অরিন্দম দেবনাথ এর সমস্ত লেখা

রাশিয়ার দক্ষিণে উরাল পর্বতমালায় কাজাকিস্থান সীমান্তের কাছে চেলিয়াবিনস্ক অঞ্চলে আছে একটি লেক বা হ্রদ। যা কারচায়, কারাচাজ বা কারাচাই নামেও পরিচিত। লেকটি পৃথিবীর সবচাইতে বিপদজনক লেকেদের অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত। লিখেছেন অরিন্দম দেবনাথ।
১৯৫১ থেকে ১৯৫৩ সালের মধ্যবর্তী সময় থেকে এই লেককে ব্যবহার করা হয়েছিল সরাসরি টেচা নদীতে পারমাণবিক অস্ত্র ও অন্যান্য তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলার পরিবর্ত বর্জ্য ফেলার জায়গা হিসেবে। ১৫ হেক্টর আয়তন বিশিষ্ট লেকটিকে বর্তমানে ফাঁপা কংক্রিটের টুকরো দিয়ে বোঝাই করে দিলেও এখনও এটিকে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলার স্থায়ী জায়গা হিসেবেই ব্যবহার করা হয়।
লেকটি শুধুমাত্র আশেপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রাণী জগতকেই বিপন্ন করে তোলেনি, বায়ুমণ্ডল আর ভূগর্ভস্থ জলকে দূষিত করে দিয়েছে। তুর্কি শব্দ ‘কারচায়’ কথার অর্থ ‘কালো জল’ বা ‘কালো খাঁড়ি’। নাম থেকেই পরিচয় পাওয়া যায় লেকের—কালো জলের হ্রদ। বর্তমানে লেকটির বিকিরণ মাত্রা প্রায় ৬০০ রেন্টজেন (roentgen)। প্রাকৃতিক সম্পদ প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের মতে, লেকটি এতটাই দূষিত যে এর জলে একঘণ্টার মতো থাকলেই মানুষ মারা যেতে পারে।
উত্তর চেলিয়াবিনস্ক অঞ্চলের ওজিয়র্স্ক এবং কিশিম (kyshym) শহরের কাছে মায়াক রাশিয়ার বৃহত্তম পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোর একটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে লাভরেন্টি বেরিয়া নামের একজন সমরবিদের তত্ত্বাবধানে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট স্ত্যালিনের সময়ে অতি সঙ্গোপনে তৈরি করা হয়েছিল এই পারমাণবিক কেন্দ্রটি। এটি আসলে ছিল সোভিয়েত পারমাণবিক বোমা প্রকল্প। অল্প কয়েক বছরের মধ্যে আমেরিকাকে টেক্কা দেবার মতো পারমাণবিক অস্ত্রও তৈরি করে ফেলেছিল এই কেন্দ্র। এই কেন্দ্র থেকে তৈরি পারমাণবিক বোমা ১৯৪৯ সালের ২৯ আগস্ট প্রথম পরীক্ষা করা হয়েছিল অতি সঙ্গোপনে। প্রকল্পটি তৈরি করতে আনুমানিক ৩,৩০,০০০ লোককে কাজে লাগানো হয়েছিল। এদের মধ্যে ১০,০০০-এর মতো লোক ছিল দক্ষ প্রযুক্তিবিদ। সাইবেরিয়ার ‘গুলাগ’ শ্রম তথা বন্দি শিবিরের হাজার হাজার বন্দিকে বাধ্য করা হয়েছিল ইউরেনিয়াম খনিতে কাজ করতে। এদের কাজে লাগানো হয়েছিল ইউরেনিয়াম প্রসেসিং প্লান্ট ও সেমিপালাটিনস্ক এবং নোভায়া জেমলিয়া দ্বীপপুঞ্জে বোমা পরীক্ষা করার সুবিধা গড়ে তুলতে। যাই হোক, মায়াকের কার্যক্রম উত্তর চেলিয়াবিনস্ক এবং উরাল অঞ্চলে দূষণের উত্স হয়ে ওঠে।
১৯৯০ সালে জনসাধারণ জানতে পারে এর অস্তিত্বের কথা। ১৯৯২ সালে রাশিয়ার তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট ইয়েলতসিন এক হুকুমনামায় এই অঞ্চল সকলের জন্য খুলে দেন। মায়াক শুধুমাত্র রাশিয়ার পারমাণবিক প্রকল্পের মূল ভিত্তিই ছিল না, এটি ছিল রাশিয়ার প্লুটোনিয়াম তৈরির একটি ক্ষেত্র।
১৯৫৭ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর এখানে প্রথম দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু তদানীন্তন ইউ.এস.এস.আর কর্তৃপক্ষ বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতে দেননি। চেরনোবিল (ইউক্রেনিয়ান – ইউ.এস.এস.আর) এবং ফুকুশিমা (জাপান) বিপর্যয়ের পর এটিকে ইতিহাসের তৃতীয় মারাত্মক পারমাণবিক দুর্ঘটনা বলে মনে করা হয়। একটি পরমাণবিক বর্জ্য সংরক্ষণের পাত্রে বিস্ফোরণ ঘটেছিল। এই কেন্দ্র থেকে বহুদূরের ২২টি গ্রামের তেজস্ক্রিয় বিকিরণে চূড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আনুমানিক দশ হাজার মানুষকে সরিয়ে নিতে পারলেও তেজস্ক্রিয় বিকিরণে চূড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল অগণিত গ্রাম আর গ্রামের মানুষজন। ২০০ লোকের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল আর বিস্তৃত অঞ্চলের জল ও বাতাস দূষিত হয়েছিল মারাত্মকভাবে। প্রায় তিন দশক এই দুর্ঘটনার খবর চাপা ছিল বহির্বিশ্বের কাছে।

এই পারমাণবিক কেন্দ্রটি তৈরির সময় পারমাণবিক পদার্থবিদ্যায় রাশিয়ানদের দক্ষতা বা জ্ঞান কমই ছিল। ফলে প্রথম থেকেই কেন্দ্রটি নিরাপত্তাজনিত অভাবে ভুগছিল। বিশেষ করে পারমাণবিক বর্জ্য নিয়ে। অতি তেজস্ক্রিয় দূষণ প্রধানত পারমাণবিক প্রযুক্তির অভাব, পরিবেশের উপর তেজস্ক্রিয় পদার্থের প্রভাব সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব এবং বর্জ্য নিষ্পত্তির নিরাপদ পদ্ধতির অভাবের কারণে ঘটেছিল। শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণকে বিন্দুমাত্র বিবেচনা করা হয়নি। ১৯৫৩ সালে মাটির ২৭ ফুট নীচে কংক্রিটের ঘর বানিয়ে তার মধ্যে ইস্পাতের ট্যাংক বসিয়ে পারমাণবিক বর্জ্য রাখার হত। তেজস্ক্রিয় বর্জ্যকে ঠান্ডা রাখার জন্য। ঠান্ডা করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
১৯৫৭ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর মাটির নীচের একটি বর্জ্য রাখার ট্যাংককে ঠান্ডা রাখার যন্ত্র বিকল হয় ও ট্যাংকে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের অভিঘাতে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট এবং অ্যাসিটেট-এ বাতাস ছেয়ে যায়। যদিও বিস্ফোরণের পরপরই কেউ মারা যায়নি। মারা যেতে শুরু করেছিল খানিক পরে জল ও বায়ুদূষণ শুরু হতে।
তেজস্ক্রিয় পদার্থ ধারণকারী মৃত্যু মেঘ হাওয়ার টানে উত্তর-পূর্বদিকে বইতে শুরু করে। প্রায় কুড়ি হাজার বর্গ কিলোমিটার অঞ্চলের জল আর বাতাস দূষিত করে দিয়েছিল এই মেঘ। যেহেতু চূড়ান্ত গোপনীয়ভাবে এই কেন্দ্রটি চলত, তাই জনসাধারণকে জানানোই হয়নি এই দুর্ঘটনা বা তার ভয়াবহতা সম্পর্কে। বস্তুত এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে উদ্ধারের কাজ শুরু হয়েছিল প্রায় এক সপ্তাহ পরে। প্রকৃতপক্ষে কত লোক যে মারা গিয়েছিল বা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল তা আজও জানা যায়নি। কারণ, কোন পরিসংখ্যান রাখেনি কর্তৃপক্ষ।
রাশিয়ান সরকার কিছু না জানালেও পরের বছর পশ্চিমের কিছু সংবাদপত্রে রাশিয়ার কোন এক জায়গায় পারমাণবিকে প্ল্যান্টে বিস্ফোরণ হয়েছে এবং এর ফলে ভয়াবহ বায়ু ও জলদূষণ হয়েছে বলে খুব ছোটো আকারে কিছু খবর বেরিয়েছিল। ১৯৫৯ সালের ১৭ মার্চ অস্ট্রিয়ার, ভিয়েনার সংবাদপত্র ডাই প্রেসে (Die Presse) এই ঘটনার খানিক বিবরণ প্রকাশ পেয়েছিল। ১৯৭৬ সালে এই দুর্ঘটনার অল্প হলেও খানিক বিস্তারিত ভয়াবহতার কথা লিখেছিলেন রাশিয়ান কৃষিবিদ, ইতিহাসবিদ এবং ভিন্নমতাবলম্বী ঝোরেস মেদভেদেভ, তাঁর প্রকাশনা নিউ সায়েন্টিস্ট-এ। যদিও আসলে কতজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন তিনিও বলতে পারেননি।
১৯৬৭ সালে এই কেন্দ্রে আরও একটি বড়োসড়ো তেজস্ক্রিয় দুর্ঘটনা ঘটেছিল। ফলস্বরূপ অঞ্চলের উত্তাপ এত বেড়ে গিয়েছিল যে সে-বছর শীতকাল ছিল তুষারহীন। লেকের জল শুকিয়ে গিয়েছিল পুরোপুরি। লেকের জলে ডুবে থাকা বর্জ্য জল শুকিয়ে যাওয়ায় হাওয়ার ছোঁয়ায় ও টানে ছড়িয়ে পড়েছিল প্রায় ১৮০০ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে। পরিবেশ ও প্রাণীজগতে তার প্রভাব কী পড়েছিল জানা যায়নি সবকিছু গোপনীয়তার মোড়কে থাকায়। অনুমান, বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রায় পাঁচ লক্ষ লোক ‘মৃত্যু-মেঘ’-এ চূড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
তবে এই দুর্ঘটনার পর সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে এই কারচায় লেককে পুরোপুরি তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলার কাজে ব্যবহার করা হবে, পাশাপাশি কিছু নিরাপত্তাজনিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। লেকের অনেকটাই ঢেকে দেওয়া হয়েছিল ফাঁপা কংক্রিটের বাক্স দিয়ে যাতে কোনোভাবে এই বর্জ্য বাতাসের সংস্পর্শে আসতে না পারে। পাশাপাশি লেকের পাশে গড়া হয়েছে বাঁধ দিয়ে আর একটি জলাশয়, যাতে লেকের যে অংশে বর্জ্য ফেলা হবে তা কখনোই জলশূন্য না হয়ে যায়। কিন্তু যা ক্ষতি হয়ে যাবার তা হয়েই যাচ্ছিল ও আজও যাচ্ছে। ভয়ংকর দূষিত জল মাটির ভেতর দিয়ে চুইয়ে গিয়ে মিশছে ভূগর্ভস্থ জলে। কলুষিত করে রেখেছে বিস্তীর্ণ অঞ্চল। জনবসতি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে দূরদূরান্তে। বিজ্ঞানীরা নিরন্তর কাজ করে চললেও পারমাণবিক দূষণ থেকে মুক্তি পাবার কোনও সহজ উপায় খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ছবি – ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত