বৈজ্ঞানিকের দপ্তর আবিষ্কারের কাহিনি রাজীব কুমার সাহা বসন্ত ২০১৭

আগের পর্বগুলো

bigganabishkar60-1-mediumএই নীলগ্রহের জন্মলগ্ন থেকেই ঘটে চলেছে কতই না আজব কাণ্ডকীর্তি। বিশেষত মানুষ বা তার পূর্ব প্রজাতির সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন আবিষ্কার। আদিযুগ থেকে বিভিন্ন খোঁজ আর আবিষ্কারের যথাসম্ভব তথ্য ক্রমানুসারে নথিভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে এই বিভাগে।

পর্ব – ৪

ধাতু আবিষ্কার (Metalworking) (খ্রিস্টপূর্ব ৮৭০০)

bigganabishkar60-1-medium

ধাতু আবিষ্কারের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত আদিমানব ধারণাই করতে পারেনি যে এই যুগান্তকারী আবিষ্কার নিজেদের সভ্যতাকে কোন পথে চালিত করতে পারে। ইরাকের উত্তরাংশে তামা নির্মিত দুল খুঁজে পাওয়ার পর প্রত্নতাত্ত্বিকেরা ধারণা করেন যে প্রথম ধাতু হিসেবে তামার ব্যবহার মানুষ খ্রিস্টপূর্ব ৮৭০০ থেকেই জানত। প্যালেস্তানিয় এবং অ্যানাটলিয় আদিবাসীরা কোনও গভীর গর্ত বা গুহা খুঁড়তে গিয়ে পাওয়া খনিজ তামা পিটিয়ে অচিরেই বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র বা হাতিয়ার বানিয়ে ফেলল। কিন্তু সে তামা ছিল বেশ নরম। পরবর্তী সময়ে তারা আকরিক থেকে তামা আহরণ-বিদ্যা রপ্ত করে টিনের সাথে মিশিয়ে ব্রোঞ্জ তৈরি করে ফেলল। সে প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ – ৪০০০-এর কথা। মানুষ তখন রীতিমতো সোনা ব্যবহার করতে শিখে গেছে। অবশ্য এর আগেই তারা ধাতুবিদ্যার উন্নতিকরণ করতে গিয়ে তামার সাথে আর্সেনিক মিশিয়ে হঠাৎ এক সম্পূর্ণ নতুন ধরণ এবং চরিত্রের ধাতু আবিষ্কার করে ফেলল, যা আর্সেনিক্যাল ব্রোঞ্জ নামে পরিচিত। আর সম্ভবত এটাই পৃথিবীর সর্বপ্রথম মানবসৃষ্ট সঙ্কর ধাতু।

গাছের গুঁড়ির শালতি (Dugout Canoe) (খ্রিস্টপূর্ব ৭৫০০)

bigganabishkar60-2-mediumপ্রয়োজন জিনিসটা মানুষের কখনও এক জায়গায় বা সীমিত সংখ্যক বস্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাই বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতেই একসময় গুহামানবদের দরকার পড়ল এমন এক বস্তুর যার সাহায্যে অনায়াসে জলের ওপর বিচরণ করা যায়। এতদিন শুধু সাঁতার আর জলে ভাসমান কাঠ জড়িয়ে ধরে সাঁতার কেটেই কাজ চালানো হচ্ছিল। সেই কাঠ অথবা মোটা গাছের গুঁড়িকে কাজে লাগিয়েই তারা তৈরি করে ফেলল শালতিজাতীয় একধরনের জলযান – যা দেখতে শুনতে প্রায় আধুনিক নৌকোর মতোই। ফাঁপা গাছের গুঁড়ির ভেতরটা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে বা ঠাসা গুঁড়ির পেটটা কুঁদে বানানো হল এই শালতি। বিবর্তনের মাধ্যমে আস্তে আস্তে একসময় শালতির দুইদিকটা কোণাকৃতি করে দেওয়া হল যাতে জিনিসটা দ্রুত জল কাটতে পারে। ইউরোপের উত্তরাংশে এধরনের প্রাচীন শালতির বেশ কিছু প্রমাণ মিলেছে। প্রাচীন গ্রিসেও এই জলযানের ব্যবহার ছিল। গ্রিকরা একে ‘মনো-অক্সিলন’ বলে, যার ইংরেজি সমার্থক হচ্ছে ‘সিঙ্গল ট্রি’।

বাটালি (Chisel) (খ্রিস্টপূর্ব ৭৫০০)

bigganabishkar60-3-mediumআধুনিক বাটালি – কত রকম, কত ধরন আর কত ডিজাইনের হয়। তা ধারণাটা কবেকার? না, সেই ৭৫০০ খ্রিস্টপূর্বের আশেপাশে সময়কার। আদিমানব তখন হোমো ইরেক্টাস থেকে হোমো সেপিয়েন্সে উন্নিত হয়েছে। শক্ত হাড়গোড়ের বদলে ধাতুর যন্ত্রপাতি তৈরি করতে শিখে গেছে। গ্রিক স্থপতি ম্যানোলিস কোরেস তো মনে করেন, আদি গ্রিকদের ব্যবহৃত ধাতুনির্মিত বাটালি বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি ধারালো আর শক্তপোক্ত ছিল। ফ্রান্সের দক্ষিণাংশে অউরিগন্যাক গ্রামের নিকটে আবিষ্কৃত প্রায় ৩০০০০ খ্রিস্টপূর্বে নির্মিত হাড়ের বাটালি আর প্রস্তরযুগের শেষে ধাতুনির্মিত বাটালি অন্তত তাই প্রমাণ করে। তবে হাড়গোড়ের বাটালি যতই শক্তপোক্ত হোক না কেন তা ছিল ভঙ্গুর। ব্যবহারবিধি সম্পর্কে আদিম মানব ততটা সচেতনও ছিল না। পরবর্তী সময়ে ধাতুনির্মিত বাটালির আবিষ্কারের ফলে তাদের বিভিন্ন আয়াসসাধ্য কাজকর্ম যেমন, গাছ কাটা, কাঠ এবং পাথর কেটে বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করা অনেক সহজ হয়ে গেল। প্রাচীন মিশরীয় ছুতোর এবং রাজমিস্ত্রিরা পিরামিড তৈরিতে ব্রোঞ্জের বাটালি ব্যবহার করতেন। মজার কথা হচ্ছে, প্রথম তৈরির সময় বাটালির যে রূপদান করা হয়েছিল আজও তার চেহারার কোনোরূপ পরিবর্তন হয়নি। ইংরেজিতে ‘chisel’ কথাটি এসেছে পুরাতন ফরাসি শব্দ ‘cisel’ থেকে – উৎস হচ্ছে ল্যাটিন শব্দ ‘cisellum’, যার অর্থ ‘কিছু কাটার যন্ত্র’।

ইট (Dried Brick) (খ্রিস্টপূর্ব ৭৫০০)

bigganabishkar60-6-mediumমানুষ আস্তে আস্তে দৈনন্দিন জীবনযাপনের ক্ষেত্রে প্রত্যেকটা বিষয় প্রত্যেকটা প্রয়োজন নতুনভাবে ভাবতে শুরু করল। ফলে দিন দিন নতুন নতুন জিনিসের আবিষ্কার হতে লাগল। বর্তমানে মানবসমাজে বাসস্থান তৈরির ক্ষেত্রে এক অতীব প্রয়োজনীয় জিনিস হচ্ছে ইট। মানুষ প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৭৫০০-এই ইটের ব্যবহার শিখে গিয়েছিল। তখন তা ছিল কাঁচা মাটির, তবে শুকনো। একটা সুরক্ষিত বাসস্থানের প্রয়োজন আদিমজাতিকে বড়োই দুর্ভাবনায় ফেলে রেখেছিল দীর্ঘদিন। শেষে তারা নরম মাটিকে ঢেলা বানিয়ে খটখটে রোদে শুকিয়ে নিয়ে ঘর তৈরি করার কৌশল রপ্ত করে নিল। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা অনুমান করেন, এ কাজে মাটি তারা নদীগর্ভ থেকে সংগ্রহ করত এবং তাদের ইটনির্মিত বাসস্থান রীতিমতো সুন্দর আকার আকৃতির ছিল আর সম্পূর্ণ মাটির তৈরি ছিল বলে অনেকাংশেই শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ছিল। তুরস্কের উচ্চ টাইগ্রিস উপত্যকার ক্যায়োনু আর অ্যানাটোলিয়ার দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত দিয়ারবাকির নামক স্থানে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা খ্রিস্টপূর্ব ৭৫০০-এর কাছাকাছি সময়কার কাঁচা ইটের সন্ধান পান। তবে সেগুলো ছিল একেকটা মাটির ঢেলা।

পরবর্তী সময়ে তুরস্কেরই ক্যাতালহয়ুক অঞ্চলের জর্ডন নদীর উপত্যকার জেরিকোতে আরও কিছুটা উন্নত ধরনের ইটের খোঁজ পাওয়া যায়। এগুলো কাদামাটির ঢেলা বানিয়ে রোদে শুকিয়ে হাতে তৈরি করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, ইটগুলো প্রত্যেকটা নিজেদের মধ্যে কাদার প্রলেপের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে দেওয়াল আকারে আবিষ্কৃত হয়েছিল। আর আশ্চর্যজনকভাবে প্রত্যেকটা ইটের আকার ছিল একই অনুপাতের। যেমন, একেকটা ইট চার একক লম্বা, দুই একক প্রস্থ এবং এক একক উচ্চ ছিল। এ থেকে মনে করা হয়, মানুষ তখন রীতিমতো কাঠের বাক্সের নির্দিষ্ট ফর্মার সাহায্যে ইট তৈরি করত। সমগ্র মিশরীয় ও সিন্ধুসভ্যতায় ছোটবড়ো ঘরবাড়ি, খামার, শস্যাগার প্রভৃতি ক্ষেত্রে এ ধরনের ইটের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়েছে। কাঠের ফর্মায় তৈরি ইটগুলো খ্রিস্টপূর্ব ৭০০০ – ৬৪০০-এর মধ্যে তৈরি বলে মত প্রকাশ করা হয়।

স্লেজ (Sledge) (খ্রিস্টপূর্ব ৭০০০)

bigganabishkar60-7-mediumআজকালকার ‘স্নোমোবাইল’-এর অনেক অনেক আগেই আমাদের পূর্বপুরুষেরা বরফ দিয়ে যাতায়াতের সুবিধার্থে এক পরিবেশ-বান্ধব যানের উদ্ভাবন করে ফেলে। পরবর্তীকালে তাই স্লেজগাড়ি নামে পরিচিত হয়। উত্তর ইউরোপের আর্কটিক অঞ্চলে কাঠনির্মিত স্লেজ আবিষ্কৃত হয় যা প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৭০০০-এর সময়কার। অনুমান করা হয়, প্রাথমিক অবস্থায় এই স্লেজ মানুষ দ্বারা টানা হলেও পরে ধীরে ধীরে তা কুকুর এবং মেরুষাঁড় দিয়ে টানা শুরু হয়। এও ধারণা করা হয় যে মানুষ দ্বারা টানা স্লেজে চড়েই কিছু মানুষ প্রথমবারের মতো আর্কটিক এবং অ্যান্টার্কটিক অভিযানে বেরিয়ে পড়েছিল। স্লেজ শুধু বরফের ওপরেই নয়, ভিজে বা কর্দমাক্ত পথ, এমনকি শক্ত পাথুরে রাস্তাতেও চলাফেরা করত। সামনে থেকে কেউ পাথুরে রাস্তায় তেলজাতীয় কোনও তরল ছড়িয়ে দিত যাতে যানটির নীচের অংশটি শক্ত মাটি বা পাথরের ঘর্ষণে বাধাপ্রাপ্ত না হয়।

দুর্গ (Fort) (খ্রিস্টপূর্ব ৭০০০)

bigganabishkar60-8-mediumমানব সমাজে আত্ম-প্রতিরক্ষার ধারণাটি হাজার হাজার বছরের পুরনো। প্রাগৈতিহাসিক যুগের দুর্গ নির্মাণ থেকে শুরু করে আজকের অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সবই এই ধারণারই ফসল। নিজের এবং পরিবার পরিজনদের সুরক্ষা দিতে মানুষ একসময় দুর্গ নির্মাণ করে ফেলে। প্রাচীন যুগে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা প্রধানত তিন ধরনের দুর্গ তৈরি হত বলে মত প্রকাশ করেন। এক, মাটির প্রাচীরওলা দুর্গ; যেগুলো তৈরি হত দুর্গের চারপাশের পরিখা থেকে উত্তোলিত বালি মাটি দিয়ে। দুই, পাথরকুচি দ্বারা তৈরি অপেক্ষাকৃত দৃঢ় দুর্গ। তিন, ছোট বড়ো মাঝারি আকারের শক্ত পাথর দিয়ে রাজমিস্ত্রিদের দ্বারা তৈরি দৃঢ়তম দুর্গ। পুরনো ভেঙেচুরে যাওয়া দুর্গের জিনিসপত্র দিয়ে আবার নতুন দুর্গ তৈরি করে ফেলত তারা। তবে আধুনিক থেকে আধুনিকতর শৈলীযুক্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত সবচেয়ে বেশি দুর্গের পরিচয় পাওয়া যায় ঐতিহাসিক যুগে।

মালবাহী যান (Travois) (খ্রিস্টপূর্ব ৭০০০)

bigganabishkar60-10-mediumট্রাভয় শব্দটি কানাডিয়ান ফ্রেঞ্চ; উৎপত্তি ফরাসি শব্দ ট্র্যাভেইল (Travail)। এটি ইংরেজি ‘A’ আকৃতির একটা কাঠের ফ্রেম যা প্রাথমিকভাবে কুকুরের পিঠে বেঁধে একস্থান থেকে অন্যস্থানে মালপত্র বহন করা হত। পরে অবশ্য অধিক মালপত্র বহনের প্রয়োজনে বন্য ঘোড়া, খচ্চর এগুলোকে পোষ মানিয়ে কুকুরের বদলে ব্যবহার করা হত। কারণ, গ্রীষ্মকালে ক্লান্ত হয়ে গিয়ে কুকুরের গতি শ্লথ হয়ে পড়ত, আর কুকুরবাহী যানে কুড়ি থেকে ত্রিশ কেজি ওজনের বেশি ভার বহন করাও যেত না। ৭০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি সময়ে সমতলভূমিতে বসবাসকারী নর্থ আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের মধ্যেই এই ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল বলে ধারণা করা হয়। ট্রাভয়ের কোণের দিকটা কুকুরের পিঠে বেঁধে দেওয়া হত আর দুদিকের দুটি লম্বা কাঠের টুকরো মাটি ছুঁয়ে থাকত। আড়াআড়িভাবে বাঁধা দুয়েকটি কাঠ বা গাছের ডালের ওপর ভার চাপিয়ে মালপত্র বহন করা হত। বিশেষত শিকার করা মৃত জীবজন্তু বা জ্বালানি কাঠ আহরণ করে এই বিশেষ যানে চাপিয়ে ঘরে ফিরত আদিমানবেরা। সঠিক অর্থে চাকা আবিষ্কারের পরে গাড়ি তৈরি হলেও আসলে গাড়িঘোড়ার ধারণা কিন্তু অনেক আগে ওই ট্রাভয় থেকেই জন্ম নিয়েছিল।

জুতো (Shoe) (খ্রিস্টপূর্ব ৭০০০)

bigganabishkar60-12-mediumজুতো আবিষ্কারের স্বপক্ষে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণাদি বিষয়ে বেশ জটিলতা থাকলেও আমেরিকায় খুঁজে পাওয়া প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৭০০০-এর কাছাকাছি সময়ের জুতোকেই পৃথিবীর প্রথম জুতো হিসেবে মান্যতা দেওয়া হয়। ১৯৩৮ সালে অরেগন-এর ফোর্ট রক গুহায় প্রাচীনতম জুতোর সন্ধান মেলে। এগুলো সাধারণত গাছগাছড়ার শক্ত লতাপাতা, দড়িদড়া আর বন্য জীবজন্তুর চামড়া দিয়েই তৈরি করা হত বলে মনে করা হয়। একদল প্রত্নতাত্ত্বিক আদিমানবের পায়ের আঙুলের হাড় পরীক্ষা করে এও বলেন, যেহেতু হাড়ের ক্রমহ্রাসমান বৃদ্ধি এবং ক্রমবৃদ্ধিমান শক্তির পরিচয় পাওয়া যায় সেহেতু প্রায় ৪০০০০ বছর পূর্বেও নিশ্চয়ই মানুষ জুতোর ব্যবহার জানত। সে জুতোর ডিজাইন ছিল আধুনিক জুতোর মতোই আর পা-কে সুরক্ষিত করে রাখে এমন সোলগুলো জুতোর সাথে দড়িদড়া দিয়ে বাঁধা থাকত।

বয়ন শিল্প (Woven Cloth) (খ্রিস্টপূর্ব ৬৫০০)

bigganabishkar60-14-mediumবন্য আদিমজাতি যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে সভ্যতার শিখরের দিকে পা রাখতে শুরু করল। সে এখন আর কাঁচা মাংস খায় না। নিয়ন্ত্রিত আগুন তাকে সে বর্বরতা থেকে মুক্তি দিয়েছে। সে নিজস্ব প্রয়োজনে জুতো বানিয়েও পরতে শিখেছে। এখন জীবজন্তুর চামড়া গায়ে রাখতেও মন চায় না। সেই তাগিদেই একসময় সে কাপড় বুনতেও শিখে গেল। কাঠের ফ্রেমে লম্বালম্বিভাবে কিছু তন্তু বেঁধে আর কিছু আড়াআড়িভাবে ঢুকিয়ে কাপড় বুনত তারা।

          মানুষ প্রথমবারের মতো জীবজন্তুর চামড়ার আঁশ দিয়ে তন্তু বানিয়ে কাপড় তৈরি করতে শিখল। কিন্তু তা তেমন টেকসই না হওয়ায় আস্তে আস্তে তাপ আর চাপের মাধ্যমে সেই তন্তু ব্যবহার করে সে সফলতার মুখ দেখল। ১৯৬২ সালে তুরস্কের ক্যাতালহয়ুক শহরে আদিমানবের কাপড় বোনার স্বপক্ষে প্রাচীনতম প্রমাণ মেলে। সে শহরে একটুকরো ‘কার্বনাইজড ক্লথ’-এর সন্ধান মেলে যা প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৬৫০০-এর সময়ের। কিন্তু সেটা ফ্ল্যাক্স (একটি বন্য ভূমধ্যসাগরীয় গাছ) না ভেড়ার পশমের তৈরি তা জানা যায়নি। তবে তার আগেই মিশরে প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০-এর সময়কার একটুকরো লিনেন কাপড় খুঁজে পাওয়া যায়। মনে করা হয় যে তুরস্ক আর মিশরে খুঁজে পাওয়া কাপড়ের টুকরোগুলো একই জিনিস দিয়ে তৈরি। তবে বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা করেও এই দ্বন্দ্বের নিশ্চিত অবসান করা সম্ভব হয়নি।

মানচিত্র (Map) (খ্রিস্টপূর্ব ৬৫০০)

bigganabishkar0প্রথম মানচিত্র তৈরি করার কৃতিত্ব কিন্তু ব্যাবিলনবাসীদের। পৃথিবীর আনাচে কানাচে দ্রুত লোকসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়ে মানুষের মস্তিষ্কেরও তখন দ্রুত বিকাশ হচ্ছে। অজানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে মানুষ বুঝতে পারল যে কোনও স্থানে দ্বিতীয়বার বা বারবার যেতে গেলে ওই জায়গার বিশিষ্ট স্থান বা দ্রষ্টব্যগুলোর অবস্থান যতটুকু সম্ভব সঠিকভাবে মনে রাখা প্রয়োজন। ভাবনাচিন্তার ফসল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল মানচিত্র। ১৯৬১ সালে তুরস্কের ক্যাতালহয়ুক শহরে একটা দেওয়ালে আঁকা মানচিত্র আবিষ্কৃত হয় যাতে কিছু বাড়িঘর আর একটা আগ্নেয়গিরির চুড়ো নজরে আসে। মানচিত্রটির বয়স নির্ধারিত হয় প্রায় ৮৫০০ বছর। প্রসঙ্গত, পৃথিবীতে বহুদিন এই মানচিত্র নামক বস্তুটার সঠিক কোনও নীতি নির্দেশিকা ছিল না। শেষে ১৮৯১ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল জিওগ্রাফিক্যাল কংগ্রেস’ পৃথিবীর স্কেল ম্যাপের সবিস্তার বিবরণী প্রকাশ করে।

এরপর আগামী সংখ্যায়

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

Leave a Reply