বিচিত্র দুনিয়া-ঝাড়ুদারি-অরিন্দম দেবনাথ-বর্ষা২০২৩

অরিন্দম দেবনাথ   এর সমস্ত লেখা

কাককে আমরা জানি ঝাড়ুদার পাখি বলে। কিন্তু রীতিমতো শিক্ষা দিয়ে এক ঝাঁক পাখিকে দিয়ে শহর পরিষ্কার করানো সহজ নয়। লিখেছেন অরিন্দম দেবনাথ।

bichitra85 (1)

সাফাইর কাজটা করার কথা পুরসভার কর্মীদের। কিন্তু সুইডেনের একটি শহর সিগারেটের টুকরো কুড়িয়ে শহর পরিষ্কার করাতে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজে লাগিয়েছে কাকবাহিনী। অবশ্যই মজুরির বিনিময়ে। আর মজুরিটা হল খাবার!

সুইডেনের স্টকহোমের কাছের একটা শহর হল সোডারটালেজ। প্রায় এক লক্ষ মানুষের বাস এই শহরে।  সেখানেই কাকেদের এক বিশেষ প্রজাতি ক্যালেডিয়ান ক্রোদের (করভিড পরিবারভুক্ত) প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে লাগানো হয়েছে হাঁটার পথের পাশে আর পার্কে ধূমপায়ীদের ফেলে দেওয়া সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ঠোঁটে করে তুলে নিয়ে গিয়ে বিশেষ পাত্রে ফেলে শহরকে পরিষ্কার রাখতে। কাকের দল এই কাজটা করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মজুরিও পেয়ে যায়। একদিকে মেশিনে সিগারেটের টুকরো ঢোকায় আর অন্য দিকে মেশিন থেকে বেরিয়ে আসে খাবারের টুকরো।

‘করভিড ক্লিনিং’-এর পরিকল্পনা যাঁর মাথা থেকে বেরিয়েছিল সেই ক্রিশ্চিয়ান গুন্থার-হ্যনসেন দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘এই বুনো পাখিগুলো কিন্তু স্বেচ্ছায় এই কাজটা করে!’

সুইডেন এমনিতে খুবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেশ। নাগরিকরা পরিছন্নতা বিষয়ে অতি সচেতন। কিন্তু সিগারেটের টুকরো ছুড়ে ফেলার সময় এদের মাথা থেকে পরিচ্ছন্নতার কথা উড়ে যায়। সুইডেনের রাস্তায় ফেলা ময়লার ৬২ শতাংশই হল সিগারেটের টুকরো। ‘দ্য কিপ সুইডেন টাইডি ফাউন্ডেশন’ এক সমীক্ষায় দেখেছে, বছরে এক বিলিয়নের বেশি (একশো কোটি) সিগারেটের টুকরো রাস্তায় ছুড়ে ফেলে সুইডেনবাসী। ঠান্ডার দেশ, একটু বেশি মাত্রায় ধূমপান করে সেখানকার লোক। ২০২১ সালের হিসেবে মাত্র এক কোটির সামান্য বেশি জনসংখ্যা ছিল সুইডেনের।

এত প্রাণী থাকতে ঝাড়ুদারির কাজে কাক কেন?

কারণ, কাক স্বভাব-ঝাড়ুদার। আর করভিড কাক অতীব বুদ্ধিমান। এরা কাজে দক্ষ আর নিজেরাই সমস্যা সমাধানে সক্ষম। এদের জন্য এমনভাবে যন্ত্রপাতি তৈরি করা হয়েছিল যা তারা সহজেই ব্যবহার করতে শিখে যায়। গুন্থার-হ্যনসেন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ‘করভিড কাকদের শেখানো সহজ, আর এই কাকেরা একে অপরকে দেখে শিখে নেয় অনায়াসে। তার থেকেও বড়ো কথা, এরা ভুলে করেও বিপদজনক আবর্জনায় মুখ দেয় না। নিজস্ব অনুভূতি দিয়ে এরা টের পেয়ে যায় কোনটা এদের পক্ষে নিরাপদ আর কোনটা বিপদজনক। ফলে এদের দিয়ে কাজটা করানোতে প্রাণী জগতের দিকে কোনও ঝুঁকি নেই।’

প্রাথমিক পর্যায়ে কাকদের দিয়ে ঝাড়ুদারির কাজ সফল হলে আস্তে আস্তে দেশের অন্যান্য পুরসভা অঞ্চলে এই প্রকল্প শুরু করা হবে।

bichitra85 (2)

পুরসভার বর্জ্য কৌশলবিদ টমাস থার্নস্ট্রম-এর মতে, সমস্ত নির্ভর করবে এই প্রজেক্ট চালানোর মতো অর্থের সংস্থান হবে কি না। তবে নিঃসন্দেহে কাকেদের নিয়ে করা এই প্রকল্পের ফলে শহর পরিষ্কার রাখার খাতের  অন্তত ৭৫ শতাংশ খরচ বাঁচবে। কারণ, মানুষের থেকে কাকেদের জন্য করা দৈনন্দিন খরচ অনেক কম। একজন মানুষকে যদি একটা সিগারেটের টুকরো তোলা বাবদ ৮০ পয়সা দিতে হয়, সেখানে একটা কাকের কুড়িয়ে আনা সিগারেটের ফিল্টার পিছু খরচ ২০ পয়সা। কিন্তু সমস্তটাই নির্ভর  করছে কাকেরা কতটা সিগারেটের টুকরো কুড়িয়ে আনছে তার ওপর। বন্য পাখি তো আর মানুষের চাহিদা শুনে উড়বে না। সে উড়বে নিজের খেয়ালখুশি মতো।

কাকেদের খানিক শিক্ষা দিয়ে সিগারেটের ‘বাট’ তোলানোর পরিকল্পনা মাথায় আসে যখন ইন্টার-অ্যাকশন ডিজাইনার রুবেন ভ্যান ডার ভ্লুটেন এবং এক্সপেরিমেন্ট ডিজাইনার বব স্পিকম্যান জোশুয়া ক্লেইন নামে এক ব্যক্তির দেখা পান। জোশুয়া ক্লেইন কাকেদের ট্রেনিং দিয়ে মুদ্রা সংগ্রহের খেলা দেখাত। ভ্যান ডার ভ্লুটেন এবং স্পিকম্যান, জোশুয়ার খেলা দেখানো দেখে কাকেদের জন্য বিশেষ ধরনের ‘ক্রোবার’ ডিজাইন করেন। এমন ‘ক্রোবার’ যার একদিকে সিগারেটের ‘বাট’ ঢোকালে অন্যদিকে থেকে খাবার বেরিয়ে আসবে।

‘ক্রোবার’-এ সিগারেটের ‘বাট’-এর জায়গায় অন্য কিছু ঢুকিয়ে দিলে কিন্তু খাবার বেরোবে না। কাকেরা খানিক ধূর্ত, কিন্তু মানুষ তার থেকেও ধূর্ত! ক্রোবারের নীচে একই ক্যামেরা লাগানো আছে। সেই ক্যামেরা কাকের ঢোকানো বস্তুটিকে সিগারেটের বাট বা ফিল্টার হিসেবে স্বীকৃতি দিলে তবেই খাবার বেরিয়ে আসবে। এটি এই উদ্দেশ্য নিয়ে করা যাতে, কাকেরা শুধু সিগারেটের অংশই কুড়িয়ে এনে শহর পরিষ্কার রাখে।

পাখিদের দিয়ে ময়লা পরিষ্কার করার প্রয়াস অবশ্য এই প্রথম নয়। পশ্চিম ফ্রান্সের পুই ডু ফোউ (Puy Du Fou) থিমপার্ক, যাকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ থিমপার্ক বলে মানা হয়, সেখানে ২০১৮ সালে ৬টা কাককে ট্রেনিং দিয়ে সিগারেটের টুকরো তোলানো শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকে।

দুনিয়ায় এত ময়লা থাকতে তাহলে শুধুমাত্র সিগারেটের ফিল্টারের অংশ তোলা নিয়ে কেন এত তোড়জোড়?

ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিক হেলথ-এ প্রকাশিত একটি সমীক্ষা অনুসারে, সিগারেটের ফিল্টার (বাট) নন-বায়োডিগ্রেডেবল বর্জ্যের ভয়ংকর রূপ। এগুলো এতই ছোটো যে চট করে খুঁটে তুলে পরিষ্কার করা মুশকিল। রাস্তা থেকে ড্রেন দিয়ে এরা পৌঁছয় নদী-সমুদ্রে। এগুলো জলেতেও মেশে না। অসংখ্য মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর পেটে খাবার মনে করে খেয়ে ফেলা সিগারেটের ‘বাট’ পাওয়া গেছে। যা ওই প্রাণীগুলোর জন্য বিষাক্ত। দেখতে ছোটো হলেও আদতে এই নিরীহ বর্জ্যগুলো মারাত্মক ক্ষতি করে চলেছে জীবজগতের।

অনুমান, দুনিয়া জুড়ে বছরে সাড়ে চার ট্রিলিয়ন সিগারেটের টুকরো ছুড়ে ফেলা হয় এখানে ওখানে। থার্নস্ট্রম হাসতে হাসতে মন্তব্য করেছিলেন, পাখিদের শিখিয়ে সিগারেটের টুকরো কুড়িয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলাতে পারলেও মানুষকে ওই কাজটা করতে শেখানো অসম্ভব!

ছবি – ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

 

Leave a Reply