বৈজ্ঞানিকের দপ্তর তেজষ্ক্রিয় ভদ্রমহিলাগণ- নিউক্লিয় বিজ্ঞানে নারী (৩) লিজে মাইটনার, স্টেফানি হরোভিৎজ, এডা হিচিন্স ও এলেন গ্লেডিচ -গৌতম গঙ্গোপাধ্যায় বসন্ত ২০২০

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়ের আরো লেখাঃ দেড়শো বছর আগের এক সূর্যগ্রহণের গল্প, স্বর্ণযুগের কাহিনি, কৃষ্ণগহ্বর, ব্যতিক্রমী বিন্দু ও স্টিফেন হকিং , তেজষ্ক্রিয় ভদ্রমহিলাগণ ১ম পর্ব,  তেজষ্ক্রিয় ভদ্রমহিলাগণ ২য় পর্ব হ্যারিয়েট ব্রুক্‌স্‌

(৩)

নিউক্লিয়াসঃ কামানের গোলার প্রত্যাবর্তন

রাদারফোর্ড লিখেছিলেন, এ যেন একটা পাতলা কাগজের দিকে কামানের গোলা ছুঁড়লাম আর গোলাটা কিনা কাগজে ধাক্কা মেরে ছিটকে এসে আমার গায়েই লাগল! গোলাটা কী, আর কাগজটাই বা কী?
নিউক্লিয়াস থেকে যে আলফা কণা বেরোয় তার গতিবেগ প্রতি সেকেন্ডে দশ হাজার কিলোমিটারের থেকেও অনেক বেশি হতে পারে। ম্যানচেস্টারে রাদারফোর্ড তাঁর দুই ছাত্র হান্স গাইগার ও আর্নেস্ট মার্সডেনকে এই তীব্র বেগের আলফা কণা পাতলা সোনার পাতে ধাক্কা মারলে কী হবে দেখতে বললেন। সোনা কেন? কারণ সোনার পাতকে পিটিয়ে খুব পাতলা করা যায়, সুতরাং আলফা কণা পাত পেরোনোর সময় দু-একটার বেশি পরমাণুর মুখোমুখি হবে না। আগেই পরমাণু বিষয়ে টমসনের মডেলের কথা বলেছি, সেখানে ধরে নেওয়া হত পুডিংয়ের মতো পরমাণুর মধ্যে কিসমিসের মতো ইলেকট্রনগুলো ইতস্তত ছড়িয়ে আছে। এর নাম ছিল প্লাম পুডিং মডেল। টমসনের মডেলের পুডিংয়ের মতো পরমাণুর পক্ষে আলফা কণাগুলোকে ধাক্কা মেরে পিছন দিকে পাঠানো সম্ভব নয়। মনে রেখো, পরমাণু কিন্তু কাচের গুলির মতো নিরেট নয়। কাজেই দুটো গুলির মধ্যে ধাক্কা লাগলে যা হবে সেই কথা পরমাণুদের সম্পর্কে ভাবলে ভুল হবে।
গাইগার আর মার্সডেন দেখলেন যে অধিকাংশ আলফা কণাই প্রায় সোজা বেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু প্রতি আট হাজার কণার মধ্যে একটা কণা পিছনদিকে আসছে। টমসনের মডেলের পরমাণু হল রাদারফোর্ডের পাতলা কাগজ, তাঁর কামানের গোলা হল আলফা কণা। প্রায় দুই বছর ধরে রাদারফোর্ড বিষয়টা নিয়ে ভাবলেন। তারপরে ১৯১১ সালে সিদ্ধান্ত করলেন যে পরমাণু মোটেই টমসনের মডেলের মতো দেখতে নয়। তার প্রায় পুরো ভর আর ধনাত্মক আধান বা চার্জটাই রয়েছে কেন্দ্রের একটা খুব ছোট্ট জায়গার মধ্যে যার নাম তিনি দিলেন নিউক্লিয়াস; ঋণাত্মক আধানের ইলেকট্রনগুলো তাকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। রাদারফোর্ডের পরমাণুর মডেলটা হল নিচের ছবির মতো।

বিষয়টা আরও একটু ভেবে নেওয়া যাক। একটা পাতলা অ্যালুমিনিয়ামের পাতকে টানটান করে ধরো, তারপরে বন্ধুকে বলো একটা পেনসিল দিয়ে সেটাকে খোঁচা মারতে। সহজেই পেনসিলের শিসটা পাত ফুটো করে উলটোদিকে বেরিয়ে যাবে। এবার মনে করো ওই পাতটা গলিয়ে একটা ছোট্ট গুলি বানালাম। এবার কি আর পেনসিল দিয়ে সেটা ফুটো করতে পারবে? নিচের ছবিটা দেখো। টমসনের পরমাণুর মধ্যে দিয়ে আলফা কণা প্রায় না বেঁকেই বেরিয়ে যাবে। রাদারফোর্ডের মতে, ছোট্ট নিউক্লিয়াসের মধ্যে আছে পরমাণুর প্রায় সমস্ত ভর, বাকিটা শূন্য স্থান। অধিকাংশ আলফা কণা ঐ শূন্য স্থান দিয়ে বেরিয়ে যাবে। প্রতি আট হাজার কণার মধ্যে একটা আলফা কণা নিউক্লিয়াসকে ধাক্কা মেরে পিছন দিকে ঠিকরে আসতে পারে।
আলফা কণা ও পরমাণুর সংঘর্ষঃ টমসনের মডেল (উপরে) এবং রাদারফোর্ডের মডেল (নিচে)–>

রাদারফোর্ডের মডেলে পরমাণুকে দেখতে অনেকটা আমাদের সৌরজগতের মতো বলে মনে করা হত। এখন অবশ্য আমরা আর সেরকম ভাবি না। মাঝখানের ছোট্ট জায়গাটা হল নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রীণ। কত ছোটো এই নিউক্লিয়াস? আগেই বলেছি, পরমাণুর ব্যাসার্ধ হল এক ন্যানোমিটারের দশভাগের এক ভাগের কাছাকাছি। নিউক্লিয়াসের ব্যাসার্ধ তার দশ হাজার ভাগের এক ভাগ। একটা পরমাণুকে যদি ফুলিয়ে নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামের মতো করি, তাহলে নিউক্লিয়াস হবে একটা মাছির মতো বড়ো। বিজ্ঞানীরা জানতেন ইলেকট্রনের ভর খুব কম, হাইড্রোজেন পরমাণুর ভরের মোটামুটি ১৮৪০ ভাগের এক ভাগ। পরমাণু থেকে ইলেকট্রন বাদ দিলে পড়ে থাকে শুধু নিউক্লিয়াস। সুতরাং, নিউক্লিয়াসের মধ্যে পরমাণুর প্রায় সমস্ত ভরটা আছে। পরমাণু তড়িৎ-নিরপেক্ষ। ইলেকট্রনের আধান ঋণাত্মক। সুতরাং, নিউক্লিয়াস নিশ্চয়ই ধনাত্মক। রাদারফোর্ডের আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে নিউক্লিয় পদার্থবিজ্ঞানের জন্ম হল ধরে নিতে পারি।

মাদাম কুরির ল্যাবরেটরি ও এলেন গ্লেডিচ

ম্যানচেস্টারে রাদারফোর্ড ও তাঁর সহযোগীরা যখন পরমাণুর গঠন নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করছেন, তখন প্যারিতে মাদাম কুরির গবেষণাগারে তেজষ্ক্রিয়তা নিয়ে পুরোদমে কাজ চলছে। নিউক্লিয়াস আবিষ্কারের বছরেই মাদাম তাঁর দ্বিতীয় নোবেল পুরস্কারটি পান, এবার রসায়নে এককভাবে রেডিয়াম ও পোলোনিয়াম আবিষ্কারের জন্য। মাদাম অবশ্য নোবেল বক্তৃতার সময় মনে করিয়ে দিতে ভোলেননি, যে আবিষ্কারের জন্য এই পুরস্কার, তাতে পিয়েরেরও সমান কৃতিত্ব আছে। কিন্তু নোবেল পুরস্কারের রীতি অনুযায়ী মৃত ব্যক্তিদের বিবেচনা করা হয় না। আগেই মাদামের ল্যাবরেটরিতে কাজ করার জন্য নানা জায়গা থেকে মহিলা গবেষকরা আসতেন, দ্বিতীয় পুরস্কারের পর সেই সংখ্যা আরও বাড়ল। মাদামের থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে ইউরোপে অন্তত তিরিশ জন মহিলা তেজষ্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছ’জন মাদামের সঙ্গে কাজ করছিলেন। এঁদের মধ্যে হ্যারিয়েট ব্রুকসের কথা আগেই আমরা শুনেছি। অন্য একজনের কথা সংক্ষেপে তোমাদের বলি।
এলেন গ্লেডিচ নরওয়ের ইতিহাসে দ্বিতীয় মহিলা অধ্যাপক। কিন্তু তাঁর জীবনের পথ মোটেই সোজা ছিল না। স্কুলের সেরা ছাত্রী হলেও স্কুল পাস করার পরে তিনি ফার্মাসি অর্থাৎ ওষুধ তৈরির কাজে শিক্ষানবিশ হয়ে যোগ দিলেন। বিজ্ঞান তাঁর ভালো লাগত, তাই এভাবেই তিনি বিজ্ঞানের কাছাকাছি থাকতে চেয়েছিলেন। তাছাড়া ছিল অর্থের সমস্যা। ফার্মাসিস্ট হিসাবে তিনি তাড়াতাড়ি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন। পাঁচ বছর শিক্ষানবিশি এবং দুটো পরীক্ষা সাফল্যের সঙ্গে পাস করার পরে কিন্তু তাঁর আর সেই রাস্তা ভালো লাগল না। তাঁর পছন্দের বিষয় হয়ে দাঁড়াল রসায়ন। নরওয়ের অসলোর ক্রিস্টিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি রসায়ন বিষয়ে কাজ শুরু করেন। তাঁকে উৎসাহ দেন সেখানকার অধ্যাপক বোয়েডকার। আর্থিক সমস্যা ছিল, কাজেই একই সঙ্গে ছাত্র পড়াতেন এলেন। তিনি নিজেই বলেছিলেন, আগে রুটি, পরে বিজ্ঞান। ১৯০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষাতে পাস করলেন গ্লেডিচ। বোয়েডকারের সাহায্যে তিনি ১৯০৭ সালে প্যারিতে মাদামের ল্যাবরেটরিতে কাজ শুরু করলেন।

পাঁচ বছর মাদামের ল্যাবরেটরিতে কাজের পর তিনি আমেরিকাতে গবেষণার জন্য বৃত্তি পান। ১৯১২ সালে তিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ শুরু করেন, যদিও তাঁর প্রাথমিক অভিজ্ঞতা খুব সুখের ছিল না। কিন্তু প্রথমে যাঁরা গ্লেডিচকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, পরে তাঁরাই নিজে থেকে তাঁর সঙ্গে গবেষণাতে অংশ নিয়েছিলেন। দু’বছর আমেরিকাতে কাটানোর পরে তিনি নরওয়ে ফিরে ক্রিস্টিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো শুরু করেন। ১৯২৯ সালে তিনি পূর্ণ অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। সেই সময় এই ঘটনা বেশ বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। তবে তাঁর সাফল্য সব সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি নরওয়ে অধিকার করে নেয়। গ্লেডিচ নাৎসিদের খপ্পর থেকে ইহুদি বিজ্ঞানীদের পালাতে সহায়তা করেছিলেন। মহিলা বিজ্ঞানীদের তিনি সারাজীবন নানাভাবে সাহায্য করেছেন।
এলেন সারাজীবনে তেজষ্ক্রিয়তা নিয়ে অনেক উল্লেখযোগ্য কাজ করেছিলেন। তার মধ্যে মাত্র কয়েকটার উল্লেখ করি। নিষ্ক্রিয় গ্যাস আবিষ্কারের জন্য উইলিয়াম  র‍্যামজে ১৯০৪ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তিনি একসময় দাবি করেছিলেন যে তামা যদিও তেজষ্ক্রিয় নয়, কিন্তু তিনি দেখেছেন যে তেজষ্ক্রিয় পদার্থের কাছাকাছি থাকলে তামা ভেঙে লিথিয়াম তৈরি হচ্ছে। মেরি কুরি এবং এলেন গ্লেডিচ দেখান যে র‍্যামজে ভুল করেছেন। লিথিয়াম সম্ভবত আগে থেকেই তামার মধ্যে ছিল, নয়তো যে কাচের বিকার তিনি ব্যবহার করেছেন, তার থেকে এসেছে। তাঁদের এই কাজ তেজষ্ক্রিয়তা বিষয়ে র‍্যামজে  ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে দেয়।
গ্লেডিচের পরের কাজে যাওয়ার আগে আমাদের আরও একটু নিউক্লিয় পদার্থবিদ্যা জানতে হবে। আমরা আগেই জেনেছি, রেডিয়ামের (সঠিকভাবে বললে রেডিয়াম-২২৬ আইসটোপের) অর্ধায়ু কাল হল ১৬০০ বছর। সেই অর্ধায়ু কাল নির্ধারণে এলেনের ভূমিকা আছে। কিন্তু তারও আগে প্রশ্ন হল যে পৃথিবীর বয়স প্রায় সাড়ে চারশো কোটি বছর। প্রতি ১৬০০ বছরে যদি রেডিয়ামের পরমাণু সংখ্যা অর্ধেক হয়ে যায়, তাহলে এখনও আমরা রেডিয়াম খুঁজে পাই কেন? রেডিয়ামের সমস্ত পরমাণুর তো অনেকদিন আগে ভেঙে যাওয়ার কথা। আসলে রেডিয়ামের পরমাণু যেমন ভেঙে পড়ছে, তেমনি তৈরিও হচ্ছে। কোথা থেকে? ইউরেনিয়াম-২৩৮ আইসোটোপের অর্ধায়ু কাল হল প্রায় সাড়ে চারশো কোটি বছর। তার মানে পৃথিবীর সৃষ্টির সময় যত ইউরেনিয়ামের পরমাণু ছিল, এখন তার অর্ধেক আছে। আরও এই ধরনের এক আইসোটোপ হল থোরিয়াম-২৩২; তার অর্ধায়ুকাল চোদ্দশো কোটি বছর। এই ইউরেনিয়াম বা থোরিয়াম থেকে আলফা ও বিটা ক্ষয়ের মাধ্যমে রেডিয়ামের মতো মৌলের জন্ম হয়। আমরা আগে দেখেছিলাম, ইউরেনিয়ামের আকরিক পিচব্লেন্ডের মধ্যে কুরিরা অনেক নতুন মৌল খুঁজে পাচ্ছিলেন। তার কারণ, ইউরেনিয়াম থেকে নতুন মৌল জন্ম নিয়েছে। ছবিতে ইউরেনিয়াম-২৩৮ থেকে কোন কোন মৌল সৃষ্টি হচ্ছে তা দেখানো হয়েছে। এই ছবিটা অবশ্য অনেক পরের যুগের। যে সময়ের কথা বলছি তখন এত খবর জানা ছিল না।
ইউরেনিয়ামের ক্ষয় শৃঙ্খলের ছবিটা একটু ভালো করে বুঝে নিলে পরে আমাদের সুবিধা হবে। ছবিতে ইউরেনিয়াম(U)-২৩৮ কোন পথে সিসা(Pb) পর্যন্ত নতুন মৌলদের জন্ম দেয় দেখানো হয়েছে। বাক্সের মধ্যে আইসোটোপের অর্ধায়ুকালও লেখা আছে। সিসা-২০৬ স্থায়ী, তার আর ক্ষয় হয় না। আলফা(  ) কণাতে আছে দুটো প্রোটন ও দুটো নিউট্রন। তার মানে আলফা কণা বেরোলে পরমাণুর নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সংখ্যা দুই কমে যায়, আর ভরসংখ্যা কমে চার। বিটা() রশ্মি হল ইলেকট্রন। বিটা ক্ষয়ের সময় একটা নিউট্রন একটা প্রোটনে পরিবর্তিত হয়। (অন্যরকম বিটা ক্ষয়ও আছে, সেকথাও আমাদের গল্পে আসবে।) ভরসংখ্যা হল প্রোটন ও নিউট্রনের মোট সংখ্যা। সুতরাং, বিটা ক্ষয়ে ভরসংখ্যা অপরিবর্তিত থাকে, প্রোটনের সংখ্যা এক বেড়ে যায়। বিভিন্ন মৌলের নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সংখ্যা বিভিন্ন। ফ্রেডরিক সডি ও কাসিমির ফাইয়ান্স প্রথম বলেন যে আলফা ক্ষয়ে মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা দুই এবং পারমাণবিক গুরুত্ব চার কমে। বিটা ক্ষয়ে পারমাণবিক গুরুত্ব পালটায় না, কিন্তু পারমাণবিক সংখ্যা এক বাড়ে। এই সূত্রকে বলা হয় ফাইয়ান্স-সডি সূত্র।
ইউরেনিয়ামের আকরিকে যে অন্য তেজষ্ক্রিয় মৌল পাওয়া যায়, ইউরেনিয়াম থেকেই যে তাদের জন্ম তা প্রমাণ করা যাবে কেমন করে? আমেরিকাতে বার্ট্রাম বোল্টউড ইউরেনিয়ামের বিভিন্ন আকরিকে ইউরেনিয়াম ও রেডিয়ামের পরিমাণের অনুপাত মাপতে শুরু করেন; পরে রাদারফোর্ডও তাঁর সঙ্গে সহযোগিতা করেন। তাঁরা অনুমান করলেন যে যেহেতু ইউরেনিয়াম থেকেই রেডিয়ামের জন্ম, তাই রেডিয়াম ও ইউরেনিয়ামের অনুপাত সব আকরিকেই সমান হওয়ার কথা। বিভিন্ন আকরিকে তাঁরা এই অনুপাতের একই মান পেলেন। সুতরাং, তাঁরা নিশ্চিত হলেন যে ইউরেনিয়াম থেকেই রেডিয়ামের জন্মের তত্ত্বটাই ঠিক।
ইউরেনিয়ামের আকরিকে রেডিয়ামের পরিমাণ খুবই অল্প। প্রতি এক কোটি ইউরেনিয়াম পরমাণুতে রেডিয়াম পরমাণুর সংখ্যা চারেরও কম। রাসায়নিক পদ্ধতিতে এইটুকু রেডিয়াম আলাদা করা খুব শক্ত। রেডিয়াম থেকে আলফা ক্ষয়ের ফলে রেডন গ্যাস তৈরি হয়। বোল্টউড ইউরেনিয়ামের আকরিক থেকে যে রেডন বেরোচ্ছে, তা মেপে তার থেকে রেডিয়ামের পরিমাণ নির্ধারণ করছিলেন। গ্লেডিচও বিশ্বাস করতেন যে ইউরেনিয়াম থেকেই রেডিয়াম এসেছে। কিন্তু তাঁর মনে হল বোল্টউডের পদ্ধতিতে অনেক ভুল থাকতে পারে। তাই তিনি আকরিক থেকে বিশুদ্ধ রেডিয়াম নিষ্কাশনে মন দিলেন। কাজটা ছিল ভীষণ শক্ত। কিন্তু গ্লেডিচ তাতে দমে যাননি। টানা তিন বছর তিনি এই নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। শেষপর্যন্ত তিনি দেখান যে রেডিয়াম ও ইউরেনিয়ামের অনুপাত নানা আকরিকে কাছাকাছি হলেও একেবারে সমান নয়।
এই কাজের গুরুত্বটা আস্তে আস্তে বোঝা গেল। একথা ঠিক যে ইউরেনিয়াম থেকেই রেডিয়ামের জন্ম। পৃথিবী সৃষ্টির প্রথম যুগে যে সমস্ত পাথর তৈরি হয়েছিল, তাদের সবার মধ্যে তাই রেডিয়াম ও ইউরেনিয়ামের অনুপাত সমান। ইউরেনিয়ামের ক্ষয়শৃঙ্খলের ছবিতে দেখো ইউরেনিয়াম ও রেডিয়ামের মাঝে আরও কিছু মৌল আছে। এই অনুপাতে তাদেরও কিছু ভূমিকা আছে। যে সমস্ত পাথর তৈরি হয়েছে পৃথিবী সৃষ্টির অনেক পরে, তাদের জন্মের আগে রেডিয়াম বা মাঝের মৌলগুলো হয়তো বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াতে ইউরেনিয়াম থেকে আলাদা হয়ে গেছে। ফলে ইউরেনিয়াম ও রেডিয়ামের অনুপাতটা পালটে গেছে। এই ধরনের অনুপাত থেকেই পাথরের বয়স মাপা হয়।
আমেরিকাতে গ্লেডিচ বোল্টউডের ল্যাবরেটরিতেই গিয়েছিলেন। তিনি প্রথম প্রথম গ্লেডিচকে না নিতে চাইলেও পরে তাঁর গবেষণা দেখে খুবই খুশি হয়েছিলেন। বোল্টউড রেডিয়ামের অর্ধায়ু কাল মেপে বার করেছিলেন ২০০০ বছর; রাদারফোর্ড ও গাইগার মেপে পেয়েছিলেন ১৬৯০ বছর। বোল্টউড গ্লেডিচকে আবার মাপতে বলেন। আগেই দেখেছি গ্লেডিচ ছিলেন ইউরেনিয়ামের আকরিক থেকে রেডিয়ামকে আলাদা করার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ। তিনি অর্ধায়ুকালটা মেপে দেখলেন যে রাদারফোর্ডদের মাপটাই সঠিক মানের কাছাকাছি। বহুদিন পর্যন্ত গ্লেডিচের মাপটাকেই আমরা ব্যবহার করেছি।
১৯০৪ সালে ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে ১৯৩৪ সালে মাদাম কুরির মৃত্যু পর্যন্ত মোট সাতচল্লিশ জন মহিলা মাদামের ল্যাবরেটরিতে গবেষণা করেছিলেন। ১৯১৯ সালে মাদামের মেয়ে আইরিন কুরি সেখানে কাজ শুরু করেন। আইরিন ও তাঁর সমসাময়িকদের কথা পরে আমাদের আলোচনায় আসবে। মাদামের অনুরোধে গ্লেডিচ আমেরিকা থেকে ফেরার পরে বেশ কয়েকবার তাঁর ল্যাবরেটরিতে কাজ করেছেন। নানা দেশ থেকে মহিলারা মাদামের ল্যাবরেটরিতে আসতেন। ১৯১৯ পর্যন্ত যাঁরা মাদামের ল্যাবরেটরিতে গবেষণা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইংল্যান্ড থেকে আসা মে সিবিল লেসলি (১৪ আগস্ট ১৮৮৭ – ৩ জুলাই ১৯৩৭)। তিনি পরে রাদারফোর্ডের সঙ্গেও কাজ করেছিলেন। লেসলি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের রসায়ন শিল্পোদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং পরে ইংল্যান্ডের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হয়েছিলেন। এসেছিলেন রাশিয়ান জাডউইগা স্মিডট (৮ সেপ্টেম্বর ১৮৮৯ – এপ্রিল ১৯৪০), যিনি পরে রাদারফোর্ডের সঙ্গে কাজ করেছিলেন এবং বিপ্লবের পরে রাশিয়াতে স্টেট ফিজিকো-টেকনিকাল অ্যান্ড রেডিওলজিকাল ইন্সটিটিউট তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। সুইডেনের বিজ্ঞানী এভা র্যা মস্টেড (১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৭৯ – ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪) পরে স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন ধরনের তরলে রেডন ও রেডিয়াম থেকে তৈরি অন্যান্য মৌলের দ্রাব্যতা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। হাঙ্গেরি থেকে এসেছিলেন আইরেন গোয়েজ (৩ এপ্রিল ১৮৮৯ – ১৯৪১)। ১৯১৯ সালে আইরেন হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা লেকচারার নিযুক্ত হন। কিন্তু বামপন্থী রাজনীতিতে অংশগ্রহণের জন্য দেশের সরকার পরিবর্তনের পরে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। এরপর তিনি রুমানিয়ার ক্লাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছ’বছর পড়িয়েছিলেন। জার্মানিতে আরো তিন বছর কাটানোর পরে সোভিয়েত ইউনিয়নে নাইট্রোজেন রিসার্চ ইন্সটিটিউটে বিভাগীয় প্রধান হয়েছিলেন। ১৯১৯ সাল পর্যন্ত চারজন ফরাসি মহিলাও মাদামের ইন্সটিটিউটে কাজ করেছিলেন, যদিও তাঁদের সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না।

লিজে মাইটনারঃ প্রথম পর্ব

বিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশকে প্যারিতে মাদাম কুরি বা ম্যানচেস্টারে রাদারফোর্ডের পরীক্ষাগারে অনেক মহিলা গবেষণা করেছিলেন। এই দুই জায়গার বাইরে আরও কয়েকজন বিজ্ঞানীর কথা আমাদের লেখাতে আসবে। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত নিঃসন্দেহে লিজে মাইটনার। মাইটনারের গবেষণার কথা অবশ্য এক পর্বে শেষ করা যাবে না। দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময় তিনি তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কাজটা করেছিলেন। আমরা এই পর্বে শুধু তাঁর প্রথম যুগের গবেষণার দিকে চোখ রাখব।

মাইটনারের জীবনকাহিনি আমাদের পরিচিত। এই লেখায় তাঁর সংক্ষিপ্ত পরিচয় তোমরা পাবে। মাইটনারের জন্ম ৭ নভেম্বর, ১৮৭৮ অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায়। প্রথমে উচ্চশিক্ষার সুযোগ না পেলেও ১৯০০ সালে তিনি ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পান এবং বিখ্যাত বিজ্ঞানী লুডউইগ বোলজমানের কাছে শিক্ষালাভ করেন। ভিয়েনাতেই ডক্টরেট করেন মাইটনার। সেই সময় বিশিষ্ট বিজ্ঞানী স্টেফান মায়ারের সাহায্যে তেজষ্ক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত হন। এরপর সারাজীবন তিনি এই সংশ্লিষ্ট বিষয়েই কাজ করেছেন। তাঁর প্রথম কাজ ছিল আলফা কণার বিচ্ছুরণ। তেজষ্ক্রিয়া বিষয়ে যে বিজ্ঞানীরা কাজ করতেন তাঁদের মধ্যে অনেকেই, যেমন আর্নেস্ট রাদারফোর্ড বা মেরি কুরি, বলতেন যে আলফা কণা অণুর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে বিচ্ছুরিত হয়। কিন্তু পরীক্ষামূলকভাবে তা দেখানো শক্ত ছিল। লিজে পরীক্ষা করার এক নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।
কিন্তু অস্ট্রিয়াতে শিক্ষকতা ছাড়া অপর কোনও পেশার দরজা তাঁর সামনে ছিল না। তিনি মেরি কুরির গবেষণাগারে কাজ করতে চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু তখন কোনও জায়গা খালি ছিল না। বার্লিনে চলে গেলেন মাইটনার। উদ্দেশ্য, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের ক্লাস করা। সেখানে বিজ্ঞানী অটো হানের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। একসঙ্গে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্ট্রি ইন্সটিটিউটে কাজ শুরু করেন তাঁরা।
প্রথম প্রথম অন্য বিজ্ঞানীদের অবজ্ঞার পাত্রী হলেও অল্প দিনের মধ্যেই লিজের গবেষণা সকলের সমীহ আদায় করে নিল। ১৯১২ সালে ডালেমে জার্মানির সেরা গবেষণাগার কাইজার উইলহেলম ইন্সটিটিউট স্থাপিত হল। হান ও মাইটনার দু’জনেই নতুন ইন্সটিটিউটে যোগ দিলেন। মাইটনার হলেন প্ল্যাঙ্কের সহকারী। প্ল্যাঙ্ক সে সময় তাঁকে সহযোগী অধ্যাপক বা এসোসিয়েট প্রফেসর হিসাবে ক্লাস নিতে বলেন। জার্মানিতে তাঁর আগে কোনও মহিলা এই পদে যেতে পারেননি। ১৯১৭ সালে মাইটনার হলেন কেমিস্ট্রি ইন্সটিটিউটের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান। সে সময় হানের সঙ্গে তাঁর যৌথ গবেষণাতে সাময়িক ছেদ পড়ে। দু’জনে আবার একসঙ্গে কাজ শুরু করেন ১৯৩৪ সালে। ইতিমধ্যে ১৯২৬ সালে তিনি প্রফেসরের পদ পেয়েছেন, জার্মানির প্রথম মহিলা প্রফেসর।
১৯১৩ সালে জার্মানির কার্লসরুহেতে পোলিশ বিজ্ঞানী কাসিমির ফাইয়ান্স ও জার্মান বিজ্ঞানী অসওয়াল্ড গোয়েরিং ইউরেনিয়ামের ক্ষয় হয়ে যে সমস্ত নতুন মৌল তৈরি হয়, তার মধ্যে প্রোট্যাক্টিনিয়ামের সন্ধান পান। তখনও অবশ্য এই নাম দেওয়া হয়নি। তাঁদের আবিষ্কৃত মৌলটির ভরসংখ্যা ছিল ২৩৪। এর অর্ধায়ু কাল এক মিনিটের সামান্য বেশি। এত ক্ষণস্থায়ী মৌল নিয়ে গবেষণা করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। লাতিন ভাষায় ব্রেভিস অর্থে স্বল্পস্থায়ী। তার থেকে তাঁরা এর নাম দিয়েছিলেন ব্রেভিয়াম। কিন্তু এ আদৌ মৌল কি না তা পরীক্ষা না করে নিশ্চিত হওয়া যায় না।
সেই কাজটাই করেন পাঁচ বছর পরে জার্মানির বার্লিনে অটো হান ও লিজে মাইটনার। তাঁরা ইউরেনিয়ানের আকরিক পিচব্লেন্ডের গুঁড়োতে উত্তপ্ত ঘন নাইট্রিক অ্যাসিড দিয়ে রেডিয়াম ও অন্যান্য পরিচিত তেজষ্ক্রিয় পদার্থকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। পড়ে থাকা অধঃক্ষেপ থেকে যে আলফা বিকিরণ বেরিয়েছিল, তার ভেদনক্ষমতা মেপে তাঁরা নিশ্চিত হন যে এক নতুন মৌলের সন্ধান তাঁরা পেয়েছেন। এটা ছিল প্রোট্যাক্টিনিয়ামের অন্য আইসোটোপ যার ভরসংখ্যা ২৩১। এর অর্ধায়ু কাল হল প্রায় তেত্রিশ হাজার বছর। ফলে মৌলের রাসায়নিক ধর্ম নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছিল। দেখা গেল, তা ট্যান্টালাম মৌলের অনুরূপ। নতুন মৌলটি আলফা ক্ষয়ের মাধ্যমে অ্যাক্টিনিয়াম মৌল তৈরি করে বলে তার নাম হল প্রোট্যাক্টিনিয়াম। ফাইয়ান্সও এই নামকরণে সায় দেন। প্রায় একই সময়ে স্কটল্যান্ডে ফ্রেডরিক সডি ও তাঁর সহযোগী জন ক্র্যানস্টন প্রোট্যাক্টিনিয়ামের চিহ্ন খুঁজে পেয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে আরও কথা আমরা পরে শুনব। পর্যায়সারণিতে পারমাণবিক সংখ্যা ৯১-এর ঘরটা শূন্য ছিল। পর্যায়সারণীর আবিষ্কর্তা দমিত্রি মেন্দেলিয়েভ বলেছিলেন, ওইখানে যে মৌল বসবে তার ধর্ম হতে হবে ট্যান্টালাম মৌলের খুব কাছাকাছি। প্রোট্যাক্টিনিয়ামই সেই শূন্যস্থান পূরণ করল।

আইসোটোপের আবিষ্কারঃ স্টেফানি হরোভিৎজ, এডা হিচিন্স ও এলেন গ্লেডিচ

মনে করিয়ে দিই, কোনও নির্দিষ্ট মৌলের নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সংখ্যা নির্দিষ্ট, কিন্তু নিউট্রনের সংখ্যা আলাদা আলাদা হতে পারে। তাদের বলে মৌলের আইসোটোপ। প্রোটন ও নিউট্রনের মোট সংখ্যাকে বলে ভরসংখ্যা। এই লেখায় আইসোটোপের কথা অনেকবার এসেছে। কিন্তু তার ধারণাটা এল কোথা থেকে? বিজ্ঞানের আবিষ্কারের পাশে সাধারণত একজন বা কয়েকজন বিখ্যাত বিজ্ঞানীর নাম লেখা থাকে, হারিয়ে যায় তার পিছনে আরও স্বল্পখ্যাত অনেকের অবদান। আমরা যে সময়ের গল্প শুনছি, সেই সময় মহিলা বিজ্ঞানীদের জন্য এই কথাটা বিশেষ করে সত্যি। আমরা দেখেছি, রেডন আবিষ্কারে হ্যারিয়েট ব্রুকসের অবদান রাদারফোর্ড ও কুরিদের নামের আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। ১৯২১ সালে তেজষ্ক্রিয় পদার্থ ও আইসোটোপ বিষয়ে গবেষণার জন্য রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ফ্রেডরিক সডি। একথা ঠিক যে সডিই আইসোটোপের ধারণা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই কথা আলোচনার সময় সাধারণত পাদপ্রদীপের আড়ালে থেকে যান এমন কয়েকজনের কথা আমরা এবার শুনে নিই।
এলেন গ্লেডিচের কথা আগেই জেনেছি। এডা হিচিন্স দীর্ঘদিন ছিলেন সডির প্রধান সহকারী। তাঁর জন্ম ১৮৯১ সালের ২৬ জুন ইংল্যান্ডের ডেভনে। তিনি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯১৩ সালে স্নাতক হয়েছিলেন। স্নাতকে পাঠক্রমের শেষ বছরেই তিনি ফ্রেডরিক সডির সঙ্গে কাজ শুরু করেছিলেন। সডি দশ বছর আগে কানাডা থেকে গ্লাসগোতে চলে এসেছিলেন। পরের বছর সডি স্কটল্যান্ডের এবার্ডিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। হিচিন্স হলেন সেখানে কার্নেগি গবেষক। ১৯১৫ সালে সডির প্রধান সহকারী জন ক্র্যানস্টনকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সৈন্যদলে যোগ দিতে হয়। হিচিন্স তখন সেই কাজের দায়িত্ব নেন। ১৯১৬ সালে হিচিন্সও যুদ্ধ সংক্রান্ত গবেষণাতে যোগ দেন। ১৯১৯ সালে যুদ্ধ শেষের পরে যখন পুরুষরা আবার অসামরিক কাজে ফিরে আসে। তখন হিচিন্সের চাকরি যায়। ১৯২১ সালে আবার তিনি সডির সঙ্গে কাজ শুরু করেছিলেন। সডি তখন অক্সফোর্ডে। ১৯২৭ সালে হিচিন্স ব্রিটিশ উপনিবেশ কেনিয়াতে তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগ দেন। সেখানেও তিনি রসায়নবিদের চাকরি করেছিলেন। ১৯৪৬ সালে চাকরি থেকে অবসর নিয়ে তিনি আবার ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়।
স্টেফানি হরোভিৎজের জন্ম হয় পোল্যান্ডের ওয়ারশতে ১৮৭৭ সালের ১৭ এপ্রিল। ১৮৯০ সাল নাগাদ তাঁদের পরিবার ভিয়েনা চলে আসে। ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তিনি ১৯১৪ সালে রসায়নে ডক্টরেট করেন। তার আগের বছর থেকেই তিনি ভিয়েনার ইন্সটিটিউট ফর রেডিয়াম রিসার্চে অট্টো হোয়েনিগস্মিডের সঙ্গে কাজ শুরু করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে সেই কাজে ছেদ পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পোল্যান্ড দখল করে যে লক্ষ লক্ষ ইহুদিকে নাৎসি ঘাতকবাহিনী খুন করেছিল, তাঁদের মধ্যে ছিলেন তিনি ও তাঁর বোন। কোথায় বা কবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল, সেকথা আমরা কোনোদিনই জানতে পারব না।
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক পর্যন্ত রসায়নবিদরা মৌলের পারমাণবিক গুরুত্ব খুব যত্ন নিয়ে মাপতেন। তখনও পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা ভাবতেন যে কোনও মৌলের সমস্ত পরমাণুর ভর সমান। সুতরাং, পারমাণবিক ভর আলাদা হলে মৌলগুলোও আলাদা। যখন বোঝা গেল তেজষ্ক্রিয়াতে এক মৌল অন্য মৌলে রূপান্তরিত হচ্ছে, তখন মনে করা হল যে প্রত্যেকটা পরমাণুই আলাদা আলাদা মৌলের। একটা উদাহরণ দিলে হয়তো বিষয়টা পরিষ্কার হবে। খুব পুরনো বইতে এখনও দেখতে পাবে থোরিয়াম থেকে ক্ষয়ের মাধ্যমে হয় মেসোথোরিয়াম-I। এভাবে পরপর যত পরমাণু পাওয়া যায় মনে করা হচ্ছিল এগুলো সবই নতুন মৌল। এখন আমরা জানি যে থোরিয়াম-২৩২ আলফা ক্ষয়ের মাধ্যমে হয় রেডিয়াম-২২৮। সেটাকেই তখন মেসোথোরিয়াম-I বলা হচ্ছিল। ইউরেনিয়ামের ক্ষয় শৃঙ্খলের ছবিতে দেখবে ক্ষয়ের মাধ্যমে রেডিয়াম-২২৬ তৈরি হচ্ছে। বুঝতেই পারছ, মৌলটা একই, এরা রেডিয়ামের আলাদা আলাদা আইসোটোপ। কিন্তু সেই সময় একথা জানা ছিল না। থোরিয়াম ও ইউরেনিয়ামের পারমাণবিক গুরুত্ব জানা ছিল, তাই ফাইয়ান্স-সডি সূত্র, যার কথা আগে এসেছে, তার সাহায্যে বোঝা সহজ ছিল যে ইউরেনিয়াম থেকে পাওয়া রেডিয়াম এবং থোরিয়াম থেকে পাওয়া মেসোথোরিয়ামের পারমাণবিক গুরুত্ব আলাদা। তাই মনে করা হচ্ছিল মেসোথোরিয়াম-I একটা নতুন মৌল। তেমনি তার থেকে পরপর দু’বার বিটা ক্ষয়ের মাধ্যমে হয় যথাক্রমে অ্যাক্টিনিয়াম-২২৮ ও থোরিয়াম-২২৮। এই দুটোর নাম দেওয়া হয়েছিল মেসোথোরিয়াম-II ও রেডিওথোরিয়াম। ১৯০৭ সালে মার্কিন বিজ্ঞানী হার্বার্ট ম্যাককয় ও উইলিয়াম রস দেখেন যে থোরিয়াম ও রেডিওথোরিয়ামের রাসয়ানিক ধর্মে কোনও পার্থক্য নেই।
প্রোটন বা নিউট্রনের অস্তিত্ব কিংবা ভরসংখ্যার কথা জানার আগে মেন্দেলিয়েভের পর্যায় সারণিতে কয়েকটা ব্যতিক্রম ছাড়া মৌলদের তার পারমাণবিক গুরুত্ব অনুযায়ী সাজানো হত। যে মৌল যত নম্বর ঘরে অবস্থান করে, তাকে বলে তার পারমাণবিক সংখ্যা। সডি শুরু করলেন তাঁর ও ফাইয়ান্সের সূত্র থেকে। ইউরেনিয়ামের ক্ষয় শৃঙ্খলে ইউরেনিয়াম-২৩৮ থেকে শেষপর্যন্ত সিসা-২০৬ তৈরি হচ্ছে। ঠিক তেমনি থোরিয়াম-২৩২ থেকে শেষপর্যন্ত তৈরি হবে সিসা-২০৮। সাধারণ সিসার পারমাণবিক গুরুত্ব মেপে পাওয়া গিয়েছিল ২০৭.২। সডির যুক্তি, এই মানটা আসলে দুটো আলাদা ভরসংখ্যার গড়। ইউরেনিয়ামের ক্ষয়ের ফলে যে সিসা তৈরি হয় আর থোরিয়ামের ক্ষয়ের ফলে সে সিসা তৈরি হয়, তাদের পারমাণবিক গুরুত্ব মেপে প্রমাণ করা যাবে যে একই মৌলের পরমাণুর আলাদা আলাদা গুরুত্ব হওয়া সম্ভব। সডিই এদের নাম দিয়েছিলেন আইসোটোপ। এই কাজেই তিন মহিলা বিজ্ঞানীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।
সডি ও তাঁর সহযোগী হেনরি হাইম্যান ও পিয়ের কুরির ভাইপো মরিস কুরি তেজষ্ক্রিয় পদার্থ থেকে পাওয়া সিসার পারমাণবিক গুরুত্ব মেপে দেখলেন যে সাধারণ সিসার থেকে তা আলাদা। কিন্তু পারমাণবিক গুরুত্ব মাপার ক্ষেত্রে তাঁরা কেউই বিশেষজ্ঞ ছিলেন না। ফলে বিজ্ঞানীমহল তাঁদের সিদ্ধান্ত মানতে ইতস্তত করছিল। এ বিষয়ে পৃথিবীর প্রথম সারির বিজ্ঞানীদের মধ্যে ছিলেন ভিয়েনার রেডিয়াম ইন্সটিটিউটের অট্টো হোয়েনিগস্মিড। তিনি ও তাঁর ছাত্রী স্টেফানি হরোভিৎজ ইউরেনিয়ামের বিভিন্ন আকরিক থেকে সিসাকে আলাদা করলেন। সেই সিসার পারমাণবিক গুরুত্ব মেপে তাঁরা পেলেন ২০৬.০৪৬। অর্থাৎ সডির সিদ্ধান্তকেই তাঁরা সমর্থন করলেন। কাজটা ছিল প্রচণ্ড কঠিন। হোয়েনিগস্মিড এক চিঠিতে লিজে মাইটনারকে লিখেছিলেন, ‘হরোভিৎজ ও আমি কুলির মতো পরিশ্রম করছি।’
১৯১৬ থেকে ১৯১৯ সালে হোয়েনিগস্মিড ও হরোভিৎজ আরও একটা কাজ করেছিলেন। বার্ট্রাম বোল্টউড নতুন একটা মৌল আবিষ্কার করেছিলেন বলে দাবি করেছিলেন। তার নাম দেওয়া হয়েছিল আয়োনিয়াম। বিজ্ঞানীরা অনেকেই সেকথা মেনে নিয়েছিলেন। এমনকি তাকে একটা চিহ্নও দেওয়া হয়েছিল, Io। হরোভিৎজরা বর্ণালী বিশ্লেষণ ও পারমাণবিক গুরুত্ব মেপে দেখালেন যে আয়োনিয়াম কোনও নতুন মৌল নয়, থোরিয়ামের আইসোটোপ। ইউরেনিয়ামের ক্ষয় শৃঙ্খলে যে থোরিয়াম-২৩০ তৈরি হয়, তাকেই নতুন মৌল বলে ভুল হচ্ছিল। এই ছিল হরোভিৎজের শেষ গবেষণা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওডর রিচার্ডস ছিলেন হোয়েনিগস্মিডের শিক্ষক। পারমাণবিক গুরুত্ব মাপার ব্যাপারে বিজ্ঞানীমহল তাঁকে এক নম্বর বিশেষজ্ঞ হিসাবে স্বীকার করত। তিন আলাদা আলাদা জায়গার ইউরেনিয়ামের আকরিক থেকে পাওয়া সিসার পারমাণবিক গুরুত্ব নির্ণয় করে তিনি দেখলেন যে তা ২০৬-এর কাছাকাছি, অর্থাৎ সডি ঠিক বলেছেন। আকরিক থেকে সিসাটা আলাদা করেছিলেন এলেন গ্লেডিচ। গ্লেডিচ প্রথমে রিচার্ডসের কাছেই গবেষণা করতে চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন যে হার্ভার্ডে তখনও পর্যন্ত কোনও মহিলা গবেষণা করেননি। রিচার্ডসের গবেষণাপত্রে সহযোগীদের তালিকায় গ্লেডিচের নাম ছিল না, তবে সিসার নমুনা যে গ্লেডিচের থেকে পাওয়া গেছে সেকথা ভিতরে লেখা ছিল।
সডি নিজে থোরিয়াম থেকে পাওয়া সিসার পারমাণবিক গুরুত্ব মেপেছিলেন। তাঁর পাঠানো নমুনা থেকে হোয়েনিগস্মিডও একই কাজ করেছিলেন। দু’জনেই মানটা পেয়েছিলেন ২০৮-এর কাছাকাছি। থোরিয়াম আকরিক থেকে সিসা নিষ্কাশনের কাজটা করেছিলেন এডা হিচিন্স। সডির লেখাতে একথাও আছে যে রাসায়নিক বিশ্লেষণের কাজেও তিনি সহায়তা করেছিলেন। কিন্তু গ্লেডিচের মতোই হিচিন্সের নামও সেই গবেষণাপত্রদের লেখকের তালিকায় পাওয়া যাবে না।
হিচিন্সের আরও কিছু গবেষণার কথা সংক্ষেপে শুনে নেওয়া যাক। সডির নির্দেশমতো হিচিন্স ইউরেনিয়ামের আকরিক থেকে ইউরেনিয়াম বের করে নেন। তখনও বিজ্ঞানীরা আয়োনিয়ামের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন। হিচিন্স তার অর্ধায়ু কাল মেপেছিলেন। এছাড়া তিনি দেখিয়েছিলেন, তাঁর নিষ্কাশিত বিশুদ্ধ ইউরেনিয়ামের মধ্যে রেডিয়ামের পরিমাণ ক্রমশই বাড়তে থাকে। ইউরেনিয়াম থেকেই যে রেডিয়াম তৈরি হচ্ছে এই ছিল তার প্রথম প্রত্যক্ষ প্রমাণ। প্রোট্যাক্টিনিয়াম মৌলের আবিষ্কার প্রসঙ্গে সডি ও ক্র্যানস্টনের কথা আগেই বলেছি। গবেষণাপত্রের লেখক তালিকায় হিচিন্সের নাম জায়গা না পেলেও লেখার মধ্যে তাঁর অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।
একই মৌলের বিভিন্ন আইসোটোপের ভর বিভিন্ন, কিন্তু তাদের রাসায়নিক ধর্মে কোনও পার্থক্য নেই। তাহলে বিভিন্ন আইসোটোপের মধ্যে নিশ্চয়ই কোনও একটা মিল আছে? সেটা কী? ১৯১৩ সালে ব্রিটেনে হেনরি মোসলে এক্স-রশ্মি ব্যবহার করে দেখান যে মৌলের নিউক্লিয়াসের আধান বা চার্জ নির্দিষ্ট। মোসলে খুব অল্প বয়সে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মারা যান। পরমাণু যেহেতু নিস্তড়িৎ, এই আধানের পরিমাণ থেকেই পরমাণুতে ইলেকট্রনের সংখ্যা নির্ধারিত হয়। ইলেকট্রনের সংখ্যাই মৌলের রাসয়ানিক ধর্ম নিয়ন্ত্রণ করে। সুতরাং কোনও মৌলের সব আইসোটোপের নিউক্লিয়াসের আধান সমান। আগেই বলেছি যে পর্যায় সারণিতে মৌল যে ঘরে অবস্থান করে, তাকে বলা হয় তার পারমাণবিক সংখ্যা। দেখা গেল নিউক্লিয়াসের আধান পারমাণবিক সংখ্যার সঙ্গে সমান। শীগগিরই বোঝা গেল যে আসলে প্রোটনের সংখ্যা দিয়েই আধান নির্ধারিত হয়। আইসোটোপদের ভর আলাদা আলাদা, কিন্তু নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সংখ্যা সমান। রাদারফোর্ড অনুমান করলেন যে নিউট্রন বলে এক কণা আছে, যার ভর প্রোটনের ভরের সঙ্গে প্রায় সমান কিন্তু তার আধান নেই। আইসোটোপদের মধ্যে নিউট্রন সংখ্যা আলাদা আলাদা হয়। পরে তাঁর ছাত্র জেমস চ্যাডউইক সেই নিউট্রনের অস্তিত্ব প্রমাণ করে দেখান। সেই কথা আমরা পরের পর্বে শুনব।

এরপর আগামী সংখ্যায়

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর 

Leave a Reply