মহাবিশ্বে মহাকাশে আগের সমস্ত পর্ব একসঙ্গে
প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মহাকাশে চান্দ্রপথ অবলম্বনে (অশ্বিনী থেকে রেবতী পর্যন্ত) চান্দ্রতিথি সংক্রান্ত যে সাতাশটি নক্ষত্রের (সমব্যাবধানে অবস্থিত) কথা উল্লেখ করেছেন সেগুলি হল অশ্বিনী, ভরণী, কৃত্তিকা, রোহিণী, মৃগশিরা বা মৃগশীর্ষ, আর্দ্রা, পুনর্বসু, পুষ্যা, অশ্লেষা, মঘা, পূর্বফল্গুনী, উত্তরফল্গুনী, হস্তা, চিত্রা, স্বাতী, বিশাখা, অনুরাধা, জ্যেষ্ঠা, মূলা, পূর্বআষাঢ়া, উত্তরআষাঢ়া, শ্রবণা, ধনিষ্ঠা, শতভিষা, পূর্বভাদ্রপদা, উত্তরভাদ্রপদা এবং রেবতী।
ভারতীয় ভাবনায় তারকামণ্ডল নক্ষত্র নামে পরিচিত। নক্ষত্র শব্দ এসেছে ‘নক্ত’ ও ‘ত্রৈ’ ধাতু মিলিয়ে। নক্ত শব্দের মানে রাত্রি এবং ত্রৈ ধাতুর অর্থ পালন করা। দুয়ের মিলিত অর্থ রাত্রিকে যে পালন করে। অর্থাৎ, নক্ষত্রের আলোয় দূরীভূত হয় রাতের বিভীষিকা। নক্ষত্র নামের পিছনে এ জাতীয় একটি ধারণার প্রচলন ছিল বলে অনেকে মনে করেন। মৎস্যপুরাণে নক্ষত্র শব্দ সম্বন্ধে বলা আছে, “ন ক্ষীয়তে যতস্তানি তস্মান্নক্ষত্রতা স্মৃতা”। অর্থাৎ নক্ষত্রসমূহের ক্ষয় নেই, তাই এর নাম নক্ষত্র। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে নক্ষত্রের নামকরণ সম্পর্কে একই কথা বলা হয়েছে— যা ক্ষত্র হয় না তা নক্ষত্র। এই প্রসঙ্গে শ্রী অরূপরতন ভট্টাচার্য মহাশয় তাঁর ‘প্রাচীন ভারতে জ্যোতির্বিজ্ঞান’ গ্রন্থে বলেছেনঃ
“আমার মনে হয় নক্ষত্র নামকরণের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য যুক্তি, রাত্রির নিমিত্ত আবাস। নক্ বা নক্ত শব্দটির অর্থ রাত্রি এবং সত্র অর্থ আবাস, উভয় যোগে রাত্রির জন্য আবাস। ভারতীয় তিথি বিভাগের অনুরূপ চৈনিক জ্যোতিষ শাস্ত্রের যে সিউ (Sieu) এবং আরবদের যে মঞ্জিলের প্রচলন তার অর্থ আবাস। নক্ষত্র সকল চন্দ্রের আবাসস্থল। ঋগ্বেদেও নক্ষত্র সোমের গৃহ।
ভারতবর্ষে প্রাচীনতম মহাকাশ চিন্তায় তারকা এবং নক্ষত্র শব্দ দুটির মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য দৃষ্ট হয় না। পরে নক্ষত্র অর্থে চান্দ্রপথের উপরে অবস্থিত কয়েকটি তারকামণ্ডল বোঝাত।”
আগেই বলেছি চান্দ্রতিথি সংক্রান্ত সাতাশটি নক্ষত্র সমব্যাবধানে অবস্থিত। প্রত্যেকটি নক্ষত্র পৃথিবীর আকাশে ১৩০২০’ অংশ ঘিরে অবস্থান করছে। স্বাভাবিকভাবেই কোনো একটি নক্ষত্র বা তারার পক্ষে আকাশের এতটা স্থান (১৩০২০’) দখল করে অবস্থান করা সম্ভব নয়। তাই নক্ষত্র বলতে একাধিক তারার সমাবেশ অর্থাৎ তারকামণ্ডল বা তারকাপুঞ্জকে বোঝানো হচ্ছে। এই প্রবন্ধেও ‘নক্ষত্র’ শব্দটি চন্দ্রের আবাসস্থল অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে।
অশ্বিনী বা অশ্বিদ্বয়ঃ
চান্দ্রতিথি সংক্রান্ত নক্ষত্রচক্রের প্রথম নক্ষত্র অশ্বিনী। এতে রয়েছে দুটি তারা। এই তারা দুটিকে একত্রে বলা হয় অশ্বিদ্বয়। এদের নাম নাসত্য ও দস্র। বৈদিক যুগে অশ্বিদ্বয় সূর্যোদয়ের পূর্বে উদিত হয়ে শীতকালের সূচনা করত। বর্ষাঋতুর সূচনাকালে এটি উদিত হত সূর্যাস্তের পরে। এ বিষয়ে ঋগ্বেদে অনেক শ্লোক আছে। সঠিক ঋতু নির্ণয়ের জন্য এরা নাসত্য। আবার বর্ষা ও শীত উভয় ঋতুর আগমন বার্তা দেওয়া জন্য এরা দস্র (বিস্ময়কর)। অশ্বিনী নক্ষত্রের অধিপতি অশ্বি। বেদে সূর্যের রশ্মির নাম অশ্বি।
প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিদদের কাছে প্রথম দিকে অশ্বিনীর আকৃতি অশ্ববদন সদৃশ ছিল না। সে সময় দুটি জ্যোতি অর্থে অশ্বিনী পরিচিত ছিল। পরে আরেকটি তারা যুক্ত করে অশ্বমুখের কল্পনা করা হয়। (শ্রীপতি ভট্টের জ্যোতিষ রত্নমালায় অশ্বিনী নক্ষত্রে তিনটি তারকার উল্লেখ আছে) অশ্বিনী নক্ষত্রের প্রধান তারকাদ্বয় যুগ্মতারা (Binary Star)। মেষরাশি (Aries) মণ্ডলে তিনটি তারা দ্বারা গঠিত অশ্বিনী নক্ষত্রের মাঝের তারাটি যোগতারা। শ্রী অরূপরতন ভট্টাচার্য তাঁর প্রাচীন ভারতে জ্যোতির্বিজ্ঞান বইতে যোগতারা সম্পর্কে বলেছেন, “চন্দ্রের আবাসস্থল সংক্রান্ত ২৭টি তারকাপুঞ্জের উজ্জ্বলতম বা সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য তারকাকে তাঁরা (প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিদেরা) যোগতারা বলতেন এবং সমগ্র পুঞ্জটিকে নক্ষত্র নামে অভিহিত করতেন। ওই যোগতারা প্রতি বিভাগের আদি প্রান্ত সূচনা করত। এইভাবে প্রতিটি বিভাগে চন্দ্রের অবস্থান থেকে কাল নির্ণয় এবং তিথি গণনা হত।”
আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে শেরাতন (বিটা অ্যারিয়েটিস) এই নক্ষত্রের যোগতারা এবং অন্য তারা মেসার্থিম (গামা অ্যারিয়েটিস)।
এই তারা দুটির মধ্যে শেরাতনের ঔজ্জ্বল্য কিছুটা বেশি হলেও দুটি তারাই পঞ্চম মাত্রার তারকা। পৌষ মাসে সান্ধ্য আকাশে এই নক্ষত্রটিকে (তারা দুটিকে) মধ্যাকাশে দেখা যায়। তবে অশ্বমুখ কল্পনার জন্য যে তৃতীয় তারাটিকে যুক্ত করা হয়েছে সেটি দ্বিতীয় মাত্রার তারা হওয়ায় এদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল।
ঋগ্বেদে অশ্বিদ্বয় প্রসঙ্গে যে শ্লোকগুলি আছে তার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অনেকে এদের দেবতার আসনে বসিয়েছেন। প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থগুলিতে এদের সর্বরোগহর স্বর্গবৈদ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সত্যিই কি এরা স্বর্গবৈদ্য? আগেই বলেছি রাশিচক্রের প্রথম নক্ষত্র অশ্বিনী বা অশ্বিদ্বয় এবং শেষ নক্ষত্র রেবতী। এদের মাঝখানে আছে বৃত্রের নমুচি নামক গণ্ড। জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় বৃত্র হল নীহারিকা (আমাদের সৌরবিশ্ব যে নীহারিকায় তার ঋগ্বেদীয় রূপক হল বৃত্র)। এই নীহারিকার অনুন্মোচিত আবরণ বা নমুচি উন্মোচিত হয়ে নক্ষত্রের সৃষ্টি। বেদে নীহারিকার আরও কয়েকটি নাম পাওয়া যায়, যেমন সমুদ্র, বৈতরণী, স্বর্গগঙ্গা ইত্যাদি। নীহারিকার পারমাণবিক পদার্থকে প্রাচীন ঋষিরা সমুদ্রের ফেনার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁদের ভাষায় দস্র ও নাসত্য নামের যুগ্মতারা দুটি নীহারিকার পারমাণবিক পদার্থের অপসারণ করে মেশরাশির তারাগুলিকে উন্মোচিত করেছে। তাই আধুনিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে বলা যায় অশ্বিদ্বয় দেবতা নন, দেব-বৈদ্যও নন। এরা অশ্বিনী নক্ষত্রের দুটি যুগ্মতারা।
তথ্য সূত্রঃ
১) অরূপরতন ভট্টাচার্য— প্রাচীন ভারতে জ্যোতির্বিজ্ঞান, কলকাতা, ২০০৬
২) রমেশচন্দ্র দত্ত— ঋগ্বেদ-সংহিতা, কলিকাতা, ১২৯২
৩) সুকুমাররঞ্জন দাশ— হিন্দু জ্যোতির্বিদ্যা, বিশ্ববিদ্যাসংগ্রহ, কলিকাতা, ১৩৫৩