আগের লেখা – ঝড় এসেছে রুদ্ররূপে

আমার জন্ম অবিভক্ত বাংলার বরিশাল জেলার গাববাড়ি গ্রামে। চারপাশে বড় বড় নদী ও খালে ঘেরা আমার গ্রাম। তখনো দেশ ভাগ হয়নি, যৌথ পরিবার ভেঙে পড়েনি। উঠোনের চারপাশে একই পরিবারের বিভিন্ন তরফের ঘর। ডাকাতির ঘটনাটি যখন ঘটে, তখন আমার বয়স চার হবে। ১৯৪৫ সালের ঘটনা…
শাখ মাসের অমাবস্যা। গরম যেমন তেমনি অন্ধকার। রাত হতে আমি বারান্দায় গিয়ে বাইরে তাকিয়ে বেশ ভয়ে ভয়ে ঘরে ঢুকে গেলাম। বড় ঘরে বিছানা পাতা রয়েছে,বিছানা মানে তো শীতলপাটি আর বালিশ। চট করে শুয়ে পড়লাম। সকালে মার সাথে মামাবাড়ি গেছিলাম। সন্ধের আগেই ফিরে এসেছি। মামাবাড়ি তো দক্ষিণদিকের মাঠটার পরই। কখন মা শুয়েছে, মশারি টাঙিয়েছে টেরই পাইনি।
কত রাত কে জানে–মার ডাকে আর টানাটানিতে উঠে পড়ে দেখি ঘরে বাতি জ্বলছে। দিদিও দাঁড়িয়ে আছে। জেঠিমা আর দিদি পাশের বিছানায় শুয়েছিলো। মা উঠে দরজা খুলে দিদির হাত ধরে, আমাকে কোলে নিয়ে বড় বারান্দা ছোট বারান্দা পেরিয়ে উঠোনে নেমে এলেন। ঘরের পাশ দিয়ে গিয়েই আমাদের বাথরুম করালেন। তারপর উঠানে দিদির পাশে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বললেন, “একটু খাড়া, মুই এহনই ফিরমু। ”

দিদি আমার হাত শক্ত করে ধরে আছে। চারদিকে নিকষ কালো অন্ধকার। নিস্তব্ধ রাত। দিদি চারদিকে তাকাচ্ছে আর বলছে, “ওমা বড় ভয় করতে আছে। ”
“কিছু ভয় নাই, মুই বেশিদূর যামু না। এহনই আইয়া পড়মু। ”
খানিক বাদেই মা এসে আমাকে কোলে নিয়ে দিদির হাত ধরে ঘরের দিকে যেতেই দেখলেন কুকুরগুলো উত্তর দিকে বাড়ির ঢোকার রাস্তায় প্রচন্ড চিৎকার করছে ও যেন ঝাঁপিয়ে পড়ছে। মনে হল মা-ও ভয় পেয়েছেন। দুই মেয়েকে নিয়ে দ্রুত উঠে গেলেন বারান্দায়। সেখান থেকে উঠোনের দিকে তাকিয়ে দেখেন চারদিকে কালো কালো ছায়ায় ভরে গেছে। তীব্র টর্চের আলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। মা ঘরে ঢুকেই আমাকে নামিয়ে দরজা বন্ধ করে চিৎকার করে উঠলেন, “মাইজলাদিদি- শিগগির ওডো। লোকে উডান ভইরগ্যা গেছে। ”
মা কিন্তু দরজা বন্ধ করে দরজা ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মুহুর্তের মধ্যে দরজায় আঘাত। দেশের বাড়ির কাঠের শক্ত দরজা, বেশ কিছুটা সময় সে স্থির ছিলো- তারপর প্রচণ্ড আঘাতে ভেঙে গেলো খিল। দিদি তখন আমাকে নিয়ে মায়ের বিছানায়, মাও ছিট্কে চলে এলেন বিছানায় দুই মেয়ের কাছে। ডাকাতরা হৈ হৈ করে ঢুকে পড়েছে ঘরে। কি চিৎকার তাদের! বড় বড় টর্চের আলোয় সমস্ত ঘর আলোকিত হয়ে গেলো। জেঠিমাও তীব্র চিৎকার করে উঠলেন। একজন ডাকাত ততক্ষণে হাতের রামদা দিয়ে মশারির কোণাগুলো ঝপাঝপ কেটে মশারিগুলো ছুঁড়ে দিয়েছে।
বাড়ির লোকজন সব তখন জেগে গেছে। বড় বারান্দার দু’দিকে মেঝেতে বিছানা। একদিকে আমার বাবা আর জেঠামশাই আর অন্যপাশে দুজন কাজের লোক। বারান্দার শেষ দুইদিকে দুটি খাট। ওখানে বাড়ির দুজন মাস্টারমশাই ঘুমোন। তাঁরা সেদিন তাদের বাড়িতে চলে গেছিলেন।
হইচই শুনে আমার জেঠামশাই মশারির মধ্যেই উঠে দাঁড়িয়েছেন। এক ডাকাত মশারির দুটো কোণা ছিঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল আর ওনাকে দুচার ঘা দিয়ে হাত বেঁধে বসিয়ে দিল। কাজের লোকেদেরও সেই দশা। তারা বারবার বলছে, “মোরা এ বাড়ির কাজের লোক – মোগো ছাইড়গ্যা দ্যান,” কিন্তু কে শোনে কার কথা? পিটিয়ে হাত, পা বেঁধে রেখে দিল তাদের।
জেঠিমা চিৎকার করে কাঁদছেন আর বলছেন, “বাবারা যা আছে সব লইয়া যাও। পরাণ কয়ডার ক্ষতি কইরোনা। ”
জবাবে “অ্যাই বুড়ি চুপ” বলে জোর ধমক।
জেঠিমার চিৎকার শুনে পাশের ঘর থেকে মেজদাদা “ও মা কী হইছে?” বলে ঘরে ঢুকতেই “ধর শালাকে” বলে সে কি মার!
পশ্চিম ভিটার পূবমুখো ঘর। মাঝখানে বড়ো ঘর তার পাশ দিয়ে অন্য ছোটোঘর। দক্ষিণ পাশের ঘরটায় আমির ছোড়দা, টবিদা আর এ বাড়িতে লজিং-এ থেকে যে ছেলেটা পড়াশুনা করতো সে থাকে। ও ঘরেই তাদের পড়ার টেবিল, খাট, চেয়ার সব। মা আর জেঠিমার কান্না শুনে টবিদা যেই উঁকি দিয়েছে, অমনি চুলের মুঠি ধরে টেনে এনে মেরে হাত পা বেঁধে জেঠিমার পাশেই বসিয়ে দিলো। সুশীল বলে লজিং-এ থাকা ছেলেটি পা টিপে টিপে পালাবার ধান্দা করছিলো। তাকেও ধরে মেরে, তার হাতদুটো গামছা দিয়ে বেঁধে বারান্দার সেই খাটে ফেলে রাখলো হুমকি দিয়ে, “এই পলাবিনা। ”
আমার ছোড়দা মশারির ফাঁক দিয়ে এসব দেখে খাটের তলায় ঢুকে পড়েছিল। খাটের তলায় ছিলো বিরাট একটা মাটির জালা। তার মধ্যে বীজ আলু রাখা ছিলো। আলুগুলো ঢেলে জালার মধ্যে ঢুকে পড়েছিলো সে। কিন্তু পুরো মাথাটা ঢেকেনি। সামান্য একটু বেরিয়ে ছিল।
পূর্ববাংলার বাড়িগুলো এরকম ছিল- মাঝখানে উঠান। উঠানকে ঘিরেই সকলের ঘর। আমাদের বড় বাড়ি বলে বিরাট উঠান- দক্ষিণ দিকে ছিলো বড় কাছারিঘর, উত্তর দিকে পুকুর। বাড়িতে আসা যাওয়ার পথ ছিলো দু’দিকেই। ডাকাতদলের দুই তিন জন উঠানে দাঁড়িয়ে পাহারার কাজ করছিল। অন্যরা লুঠপাটে ব্যস্ত। একতলা বাড়ি, কিন্তু উপরে দোতলার মত পাটাতন। সেখানেও উঠেছে দু এক’জন। আমি তো মায়ের কোলে লুকিয়ে বসে আছি। মাকে বলে যাচ্ছি “মা- পলাইয়া যাই। ” কিন্তু আমার দশ এগারো বছরের দিদি তখন বীরাঙ্গনা। সে সব দেখেছে- ডাকাতরা আলমারির একটা দরজা খুলতে না পেয়ে সেটাকে যেই কাটতে যাবে, দিদি তাদের বাধা দিয়ে বললো,“হ্যান্ডেল ধইর্যা বাঁদিকে ঠেলা দাও, খুইল্যা যাবে। ”
আমাদের মন্দিরে নারায়ণ পুজো হয় গোটা বৈশাখ মাস ধরে। তার জন্য কাউখালি থেকে সের পাঁচেক চিনি আনা ছিল। একটা ডাকাত হাত ঢুকিয়ে পাত্র থেকে চিনি তুলেছে, তাই দেখে দিদি খুব ক্ষেপে গেল, “আমাগো নারায়ণের চিনিতে হাত দিছো ক্যান? আবার খাইতে আছো! দ্যাখবা কী দশা হয় তোমাগো!”
দিদির আবার একটা ছোট সুটকেসও ছিলো। সেখানে তার নিজস্ব জিনিসপত্র, সামান্য টাকাপয়সা রাখত। একটা ডাকাত সুটকেসটা খুলতেই আবার বাধা, “এটা মোর সুটকেস। ওর মইধ্যে মোর টাকা। ”
“ঠিক আছে, ঠিক আছে, রইলো তোর সুটকেস” বলে ডাকাতটা সেটা তাড়াতাড়ি রেখে দিলো।
এদিকে ততক্ষণে ডাকাতরা সারা বাড়ি দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল। আর কিছুক্ষণ পরপরই “খবরদারি হে!” বলে একসাথে চিৎকার করছিল। গ্রামের নীরবতার মধ্যে সেই ভয়ঙ্কর চিৎকার একটা বেশ ত্রাসের আবহ সৃষ্টি করেছিল। পূবের ভিটায় বড় জ্যাঠার দোতলা পাকা বাড়ি। তাদেরও দরজা ভেঙে একজন ডাকাত ঢুকেছিল, কিন্তু কোনও ঝামেলা করেনি। শুধু হুশিয়ারি দিয়েছিল, “চুপচাপ যে যেখানে আছিস ,হে হেইখানে বইয়া থাকবি। “ হলে হবে কি, খানিক পরে পূবের ঘরের বড়ো বৌ চুপচাপ খিড়কির দরজা খুলে বেড়িয়ে ছোট খাল পেরিয়ে পাশের বাড়ি পার হয়ে চলে গেছিল মাঠে। মাঠের ওপাশে পাশাপাশি সব গ্রাম। সেই মাঠের মধ্যে ছুটছিল আর চিৎকার করছিল, “ডাকাইত পড়ছে মোগো বাড়ি! হগলে বাইরাইয়া আসো। দক্ষিণের মাঠ ছেড়ে যখন পশ্চিমের মাঠে যাচ্ছিল, দেখে ডাকাতদের টর্চের আলো ঘু্রছে চতুর্দিকে। ধরা পড়ার ভয়ে বুদ্ধিমতি বড়বৌ মুহুর্তের মধ্যে গা ঢাকা দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে চলে গেছিল।
বেশ কিছুটা সময় কেটে গেছে। বাড়ির অন্য লোকেরা, গ্রামের লোকেরা সব জেগে গেছে। বাড়ির কেউ কেউ পেছনের দরজা দিয়ে চলে গেছে বাড়ির বাইরে- পাশের সব গ্রামের লোকদের ডাকতে। আমার বড় জেঠতুতো দাদা, কবিরাজদা গরমের জন্য বারান্দায় শুয়েছিলো। উত্তর ভিটায় আর একটা ঘর, সেখানে তার ডিসপেন্সারি আর দুটো শোবার ঘর, সামনে পেছনে টানা বারান্দা। চ্যাঁচামেচি শুনে উঠে পালাবার চেষ্টা করছিলো, কিন্তু ডাকাতেরা ঠিক দেখে ফেলেছে। দু চারজন তো উঠোনে ছিলো পাহারার জন্য। ধরা পড়বার পর আঙুলের সোনার আংটিটা চেপে ধরে বলে, “মুই-এ বাড়ির কাজের লোক। কিছু জানিনা, মোরে মারবেন না যেন। ” কিন্তু সেই বলে কি মারের হাত থেকে রেহাই পায়? তবে হ্যাঁ, পরিমাণে খানিক কম হয়েছিলো।
ইতিমধ্যে বাড়ির বাইরে শয়ে শয়ে লোক জড়ো হয়েছিল। কিন্তু ডাকাতের গাদা বন্দুকের ভয়ে সাহস করে বাড়ির মধ্যে ঢুকছিল না। ডাকাতের সর্দার খুঁজছিলো ঘরের কর্তা মানে আমার বাবাকে। আমার বাবাও বারান্দায় শুয়েছিলেন। বাবা বুঝেছিলেন এদের সামনে পড়লে প্রাণ যাবে। তাই কাটা মশারিটা জড়িয়ে বড় ঘরের দেয়ালের সাথে নিজেকে মিশিয়ে নিঃসারে শুয়েছিলেন। ডাকাতরা লাথি মেরে বালিশগুলোও ছুঁড়ে দিয়েছিলো তার গায়ের উপর।
“আরে বাড়ির কর্তাডা কোথায়? খোঁজ খোঁজ—” এই বলে তারা দক্ষিণের ঘরটায় ঢুকলো রামদা হাতে। একই কায়দায় কেটে ফেলে দিল মশারি কোণ। একটা একটা করে তোষক তুলে দেখতে দেখতে আমার ছোড়দার মাথার অংশটুকু দেখতে পেল। ওমনি “বাইরা বাইরা” বলে তার চুল ধরে টেনে তুলছে।
“পাইছি এবার কর্তারে। কোথায় কী আছে বাইর কর। ”
আমার ছোড়দা খুব রাগী আর দুরন্ত দুঃসাহসী। সে খাটের তলা থেকে বেরোতে বেরোতে বলতে লাগল, “হু! কর্তারে পাইছে! দেহো দেহি কেমন কর্তা মুই। এবার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিমু। সকাল দশটায় ইস্কুলে যাই, সন্ধ্যায় ফিরি। কোথায় কী আছি কেমনে জানি? দাড়ি -মোচও বাইরায়নি ভালো মত!”
ডাকাত খুব রেগে গিয়ে হাত তুলেছে- আর ছোড়দাও মুহুর্তের মধ্যে ডাকাতের হাত থেকে রামদা টেনে নিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে কোপ বসিয়েছে।

ডাকাতের সৌভাগ্য এবং ছোড়দার দুর্ভাগ্য যে ওরা দুজন যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল তার সামনের পড়ার টেবিল আর বিদ্যাসাগরী মোটা হাতলওয়ালা চেয়ার এবং ডাকাতটার মাথা বরাবর একটা মোটা লোহার তার ছিল। সেই দায়ের কোপ মোটা তারটিকে কেটে ডাকাতের কাঁধের পাশে আঘাত করে চেয়ারের হাতলটিকে কেটে দুভাগ করে দিল। ডাকাত বিপদ বুঝে এবার দলবল নিয়ে উঠোনে নেমে গেল। ছোড়দাও সেই রামদা হাতে মূর্তিমান বিভীষিকার মত ডাকাতের পিছু নিতে ডাকাতরা তখন উর্ধ্বশ্বাসে উত্তর দিকে ছুটে পালাতে লাগল। দৌড়োতে দৌড়োতে ছোড়দা জোর হাঁক দিচ্ছিল, “হগলে বাইরাও, বিপদ আইসে!“
উত্তর দিকে বাড়ির বেরোবার রাস্তা ধরে একটু এগিয়ে বড় পুকুর- তার সামনে দিয়ে রাস্তা চলে গেছে মন্ডল বাড়ির দিকে। মন্ডলবাড়ি যাবার আগেই ছোট মাঠের পরে একটা ভিটা। ভিটা পার হলেই নদী। ডাকাতদের গন্তব্য নদী। সেখানে তাদের নৌকা আছে। ছোড়দা ছুটতে ছুটতে হঠাৎ শোনে পাশেই কার গলা-“আউগা ভাইডি, মুই আসি তোর লগে। ” তাকিয়ে দেখে মেজদা। হাতে লম্বা বাঁশের পাকানো লাঠি। দুই ভাই একসাথে তাড়া করে চলল। গ্রামের শয়ে শয়ে লোকও এবার ঢুকে পড়েছে পাশের মাঠে। তাদের চিৎকারে ডাকাতরা তখন দিশেহারা।
গ্রামের যজ্ঞেশ্বর যাত্রা-থিয়েটারে ডেলাইট আর হ্যাজাকবাতি সরবরাহ করে। সে বুদ্ধি করে চারটে হ্যাজাকবাতি আর ডেলাইট জ্বেলে মাঠে চলে এসেছে ততক্ষণে। চারদিক আলোয় আলো।
এদিকে আমার বাবা, জ্যাঠা ও বাড়ির অন্যান্য লোকেরা মরিয়া হয়ে হাতের কাছে যে যা পাচ্ছিল তাই নিয়েই ছুটে আসছিল। গ্রামের লোকেদের হাতে তো ল্যাজা, সড়কি, লাঠি সবই ছিল। ডাকাতরা প্রমাদ গুনলো। তারা তখন সৈন্যদের মত ব্যুহ রচনা করে পিছু হটছিল মাঠের মধ্যে দিয়ে আর তাদের হাতে যা ছিলো ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছিল।
তখনকার দিনে কাগজের টাকা কম ছিল। বেশি ছিল রুপোর টাকা বা কাঁচা টাকা। আমার বড়দাদা বিলেতে ব্যারিস্টারি পড়তে যাবে বলে টাকা জমানো হচ্ছিল বড়ো বড়ো কৌটো ভর্তি করে। ডাকাতরা আসলে এই টাকার খবর পেয়েই এসেছিল। তারা সেই টাকার কৌটো নিয়ে পালাচ্ছিল। এইবারে ধরা পড়বার ভয়ে তারা এক অদ্ভুত কৌশল নিল। বাড়ির অন্যান্য লুঠের জিনিসের সাথে সেই টাকার কৌটোগুলোও মাঠে ছুঁড়তে ফেলতে লাগলো। মাঠে পা ডোবার মত জল আর তার মধ্যে ঝনঝন করে টাকা পড়তে শুরু করল ও লোকজন দিশাহারা হয়ে গেল।
ডাকাতদের এই কৌশলটা বেশ কাজে লাগল। গ্রামের অনেক লোক তখন টাকা কুড়োতে ব্যস্ত। এই ভাবে ওরা প্রায় নদীর কাছে এসেই জোরে ছুটতে লাগলো। ছোড়দা একজনকে তাড়া করছে। হাতে তার রামদা আর চিৎকার, “মোর বাবারে মারার শোধ মুই নিমু। ” ডাকাতটা যেই ভিটেতে উঠে লাফ দিয়ে নিচে নেমেছে আর আমার ছোড়দাও লাফ দিয়ে নেমে ডাকাতকে চেপে ধরে বুকের উপর বসে রামদা তুলেছে। পিছন থেকে গ্রামের একজন লোক সেই উদ্যত রামদা সমেত হাত ধরে ফেলে বলল, “মারিসনা মারিসনা ,এডারে বাঁচাইয়া রাখতে হবে, তাইলে আরও ডাকাইত ধরা যাবে। ”
“কিন্তু মোর বাবা যে–”
“ওরে না, তোর বাবার কিছু হয়নাই। বাইচ্যা আছে। ” ডাকাতের দল নৌকায় উঠেছে ততক্ষণে। লোকজন এবারে লম্বা বাঁশ দিয়ে আর বড় বড় মাটির চাকা ছুঁড়ে ছুঁড়ে একটা নৌকা ডুবিয়ে দিলো। অন্ধকারে ডুব সাতাঁর দিয়ে হোগলাবনে লুকিয়ে পড়ল ডাকাতের দল।
ধরা পড়া ডাকাতটাকে পায়ে দড়ি বেঁধে মাঠের মধ্যে দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে এসে- পাশের এক ছাড়া (পরিত্যক্ত) বাড়িতে রাখা হলো। অনেক সময় ডাকাত ধরা পড়লে তারা দ্বিগুণ বলে ফিরে এসে অত্যাচার করে ও সঙ্গীকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। ফলে সবাই সে রাতে সতর্ক হয়ে জেগেই কাটিয়ে দিল।
আমি মায়ের কোলের মধ্যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল জানিনা। সকালবেলা বাবা আমাকে কোলে নিয়ে উঠোনে ডাকাত দেখাতে নিয়ে এসেছিলেন। আমার এখনও সেই দৃশ্য চোখের সামনে ভাসে- কালো পোশাক পরা একটা লোক উঠানের মধ্যে টানটান হয়ে শুয়ে আছে, যন্ত্রনায় গোঙাচ্ছে আর চারদিকে জনসমুদ্র। বড় জ্যাঠার ছাদে, অন্যঘরের টিনের চালে, সুপারি গাছ, নারকেল গাছের মাথায় তখন শুধু লোক আর লোক।
উপসংহারঃ বেশ কয়েক বছর পরে একদিন দুপুরবেলা এক চোখওয়ালা এক ভিখারি এসেছিল আমাদের বাড়িতে। সে খেয়েদেয়ে তার দুঃখের কাহিনী বলছিল, “কত্তা, আপনাগো বাড়ির মোগো দল ডাহাতি করতে আইসিলো। নাও ডোবার পর হোগলা বনে পলাইয়াছিলাম। আর আপনের বড়পোলা (আমার বড়দা) যে বেলাত যাবে, এ খবর মোগো দেছিল আপনাগো এক দূরের কুটুম। দেহেন, পাপ কইর্যা এখন কী দশা হয়েছে। ”
ছবি- মৌসুমী
এমনই অসামান্য সব কাহিনি নিয়ে অলকানন্দা রায়ের জনপ্রিয় বই- ছোটোমনুর উপাখ্যান। জয়ঢাক প্রকাশন। নীচের লিঙ্কে ক্লিক করে অর্ডার দিন