সন্ধ্যা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য প্রতিযোগিতা ২০২২- জয়ী প্রবন্ধগুলো- প্রথম স্থান- প্রভু দাও মোরে আরো চেতনা, যুগ্ম দ্বিতীয় স্থান- ভ্রাম্যমান বেচুবাবুর সঙ্কট,যুগ্ম দ্বিতীয় স্থান-মুণ্ডু ছাড়া বাঁচব নাকি, তৃতীয় স্থান- বাউড়ি জাতির ইতিহাস, চতুর্থ স্থান- এন্টিকাইথেরা দ্বীপের মহাকাশ যন্ত্র, পঞ্চম স্থান-একটি ব্যর্থ আর্কটিক অভিযান, ষষ্ঠ স্থান-ফারাওয়ের রান্নাঘর

প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা সম্পর্কে আমাদের ধারণা যে একেবারে কম, তা কিন্তু নয়। ফারাও, মমি, পিরামিড, সারকোফেগাস, হায়রোগ্লিফ ইত্যাদি সম্পর্কে বাঙালি পাঠকের আগ্রহ কিছু কম নয়। আর সেই আগ্রহের কারণেই ভারতবর্ষ থেকে বিস্তর দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা সম্পর্কে রিসার্চ এবং সেই সম্পর্কিত একাধিক তথ্যসমৃদ্ধ ভালো বই লেখা হয়েছে।
তবে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার একটা বিশেষ দিক নিয়ে কিন্তু খুব বেশি আলোচনা এ-যাবৎ হয়নি। বিষয়টা হল তাদের রান্নাঘর। কেমন ছিল সেই রান্নাঘর যা আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগে ঈশ্বর সমান ফারাওদের খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত করত; অথবা কোনও সাধারণ মিশরীয় পরিবারের মুখে তুলে দিত খাবার? সেই সম্পর্কে ধারণা কিন্তু আমাদের খুব বেশি নেই। তাই এবার আমরা সেই সম্পর্কে একটু খোঁজখবর করব।
চলুন সরাসরি ঢুকে যাওয়া যাক প্রাচীন মিশরীয় এক রান্নাঘরে। প্রথমেই দেখে নেব ঠিক কেমন ছিল সেই জায়গা যেখানে প্রাচীন মিশরের রাজকীয় বাবুর্চি অথবা কোনও সাধারণ গৃহস্থ রাঁধুনি প্রতিদিনের খাবারের আয়োজন সম্পন্ন করত। অর্থাৎ আমাদের দেখে নিতে হবে মোটামুটিভাবে প্রাচীন মিশরের ‘রান্নাঘর’ দেখতে কেমন ছিল। জেনে নিতে হবে কী কী সরঞ্জাম (কিচেন ইউটেন্সিল) থাকত সেই রান্নাঘরে। প্রাথমিকভাবে সেই রান্নাঘরের স্ট্রাকচার সম্পর্কে খোঁজখবর করতে গিয়ে ঐতিহাসিকরা এক আশ্চর্য জিনিস আবিষ্কার করেন। তাঁরা খেয়াল করেন, প্রাচীন মিশরের সমাজে শ্রেণিবৈষম্য থাকলেও সেই হিসেবে তাদের রান্নাঘরের মডেলে বিশেষ বৈষম্য খুঁজে পাওয়া যায় না। অর্থাৎ রাজপরিবার, পুরোহিত, আমলা অথবা সাধারণ মানুষের রান্নাঘর ছিল প্রায় একইরকম দেখতে।
এই বিষয়ে আরও একটা ব্যাপার বেশ আশ্চর্যের। পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে মিশরীয় সভ্যতা টিকে থাকলেও এই সুদীর্ঘ সময়ে কিন্তু তাদের রান্নাঘরের বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। এর থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার যে ‘কিচেন প্ল্যান’ এবং ‘কুকিং টুলস’ সম্পর্কে প্রাচীন মিশরীয়রা বেশ গোঁড়া ছিল। এই সম্পর্কে তথ্যপ্রমাণ খুঁজতে আমাদের যেতে হবে আধুনিক মিশরের দুটি জায়গায়। তবে তার আগে আমরা ঘুরে আসব ইতিহাসে আর দেখে নেব কেমন ছিল প্রাচীন মিশরীয় সেই ‘রান্নাঘর’।
সময়টা ১১৫৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আশেপাশে। প্রাচীন মিশরের ফারাও তখন তৃতীয় আমেনহোতেপ। প্রাচীন মিশরের অধিকাংশ ফারাওয়ের মতন এই সময়ে তিনিও নানান রোগে আক্রান্ত হয়ে শারীরিকভাবে বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছেন। প্রথা অনুযায়ী ইতিমধ্যেই তিনি নিজের উত্তরসূরি নির্বাচন করে ফেলেছেন। ফারাওয়ের প্রধান স্ত্রী ‘তিয়েতি’র পুত্র চতুর্থ আমেনহোতেপকে তিনি মিশরের পরবর্তী ফারাও ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে তার এই সিদ্ধান্ত অনেকেই মেনে নিতে পারেনি। সেই মানুষগুলোর মধ্যে অন্যতম ফারাওয়ের মেসোপটেমিয়ান রানি (সেকেন্ডারি ওয়াইফ) তিয়ে, যিনি একসময় রোগগ্রস্ত তৃতীয় আমেনহোতেপের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন এক বিশেষ প্রাণদায়ী ওষুধ আমদানি করিয়ে। খুব স্বাভাবিকভাবেই তাই ফারাওয়ের জীবনে তাঁর মেসোপটেমিয়ান রানি তিয়ের গভীর প্রভাব ছিল। হয়তো সেই কারণেই রানি নিশ্চিত ছিলেন যে তাঁর পুত্র ‘পেন্তাওরেত’ই হবেন মিশরের ভবিষ্যৎ ফারাও। তবে তৃতীয় আমেনহোতেপ রানি তিয়ের যাবতীয় ভাবনা-চিন্তায় জল ঢেলে দিলেন।
ফলস্বরূপ রানি তিয়ে এবং তার পুত্র পেন্তাওরেত মিলে এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন। তাদের সঙ্গী হল বেশ কয়েকজন আমলা, যাদের সেই সময়ের মিশরে বিশেষ প্রতিপত্তি ছিল। ভবিষ্যৎ ফারাও ঘোষণার আগেই তারা বর্তমান ফারাও তৃতীয় আমেনহোতেপকে হত্যার সিদ্ধান্ত নিলেন।
ফারাও সেদিন রাতে নিজের হারেমে পানাহারে ব্যস্ত ছিলেন। সেই সময় পেন্তাওরেত এবং কয়েকজন আমলার দ্বারা নিযুক্ত গুপ্ত ঘাতকের হাতে নিহত হলেন তিনি। তবে রানি তিয়ে কিন্তু শেষরক্ষা করতে পারেননি। এই ঘটনার সঙ্গে-সঙ্গেই চতুর্থ আমেনহোতেপ রাজধানীর দখল নিয়েছিলেন এবং তিনিই হয়েছিলেন মিশরের পরবর্তী ফারাও। তিনি এই কাজ খুব সহজেই করতে পেরেছিলেন। কারণ, সেই সময় চতুর্থ আমেনহোতেপ ছিলেন মিশরীয় সেনাবাহিনীর প্রধান।
ফারাও হয়ে চতুর্থ আমেনহোতেপ মেদিনেত হাবুতে নিজের পিতার স্মৃতির উদ্দেশ্যে একটি মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। সেখানেই রাখা হয়েছিল মমি সমেত তৃতীয় আমেনহোতেপ-এর সারকোফেগাস। আফটার লাইফে তার যাবতীয় সুখ-স্বাচ্ছন্দের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল ফারাও-এর নির্দেশে। ফারাও তৃতীয় আমেনহোতেপ ছিলেন একজন খাদ্যরসিক মানুষ। তবে জীবনের শেষ দিকে ‘পাইরিয়া’ (দাঁত এবং মাড়ির রোগ) এবং ডায়াবেটিস-এর কারণে তার খাওয়াদাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। খাদ্যরসিক পিতা যাতে আফটার লাইফে ভোজনসুখ থেকে বঞ্চিত না হন সেই কারণে ফারাও হয়ে চতুর্থ আমেনহোতেপ মেদিনেত হাবুতে প্রতিষ্ঠিত সেই মন্দিরের ঠিক পাশেই তৈরি করালেন একটি রান্নাঘর।
প্রায় তিন হাজার বছর পর মেদিনেত হাবুতে এক্সক্যাভেশনের সময় সেই রান্নাঘরের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পেলেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। সেই রান্নাঘরের অনেক কিছুই তখন ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে প্রাচীন মিশরের আর কোনও বিউরিয়াল সাইটে এ-যাবৎ যা খুঁজে পাওয়া যায়নি তা পাওয়া গেল এই মেদিনেত হাবুতে, অর্থাৎ একটি রান্নাঘর।
মিশরীয় আরকিওলজির এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধানের ফলে খুঁজে পাওয়া তথ্যপ্রমাণের ওপর নির্ভর করে প্রাচীন মিশরের রান্নাঘরের একটি মডেল তৈরি করা হল। বর্তমানে সেই মডেল সযত্নে রাখা রয়েছে কায়রোর ‘মিউজিয়াম অফ এগ্রিকালচার’-এ। কেমন ছিল সেই রান্নাঘর? জানার জন্য আমরা আবার ফিরে আসব বর্তমানে। সেই মডেল দেখতে চলে যাব কায়রোর মিউজিয়াম অফ এগ্রিকালচার-এ।
⮚ রান্নাঘরের মডেল: মিউজিয়ামে রাখা রান্নাঘরের মডেল থেকে আমরা প্রাচীন মিশরীয় রান্নাঘর সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে পারি। রান্নাঘরটি সাধারণত তৈরি করা হত বাড়ির প্রধান বিল্ডিংয়ের পেছন দিকে। আবার কখনও সেটি তৈরি করা হত একেবারে বাড়ির বাইরে কোনও জায়গায়। রান্নাঘরের ছাদ খড় দিয়ে তৈরি করা হত, যাতে ভেতরের গরম হাওয়া এবং ঝাঁজ সেই খড়ের ফাঁক দিয়ে বাইরে বের হতে পারে। রান্নাঘরের সঙ্গেই থাকত আরও একটি মাটির ঘর। সেই ঘরটিতে খাদ্যশস্য মজুত করে রাখা হত। অনেক ক্ষেত্রে বাড়ির প্রধান বিল্ডিংয়ের ছাদের একটি বিশেষ অংশে মজুত করে রাখা হত খাদ্যশস্য। সেইক্ষেত্রে একটি মই (স্টেয়ার) রাখা হত ছাদে উঠে খাদ্যশ্যস্য ওঠানো এবং নামানোর জন্য।
রান্নাঘরের কোনও এককোণে একটি অথবা দুটি মাটির তৈরি উনুন (ওভেন) বানানো হত। পাথর দিয়ে বানানো অন্তত একটি হামানদিস্তা ছিল প্রাচীন মিশরীয় রান্নাঘরের বৈশিষ্ট্য। প্রাচীন মিশরে এই হামানদিস্তাকে বলা হত ‘রেহ্য’। এই রেহ্য মশলা বাটা এবং রুটি তৈরির জন্যে আটা মাখা (ডোহ) উভয় কাজে ব্যবহৃত হত। জল ধরে রাখার জন্যে রান্নাঘরে একাধিক বিশাল আকারের পাথরের তৈরি ‘ভেসেল’ রাখা থাকত। রান্নাঘরের দেওয়ালে ঝোলানো থাকত সমকালীন কোনও আরাধ্য দেবতার প্রতিকৃতি।
এছাড়াও রান্নার জন্য ব্যবহৃত হত দুই হ্যান্ডেলবিশিষ্ট আধুনিক কড়াইয়ের মতন দেখতে সব পাথরের বাসনপত্র। পাথর দিয়ে বানানো শান দেওয়া বেশ কয়েকটি ছুরি থাকত মাংস, সবজি অথবা ফলমূল কাটার জন্য। খাবার রাখা, পরিবেশন করা এবং খাওয়ার জন্য প্রধানত মাটির তৈরি পাত্র ব্যবহৃত হত। নীল নদের পার্শ্ববর্তী পলিমাটি থেকে বানানো এই পাত্রগুলির রঙ সাধারণত দু-রকম হত—লালচে-বাদামি এবং গোলাপি। পলিমাটির প্রকৃতি এবং রোদে শোকানোর সময়ের ওপর এই রঙ নির্ভর করত।
প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার মাঝামাঝি সময় থেকে খ্রিস্টপূর্ব এক হাজার বছর আগে পর্যন্ত জল ঠান্ডা রাখার জন্য মাটির তৈরি বকের মতন লম্বা গলার এক বিশেষ ‘জগ’ ব্যবহার করত প্রাচীন মিশরীয়রা। তার নাম ছিল ‘মেঙ্গাল’। আবার ‘মাগুর’ নামের গোলাকৃতি একধরনের মাটির পাত্রও তারা এই সময় ব্যবহার করত। মূলত তা খাদ্যসামগ্রী পরিবেশনের কাজে লাগত।
কয়েক হাজার বছর আগে মেদিনেত হাবুতে ফারাও তৃতীয় আমেনহোতেপ-এর সমাধি মন্দিরের ঠিক পাশেই যে রান্নাঘর তৈরি করা হয়েছিল সেখানে এক্সক্যাভেশনের ফলে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই প্রাচীন মিশরীয় রান্নাঘরের এই মডেল বিশেষজ্ঞরা তৈরি করতে সমর্থ হয়েছেন। ১৯৯৮ সালে খুঁজে পাওয়া সেই রান্নাঘরের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেই প্রত্নতাত্ত্বিকরা পরবর্তীকালে রান্নাঘরের যে মডেলটি বানিয়েছিলেন তাই একপ্রকার প্রাচীন মিশরীয় রান্নাঘরের স্ট্যান্ডার্ড মডেল। বর্তমানে সেই মডেলই রাখা রয়েছে কায়রোর ‘মিউজিয়াম অফ এগ্রিকালচার’-এ।