বনের ডায়েরি-বন-বন্দুকের ডায়েরি-আহত বাঘের খোঁজে-মার্ভিন স্মিথ-অনু দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য-শীত২০২৪

বন বন্দুকের ডায়েরি আগের পর্বঃ হাতি হাতি, শঙ্খচূড়ের ডেরায়, আলাদিনের গুহা, শিকারী বন্ধু গোন্দ, হুনসুরের আতঙ্ক… পীর বক্স (১), হুনসুরের আতঙ্ক… পীর বক্স (২)বোয়া সাপের খপ্পরে, বে-ডর লছ্‌মণ, মানুষখেকো নেকড়ে , নেকড়ে মানুষ সিয়াল, বাঘমারা ভীম, ডাইনি প্যান্থার, মহিষাসুরের খপ্পরে, অরণ্যের সন্তান জুয়াং, জল হুপু, সাদা বাঘ, সামনে ভালুক, পরদেসি ডোম, ডোঙায় চেপে বুনোকুকুর শিকার, পাগলা হাতি ১ম পর্ব,পাগলা হাতি২য় পর্ব, প্রথম বাইসন, হনুমানখেকো

bonerdiarybonbonduk91

বাংলো থেকে শ-দুয়েক গজ দূরেই বাঘটা ভরদুপুরে একটা গরু মেরেছিল। কাজেই খবরটা আমার কাছে পৌঁছোতে দেরি হয়নি। আমার তখন গায়ে বেশ জ্বর। ওই নিয়ে বাঘের খোঁজে মড়ি পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়। বলে পাঠালাম, এ-যাত্রা কোনো বাঘমারিকে দিয়ে কাজটা মেটানো গেলে ভাল।

সেইমতই বন্দোবস্ত করা হল শেষমেষ। গরুটার শরীরের দুপাশে কয়েকটা ডালপালার হালকা ঘেরা তৈরি করে গলির দু-মুখে বাঘমারিদের ধনুক ফাঁদ পাতা হল দুটো। একেকটা ধনুকে দুটো করে বিষমাখানো তির। সকালে  গিয়ে দেখা গেল, বাঘ এসেছিল রাতে। গলির একদিকে রাখা ধনুকের সঙ্গে বাঁধা সুতোয় থাবা জড়িয়ে যেতে ধনুক থেকে দু-দুটো তিরই বেরিয়ে তার গায়ে গেঁথেছে। ছাপছোপ দেখে এ-ও আন্দাজ হচ্ছিল, খোঁচা খেয়ে সে বোধ হয় লাফঝাঁপ দিয়ে গলির অন্যমুখের দিকে ছুটেছিল। সেখানে রাখা ধনুকের সুতোতেও ঘা দিয়েছিল সে, তবে ছিটকে আসা তিরগুলো তার গায়ে না লেগে মড়ির কাছের মাটিতে গেঁথে পড়েছিল।  সামান্য কিছু লোম আর কয়েক ফোঁটা রক্তই পাওয়া গেল। বাঘ পাওয়া গেল না। তবে বাঘমারিরা ওই দেখেই হইহল্লা শুরু করে দিয়েছিল। বলে, গায়ে তির যখন লেগেছে তখন ও দুশমনের বাঁচার আশা নেই আর। নির্ঘাৎ জঙ্গলে গিয়ে মরেছে কোথাও। এই বলে তারা গ্রামের লোকজন নিয়ে চলল জঙ্গল হাঁটকাতে।

ঘণ্টাখানেক বাদে তারা ফিরে এসে বলে, বাঘের দেখা তাদের মিলেছে। কিন্তু মরা নয়, জ্যান্ত। জঙ্গলে খানিক  ঢুকেই একটা নালা আছে। তার ধারেই বাঘটা ছিল।  মরবার কোনো লক্ষণ তো তার নেইই, উলটে বেদম তাড়া করেছিল তাদের দেখে।

শুনে আমি বললাম, “এখন আর জঙ্গলে ঢুকতে যেও না খবরদার। খোঁচা খাওয়া বাঘ সাক্ষাৎ যম। সন্ধে অবধি অপেক্ষা কর। দেখবে তিরের বিষে ততক্ষণে বাবাজি চোখ ওলটাবেই।”

বিকেল চারটে নাগাদ গ্রামের লোকজন ফের ফেরৎ এল বাঙলোয়। বলে বাঘ একই জায়গায় গেড়ে বসে আছে, তবে ভারী দুর্বল। গেলে গুলি করে মারতে সাহেবের কোনো কষ্ট হবে না। তখনও জ্বর সারেনি আমার। তাছাড়া চোট খাওয়া বাঘের পেছনে ধাওয়া করা যে কতটা বিপজ্জনক সে আমি ভাল করেই জানতাম। কিন্তু এর পরে আর ঘরে বসে থাকা যায় না। লোকজন তাহলে ভাববে তারা বন্দুক ছাড়া যেখানে যেতে সাহস পায় সেখানে বন্দুক হাতেও যাবার হিম্মত সাহেবের নেই। অরণ্যের এই মানুষজনের সঙ্গে চলবার নীতি একটাই, তাদের সবসময় দেখাতে হয় যে আপনি তাদের চেয়ে কম সাহসী নন। একবার যদি তাদের মাথায় ঢোকে যে আপনি ভয় পাচ্ছেন তাহলে আপনার প্রতিপত্তি ধুলোয় লুটোতে বেশি সময় নেবে না।

অতএব আমি বললাম তাদের কাছে কুড়ুল ছাড়া আর কোনো অস্ত্র নেই, কাজেই তাদের এই বিপদের মুখে আমি ঠেলে দেব না। তারা আমার বাংলোয় অপেক্ষা করুক। শুধু রাস্তা দেখাবার জন্য তাদের মধ্যে একজনকে সঙ্গে নিয়ে আমি জঙ্গলে ঢুকব। প্রথমে তো তারা কিছুতেই রাজি হয় না। সাহেবকে এমন বিপদে তারা একা যেতে দেবে না। তবে শেষমেষ যখন দেখল আমি নাছোড় তখন তারা দল বেঁধে বাংলোর সামনে বসে পড়ল, আর একজন চলল আমার সঙ্গে।

শোনা গেল জন্তুটাকে শেষ দেখা গেছে বাংলো থেকে ছশো গজ মতন দূরে একটা ঘন ঝোপের ভেতর। বারো বোরের দু ব্যারেলের বন্দুক আর চারটে গুলি নিয়ে আমি চললাম বাঘ শিকারে। জন্তুটা যেখানে তারা শেষ শুয়ে থাকতে দেখেছিল তার কাছাকাছি পৌঁছে একটা বড়ো গাছের পেছনে গিয়ে লুকোলাম আমি। এইবার আমার সঙ্গের লোকটা কয়েকটা পাথর কুড়িয়ে সামনের ঝোপটার দিকে ছুঁড়তে শুরু করল। দশ-বারোটা ঢিল ছুঁড়েও কোনো ফল না হতে আমি সবে গাছের আড়াল থেকে বাইরে পা বাড়াতে যাব এমন সময় শুনি পেছন থেকে চাপা গলায় কে যেন বলছে, “আরেকটু দূরে ঢিল ছোঁড়। বাঘটা ওই মহুয়া গাছটার পেছনে আছে।”

চমকে উঠে ঘুরে তাকিয়ে দেখি, গোটা দলটাই গুটি গুটি এসে আমার গজচল্লিশেক পেছনে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখ আমার দিকে ধরা। ধমকধামক দিতে তারা বলে, “যেখানে বন্দুক হাতে  স্বয়ং সাহেব আছে সেখানে আবার ভয় কী?  সাহেব নেই টের পেয়ে বাঘ যদি বাংলোয় এসে তাদের ওপর হানা দিত তখন তারা কী করত?”

অতএব তারাও এসে পড়েছে সাহেবের কাছে দল বেঁধে। কী আর করা, বললাম, “চলো তবে।”

এইবার দেখি তাদের আর ভয়ডরের বালাই নেই। একেকবার তো তারা আমাকে ছাড়িয়ে আগে এগিয়ে যায়। ধমক দিয়ে ফের তখন তাদের পেছনে আনতে হয়।

গোটা এলাকাটা ভাল করে খুঁজে দেখা হল এইভাবে। কিন্তু এদিক-ওদিক কয়েক ফোঁটা রক্তের দাগ ছাড়া বাঘের আর কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না। ওদিকে তখন সন্ধে হয়ে আসছে। সেই দেখে আমি তাদের বুঝিয়ে সুজিয়ে ফেরৎ আনবার বন্দোবস্ত করলাম। তবে কথা দিতে হল, সকালবেলা তাদের সবাইকে সঙ্গে করে বাঘ শিকারে যেতে হবে।

রাত্রে আমার জ্বরটা বেড়েছিল খুব। জ্বরের তাড়সে ঘুম আসেনি। মাঝরাত্রের দিকে শুনলাম ফেউ ডাকছে কাছাকাছি কোথাও। এই শেয়ালেরা বাঘ বা লেপার্ডের সঙ্গে সঙ্গে চলে। তাদের খাওয়া শেষ হলে শিকারের টুকরোটাকরা দিয়ে পেট ভরায়। ডাকটা আসছিল, বাঘটাকে লোকজন যেখানে শুয়ে থাকতে দেখেছিল সেই জায়গাটা থেকেই।

সে-রাত্রে ফেউয়ের ডাকটা একটু অন্যরকম ঠেকছিল কানে। যেন কাঁদছে। কান পেতে সেই ডাক শুনে আমার চাপরাশি বলল, “বাঘটা বোধ হয় মারা গেছে সাহেব। ফেউ তার খাবারের জোগানদারের দশা দেখে কাঁদছে।” 

বাঘটা আর বেঁচে নেই ধরে নিয়ে পরদিন সকালে অসুস্থ শরীরে আমি আর বের হলাম না। আমার জেমাদারকে ডেকে বললাম, গ্রামের লোকজন সঙ্গে করে নিয়ে জায়গাটা যেন একবার দেখে আসে। লোকজনকে ভরসা দেওয়ার জন্য তার সঙ্গে আমার বন্দুকটা আর গোটাদুয়েক গুলিও দিয়ে দিলাম।

তারা রওনা হবার আধ ঘণ্টাও কাটেনি, তখন হঠাৎ পরপর দুখানা গুলির শব্দ কানে আসতে চমকে উঠেছিলাম আমি। কিছু অঘটন ঘটে গেছে হয়ত, এই ভেবে তাড়াতাড়ি পকেটে গোটাচারেক কার্তুজ পুরে নিয়ে আমি তখনই ছুট দিলাম জঙ্গলের দিকে।

পৌঁছে দেখি প্রায় ডজনখানেক লোক গাছের মাথায় চেপে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে আর আমার জেমাদার গুটিদুই খোঁজারুকে নিয়ে দিব্যি জঙ্গল ঢুঁড়ে বাঘ খুঁজছে। জিজ্ঞেস করতে সে বলে, বাঘ বেঁচে আছে। আগের দিন যেখানটায় আমি গাছের পেছনে লুকিয়েছিলাম,  তার কয়েক পা পেছনে সে একটা ঝোপের ভেতর লুকিয়ে ছিল। নাকি সেখানেই সারা রাত ঘুমিয়েছে সে।

কথাটা ভুল নয়। তার দেখিয়ে দেওয়া ঝোপটার ভেতর ঢুকে দেখি সেখানে নরম মাটিতে পরিষ্কার তার শরীরের ছাপ। দু-এক ফোঁটা রক্তের দাগও ছড়িয়ে আছে এদিক-ওদিক। দেখে আমার হাত পা ঠাণ্ডা হবার জোগাড়। তার মানে আমরা যখন তাকে সামনের দিকে খুঁজছিলাম, সে তখন আমাদের পেছনে ঝোপের ভেতর বসে আমাদের  কাজকর্ম দেখছিল চুপচাপ! তবে খুব দুর্বল ছিল বলেই বোধ হয় তেড়ে আসেনি। বাঘমারিরা জানাল, তিরে ডাকারা (অ্যাকোনাইট)-এর বিষ মাখানো হয়েছিল। সে বড়ো তেজি বিষ। তবে মাসদুয়েক আগে মাখানো হয়েছিল বলে বোধ হয় তার তেজ খানিক ফিকে হয়েছিল। তাই বাঘ তাতে কাহিল হয়েছে শুধু। একেবারে মরেনি।

জেমাদারের কাছে জানা গেল, সে এখানে পৌঁছে হঠাৎ করেই দশ বারো পা দূরে  ঝোপের মধ্যে জন্তুটাকে দেখতে পেয়ে গুলি চালিয়েছিল। কিন্তু সে গুলি বাঘের গায়ে লাগেনি। শব্দ শুনে বাঘ লাফ দিয়ে উঠে ছুট দেয়। জেমাদার তখন দু’নম্বর গুলিটা করতে সেটা বাঘের গায়ে লাগে। (পরে দেখা গিয়েছিল, গুলিটা লেগেছে তার পেটে, যেখানে বিষ তিরের খোঁচা খেয়েছিল সে তার কাছাকাছি এলাকায়।) তাইতে যে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরেছে, তার দাগ ধরেই এখন তাদের খোঁজা চলেছে। সে নাকি সেই খোঁজ নিয়ে তবে বাংলোয় ফিরে আমায় খবর দেবার মতলবে ছিল।

লোকটার সাহস দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে যাছিলাম। সঙ্গে একটা খালি বন্দুক। সঙ্গী দুজনের সঙ্গে শুধু দুখানা কুড়ুল। আর সেই নিয়ে তারা পায়ে হেঁটে আহত বাঘের পিছু করছে!

জ্বরটর তখন আমার মাথায় উঠেছে। বন্দুকে গুলি পুরে, ট্রিগারে আঙুল রেখে আমি বললাম, “আমার পেছন পেছন এস তোমরা।”

তবে বেশিক্ষণ তাদের পেছনে সরিয়ে রাখা গেল না। গভীর জঙ্গলে ইতিউতি হালকা রক্তের দাগ খুঁজে খুঁজে পথ বের করা আমার সাধ্যের বাইরে। কাজেই খানিক বাদে তাদেরকেই খোঁজারুর কাজে লাগাতে হল আমায়।

খুঁজতে খুঁজতে প্রায় দুশো গজ মতন এগিয়ে গেলাম, তবুও বাঘের কোনো চিহ্ন নেই। জঙ্গল সেখানে তখন আরো গভীর আর ঘন হয়ে উঠেছে। ফলে খোঁজারুর দলটার আর একসঙ্গে জটলা বেঁধে থাকা সম্ভব হচ্ছিল না। আমাকে ঘিরে তারা এদিক ওদিক অনেকটা জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে যে যেভাবে পারে খুঁজতে খুঁজতে এগিয়ে যাচ্ছিল। এমন অসময় হঠাৎ সামনের দিক থেকে খসখসে গলায় ‘ঘ্রাংক ঘ্রাংক’ করে শব্দ উঠল একটা। নজর করে দেখি ঝোপে আড়ালে মাত্র দশ পা দূরে একেবারে মুখোমুখি বাঘটা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। মুখটা হাঁ করে বিরক্তির হাঁক ছাড়ছে বারবার।

হাঁ-করা মুখটার দিকে বন্দুকের নিশানা নিতে না নিতেই সে আবার মাথা নিচু করে একটা ঝোপের ভেতর মিলিয়ে গেল। বন্দুকের নলটা সতর্কভাবে ঝোপটার দিকে বাগিয়ে ধরে রেখে আমি ইশারায় সঙ্গের লোকজনকে পিছিয়ে আসতে ইশারা করলাম। তবে তার খুব একটা দরকার ছিল না। আওয়াজটা শুনেই তাদের ভেতর দুজন বাদে বাকিরা নিজে থেকেই আমার পেছনদিকে চম্পট দিয়েছে।  আমার সঙ্গে রয়েছে শুধু লালু তাঁতি আর পূরদান ভূমিজ। আমার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তারা ফিসফিস করে বলছিল, “মাথা দেখা না গেলে গুলি ছুঁড়ো না সাহেব। এক গুলিতে না মারা গেলে এ আমাদের তিনজনকেই শেষ করে দেবে।”

প্রায় পাঁচমিনিট ওভাবেই পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইলাম আমরা। বাঘ মাথা আর তোলে না। শুধু মাঝে মধ্যে  ঝোপের আড়াল থেকে গরগর করে হুঙ্কার ছাড়ে। শেষমেষ আমি পূরদানকে গাছে চড়ে বাঘটা ঠিক কোথায় লুকিয়ে বসে আছে তাই দেখে নিতে বললাম পূরদানকে। পূরদান চটপট একটা উঁচু দেখে গাছ বেছে নিয়ে তার মাথায় চড়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে সেখান থেকেই বলে, “সাহেব, বাঘ ঝোপের পেছনেই বসে আছে। আর আপনি যেখানটায় দাঁড়িয়ে আছেন সেদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে লেজ আছড়াচ্ছে। সামনাসামনি এগোবেন না। ঘুরে ওর পেছন দিক দিয়ে যান। ”

ইতিমধ্যে আমার জেমাদারও পুনরাবির্ভূত হয়েছে। তাকে অন্য একটা গাছে চেপে নজর রাখতে বলে আমি লালুকে সঙ্গে নিয়ে বন্দুক হাতে চললাম বাঘের পেছন দিক দিয়ে হামলা করতে।  রওনা দিয়েছি তার পাঁচ মিনিটও হয়নি, তখন হঠাৎ গাছের মাথা থেকে পূরদানের পরিত্রাহি চিৎকার উঠল, “আপনাদের দিকে বাঘ তেড়ে যাচ্ছে সাহেব…”

তাড়াতাড়ি ঝোপের ভেতর দিয়ে উঁকি মেরে দেখি কথাটা মিথ্যে নয়। ঠিক তেড়ে আসছে না অবশ্য। খানিক টলতে টলতে প্রায় পঞ্চাশ পা দূর থেকে আমার দিকে এগিয়ে আসছে সে। খানিক আসে, আবার থেমে গন্ধ শোঁকে, তারপর ফের এগোয়। আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে বন্দুকটা বাগিয়ে ধরে লালুকে বললাম, “আমার পেছনে যা।”

যখন প্রায় তিরিশ পা দূরে, তখন বাঘ ফের নিচু হয়ে ঝোপের ভেতর গা ঢাকা দিল। সেখানে আলো-আঁধারিতে যে জায়গাটাকে তার মাথা মনে হচ্ছিল সেখানটায় নিশানা ধরে রেখেছিলাম আমি। বারবার মনে হচ্ছিল, ট্রিগারে চাপ দিয়ে দি। কিন্তু অনেক কষ্টে সে লোভ আটকাতে হল আমাকে। পরিষ্কার নিশানা না ঠিক করে নিয়ে ওই কালান্তক জীবের ওপর আক্রমণ শানানো আর নিজের মৃত্যুর  পরোয়ানায় সই করা একই ব্যাপার।

ওদিকে গাছের মাথা থেকে জেমাদার তখন ডেকে বলছে, “এখান থেকে বাঘ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে সাহেব। ঘুরে এদিকটা চলে আসুন…” পা চালিয়ে তার গাছের নিচে পৌঁছোতে সে বলে বাঘ তখনও সেই একই

জায়গায় রয়েছে। নড়েনি।

কিন্তু মুশকিল হল, মাটি থেকে তাকে দেখা যাচ্ছিল না। দু একবার গাছ বেয়ে ওঠবার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিলাম। ও কাজ আমার দ্বারা সম্ভব নয়। তখন জেমাদার বলে, “বন্দুকটা আমায় দাও সাহেব। আমি এখান থেকে এক গুলিতে ওর খুলি উড়িয়ে দি।”

বন্দুকটা তার দিকে হাত উঁচিয়ে বাড়িয়ে ধরে আমি বললাম, “একটাই গুলি করবি। বাঘ এদিকমুখো তেড়ে না এলে দু’নম্বর গুলি করবি না খবরদার।”

এই বলে আমি গিয়ে লুকোলাম গাছটার পেছনদিকে। একেবারে খালি হাতে সেখানে দাঁড়িয়ে বুকটা দুরদুর করছিল আমার।  কয়েক সেকেন্ড বাদেই জেমাদারের গলা ভেসে এল ফের, “বাঘ এদিকেই আসছে সাহেব। গুলি করি?”

বললাম, “কর। মাথায় তাক করবি।”

পরমুহূর্তেই গুড়ুম করে জেমাদারের হাতের বন্দুক হেঁকে উঠল। জবাবে বাঘটা একটা চিৎকার করে উঠেই একেবারে চুপচাপ হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি জেমাদারের থেকে বন্দুকটা লুফে নিয়ে আমি তার ফাঁকা ব্যারেলে একটা নতুন কার্তুজ পুরে নিলাম।

একটুক্ষণ অপেক্ষা করবার পর জেমাদার যখন বলল, বাঘ চুপচাপ চিৎ হয়ে পড়ে আছে, নড়ছে না, তখন নিশ্চিন্ত হয়ে তার কাছাকাছি গিয়ে দেখা গেল বাঘ মরেছে। জেমাদারের গুলি তার ডান চোখের ঠিক ওপরে গিয়ে লেগেছিল।

বাংলোয় নিয়ে গিয়ে মেপেজুকে দেখা গেছিল, সে এক বাঘিনী। মাথা থেকে লেজ অবধি পাক্কা আট ফিট তিন ইঞ্চি লম্বা আর সাড়ে তিন ফিট উঁচু। তার পেটে গুলির দাগের কাছাকাছিই বিষের তিরের ফলাটা তখনো গেঁথে ছিল। সেখানে ততক্ষণে বিশ্রি একটা ঘা হয়ে গেছে। ঐ বিষের জ্বালাতেই তার নড়াচড়ায় অত ঢিলেমি এসেছিল। নইলে হয়ত পরপর দুদিন অত কাছাকাছি এসে প্রাণ নিয়ে ফিরতে হত না আমাদের।

বনের ডায়েরি সব লেখা একত্রে

Leave a Reply