গল্প-নকশি কাঁথা -বুমা ব্যানার্জী দাস-শীত ২০২২

এই লেখকের আগের গল্প – প্রতীক্ষা

golponoksikatha_fnl

প্রথম পর্ব

১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ, পান্ডুয়া, বঙ্গদেশ।

দ্রুত পদক্ষেপে চওড়া অলিন্দ পার হয়ে অন্দরের দিকে এগিয়ে যান চাটুজ্জেমশাই। জমিদার শক্তিমোহন চট্টোপাধ্যায়। তাঁর খড়মের খটখট আওয়াজে অন্দরের দাসীরা সচকিত হয়ে মাথায় কাপড় টেনে সরে দাঁড়ায়। এই অসময়ে চাটুজ্জেমশাইকে অন্দরে দেখে সকলেই বেশ অবাক। একজন ছোটে কর্তামা অর্থাৎ চাটুজ্জেমশাইয়ের মাকে খবর দিতে। মায়ের মহলের দিক থেকে শক্তিমোহনের কানে ভেসে আসে অদ্ভুত একটা গানের সুর। বেশ অনেকজন মিলেই গাইছে মনে হয়। সামান্য কুঁচকে যায় তাঁর ভ্রূ। এই সুরটি তিনি চেনেন, ক’দিন ধরেই শুনছেন। তাঁর মায়ের দেওয়া সুর। গানের কথাও মায়েরই তৈরি। নকশিকাঁথা বোনার গান বানিয়েছেন মা। অন্য সময় হলে হয়তো চিরাচরিত মাতৃগর্বে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠত শক্তিমোহনের। কিন্তু বড়ো দুর্যোগ ঘনিয়ে এসেছে। এটা গান গেয়ে গেয়ে কাঁথায় ফুল তোলার সময় নয়। তাঁর পিতা অসুস্থ। শয্যাশায়ী না হলেও রুগ্নদেহ তাঁকে অক্ষম করে রেখেছে। এ-সময় মায়ের বিচক্ষণতাই তাঁর প্রধান ভরসা। সামান্য গলা-খাঁকারি দিয়ে মায়ের মহলে প্রবেশ করেন শক্তিমোহন।

ভিতরের দৃশ্য সত্যিই দেখার মতো।

ঘরের মেঝে জুড়ে বসে গ্রামের প্রায় জনা দশেক মেয়ে-বউ। নীচু পালঙ্কের উপর বসে আছেন এ-বাড়ির কর্তামা কাজলরেখা দেব্যা। প্রশস্ত কপালে অস্তগামী সূর্যের মতো সিঁদুরের টিপ। গুচ্ছ গুচ্ছ কোঁকড়া চুল কাঁধের দুই পাশ দিয়ে নেমে এসেছে। হালকা গোলাপি রঙের চওড়া পাড় শান্তিপুরী শাড়ির আঁচল পিঠের উপর ছড়িয়ে আছে। এ-বাড়ির সব বউদের মতোই তিনিও সাধারণ সুন্দরী নন, কিন্তু তাঁর বুদ্ধির উজ্জ্বলতা তাঁর সৌন্দর্যকে বহুগুণে ছাপিয়ে যায়। মেঝে জুড়ে ছড়ানো বেশ বড়ো একটা কাঁথা। নানারকম নকশায় ভরা। সবাই মিলে কোনো না কোনো অংশের কাজে হাত লাগিয়েছে। একটি প্রান্ত স্বয়ং কাজলরেখার হাতে। সবার হাতে সূচ, রঙিন সুতো। গলায় গান। ভারি অদ্ভুত গানের কথাগুলো। গান চলছে, সঙ্গে হাতে হাতে উঠছে সুতোর ফোঁড়, ফুটে উঠছে নানান নকশা।

“মা!” একটু জোরেই ডাক দেন শক্তিমোহন।

চোখ তুলে তাকান কাজলরেখা। মাথাটা সামান্য সোজা হওয়ার দরুন হিরের নাকফুলে আলো পড়ে ঝিলিক দিয়ে ওঠে। শান্ত আয়ত দুটি চোখ।

“আয়, তোরা একটু বাইরে গিয়ে দাঁড়া না মা, দাদাবাবু চলে গেলে আসিস।” মেয়েরা নিঃশব্দে বেরিয়ে যায়।

“মা, বড়ো বিপদ যে সামনে। গৌড়ের পতন ঘটেছে। শের শাহ্ দখল নিয়েছে গৌড়ের।”

“শুনেছি। সুলতান মাহমুদ শাহ্ কি জীবিত আছেন?” শান্ত স্বরে প্রশ্ন করেন কাজলরেখা।

“তিনি বিহার প্রদেশের কোথাও আছেন।”

“অর্থাৎ দুর্বল সুলতান পলায়ন করেছেন।” সামান্য শ্লেষ মেশে কাজলরেখার কণ্ঠস্বরে।

“মা, যে-কোনো দিন শের শাহের সৈন্যবাহিনী পান্ডুয়া এসে পৌঁছবে। এখানে বাস করা আর সমীচীন নয়।” নরম স্বরে বলেন শক্তিমোহন। এই বাড়ি ছেড়ে যেতে মা রাজি হবেন কি? সেই বারো বছর বয়সে এ-বাড়ির বড়ো বউ হয়ে এসেছিলেন। তারপর থেকে এ-বাড়ির ইট-কাঠ-পাথরে মিশে আছেন মা। লোকে বলে, এ-বাড়ির চৌহদ্দিতে একটা পাতাও কাজলবউকে না জানিয়ে খসে না। এই এলাকার যার যা সমস্যা হোক, কাজলরেখা আছেন তাদের পাশে। সবাইকে ছেড়ে মা যাবেন কীভাবে? শুধু তাই নয়, সবচেয়ে বড়ো চিন্তা গৃহদেবতাকে নিয়ে। তাঁদের বহু পুরোনো সোনার নাড়ুগোপাল। গৃহসংলগ্ন মন্দিরে হাতে হিরের তৈরি নাড়ু নিয়ে হাসিমুখে বসে আছেন তিনি। ঠোঁট দুটি প্রবালের। অমূল্য সম্পদ। সেই ভোরবেলায় ঠাকুরদালানে বাঁশি বাজিয়ে ঘুম ভাঙানো থেকে রাতে শয়ন দেওয়া পর্যন্ত গৃহদেবতার সমস্ত দিনের সেবা কাজলরেখার সদাসতর্ক দৃষ্টির সামনে পালন করা হয়। পুরোহিতমশাই, বংশীবাদক, নিত্যভোগ রান্নার বামুনঠাকুর, মালি সবাই বংশপরম্পরায় এই মন্দিরের কাজ করে আসছে। দোলযাত্রা আর জন্মাষ্টমীর দিন সারা গ্রামের লোক দুইবেলা পাত পেড়ে খায় তাঁদের বিশাল ঠাকুরদালানে। কাজলরেখা নিজের হাতে ভোগ রাঁধেন এই দুইদিন। মন্দির ঘিরে গন্ধরাজ, বেলি আর জুঁই ফুলের গাছ। বর্ষাকালে সুগন্ধে আকুল হয়ে ওঠে চারদিক। মন্দিরটি মায়ের প্রাণস্বরূপ তা শক্তিমোহন জানেন। সে-সব ছেড়ে মা কোথাও যেতে রাজি হবেন না। তাছাড়া ওই অমূল্য মূর্তি সঙ্গে নিয়ে কোথায়ই-বা যাবেন? পথেই তো লুঠপাট হয়ে যেতে পারে সব। কিন্তু এখানে থাকতে আর ভরসা হয় না। গৌড় বেদখল হয়েছে মানে আর কিছুদিনের মধ্যেই শের শাহের সৈন্যবাহিনী এসে পৌঁছবে এখানে। তারপর আর ভাবতে পারেন না শক্তিমোহন। দুশ্চিন্তায় মুখ কালো হয়ে আসে তাঁর।

“জানি। কোথায় যাবি কিছু ভেবেছিস?” মায়ের কথায় সংবিৎ ফেরে শক্তিমোহনের।

“চট্টগ্রামের দিকে গেলে হয় না? সেখানে চেনা-পরিচিত আছেন অনেকে।” কিঞ্চিৎ দ্বিধাগ্রস্ত শোনায় শক্তিমোহনের স্বর। মা যেতে রাজি আছেন তাহলে।

“না রে। হার্মাদদের ঘাঁটি হয়েছে এখন সেখানে।”

ঠিকই বলেছেন কাজলরেখা। চট্টগ্রামে পর্তুগিজদের কারখানা বানানোর অনুমতি দিয়েছেন সুলতান মাহমুদ শাহ্।

“তাহলে কোথায় যেতে চাও মা?” শক্তিমোহন বুঝতে পারেন, তাঁর মা এই বিষয়ে তাঁর আগেই ভেবেছেন এবং হয়তো কোনও সিদ্ধান্তও নিয়েছেন।

খানিকক্ষণ চুপ করে থাকেন কাজলরেখা। তারপর খুব আস্তে বলেন, “রামকেলি।”

চমকে ওঠেন শক্তিমোহন। তাই তো! বেশি দূরেও নয়, অথচ পূণ্যভূমি বটে। নিমাই পণ্ডিত সন্ন্যাসী হয়ে বৃন্দাবন যাওয়ার পথে রামকেলি গ্রামে কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন। তাঁর কথা অনেক শুনেছেন শক্তিমোহন।

“তাই হবে মা। তাহলে গোছগাছ খোঁজখবর করি? ব্যবস্থাপত্র করতেও তো ক’টা দিন যাবে। কিন্তু তোমার সোনার গোপালের কী করবে মা? পুরোহিতমশাইকে পাঠিয়ে দিই? গৃহদেবতাকে উচ্ছেদ করে নিয়ে যাওয়ার কী বিধিবিধান দেন তিনি…”

দুই চোখ সহসা তীব্র হয়ে ওঠে কাজলরেখার। তবে তা মুহূর্তমাত্র। শান্ত গলাতেই বলেন, “তুই অন্য সব ব্যবস্থা দেখ। গোপালের ভার আমার উপর ছেড়ে দে।”

খানিক নিশ্চিন্ত হন শক্তিমোহন। বেরিয়েই যাচ্ছিলেন, হঠাৎ ফিরে দাঁড়িয়ে বলেন, “ওদের তবে বাড়ি চলে যেতে বলে দিই?”

“না না, শিগগির আসতে বল, সময় কই আর? এটা শেষ করতে হবে।” ততক্ষণে হাতে আবার সূচ তুলে নিয়েছেন কাজলরেখা।

“এই কি কাঁথা বোনার সময় মা?”

চাপা কৌতুক ফুটে ওঠে মায়ের মুখে।—“তোর অনেক কাজ এখন, যা। ওদের পাঠিয়ে দে।”

বেরিয়ে যেতে যেতে শক্তিমোহন শুনতে পান, মা আবার সেই অদ্ভুত সুরটা গুনগুন করছেন।

জুন, ২০১৬।

কী শোরগোল রে বাবা! আন্ডা সেদ্ধ, চা-কফি, জুতো পালিশ তো আছেই, তার মধ্যে দরজার ঠিক কাছটিতে কোথা থেকে এক বাউলনি উঠেছে। একটু আগেও তো ছিল না। একতারা বাজিয়ে গান গাইছে—‘ছাড়ো ছাড়ো ত্রিভঙ্গ কালো, রঙ্গ কোরো না।’ গলাটা ভীষণ সুরেলা যদিও। মুখটা দেখা যাচ্ছে না, গেরুয়া কাপড়টা টেনে মাথা-মুখ ঢেকে রেখেছে, বোধহয় রোদ এড়াতে।

“আর কতক্ষণ রে?” এই নিয়ে বোধহয় শেষ আধঘণ্টায় পনেরো বার জিজ্ঞেস করল মিঠু।

“পাঁচ মিনিট আগে বলেছিলাম মিনিট পঁয়তাল্লিশ, এখন তার থেকে পাঁচ মিনিট বাদ দে।” ফোন থেকে চোখ না তুলেই গম্ভীরভাবে উত্তর দেয় টিয়া।

“আরেক রাউন্ড ঝালমুড়ি হোক তাহলে?” চিউইং গামটা এক গাল থেকে আরেক গালে ঠেলে ফুট কাটে রাকা।

দলের চার নম্বর সদস্যের কাছ থেকে যথারীতি কোনও সাড়াশব্দ আসে না। একটা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের স্পেশাল এডিশন চোখের সামনে মেলে ধরে বাহ্যজ্ঞানরহিত নন্দিনী ওরফে নন্দু। বাকি তিনজনের চোখে চোখে কথা হয়ে যায়। টিয়া আচমকা এগিয়ে এসে ছোঁ মেরে বইটা তুলে নেয় নন্দিনীর হাত থেকে।

“ওইইই!” ছিটকে ওঠে নন্দিনী। চশমার আড়ালে জ্বলজ্বলে চোখ দুটো ঝিকিয়ে ওঠে।

“অ্যান্টার্কটিকা থেকে মালদায় ফিরে এসো বৎসে।”

একসঙ্গে হেসে ওঠে সবাই।

সেই প্রথম শ্রেণি থেকে বন্ধু ওরা। এখন একাদশ শ্রেণিতে এসে গরমের ছুটিতে একসঙ্গে চারজনে বড়দের ছাড়া বেড়াতে যাওয়ার অনুমতিও পেয়ে গেছে। টিয়াদের বহু প্রাচীন বাড়ি মালদা থেকে সামান্য দূরে রামকেলি গ্রামে। নাকি প্রায় সাড়ে চারশোরও বেশি বছর আগে তাদের কোনও এক পূর্বপুরুষ সেই বাড়ি বানান। সেটা অবিশ্যি এখন আর নেই, তবে এখনকার বাড়িটাও যথেষ্ট পুরোনো। এই সময় মস্ত বড়ো মেলাও হয় সেখানে। বিখ্যাত সব কীর্তনিয়ার দল আসে, বাউলরা আসে। ওই বাউলনিও নিশ্চয়ই ওই মেলার উদেশ্যেই যাচ্ছে। টিয়ার দুই জ্যাঠা-জেঠিমা ওই বাড়িতেই বসবাস করেন। তাই ওদের যাওয়া নিয়ে বড়োরা কেউ কোনও আপত্তি করেননি। টিয়া অবিশ্যি নিজেই খুব কম গেছে সে-বাড়িতে। ওর বাবা বহুদিন ধরেই কলকাতার বাসিন্দা। জ্যাঠা-জেঠিমারাই আসেন মাঝেমধ্যে ওদের কলকাতার বাড়িতে। ওদের বিশেষ যাওয়া হয় না।

“মালদা স্টেশন থেকে তোদের বাড়ি কতদূর বললি যেন?” রাকার চোখ ঝালমুড়িওলার সন্ধান করছে। ওর নাকি ট্রেনে উঠলে সমানে খিদে পায়। ভোরের ট্রেনে উঠেছে ওরা, শিয়ালদা-আগরতলা স্পেশাল মালদা পৌঁছবে ভরদুপুরে। স্টেশন থেকে রামকেলি আরও খানিকক্ষণ।

“ঠিক ২০.৫ কিমি।” চশমাটা নাকের উপর ঠেলে তুলে নন্দুর উত্তর। ওরা নন্দুকে নন্দুপিডিয়া এমনি এমনি বলে না।

“তোর দীনুকা সময়মতো আসবে তো রে স্টেশনে?” রাকা ঝালমুড়িওলা খুঁজে না পেয়ে হতাশ।

“দেখতেই পাবি।” চোখ নাচিয়ে নেয় টিয়া।

মালদা স্টেশনে বাড়ির গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করার কথা দীনুকা ওরফে দীনুকাকা ওরফে টিয়াদের সকল কাজের কাজীর। মালদা এসে গেল প্রায়।

১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ, পান্ডুয়া, বঙ্গদেশ।

রাত ভোর হয়ে এল। মধ্যাহ্নেই রওনা হবার পালা। সব গোছগাছ বাঁধাছাঁদা শেষ। এতদিনের ভিটে ছেড়ে চলে যেতে হবে কাজলরেখাকে। তবে যাওয়ার আগে এই নকশিকাঁথাটা তিনি শেষ করবেন। আর যদি কখনও বানাবার সুযোগ না পান। সারারাত কাজ করেছেন তিনি। সঙ্গে গ্রামের কয়েকটি বউ, তাদেরও হাতের কাজ বড়ো সুন্দর। কম নকশিকাঁথা বানাননি তিনি সারাজীবনে। তবে এটা হবে তাঁর সেরা কাজ। ক্লান্তিতে পিঠ ভেঙে আসছে, চোখ জ্বালা করছে। ধীরে ধীরে কাঁথায় ফুটে উঠেছে এই গ্রামেরই দৃশ্য। যদি এখানে আর ফিরে না আসতে পারেন, এই কাঁথার দিকে তাকিয়েই তিনি তাঁর গ্রামকে ফিরে পাবেন। আর খুব সামান্যই বাকি আছে। সঙ্গে চলেছে গুনগুন করে কাঁথা বোনার গান। ঈষৎ চাপা গলায়, যাতে বাড়ির বাকিদের ঘুম না ভেঙে যায়। এ-গানও তাঁর নিজেরই তৈরি। লিখতে জানেন না, তাই মুখে-মুখেই শিখিয়ে যাবেন বিপত্নীক শক্তিমোহনের সন্তানদের। এ-গান ভুলে গেলে চলবে না। ভোরের মিষ্টি বাতাসে সুর ছড়িয়ে পড়ে—

হলুদ ক্ষেতে লালের বুটি
গোনাগুনতি চৌদ্দ খুঁটি।।
আকাশ বাতাস সমস্ত নীল
মুখ দেখছে জল ঝিলমিল।।
ক্ষেতের মাঝে সূর্য ডোবে
সবুজ ক’ফোঁড় গুনতে হবে।।
বুটির সাথে সবুজ মিশে
পৌঁছে গেলাম বটের পাশে।।
পায়ে চলা পথের শেষ
এবার জানকী পাতাল প্রবেশ।।
একটি হাতে তিনটি ফোঁড়
হলুদ ফোঁড়ে লাগায় ঘোর।।
নকশিকাঁথায় আমার কপাল
জয় শ্রীহরি প্রাণের গোপাল।।

শেষ হয়ে আসে সম্পূর্ণ গ্রামের দৃশ্য। নিপুণ সেলাইয়ে কাঁথার চার কোণে ফুটে উঠেছে হরধনু ভঙ্গ, তাড়কা বধ, রাম-রাবণের যুদ্ধ আর সীতার পাতাল প্রবেশ।

জুন ২০১৬, রামকেলি

“মেলা শুরু পরের সপ্তাহের মাঝামাঝি। এখনও পাঁচদিন বাকি।” এই নিয়ে তৃতীয় বার সবার প্লেটে ফিশ ফ্রাই দিতে দিতে বললেন টিয়ার বড়ো জেঠিমা অনিতাদেবী। বেলা গড়িয়ে প্রায় বিকেলের দিকে চলেছে। কোনোরকমে স্নান সেরে বিশাল শ্বেতপাথরের টেবিল ঘিরে বসে পড়েছে টিয়ারা।—“তবে মেলার প্রস্তুতি পুরোদমে শুরু হয়ে গেছে। মদনমোহনের মন্দির ঘিরে মস্ত মেলা বসে ছয়দিন ধরে। এখানের ইতিহাসটা বলেছিস তো ওদের, টিয়া?”

টিয়া আমতা আমতা করতে থাকে। ও ইতিহাসের ধার ধারে না কোনোদিন।—“ছোটবেলায় শুনেছিলাম, তারপর…” এবার হেসে ওঠে সবাই।—“নন্দুপিডিয়া এমনিতেই জানবে জেম্মা।”

এবার অনিতাদেবীর চোখ কপালে।—“নন্দুপিডিয়া কী জিনিস?”

মিঠু হইহই করে ওঠে—“এই যে আমাদের নন্দু দেখছ, এ হল সবজান্তা। তাই উইকিপিডিয়ার মতো নন্দুপিডিয়া।”

“না জেম্মা, তুমি বলো, আমি বেশি কিছু জানি না। চৈতন্যদেব এখানে বৃন্দাবন যাওয়ার পথে এসেছিলেন, আর রূপ সনাতন গোস্বামী তাঁকে দেখে, তাঁর বাণী শুনে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, এটুকুই শুধু জানি।” চ্যাঁ চ্যাঁ করে প্রতিবাদ করে নন্দিনী।

ওদের প্লেটে চিকেন কারি দিতে দিতে অনিতাদেবী বলেন, “এই মদনমোহন মন্দিরের চত্বরেই মহাপ্রভু সংকীর্তন করতেন এখানে থাকার সময়। মন্দিরের দুই পাশে ছয়শো বছরের পুরোনো কদম আর তমাল গাছ আছে দেখবি। খেয়ে উপরের বারান্দায় গিয়ে বস। জেঠুরা আর মেজো জেম্মা একটু বাদেই ফিরবেন।”

টিয়ার দুই জ্যাঠা পারিবারিক ব্যাবসা সামলান। তাছাড়া বিশাল আমবাগান তাঁদের। কলকাতায় আম চালান যায়। সে-সবের দেখাশোনাও আছে। মেজো জেঠি এখানকার একমাত্র হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। বড়ো জেঠুর ছেলে চাকরি নিয়ে দিল্লিতে, মেয়ে পুনেতে পড়াশোনা করছে। মেজো জেঠু নিঃসন্তান। বাড়িতে কেবল এঁরাই থাকেন তাই। চুপচাপ বাড়ি আজ চারটি কিশোরীর হুল্লোড়ে মুখর হয়ে উঠেছে।

খাওয়া সেরে ওরা দোতলার বিশাল বারান্দায় এসে বসে। বাড়ির এই অংশের বয়সও কম নয়। মূল বাড়িটা অবিশ্যি অনেকদিন নষ্ট হয়ে গেছে। টিয়াদের পূর্বপুরুষ প্রায় চারশো সত্তর বছর আগে মূল বাড়ি পত্তন করেছিলেন। সে-বাড়ি ধ্বসে পড়ার পর এই নতুন বাড়ি তৈরি হয়। তবে নতুন বাড়িরও বয়স প্রায় তিনশো। মস্ত মস্ত থাম, সরু খাড়া সিঁড়ি, ভীষণ উঁচু ছাদ, রহস্যজনক কুলুঙ্গি, দেওয়ালজোড়া গম্ভীর দেখতে মানুষের ধুলো পড়া তৈলচিত্র, খড়খড়ি লাগানো প্রায় মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত জানালা সবই আছে। কাল ভালো করে দেখতে হবে সব।

সন্ধে হয়ে আসে ধীরে ধীরে, সামনের বাগানে অন্ধকার নামতে থাকে। একসময় বাগানটা খুবই সুন্দর ছিল। নাকি একদিকে শ্বেতপাথরের পরি আর ফোয়ারাও আছে। তবে ফোয়ারা থেকে এখন আর জল পড়ে না, ভগ্নদশা। চুপ করে বসে থাকে সবাই। বকবকানিতে ওস্তাদ রাকা পর্যন্ত কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে।

টিয়ার বড়ো জেঠু এসে বসেন তাদের পাশে। তিনি ফিরেছেন খানিক আগে।—“কী রে, কেমন লাগছে তোদের?”

“খুব ভালো গো। গরমটাও যেন লাগছে না তেমন।” প্রায় কোরাস করে ওঠে ওরা।

“আচ্ছা জেঠু, যাঁরা এই বাড়ি আসলে বানিয়েছিলেন, মানে সেই চারশো সত্তর বছর আগে, তাঁদের কোনও প্রাচীন জিনিস আছে এখনও?” মিঠু একটু ভূতের ভয় পায়, তাই মনে হয় সাবধান হতে চাইল। না-হলে প্রাচীন জিনিসে উৎসাহ বড়ো একটা দেখা যায় না ওর।

“না রে মা। একটা জিনিস ছাড়া আর বেশি কিছু নেই। তবে যেটা আছে সেটা সত্যিই দুষ্প্রাপ্য।”

“কী জেঠু?” প্রায় ফিসফিস করে বলে নন্দিনী।

“একটা নকশিকাঁথা। চল দেখবি, বলে বোঝানো মুশকিল।”

“আর কাজলাদিদার নকশিকাঁথার গান?” টিয়া বলে ওঠে।

“ওটা তুই শুনিয়ে দে। মনে আছে তো পুরোটা?”

ওরা অবাক হয়ে তাকায় টিয়ার দিকে।—“কী জিনিস? কখনও বলিসনি তো!”

“আরে যাঁর বানানো নকশিকাঁথা দেখবি, তাঁরই বানানো নকশিকাঁথার গানও আছে। এ-বাড়ির সকলকে সেই গান শিখতে হয়। রেওয়াজ আর কী।”

টিয়ার সুরেলা গলার আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে। ওরা সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে।

রাত নেমেছে। একটা বিশাল ঘরে দুটো বিছানায় ভাগাভাগি করে ওরা চারজন। ঘুম আসছে না নন্দিনীর। আস্তে করে ঠেলা মারে পাশে শুয়ে থাকা টিয়াকে।

“কী বল?” ঘুম জড়ানো গলায় কথাটা বলেই আবার পাশ ফেরে টিয়া।

নীচের হলঘরের পেন্ডুলাম ঘড়িতে দুটো ঘণ্টা পড়ার আওয়াজ ভেসে আসে। রাত দুটো। বিছানা থেকে নেমে জানালার সামনে এসে দাঁড়ায় নন্দিনী। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারদিক। বার বার নকশিকাঁথাটার কথা মনে পড়ছে তার। কী অপূর্ব কাজ! স্রেফ সুতো দিয়ে নকশা করে একটা গোটা গ্রামের দৃশ্য ফুটিয়ে তুলেছেন সেই কবেকার একজন লিখতে পড়তে না জানা গ্রাম্য মধ্যবয়স্কা গৃহিণী! কাঁথার মাঝখানটা জুড়ে গোটা গ্রামের দৃশ্য। কী নেই সেখানে—মন্দির, পুকুর, ক্ষেত, রাস্তা, বাড়ি এমনকি একটা পুকুরে আকাশ আর মেঘের প্রতিফলন পর্যন্ত নিখুঁতভাবে বানানো। কাঁথার চার কোণে রামায়ণের চারটি দৃশ্য। কত যত্ন করে তিল তিল করে বানানো সেটা দেখলেই বোঝা যায়। রঙের ঔজ্জ্বল্য স্বাভাবিকভাবে অনেকটা কমে এসেছে ঠিকই, তাও এঁরা এতটাই যত্ন করে রেখেছেন যে একটা সুতোও এখনও খুলে আসেনি, কোথাও একটু ফেঁসে যায়নি। ফ্রেমবন্দি করে বেলজিয়াম কাচে ঢেকে দেওয়ালে ছবির মতো করে ঝুলিয়ে রেখেছেন ওঁরা। আর সেই কাঁথা বোনার গানটা? সেটাও সেই কাজলরেখাদেবীর নিজের বানানো। বংশপরম্পরায় সবাইকে নাকি শিখে নিতে হয় সেই গান। টিয়াও পুরোটা জানে। কেন এমন ব্যবস্থা কে জানে। তবে এঁরা যে মজা পেয়েই হোক বা যে কারণেই হোক গানটা এখনও মনে রেখে কাজলরেখাদেবীর ইচ্ছার সম্মান রেখেছেন, সেটাই বড়ো কথা। ফুটফুটে চাঁদের আলোর দিকে তাকিয়ে নন্দিনী মনে করার চেষ্টা করে গানের কথাগুলো।

হলুদ ক্ষেতে লালের বুটি

গোনাগুনতি চৌদ্দ খুঁটি…

তারপর কী যেন? গানের শেষের দিকে কাঁথার এক কোনায় আঁকা সীতার পাতাল প্রবেশের কথাও বলা আছে। বিশেষ করে ওটার কথা কেন বলা আছে কে জানে।

হঠাৎ নন্দিনীকে চমকে দিয়ে দূর থেকে আরেকটা সুর ভেসে আসে। মনে হয় মদনমোহনের মন্দিরের দিক থেকেই আসছে। আসার সময় ওরা মন্দিরের পাশ ঘুরেই এসেছে। মেলার কীর্তনিয়ার দল আসর বসাল নাকি? এত রাতে? কান খাড়া করে নন্দু। আরে! সেই ট্রেনে শোনা গানটা না? তবে সেই বাউলনিই হয়তো গাইছে। ভরা চাঁদের আলোয় দূর থেকে ভেসে আসা সুরে কেমন গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে নন্দুর। হঠাৎ মন্দিরের দিক থেকে আসা দমকা হাওয়ায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে গানের কথা—‘ছাড়ো ছাড়ো ত্রিভঙ্গ কালো, রঙ্গ কোরো না।’

টিয়া লাফাতে লাফাতে চলেছে সবার আগে।—“বাড়ির ভাঙা মন্দিরটা দেখবি আয় নন্দু। তোর তো আবার পুরোনো জিনিস দেখলে মাথা খারাপ হয়ে যায়।”

“হ্যাঁ রে, ভূত-পিশাচ নেই তো? পুরোনো মন্দিরে ওসব থাকেই।” মিঠু পিনপিন করে বলে।

“হ্যাঁ আছে, অবশ্যই আছে। তোর ঘাড়ে চাপার জন্য অপেক্ষা করছে।” রাকা আমের ঝাল আচার চুষতে চুষতে বলে।

বাগানের ভেঙে পড়া ফোয়ারা পেরিয়ে ওরা এসে দাঁড়ায় একটা ছোট্ট মন্দিরের সামনে। দেখলেই বোঝা যায় পরিত্যক্ত। গা বেয়ে বটের ঝুরি নেমেছে। দরজা ভাঙা, সামনে আগাছা। বাড়ির মন্দির সাধারণত এমনটি হয় না।

“পুজো হয় না রে?” রাকা অবাক হয় একটু।

“কাকে পুজো করবে? কোনও ঠাকুর তো নেই, কোনোদিন নাকি ছিলও না।”

“কোনোদিন ছিল না মানে?” সবাই প্রায় একসঙ্গে চেঁচিয়ে ওঠে।

“বড়ো জেম্মার কাছে চল, ভালো করে বলতে পারবে।”

“শের শাহ্ যখন গৌড় দখল করেন তখন এই পরিবারের পূর্বপুরুষ পান্ডুয়া থেকে চলে এসে এখানে বসতি স্থাপন করেন, সে তো তোরা টিয়ার কাছে শুনেছিস নিশ্চয়ই। তাঁদের সঙ্গে সেই অঞ্চলের অনেক লোকই চলে আসে। এখানে প্রায় নতুন করে একটা গ্রামই তৈরিই হয়ে যায় বলতে পারিস।” আম কাটতে কাটতে বলেন অনিতাদেবী। চারিদিকে আমের সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।—“সেই পূর্বপুরুষের নাম ছিল শ্রী শক্তিমোহন চাটুজ্জে। তাঁর মা-ই হলেন কাজলরেখাদেবী, যাঁর নকশিকাঁথা কাল তোরা দেখলি। তিনি নাকি অসাধারণ এক মহিলা ছিলেন। যেমন রূপ, তেমন বুদ্ধি।”

“মন্দিরের গল্পটা বলো না।” টিয়া এত ইতিহাস শুনে ব্যাজার।

“বলছি রে বাবা।” সবার দিকে আমে ভর্তি প্লেট এগিয়ে দেন অনিতাদেবী।—“পান্ডুয়ার সেই বাড়িতে নাকি এক অমূল্য গোপাল মূর্তি ছিল, তিনিই গৃহদেবতা। কোনও প্রমাণ নেই, কিন্তু এই বংশতে গল্প চালু আছে, সেই মূর্তি সম্পূর্ণ সোনার তৈরি, হাতে হিরের নাড়ু নিয়ে সোনার গোপাল বসে আছেন। এই মূর্তি কিন্তু কোনোদিন রামকেলি পৌঁছয়নি। অথচ মন্দির একটা তৈরি হয়েছিল। সে-মন্দিরে কোনোদিন কোনও বিগ্রহ স্থাপন করা হয়নি। যেমন দেখলি, তেমনই চিরকাল পড়ে আছে।”

“আসার পথে হারিয়ে গেছিল, নাকি চুরি?” রাকা জিজ্ঞেস করে।

“জানা নেই রে। তাহলে মন্দিরে অন্য কোনও মূর্তি স্থাপন করল নাই-বা কেন?”

“পান্ডুয়াতেই রয়ে যায়নি তো সেটা? তারপর কেউ সেখানে গিয়ে দেখেনি কখনও? বেশি দূর তো নয়। আর শের শাহ্ পান্ডুয়াতে একেবারেই বেশি দিন ছিলেন না। গৌড় বিজয়ের পর উনি বিহারের দিকে চলে গিয়ে হুমায়ূনের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন।” এতক্ষণ বাদে নন্দুপিডিয়া সরব হয়।

“সেটা জানি না রে। ধীরে ধীরে পান্ডুয়ার অবস্থা পড়ে যেতে থাকে। কিছুদিন টাঁকশাল হিসেবে টিকে ছিল শের শাহের সময়, ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত নগর হয়ে যায়। শক্তিমোহনের মতো বহু লোকই পরিবার-সমেত পান্ডুয়া থেকে নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।”

“একটা ভূমিকম্প হয়েছিল না?” আবার নন্দুপিডিয়া।

“ঠিক বলেছিস। তবে সে আরও বহুদিন পর। ততক্ষণে পান্ডুয়া সম্পূর্ণভাবে পরিত্যক্ত। তারপর একেবারেই ভূতের শহর হয়ে যায় যতদিন না কানিংহাম সাহেব আবার সেই শহর খুঁজে বের করেন। তোরা যাবি তো পান্ডুয়া? আদিনা মসজিদ, একলাখি সৌধ, দনুজ দিঘি এসব দেখে আসিস। সবই ধ্বংসাবশেষ যদিও। তবে ভালো লাগবে।”

“তুমি তো অনেকবার গেছ জেম্মা, সেই কাজলাদিদারা কোনদিকে থাকতেন কিছু বুঝতে পেরেছ কখনও? উনি তো নকশিকাঁথায় ওঁর পুরো গ্রামের ছবি এঁকে ফেলেছিলেন।” টিয়া আগে কখনও এভাবে ভাবেনি, হঠাৎ বেশ উৎসাহ পায়।

“না রে, কিছুই নেই মসজিদ আর কিছু সৌধের ভগ্নাবশেষ ছাড়া। তবে ওঁদের এলাকাটা জানি, কিন্তু এখন সেখানে মাঠ আর ঝোপ। মাঝে মাঝে মাটির ঢিবি। কোনটা কী ছিল বোঝা একরকম অসম্ভব। তবে গ্রামের শুরুতে ছিল একটা বিশাল শিবমন্দির। সেটা এখনও খানিকটা দাঁড়িয়ে আছে। তারপর চাষের জমি ছিল অনেকটা জায়গা জুড়ে।”

“হলুদ ক্ষেতে লালের বুটি, গোনাগুনতি চৌদ্দ খুঁটি?” বলে ওঠে রাকা।—“খুঁটি দিয়ে ঘেরা ক্ষেত?”

“একদম ঠিক বলেছিস, ওটা ক্ষেতের বর্ণনাই বটে। তবে লালের বুটি দিয়ে কীসের ক্ষেত বোঝাতে চেয়েছেন কাজলরেখাদেবী তা জানি না।” অনিতাদেবী মৃদু মৃদু হাসতে থাকেন। কী যে ভালো লাগছে বাচ্চাগুলোর সঙ্গে বকবক করতে।

“কাঁথায় কিন্তু ক্ষেত ঘিরে চৌদ্দর অনেক বেশি খুঁটি আছে জেম্মা। তাহলে চৌদ্দ খুঁটি কেন বলছে গো?” নন্দিনী হঠাৎ জিজ্ঞেস করে।

অবাক হয়ে অনিতাদেবী তাকান নন্দুর দিকে।—“খুব নজর তো তোর! তবে কেন চৌদ্দ খুঁটি সেটা জানি না। লিখতে পড়তে জানতেন না, হয়তো অনেকগুলো খুঁটি বোঝাতে চৌদ্দ খুঁটি বলেছেন।”

সূর্যাস্তের লালচে আভায় ভারি মায়াময় দেখায় মদনমোহনের মন্দির প্রাঙ্গণ। মেলার প্রস্ততি চলছে জোরকদমে। তেলেভাজা আর পাঁপড়ের দোকান এর মধ্যেই চালু হয়ে গেছে। কীর্তন আর বাউল গানের মঞ্চ বানানো প্রায় শেষ। আর দুই-তিনদিনের মধ্যেই ছোটো ছোটো দোকানগুলো খেলনা আর নানারকম জিনিসে ভরে উঠবে। পড়ে থাকা বাঁশ, পেরেক সামলে ওরা এলোমেলো ঘুরতে থাকে। বিভিন্ন দিক থেকে হ্যালো মাইক টেস্টিং ওয়ান টু থ্রি, কীর্তনের সুর, সিনেমার গানের সুর, লটারির টিকিটের ঘোষণা, যাত্রাপালার সময়-তারিখ ঘোষণা সব মিলিয়ে সাংঘাতিক এক আওয়াজের খিচুড়ির চোটে কান পাতা দায়।

“ওই দেখ ফুচকাওলা, যাবি?” রাকার মুখ উদ্ভাসিত, যেন পরম বন্ধুকে খুঁজে পেয়েছে।

হইহই করে এগিয়ে যায় ওরা।

নন্দু সামান্য পিছিয়ে পড়েছিল, হঠাৎ ভীষণ চমকে ওঠে। মন্দিরের পেছনের অংশটা এখান থেকে দেখা যাচ্ছে। সিঁড়ির উপরে কমলা রঙের রোদটা একজায়গায় যেন গাঢ় কমলা হয়ে জমাট বেঁধে গেছে। গেরুয়া রঙের কাপড়ে মাথা মুখ ঢাকা। হাতে একতারা। কোনও ভুল নেই। সেই ট্রেনের বাউলনি। হাজার আওয়াজের মাঝেও নন্দুর কানে স্পষ্ট ভেসে আসে—‘ছাড়ো ছাড়ো ত্রিভঙ্গ কালো, রঙ্গ কোরো না।’ নন্দুর মনে হয় মেলার বাকি সমস্ত আওয়াজ হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। একটা দমকা হাওয়ায় বাউলনির মাথার ঢাকাটা একপাশে সরে যায়, আর রোদ পড়ে নাকের কাছে কিছু একটা ঝলমল করে ওঠে। নাকের গহনা নাকি? মুখের বাকি অংশটা অবিশ্যি আলো-আঁধারেই থেকে যায়।

“নন্দু! অ্যাই নন্দু! হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?” মিঠু কাঁধ ধরে ঝাঁকাচ্ছে। চমকে ফিরে তাকায় নন্দিনী। মেলার জগঝম্প আওয়াজ আবার কানে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

“ওই দেখ।” আঙুল তুলে মন্দিরের পেছনের সিঁড়ির দিকে দেখায় সে। কিন্তু কোথায় কী?

“কী দেখব? উফ্, তুই না! চল চল।” ফাঁকা সিঁড়ির দিকে একবার তাকিয়েই আবার নন্দুর হাত ধরে টান মারে মিঠু।

বাড়ি ঢুকতে গিয়ে নীচের হলঘর থেকে একটা তর্কাতর্কির আওয়াজ কানে আসে। টিয়া হাত তুলে ইশারায় ওদের দাঁড়াতে বলে ভিতরে উঁকি মারে। একটা চাপা কান্না কানে আসছে না? সঙ্গে কার তর্জন। হঠাৎ অনিতাদেবীর গম্ভীর গলা শোনা যায়।—“তুমি এখন যাও প্রকাশ। দাদারা এসে গেলে কিন্তু তোমার পক্ষে ভালো হবে না। তাছাড়া বাড়িতে অতিথি আছে। রুমি কাঁদিস না, তুই কি আজ ওকে নতুন দেখছিস?”

রুমি টিয়ার মেজো জেঠির নাম।

একটা কর্কশ অভদ্র গলা শোনা যায় এবার।—“যান যান, আমাকে আর ভয় দেখাতে আসবেন না।”

একটা লোক দ্রুতগতিতে বাইরে বেরিয়ে আসে। হাবভাব একেবারে গুণ্ডাদের মতো। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বাঁকা চোখে ওদের দেখতে দেখতে বেরিয়ে যায়। পেছন পেছন অনিতাদেবীও বেরিয়ে আসেন। চাপা স্বরে বলেন, “তোরা উপরে যা, আমি আসছি।”

“লোকটা কে রে? চিনিস?” খাটের উপর পা ছড়িয়ে বসে জিজ্ঞেস করে মিঠু।

“চিনি না আবার! ও হল প্রকাশকাকা, মেজো মার গুণধর ভাই। এক নম্বরের বদমাশ। টাকার প্রয়োজন হলেই এখানে এসে ঝামেলা করে। একবার জেল পর্যন্ত হয়েছিল শুনেছি। মেজো মার কান্নাকাটিতে সে-বার ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করেছিল মেজ জেঠু। আবার নিশ্চয়ই টাকার প্রয়োজন হয়েছে। ওকে নিয়ে অশান্তির শেষ নেই। চাকরিতে ঢোকানোর চেষ্টাও করেছে জেঠুরা। কোনও লাভ হয়নি। মারপিট ঝামেলা করে চলে এসেছে। মেজো মা ভাইকে আবার খুব ভালোবাসে।” মুখ ব্যাজার করে টিয়া।

নন্দু হঠাৎ বলে, “বাউলনিরা কখনও দামি গহনা পরে? মানে হিরে-টিরে?”

সবাই অবাক হয়ে ওর দিকে তাকায়। তারপর একসঙ্গে বলে ওঠে, “নন্দু, মালদায় ফিরে আয়।”

গভীর রাত। অনিতাদেবীর ঘুম আসছিল না। আজ বাচ্চা মেয়েগুলোর সামনে বিশ্রী ব্যাপার হয়ে গেল। রুমির জন্য মায়াও হয়। সন্তান নেই, সব স্নেহ ওই অপদার্থ ভাইটার উপর গিয়ে পড়েছে। পরশু ওদের পান্ডুয়া বেড়াতে নিয়ে যাবেন। রবিবার, সবাই মিলেই যাওয়া যাবে। ভারি ভালো টিয়ার বন্ধুরা। নন্দিনী মেয়েটি তো একেবারেই অন্যরকম।

হঠাৎ খুট করে একটা আওয়াজ হয় নীচের হলঘর থেকে। উঠে বসেন অনিতাদেবী। ঘর থেকে বেরোলে একটা লম্বা করিডোর, সেখান থেকে নীচের হালঘরটা পুরো দেখা যায়। এ কি, আলো জ্বলছে যে নীচে! হলঘরের পশ্চিমদিকের দেওয়ালে একটা বিশাল সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো নকশিকাঁথাটা ঝুলছে। তার নীচে আলোর ব্যবস্থাও আছে যাতে কাঁথাটা ভালোভাবে দেখা যায়। সেই আলোটাই জ্বলছে। কেউ দাঁড়িয়ে আছে ফ্রেমটার সামনে। আলোর পেছনে থাকাতে বোঝা যাচ্ছে না কে সে। দ্রুত পায়ে সিঁড়ি ভাঙতে থাকেন অনিতাদেবী।

দ্বিতীয় পর্ব

“এ কি নন্দিনী তুই, এত রাতে একা একা এইভাবে এখানে!”

“জেম্মা, এসো এসো, এদিকে দেখো।” নন্দিনীর গলায় চাপা উত্তেজনা।

“কী দেখব?” নকশিকাঁথার সামনে এসে দাঁড়ান অনিতাদেবী।

নন্দিনীর চোখ জ্বলজ্বল করছে, ঘুমের লেশমাত্র নেই।—“দেখো, সারা গ্রাম জুড়ে একরকম দেখতে খুঁটি ছড়ানো আছে, কিন্তু এই জায়গাটা খেয়াল করো।” আঙুল দিয়ে কাঁথার বাঁদিকের একটা অংশ দেখায় নন্দিনী।

“এত রাতে তোর মাথায় খুঁটি ঢুকল কেন রে?” চোখ কুঁচকে অনিতাদেবী দেখার চেষ্টা করেন।

“দেখো একটু খেয়াল করে,” অনিতাদেবীর হাত ধরে হালকা টান দেয় নন্দিনী।—“এই এক জায়গায় একসঙ্গে ঠিক চৌদ্দটা খুঁটি মিলে একটা প্রায় বর্গাকার ক্ষেত্র তৈরি করেছে, বাকি কোথাও আর তেমন নেই। ছড়ানো ছিটানো বলে খুব মন দিয়ে না দেখলে চোখে পড়ে না। কিন্তু আর সব খুঁটি এলোমেলো।”

“তা ঠিকই বলেছিস।” খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে বলেন অনিতাদেবী, “কিন্তু তাতে কী হল রে?”

“এখনও জানি না সত্যি কোনও তাৎপর্য আছে কি না, কিন্তু চারদিকে খুঁটি থাকতেও গোনাগুনতি চৌদ্দ খুঁটি বলছে কেন সেটাই মাথা থেকে বেরোচ্ছিল না।”

“এবার তো আমাকেও চিন্তায় ফেললি। কী আছে ওই চৌদ্দ খুঁটির মধ্যে?”

“তুমিই দেখো কী আছে, হলুদ ক্ষেতে লালের বুটি।”

“সে তো অন্য দিকেও আছে।”

“কিন্তু সেখানে একসঙ্গে চৌদ্দটা খুঁটি নেই। জেম্মা হেসো না, কিন্তু নকশিকাঁথার গানটা সাধারণ একটা গান নয়।”

“সে কি রে! তাহলে কী ওটা?” অনিতাদেবী আস্তে আস্তে বসে পড়েন সামনের সোফাটাতে। এত রাতে মেয়েটা যে কী শুরু করেছে।

“আরও পরে কী বলছে ভাবো,” নন্দু অস্থিরভাবে পায়চারি করতে থাকে এবার।—“বুটির সঙ্গে সবুজ মিশে/ পৌঁছে গেলাম বটের পাশে—তাই তো? কিন্তু কই, কোনও সবুজ রঙের উপর তো কোনোরকম রঙের কোনও বুটি নেই। যা বুটি আছে সব হলুদের উপর। তাহলে? তার আগের লাইনটা ভাবো—সবুজ ক’ফোঁড় গুনতে হবে। একটা গোনাগুনির ব্যাপার থেকেই যাচ্ছে জেম্মা।”

অনিতাদেবী কী বলবেন বুঝতে পারেন না। অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলেন, “তুই কি বলতে চাইছিস এটা একটা ধাঁধা?”

“তেঁতুল বটের কোলে, দক্ষিণে যাও চলে/ ঈশান কোণে ঈশানী, কহে দিলাম নিশানি? গুপ্তধনের সন্ধান?” হইহই করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসে পল্টনের বাকিরা। ওরা কখন জেগে এসে দাঁড়িয়েছে চুপচাপ, টের পাননি অনিতাদেবী।

“এ কী রে, কেউ ঘুমাবি না! দুটো তো প্রায় বাজে।” কী করবেন ভেবে পান না তিনি।

“ঘুমোচ্ছিলামই তো।” টিয়া হড়বড় করে বলে, “হঠাৎ উঠে দেখি নন্দুপিডিয়া নেই। বেরিয়ে এসে দেখি তোমরা গুপ্তধন খুঁজছ।”

হেসে ফেলেন অনিতাদেবী।—“দাঁড়া, একটু কফি করে আনি, নয়তো তোদের নন্দুপিডিয়া কী বলছে মাথায় ঢুকছে না। তোদের জন্যও আনি?” অনিতাদেবী উঠে দাঁড়ান।

“এই নন্দু, বিড়বিড় করা বন্ধ করবি?”

“হলুদ ক্ষেতে লালের বুটি/ গোনাগুনতি চৌদ্দ খুঁটি…” নন্দিনী আবার পায়চারি শুরু করে।—“ওই চৌদ্দটা খুঁটির মধ্যে বুটির সংখ্যা ১৭।” অসম্ভব জ্বলজ্বলে দেখায় নন্দিনীর চোখ।

“বুটির সংখ্যা দিয়ে কী করবি?” সবাই এবার সরে আসে ফ্রেমে ঝোলানো কাঁথাটার সামনে।

“বলছি। তার পরের লাইনগুলো বল টিয়া।”

“আকাশ বাতাস সমস্ত নীল/ মুখ দেখছে জল ঝিলমিল। এটা তো সোজাসাপটা, কোনও অসুবিধা নেই। এই পুকুরটার কথা বলছে, যেখানে নীল আকাশ আর মেঘের প্রতিফলন পড়েছে।” আঙুল দিয়ে কাঁথার মাঝ বরাবর পুকুরটাকে দেখায় টিয়া।

“তারপর?” নন্দুর কথার সঙ্গে সঙ্গে হলঘরের ঘড়িতে ঢং করে আড়াইটে বাজে।

“ক্ষেতের মাঝে সূর্য ডোবে/ সবুজ ক’ফোঁড় গুনতে হবে/ বুটির সাথে সবুজ মিশে/ পৌঁছে গেলাম বটের পাশে। কোথাও তো সূর্য ডোবা আঁকা নেই রে পুরো কাঁথাতে!”

“এই ছোটো ছোটো অসঙ্গতিগুলো থেকেই তো আমার প্রথম সন্দেহ হয় যে এটা এমনি একটা গানের থেকেও বেশি কিছু। ঠিক কথা, সূর্য তো আঁকা নেই। তাহলে কী হতে পারে আর?” নন্দিনীর ভ্রূ কুঁচকে ওঠে।

“দিক? পশ্চিমদিকে কিছু?” রাকা খুব আস্তে আস্তে বলে।

“মোক্ষম বলেছিস!” সবাই মিলে এমন লাফিয়ে ওঠে যে আর একটু হলে অনিতাদেবীর হাত থেকে কফির ট্রে পড়ে একাকার হচ্ছিল।

“দাঁড়া, বাকিদের ডেকে আনি।” ট্রে নামিয়ে রেখে বলেন অনিতাদেবী, “তোরা একটা কাণ্ডই বাধাচ্ছিস মনে হচ্ছে।”

“পুকুরের পশ্চিমদিকে সবুজ রঙের সুতোর ক’টা ফোঁড় আছে গুনতে হবে রে। একটা ম্যাগনিফাইং গ্লাস লাগবে।” নন্দিনী কথা শেষ করার আগেই সিঁড়ির দিকে দৌড়ায় টিয়া।

“সাঁইত্রিশ, আটত্রিশ, ঊনচল্লিশ… নাহ, পশ্চিমদিকে তো আর সবুজ সুতোর কিছু নেই রে।” ম্যাগনিফাইং গ্লাস চোখের সামনে ধরে বড়ো জেঠু গুনতে থাকেন। রাত আড়াইটের সময় ঘুম ভাঙানোতে প্রথমটায় ভীষণ চমকে গেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সব শুনে এখন উৎসাহে টগবগ করছেন। “তাই তো ভাবি, এমন একটা গান এত বছর ধরে আমাদের শিখতে হয় কেন।” বলতে বলতে নিজেই গুনতে নেমে পড়েছেন।

“আচ্ছা, বুটির সঙ্গে সবুজ মিশে মানে ১৭টা বুটির সঙ্গে ৩৯টা সবুজ সুতোর ফোঁড় যোগ করলে হয়…”

“৫৬।” মেজো জেঠু ঢুলছিলেন। হঠাৎ ‘৫৬’ বলে আবার ঘুমিয়ে পড়লেন।

“বুটির সাথে সবুজ মিশে/ পৌঁছে গেলাম বটের পাশে মানে একটা দূরত্ব বোঝাচ্ছে, কোথাও পৌঁছতে হবে। কিন্তু ৫৬ কী? ৫৬ হাত? কীভাবে মাপা হত তখন?” অনিতাদেবীর চোখে আর বিন্দুমাত্র ঘুম নেই। মেয়েগুলো যা শুরু করেছে।

“পায়ে চলা পথের শেষ/ এবার জানকী পাতাল প্রবেশ। ৫৬ পা জেম্মা। ৫৬ পা দূরে একটা বটগাছ থাকা উচিত।” নন্দু এতক্ষণে এসে বসে।

“পা কী করে মাপা যাবে রে? কার পায়ের মাপে হিসেব হবে?” টিয়া ঘাবড়েছে।

“ইয়েতির পায়ের মাপটাই নে, কাজলরেখাদেবীর পায়ের মাপ পাচ্ছিস কোথায়?” মিঠু চিমটি কাটে টিয়াকে।

“উফ্, বাজে বকিস না, পায়ের হিসেব মানে এখনকার হিসেবে ১০ ইঞ্চি। তখন কী হত জানি না।”

বড়ো জেঠু মাথা নেড়ে নন্দিনীর কথায় সায় দেন, “ওটাই ধর।”

“তাহলে ওই পুকুরটা থেকে ৫৬০ ইঞ্চি মানে ধর ৪৬ ফিট মতো দূরে একটা বটগাছ থাকবে? আছে নাকি, জেঠু?” রাকা উত্তেজনায় উঠে দাঁড়ায়। সামনে গিয়ে ঝুঁকে পড়ে কাঁথার উপর। আঙুল দিয়ে দেখায়—“দেখো, পুকুরটার পশ্চিমদিকে কিছু বড়ো গাছ দেখা যাচ্ছে ঠিকই।”

“সামনে থেকে দেখলে পুকুরটার উত্তরদিকে দেখ তিনটে গোল গম্বুজ মতো আর লম্বা পাঁচিল, ওটা আদিনা মসজিদ। দক্ষিণদিকে একটা গোল গম্বুজ দেখতে পাচ্ছিস? ওটা একলাখি সৌধ। পুকুরটা এখনও আছে, ওটার নাম দনুজ দিঘি। জলও আছে বেশ, কিন্তু পশ্চিমদিকে বটগাছ আছে কি না তা তো জানি না রে। আমরা তো রবিবারই যাচ্ছি, গিয়ে দেখব’খন। কিন্তু তারপর কী করবি? বটগাছ যদি থাকেও? সেখানে তো পথের শেষ বলছে।”

“তার পরের ক্লু সীতার পতালপ্রবেশের ছবিতে।” অনিতাদেবী বলে ওঠেন।

“খুব গোলমেলে ব্যাপার। সীতার পাতাল প্রবেশের ছবিটা কাঁথার নীচের দিকে, একেবারে উলটো কোণে। মানে হচ্ছে না কোনও।” নন্দিনীর কপাল কুঁচকে যায়।

সবাই চুপ করে যায় হঠাৎ। সত্যি তো, মস্ত ছন্দপতন। এতক্ষণের উত্তেজনার পর কেমন থিতিয়ে যায় সবাই।

খুব আস্তে, প্রায় শোনা যায় না এমনভাবে মিঠু হঠাৎ বলে, “সীতা নাম ধরে বলছে না তো রে? আমরা ছোটবেলায় বলতাম না জানকীর আরেক নাম জানো কী? এটা সেরকম নয় তো? মানে এবার জানো কী? পাতাল প্রবেশ।”

একটা সাংঘাতিক হল্লার চোটে খানিকক্ষণ কে কী বলছে কিচ্ছু শোনা যায় না। নন্দিনী প্রায় উড়ে এসে মিঠুকে জড়িয়ে ধরে।

হল্লা থামলে অনিতাদেবী বলেন, “তাহলে মাটির নীচে কিছু আছে বলছিস? যাকে কাজলরেখা বলেছেন আমার কপাল?”

“একটি হাতে তিনটি ফোঁড়/ হলুদ ফোঁড়ে লাগায় ঘোর। হলুদ ফোঁড় গুনতে হবে সেটা তো পরিষ্কার। কিন্তু একটি হাতে তিনটি ফোঁড় মানে কী? সত্যি অসাধারণ ছিলেন এই কাজলরেখাদেবী।” রাকার গলায় সম্ভ্রম ফুটে ওঠে।

“যথেষ্ট হয়েছে এখনকার মতো। এবার শুতে চল সবাই। খানিকটা ঘুমিয়ে নিয়ে আবার হবে। তাছাড়া মাটিতে কিছু পোঁতা থাকলে তো খুঁড়তে হবে। ওদিকটা পুরোপুরি আর্কেওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার এক্তিয়ারে। খোঁড়ার অধিকার আমাদের নেই।” অনিতাদেবীর কথায় সবার চক্ষু চড়কগাছ।

“দাঁড়া, এখুনি হতাশ হয়ে যাস না।” বড়ো জেঠু বলেন, “সকাল হোক, আমার বন্ধু সুপ্রতীককে ফোন করব। আমার ক্লাসমেট, এখন আর্কেওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার একজন বড়কর্তা।”

উঠে দাঁড়ায় সবাই। হঠাৎ রান্নাঘরের দিক থেকে ঝনঝনাৎ আওয়াজে চমকে ওঠে সবাই। অনিতাদেবী ‘এই রে! দুধের বাটি ঢাকা দিয়ে আসিনি, বেড়ালটা বোধহয় মুখ দিল।’ বলতে বলতে রান্নাঘরের দিকে দৌড় লাগালেন।

নিজেদের ঘরে এসে সবাই ধুপধাপ শুয়ে পড়ে। আকাশ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে, ভোর হয়ে এল প্রায়। দু-একটা পাখি ডাকতে শুরু করে দিয়েছে। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে সবার। পাখির কিচমিচের সঙ্গে আরও একটা শব্দ কানে আসে নন্দিনীর। অনেক দূর থেকে আবছা হয়ে ভেসে আসছে একটা চেনা সুর—‘ছাড়ো ছাড়ো ত্রিভঙ্গ কালো, রঙ্গ কোরো না।’ ঘুম জড়ানো গলায় নন্দিনী বলে, “শোন, ট্রেনের সেই বাউলনি।”

কারও কাছ থেকে কোনও সাড়া আসে না।

হা হা করে হাসছেন বড়ো জেঠু।—“অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল বুঝলি, একটা অ্যাডভেঞ্চারে যাওয়ার। সুপ্রতীক বলল দনুজ দিঘির পাড় পর্যন্ত ওদের আওতায়, তারপর এমনি জমি। একেবারে নো ম্যানস ল্যান্ড।”

বেলা সাড়ে দশটায় ব্রেকফাস্ট জমে উঠেছে।

“জিজ্ঞেস করল না খামোকা খুঁড়বে কেন?” অনিতাদেবী উদ্বিগ্ন।

“বললাম পিকনিকের জন্য উনুন খুঁড়ব।”

“তাহলে বটগাছের নীচে আমরা গুপ্তধন খুঁজব কাল?” মেজো জেঠুকে খুব একটা উৎসাহিত লাগে না। কাজের মানুষ, সামান্য বিরক্ত মনে হয় এসব ঝামেলায়।

“অবশ্যই খুঁজব, তুইও হাত লাগাবি। তুই, আমি, দীনু আর মেয়েগুলো। সবাই মিলে খুঁড়লে কতক্ষণ আর লাগবে?” হইহই করে বলেন বড়ো জেঠু।

“কতটা খুঁড়তে হবে সেটা কি জানো আদৌ?”

“এই তো নন্দিনী জানে, বল না।”

অমলেটের টুকরোটা মুখে তুলতে গিয়ে থেমে যায় নন্দিনী।—“এখানে একটু গোলমাল বাধছে জেঠু। একটি হাতে তিনটি ফোঁড়/ হলুদ ফোঁড়ে লাগায় ঘোর, তাই তো? হলুদ ফোঁড় কাল রাতেই গুনে রেখেছে রাকা। ঠিক ছ’টা। কিন্তু তার মানে কী? ছয় হাত খুঁড়তে হবে? সে তো অনেক। অত নীচে…” চুপ করে যায় নন্দিনী। সত্যি একটু অবাস্তব শোনাচ্ছে। হলুদ ফোঁড় ঘোরই লাগাচ্ছে বটে।

“চ’ যাই তো আগে, তারপর দেখা যাবে। দীনুকে বলে দিই ক’টা কোদাল জোগাড় করতে। কোদাল চালিয়েছিস কখনও?” ওদের ভ্যাবাচ্যাকা মুখগুলো দেখে আবার হো হো করে হেসে ওঠেন বড়ো জেঠু।

সামনের গাড়িতে দুই জেঠু, দীনুকা আর কোদাল। পেছনের গাড়িতে মেয়েদের নিয়ে অনিতাদেবী। মেজ মা রুমি আসতে রাজি হননি। এখনও খুব মনটা খারাপ তাঁর। গাড়ি চালাচ্ছে দীনুকার ছোটো ভাই শানু। সকাল প্রায় সাতটা। নন্দিনীর মুখটা খুব শুকনো। যদি সত্যি কিছু না থাকে? যদি খামোকা সবাইকে ঘুরিয়ে মারে ও? না না, সে কিছুতেই নয়। নিশ্চয়ই কিছু আছে। না-হলে এরকম একটা গান কেন বানালেন সেই কাজলরেখাদেবী। কাল থেকে মেলা শুরু। প্রস্তুতি পর্ব শেষ। মন্দিরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এদিক ওদিক তাকিয়ে কাকে যেন খোঁজে নন্দিনী। নাহ্, নেই।

টিয়া হঠাৎ রাকার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে, “সেই উধাও হওয়া সোনার গোপাল পোঁতা আছে নাকি রে?”

চমকে ওঠে রাকা। সেও ঠিক এটাই ভাবছিল। আস্তে আস্তে তর্জনী তুলে ঠোঁটের উপর রেখে চুপ করার ভঙ্গি করে রাকা। চোখে চোখে কথা হয় দুই বন্ধুর। দুজনেরই বুক ঢিপঢিপ করে ওঠে। কী হতে চলেছে কে জানে। মিঠু শান্ত, চুপচাপ। নন্দু উৎকট গম্ভীর। ন্যাশনাল হাইওয়ে থেকে ইংলিশ বাজারের দিকে গাড়ি ঘুরতেই হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে লাফিয়ে ওঠে নন্দিনী। শানু-সমেত সবাই হাঁই হাঁই করে ওঠে।

“একটি হাতে তিনটি ফোঁড়!” গাড়ির মধ্যে প্রায় নাচতে থাকে নন্দিনী।—“পেয়ে গেছি, পেয়ে গেছি।”

“শান্ত হয়ে বোস, অ্যাকসিডেন্ট হবে যে!” সস্নেহ ধমক দেন অনিতাদেবী।

“পেয়ে গেছি জেম্মা! এর মানে তিনটে ফোঁড় হলে মাপে এক হাত হয়, আমাদের ছয়টা ফোঁড়। অর্থাৎ…”

“দুই হাত খুঁড়তে হবে।” একসঙ্গে অনিতাদেবী-সমেত বাকিরা চেঁচিয়ে ওঠে।

শানু যে কোথাও ধাক্কা না লাগিয়ে পান্ডুয়া পৌঁছাল সেটা খুবই আশ্চর্যের। মাঝে অবিশ্যি একবার গাড়ি থামিয়ে চা খাওয়ার সময় জেঠুরাও জানলেন ব্যাপারটা। দীনুকা বলল, সে নাকি একাই দুই হাত গর্ত খুঁড়ে দিতে পারবে। অদ্ভুত মানুষ, একবার জিজ্ঞেসও করল না কেন খুঁড়তে হবে।

আদিনা মসজিদ পার হয়ে দনুজ দিঘির সামনে গাড়ি থামল। ছিটকে নেমে এল টিয়া, রাকা, মিঠু আর নন্দিনী।

“এ তো খালি ঝোপঝাড়, বড়ো গাছ তো কিছু নেই রে।” একেবারে চুপসে যাওয়া গলায় বলে নন্দিনী।

সত্যিই, দিঘি থেকে পশ্চিমদিকে পোড়ো জমি জুড়ে যত দূর চোখ যায় কেবল ঝোপঝাড়। এখানে যে একসময় একটা বর্ধিষ্ণু গ্রাম ছিল, বসতি ছিল, চাষ-আবাদ হত, উৎসব হত, ওই প্রায় ভেঙে পড়া মসজিদ, সৌধগুলো ছাড়া তার কোনও চিহ্নই আজ আর নেই। টিয়া ভাবে, এখানেই কোথাও তার কাজলাদিদার বাড়ি ছিল। আজ আর খুঁজে পাওয়ার কোনও উপায় নেই। কিন্তু এবার?

দীনুকা এসে দাঁড়ায় নন্দিনীর পাশে। নরম গলায় বলে, “দিদিমণি, কোথায় পাবে গাছ? ভূমিকম্পের সময় সব বড়ো গাছ ভেঙে পড়েছিল বলে শুনেছি। তারপর থেকে তো এ-শহর ভূতের শহর। কেউ কোনোদিন আর থাকেওনি, গাছ-টাছও আর হয়নি।”

সত্যি তো। একদম খেয়াল ছিল না। বড়ো জেঠু পকেট থেকে টেপ বের করতে করতে এগিয়ে আসেন।—“কী ম্যাডাম হোমস্, দিঘি থেকে সোজা পশ্চিমে ৪৬ ফিট, তাই তো?”

বুক দুরদুর করতে থাকে নন্দিনীর। পাশে এসে দাঁড়ায় রাকা, মিঠু, টিয়া। দুই পাশ থেকে নন্দিনীর কাঁধে হাত রেখে বলে, “চল, দেখা যাক।”

৪৬ ফিট মেপে যেখানে পৌঁছানো গেল সেখানে সমান ঘাসজমি। আশেপাশে ঘন ঝোপ, কোনো-কোনোটা প্রায় কাঁধ পর্যন্ত।

“এখানটায় খুঁড়ব বড়দা?” দীনুকা কোদাল কাঁধে তৈরি। সঙ্গে শানু। জেঠুরাও খোঁড়ার জন্য তৈরি, দীনুকা রাজি হল না।—“যাও না, দিদিমণিদের আদিনা দেখিয়ে আনো।”

কেউ যদিও রাজি হল না নড়তে। ভাগ্যিস এদিকটাতে কেউ আসে না। না-হলে পিকনিকের জন্য দুই হাত গভীর গর্ত খোঁড়া হচ্ছে এটা কাউকে বোঝানো যেত না।

প্রায় আধঘণ্টা খোঁড়ার পর দীনুকার উত্তেজিত গলা শোনা গেল।—“দেখে যাও!”

না, গুপ্তধন নয়, শিকড়। খুব বড়ো কোনও গাছের শিকড়, উপড়ে যাওয়া গাছের রয়ে যাওয়া অংশ। লাফিয়ে ওঠে টিয়া। প্রায় নাচতে থাকে।—“আমরা ঠিক রাস্তায় এগোচ্ছি।”

এখানেই তাহলে গাছটা ছিল, ভেঙে পড়েছিল ভূমিকম্পে। তার উপর পড়েছিল বহু বছরের মাটির প্রলেপ। গাছ আর গজায়নি, তবে শিকড় এখনও রয়ে গেছে।

“জেঠু, এখান থেকে এবার দুই হাত।” তীব্র দেখায় নন্দিনীর চোখ।

অনিতাদেবী আর রোদ সহ্য করতে না পেরে গাড়ির ভিতরে গিয়ে বসেছেন। রোদে গরমে সকলেই ক্লান্ত। দীনুকা ঘেমে স্নান। শানুর মুখে স্পষ্ট বিরক্তি।

“এবার আমিও হাত লাগাই।” নেমে পড়েন বড়ো জেঠু। দাদাকে দেখাদেখি মেজো জেঠুও।

চল্লিশ মিনিট কেটে যায়, পঞ্চাশ মিনিট। হঠাৎ—ঠং! চমকে ওঠে নন্দিনী। তারা মাথায় টুপি দিয়ে একটু দূরে দিঘির দিকে মুখ করে বসে ছিল। লাফিয়ে উঠে ছুটল গর্তের কাছে। পেছনে বাকিরা। আবার ঠং!

কী?

একটা ধাতব বাক্সের কোনা। তাতেই গিয়ে লেগেছে কোদালটা। পা কাঁপতে থাকে নন্দিনীর। কিছু একটা হয়েছে বুঝতে পেরে গাড়ি থেকে নেমে এসেছেন অনিতাদেবীও। বাকিটা যেন স্বপ্নের মতো লাগে নন্দিনীর।

হাতে হাতে উঠে আসে বেশ বড়ো একটা চৌকো বাক্স। তার ডালা বন্ধ করা মরচে ধরা একটা পেল্লায় তালা দিয়ে। সেটা ভাঙতে লাগল কয়েক মিনিট। সবাই বোধহয় নিঃশ্বাস ফেলতেও ভুলে গেছে। ডালা খুলতেই ঝলমল করে উঠল হাতে হিরের নাড়ু নিয়ে হাসিমুখে বসে থাকা প্রায় ইঞ্চি দশেক উচ্চতার সোনার তৈরি গোপাল। টুকটুকে লাল প্রবালের তৈরি দুটো ঠোঁট। প্রায় পাঁচশো বছর বন্দি থেকেও অমলিন। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সবাই। দীনুকা শানুকে নিয়ে সরে দাঁড়ায় গর্ত থেকে। অনিতাদেবী সাগ্রহে এগিয়ে যান, তাঁর দুই চোখে টলমল করছে জল।

বড়ো জেঠু গর্তের মধ্যে নেমে দাঁড়িয়ে ছিলেন; সযত্নে তুলে ধরেন হারিয়ে যাওয়া গৃহদেবতাকে। দুই হাত বাড়িয়ে অনিতাদেবী কোলে তুলে নিতে গেলেন গোপালকে। হঠাৎ পেছন থেকে কর্কশ গলায় টেনে টেনে কে বলল, “নকশি কাঁথায় আমার কপাল/ জয় শ্রীহরি প্রাণের গোপাল। তোমাদের না বড়ো বৌদি, কপাল আমার।”

চমকে ফিরে তাকায় সবাই। টিয়ার গলা থেকে ফ্যাসফ্যাসে একটা আওয়াজ বেরিয়ে আসে, “প্রকাশকাকা।”

“ঠিক। প্রকাশকাকা, মামণিরা। আর এটাও নিশ্চয়ই চেনো, এটা হল ছুরি। এটার নাম কিডনি ড্যাগার। না না, কেউ এগিও না। কেমন সুন্দর ধাঁধার উত্তর বের করলে তোমরা। কেউ আসবে না এদিকে। চটপট ওটা আমাকে দাও বৌদি। সেদিন অনেকক্ষণ রান্নাঘরে লুকিয়ে থেকে সব শুনেছিলাম তোমাদের কথা। তুমি ভেবেছিলে আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছ, না বৌদি? প্রকাশকে এত সহজে তাড়ানো যায় না। হাত লেগে বাসন ওলটাল, তুমি ভাবলে বেড়াল।” বিশ্রীভাবে হাসতে থাকে প্রকাশ। ছুরিটা নাচাতে নাচাতে এগিয়ে যায় অনিতাদেবীর দিকে। নন্দিনী দেখে জেম্মার হাত ঠকঠক করে কাঁপছে। না, কেউ কোথাও নেই। যা ঝোপ চারপাশে, কেউ দেখতেও পাবে না।

“প্রকাশ, এ-কাজ কোরো না।” বড়ো জেঠু এগোনোর চেষ্টা করেন। দূরে দাঁড়ানো চিরকালের বিশ্বাসী দীনুর দিকে একবার তাকান। দীনু অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকে—ইশ্, বড্ড দূরে চলে এসেছে সে। এখন এগোতে গেলে সে পৌঁছবার আগেই হয়তো ছুরি চালিয়ে দেবে প্রকাশ।

“খবরদার বড়দা! এগিও না, আমার হাতে ছুরি কিন্তু কথা বলে। চুপচাপ দিয়ে দাও, কারও কোনও ক্ষতি হবে না। তোমরা তো আত্মীয় আমার, তোমাদের ক্ষতি আমি করতে পারি বলো?” দাঁত বের করে খ্যাঁকখ্যাঁকে হাসি হাসতে হাসতে আরও দুই পা এগিয়ে যায় প্রকাশ। নন্দিনীকে পেরিয়ে গেল, টিয়াকেও। এবার মিঠুর পাশ দিয়ে যাবে। একটা পা বিদ্যুৎ বেগে উঠে আঘাত করল প্রকাশের কবজিতে। ছুরিটা ছিটকে গেল, প্রকাশ চমকে ঘুরে দাঁড়াতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে গর্তে গিয়ে আছড়ে পড়ল সটান বাক্সটার উপর। ধাতব বাক্সটার একটা কোনা সজোরে ঠুকে গেল তার মাথার পাশে। পা দুটো বেরিয়ে রইল গর্তের বাইরে।

পুরো ঘটনাটা ঘটতে লাগল হয়তো সাত সেকেন্ড। মিঠু। চুপচাপ শান্ত মিঠু যে পাঁচ বছর বয়স থেকে মার্শাল আর্ট শিখছে তা কারও মনে থাকে না। অনিতাদেবী জড়িয়ে ধরেন মিঠুকে।

পুলিশ যখন এসে পৌঁছল, প্রকাশ তখনও অজ্ঞান। সে একেবারেই আশা করেনি এই আক্রমণ, নইলে বদমাশ প্রকাশকে হয়তো এত সহজে কাবু করা যেত না।

অনেক পরে সবকিছু পুলিশকে জানিয়ে গোপালকে কোলে বসিয়ে যখন রামকেলি প্রায় পৌঁছে গেছেন তাঁরা, অনিতাদেবী অস্ফুটে বললেন, ‘ভাগ্যিস রুমিটা আসেনি।”

মেলার আজ তৃতীয় দিন। সংকীর্তনের আওয়াজে মুখর চারদিক। তবে মেলার থেকেও বেশি ভিড় আজ চাটুজ্জে বাড়িতে। এতদিনের শূন্য মন্দিরে আজ গোপাল ফিরবে। সবাই টিয়া আর তার বন্ধুদের দেখতে চাইছে, আলাপ করতে চাইছে। সুন্দর করে শাড়ি পরে সেজেছে ওরা। জেম্মা আর মেজো মাকে লাল পাড় ঢাকাই শাড়ি আর সোনার গহনায় কী সুন্দর যে লাগছে! টিয়ার বাবা-মা, জেঠতুতো দাদা আর দিদিও বিকেলের মধ্যেই এসে পৌঁছবে। বাগান লোকে লোকারণ্য।

নন্দিনী এক থালা ফুল আর মালা নিয়ে মন্দিরের দিকে যাচ্ছিল। মন্দির পরিষ্কার করে আগাছা কেটে ফেলা হয়েছে। হঠাৎ থেমে যায় নন্দিনী। ওটা কে ওখানে? ওই গন্ধরাজ গাছটার নীচে? গেরুয়া কাপড়ে মুখ-মাথা মোড়া। হাতে একতারা। ভিড় ঠেলে এগিয়ে যায় নন্দিনী। আজ ও ধরে ফেলবেই ওকে। এত ভিড়, উফ্! নন্দিনী যখন গন্ধরাজ গাছটার নীচে পৌঁছল, কেউ নেই সেখানে তখন। ছুটে গেটের কাছে যায় ও। নাহ্, কেউ কোত্থাও নেই। একটা অজানা কষ্টে, প্রায় পাঁচশো বছর আগেকার এক অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত মানুষের জন্য চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে নন্দিনীর।

শান্তি, এতদিন পর। অনেক অনেক যুগ ধরে ঘুরতে হল তাঁকে। তাঁর ভগবান বড়ো রঙ্গ ভালোবাসেন। এত বছর ধরে কম রঙ্গ করলেন না। বাড়ি, মন্দির তৈরি করে পরিবেশ শান্ত হলে ভেবেছিলেন গোপালকে নিয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠা করবেন। যদি তার আগেই ও-পারে যাওয়ার ডাক আসে, তাই হদিস রেখে গেছিলেন নকশিকাঁথার গানে। যোগ্য লোক ওই অমূল্য মূর্তির ভার নিক, এই ছিল তাঁর ইচ্ছা। সত্যিই বড়ো তাড়াতাড়ি তাঁর গোপাল টেনে নিয়েছিল তাঁকে। এতই আচমকা যে ছেলেকেও বলে যেতে পারেননি নকশিকাঁথার গানের আসল মানে। কেউ বোঝেওনি আর। কত অপেক্ষা। তবে এই মেয়েগুলোকে বড়ো ভাল লাগল তাঁর। কেমন ঝকঝকে বুদ্ধি, চলাফেরা হাবভাব কত উজ্জ্বল। কেমন মোকাবিলা করতে পারে বিপদের। তাঁর সময়ে এমনটি হত না। বড্ড লেখাপড়া শেখার ইচ্ছা ছিল; চল ছিল না তখন, তাই হয়ে ওঠেনি। আজ এদের দেখলে মনটা ভরে যায়। বড়ো হয়ে উঠুক এরা, আরও উজ্জ্বল হোক। এবার তাঁর সত্যিকার বাড়ি ফেরার পালা। মনে মনে হেসে ফেলেন তিনি। কেমন গেরুয়া পোশাকে বোষ্টমী হয়েছেন। কাজল বোষ্টমী। আস্তে আস্তে মিলিয়ে যান দিগন্তে। শুধু সুরের রেশ থেকে যায়—‘ছাড়ো ছাড়ো ত্রিভঙ্গ কালো, রঙ্গ কোরো না।’

অলঙ্করণ- জয়ন্ত বিশ্বাস

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s