শিশির বিশ্বাস-এর সমস্ত গল্প

অফিসের কাজে কাঞ্চিপুরম যাচ্ছিলাম। এদিকের ট্রেনে সারা বছরই ভিড় খুব বেশি। সেদিন কিন্তু মামবালম থেকে উঠে বেশ অবাক হয়ে গেলাম। কামরায় যাত্রী বলতে মাত্র আর একজন। লালমুখো এক ইউরোপিয়ান।
এক সময় সাহেবদের চেহারার বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখকরা জাঁদরেল বিশেষণটি প্রায় সব ক্ষেত্রেই জুড়ে দিতেন। একালে সে-সব সাহেবদের দেখা প্রায় আর মেলেই না। তবু গোড়ায় ভদ্রলোককে কিছুটা ব্যতিক্রম বলেই মনে হয়েছিল। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স। কপালে ভাঁজ পড়েছে গোটা কয়েক। নিখুঁত পোশাক পরিচ্ছদ। চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ। চোখে গাঢ় রঙের সানগ্লাস। হাতে মোটাসোটা একটা বই নিয়ে নিবিষ্ট মনে পড়ছেন। আমার পায়ের শব্দে সামান্য মাথা তুলেই ফের বইয়ের ভিতর ডুবে গেলেন। ট্রেনে উঠে একটু গুছিয়ে বসতে পারলেই আমার ঘুম পায়। বোধহয় দু-তিনটের বেশি স্টেশন পেরোয়নি, জানলার ধারে বসে যথারীতি ঢুলতে শুরু করেছি। হঠাৎ ছোট্ট একটা ঝাঁকুনিতে চোখ মেলে দেখি, ভদ্রলোক কখন জায়গা বদল করে আমার উল্টো দিকে এসে বসেছেন। আমাকে চোখ মেলতে দেখে একটু উসখুস করে হঠাৎ আমার দিকে ঝুঁকে এলেন। গলাটা একটু ঝেড়ে নিয়ে সামান্য ভাঙা ইংরেজিতে বললেন, “হ্যালো মিস্টার, তুমি কি হিন্দু? আই মিন তুমি কি দেবদেবীর মন্দিরে যাও?”
হঠাৎ ঐ অদ্ভুত প্রশ্নে গোড়ায় একটু অবাক হলেও সাহেবের হাতের সেই বইটির দিকে নজর পড়তে বোঝা গেল ব্যাপারটা। বইটির নাম ‘টেম্পলস অব সাউথ ইন্ডিয়া’। সন্দেহ নেই, ভদ্রলোক ট্যুরিস্ট। কিংবা ভারতের মন্দির নিয়ে গবেষণা করতে এদেশে এসেছেন। সামান্য মাথা দুলিয়ে ভদ্রলোকের প্রশ্নের উত্তরটা জানিয়ে দিলাম।
“কত মন্দিরে গিয়েছ তুমি? অনেক? থাউজ্যান্ড? ল্যাখ?”
গাঢ় সানগ্লাসের আড়ালে চোখের তারা অদৃশ্য। কিন্তু গলার স্বর, মুখের ভাঁজেই বোঝা যাচ্ছিল কি ভীষণ উৎকন্ঠা নিয়ে উত্তরটা জানতে চাইছেন মানুষটি। সামান্য হেসে বললাম, “না অত নয়। তবে সাউথ ইন্ডিয়ার অনেক মন্দিরেই আমি গেছি।”
ভদ্রলোক আরো ঝুঁকে পড়ে বললেন, “মিস্টার, তুমি এমন কোন মন্দির দেখেছ, যেখানে দেবমূর্তির একটা মাত্র চোখ?”
গোড়ায় প্রশ্নটা ঠিক ধরতে পারিনি। মাথা নাড়লাম, “না না, তেমন কোন মন্দিরে আমি যাইনি। তা ছাড়া, এক চোখের কোন দেবদেবী হিন্দুশাস্ত্রে আছে বলেও আমার জানা নেই।”
“না না, তা নয়,” মাথা ঝাঁকালেন ভদ্রলোক, “আমি সে কথা বলছি না। মানে এমন কোন দেবদেবীর মূর্তি, যার একটা চোখ খোয়া গেছে। আই মিন চুরি।”
আমি মাথা নাড়লাম।

একটু যেন নিরাশ হলেন উনি, “ভাল করে মনে করে দেখ তো! মন্দির ছাড়া অন্য কোথায়, কোনও মিউজিয়াম, কিউরিও শপ, অথবা কারও ব্যক্তিগত সংগ্রহে। আই মিন, পুরোনো দিনের অনেক দেবদেবীর মূর্তিও তো এখন আর মন্দিরে নেই।”
বলা বাহুল্য, তেমন কোনও দেবমূর্তির খোঁজ আমার জানা ছিল না। কিন্তু তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলাম না। ইতিমধ্যে মনের ভিতর সামান্য কৌতূহল উঁকি মারতে শুরু করেছে। বললাম, “হঠাৎ এমন এক দেবমূর্তির খোঁজ করছেন কেন?”
“হঠাৎ নয় মিস্টার। আজ প্রায় দেড় বছর হল এদেশে এসেছি ওই দেবমূর্তির খোঁজে। প্রায় চষে ফেলেছি সারা ভারতবর্ষ।”
হেসে বললাম, “ওই রকম এক দেবমূর্তি যে এদেশে থাকতে পারে, তা কী করে ভাবলেন আপনি?”
“আমি জানি, এমন এক দেবমূর্তি সত্যিই রয়েছে। আর তার খোঁজ যে করেই হোক পেতেই হবে আমাকে।”
থামলেন উনি। সানগ্লাসের আড়ালে সম্ভবত আমার উপর একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। তারপর ফের বলতে শুরু করলেন, “তুমি তো হিন্দু। দেবতার অভিশাপে বিশ্বাস করো?”
চট করে কোনও উত্তর জোগাল না। অবশ্য সে জন্য উনি অপেক্ষাও করলেন না। বললেন, “লিসবনের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারকে অভিশাপ থেকে মুক্ত করার জন্য ওই বিশেষ দেবমূর্তি গত দেড় বছর ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছি আমি।”
অবাক হয়ে বললাম, “হিন্দু দেবতার অভিশাপ লিসবনের এক ইউরোপিয়ান পরিবারের উপর তো পড়ার কথা নয়। অবশ্য যদি ওরা হিন্দু হয় তো আলাদা কথা।”
“নো মিস্টার। লিসবনের বেনডিক্ট ডি-সুজার পরিবার গোঁড়া ক্যাথলিক। তবুও গত তিনশো বছর ধরে এক হিন্দু দেবতার অভিশাপ ডি-সুজা পরিবারকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আজ আট পুরুষ পরে এসেও রেহাই মেলেনি। ভাবতে পারো?”
শুরু থেকেই মানুষটির কথাবার্তা কেমন প্রলাপের মতো। এখন আর কোনও সন্দেহই রইল না যে, সাহেবের মাথাটাই গেছে। তবু গল্পের গন্ধে সামান্য উসকে দেবার জন্যই বললাম, “তা ডি-সুজা পরিবার কী এমন অপরাধ করেছিলেন যে, আট পুরুষ পরেও তাঁদের উপর অভিশাপের খাঁড়া ঝুলছে?”
কাজ হল। সামান্য ইতস্তত করে ভদ্রলোক বললেন, “ইয়েস মিস্টার, অপরাধ করেছিলেন বেনডিক্ট ডি-সুজার এক পূর্বপুরুষ। গোঁড়া ক্যাথলিক ম্যানুয়েল ডি-সুজা অবশ্য ব্যাপারটাকে আদৌ অপরাধ বলে ভাবেন নি। সে সব তিনশো বছর আগের কথা। কোম্পানির আমলের একেবারে গোড়ার দিক। ইংরেজ আর ডাচদের পাশাপাশি পোর্তুগিজরাও ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ব্যবসা মানে লুঠতরাজ। অবশ্য আগের মতো রমরমা আর নেই। তবু মোটামুটি চলছে। ম্যানুয়েল ডি-সুজা এই সময়েই ভারতে আসেন।”
এই পর্যন্ত বলে সামান্য থাকলেন ভদ্রলোক। মনে হল, সানগ্লাসের আড়ালে একবার দেখে নিলেন আমাকে। বোধ হয় বুঝে নিতে চাইলেন গল্পটা আদৌ শুনছি কিনা। তারপর ফের শুরু করলেন, “ম্যানুয়েল ডি-সুজা এদেশে এসেছিলেন জাহাজের সামান্য এক খালাসি হয়ে। কতই বা মাইনে! প্রতি মাসে পাঁচ কি সাত ক্রুসাডো। প্রতি ক্রুসাডোর বাজার দর সেকালে আড়াই শিলিং–এর বেশি হত না। এই সামান্য মাইনের জন্য কেউ কি আর দেশ ছেড়ে এত দূরে আসে! সুতরাং বুঝতেই পারছ, সকলের আসল লক্ষ্য ছিল উপরি পাওনা, অর্থাৎ লুঠতরাজ। যেখানে সেটা সম্ভব নয়, সেখানে চুরিতেও এরা পিছপা হত না।
“ম্যানুয়েল ডি-সুজাও ব্যতিক্রম ছিলেন না। বছর আড়াই এদেশে ছিলেন। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে সব মিলিয়ে প্রচুর রোজগার করে ফেলেছিলেন। ম্যানুয়েল এই সময়েই এখানে এক মন্দিরের খোঁজ পান। সেখানে পাথরের দেবমূর্তির চোখে নাকি দুটো হিরে বসানো। খবরটা কানে আসতেই মনস্থির করতে আর দেরি করেন নি। দলবলসহ মন্দির লুঠ খুব একটা কঠিন ব্যাপার ছিল না হয়তো। কিন্তু সে ক্ষেত্রে হিরে দুটো চলে যেত ক্যাপ্টেনের হেফাজতে। সুতরাং, হিরে দুটো তিনি চুরি করবেন ঠিক করলেন। দিন কয়েকের মধ্যে বিস্তারিত খোঁজ খবর নিয়ে এক রাত্তিরে হানা দিলেন সেই মন্দিরে। পুরোহিতসহ মন্দিরের জনা কয়েক স্থায়ী বাসিন্দা পাশের একটি ঘরে বাস করত। জনা কয়েক প্রহরী শুধু রাত কাটাত মন্দির সংলগ্ন নাটমন্দিরে। ম্যানুয়েল খবর নিয়ে জেনেছিলেন, এদের কেউই রাতে তেমন জেগে থাকে না। রাত কিছু বাড়লেই একে একে ঘুমিয়ে পড়ে সবাই। সুতরাং তেমন সমস্যা হয় নি। নাটমন্দিরের পাশের দরজা দিয়ে ঢুকে ঘুমন্ত প্রহরীদের পাশ কাটিয়ে খুব সহজেই পৌঁছে গিয়েছিলেন মন্দিরের গর্ভগৃহে। ভিতরে সিংহাসনের উপর দেবমূর্তির সামনে প্রদীপ জ্বলছে। আবছা আলো-আঁধারি পরিবেশ। সেই স্বল্প আলোয় জ্বলজ্বল করছে দেবমূর্তির চোখের হিরে দুটো। ম্যানুয়েল এরপর সময় নষ্ট করেন নি। সঙ্গে কয়েকরকম লোহার ফলা, উকো ইত্যাদি নিয়ে এসেছিলেন। সেগুলো নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেবমূর্তির উপর। প্রায় পায়রার ডিমের আকারের বাঁ চোখের পাথরটা খুলে ফেলেছিলেন সামান্য চেষ্টাতেই। গন্ডগোলটা হল এর পর। তড়িঘড়ি করার জন্যই হোক, বা অন্য কোনও কারণে হঠাৎ পায়ে লেগে পুজোর কোনও পাত্র আচমকা ঝনঝন করে উল্টে যেতে প্রহরীরা জেগে উঠে হইচই শুরু করে দিল। দেবমূর্তির দ্বিতীয় চোখ ম্যানুয়েল তখন সবে ছুরি দিয়ে খোঁচাতে শুরু করেছেন। কিন্তু বেগতিক দেখে সেটার আশা ত্যাগ করেই পালাতে হল। ব্যাপারটা দলের কাউকেই আর বলেননি তিনি। পাথরটা লুকিয়ে রেখেছিলেন জাহাজের এক গোপন জায়গায়।
এর মাস কয়েক বাদে দেশে ফিরে লুঠের জিনিসপত্র বেচে ম্যানুয়েল ছোটোখাটো একটা জমিদারি কিনে ফেললেন। তবে মন্দির থেকে চুরি করা সেই পাথরটাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি নিরাশ করেছিল। এক জহুরিকে দিয়ে যাচাই করাতে গিয়ে জানতে পারলেন, সেটা হিরে নয়। ভাল জাতের জারকন। বাজারদর সামান্যই। পাথরটা তাই আর বিক্রি করেন নি। যে জিনিসের জন্য প্রায় প্রাণ যেতে বসেছিল, তা অত সস্তায় বিক্রি করতে আর মন চায়নি। রেখে দিয়েছিলেন নিজের কাছেই।
“ডি-সুজা পরিবারে অঘটন শুরু হল এর পর থেকেই। অঘটন কেন, একরকম বিপর্যয়ই বলা যায়। বছর কয়েক বাদে ম্যানুয়েলের একমাত্র পুত্র অ্যান্টনির জন্মের পর দেখা গেল নবজাতকের বাঁ চোখের আইবলটি নেই। সাধারণত এমনটি দেখা যায় না। অন্ধ হয়ে অনেকেই জন্মায়। কিন্তু আইবলহীন অবস্থায় জন্ম, এমন বড়ো একটা শোনা যায় না। তবু এটাকে নিছক অ্যাকসিডেন্ট বলেই মেনে নিয়েছিল সবাই। কিন্তু ব্যাপারটা এখানেই শেষ হল না। এর অনেক বছর বাদে অ্যান্টনির একমাত্র পুত্র ফ্রান্সিসের জন্মের পর দেখা গেল তারও বাঁ চোখের আইবল নেই। ব্যাপারটাকে এবার আর নিছক কাকতালীয় বলে মেনে নিতে পারলেন না ম্যানুয়েল। তখন বয়স হয়েছে। দেহ-মনে আগের তেজ আর নেই। এক অজানা আশঙ্কায় ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন তিনি। ছেলেকে একান্তে ডেকে একদিন সেই পাথরটার কথা খুলে বললেন।
“অ্যান্টনি ছেলেবেলা থেকেই একটু অন্য রকমের। নিয়মিত চার্চে যায়। ধর্মভীরু মানুষ। বাবার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার পর দেখতে চাইল সেটা। সিন্দুকের এক কোণে অযত্নে পড়ে ছিল পাথরটা। খুঁজেপেতে বের করল ম্যানুয়েল। পাথরটা হাতে নিয়ে অ্যান্টনি উল্টে-পাল্টে দেখল খানিক। তারপর এক সময় বিষন্ন গলায় বলল, “পাথরটার কথা তুমি আগে কেন বলো নি বাবা?”
ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে ভীষণ ঘাবড়ে গেলেন ম্যানুয়েল, “কেন রে?”
প্রত্যুত্তরে একটু বিষণ্ণ হাসল অ্যান্টনি। তারপর হঠাৎ এমন এক অদ্ভুত কাজ করে বসল, যা ম্যানুয়েল স্বপ্নেও ভাবতে পারেন নি।
এই ঘটনার পর ম্যানুয়েল আর বেশিদিন বাঁচেন নি। মরবার আগে বেচারা জেনে গিয়েছিলেন, ওঁদের বংশে কেউ আর বাঁ চোখ নিয়ে জন্মাবে না।
ম্যানুয়েল মরে বাঁচল। ডি-সুজা পরিবারের পরবর্তী অবস্থা তাঁকে আর চোখে দেখে যেতে হয়নি। সেটা দেখল অ্যান্টনি। ওর ছেলে ফ্রান্সিসের কর্মক্ষম ডান-চোখটাও অন্ধ হয়ে গেল যৌবন পার হবার আগেই। আর পরবর্তী কয়েক জেনারেশন ধরে ডি-সুজা পরিবারে চলছে ওই একই ব্যাপার। পরিবারের বর্তমান উত্তরাধিকারী বেনডিক্ট-এর দুই চোখই আজ অন্ধ। বিয়ে করেনি। ওর দৃঢ় বিশ্বাস, দেবমূর্তির বাঁ চোখের সেই পাথরটা যথাস্থানে ফিরিয়ে না দিলে বংশের কেউ অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে না। মিস্টার, পাথরটা আমি সঙ্গে এনেছি। গত দেড় বছর ধরে এ দেশের পথে-পথে ঘুরে বেড়াচ্ছি। সেই দেবমূর্তির খোঁজ এখনও পাইনি।”
একটানা অনেকক্ষণ কথা বলে থামলেন ভদ্রলোক। হাতের ঘড়ির দিকে এক ঝলক চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, “চিঙ্গলপুট বোধ হয় এসে গেল। তাই না?”
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বুঝলাম সময় অনুযায়ী গাড়ি চিঙ্গলপুট স্টেশনেই ঢুকতে চলেছে। গল্পের ঝোঁকে কোথা দিয়ে যে সময় পেরিয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি। মাথা নাড়লাম। উনি ব্যস্ত হয়ে বললেন, “আমি চিঙ্গলপুটেই নামব। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছতে মুছতে উঠে দাঁড়ালেন। সামান্য নীচু হয়ে সিটে নামিয়ে রাখা বইটা তুলে বিদায় নেবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন, হঠাৎ কোন কারণে ট্রেন আচমকা ব্রেক কষল। টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যাচ্ছিলেন ভদ্রলোক। কোন রকমে টাল সামলে নিলেও চোখ থেকে সানগ্লাসটা ছিটকে আমার কোলে এসে পড়ল। সেই সঙ্গে আরও কিছু ঠং করে ছিটকে পড়ল মেঝেয়।
ওঃ –গড। চাপা আর্তনাদে মানুষটি মূহুর্তে ঝুঁকে পড়লেন মেঝের উপর। অন্ধের মত হাতড়ে কিছু খুঁজতে লাগলেন। ব্যাপার দেখে তাড়াতাড়ি কোলের উপর থেকে সানগ্লাসটা তুলে নিয়ে বললাম, ওখানে কী খুঁজছেন। এই তো আপনার সানগ্লাস।
ডানহাত দিয়ে সেইভাবেই হাতড়াতে হাতড়াতে মুখ তুললেন উনি। বাঁ হাতটা এগিয়ে দিলেন আমার দিকে। সানগ্লাসটা এগিয়ে দিতে গিয়ে ভদ্রলোকের মুখের উপর দৃষ্টি পড়তে চমকে উঠলাম। মানুষটি সম্পূর্ণ অন্ধ। বাঁ চোখে বিশাল একটা গর্ত। কোনও আইবল নেই। ডান চোখের মণি সাদা। সম্পূর্ণ ছানিপড়া। অথচ খানিক আগেই এঁকে বই পড়তে দেখেছি। এতক্ষণ যে কথা বললেন, একবারও মনে হয়নি উনি অন্ধ।
হাঁ করে তাকিয়েছিলাম। ইতিমধ্যে উনি হাতড়ে আমার হাত থেকে সানগ্লাসটা নিয়ে চোখে লাগিয়ে ফের মেঝের উপর ঝুঁকে দু’হাতে হাতড়াতে শুরু করেছেন। অস্ফুট স্বরে বললাম, “আপনি, আপনি আপনার বাঁ চোখের পাথরটা খুঁজছেন?”
“হ্যাঁ –হ্যাঁ ম্যান। তুমি কি পেয়েছ ওটা? প্লিজ দাও?”
ততক্ষণে পাথরটা আমার নজরে পড়েছে। বললাম, “ওটা আপনার ডানদিকে মেঝেতে পড়ে রয়েছে। দেয়াল ঘেঁষে।”
তৎক্ষণাৎ উনি ডানদিকে ঘুরে গিয়ে পাগলের মত দেয়ালের দিকের মেঝে দু’হাতে প্রায় সাপটাতে শুরু করলেন। তবু পায়রার ডিমের আকারের উজ্জ্বল পাথরটার উপর মানুষটির হাত কিছুতেই আর পৌঁছোচ্ছিল না। একবার মনে হল, তুলে ওর হাতে দিই। কিন্তু জিনিসটাকে হাতে নেবার কথা ভাবতে অজান্তেই শিউরে উঠল শরীর। ঠায় বসে রইলাম।
ভদ্রলোক শেষ পর্যন্ত অবশ্য খুঁজে পেলেন পাথরটি। পরম মমতায় রুমালে মুছলেন কিছুক্ষণ। তারপর চোখের সানগ্লাস সামান্য তুলে পুরে দিলেন বাঁ-চোখের ভিতর।
ট্রেন ইতিমধ্যে চিঙ্গলপুট স্টেশনে ঢুকে পড়েছে। গতি কমে আসছে। উঠে দাঁড়ালেন উনি। মেঝে থেকে বইটা তুলে নিয়ে সামান্য হাসলেন, “চলি মিস্টার।” হাতটা বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে। প্রত্যুত্তরে আমিও হাত বাড়ালাম। ট্রেনটা ততক্ষণে থেমে গেছে। করমর্দন করে নেমে গেলেন তিনি।
ডি-সুজা পরিবারের বর্তমান পুরুষ বেনডিক্ট ডি-সুজার সঙ্গে আর দেখা হয়নি আমার। জানি না, শেষ পর্যন্ত উনি সেই দেবমূর্তিটি খুঁজে পেয়েছেন কিনা। আর পেলেও, পাথরটি কি যথাস্থানে ফিরিয়ে দিতে পেরেছেন?
ছবি- শিবশংকর ভট্টাচার্য