মাছ, গাছ, কচ্ছপ আর হনুমান সক্রেটিস ঋত্বিক

সক্রেটিস

ঋত্বিক

এই লেখা একেবারেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা। কিন্তু এই অভিজ্ঞতার কথা বলার আগে আমার পারিবারিক ইতিহাস সম্পর্কে কিছু বলা প্রয়োজন। ভয় নেই, বেশি সময় নেব না; কারণ আমি আমার পরিবারের ইতিহাস সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানি না। আমাকে যদি তৃতীয় প্রজন্ম ধরে নেওয়া হয় তাহলে এটুকু বলতে পারি তিন পুরুষ ধরেই আমরা গোলাম। আমার মায়ের দিক থেকেও তিনপুরুষের মধ্যে গোলামির ইতিহাস আছে। ছোটো থেকে আজ পর্যন্ত আমি যেভাবে আমার পূর্বপুরুষ, গুরুজন এবং আত্মীয় পরিজনদের গোলামি করতে দেখেছি আজ আমিও তাঁদের মতোই বাঁধা মজুর হয়ে দিন পার করছি। বৈবাহিক সূত্রে এমনই এক গোলাম পরিবারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক স্থাপন হয়েছে। সহধর্মিনীর মুখ থেকে শুনে নয়, নিজের চোখে তার মা ও বাবাকে দেখে যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল সেখান থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম আমাদের বিয়েটা একেবারে সফল গোলাম-যোটক সম্পর্কের উদাহরণ হতে চলেছে। হয়েছেও তাই। বলা প্রয়োজন, আমার ঠাকুর্দা, ঠাকুমা আর বাবার বেশির ভাগ মালিকের মেজাজ ছিল ভয়ংকর, আমার দিদা এবং মায়ের মালিকরা ছিলেন তুলনায় অনেক শান্ত; হয়তো তাঁদের এই অবস্থা দেখে আমি এবং আমার সহধর্মিনী মনে মনে ঠিকই করে নিয়েছিলাম আমরা বদমেজাজি আর শান্ত দু’রকম মালিকেরই সেবা করব। এই কারণেই আমরা দু’জনেই বাগান করি, আমি মাছ পুষি, সহধর্মিনী রাস্তার কুকুর খাওয়ায়, আমরা দু’জনেই পড়শি পাখিদের নিয়মিত খাওয়াদাওয়া আর জলের ব্যবস্থা করি। আমাদের একমাত্র কন্যা তার মায়ের মতো মেজাজি মালিক অর্থাৎ কুকুর এবং পাখিদের সেবায় নিজেকে যেভাবে দক্ষ করে তুলেছে তাতে মনে হয় আমাদের গোলামির ইতিহাস চট করে থেমে যাবে না।

আজ থেকে আট বছর আগে, ২০১২ সালের ২০ মে, রবিবার, নিঃসন্দেহে রোদের তেজ ছিল সাংঘাতিক। যারা মনে করে এমন তাপমাত্রায় শুধুমাত্র সর্দিগর্মি হয় তারা ভুল করে। এমন গরমে দুপুরে ঘুম হয় না, জলে তেষ্টা মেটে না, ফ্যানের হাওয়া ঠান্ডা হয় না, গল্পের বই ভালো লাগে না, টিভি দেখতে ইচ্ছা করে না, এমনকি আড্ডা দিতেও ভাল লাগে না। এ’জন্যই অনেকের মাথাটা যায় বিগড়ে। আমারও সেদিন তেমন হয়েছিল। ছোটো থেকেই এমন অবস্থায় আমি যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছি তার জন্য প্রায় সবকটা ক্ষেত্রেই আমার বা বাড়ির অন্য কারো কোনো সমস্যার এতটুকু সুরাহা হয়নি, বরং বেড়েছে। ২০ মে, ২০১২ রাত আটটার সময় আমি যা করেছিলাম তার ফলও অন্য কিছু হয়নি। সেদিনই আমি আমার পরিবারের নতুন মালিক সক্রেটিসকে নিয়ে এসেছিলাম। ব্যাগে ভরে আনার সময় আমি জানতে চেয়েছিলাম, আমার নতুন মালিক কী খেতে পছন্দ করেন। আমায় বলা হয়েছিল, “কলমি পাতা আর কুমড়ো”; একই সঙ্গে সাবধান করে দেওয়া হয়েছিল, আমি যেন কখনো আমার নতুন মালিককে জলে না ভিজিয়ে ফেলি কারণ এমন করলে ইনফেকশন হতে পারে। বাড়িতে আসার পরে যে সবচেয়ে বড়ো প্রতিবাদ করেছিল সে-ই যে সক্রেটিসের দেখভালে সবচেয়ে বেশি খেয়াল রাখবে, তার যত্ন আত্তিতে কোনো খামতি রাখবে না, এই কথা আমি জানতাম। আমায় শুধু রাতটুকু বলতে হয়েছিল, আমি সক্রেটিসকে অন্য জায়গায় দিয়ে আসব। পরের দিন নতুন আলোয় গত সন্ধ্যার প্রতিবাদী, আমার স্ত্রীর গলায় অন্য সুর, চোখে অন্য দৃষ্টি দেখতে পেয়েছিলাম। বড়োজোর চার ইঞ্চি ব্যাসের ইন্ডিয়ান স্টার কচ্ছপ সক্রেটিস অবশ্য এই কথাটা দু-তিন মাস পরে বুঝতে পেরেছিল।

প্রথম দিন থেকেই সক্রেটিস একটা বিষয় বুঝিয়ে দিয়েছিল- সে অত্যন্ত চিন্তাশীল এবং গোলামরা তার আশেপাশে থাকলেও সে নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছা প্রকাশের থেকেও চিন্তায় মগ্ন থাকতেই বেশি পছন্দ করে। ছোট্ট মাটির হাঁড়ি উলটো করে রেখে সামনে দিকটায় ঢোকার জায়গা করে সক্রেটিসকে রাখা হয়েছিল। দিনের একটা বড়ো অংশ সে নিজের সেই গুহায় থাকতে পছন্দ করত। সেই গুহাটা ছিল মেঝে থেকে আড়াই ফুট উঁচু, ছ’ফুট লম্বা দু’ফুট চওড়া একটা বারান্দায়; বারান্দাটার একটা দিকে গ্রিলের জানালা অন্যদিকে, বলেইছি আড়াই ফুট নীচের মেঝে। অন্য দুটো দিকে দেওয়াল। প্রথম দিকে বাজার থেকে কলমি পাতা আর কুমড়ো এনে সক্রেটিসকে দেওয়া হত। কখনো খেত, কখনো ছুঁয়েও দেখত না। প্রতিদিন দেখার জন্যই মনে হত, মালিক বোদহয় আড়ে বহরে একই থেকে যাবেন। ধীরে ধীরে দেখা গেল সক্রেটিস মাঝেমাঝেই জানালার দিকে গুটিগুটি পায়ে হেঁটে এগিয়ে চলেছেন আর একটু পরে গ্রিলের কাছে এসে ওপারের আকাশ আর গাছপালা দেখছেন। এইসব দিনগুলোর কথা মনে পড়লে এখন মনে হয়, এই আট বছরে মালিক কত পালটে গেছেন! কেবল একটা বিষয়েই সক্রেটিসের স্বভাবে কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম দিন থেকেই সক্রেটিস চরম অনিশ্চিত। তার কাছে এই বিষয়টা রোজকার অবশ্যকর্তব্য নয়, যখন সাড়া দেবে তার আগে কোনোরকম সংকেত দেবে না আর সে নিজের বর্জ্য পদার্থকে, সে তরল বা আধা কঠিন যাই হোক না কেন, মোটেই এড়িয়ে যাবে না। পায়ে, পেটে মেখে এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা তৈরি করবে।

কয়েকমাসের মধ্যেই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, সক্রেটিস আস্তে আস্তে চঞ্চল হয়ে উঠছে। খাওয়াদাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়ে সারাক্ষণ গুহার বাইরে হাঁটাহাঁটি করছে। এইভাবে ক্যালরি ঝরাবার কারণ আবিষ্কারের চেষ্টার মধ্যেই সক্রেটিস সংকেত দিয়েছিল, ভবিষ্যতে কী হতে চলেছে। রাতে আমরা সবাই আলো নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মাঝরাতে হঠাৎ “থপ-খট্‌” একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গেছিল। চোখ খুলে দেখি আমার স্ত্রী আমারই মতো ভড়কে গেছে। আলো জ্বালিয়ে এদিক ওদিক দেখার পরেও আমরা কিছুতেই কিছু বুঝতে পারছিলাম না। তারপর আমার স্ত্রীর কথায় মাথার কাছের জানালাটায় সক্রেটিসের খোঁজ করতে গিয়ে দেখি তিনি নেই! দুইয়ে দুইয়ে চার করে মেঝের দিকে তাকিয়েও সক্রেটিসকে দেখতে না পেয়ে খাটের নীচে আলো ফেলেছিলাম। আর তখনই দেখতে পেলাম সক্রেটিস নিজের পিঠের উপর উলটে পড়ে আছে আর চারটে পা ছুঁড়ে সোজা হওয়ার চেষ্টা করছে। ওকে তুলে নিজের জায়গায় দেওয়ার পরে দেখলাম, কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে ও নিজের গুহায় চলে গেছিল। পরের দিন মেঝের দিকটায় একটা ছ” ইঞ্চি কাঠের অস্থায়ী দেওয়াল রাখা শুরু করলাম আর সেইদিন থেকেই বুঝতে পারলাম সক্রেটিস মুখে কোনো শব্দ না করলেও তার অপছন্দের কথা জানাতে পায়ের নখ দিয়ে যথেষ্ট শব্দ করতে পারে। ক্রমাগত কাঠের গায়ে আঁচড় কাটার শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে সেই “বার্লিন ওয়াল” সরাতে বাধ্য হয়েছিলাম। এরমধ্যে সক্রেটিসের প্রধান সেবিকা বুঝতে পেরেছিল, খুব টাটকা খাবার না হলে সক্রেটিস খাওয়ার বিষয়ে কোনো আগ্রহ দেখায় না। সুতরাং আমায় প্রায় রোজ বাজারে যাওয়ার রুটিন চালু করতে হয়েছিল। পুরোনো কুমড়ো নিয়ে সক্রেটিসের আপত্তিটা তুলনায় কম ছিল কিন্তু পুরোনো কলমি? কখনোই নয়। আমার বেশ মনে পড়ে তখন অনেকেই আমায় বাড়ির আশেপাশের পুকুরগুলোয় কলমি শাক তুলতে দেখেছে। কেউ কেউ নিশ্চয়ই ভেবেছিল, আমি এবং আমার পরিবার অর্থ সংকটে পড়েছে; কেউ হয়তো ভেবেছিল, আমার পাগলামিটা বেড়ে গেছে কিন্তু তারা কেউ বোঝেনি, আর্থিক স্বাচ্ছল্য সবসময় সমাধান দেয় না। আমি কলমি পাতার ঝামেলাটা কমাবার জন্য বাগানের মাটি আর চৌবাচ্চার জলে কলমি চাষ করা শুরু করেছিলাম। খুব সুবিধা হয়নি; কলমি লতারা কিছুতেই প্রতিদিন অন্তত দশটা পূর্ণাঙ্গ পাতা দিতে রাজি হয়নি।

কিছুদিন পরে দেখা গেল, সক্রেটিস গুহায় ঢোকা বা গুহা থেকে বেরোনোর সময় গোটা হাঁড়িটাই নড়ে যাচ্ছে। একটা দোতলা বাড়ির মাপে (অবশ্যই সক্রেটিসের উচ্চতা অনুযায়ী দোতলা) কাঠের বাক্স বসানো হয়েছিল। এক সপ্তাহ সেই বাক্সের থেকে দূরে থেকে সক্রেটিস জানিয়ে দিয়েছিল, সেই বাড়ি তার পছন্দ নয়। এবার দেড়তলা উঁচু কিন্তু নীচটা সমতল একটা বারো ইঞ্চি টব এনে দরজার মতো জায়গা তৈরি করে উলটো করে বসানোর এক ঘণ্টা পরেই সক্রেটিস তার নতুন বাসায় “গৃহপ্রবেশ” করে; এই বাড়িটা মাত্র একবছর আগে পালটাতে হয়েছে। ব্যাসে আর উচ্চতায় বাড়ার সময় সক্রেটিসের আবেগ বা উৎসাহ সমান তালে বেড়ে চলেছিল। দিনক্ষণ আর ঠিক মনে পড়ে না কিন্তু সক্রেটিসের অতি উৎসাহের কারণে আমাদের পরিবারে অন্তত দশ বারোদিন সমস্ত সুখশান্তি উধাও হয়ে গেছিল। সেদিন সকাল থেকেই প্রত্যেকে নিজের কাজে ব্যস্ত ছিল। বেলা বারোটা নাগাদ জানালার বারান্দা দেখে বোঝা গেছিল প্রভু তাঁর প্রাতরাশ স্পর্শ করেননি। কী এমন হল দেখার জন্য আমার স্ত্রী জানালার কাছে গিয়ে দেখেছিল, সক্রেটিস জানালার সামনে বা গুহার ভিতরেও নেই। অভিজ্ঞতা থেকে সে খাটের নীচে চোখ রেখে দেখল সেখানেও সক্রেটিস নেই। মুহূর্তের মধ্যে বাড়ির পরিবেশ গেল পালটে। সমস্ত ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজেও সক্রেটিসকে পাওয়া গেল না। প্রায় সাত বছর প্রতিদিন সকাল, দুপুর, আর বিকেলে হানা দেওয়া দাঁড়কাক দুটোর উপর আমি সন্দেহ প্রকাশ করতেই স্ত্রী আর কন্যার কাছে যথেষ্ট অপদস্থ হয়েছিলাম। তারা দু’জনেই বলল, সকালে বিস্কুট, দুপুর আর বিকেলে আলুভাজা, ভাত, খেজুর, আঙুর, একটু মাংস খায় বলে ওদেরকে এতটা নৃশংস মনে করাটা ঠিক হয়নি; আর সবচেয়ে বড়ো কথা সাত বছরের পুরোনো মালিক কখনোই এমন কাজ করতে পারে না। প্রায় চল্লিশ মিনিট পরে সক্রেটিসকে খুঁজে পেয়েছিলাম; সেই পিঠ উপুড় করে নারকেল গাছের নীচে পড়ে আছে। তাড়াতাড়ি উপরে নিয়ে এলাম। সব মালিকের মালিককে বলেছিলাম, তিনি যেন সব ঠিক করে দেন। কচ্ছপের শরীর, বহিরঙ্গ দেখে বোঝা সম্ভব নয় তার কোথাও আঘাত লেগেছে কিনা। সক্রেটিসকে দেখেও প্রথমে কিছু নজরে পড়েনি। তারপর খুঁটিয়ে দেখার পর দেখা গেল, ওর চোয়ালের পাশ থেকে রক্ত বেরিয়েছে। তখনো গলা পর্যন্ত রক্তের সরু রেখাটা টাটকা  বলেই মনে হয়েছিল। হাতে করে ওকে গুহায় ঢুকিয়ে দেওয়ার পর আমরা সবাই চিন্তা করছিলাম কী করা যায়। চোদ্দো ফুট নীচে পড়লে কচ্ছপের কী হতে পারে তা আমদের জানা ছিল না; যেখানে প্রায় সব বিষয়ের খোঁজ পাওয়া যায় সেখানেও এই নিয়ে কিছু বলা ছিল না এবং এখনো নেই। পরের দশ বারো দিন সক্রেটিস কিছুই খায়নি। পাঁচ ছদিন পর প্রকৃতির ডাকে ও যে রঙের সাড়া দিয়েছিল তাও আমাদের এতাবৎ অজানা। আমরা খুবই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। অন্যান্য মালিকদের অর্থাৎ পশুপাখিদের প্রায়ই নানা কারণে ওষুধ দেওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু টিয়াপাখির মতো ঠোঁট, আজীবন চারটে পা, মাথা আর গলার কিছুটা অংশ ছাড়া যিনি তাঁর শরীরের কিছুই দেখতে দেন না তাঁর চিকিৎসা সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা ছিল না। সেই প্রথম ওর সামনে জলের ব্যবস্থা করা হয়েছিল আর সবাই পালা করে ওকে রোদে রাখার দায়িত্ব নিয়েছিল। প্রায় একমাস পর সক্রেটিস বুঝিয়েছিল সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছে। দুর্ঘটনার পরের দিনই জানালার নীচের দিকটায় নাইলন নেট লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই নেট আজও সক্রেটিসের অতি উৎসাহে বাধা দিয়ে চলেছে। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম সবথেকে বেশি প্রাণের মালিক বলে বেড়ালের যে খ্যাতি তার একটা কারণ, যারা বেড়ালকে এই সম্মান দিয়েছিলেন তাঁরা কচ্ছপের লড়াই করা সম্পর্কে কিছুই জানতেন না।

বেড়ালের কথায় সক্রেটিসের প্রথম আন্ত-প্রজাতি সম্পর্কের কথা মনে পড়ে গেল। আমাদের বাড়িতে তখন চারটে বিড়াল ঘরের মধ্যে থাকে, বাকি আটটা রাজত্ব বিস্তারের উদ্দেশ্যে প্রায় সারাটা দিন বাইরেই কাটায়; খাওয়ার সময়টুকু ছাড়া তারা আসত না বা আসার প্রয়োজন বোধ করত না। এখন সক্রেটিসের কথাই বলব বলে ঠিক করেছি তাই অন্যদের কথা বলব না। কিন্তু সুস্মিতার নাম উল্লেখ না করে পারলাম না। আমাদের সঙ্গে এগারোটা বছর পার করার পর সুস্মিতা মারা যায় কিন্তু যাওয়ার আগে সে আমাদের পরিবারকে এমন কিছু অভিজ্ঞতা দিয়েছে যা একই সঙ্গে অবিশ্বাস্য এবং অলৌকিক। কিন্তু সেই বৃত্তান্তের জায়গা অন্য। শুধু এটুকুই বলে রাখি, সম্রাজ্ঞী সুস্মিতার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ভুশকেট (বানানে কোন “স” হবে তা আগে কখনো ভাবিনি!); আকারে ছোটো কিন্তু ভয়ানক বন্য; প্রতিক্রিয়া দেওয়ায় কৃপণ কিন্তু অত্যন্ত সতর্ক; স্বজাতি আরামপ্রিয়, এই বদনাম দূর করার জন্য নিরলস পরিশ্রমী। সেই ছাই-রঙা ভুশকেটের পুত্র সন্তান ছিল বান্টু; উচ্চতার কারণে তাকে আফ্রিকান উপজাতির নামটা দেওয়া হয়েছিল কিন্তু সে মোটেই মায়ের কালচে ভুশো রঙ পায়নি; ও ছিল ধবধবে সাদা। রাজপুত্র বান্টু ছিল ঘরকুনো, মাঝেমাঝে অতি চঞ্চল এবং নতুন কিছুর সন্ধানে অক্লান্ত। সামান্য বড়ো হওয়ার পরেই বান্টু আমাদের বিছানা, রান্নাঘর, বিভিন্ন তাক, টেবিল ও খাটের নীচ, ফ্রিজ ও আলমারির অন্দরমহল, পর্দার লাঠি, বেডসুইচ ও টিভি সম্পর্কে খবরাখবর নিতে শুরু করেছিল। দুনিয়াকে এইভাবে বান্টুর নিজের চোখে এবং থাবায় পরখ করার সময়ে একদিন আমরা দেখলাম, বান্টু নিজের ডান পা দিয়ে গুহা থেকে সক্রেটিসকে বাইরে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। পিছনে আমার কন্যার আদরসম চাপড় খেয়ে বান্টু বুঝতে পেরেছিল সে একটা দারুণ কিছু পেয়েছে কিন্তু বাড়ির অর্বাচীন সদস্যরা তাকে এই বিষয়ে কোনো সাহায্য করবে না। কাজেই দুপুরে আমার স্ত্রী চোখ বন্ধ করলে বা বাড়িতে কোনো অতিথি আসায় আমরা ব্যস্ত হয়ে থাকলে বান্টু এতটুকু সময় নষ্ট না করে সক্রেটিস-রহস্য উদ্ধারে ব্যস্ত হয়ে পড়ত। কয়েকদিন পর দেখা গেল সক্রেটিস দিব্যি গলা বের করে হাঁটাহাঁটি করছে আর বান্টু মহা উৎসাহে তাকে ঘিরে কখনো লাফাচ্ছে, কখনো থাবা দেখাচ্ছে। আমার স্ত্রী খেয়াল করেছিল, সেই থাবা তোলার সময় বান্টু কখনো নখ বের করত না। শব্দহীন সক্রেটিস এবং “ম্যাও” ও “ফ্যাঁ- -শ”, এই দুই শব্দের বাইরে অন্য কোনো শব্দ না জানা বান্টু, দুই ভিন্ন প্রজাতির একে অন্যকে নিয়ে মেতে থাকার সেই দিনগুলো কোনোদিন ভুলতে পারব না। শীতের দুপুরে বান্টুর এলিয়ে দেওয়া গায়ের উপর সক্রেটিসের ঘুমিয়ে পড়ার দৃশ্য ছিল স্বর্গীয়। এখানে বলা প্রয়োজন সক্রেটিস কিন্তু এমন সখ্যতার সুযোগে অতীতে বান্টু তার সঙ্গে যে অন্যায় করেছিল তার শোধ তুলেছিল। একদিন দেখি সক্রেটিস তার টিয়াপাখির মতো ঠোঁট দিয়ে বান্টুর কপাল থেকে একগোছা সাদা লোম উপড়ে নিয়েছে! বান্টু পাঁচ বছর বয়সে মারা যায়। তার আগে থেকেই ভাব ভালবাসাটা একটু কমে গিয়েছিল। আমার ধারণা এর কারণ আমার স্ত্রী। ভদ্রমহিলা কুকুর, বিড়াল বা পাখিদের গড়পড়তায় চেনেন, খাওয়ান, শুশ্রুষা করেন এমন নয়। প্রত্যেকের কী রুচি, কী প্রয়োজন সেটা বুঝেই তাদের সঙ্গে আদান প্রদানে অংশগ্রহণ করেন। সাধারণত তিনি একমাস দু’মাসের মধ্যেই কার কী ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য সেটি বুঝে যান।

সক্রেটিসের ক্ষেত্রে একটু বেশি সময় লেগেছিল। কাজেই বান্টু জ্ঞান হওয়ার পরেই দেখেছিল, সক্রেটিস না খেতে চাইলে আমার স্ত্রী তার পিঠের খোলার উপর আস্তে আস্তে চাপড় দিয়ে তাকে খেতে বলছে, খেয়ে নেওয়ার পর তার চারটে পা আর গলায় আঙুল বুলিয়ে আদর করছে কিংবা প্রকৃর ডাকে সাড়া দেওয়ার পর তাকে কোলে নিয়ে ভিজে কাপড় দিয়ে মুছিয়ে দিচ্ছে। মনে হয়, ল্যাজ নেই, গোঁফ নেই, দৌড়াতে পারে না এমন একজনের প্রতি এতটা আদিখ্যেতা বান্টুর ভাল লাগেনি।

সময় কখন কীভাবে পেরিয়ে যায়; কিন্তু এমন পেরিয়ে যাওয়ার সময় যদি আমাদের প্রতিদিন নতুন ঘটনা আর নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় আমরা নিঃসন্দেহে পাগল হয়ে যাব। আবার আমাদের যদি সম্পূর্ণ গতানুগতিকভাবে জীবন পার করতে হয় তাহলেও আমরা সুস্থভাবে বাঁচতে পারব না। এই নিয়মের জন্যই গত আট বছরের বেশির ভাগ সক্রেটিস তার রুচি, অরুচি, ঘুম, জেগে থাকা, হাঁটা, বসে থাকা, মাঝেমাঝে জানালা দিয়ে আকাশ দেখা, পাখিদের খেতে আসার সময় তাদের ঝগড়া শোনা, ওর সামনে দিয়ে কাঠবেড়ালি চলে গেলে চমকে ওঠা নিয়ে দিন পার করে চলেছে। আমরা এই বছরগুলোয় জানতে পেরেছি সক্রেটিস কপির পাতা, বিনস বা শিমের পাতা, একেবারে কচি বিনস, বরবটি, পাকা পেঁপে খেতে খুব ভালবাসে; মেঘ ডাকলে বা ঝমঝম করে বৃষ্টির সময় জানালার সামনে দাঁড়িয়ে হাওয়ায় ভেসে আসা বৃষ্টির গুঁড়ো গায়ে মাখতে ভালবাসে, কেউ খেয়াল না করলে সরাসরি ছাঁট গায়ে লাগলেও এতটুকু নড়ে না; কয়েকদিন অন্তর ও খুব তৃপ্তি করে ঠোঁট ডুবিয়ে জল খায়; শীতের শুরু থেকে সারাদিন চল্লিশ ওয়াটের পুরোনো দিনের হলুদ বাল্ব জ্বালিয়ে না রাখলে ওর ঠান্ডা লেগে যায়, নাক দিয়ে সর্দি পড়ে; আমার স্ত্রী ওর থাকার জায়গা পরিষ্কার করার জন্য ফুলঝাঁটা বা ভিজে ন্যাকড়া নিয়ে ওর সামনে দাঁড়িয়ে “পেট তোলো, পেট তোলো” বললে ও চারপায়ে দাঁড়িয়ে যায়; জানালার কাচে পায়ের নখ দিয়ে আঁচড়ে কান ঝালাপালা করলে বুঝতে হয় ওর সঙ্গে কথা বলতে হবে নতুবা ওকে নিজের বারান্দা থেকে নামিয়ে ঘুরতে দিতে হবে; নিঃঝুম দুপুর বা রাতের অন্ধকারে “কিঁচকিঁচ” বা “ক্যুঁই-য়িক” শব্দ শুনতে পেলে বুঝতে হয় ভয়ের কিছু নেই, সক্রেটিস নিজের মনে শব্দ করছে।

খোঁজ নিলেই জানা যাবে ইন্ডিয়ান স্টার কচ্ছপ ৩০ থেকে ৮০ বছর পর্যন্ত বাঁচে। সক্রেটিস যদি দীর্ঘায়ু হয় ওকে শেষ জীবনটা ও যে তিনজনের সঙ্গে জীবন শুরু করেছে তাদের ছাড়াই পার করতে হবে। এই ভাবনাটায় মাঝেমাঝেই মন খারাপ হয়ে যায়। মন ভালো করার জন্য ভাবি, প্রাণীরা যে আশ্চর্য উপায়ে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখে সেই উপায়ে সক্রেটিস নিশ্চয়ই সবাইকে বলবে, “এই তিনটে মানুষ অন্যের যত্ন আত্তি করতে জানে।” আমি তো মনে করি ইতিমধ্যেই সক্রেটিস এই কথা অনেকবার অনেককে বলেছে। না হলে ও আসার পর থেকে এই বাড়িতে খেতে আসা পাখিদের সংখ্যা কী করে এত বেড়ে গেল? কী করে আশেপাশের বেজি আর কাঠবেড়ালির দল কিংবা একটা ভাম বিড়াল এত নিশ্চিন্তে এই বাড়িতে আসতে শুরু করেছিল আর আজও আসে?

2 thoughts on “মাছ, গাছ, কচ্ছপ আর হনুমান সক্রেটিস ঋত্বিক

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s