টাইম মেশিন সীমান্তের অন্তরালে সমরেন্দ্রনাথ লাহিড়ী শরৎ ২০১৭

আগের পর্বগুলো

 “ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কিজ় এর বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে জোয়াকি লশ্‌করের ক্ষয় ক্ষতি যা হয়েছিল তা অতি অল্প,  সেই অবস্থায় তাদের এলাকার গভীরতম প্রদেশে প্রবেশ করে তাদের যুদ্ধে পরাস্ত করা প্রায় অসাধ্য কাজ। তাদের নতুন ঘাঁটি আগলে আছে চারিদিকে বড়ো বড়ো পাহাড়, অনেক খরস্রোতা পাহাড়ি নদী ও অজস্র দুর্গম গিরিপথ। জোয়াকিদের নতুন ঘাঁটি আক্রমণ করতে গিয়ে জেনারেল কিজ় যদি বিপন্ন হয়ে পড়েন সে অবস্থায় জোয়াকিরা তাঁর পশ্চাদপসরণের পথও বন্ধ করে দিতে পারে। কাজেই কিজ় সে পন্থা পরিহার করলেন।

“ব্রিটিশ মহলে পরামর্শ আরম্ভ হল। বলপ্রয়োগে জোয়াকিদের প্রাকৃতিক দুর্গ থেকে বের করা অসম্ভব, কাজেই তাদের ধ্বংস করার জন্য আশ্রয় নিতে হবে কৌশল ও ছলের।

“চতুর কার্যকলাপ দ্বারা জোয়াকিদের মনে ধারণা জন্মানো হল যে একটি শক্তিশালী ব্রিটিশ ফৌজ পেশাওয়ারের কাছে ফোর্ট ম্যাকসন দুর্গ থেকে তাদের আক্রমণ করতে এগিয়ে আসছে। সেই ধারণার বশবর্তী হয়ে জোয়াকিরা তাদের অভেদ্য ঘাঁটি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল ফোর্ট ম্যাকসন এর দিকে ব্রিটিশ ফৌজকে আগেভাগে বাধা দেবে বলে।

“ম্যাকসন দুর্গে অবস্থিত ব্রিটিশ সৈন্য জোয়াকি লশ্‌করকে ছোটোখাটো যুদ্ধে লিপ্ত করে সেইখানেই আটকে রাখল। ইত্যবসরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রস্ আর একটি শক্তিশালী ফৌজ নিয়ে বোরি উপত্যকায় জোয়াকিদের অন্য কয়েকটি গ্রাম আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেলেন। রস এর বাহিনীতে ছিল দু ব্যাটারি গোলন্দাজ, এক কোম্পানি স্যাপারস ও সাত ব্যাটালিয়ান পদাতিক, সব নিয়ে পাঁচ হাজার সৈন্য,  সুশিক্ষিত এবং আধুনিক অস্ত্র শস্ত্রে সুসজ্জিত। রস এর অধীনে দুজন সহসেনাপতি ছিলেন, কর্নেল ডোরান ও কর্নেল বুকানন।

“ব্রিটিশ কামানের গর্জনে বোরি উপত্যকা মুখরিত হয়ে উঠল,  হাজার হাজার মাসকেট এর কড়কড় ধ্বনি উপত্যকায় ছড়িয়ে পড়ল। উত্তরে জোয়াকিদের  শত শত জাজ়য়েলও সজীব হয়ে উঠল। ব্রিটিশ কামান ও মাসকেটের ও জোয়াকিদের জাজয়েলের গোলাগুলি বিস্ফোরণের ধোঁয়ায় বোরি উপত্যকার আকাশ অন্ধকার হয়ে উঠল।

“জোয়াকিদের খুব বড়ো একটি দল যখন মরণপণ করে রস এর ফৌজ এর সঙ্গে যুদ্ধে রত, সেই সময় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কিজ় তাঁর ফৌজ নিয়ে চড়াও হলেন জোয়াকিদের অন্য একটি গ্রাম গরিবার ওপর। গ্রামটিকে তিনদিক থেকে আক্রমণ করলেন কর্নেল মোকাটা,  কর্নেল গার্ডিনার ও মেজর উইলিয়ামস। গ্রাম প্রধান মুশ্‌ক্‌ খাঁ ব্রিটিশ বাহিনীর চক্রব্যূহ ভেদ করে গ্রামবাসীদের নিয়ে বেরিয়ে যেতে সমর্থ হলেন মাত্র, সক্রিয় যুদ্ধ করতে পারলেন না।

“বোরি উপত্যকা এবং অন্যান্য জোয়াকি ঘাঁটিগুলিতে জোয়াকিরা যুদ্ধ করছিল বটে, কিন্তু অস্ত্রবলে ব্রিটিশ ফৌজের পাল্লা ছিল বহুগুণে ভারী। সেই কারণে ক্ষয়ক্ষতিও হল প্রচুর জোয়াকি লশ্‌করগুলির। ব্রিটিশ সেনাপতিরা আশা করেছিলেন যে, যেহেতু জোয়াকিরা বিপাকে পড়ে গেছে, তারা নিশ্চয় ইংরাজের কাছে আত্মসমর্পণের, কিম্বা অন্ততপক্ষে যুদ্ধবিরতির জন্য আবেদন করবে।

“কিন্তু তার কোন লক্ষণ দেখা গেল না। জোয়াকিরার  তাদের লশ্‌করগুলির পুণর্গঠন করে তাদের অবশিষ্ট ও শেষ ঘাঁটি পশ্তাওনি গ্রাম থেকে যুদ্ধের প্রস্তুতি আরম্ভ করল। কিন্তু তারা সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত হবার আগেই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রস্ ও কিজ় তাঁদের সম্মিলিত ফৌজ নিয়ে পশ্তাওনি গ্রাম আক্রমণ করলেন। ঘোরতর যুদ্ধে গ্রামটি শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ ফৌজ এর অধিকারে চলে গেল এবং অস্ত্রবলে দুর্বল জোয়াকিদের প্রতিরোধ সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ল। জোয়াকিদের চূড়ান্তভাবে পরাস্ত করতে ইংরাজের সময় লেগেছিল দু বছর, ১৮৭৬ থেকে ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত।” 

১৫

সেবার বাদামা থেকে ফিরে যখন সাদ্দায় পৌঁছলাম তখন প্রায় সন্ধ্যা। থালে যেতে হলে আরও চল্লিশ মাইল রাস্তা নো-ম্যান্‌স্‌-ল্যান্ডের ভিতর দিয়ে পাড়ি দিতে হয় আর সেটা করার চেষ্টা মূর্খতা, কাজেই সে রাতটাও আমার আতিথ্য রশিদ খাঁ এর  ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে বাধ্য হলাম।

রশিদ খাঁ সাহেব তো আমার প্রস্তাব শুনে ভারি খুশি।  রাতের বেলা সেই নড়বড়ে টেবিলটা টেনে নিয়ে আবার হোয়াইট হর্সের বোতলটা নিয়ে বসলেন। আমি বললাম, “কী রশিদ  সাহেব। বোতলের রঙ কি রোজই বদলায় নাকি? আমি এ পর্যন্ত আর কোনও পাখতুনকে মদ খেতে দেখিনি, আপনি এই দেশের লোক হয়ে হুইস্কি ধরলেন ক্যান?”

তিনি বললেন, “যেদিন রাইফেল ছেড়ে কলম ধরেছি হাতে, আমার পাঠানত্বের বিসর্জন তো সেইদিনই হয়ে গেছে। কলম যখন ধরলাম তখন হুইস্কিই বা কী দোষ করেছে?  একটা কথা কিন্তু মানতেই হবে স্যার যে ইংরেজরা রাইফেল আর হুইস্কি এই দুটো জিনিসই তৈরি করে একেবারে লা জবাব। আই টেক অফ মাই কূল্লা (হ্যাট তো পরি না ) টু দেম। আরে,  আপনি তো হাত গুটিয়ে বসে রইলেন দেখছি। আমার সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে না।  আমি তো আকণ্ঠ ডুবে আছি, আপনাকে একটি ছোট্ট পেগমাত্র দিয়েছি,  পেয়ালার অপমান করবেন না।

“আমার ওয়াজিরি ভাই-বেরাদররা বলেন যে আমি ইংরাজি লেখাপড়া শিখে আর হুইস্কিতে ডুবে কাফের বনে গিয়েছি। কিন্তু চিরকাল কি শুধু রাইফেল নিয়েই শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করা যায়? রাইফেলের সঙ্গে কলমও দরকার। জানেন তো যে, আমরা শুধু বর্তমানটাই জানি, পিছনপানে আমরা তাকাই না, বিগত দিনের কথা জানি না বা জানবার উপায়ও নেই কারণ আমাদের যথার্থ ইতিবৃত্ত কেউ লিখে যায়নি। কিন্তু এমন একদিন আসবে  যেদিন আমাদের বিগত দিনের ইতিহাস জানবার প্রয়োজন হবে সামনে এগিয়ে যাবার প্রেরণা জোগাবার জন্য। আপনারাও মনে করেন যে রশিদ ইংরাজের সরকারি অফিসে বসে শুধু ‘উইথ রেফারেন্স টু ইওর লেটার নাম্বার’ ইত্যাদি লিখেই নিজের কাজ শেষ করে। কিন্তু তা নয় লাহিড়ী সাহেব, আমি হুইস্কি খাই আর লিখে যাই ইংরেজ শাসনের অত্যাচার আর পাখতুনদের বীরত্বের কাহিনী, পাখতুনদের সুখদুঃখের কাহিনী, পাখতুন রাষ্ট্রজীবনের জোয়ারভাঁটার কাহিনী। আগামি দিনের আত্মবিস্মৃত পাখতুনদের প্রাণে আলোড়ন আনবে তাদের বিগত দিনের ইতিহাস আর তার প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়বে গোটা পাখতুনিস্তানে –The echoes shall roll from soul to soul,  and grow for ever and  ever,’

“কোহাট পেশাওয়ার রাস্তাটা দেখেছেন তো ? আজকাল মজবুত আর মসৃণ রাস্তা তৈরি করতে তার ওপর পিচ ঢালা হয়, কিন্তু কোহাট- পেশাওয়ার রাস্তাটা বলতে গেলে পাখতুনদের রক্ত ঢেলে তৈরি করা হয়েছে। শোনা যায় পুরাকালে ইংরেজরা যেখানে নিজেদের রাজ্যবিস্তার করবার মতলব করতেন সেখানে তাঁরা বাইবেল হাতে পাদ্রিদের পাঠিয়ে দিতেন আগে,  সৈন্যসামন্ত পাঠাতেন পরে। কিন্তু পাখতুনিস্তানে তাঁদের পাদ্রিরা দাঁত ফোটাতে পারবে না দেখে সেখানে পাঠানো হল স্যাপারদের। স্যাপারদের কাজ,  তারা পাখতুন এলাকার ভিতর দিয়ে রাস্তা গড়বে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, ইংরেজদের এক ঘাঁট থেকে আর এক ঘাঁটি। এমনি করে গোটা পাখতুনিস্তানে সড়কের জাল বিছিয়ে দেবে,আর সেই জালের ভিতর জড়িয়ে ধরা পড়বে গোটা পাখতুন জাতি। পাখতুনরা কিন্তু ইংরাজের ফন্দি বুঝতে পেরে প্রত্যেক জায়গায় রাস্তা তৈরি করায় বাধা দিতে লাগল আর সেই অজুহাতে ইংরেজ সরকার বড়ো বড়ো সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে দিলেন বাধাদানকারী পাখতুনদের শায়েস্তা করতে। গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করে দেওয়া হল, হাজার হাজার পাখতুনদের রক্তাক্ত দেহ লুটিয়ে পড়ল মাটির ওপর আর তাঁদের ওপর দিয়ে ইংরাজের সড়ক চলল গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, এক ঘাঁটি থেকে আর এক ঘাঁটি। তারই কিছু কিছু কাহিনী আপনাকে আমি আগের দিন শুনিয়েছি। শতাব্দি বদলে গেছে, কিন্তু আজও সে কাহিনি চলছে নির্মম, নির্দয়ভাবে। আজ আরও একটা গল্প শোনাই। সেই রাস্তার গল্প।

“কোহাট পাসের ঠিক ওপিঠেই আছে একটি আদমখেল। আফ্রিদিদের গ্রাম। এই গ্রামের পাশ কাটিয়ে চলে গেছে পায়েহাঁটা রাস্তা, দুসারি পাহাড়ের মধ্যে দর্রা হয়ে পেশওয়ার পর্যন্ত। আফ্রিদিদের অস্ত্রশস্ত্রের একটা বেশ বড়ো রকম অংশ তৈরি হয় এই দর্রার পাহাড়ের গুহায় ছোটো ছোটো কামারশালে।

“যে সময়টার কথা বলছি তখন কোহাট পাস এ তৈরি করা কোনও পাকা রাস্তা ছিল না। প্রকৃতি নিজের খেয়ালখুশি মত যেটুকু পথ করে দিয়েছিল আফ্রিদিরা তাতেই সন্তুষ্ট ছিল। এ পথটি এতই অপ্রশস্ত ছিল যে পাশাপাশি দুজন লোক পাস এর ভিতর দিয়ে হেঁটে যেতে পারত না। তার ওপর পাস পর্যন্ত পৌঁছতে হলে পাক্কা দু’মাইল খাড়া পাহাড়ের চড়াই। কাজেই এ অঞ্চলের আফ্রিদিরা মনে করত তারা অভেদ্য দুর্গের মধ্যেই বাস করছে। কোহাটের ময়দান থেকে যদিও ইংরেজ আফ্রিদিদের উৎখাত করে ছাউনি গড়তে আরম্ভ করেছে কিন্তু আফ্রিদিদের ধারনা ছিল যে, কোহাট পাসে এর মধ্যে ঢুকে ইংরেজ তাদের স্বাধীনতায় হাত দিতে পারবে না। কিন্তু এই ভুল ধারনা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

“সেটা ছিল এপ্রিল মাস। শীত নিজের নিষ্ঠুর সাদা হাত ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিচ্ছে, যদিও দূরের পাহাড়গুলির চূড়া তখনও বরফে ঢাকা। আফগানিস্তানের ওপর থেকে যে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া শীতকালভর বয়েছে, তার ছুঁচ বিঁধানো তীব্রতা আর নেই,  বরং হাওয়াতে একটু আরামের আমেজ এসে গেছে। এই সময় একদিন সকালবেলা কোহাট পাস এর আফ্রিদিদের ঘুম ভেঙে গেল পাহাড়ের নীচে গুড়ুম গুড়ুম শব্দে। দেখা গেল ইংরেজ  স্যাপাররা পাহাড়ের গায়ের অতিকায় সব পাথর টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে বিস্ফোরণ করিয়ে, রাস্তা তৈরি করতে করতে এগিয়ে আসছে পাহাড়ের গা বেয়ে কোহাট পাস এর দিকে। 

“গ্রামের মিনারে বেজে উঠল দ্রিম দ্রিম দ্রিম শব্দে “চীগা”,পাখতুনদের রণবাদ্য। গ্রামের লোক সব ছুটে এল ঢালতলওয়ার আর গাদা বন্দুক নিয়ে মিনারের তলায়। তারপর তারা দুটো দলে বিভক্ত হয়ে, গেল কোহাট পাহাড়ের মাথায়। পাস এর দক্ষিণ দিকের দলটি পরিচালনা করছিলেন বৃদ্ধ গ্রামপ্রধান সমীর খান আর উত্তর দিকের দলের নেতৃত্বের ভার ছিল গ্রামের ওস্তাদ মিস্ত্রি সিকন্দর খান এর ওপর। আমাদের থাল গ্রামের কুদরৎ খানকে তো জানেন। সিকন্দর ছিলেন কুদরৎ এর প্রপিতামহ। ওস্তাদ এই মিস্ত্রির হাতের তৈরি তলওয়ার আর গাদা বন্দুকের খ্যাতি ছিল গোটা পাখতুনিস্তানে। বুদ্ধিতে ছিলেন তিনি বিচক্ষণ আর চেহারা ছিল অ্যাপোলোর মত সুন্দর, শরীরে শক্তি আর মনে উৎসাহ ছিল অফুরন্ত। 

“সমীর খান বয়সে বৃদ্ধ হলেও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা ছিলেন। যৌবনের উদ্দাম চঞ্চলতা তখনও তাঁর মধ্যে বর্তমান। তিনি নিজের দলটি নিয়ে খোলা তলওয়ার হাতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন কোহাট পাসের নীচে স্যাপারদের অ্যাডভান্স পার্টির ওপর। কিছুক্ষণের মধ্যেই অ্যাডভান্স পার্টির কতক স্যাপাররা সমীর খান এর দলের হাতে প্রাণ দিল, আর কতক পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচাল।

“অ্যাডভান্স পার্টির স্যাপারদের হটিয়ে দিয়ে তিনি কিন্তু ফিরলেন না, তাজা রক্তমাখা তলওয়ার নিয়ে দলশুদ্ধ ছুটে গেলেন পাহাড়ের নীচে  স্যাপারদের প্রধান ঘাঁটির দিকে। স্যাপারদের মাসকেটের পাল্লার মধ্যে পৌঁছেই সমীর খান নিজের ভুল বুঝতে পারলেন, কিন্তু তখন আর ফিরবার উপায় ছিল না। স্যাপারদের মাসকেট থেকে তখন মৃত্যুবৃষ্টি আরম্ভ হয়ে গেছে। কয়েকজন আফ্রিদি, যারা তখনও মাসকেটের গুলির নাগালের মধ্যে পৌছয়ইনি, সমীর খান চিৎকার করে তাদের ফিরে গিয়ে সিকন্দর খানকে খবর দিতে বললেন। তারপর মাসকেটের গুলি অগ্রাহ্য করে দলশুদ্ধ ঢুকে পড়লেন স্যাপারদের মধ্যে। এদের তলওয়ারের সামনে যে পড়ল সে আর উঠল না, কিন্তু স্যাপারদের মাসকেটের সামনে বেশিক্ষণ তারা টিকে থাকতে পারল না, একে একে ধরাশায়ী হল। সমীর খানের গোটা দলটি নিঃশেষ হয়ে গেল।

“স্যাপাররা কিন্তু জয়ের নেশায় ঠিক সেই ভুলই করে বসল যা সমীর খান করেছিলেন। সমীর খান আর তাঁর দলকে ধরাশায়ী করে তারা এগিয়ে গেল পাহাড়ের গা বেয়ে সরাসরি কোহাট পাসের দিকে। 

“সমীর খানের মৃত্যুতে গ্রামরক্ষার দায়িত্ব পড়ল সিকন্দর খানের ওপর। তিনি তাঁর দলের লোকদের নিয়ে পাসের দক্ষিণ দিকের ওপর নিঃশব্দে উঠে বসে রইলেন। স্যাপাররা যখন মাসকেটের গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে পাসের প্রায় তিনশ গজের মধ্যে এসে গেছে তখন তিনি আক্রমণের আদেশ দিলেন। স্যপাররা আতঙ্কবিহ্বল চোখে দেখল রাশি রাশি বড়ো বড়ো পাথর সাক্ষাত মৃত্যুরূপ ধরে তাদের দিকে পাহাড়ের ওপর থেকে গড়িয়ে পড়ছে। মৃত্যুর গ্রাস থেকে রক্ষা পাবার প্রয়াসে তারা ছুটল পাহাড়ের নীচের দিকে কিন্তু কেউই পৌঁছতে পারল না। কেবলমাত্র স্যাপারদের কমান্ডার আর তার কয়েকজন সেপাই যারা পাহাড়ের নীচেই ছিল, প্রাণ নিয়ে কোহাট ছাউনিতে ফিরতে পেরেছিল এই বিপর্যয়ের খবর নিয়ে।

“তারপর এক সপ্তাহ কেটে গেল, ইংরেজদের দিক থেকে আর কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না। অনেকের ধারনা হল যে ইংরাজের যথেষ্ট শিক্ষা হয়ে গেছে, তারা আর কোহাট পাসের দিকে পা বাড়াবে না। কিন্তু বিচক্ষণ সিকন্দর বোঝেন যে এই থমথমে ভাবটা প্রচণ্ড ঝড়ের পূর্বলক্ষণ মাত্র। ইংরেজ এই খণ্ডযুদ্ধে তাদের পরাজয় স্বীকার করে নিয়ে চুপ করে বসে থাকতে পারে না। তাদের অজস্র সৈন্যসামন্ত আছে, গোলাগুলি আর রসদের অভাব তাদের নেই, তাছাড়া তারা তীক্ষ্ণধার এবং কূটবুদ্ধি সম্পন্ন। তারা একটা প্রচণ্ড আঘাত হেনে পাখতুনদের চূর্ণ করে দেবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। এ সত্যটা সিকন্দর খান অনুমান করতে পেরেছিলেন। তিনিও নিজের ক্ষুদ্র শক্তি নিয়ে প্রস্তুতি আরম্ভ করলেন আসন্ন ঝড়ের মোকাবেলা করার জন্য।

“সিকন্দর অবিরাম কাজ করে যান নিজের কামারশালে। ঠক ঠক তাঁর হাতুড়ি চলে লাল টকটকে লোহার ওপর। তৈরি হয় ইংরেজদের  মাসকেটের অনুরূপ মাসকেট। দূরদূরান্তে পাখতুনদের গ্রামে গ্রামে পাঠানো হবে সেই ম্যাসকটের নমুনা যাতে ক্রমে ক্রমে গোটা পাখতুনিস্তানে তৈরি হতে পারে উন্নত ধরনের মাসকেট। প্রস্তুতির জন্য প্রচুর সময়ের প্রয়োজন,  তা পাওয়া যাবে কী ? এই কথাই ভাবেন সিকন্দর।

“সিকন্দর এর কামারশালে তাঁর কাজে সমানে সাহায্য করে যান তাঁর স্ত্রী গুলশন। তাঁদের শিশুপুত্র আমীন ঘুম চোখে দেখে এই নতুন ধরনের মাসকেট তৈরির কাজ আর মাঝে মাঝে ঘুমিয়ে পড়ে কামারশালের এক কোণে। সিকন্দর খানের চেহারার তুলনা যদি অ্যাপোলোর সঙ্গে করা হয়, তবে গুলশনের সৌন্দর্যও ভেনাস এর সঙ্গে তুলনীয়। তাঁরা স্বামীস্ত্রী শুধু চেহারাতেই মানিকজোড় ছিলেন না, গুলশনও তাঁর স্বামীর মতই বিচক্ষণ, কর্মঠ এবং দেশপ্রেমিক ছিলেন। সিকন্দরের সমস্ত উদ্যম আর উৎসাহের উৎস ছিলেন গুলশন। এই মহীয়সী রমণীর কথা কোন ঐতিহাসিক লিখে যাননি।”

১৬

“এবার রাস্তার কথা থাক। আফ্রিদি উপজাতি ও ইংরাজের দ্বন্দ আপাতত কোল্ড স্টোরেজে রেখে কাবুল ও হিন্দুস্থানে ইংরেজ রাজ প্রতিনিধির দিকে নজর দেওয়া যাক। 

“আগেই বলেছি লর্ড লিটন স্থির করে ফেলেছিলেন যে আফগানিস্তানে  যুদ্ধাভিযান চালিয়ে বাহুবলে আমীর শের আলিকে গদিচ্যূত করবেন, কারণ ব্রিটিশের কাছে সাহায্যের আশ্বাস না পেলে শের আলি রাশিয়ার দ্বারস্থ হয়েছেন তাঁর সিংহাসন রক্ষার জন্য,  সেটা লর্ড লিটন পছন্দ করেননি।  তার প্রথম ধাপে তৈরি হল কোহাট গিরিসংকটের সড়ক সম্প্রসারণ করে উপযুক্ত রাস্তা।

“কিন্তু যুদ্ধবিগ্রহ বাধাবার জন্য আরও কিছু ছুতোর প্রয়োজন। একটা ছুতো বা ওজর খুঁজে বার করা কোনও কষ্টসাধ্য কাজ নয়। রাশিয়ান তুর্কিস্থানের (সম্প্রতি অধিকৃত সমরকন্দ, তাসকন্দ, খীভা ইত্যাদি) গভর্নর জেনারেল কফম্যান, তাঁর প্রতিনিধি জেনারেল স্টলিয়েটভ্ কে পাঠিয়েছিলেন শের আলির কাছে। সেই খবর পাবামাত্রই লর্ড লিটন দাবি করলেন যে একজন ইংরেজ রাজদূতকে ও তাঁর অনুচরবৃন্দদের পাকাপাকি ভাবে কাবুলে থাকতে দিতে হবে ব্রিটিশ স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য। ইতিমধ্যে জেনারেল স্টলিয়েটভ কাবুল ত্যাগ করেছিলেন এবং রাশিয়া ইংরেজ গভর্নমেন্টকে আশ্বাস দিলেন যে রাশিয়ান প্রতিনিধি কাবুলে অস্থায়ীরূপে গিয়েছিলেন ও রাশিয়া আফগানিস্তানের কোনও ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে চায় না, এ কথাও জানিয়ে দিলেন।

“শের আলি কাবুলে ব্রিটিশ রাজদূতের পাকাপাকি অবস্থানে রাজি হলেন না। লর্ড লিটন ইতিপূর্বেই তিন ডিভিশন ফৌজকে ( প্রথমটি জেনারেল স্যাম ব্রাউন, দ্বিতীয়টি জেনারেল রবার্টস ও তৃতীয়টি জেনারেল বিডল্ফ এর অধিনায়কত্বে) আফগান সীমার ওপরে প্রস্তুত করে রেখেছিলেন,  তারা লর্ড লিটনের আদেশ এর অপেক্ষা করছিল। এরা ছাড়া জেনারেল স্ট্যুয়ার্ট এর ডিভিশন প্রস্তুত হচ্ছিল জেনারেল বিডল্ফ এর সঙ্গে যোগ দেবার জন্য। সবশুদ্ধ প্রায় চল্লিশ হাজার সৈন্য। জেনারেল মড এর অধীনে আরও এক ডিভিশন অতিরিক্ত সৈন্য  রাখা হয়েছিল খাইবার পাস এ,  প্রয়োজন অনুসারে ব্যবহারের জন্য।

“১৮৭৮ সালে নভেম্বর মাসের শেষ ভাগে লর্ড লিটন এর নির্দেশ অনুযায়ী তিন জন জেনারেলই এক দিন ভোর বেলা নিজ নিজ সৈন্য বাহিনী নিয়ে ভারত আফগানিস্তান সীমা অতিক্রম করে তিন দিক থেকে আফগানিস্তান এর অভ্যন্তরে অগ্রসর হলেন। শের আলি যে মুহূর্তে জানতে পারলেন যে ব্রিটিশ ফৌজ তিন দিক থেকে রওনা হয়েছে আফগানিস্তান আক্রমণ করার জন্য, তিনি তাঁর পুত্র য়াকুব খাঁ কে রাজপ্রতিনিধিরূপে নিযুক্ত করে রাশিয়ায় পালিয়ে গেলেন।

“জেনারেল স্যাম ব্রাউন খাইবার পাসে আফগান সীমা অতিক্রম করে আলি মসজিদ দুর্গে পৌঁছলেন। আলি মসজিদ ছিল খাইবারের পথে প্রথম সৈন্যঘাঁটি, যেখানে আফগান দুর্গরক্ষী সৈন্য ইংরেজ বাহিনীকে প্রচণ্ড ভাবে বাধা দিল। অবশ্য আফ্রিদি উপজাতীয় লশ্‌করও পথে বাধার সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু সে বাধা জেনারেল স্যাম ব্রাউনের গতি রোধ করতে পারে নি, কারণ জেনারেল মড এর ডিভিশন একাণ্ট ভাবে আফ্রিদিদের দমন কার্য রত ছিল। স্যাম ব্রাউন পিছু হটে গিয়ে ঘুরে আফগান সৈন্যের পার্শ্বদেশ থেকে ফ্ল্যাংকিং  আক্রমণ করলেন। সে যুদ্ধে আফগান সৈন্য পরাজিত হয়ে পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হল। জেনারেল স্যাম ব্রাউন এগিয়ে গেলেন জালালাবাদের পথে।

“জেনারেল রবার্টস সেই একই সময়ে আফগানিস্তানের কুরম উপত্যকায় প্রবেশ করলেন। উপত্যকার ভিতর দিয়ে ষাট মাইল পথ পেরিয়ে গিয়ে তিনি বাধা পেলেন পেওয়াড় গিরিসংকটে। গিরিসংকটের ওপরে পাহাড়ের মাথায় ঘন পাইন জঙ্গলের আড়ালে একটি শক্তিশালী আফগান সৈন্যদল ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল। তাদের আর্টিলারির ভারি কামানও পাহাড়ের মাথায় স্থাপন করে রেখেছিল। প্রায় দু’মাইল উত্তরে স্পিঙ্গাওয়াই নামক পর্বত শিখরে আফগান সৈন্যের আর একটি ঘাঁটি ছিল মূল পেওয়াড় ঘাঁটির বহিঃস্থ প্রতিরক্ষার জন্য। জেনারেল রবার্টস বিচক্ষণ সেনাপতি, তিনি অবস্থা বিশ্লেষণ করে দেখলেন যে সামনের দিকে পেওয়াড় মূল ঘাঁটির আফগান সৈন্যের বিরুদ্ধে অগ্রসর হওয়া অসম্ভব। তিনি ছোটো ছোটো রিকনিসেন্স পার্টি পাঠালেন চারিদিকে কোনও বিকল্প পথের সন্ধান পাওয়া যায় কি না দেখবার জন্য। একটা পথের সন্ধান পাওয়া গেল যেটা প্রায় দু’মাইল পূর্বে ঘুরে গিয়ে স্পিঙ্গাওয়াই এর বাঁ পাশে গিয়ে পড়েছে ও সেখান থেকে পেওয়াড় মূল ঘাঁটির পাশে ও পিছনে পৌঁছন সম্ভব।

“রবার্টস স্থির করলেন শেষ রাতে তিনি এক হাজার সৈন্য ও চারখানা ঘোড়ায় টানা হালকা কামান সঙ্গে নিয়ে স্পিঙ্গাওয়াই আক্রমণ করে মূল আফগান ঘাঁটির ওপরে ছোটো রকমের হামলা করে আফগান সৈন্যের পিছনে অগ্রসর হবেন। তাঁর অধীনস্থ জেনারেল কোবকে নির্দেশ দিলেন যে তিনি সকাল ছ’টার সময় অধিক সংখ্যক মূল ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী নিয়ে পেওয়াড়ে আফগান ঘাঁটির ওপর সরাসরি আক্রমণ করবেন।

“পরিকল্পনা অনুযায়ী জেনারেল রবার্টস শেষ রাতের গাঢ় অন্ধকারে এক হাজারের কিছু বেশি সৈন্য আর চার খানা হালকা কামান নিয়ে রওনা হলেন স্পিঙ্গাওয়াই এর দিকে। সূর্যের প্রথম আলো উঁকি দিচ্ছে পেওয়াড় ও স্পিঙ্গাওয়াই এর মাথায়,  পাইন গাছ ও পাতার মৃদু গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে বনের ভিতর, সফেদকোহ এর উঁচু শিখরগুলির শুভ্র বরফের ওপর সূর্যের সোনালি কিরণ  অপূর্ব শোভা দিচ্ছে আর একটা শান্ত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে সমস্ত অঞ্চলটায়। কিন্তু সেই মনোরম ও শান্ত পরিবেশের মধ্যে নৃশংস মানুষের রক্ত পিপাসায় ছেদ পড়ে না। রবার্টসের কামান গর্জে উঠল এবং পদাতিক সৈন্যদল গুলি চার্জ করে ছুটল আফগান সৈন্যের ট্রেঞ্চ সমূহের দিকে। কড়কড় শব্দে আফগানদের আগ্নেয়াস্ত্রও ডেকে উঠল। রবার্টস আফগানদের প্রথম প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেদ করে অগ্রসর হলেন আফগান মূল ঘাঁটির পিছনে। ঠিক সেই সময় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কোব মূল ব্রিটিশ বাহিনী নিয়ে এলেন পেওয়াড় গিরি সংকটের সামনের দিকে। আফগান সৈন্য ব্রিটিশের সাঁড়াশি আক্রমণের ভিতর পড়ে গেল। পাশে ও পিছনে রবার্টস এর আক্রমণ এবং সম্মুখে জেনারেল কোব এর। আফগান সৈন্য ছত্রভঙ্গ হয়ে বিশৃঙ্খলভাবে পশ্চাদপসরণ করল। তারপর জেনারেল রবার্টস সমগ্র ডিভিশন নিয়ে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে সুতরগর্দন গিরিসংকটের আশেপাশের পাহাড়ের শিখরে ঘাঁটি গড়ে বসলেন।

“জেনারেল স্টুয়ার্ট ও জেনারেল বিডলফ্ এর বাহিনী  কোয়েটা থেকে নভেম্বর ১৮৭৮ এ রওনা হয়ে কান্দাহার পৌঁছল ১৮৭৯ এর প্রথম দিকে এবং বিনাযুদ্ধে কান্দাহার অধিকার করে নিল।

“নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তিনটি ব্রিটিশ বাহিনী তাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূর্ণ করতে সক্ষম হল এবং আফগান অভিযান সাফল্যমণ্ডিত হল। জেনারেল স্যাম ব্রাউন ও জেনারেল রবার্টস ১৮৭৮ সালের শেষের দিকে যথাক্রমে জালালাবাদ ও সুতরগর্দন অধিকার করলেন এবং ১৮৭৯ সালের প্রথম দিকেই কান্দাহারে প্রভুত্ব কায়েম করলেন জেনারেল স্টুয়ার্ট। আপাতদৃষ্টিতে সমগ্র আফগানিস্তান তখন ব্রিটিশ অভিযানকারী সৈন্যের অনুকম্পার ওপর নির্ভর করছে।

“জালালাবাদে পৌঁছে জেনারেল স্যাম ব্রাউন জানতে পারলেন যে শের আলি রাশিয়ায় পালিয়ে গেছেন ও তাঁর পুত্র য়াকুব খাঁ  তাঁর প্রতিনিধি রূপে রাজ্য শাসন করছেন।  য়াকুব খাও সংবাদ পেলেন যে ব্রিটিশ সৈন্য আফগানিস্তানকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। তিনি জালালাবাদে জেনারেল স্যাম ব্রাউনের কাছে দূত পাঠিয়ে সন্ধির প্রস্তাব করলেন। প্রস্তাবটির সম্বন্ধে লর্ড লিটনের নির্দেশ চাইলেন স্যাম ব্রাউন। লর্ড লিটন সন্ধির শর্তাবলি জানালেন যথা

(১) গোটা খাইবার অঞ্চল ইংরাজের হাতে তুলে দিতে হবে এবং তথাকার বাসিন্দাদের শাসনকার্য চালাবে ইংরেজ সরকার।

(২) সমগ্র কুরম অঞ্চল থাল থেকে  আরম্ভ করে সুতরগর্দন পর্যন্ত ব্রিটিশ অধিকারে থাকবে।

(৩) আফগানিস্তানের বৈদেশিক নীতি নিয়ন্ত্রণ করবে ইংরেজ গভর্নমেন্ট এবং

(৪) ব্রিটিশ স্বার্থরক্ষার জন্য কিছু ব্রিটিশ অফিসার ইংরাজের প্রতিনিধিত্ব করবেন খাস কাবুলে অবস্থান করে।

“জেনারেল স্যাম ব্রাউনের রাজনৈতিক পরামর্শদাতা হিসাবে সঙ্গে ছিলেন মেজর ক্যাভান গ্রী। তিনি য়াকুব খাঁর দূত মারফত সন্ধি প্রস্তাব সম্বন্ধে কথাবার্তা চালিয়ে যেতে লাগলেন। পরে স্থির হল যে য়াকুব খাঁ নিজে জালালাবাদে হাজির হয়ে সন্ধির শর্তাবলি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করবেন।

“ওদিকে কাবুলে য়াকুব খাঁর সর্দারদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিল সন্ধি প্রস্তাব নিয়ে। সর্দারদের মতে বিনাযুদ্ধেই য়াবুব খাঁ ব্রিটিশের কাছে নতিস্বীকার করছেন। আলমসজিদ ও পেওয়াড়ে ব্রিটিশ সীমারক্ষী আফগান সৈন্যদের পরাস্ত করেছে মাত্র। আফগানিস্তানের মূল সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে ব্রিটিশের যুদ্ধই হয়নি এবং আফগানিস্তান অপরাজিতই আছে। কিছু সর্দার য়াকুব খাঁর নেতৃত্ব অস্বীকার তাঁকে ত্যাগ করে চলে গেলেন। তাঁদের মধ্যে মোহমান্দ উপজাতীয় সর্দার মোগল খাঁও ছিলেন যিনি অচিরেই ব্রিটিশের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করলেন।

“য়াকুব খাঁ ও ব্রিটিশের মধ্যে সন্ধির শর্তাবলি আলোচনা মাঝপথেই আটকে গেল কারণ মোহমান্দ ও শিনওয়াড়ি উপজাতীয়রা ব্রিটিশের ওপর প্রচণ্ড হামলা চালাতে আরম্ভ করল।

“পেওয়াড়ের প্রায় ত্রিশ মাইল উত্তর পশ্চিমে কাবুল নদীর তটবর্তী অঞ্চলে থাকে মোহমান্দ উপজাতি পাখতুন। এরা তারকজাই, বাইজাই, হালিমজাই ও খোয়াইজাই  এই চারটে খণ্ডজাতির সমষ্টি। এদের চৌহদ্দির উত্তরে বাজৌড় উপজাতি,  দক্ষিণে শিনওয়াড়ি,  পূর্বে উতমনখেল উপজাতি ও পশ্চিমে কুনার নদী। মোহমান্দ অঞ্চলের ছোটো ছোটো উপত্যকাগুলি ভরা বৃষ্টির সময় জলে ভরে যায়, কিন্তু অন্যান্য সময় খটখটে শুকনো কাঁকর আর বালি ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। এদের এলাকার পাহাড়শ্রেণীতে বনসম্পদ নিতান্তই অল্প এবং সেই কারণে গ্রীষ্মের সময় জলাভাব প্রবলভাবে দেখা যায়। শুকনো পাহাড় ও পাথরে সূর্যতাপ প্রতিফলিত হয়ে অসহ্য গরমে ঝলসে দেয় গোটা এলাকা।

“শেরগড় মোহামান্দদের একটি ছোটো গ্রাম। গ্রামটি ছোটো হলেও বাসিন্দারা শের অর্থাৎ টাইগারের মতই ভয়ঙ্কর। মোগল খাঁ সম্প্রতি শেরগড় গ্রামেই ডেরা বেঁধেছিলেন। নিপুণ যোদ্ধা বলে তাঁর খ্যাতি ছিল সমগ্র মোহমান্দ এলাকায় এবং উপজাতিটির ওপর তাঁর প্রভাবও ছিল প্রচূর। একটি মোহমান্দ লশ্‌কর গড়তে তাঁর বেশি সময় লাগল না। সেই লশ্‌কর পরিচালনা করে মোগল খাঁ ইংরেজ অধিকৃত এলাকায় যত্রতত্র হামলা চালিয়ে ব্রিটিশ সৈন্যাবাসগুলিতে আতঙ্ক সৃষ্টি ও অনেক ক্ষয়ক্ষতি করতে আরম্ভ করলেন। তাঁর লশ্‌কর আলেয়ার মতই এক ব্রিটিশ ছাউনিতে দপ করে জ্বলে ওঠে আর ছাউনির সৈন্যসামন্তদের মধ্যে সাজ সাজ রব উঠবার আগেই লুটপাট আর সামরিক সম্পদ নষ্ট করে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। তারপর অন্য ছাউনির পালা। কোন পথ দিয়ে লশ্‌করটি আসে আর কোন পথে বেমালুম অদৃশ্য হয়ে যায় কিছুই বুঝতে পারে না ইংরেজ রক্ষী সৈন্যদল। মোহমান্দ এলাকার কাছাকাছি ব্রিটিশ অধিকৃত অঞ্চলগুলি মোগল খাঁর ভয়ে সন্ত্রস্ত।

“ইতিমধ্যে জাকাখেল উপজাতির সঙ্গে একটা মিটমাট হওয়ায় ইংরেজ কর্তারা মনে করেছিলেন যে খাইবার অঞ্চল শান্ত থাকলে তাঁদের পক্ষে আফগানিস্তান জয় করা সহজ হবে, কিন্তু মোগল খাঁ ব্রিটিশের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ালেন। আফগানিস্তানে ইংরেজ সমর নায়করা খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন যে মোগল খাঁ তাঁর সামরিক ঘাঁটি করেছেন শেরগড় গ্রামে ও সেই স্থান থেকে ব্রিটিশ ছাউনির ওপর হামলা চালাচ্ছেন। আফগানিস্তানকে পদানত করার পথে এই নতুন কাঁটা উচ্ছেদের উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ জেনারেলরা স্থির করলেন শেরগড় গ্রাম অতর্কিতে আক্রমণ করে মোগল খাঁকে বন্দি করার চেষ্টা পুনরায় করবেন।

“মোগল খাঁ ছিলেন মোহমান্দ এলাকার মধ্যে গোশ্তা অঞ্চলের সর্দার এবং কাবুল দরবারে রীতিমত স্বীকৃত অঞ্চলপতি। কাবুলে তাঁর প্রভাব ও প্রতিপত্তিও ছিল ভালই। ইংরেজ ইতিপূর্বে তাঁর কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন ইংরাজের আনুগত্য স্বীকার করার জন্য। কিন্তু সে প্রস্তাব তিনি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

“আজিম খাঁ ছিলেন সর্দার মোগল খাঁর আত্মীয় ও সভাসদ। তিনি নিজে ছিলেন একজন খুদে সর্দার কিন্তু তাঁর আকাঙ্খা ছিল বৃহৎ আর নজর ছিল মোগল খাঁর গদির ওপর। প্রাসাদ ষড়যন্ত্র পৃথিবীতে রাজতন্ত্রের আরম্ভকাল থেকেই বিদ্যমান। ছোটোবড়ো কত রাজা মহারাজা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তাঁদের সিংহাসন এমন কি শিরও হারিয়েছেন।

“মোগল খাঁর দু’তিনজন অসন্তুষ্ট সভাসদদের নিজের সঙ্গে ভিড়িয়ে আজিম খাঁ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন মোগল খাঁকে গদিচ্যুত করার প্রয়াসে এবং নিজে সেই গদি দখলের উদ্দেশ্যে। মোগল খাঁর অজান্তে তাঁরা কাবুলে আমীরের সকাশে মোগল খাঁর বিরুদ্ধে অনেক মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করলেন। আজিম খাঁ আমীরের কাছে মোগল খাঁকে দেশদ্রোহী ও আমীরের শত্রু এবং নিজেকে দেশভক্ত ও আমীরের একান্ত অনুগত বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করলেন। ইঙ্গিতে প্রস্তাব করলেন মোগল খাঁকে সরিয়ে তাঁকে সর্দারির গদিতে বহাল করতে।

“কিন্তু আজিম খাঁর সে চালটা সফল হল না কারণ খাস কাবুল দরবারেই তখন ডামাডোল অবস্থা চলছে ইংরাজের আফগানিস্তান আক্রমণের আশঙ্কায়। কোনও আঞ্চলিক সর্দারের গদি সম্বন্ধে মাথা ঘামাবার মত সময় বা মানসিক অবস্থা আমীরের ছিলনা। আজিম খাঁ আপাতত বিফলমনোরথ হয়ে ফিরে গেলেন কাবুল থেকে কিন্তু মোগল খাঁর গদি অধিকার করার লোভ ত্যাগ করতে পারলেন না, উপযুক্ত সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় থাকলেন।

“সুযোগ এসে গেল অনতিবিলম্বেই, ইংরাজের আফগানিস্তান অভিযান ও মোগল খাঁর সেই অভিযানের বিরুদ্ধাচরণের সংবাদে।

“আজিম খাঁ গোপনে যোগাযোগ স্থাপন করলেন অভিযানকারী ব্রিটিশ কর্তাদের সঙ্গে। ব্রিটিশ কর্তারা এমন একজন লোকের তল্লাশে ছিলেন যাঁর প্রভাব গোশ্তার মোহমান্দ উপজাতির ওপর কিছুটা আছে অথচ তিনি সর্দারের গদি অধিকার করেও ইংরাজের তাঁবেদার হয়ে থাকবেন। তাঁরা আগ্রহভরে আজিম খাঁর আবেদনে সাড়া দিলেন,  তাঁকে ভরসা দিলেন যে গোশ্তার গদি আত্মসাৎ করতে তাঁকে সাহায্য করবেন কিন্তু বিনিময়ে ইংরাজের আনুগত্য তাঁকে পুরদস্তুর স্বীকার করতে হবে আর তাঁর  ক্ষমতা ইংরাজের সাহায্যে নিয়োগ করতে হবে। ইংরেজ তাঁর কাছে এর বেশি আর কিছু চায় না।

“গোশ্তার সব অলিগলি সম্বন্ধে আজিম খাঁর জানা ছিল। এক ইংরেজ ফৌজকে পথ দেখিয়ে তিনি নিয়ে গেলেন গোশ্তায় এমন একটি দিনে যেদিন গোশ্তার প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা ছিল শিথিল। সম্ভবত সেই শিথিলতায় তাঁর হাতও ছিল। অতর্কিতে ইংরেজ সৈন্যদল প্রবেশ করল গোশ্তার কেন্দ্রস্থলে। ইংরাজের অতর্কিত আক্রমণে অপ্রস্তুত মোগল খাঁ এক গুপ্ত পথ দিয়ে গোশ্তা থেকে বেরিয়ে গেলেন সৈন্যদলের নাগালের বাইরে। সে গুপ্ত পথের হদিশ আজিম খাঁরও জানা ছিল না। যাইহোক ইংরেজ কর্তারা বেয়নেটের জোরে আজিম খাঁকে বসিয়ে দিলেন গোশ্তার গদিতে আর প্রতিদানে পেলেন আজিম খাঁর দাসখত।

“গোশ্তার গদি হারিয়েও মোগল খাঁ হতাশ হয়ে বা ভয় পেয়ে ইংরাজের বিরুদ্ধাচরণ ত্যাগ করেননি,  শেরগড় গ্রামে নতুন ঘাঁটি করে তিনি ইংরাজের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত হলেন।

“ব্রিটিশের পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৮৭৯ সালে জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জেনকিন্স একটি সুসজ্জিত সৈন্যদল নিয়ে একদিন রাতের অন্ধকারে চুপিসাড়ে রওনা হলেন শেরগড় গ্রাম অভিমুখে। তাঁর সৈন্যদলে ছিল দুটি ভারী কামান, পঞ্চাশ জন অশ্বারোহী এবং তিনশ পদাতিক সৈন্য। ক্ষুদ্র শেরগড় গ্রাম জয় করার জন্য ইংরেজ সৈন্যদলটি ছিল প্রয়োজনাতিরিক্ত। কিন্তু জেনকিন্স জানতেন যে মোগল খাঁ অত্যন্ত চতুর ও কুশলি লোক তাই এমন শক্তিশালী ব্যবস্থা করেছিলেন যাতে মোগল খাঁ শেরগড় থেকে পালিয়ে যাবার কোন সুযোগই না পান। 

“সৈন্যদল নিশুতি রাতে নিঃশব্দে গ্রামটিকে ঘিরে ফেলল। প্রতিটি পথ ও রন্ধ্র আগলে বসল পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্য। তারপর গ্রামের ওপর অকস্মাৎ কামানের গোলা ও মাস্কেটের গুলি বৃষ্টিতে গ্রাম বাসিদের মধ্যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হল। গ্রামের বাইরে পালাতে গিয়ে তারা দেখে যে প্রতিটি নির্গমণের পথেই পদাতিকের বেয়নেটযুক্ত মাস্কেট আর অশ্বারোহীর শানিত বল্লম উদ্দত। গ্রামবাসীদের বিশৃঙ্খলার সুযোগে গ্রামপ্রধানকে বন্দি করলেন জেনারেল জেনকিন্স।

“অতঃপর বড়ো শিকারের সন্ধানে প্রতিটি বাড়ি ও ঘর  তন্নতন্ন করে খোঁজা হল। কিন্তু মোগল খাঁর কোনও চিহ্নই পাওয়া গেল না গ্রামের ভিতরে। মোগল খাঁ ইংরাজের আবেষ্টনীকে কদলি প্রদর্শন করে বেমালুম অন্তর্ধান হয়ে গেল।

“তোমাদের দেশে রামায়ণ মহাকাব্যে দেখা যায়, রাবণরাজা খেদ করে বলেছেন ‘মরিয়া না মরে রাম এ কেমন বৈরি।’ ব্রিটিশ কর্তাদেরও সেই অবস্থা। মোগল খাঁর লশ্‌কর দু’দুবার ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে,  তাঁর গদি এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষমতাও বেহাত হয়ে গেছে। তাঁর না আছে চাল না আছে চুলো, এ হেন অবস্থায় মোগল খাঁর পক্ষে আর লশ্‌কর গঠন করে ব্রিটিশকে ব্যতিব্যস্ত করার সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু তিনি তিন সপ্তাহের মধ্যেই মোহমান্দ এবং বাজৌড় উপজাতির একটি বড়ো লশ্‌কর গড়ে তুললেন চারদেঃ গ্রামে এবং ইংরেজ তল্পিদার আজিম খাঁর এলাকা আক্রমণ করলেন।

“আজিম খাঁ প্রমাদে পড়লেন, মোগল খাঁর দুর্ধর্ষতার সঙ্গে তিনি ভালোভাবেই পরিচিত ছিলেন এবং তাঁর কোপে পড়লে নিস্তার পাওয়া কঠিন তাও জানতেন। সাধারণত স্বার্থপর, ঈর্ষাপরায়ণ ও পরশ্রীকাতর লোকেরা কাপুরুষ হয়ে থাকে। তারা শুধু কুটিলতার আশ্রয় নিয়েই নিজেদের উদ্দেশ্য সিদ্ধির চেষ্টা করে,  যুদ্ধের বেলায় তারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে থাকে। আজিম খাঁর বেলাতেও তার ব্যতিক্রম হল না। তিনি সত্বর তাঁর ইংরেজ প্রভুদের দ্বারস্থ হলেন মোগল খাঁর হাত থেকে বাঁচবার জন্য। ব্রিটিশ মুরুব্বিরা দুই ব্রিগেড সৈন্য পাঠালেন মোগল খাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করতে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ম্যাকফারসন এর ব্রিগেড রওনা হল জালালাবাদ থেকে এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল টাইটলার এর ব্রিগেড খাইবার থেকে। সেই দুটি ব্রিটিশ বাহিনীতে আর্টিলারি, ক্যাভারলি ও ইনফ্যান্ট্রি সৈন্যের তিনটি অঙ্গই পুরোদস্তুর ছিল। দুই ব্রিগেডের বিশাল বাহিনী চারদেঃ গ্রামে হামলা করল কিন্তু দেখা গেল যে গ্রামটি তখন জনমানবশূন্য। মোগল খাঁর লশ্‌কর আর গ্রামবাসীরা যে কোথায় তার কোন খোঁজ পাওয়া গেল না।  ব্রিটিশ বাহিনী প্রথামত চারদেঃ গ্রাম ধ্বংস করে ফিরে গেল।

“মোগল খাঁ ব্রিটিশের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন বিরামহীন ভাবে, তাতে অবশ্য ব্রিটিশ অভিযানকারী বাহিনীর বিশেষ ক্ষতিসাধন না হলেও হয়রানি হচ্ছিল প্রচুর। এমনি করে দিন গড়িয়ে এপ্রিল মাসে এসে পড়ল কিন্তু একটা এসপার বা ওসপার হল না।  সেই সময় জালালাবাদে ব্রিটিশ সৈন্যাবাসে খবর এল যে মুল্লা খলীল নামে আর এক মোহমান্দ নেতা একটি বড়ো লশ্‌কর সমাবেশ করেছেন কামডাক্কা গ্রামে। বড়ো রকম উপজাতীয় লশ্‌কর জমা করা মানেই ইংরাজের সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি। সাপকে  মাথা তুলবার  অবকাশ না দিয়ে আগে ভাগেই আঘাত করা হল ইংরাজের নীতি। কামডাক্কা গ্রামের অনতি দূরেই ছিল ব্রিটিশ দূর্গ ডাক্কা ফোর্ট,  আফগানিস্তানের ভিতর জবর দখল করা জায়গায় ব্রিটিশ ঘাঁটি। ডাক্কা ফোর্ট থেকে একটি ছোটো সৈন্য দল সহ মেজর বার্নস্ কে পাঠানো হল মুল্লা খলীলের লশ্‌কর গঠনে বাধা দেবার জন্য। বার্নস্ এর সৈন্য দল ছোটো হলেও শক্তিশালী ছিল। দলটিতে ছিল দুটি কামান,  কিছু অশ্বারোহী আর প্রায় পাঁচশ পদাতিক সৈন্য। কামডাক্কা গ্রামে যেতে হলে ডাক্কা গিরিসংকট অতিক্রম করে যেতে হয়। আফগানিস্তানের গিরিসংকট মানেই বিপদসঙ্কুল। গিরিসংকটের দু পাশের পাহাড়ের মাথায় দশজন রাইফেলধারী যোদ্ধা পুরো এক ব্যাটালিয়ান সৈন্যের গিরিখাতে গতিরোধ করতে পারে অনায়াসে।

“কিন্তু তাজ্জব ব্যাপার, ডাক্কা পাশ পার হবার সময় মেজর বার্নস্ কোনও রকম বাধা পেলেন না এবং সহজেই কামডাক্কা গ্রামে পৌঁছে গেলেন। কিন্তু মোহমাণ্দ লশ্‌কর গঠনের কোনও চিহ্ন দেখতে পেলেন না সেখানে। চারিদিকে গুপ্তচর পাঠানো হল কিন্তু কোনও হদিশ পাওয়া গেল না। পূর্বদিকের চর ফিরে এসে খবর দিল যে লশ্‌কর গঠন করা হচ্ছে সম্ভবত পশ্চিম দিকে,  পশ্চিমদিকের চর বলে পূর্বদিকে,  উত্তর আর দক্ষিণ দিকের খবরও একই রকম।

“মেজর বা্র্নস্ স্থির করলেন যে মুল্লা খলীলের লশ্‌কর গঠনের খবর একেবারে ভুয়ো। তিনি কয়েক দিন গ্রামের পাসে ক্যাম্প করে ফিরে গেলেন ডাক্কা ফোর্টে। 

“মেজর বার্নস্ এর ধারণা যাই হোক না কেন মুল্লা খলীলের মোহমান্দ লশ্‌কর গঠন সম্বন্ধে জনশ্রুতি বা উড়ো খবর  ক্রমেই বেড়ে চলছিল। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ একেবারে নিষ্ক্রিয় না থেকে আবার একটি শ’দেড়েক সৈন্যের ছোটো দল পাঠালেন ক্যাপ্টেন ও মূর ক্রিগের অধীনে। এবার লশ্‌কর গঠনে বাধা দেওয়ার জন্য নয়। শুধু গ্রামের ওপর ও চারপাশে নজর রাখতে নির্দেশ দেওয়া হল ক্যপ্তেন ক্রিগকে।

“ক্যাপ্টেন সাহেবও দিব্য নির্ঝঞ্ঝাটে ডাক্কা পাস অতিক্রম করে পৌঁছলেন কামডাক্কায়,  কিন্তু সেখানে একটু মুশকিলে পড়লেন তিনি। ক্যাপ্টেন ক্রিগ গ্রামবাসীদের বললেন গ্রামের ভিতরে তাঁর সৈন্যদল সমেত ডেরা করবেন গ্রামবাসীদের রক্ষা করার জন্য। গ্রামবাসীরা কিন্তু ব্রিটিশ বদান্যতার ভানে ভুলল না। তারা উত্তর দিল যে শত্রুর বিরুদ্ধে আত্মরক্ষায় তারা নিজেরাই যথেষ্ট সক্ষম, তারা ব্রিটিশের সাহায্য চায় না এবং তারা ক্যাপ্টেন ক্রিগ বা তাঁর সৈন্যদলকে গ্রামের ভিতর ঢুকতে দেবে না।

“ক্যাপ্টেন ক্রিগ দেখলেন যে জবরদস্তি গ্রামে প্রবেশ করার মত লোকবল বা অস্ত্রবল কোনটাই তাঁর নেই। তিনি তাঁর ক্ষুদ্র সৈন্যদলসহ গ্রামের বাইরে এক জায়গায় ক্যাম্প করলেন।

“রাতটা নির্বিঘ্নেই কাটল ক্যাপ্টেন ক্রিগের, কিন্তু ভোরের আলো দেখা দেবার সঙ্গেই রাইফেলের কড়কড় শব্দ উঠে তাঁর ক্যাম্পের ওপর এক ঝাঁক গুলি এসে পড়ল, বহু প্রতীক্ষিত মোহামন্দ লশ্‌করের বার্তা নিয়ে। মোহমান্দ লশ্‌করের তীব্র আক্রমণের সামনে দাঁড়াতে না পেরে ক্যাপ্টেন ক্রিগ পশ্চাদপসরণ করে এক গোরস্থানের আড়ালে আশ্রয় নিলেন ও তাঁর সৈন্যদলের সঙ্গিন অবস্থার কথা ডাক্কা ফোর্টে জানিয়ে ত্বরিত সাহায্যের প্রার্থনা করলেন।

“মোহমান্দের চাপ বেড়েই চলল,  ক্যাপ্টেন ক্রিগের চারদিকে মোহমান্দ জাল গুটিয়ে আসছিল এবং সত্বর সাহায্য না এসে পৌঁছলে তাঁর ছোটো দলের নিশ্চিহ্ন হওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চিত বলে মনে হল।

“ঠিক সেই সময় ডাক্কা ফোর্ট থেকে ক্যাপ্টেন স্ট্রং একটি অশ্বারোহী দল নিয়ে পৌঁছলেন। হঠাৎ একটি ব্রিটিশ ক্যাভালরির দল যুদ্ধ ক্ষেত্রে উদয় হওয়ায় মোহমান্দদের মনোযোগ কিছুক্ষণের জন্য বিক্ষিপ্ত হওয়ায় ক্যাপ্টেন ক্রিগ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, কিন্তু সে অনুকুল অবস্থা ক্ষণস্থায়ী মাত্র। ক্যাপ্টেন স্ট্রং ক্রিগের অবস্থানস্থলে পৌঁছবার আগেই মোহমান্দরা পূর্ণ উদ্যমে আক্রমণ আরম্ভ করল এবং সেই আক্রমণের আওতায় ক্যাপ্টেন স্ট্রং পড়ে গেলেন। দুটো দলেরই বিপজ্জনক অবস্থার খবরে লান্ডিকোটাল থেকে আর্টিলারি ও ডাক্কা ফোর্ট থেকে শক্তিশালী ক্যাভালরি ও ইনফ্যান্ট্রি খুব অল্প সময়ের মধ্যে কামডাক্কায় এসে পৌঁছল ও মোহমান্দদের ওপর গোলাবর্ষণ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিল।

“তারপর অশ্বারোহী সৈন্য প্রচণ্ড বেগে চার্জ করে তাদের পশ্চাদপসরণ করে পাহাড়ের ভিতর পালাতে বাধ্য করল। ক্রিগ ও স্ট্রং  বেঁচে গেলেন। নতুন ক্যাভালরি ও আর্টিলারির কমান্ডার ছিলেন মেজর ডাইস। ডাইসকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে তিনি ক্যাপ্টেন ক্রিগ ও ক্যাপ্টেন স্ট্রংএর সৈন্য দলকে উদ্ধার করার পর কামডাক্কা এলাকা দখল করে সেখানে অন্ততপক্ষে সেই রাতটা থাকবেন। মেজর ডাইস পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখলেন যে যদিও মোহমান্দ লশ্‌কর আপাতত পাহাড়ের ভিতর আশ্রয় নিয়েছে এবং ব্রিটিশ সৈন্য নিরাপদে আছে কিন্তু মোহমান্দরা বেশিক্ষণ নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকবে না। তিনি সৈন্যদলগুলিকে নিয়ে ডাক্কা ফোর্টে ফিরবার জন্যে পা বাড়ালেন।

“কামডাক্কা পাস পর্যন্ত মেজর ডাইস বিনা বাধায় পৌঁছে গেলেন কিন্তু যে মুহূর্তে সৈন্য দল পাস এর মধ্যে প্রবেশ করল, দুপাশের পাহাড়ের ওপর থেকে রাইফেলের ঝাঁক ঝাঁক গুলি এসে পড়তে শুরু করল। কাজেই মেজর ডাইস সৈন্য দলকে হুকুম দিলেন পাস থেকে পিছু হটে আসতে। আর্টিলারির কামান থেকে গোলাবর্ষণ করা হল পাহাড়ের মাথায় কিন্তু যেহেতু মোহমান্দ যোদ্ধারা দূরে দূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল,তাই তাতে কোনও কাজ হল না। দিনের আলোয় কামডাক্কা পাস অতিক্রম করা গেল না। মেজর ডাইস রাতের গাঢ় অন্ধকারে নিঃশব্দে গিরিসংকট পার করে পৌঁছলেন ডাক্কা ফোর্টে।

“মোহমান্দ লশ্‌করটি অক্ষত অবস্থায় বিরাজ করছিল কামডাক্কা গ্রামের আশেপাশে। মেজর ডাইস এর আত্মরক্ষামূলক আক্রমণে তাদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল নগণ্য। ওদিকে আবার ওয়াজিরিস্তানেও মাসূদ উপজাতি যুদ্ধ আরম্ভ করেছিল সেই সময়, একটা সেকেন্ড যুদ্ধ ফ্রন্ট খুলে মোহমান্দদের ওপর থেকে ব্রিটিশের চাপ লাঘব করার জন্য।

“উত্তরে মোহমান্দ ও দক্ষিণে ওয়াজিরি খণ্ড জাতি মাসূদ লশ্‌করকে চূড়ান্তভাবে পরাস্ত না করা পর্যন্ত ব্রিটিশ কত্তৃপক্ষ য়াকুব খাঁর ওপর তাঁদের এক তরফা চুক্তির শর্ত চাপাতে পারছিলেন না। উত্তরে মুল্লা খলীলের মোহমান্দ লশ্‌করের মেরুদণ্ড ভাঙবার জন্যে দুটি ফৌজ  পাঠানো হল দু’দিন পরেই। লেফটেন্যান্ট কর্নেল সিলারি ডাক্কা ফোর্ট থেকে রওনা হলেন দু’খানা দূরপাল্লার কামান, বারশো পদাতিক ও প্রায় দুশো অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে কামডাক্কা পাসের দিকে। দ্বিতীয় ফৌজ লেফটেন্যান্ট কর্নেল নর্ম্যান এর অধীনে অগ্রসর হল লান্ডিকোটাল থেকে একই গন্তব্যস্থলে।

“নর্ম্যানের ফৌজে ছিল দুটি কামান এবং ষোলশ পদাতিক। দুটি ফৌজ একত্র হয়ে অবিরাম কামানের গোলা ও রাইফেলের গুলিবৃষ্টি করে মুল্লা খলীলের লশ্‌করকে কাবুল নদীর ওপারে পাহাড়ের ভিতর আত্মগোপন করতে বাধ্য করল। লশ্‌করটি আত্মসমর্পণ না করলেও ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ধরে নিলেন যে মোহমান্দরা পরাজয় স্বীকার করেছে।

“দক্ষিণে ওয়াজিরিস্তানে টাঁক ছিল ব্রিটিশের একটি বড়ো সৈন্য ঘাঁটি এবং তার কিছু দূরে আরও দুটি ঘাঁটি ছিল গিরনি ও জাম এ। টাঁকে যেতে হলে গিরনি ও জাম অতিক্রম করে যেতে হয়। কাজেই ব্রিটিশ সামরিক হেডকোয়াটার্স বান্নুতে যখন খবর এল যে ওয়াজিরি সর্দার উমার খাঁ তাঁর লশ্‌কর নিয়ে টাঁক ঘাঁটির ওপর চড়াও করার প্রস্তুতি করছেন তখন তাড়াতাড়ি গিরনি ও জাম ঘাঁটির সৈন্য সংখ্যা দ্বিগুণ করা হল। ঘাঁটিগুলির সৈন্য সংখ্যা বাড়ানো সত্ত্বেও উমার খাঁর আক্রমণে গিরনি ও জাম ধূলিসাৎ হয়ে গেল,  তারপর লশ্‌করটি ঘূর্ণিঝড়ের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল টাঁকের ওপর।

“সর্দার উমার খাঁ দ্বারা টাঁক আক্রমণে উৎসাহিত হয়ে পাউইন্ডা নামক ওয়াজিরি খণ্ড জাতির একটি দল ব্রিটিশ আর্মড কন্সটাবিউলারি পোস্ট জাট্টা আক্রমণ করে পোস্টটি ধ্বংস করে এগিয়ে গেল ইংরেজ অধিকৃত গোমাল বাজারে। এই অঞ্চলেও একের পর এক ব্রিটিশ ঘাঁটি পাখতুনদের কব্জায় চলে গেল।

“স্থানীয় ব্রিটিশ ঘাঁটি ও পোস্টগুলির রক্ষীদের লয় হবার উপক্রম হওয়ায় ডেরা ইসমাইল খাঁ এবং বান্নু ক্যান্টনমেন্ট থেকে অতিরিক্ত ঘোড়সওয়ার, পদাতিক ও গোলন্দাজ সৈন্যের ফৌজ ছুটে গেল গোমাল বাজার ও টাঁক অভিমুখে। এই সৈন্য দলটির শক্তিশালী আর্টিলারি, ক্যাভালরি ও ইনফ্যান্ট্রির প্রতি আক্রমণে মাসূদ,  জলিলখেল ও পাউইন্ডা উপজাতির লশ্‌কর হেরে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। উপজাতি লশ্‌করগুলিকে পরাজিত করে ব্রিটিশ ফৌজ এগিয়ে গেল সেই অঞ্চলের অভ্যন্তরে। পথে এক জায়গায় যাযাবর সুলেমানখেলদের একটি অস্থায়ী শিবিরে এসে পৌঁছল ব্রিটিশ ফৌজটি। সুলেমানখেল খণ্ড জাতির দলটির যুদ্ধ করার মতলব ছিল না এবং তারা যুদ্ধের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুতও ছিল না। তারা তাদের পরিবার সমেত গতানুগতিক প্রথায় এক স্থান থেকে আর এক স্থানে পরিযান করছিল।                          

“ব্রিটিশ ফৌজ এর যুদ্ধ জয়ের নেশা তখন তাদের যুক্তিহীন করে তুলেছিল বোধ হয়। ব্রিটিশ ফৌজ এর কমান্ডাররা পরিযানকারি সুলেমান খেলদের আত্মসমর্পণ করতে বললেন। সুলেমানখেলদের বয়স্ক লোকেরা এগিয়ে গিয়ে কমান্ডার এর সঙ্গে আত্মসমর্পণের শর্ত ইত্যাদি আলচনায় প্রবৃত্ত হলেন,  ইত্যবসরে দলের যুবা পুরুষরা শিবিরের আড়ালে ট্রেঞ্চ খুঁড়তে আরম্ভ করল এবং দলের স্ত্রীলোক ও শিশুরা এক এক করে শিবির ত্যাগ করল। সুলেমানখেলদের বয়স্ক লোকেরা যে মুহূর্তে জানতে পারলেন ট্রেঞ্চ খোঁড়ার কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং স্ত্রীলোক এবং শিশুরা শিবির ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে গেছে,  তাঁরা আলোচনা বন্ধ করে দিলেন ও আত্ম সমর্পণের দাবি অগ্রাহ্য করলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা ট্রেঞ্চে ঢুকে পড়লেন ও ব্রিটিশ ফৌজের ওপর গুলিবৃষ্টি আরম্ভ করলেন।

“আধঘণ্টা ধরে খণ্ড জাতিটির সঙ্গে ব্রিটিশ পদাতিক সৈন্যের গুলিবিনিময় চলল। সেই সময় ব্রিটিশ ক্যাভালরি, যারা দূরে পিছনে ছিল তারা এসে পৌঁছল ও ঝটিকা চার্জ করল। পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্যের যুগপৎ আক্রমণের বিরুদ্ধে দলটি আত্মরক্ষা করতে পারল না,  কিন্তু তারা রাইফেল ফেলে দিয়ে তলওয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল আক্রমণকারীদের ওপর এবং যতক্ষণ তাদের হাতে তলওয়ার ধরবার শক্তি ছিল ততক্ষণ লড়াই  চালিয়ে ধরাশায়ী হল।

“ব্রিটিশ সৈন্য দলের তুলনায় খণ্ড জাতিটির সেখানে লোক সংখ্যা ছিল নগণ্য,  এবং যুদ্ধ বেশিক্ষণ ধরে চলেনি। ইংরেজ লিপিকার এই ঘটনাকে সুলেমানখেলদের  ‘ট্রেচারি’ বলে আখ্যাত করেছেন, কিন্তু সেই কলম আমার হাতে থাকলে আমি সুলেমানখেলদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের কথা স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাসে অঙ্কিত করার সুপারিশ করতাম। বলা বাহুল্য, যেসব স্থানে উপজাতিদের সঙ্গে ব্রিটিশ বাহিনীর যুদ্ধ হত, সেসব স্থানে ইংরেজ তার রণনীতির অঙ্গ হিসাবে তাদের গ্রামসমূহ ধ্বংস করে দিত। আফগানিস্তানেও কোন যুদ্ধে তার ব্যতিক্রম হয়নি।

“ইংল্যান্ডে অনেক ইংরেজ আফগান অভিযান সংক্রান্ত যুদ্ধে ইংরাজের বর্বরোচিত ব্যবহারে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। স্যর উইলিয়াম হারকোর্ট সে সময় বলেছিলেন ‘The Viceroy  declared at the outset  that we had no quarrel with the people of Afghanisthan,  but only with Sher Ali. Sher Ali is gone and we are waging hostilities against the people  with whom we have no quarrel,  whose homes we have  invaded and whose territory we have annexed, and when they resist we find it necessary to cut their throats and exterminate their villages’

“উত্তরে মোগল খাঁ ও মুল্লা খলীলের মোহমান্দ ও শিনওয়াড়ি লশ্‌কর, ও দক্ষিণে ওয়াজিরি মাসূদ ইত্যাদি উপজাতি লশ্‌কর সাময়িক ভাবে পরাস্ত হওয়ায় জেনারেল স্যাম ব্রাউন ও তাঁর রাজনৈতিক পরামর্শদাতা মেজর স্যর ক্যাভান গ্রি মনে করলেন যে আফগানিস্তান সম্পূর্ণ ও সন্দেহাতীতভাবে পরাজিত হয়েছে। তাঁরা য়াকুব খাঁকে ডেকে পাঠালেন ইংরেজ আরোপিত শর্তাবলিতে স্বাক্ষর করার জন্য।

“তারপর ১৮৩৮-৪০ সালের অ্যাংলো আফগান যুদ্ধের পরিণতির কতকাংশে পুণরাবৃত্তি শুরু হল। য়াকুব খাঁ রাজপ্রতিনিধি হিসাবে দেশ শাসন করছিলেন। তাঁর মাথায় আমীরের তাজ পরিয়ে কাবুলের সিংহাসনে বসালেন ইংরেজ জেনারেল।

মেজর স্যর ক্যাভান গ্রি ব্রিটিশ প্রতিনিধি হয়ে নিজের অঙ্গরক্ষি সৈন্য ও কর্মচারী নিয়ে বালাহিসার প্রাসাদে ব্রিটিশ দূতাবাস স্থাপন করলেন। লন্ডনে ও সিমলায় আনন্দোৎসবের ঢেউ বহে চলল। আফগানিস্তানে যুদ্ধজয় ও সেখানে ব্রিটিশ কর্তৃত্ব কায়েম করার জন্য লর্ড লিটন ভূরি ভূরি প্রশংসা পেলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডিজ়রেলি ও ভারত সচিব সল্সবেরির কাছ থেকে। কিছু ফৌজ আফগানিস্তানে রেখে বাদবাকি সৈন্য নিয়ে জেনারেলরা সব ফিরে গেলেন হিন্দুস্থানে।

“তারপর হঠাৎ সব কিছু ওলটপালট হয়ে গেল। ১৮৭৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম দিকে,  রাতের বেলায় জেনারেল রবার্টস ও লিটন এর কাছে সংবাদ এসে পৌঁছয় যে কাবুল ও তার আশপাশে বিদ্রোহ আরম্ভ হয়েছে ভয়ংকর রূপে। ব্রিটিশ দূতাবাস আক্রান্ত হয়েছ এবং মেজর স্যর ক্যাভান গ্রির পরিস্থিতি সংকটাপন্ন। পরদিন সংবাদ এল যে স্যর ক্যাভান গ্রি, তাঁর অঙ্গরক্ষিদল ও কর্মচারীরা বিদ্রোহিদের হাতে হত হয়েছেন। লর্ড লিটনের কাছে আমীর য়াকুব খাঁর  বার্তা এল যে তিনি তাঁর প্রাসাদে অবরুদ্ধ, তাঁর সিংহাসন ও রাজত্ব তাঁর পক্ষে রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

“জেনারেল রবার্টস কয়েকদিনের মধ্যেই প্রায় সাত হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী নিয়ে তাড়াতাড়ি রওনা হলেন কাবুলে। সেখানে পৌঁছে তাঁর রণকৌশলে বিদ্রোহী আফগান সৈন্যদের পরাস্ত করে কাবুল দখল করে নিলেন এবং য়াকুব খাঁকে অভয় দিলেন।

আগামী সংখ্যায় সমাপ্য

টাইম মেশিন সব লেখা একত্রে

Leave a Reply