ধারাবাহিক-নৌকা চেপে তিনজনায়-জেরোম কে. জেরোম-ভাষান্তর- দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য- শরৎ-২০২৫

আমরা দলে ছিলাম কুল্যে চারজন। আমি, জর্জ, দুই হ্যারিস—উইলিয়াম আর স্যামুয়েল, আর মন্টমোরেন্সি। আমার ঘরে সবাই মিলে জটলা চলছিল। এন্তার তামাক পুড়ছিল, আর সেই সঙ্গে আমাদের শরীরগতিকের হাল কী পরিমাণ সঙ্গিন হয়েছে সেই নিয়ে বেজায় গম্ভীর আলোচনা চলছিল।

আমাদের প্রত্যেকেরই কেমন যেন ঘুমঘুম ভাব, বেশ নার্ভাস করে দেয়া একটা দশা। হ্যারিস বলে, ঘুমঘুম ভাবের সঙ্গে তার আবার মাথাটাও নাকি চক্কর দিচ্ছে। এমন চক্কর যে, কোথায় আছে, কী করছে তার দিশাটাও পাচ্ছে না ঠিকঠাক। ওদিকে আমার আবার লিভারটা বেকায়দা হয়েছে। ব্যাপারটা আমি সম্প্রতি একটা বিজ্ঞাপন পড়ে জানতে পেরেছি। পেটেন্ট নেয়া লিভারের বড়ির এই বিজ্ঞাপনটায় লিভার বেকায়দা হবার যা যা লক্ষণ লেখা ছিল, তার সবক’টাই আমার মধ্যে খুঁজে পেয়েছি আমি।

এই ওষুধের বিজ্ঞাপনের ব্যাপারটা আমাকে মাঝে-মধ্যেই বেশ ঘাবড়ে দেয়। কী করে এটা ঘটে আমি জানি না, কিন্তু বিজ্ঞাপনে যে-অসুখের কথাই বলুক না কেন, পড়বার সঙ্গে-সঙ্গেই তার সমস্ত লক্ষণ আমার শরীরে জ্বলজ্বল করে ওঠে!

মনে আছে, একবার আমি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে গিয়েছিলাম। গিয়েছিলাম শরীরে সামান্য একটু অস্বস্তি নিয়ে। বোধ হয় হে ফিভার হয়েছিল একটু। তা সে-বিষয়ে একখানা বই থেকে পড়তে গিয়ে অন্যমনস্কভাবে তার পাতা উলটে উলটে আমি অন্যান্য অসুখদের বিষয়ে পড়তে আরম্ভ করি। তারপর, কী একটা ভয়াবহ মহামারী টাইপের রোগের পাতায় এসে তার প্রাথমিক সিম্পটমগুলোর দিকে চোখ পড়তেই আমি খেয়াল করলাম, আমার মধ্যে সেই লক্ষণগুলো ভরপুর মাত্রায় দেখা দিয়েছে!

দেখে আমি কিছুক্ষণ বজ্রাহতের মতো বসে রইলাম। তারপর খানিক সাহস সঞ্চয় করে ফের পাতা ওলটালাম। এবারে এল টাইফয়েডের জ্বরের পাতা। লক্ষণগুলো পড়লাম এবং নিশ্চিত হলাম, আমার টাইফয়েড হয়েছে। আজ নয়, অন্তত মাস খানেক ধরেই হয়ে আছে। তারপর মনে হল, আমার আর কী অসুখ আছে দেখি। তখন সূচিপত্র ঘেঁটে খুঁজে বের করলাম, ‘সেইন্ট ভিটাসের ব্যাধি’। লক্ষণ মিলিয়ে দেখলাম। সেটাও আমার আছে। এইবারে আমার ভীষণ কৌতূহল হল। ঠিক করলাম, আমার রোগ-বৃত্তান্তের ইতিহাস আমি সম্পূর্ণ ঘেঁটে দেখব। অতএব এইবার এলোমেলো পাতা ওলটাবার বদলে আমি বইতে বলা রোগব্যাধির বর্ণানুক্রমিক অনুসন্ধান শুরু করলাম। প্রথমেই অতিসার। দেখা গেল আমার শরীরে সে-রোগের চূড়ান্ত লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করেছে। আর কয়েকদিনের মধ্যেই শেষদশা উপস্থিত হবে। বি-তে ব্রাইটস ডিজিজ দেখা গেল আমার আছে বটে, তবে একটু আলাদা চেহারায়। ওতে কয়েক বছর আরও বাঁচবার সম্ভাবনা। সি-তে কলেরা তো আমার অনেকদিন ধরে চলছে। ডি-তে ডিপথিরিয়া আমার জন্ম থেকে হয়ে আছে। এইভাবে এ থেকে জেড অবধি ছাব্বিশটা অক্ষরে যত রোগ আছে, সমস্ত পড়বার পর বোঝা গেল এক ‘ব্যথিত মালাইচাকি’ রোগ বাদে বর্ণমালার হেন কোনও রোগ নেই যা আমার শরীরে বাসা বাঁধেনি।

দেখে শুরুতে সামান্য অপমানিতই বোধ করেছিলাম। কেন আমার ব্যথিত মালাইচাকি হবে না? কোন দোষে সে আমাকে উপেক্ষা করে? তবে খানিক বাদে দুঃখটা কমে গেল। ভাবলাম, আহা, ডাক্তারি বইয়ের আর সমস্ত রোগই তো আমার আছে। এইটুকু না-হয় ছেড়েই দিলাম। এত লোভ কি ভালো? ব্যথিত মালাইচাকি বাদ দিয়েই না-হয় চালিয়ে নেব কোনোমতে। অন্তত ভয়াবহ গাউট তো আমার রইলই! অথবা জাইমোসিস! যা বুঝেছি, সে-রোগ আমার ছেলেবেলা থেকেই ভরপুর আছে। অমন দুর্লভ রোগ! ক’টা লোক পায়?

জেড-এ জাইমোসিস। ওর পরে আর রোগ নেই। কাজেই বইটা বন্ধ করে এবারে আমি চুপ করে বসে বেশ খানিক ভাবলাম। ডাক্তারির দৃষ্টিকোণ থেকে নিজেকে একটা দুর্ধর্ষ নমুনা বলে ঠাহর হচ্ছিল আমার। মেডিক্যাল কলেজের যে-কোনো ক্লাশ-রুমে আমার যা খাতির জুটবে, সে কহতব্য নয়। ছাত্রদের আর গোটা হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে নানান রোগের লক্ষণ শিখতে হবে না। আমার এক শরীরেই সব আছে! আমি এক চলন্ত হাসপাতাল। হাসপাতাল ঘোরবার দরকার নেই, হে ছাত্রগণ। তোমরা আমাকে প্রদক্ষিণ করো এবং ডিগ্রি নিয়ে বাড়ি যাও।

এরপর আমার মাথায় চিন্তা এল, আমি আর কতদিন বাঁচব! নিজেকে পরীক্ষা করবার চেষ্টা করলাম আমি। কবজি টিপে ধরে নাড়ি দেখলাম। নেই। বেশ খানিকক্ষণ চেপে ধরে থাকবার পরে হঠাৎ সেটা লাফ মেরে চলতে শুরু করল। তখন আমি আমার ঘড়িটা বের করে এনে তার গতি মাপলাম। মিনিটে একশো সাতচল্লিশ। বুকে হাত দিয়ে হার্টটাকে দেখলাম। চলছে না। না! এ হতে পারে না। তাহলে বেঁচে আছি কী করে? তখন আমি হার্টটাকে খুঁজতে শুরু করলাম। কোমর থেকে গলা অবধি বুকে-পেটে ইঞ্চি ইঞ্চি এলাকা থাবড়া মেরে মেরে দেখলাম। তারপর পেটের দু-পাশে, পিঠের দিকে— কিন্তু কোথাও হৃৎপিণ্ডের কোনও সাড়াশব্দ নেই। তারপর আমি আমার জিভ পরীক্ষা করলাম। মুখ থেকে যতদূর অবধি যায় সেটাকে বের করে, প্রথমে বাঁ চোখ বুজে, তারপর ডান চোখ বুজে সেটাকে পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করলাম। তাতে কেবলমাত্র জিভের ডগাটা আমার চোখে পড়ল। তাতে যা দেখলাম ততটুকুতেই নিশ্চিত হলাম যে আমার স্কার্লেট ফিভার হয়েছে। সব মিলিয়ে সেদিন লাইব্রেরির রিডিং-রুমে আমি ঢুকেছিলাম এক সুখী যুবক হিসেবে, আর বের হয়ে এলাম যখন, তখন আমি এক জরাজীর্ণ ধ্বংসস্তূপ।

এরপর আমি ডাক্তারের কাছে গেলাম। সে আমার পুরোনো বন্ধু। মাঝে-মাঝেই আমার পেট টেপে, নাড়ি দেখে, জিভ পরীক্ষা করে। তবে কোনও কাজে আসে না। ভাবলাম এইবারে সে সত্যিকার কাজে আসবে, অতএব  আমি তার কাছে চলে গেলাম। যেতে যেতে ভাবছিলাম, একজন ডাক্তারের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কী? না, প্র্যাকটিস! প্রচুর রোগী দেখে দেখে প্র্যাকটিস। এইবারে আমিই হব তার প্র্যাকটিসের প্রধান উপকরণ। সতেরোশো রোগী দেখার প্র্যাকটিসের সমপরিমাণ ফল পাবে সে একা আমাকে দেখে।

আমাকে দেখে সে বলল, “তোমার আবার কী হল?”

আমি জবাব দিলাম, “আমার কী হয়েছে বা হয়নি সে নিয়ে বেশি বকবক করে আমি তোমার সময় নষ্ট করবে না হে। কারণ জীবন বড়োই সংক্ষিপ্ত। ফলে আমার রোগের ফিরিস্তি দিতে শুরু করলে তা শেষ হবার আগে তুমি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করে ফেললেও ফেলতে পারো। অতএব কোন রোগটা আমার হয়নি সে-কথা আমি তোমাকে বলতে পারি। আমার ব্যথিত মালাইচাকি রোগ নেই। এই একটামাত্র রোগ বাদে চিকিৎসাশাস্ত্রের চেনা আর সমস্ত রোগই আমার আছে।”

তারপর আমি তাকে সংক্ষেপে আমার লাইব্রেরি অভিযানের বৃত্তান্ত শোনালাম। তারপর সে আমার মুখ খুলিয়ে সেই পথে আমার পেট অবধি দেখল, আমার মণিবন্ধ খপ করে চেপে ধরল, আমার অন্যমনস্ক মুহূর্তে কাপুরুষের মতো আমার বুকে দুমদাম গুঁতো মারল, তারপর আমার মাথায় ঠোনা মারল। অবশেষে মারধোর শেষ হলে সে বসে একটা প্রেসক্রিপশন লিখে সেটা যত্ন করে ভাঁজ করে আমার হাতে ধরিয়ে দিল। আমি ভাঁজ করা প্রেসক্রিপশন পকেটে গুঁজে তার চেম্বার ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। তারপর এক ওষুধের দোকানে এসে সেটা দোকানদারের হাতে গছিয়ে দিয়ে বললাম, “যা যা লিখেছে সব দিয়ে দিন।”

লোকটা প্রেসক্রিপশনটা মন দিয়ে পড়ল। তারপর সেটা আমায় ফেরত দিয়ে বলে, “এ-দোকানে হবে না।”

আমি তাতে রেগে গিয়ে বললাম, “ধুর মশাই! এটা ওষুধের দোকানই তো, নাকি? তাহলে হবে না বলছেন কেন?”

তাতে লোকটা বলে, “ওষুধের দোকান বলেই তো হবে না মশাই। কো-অপারেটিভের মুদিখানা আর হোটেল একসঙ্গে হলে তবে এ-কাগজের জিনিসপত্তর সাপ্লাই করতে পারবে।”

এবারে আমি কাগজটা খুলে পড়লাম।—

প্রতি ছ’ঘণ্টায় এক পাউন্ড বিফস্টেক ও এক পাঁইট তিক্ত বিয়র।

প্রত্যহ প্রভাতে ১০ মাইল হন্টন।

প্রত্যহ রাত্রি ১১ ঘ. গতে শয়ন।

উপদেশ:

যা বোঝো না তা নিয়ে মাথা ঘামানো ক্ষতিকর।

আমি ডাক্তারের সেই প্রেসক্রিপশন অক্ষরে অক্ষরে পালন করে নিজেকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছি এবং আজও বেঁচেবর্তে রয়েছি।

এই মুহূর্তে লিভারের ওষুধের এই বিজ্ঞাপন পড়ে আমি নিশ্চিত যে উল্লিখিত অসুখের সব লক্ষণই আমার আছে। এদের মধ্যে একটা লক্ষণ খুবই পরিস্ফুট— তা হল, ‘যে-কোনো প্রকার কাজকর্মে প্রবল অনীহা’।

এতে আমি যে কী নিদারুণ কষ্ট পাচ্ছি তা আমি কাকেই-বা বোঝাব? শৈশব থেকে এই রোগ একটা দিনের জন্যও আমার পিছু ছাড়েনি। তখনও চিকিৎসাবিজ্ঞান আজকের মতো উন্নত নয়। তখনও সভ্যতা জানত না, এ হল লিভারের অসুখের লক্ষণ। মূর্খ সমাজ তাই বলত, আমি নাকি অলস!

তারা আমায় বলত, “আরে শয়তান ছোঁড়া, কাজকম্মো কিছু কর অন্তত। নইলে খাবি কী?”

তারা জানত না আমি অলস নই, আমি লিভারের ব্যাধিতে গুরুতর অসুস্থ। তাই তারা আমায় রোগ নিরাময়ের জন্য ওষুধের বদলে আমার মাথায় নিদারুণ গাঁট্টা মারত। আশ্চর্যের বিষয় হল, কখনো-কখনো এই গাঁট্টা-চিকিৎসায় আমার রোগলক্ষণ কমেও আসত। এই হল আগেকার দিনের চিকিৎসার গুণ। মাথায় একটা ঠিকঠাক গাঁট্টা আমার রোগলক্ষণকে মুহূর্তে  তাড়িয়ে দিয়ে আমাকে কাজ করতে যে পরিমাণ উদ্বুদ্ধ করত, আজকালকার এক বাক্স ওষুধেও ততটা ফল আমি পাই না।

ছবি-জয়ন্ত বিশ্বাস

জয়ঢাকের সমস্ত গল্পের লাইব্রেরি এই লিংকে

Leave a Reply