FUN-বিজ্ঞান- ভারত ও বিশ্বের বিজ্ঞানী- বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন-অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়-শরৎ ২০২৩

ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-সব লেখা একত্রে 

bigganbenjaminfranklin (1)

প্রথাগত বিজ্ঞান শিক্ষায় দীক্ষিত না হয়েও স্রেফ কৌতূহল, অনুসন্ধানী মন আর অধ্যাবসায় ভরসা করে তাক লাগানো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করে বিশ্বের দুনিয়ায় যে ক’জন নাম করেছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বা বেন ফ্রাঙ্কলিন। স্কুলের পাঠ্যবইতে বেঞ্জামিনের ছবি বেশ পরিচিত। অনেকেই জানে, ইনি ঝড়বাদলের দিনে আকাশে উড়িয়েছিলেন ঘুড়ি, আর বন্দি করেছিলেন আকাশের বিদ্যুত। প্রমাণ করেছিলেন মেঘের মধ্যে সৃষ্ট বাজ আসলে বৈদ্যুতিক ক্রিয়া।

তবে তাঁর জীবনের পথ চলাটা মসৃণ ছিল না। নতুন কাজ করার উদ্দীপনাই তাঁকে সফল করে তুলেছিল। আজও দুনিয়ার এক স্মরণীয় ব্যক্তি রয়ে গিয়েছেন বেন ফ্র্যাঙ্কলিন।

১৭০৬ সালে আমেরিকার বোস্টন শহরে জন্ম হয় বেঞ্জামিনের। দরিদ্র পরিবারে মোট সতেরটি ভাইবোনের সঙ্গে বড়ো হতে থেকে তাঁর স্কুলের শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়নি। ১০ বছর বয়সেই পড়াশুনোয় ইতি টেনে, বড়ো ভাইয়ের ছাপাখানায় শিক্ষানবিশি করতে থাকেন বেঞ্জামিন। সেই ছাপাখানা থেকে একটি সংবাদপত্র প্রকাশিত হত। কয়েকবছরের মধ্যে চটজলদি কাজ শিখে নিয়ে একদিন বেঞ্জামিন কাজের একঘেয়েমি কাটানোর জন্য লেখালেখি শুরু করেন।

শুধু লিখলে হবে না, সেই লেখা দশজনকে পড়াতেও হবে। তাই তিনি ‘ডগউড’ ছদ্মনামে লিখে ভাইয়ের ছাপা পত্রিকাতে লেখা ডাকে ফেলতে থাকেন। ছদ্মনাম নেবার কারণ ছিল, ছাপাখানার মালিক, বেঞ্জামিনের বড়ো ভাইয়ের চণ্ডালে রাগ। বৈমাত্রেয় ভাইকে খুব সুনজরে দেখত না তাঁর মালিক। 

বেশিদিন নিজেকে ছদ্মনামের আড়ালে রাখতে পারলেন না বেঞ্জামিন। তাঁর লেখা এত জনপ্রিয় হল যে বড়ো ভাই লেখককে খুঁজতে বেরিয়ে আসল সত্য আবিষ্কার করে গেল বেজায় চটে। ধরা পড়ে গিয়ে ভাইয়ের হাতে প্রচণ্ড মার খেলেন বেঞ্জামিন। এমনকি ভাইয়ের ভয়ে বাড়ি থেকে পালাতে হল তাঁকে। বোস্টন থেকে ফিলাডেলফিয়া শহরে পালিয়ে গেলেন সতের বছরের তরুণ বেঞ্জামিন। তারপর সেখান থেকে লন্ডন পাড়ি দিলেন। লন্ডন শহরে পেটের তাগিদে শুরু করলেন ছাপাখানায় কাজ করা। এই একটি কাজই তিনি তখন জানতেন। লন্ডনে তখন ছাপাখানা ক্রমশ উন্নতি করছে। নতুন নতুন ছাপা মেশিন আসছে বাজারে। খুব তাড়াতাড়ি বেঞ্জামিন ছাপাখানার জগতে কাজ শিখে বেশ নাম-টাম করে ফেললেন।

লন্ডন থেকে ছাপার আধুনিক কাজ শিখে ফিলাডেলফিয়া ফিরে এলেন বেঞ্জামিন। মাত্র ২২ বছর বয়সে সেখানে নিজের ছাপাখানা খুললেন। অধ্যবসায় আর উৎসাহ প্রবল থাকায় খুব শীগগির বেঞ্জামিনের ছাপাখানা নাম করে ফেলল। কিছুদিনের মধ্যে তিনি ‘পেনসিলভানিয়া গেজেট’ নামের একটি খবরের কাগজ নিজের ছাপাখানা থেকে ছাপতে শুরু করলেন। লেখার লোক পাওয়া যাচ্ছে না? কুছ পরোয়া নেহি— বেঞ্জামিন আবার আগের মত নানা ছদ্মনামে লিখতে শুরু করলেন কাগজে। তাতেও মন ভরল না। প্রকাশ করলেন “পুওর রিচার্ড্‌স্‌ এ্যলমানাক” নামের বাৎসরিক একটা পত্রিকা। খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠল সেই পত্রিকা, কারণ প্রতিটি সংখ্যার বিভিন্ন প্রবন্ধ উচ্চ পর্যায়ের ব্যঙ্গাত্মক হাস্যরসে পরিপূর্ণ ছিল।

বেঞ্জামিনের সঙ্গে সম্পর্ক হল তাঁর বাড়িওয়ালীর মেয়ের। কিন্তু ডোবেরা ছিল স্বামী পরিত্যক্তা এক রমণী। কাজেই সামাজিক নিয়ম অনুযায়ী বেঞ্জামিন তাঁকে বিয়ে করতে পারলেন না। তাঁদের সন্তানরা পেল না সামাজিক বৈধতা। আমেরিকার উপনিবেশগুলোতে গুটি বসন্তের সংক্রমণ সেই সময়ে মাহামারির আকার ধারণ করেছিল। বেঞ্জামিন ও ডেবোরার প্রথম পুত্র ছোঁয়াচে রোগে বাল্যকালেই মারা যায়। কন্যা ও অপর পুত্রটি বড়ো হতে থাকে উপযুক্ত শিক্ষা পেয়ে।

ছাপাখানা থেকে প্রচুর অর্থ প্রাপ্তি হতে থাকলে বেঞ্জামিন যথেষ্ট ধনী হয়ে ওঠেন। ফিলাডেলফিয়ায় তাঁর প্রতিপত্তি বাড়তে থাকে। নিজের খেয়ালেই বেঞ্জামিন সামাজিক সেবামূলক কাজে মন দেন। তাঁর প্রথম সামজিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল ফিলাডেলফিয়ায় একটি পাঠাগার স্থাপন। তখনো সেই শহরে ভালো পাঠাগার ছিল না। শহরের দমকল বিভাগ খুলে ফেললেন বেঞ্জামিন। তারপর তাঁর খেয়ালে স্থাপিত হল ‘আমেরিকান ফিলসফিকাল সোসাইটি’। এই সংস্থা খোলার আগে পর্যন্ত তাঁর মনে যে সুপ্ত এক বিজ্ঞানী লুকিয়ে ছিল, কেউ জানত না। হয়ত ধীরে ধীরে বয়সের সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতা ও যুক্তিবাদী মন তাঁকে বিজ্ঞানের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে সাহায্য করেছিল। এই সোসাইটি থেকে প্রকাশিত জার্নালে ছাপা হতে লাগল বিজ্ঞান বিষয়ে প্রবন্ধ। বেন নিজেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখে ফেলেন।

ছাপাখানার ব্যাবসা বেঞ্জামিনকে উদ্বৃত্ত অর্থ দিতে থাকলে তিনি কৌতূহলবশত নানা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নিয়ে মাথা ঘামাতে থাকেন। ঘর গরম রাখার জন্য যে চুল্লি ফিলাডেলফিয়া শহরে ব্যবহার করা হত, তা থেকে প্রায়শই ঘরে আগুন লাগত। বেঞ্জামিন একটি বিশেষ স্টোভ তৈরি করেন, যাতে আগুন লাগার সম্ভাবনা ছিল না। চিত্তাকর্ষক এই উদ্ভাবন খুব জনপ্রিয় হয়। অনেকে বেঞ্জামিনকে “ফ্র্যাঙ্কলিন স্টোভ” পেটেন্ট করতে পরামর্শ দেন। কিন্তু অর্থের মোহ বেঞ্জামিনকে আকর্ষণ করতে পারেনি, তাই তিনি এই স্টোভের পেটেন্ট করতে অস্বীকার করেন। ফলে অন্য অনেক স্টোভ বানাবার কোম্পানি বাজারে এই ধরণের স্টোভ এনে লাভবান হতে থাকে।

bigganbenjaminfranklin (2)

ফ্র্যাঙ্কলিন স্টোভ

এরপর তিনি জলে সাঁতার কাটার সুবিধার জন্য এক বিশেষ আকৃতির পাখনা ডিজাইন করেন। এই পাখনা দুই হাতে লাগিয়ে নিলেই জল কাটা সহজ হত।  এতেও তাঁর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠে।

bigganbenjaminfranklin (4)

চশমা নিয়ে তাঁর খুব কৌতূহল ছিল। বানিয়ে ফেললেন “বাই ফোকাল লেন্স”, যার সাহায্যে দূরের আর কাছের দৃশ্য একই চশমার সাহায্যে দেখা যেত। এটার পেটেন্টও তিনি করলেন না।

ইতিমধ্যে ইলেক্ট্রিসিটি নিয়ে অনেক বিজ্ঞানী পরীক্ষা নিরীক্ষা করে চলেছিলেন। বেঞ্জামিন প্রকাশনার জগতে থাকার কারণে সেইসব গবেষণা সম্বন্ধে অবহিত ছিলেন। ফলে তিনি ইলেক্ট্রিসিটি নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেন। তিনি জানতেন, বৃষ্টির দিনে আকাশ থেকে যে বাজ পড়ে, সেটি আসলে প্রাকৃতিক কারণে সৃষ্ট বিদ্যুত। আকাশে ঘুড়ি উড়িয়ে বাজ ধরার ছবি, যা আমরা সচরাচর বিজ্ঞান বইতে দেখে থাকি, সেই কারণেই বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন আজও পৃথিবীতে একটি অতি পরিচিত নাম।  কিন্তু এটি তাঁর বহু মূল্যবান কাজের একটি মাত্র।

bigganbenjaminfranklin (3)

বেঞ্জামিন ঝড়ের রাতের সুযোগ খুঁজছিলেন। তৈরি রেখেছিলেন সিল্কের কাপড়ে বানানো ঘুড়ি, শনের সুতো, সিল্কের সুতো আর একটি “লিডেন জার”। সিল্কের ঘুড়ির মাথায় একটা লোহার রড লাগিয়ে দিলেন বেঞ্জামিন। ঘুড়ির সঙ্গে প্রথমে শনের সুতো, তারপর সিল্কের সুতো লাগিয়ে দেওয়া হল।

(Leyden Jar এটি একটি স্থির তড়িৎ সংরক্ষণ করার খুব সহজ যন্ত্র। যে কোনও ইলেকট্রিকাল সার্কিটে যে Capacitor লাগানো থাকে, এই যন্ত্র তার উত্তরসূরি। একটি কাচের বোতলে বাইরে ও ভিতরে দুটি ধাতুর পাত লাগানো থাকে এই যন্ত্রে। ধাতুর পাত দুটির একটিকে postive ও অন্যটিকে negetive charge করা হয়। পাত দুটিকে বাইরে থেকে তার দিয়ে জুড়ে দিলে তড়িৎ প্রবাহিত হয়। এই সরল যন্ত্রটি ব্যবহার করে স্থির তড়িতের উপর বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়।)

biggangalvani (1)

সেদিন ছিল ১৭৫২ সালের জুন মাসের এক অপরাহ্ণ। ঝড় এল। বৃষ্টি শুরু হল। বেঞ্জামিনের ঘুড়ি আকাশে উড়ল। ঘুড়িতে লাগানো লোহার রড বৃষ্টি ভেজা বায়ুমণ্ডলের ঋণাত্মক তড়িৎ সংগ্রহ করল, শনের সুতো ভিজে যাওয়ায় সেই সুতো তড়িৎ পরিবাহিত করল। শনের সুতো লাগানো ছিল সিল্কের সুতোয়, সেটি বেঞ্জামিনের হাতে ছিল। শনের সুতোর মধ্যে দিয়ে তিনি একটা সাধারণ চাবি ঝুলিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল চাবিটির সঙ্গে সুতোর বিকর্ষণ হচ্ছে।  বেঞ্জামিন বুঝে গেলেন যে, ঘুড়ি আকাশে স্থির তড়িৎ সঞ্চয় করছে, সুতোর মধ্যে দিয়ে সেই বিদ্যুত পরিবাহিত হচ্ছে। চাবির প্রান্তে নিজের হাতটা কাছে আনতেই একটা ইলেকট্রিক স্পার্ক হল। বেঞ্জামিন তড়িতাহত হলেন না, কারণ বিদ্যুতের পরিমাণ কম ছিল। তিনি বুঝে গেলেন, হাতের ধনাত্মক স্থিরতড়িৎ চাবির ঋণাত্মক তড়িতের সঙ্গে আকর্ষিত হবার ফলে স্পার্ক সৃষ্টি হচ্ছে। বেঞ্জামিনের পরীক্ষা সফল হল। তিনি এবার ঘুড়ির সিল্কের সুতোর বেঁধে দিলেন লিডেন জারের ধাতুর পাতে। জারে বিদ্যুত সংরক্ষিত হল।

এবার দেখা যাক, তাঁর পরীক্ষায় কী জানা গেল। বোঝা গেল আকাশ থেকে যে বাজ পড়ে বাড়ি বা গাছের উপর পড়ে ক্ষতি করত, অনেক সময়ে নিয়ে নিত প্রাণ, তা আসলে হাই ভোল্টেজ ইলেক্ট্রিসিটি। ভাগ্যক্রমে সেদিন বেঞ্জামিনের ঘুড়ির উপর বাজ পড়েনি। যদি তা হত, সিল্কের সুতোর সাহায্যে বিদ্যুত পরিবাহিত হয়ে তৎক্ষণাৎ বেঞ্জামিন বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে মারা যেতেন। আসলে বায়ুমণ্ডলে মেঘলা দিনে ঋণাত্মক তড়িৎ জমা হয়। সেই তড়িৎ ঘুড়ি থেকে সিল্কের সুতো বেয়ে লিডেন জারে এসে ধরা দিয়েছিল বেঞ্জামিনের পরীক্ষায়।

বেঞ্জামিনের হাতে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হয়ে গেল – লাইটনিং রড বলে আমাদের কাছে যা অতি পরিচিত। এই রড লাগানো থাকার ফলে উঁচু বাড়ি ঘরের উপর বাজ পড়লেও বাড়ির ক্ষতি হয় না, কারণ সেই ধাতব রড বেয়ে সোজা বিদ্যুত চলে যায় মাটিতে। বেঞ্জামিনের ঘুড়ির পরীক্ষা নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় রয়্যাল সোসাইটির জার্নালে। কিন্তু পরীক্ষার বিশদ বিবরণ তিনি লেখেননি। আদৌ তিনি ঘুড়ি উড়িয়েছিলেন, না নিছক বুদ্ধি দিয়েই এই ঘটনার ব্যখ্যা করেছিলেন, সেই নিয়ে মতান্তর আছে। অবশ্য পরবর্তীকালে বিজ্ঞানী জোসেফ প্রিস্টলেকে তিনি তাঁর ঘুড়ি ওড়ানোর গল্প শুনিয়েছিলেন এবং প্রিস্টলের লেখা বইতে বেঞ্জামিনের ঘুড়ির পরীক্ষার কথা জানা যায়।  

bigganbenjaminfranklin (5)

ফ্র্যাঙ্কলিন রড

ব্যস্ত কর্মজীবন থাকা সত্ত্বেও বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন রাজনীতিতে সমান অংশগ্রহণ করেন। আমেরিকার স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে তিনি একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। স্বাধীনতার পর আমেরিকার সংবিধানে তার হস্তাক্ষর দেন। ৮৪ বছর বয়সে অসংখ্য মানুষের ভালবাসার পাত্র বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন পেনসিলভানিয়াতেই মারা যান। আমেরিকার প্রথম বিজ্ঞানী হিসাবে তাঁকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং তাঁর সম্মানার্থে পেনসিলভানিয়াতে গড়ে তোলা হয় একটি বৈজ্ঞানিক সংগ্রহশালা, যার নাম ফ্র্যাঙ্কলিন ইন্সটিটিউট।  আমেরিকান ১০০ ডলারের নোটে আজও বেন ফ্র্যাঙ্কলিনের ছবি দেখতে পাওয়া যায়।

bigganbenjaminfranklin (1)

জয়ঢাকের  বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

 

Leave a Reply