে অবশ্য পাওয়া গেল না। স্ত্রীর প্রবল আপত্তিতে রস দুর্গম আর্কটিক অভিযানে যেতে মানা করে দিলেন। প্যারিও রাজি হলেন না; ব্যাককে আবার ব্যারোর পছন্দ নয়; ফ্র্যাঙ্ক কোজিয়ার যোগ্য, কিন্তু একে সে দরিদ্র পরিবারের সন্তান, তার ওপর আইরিশ; জেমস ফিৎজেমস আবার অনভিজ্ঞ। অভিযানের দায়িত্ব অবশেষে পেলেন ৫৯ বছরের প্রায়-বৃদ্ধ জন ফ্র্যাঙ্কলিন। খুব একটা ইচ্ছে না থাকলেও ব্যারো সম্মতি দিলেন।
ব্যারোর একেবারে পছন্দের মানুষ না হলেও আর্কটিক অভিযানে কিন্তু ফ্র্যাঙ্কলিনের অভিজ্ঞতা কম ছিল না। ১৮৪৫-এর আগে ফ্র্যাঙ্কলিন তিনটি আর্কটিক অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। তার মধ্যে ১৮১৯ – ১৮২২-এর অভিযানটিও কম রোমহর্ষক ছিল না। কানাডার তুন্দ্রা অঞ্চল দিয়ে ফেরার সময় অভিযাত্রীদল এমন দুরবস্থায় পড়ে যে তারা নাকি নিজেদের জুতোর চামড়া খেতেও বাধ্য হয়। অভিযান থেকে ফিরে আসার দীর্ঘদিন পরেও আড়ালে আবডালে ফ্র্যাঙ্কলিনের ডাকনাম ছিল, ‘সেই ক্যাপ্টেন যে জুতো চিবিয়ে খেয়েছিল।’ এমনকি ক্যানিবালিজমের অভিযোগও হালকাভাবে উঠেছিল সেই সময়। তবে ১৮৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন ফ্র্যাঙ্কলিন নতুন অভিযানের দায়িত্ব পেলেন তখন এইসব অভিযোগ মানুষ প্রায় ভুলেই গেছে। প্রায় তিন বছরের খাদ্য-পানীয়ের রসদ নিয়ে ১৯ মে, ১৮৪৫ জাহাজ দুটি যখন রওনা দেয় তখন সবাই উৎসাহে আর আশায় ভরপুর। ফ্র্যাঙ্কলিনের ওপরও ভরসা যথেষ্ট। রয়্যাল জিওগ্রাফিকাল সোসাইটির সভাপতি রডেরিক মার্চিনসন তো বলেই বসলেন, “ফ্র্যাঙ্কলিন এই নামটাই যথেষ্ট সারাদেশকে ভরসা জোগানোর জন্য।” অভিযানের নেতৃত্ব ও এরেবাসের ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব ফ্র্যাঙ্কলিনের উপর থাকলেও টেরর-এর ক্যাপ্টেন হলেন কোজিয়ার।
জাহাজ দুটিতে ফ্র্যাঙ্কলিন, কোজিয়ার, ফিৎজেমস এবং অন্যান্য অফিসার ও কর্মী-সহ মোট ১৩৪ জন মানুষ ছাড়াও নেপচুন নামে এক কুকুর আর জ্যাকো নামে এক পোষা বাঁদরও ছিল। যাত্রার কয়েকদিনের মধ্যেই পাঁচজন অসুস্থ বোধ করায় ফিরে আসেন। পরে নিশ্চয় তাঁরা তাঁদের ওই হঠাৎ অসুস্থতার জন্য ঈশ্বরকে কোটি কোটি ধন্যবাদ জানিয়েছেন। অবশিষ্ট ১২৯ জন মানুষ, একটি কুকুর আর একটি বাঁদর নিয়ে এরেবাস আর টেরর নামে জাহাজ দুটো অবশ্য এগিয়ে চলে। সেই সময় দুই জাহাজের মধ্যে থাকা একজনও কি বুঝেছিল গ্রিক অন্ধকারের দেবতার নামে আর আতঙ্কের নামে রাখা জাহাজ দুটো তাদের নিশ্চিত ট্র্যাজেডির দিকে নিয়ে যাচ্ছে? জুলাইয়ের শেষে এই দুই জাহাজের সঙ্গে দেখা হয় দুটি ছোটো তিমি শিকারি জাহাজের। বাফিন উপসাগরে ফ্র্যাঙ্কলিনরা তখন অনুকূল পরিবেশের প্রতীক্ষায় আছেন যাতে তাঁরা উপসাগর পেরিয়ে ল্যাঙ্কাস্টার সাউন্ডে পৌঁছাতে পারেন। আবহাওয়ার প্রতিকূলতার মাঝে এরেবাস আর টেরর তিমি শিকারের জাহাজে দুটোর থেকে আলাদা হয়ে যায়। ব্যস, সেটাই শেষ। তারপর থেকে ফ্র্যাঙ্কলিনের ওই জাহাজ দুটির সঙ্গে ‘সভ্য’ জগতের সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়।
যেহেতু জাহাজে পর্যাপ্ত রসদ মজুত ছিল তাই যোগাযোগ ছিন্ন হলেও প্রথমে কেউই তেমন চিন্তা করেননি। ১৮৪৮-এর শুরু থেকেই কিন্তু দুশ্চিন্তা ধীরে ধীরে দানা বাঁধতে শুরু করে। ফ্র্যাঙ্কলিনের উদ্বিগ্ন স্ত্রী লেডি জেন ব্রিটিশ সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আবেদন করেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে সরকার প্রাথমিকভাবে তিনটি সন্ধান অভিযানের (search expedition) আয়োজন করে। প্রথমটির নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন হেনরি কেলেট, দ্বিতীয়টিতে স্যার জেমস ক্লার্ক রস (এবার আর তিনি আপত্তি জানানোর সুযোগ পেলেন না), আর তৃতীয়টিতে, যেটিতে অভিযান চলে স্থলপথ দিয়ে, নেতৃত্বের দায়িত্বে ছিলেন ডা. জন রে আর স্যার জন রিচার্ডসন। তিনটি সন্ধান অভিযানই ব্যর্থ হয়। পরবর্তী কিছু বছর ধরে সরকারি ও লেডি জেনের নাছোড়বান্দা চেষ্টায় বেসরকারি উদ্যোগেও বেশ কিছু সন্ধান অভিযান আয়োজিত হয়। যে-সমস্ত তথ্য উঠে আসে তা হল ১৮৪৫ – ৪৬-এর শীতকাল বিচে দ্বীপে কাটানোর পর ১৮৪৬-এর গ্রীষ্মে জাহাজ দুটি কিং উইলিয়াম দ্বীপের কাছে বরফে আটকে পড়ে। জাহাজ ছেড়ে সবাই নেমে স্থলপথ ধরে কানাডার মূল ভূখণ্ডের দিকে এগোতে শুরু করে। একটি সন্ধান অভিযানে ফ্র্যাঙ্কলিনের দলের তিন সদস্যের মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয় বিচে দ্বীপে। তবে এরা সবাই ১৮৪৬-এর প্রথমদিকেই মারা যায়। কিন্তু বাকিদের পরিণতি কী হল তা নিয়ে কোনও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেল না। ২০শে জানুয়ারি, ১৮৫৪। সরকার লিখিতভাবে ঘোষণা করে দেয় যে মার্চের ৩১ তারিখের মধ্যে অন্য কোনও খবর না পাওয়া গেলে অবশিষ্ট ১২৬ জনকেও মৃত গণ্য করা হবে। এরেবাস আর টেরর-এর সবাইকে সরকারিভাবে মৃত ঘোষণার পর মাস ছয়েক সবে কেটেছে। অক্টোবরে ‘টোরোন্টো গ্লোব’ আর লন্ডনের ‘টাইমস’ জন রের সংগ্রহ করা একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য তাদের কাগজে পরপর প্রকাশ করতে শুরু করবে, নরখাদকতার অভিযোগে বিদ্ধ হবেন ফ্র্যাঙ্কলিন ও তাঁর সহ-অভিযাত্রীরা ও সেই ‘অপবাদ’ খন্ডন করতে আক্ষরিক অর্থেই মঞ্চে অবতীর্ণ হবেন স্বয়ং ডিকেন্স।
হাডসন বে কোম্পানির হয়ে জন রে ১৮৫৪ সালে যখন ফ্র্যাঙ্কলিন অভিযানের পরিণতি নিয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছিলেন তখন কানাডার নুনাভুটের পেলি উপসাগরের কাছে তাঁর সঙ্গে এক ইনুইট বা এস্কিমোর দেখা হয়। সেই এস্কিমো রেকে জানায় যে অন্য এক এস্কিমোর থেকে সে শুনেছে যে জনা চল্লিশ সাদা চামড়ার মানুষ ব্যাক নদীর মুখে অনাহারে মারা যায়। শুধু তাই নয় ওদের মধ্যে কেউ কেউ মৃত সহযাত্রীদের দেহমাংস খেতেও বাধ্য হয়েছিল, মানে সোজা কথায় তারা ক্যানিবালিজমের আশ্রয় নিতেও দ্বিধা করেনি। এস্কিমোদের এই বয়ান রে অন্তত অবিশ্বাস করতে পারেননি। ইংল্যান্ডে ফিরে রে সরকারকে যে রিপোর্ট পেশ করেন এবং যা কোনোভাবে ফাঁস হয়ে যায় টাইমস সংবাদপত্রের পাতায়, তাতে তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন ক্যানিবালিজমের কথা—
“…from the mutilated state of many of the corpses and the contents of the kettles, it is evident that our wretched countrymen had been driven to the last resource—cannibalism—as a means of prolonging existence.”
দেশজুড়ে আলোড়ন পড়ে যায়। সভ্য ব্রিটিশদের উপর নরখাদকতার অপবাদ? লেডি জেন অত্যন্ত অপমানিত বোধ করেন—তাঁর স্বামী ও তাঁর দল নিয়ে এ কী বিশ্রী দুর্নাম? যদিও তখন কেউই জানতেন না যে নরখাদকতার অভিযোগ অন্তত ফ্র্যাঙ্কলিনের উপর লাগু হয় না। ১৮৪৮-এর কোনও এক সময়ের ক্যানিবালিজমের ঘটনার বেশ কিছু আগেই, ১১ জুন ১৮৪৭ সালে ফ্র্যাঙ্কলিনের মৃত্যু হয়। সেই তথ্য অবশ্য ১৮৫৯-এর আগে জানা যাবে না। তাই তার আগে পর্যন্ত রের নরখাদকতার অভিযোগের আওতায় স্যার জন ফ্র্যাঙ্কলিনও চলে আসেন।
ডিসেম্বর ১৮৫৪ সালে তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ‘হাউসহোল্ড ওয়ার্ডস’-এ চার্লস ডিকেন্স ‘দ্য লস্ট আর্কটিক ভয়েজার্স’ নামে তিন খণ্ডের এক প্রবন্ধে রের তথ্যকে নস্যাৎ করে দেন। রের মূল তথ্যসূত্র যেহেতু ছিল এস্কিমোদের বয়ান, ডিকেন্স প্রথমেই প্রশ্ন তুলে দেন যে বর্বর, অসভ্য এস্কিমোরা আদৌ বিশ্বাসযোগ্য কি না সেই প্রশ্ন। এইরকম অশিক্ষিত বর্বররা প্রায়শই তাদের বর্ণনা অতিরঞ্জিত করে তোলে, এক্ষেত্রেও নিশ্চিত তাই হয়েছে। কোনও অবস্থাতেই সভ্য ইংরেজরা নরখাদকতার মতো ঘৃণ্য কাজ করতে পারে না। নরখাদকতা যদি আদৌ হয়ে থাকে তাহলে ওই অসভ্য এস্কিমোরাই সেটা করেছে। এসব ঘৃণ্য কাজ ওদেরই মানায়। জীবনে কোনোদিনই আর্কটিকে না গিয়ে, একটাও এস্কিমোর সঙ্গে দেখা না করে নিজের লন্ডনের লেখার টেবিলে বসে কত সহজে তৎকালীন যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী লেখক এস্কিমোদেরই নরখাদক হিসেবে দাগিয়ে দিলেন! ব্রিটিশ অভিযাত্রীরা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও যে নিজেদের অন্তর্লীন সভ্যতা ও মানবতাকে বজায় রাখতে পারে তাই নিয়ে কলিন্সের সঙ্গে যৌথভাবে ডিকেন্স লিখে ফেললেন একটি গল্প—‘দ্য রেক অব দ্য গোল্ডেন মেরি’। গল্পটি প্রকাশিত হয় ১৮৫৬ সালে। আর তার পরের বছরই মঞ্চে এসে যায় ‘দ্য ফ্রোজেন ডিপ’—যার কথা তো প্রথমেই বিস্তারে বলা হয়েছে। ডিকেন্স অভিনীত রিচার্ড ওয়ার্ডুর যখন কলিন্স অভিনীত ফ্র্যাঙ্ক অ্যাল্ডার্সলিকে বাঁচিয়ে আত্মত্যাগ করে অভিভূত ব্রিটিশ দর্শক চোখের জল মোছার সঙ্গে সঙ্গে ফ্র্যাঙ্কলিন অভিযানের নরখাদকতার অভিযোগও যেন মুছে দেয়। সভ্য ব্রিটিশরা যে কোনোভাবেই নরখাদক হতে পারে না এই বিশ্বাসটা আরও দৃঢ় হয়ে বসে।
কিন্তু সময় প্রমাণ করে দেয় যে ডিকেন্স ও তাঁর সমসাময়িক ‘সভ্য’ ব্রিটিশেরা একেবারেই ভুল ছিলেন। ক্যানিবালিজম হয়েছিল ও ফ্র্যাঙ্কলিনের অভিযাত্রী দলের সদস্যরাই তাতে যুক্ত ছিলেন। রের পর দুই আমেরিকান অভিযাত্রী—প্রথমজন চার্লস হল আর দ্বিতীয়জন লেফটেন্যান্ট ফ্রেডেরিক শোয়াটকা আর্কটিক অঞ্চলে গিয়ে আবার খোঁজখবর শুরু করেন। দুজনকেই এস্কিমোরা জানায় যে নরখাদকতার ঘটনা সত্যিই হয়েছিল। কিন্তু নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায় প্রায় একশো বছর পর। ১৯৮০-এর দশকে ফরেনসিক নৃতাত্ত্বিক ওয়েন বিটির নেতৃত্বে কিং উইলিয়াম দ্বীপে যে অভিযান চলে তাতে ফ্র্যাঙ্কলিনের দলের কয়েকজন সদস্যের দেহাবশেষ পাওয়া যায়। সেগুলো উদ্ধার করে তাদের উপর চলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ফ্র্যাঙ্কলিন অভিযানের ব্যর্থতার এক অজানা কারণ আবিষ্কৃত হয়। ক্যানবন্দি খাদ্যে থাকা সীসাজনিত বিষক্রিয়া অনেক অভিযাত্রীর মৃত্যুর সরাসরি কারণ হয়ে ওঠে; সেই বিষ আবার অনেককে এতটাই দুর্বল করে তোলে যে প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করার সব ক্ষমতা তাদের হারিয়ে যায়। সীসাজনিত বিষক্রিয়ার নিশ্চিত প্রমাণ ছাড়া নৃতাত্ত্বিক দল নরখাদকতা নিয়ে রহস্যের সমাধানও করে ফেলেন। ক্যানিবালিজমের দুটি নির্দিষ্ট ধাপ সাধারণত দেখা যায়। প্রথম ধাপে থাকে খিদের তাড়নায় মৃতদেহের মাংসল অংশ থেকে মাংস কেটে খাওয়া; আর দ্বিতীয় ধাপে, পরিস্থিতি যখন আরোই প্রতিকূল তখন মৃতদেহের হাড় ভেঙে সেগুলো গরম করে অস্থিমজ্জা খাওয়া। ৩৫টি হাড়ের উপর পরীক্ষা করে সাইমন মেইস আর ওয়েন বিটি দেখেন যে হাড়গুলো কোনও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কাটা হয় ও তারপর গরম করা হয় যা থেকে নিশ্চিত আন্দাজ করা যায় যে ঠিক কী হয়েছিল। খাদ্যের অভাবে ফ্র্যাঙ্কলিনের দলের অভিযাত্রীরা নিজেদের সহ-অভিযাত্রীদের মৃতদেহের অংশ খেতেও বাধ্য হয়েছিলেন। এই সত্যি অস্বীকার করার কোনও উপায় আর নেই।
ফ্র্যাঙ্কলিনের অভিযান ব্যর্থ হলেও ভিক্টোরীয় যুগের মানুষের কাছে ফ্র্যাঙ্কলিন নায়ক হিসেবেই গণ্য হতেন। উৎসাহের আতিশয্যে তাঁকে উত্তর-পশ্চিম সমুদ্রপথের আবিষ্কারকের সম্মানও দেওয়া হয় যেটা মোটেই সম্পূর্ণ সত্য নয়। ফ্র্যাঙ্কলিন অভিযানের পরিণতি সন্ধানে রবার্ট ম্যাকক্লুর যে অভিযানটি করেন, ১৮৫০-এর সেই অভিযানেই বরং উত্তর-পশ্চিম সমুদ্রপথ আবিষ্কৃত হয়। অর্ধশতাব্দী পরে নরওয়ের অভিযাত্রী রোয়াল্ড আমুন্ডসেন এই পথ যে সম্পূর্ণভাবে জাহাজে ভ্রমণ করা সম্ভব তা প্রমাণ করে দেন। প্রায় ১৮০ বছর পরেও ফ্র্যাঙ্কলিনের অভিযান নিয়ে উৎসাহ বিশেষ কমেনি। লেখা হয়েছে একের পর বই; সিনেমা, টিভি সিরিজ, ডকুমেন্টারি—সবই হয়েছে। এই অভিযানের পরিণতি জানার জন্য অভিযান চলেছে একবিংশ শতকেও। ২০১৪ আর ২০১৬-তে আবিষ্কৃত হয়েছে এরেবাস আর টেরর-এর ধ্বংসাবশেষ। কিন্তু ডিকেন্সের সঙ্গে ফ্র্যাঙ্কলিন অভিযানের যোগের দিকটি তুলনামূলকভাবে অনালোচিতই থেকে গেছে। ক্যানিবালিজমের অভিযোগ ডিকেন্সকে ক্রুদ্ধ করে তুলেছিল—নিজের প্রবন্ধ, গল্প, নাটক দিয়ে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে সভ্য ইংরেজ জাতি কোনও পরিস্থিতিতেই নরখাদকে পরিণত হতে পারে না। সময় শুধু ডিকেন্সকেই ভুল প্রমাণিত করেনি, আমাদেরও মনে করে দিয়েছে ডারউইনের ‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’ সূত্রের চরম সত্যতা। চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চলে তখন সভ্যতা, ভদ্রতা, সমাজ আরোপিত রীতি-নীতির আগল ভেঙে যায়; বেঁচে থাকার জন্য যে-কোনো উপায় নিতে মরিয়া মানুষ তখন পিছু হটে না। ডিকেন্সের অভিযোগের প্রতিবাদে জন রে তো স্পষ্ট বলেছিলেন যে তিনি মোটেই মনে করেন না যে নরখাদকতার আশ্রয় নিয়ে অভিযাত্রীরা কিছুমাত্র ভুল করেছিল। চরম খিদের মধ্যে বরং তারা যা করেছিল সেটাই তো স্বাভাবিক ভাবা উচিত। ক্যানিবালিজমের আশ্রয় নিয়ে যদি বেঁচে থাকা যায় তাহলে সেটা করতেও মানুষ দ্বিধা করে না যেমনটি করেনি ১৯৭২-এর আন্দেজের প্লেন দুর্ঘটনার শিকার হওয়া যাত্রীরা। কী হয়েছিল আন্দেজের পাহাড়ে? সে এইরকমেরই এক রোমাঞ্চকর কাহিনি। না, কাহিনি নয়, একেবারে সত্য ঘটনা। পরে কখনও সময় পেলে শোনানো যাবে সেই ঘটনার কথা।
তথ্যসূত্র-
- Owen Beattie and John Geiger, Frozen in Time: The Fate of the Franklin Expedition, London: Bloomsbury, 1987.
- Jack Clayton, “The Terror: What Happened to the Real Life Franklin Expedition”, <https://mpora.com/mountaineering-expeditions/the-terror-true-story-franklin-expedition-cannibalism/>.
- Michael Palin, Erebus: The Story of a Ship, London: Hutchinson, 2018.
- Jacqueline Stamp, “Charles Dickens, Dr. John Rae, and the Mystery of Franklin Expedition”, <https://owlcation.com/humanities/ChCharles-Dickens-Dr-John-Rae-and-the-fate-of-the-Franklin-expedition>.
- Helen Thompson, “Franklin’s Doomed Expedition Ended in Gruesome Cannibalism”,