
২৫ ডিসেম্বর সেই ভোর পাঁচটায় ক্যামেরা নিয়ে সাহাবুদ্দিনের নৌকায় ভেসে পড়েছিলাম চুপির চরের জলে। সূর্য উঠতে ঢের বাকী। এই ভোরে সাধারণত মাঝিরা নৌকা বাইতে চায় না, তারপর গঙ্গার ধারে এই চরের অসপ্রে পয়েন্টে ক’দিন আগে মুণ্ডুহীন দুই পুরুষের দেহ মেলায় পুলিশে ছয়লাপ হয়ে গেছিল জায়গাটা। খুনের কিনারা করতে মাঝিদের ধরে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করে নাজেহাল করে ছেড়েছে পুলিশের লোকেরা। এই ভোরেও দু’জন পুলিশ কাষ্টশালির ঘাটে দাঁড়িয়ে।
সাধারণত নভেম্বরের শেষ বা ডিসেম্বরের শুরু থেকেই পরিযায়ী সহ নানা পাখি যেমন অসপ্রে, রুডি শেলডাক, স্মল প্রাটিনকোল, রিভার ল্যাপ উইং, গ্রে হেরন, পার্পল হেরন, রেড ক্রেস্টেড পোচার্ড, গ্রিন বি ইটারদের আনাগোনা শুরু হয়ে যায় চুপির অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদে। শুধু যে মধ্য ও উত্তর এশিয়া, ইউরোপ, সাইবেরিয়া বা তিব্বত থেকেই পাখিরা এখানে আসে এমন নয়। উত্তরবঙ্গ থেকেও প্রচুর পাখি আসে এই হ্রদে খাবারের সন্ধানে।
ভাগীরথী বা গঙ্গার একটা খাত মূল নদী থেকে ভাগ হয়ে ঘোড়ার খুড়ের আকারে ঘুরে জন্ম দিয়েছে এই হ্রদের। হ্রদের এক পাশে নবদ্বীপ আর উল্টোদিকে মায়াপুর। পুরো হ্রদ ভর্তি কচুরিপানা আর নানা জাতের জলজ উদ্ভিদে। এই জলজ উদ্ভিদ আর কচুরিপানার মধ্যে থেকে পাখিরা খুঁজে নেয় তাদের খাবার। হ্রদের ঠিক মাঝখানে আছে এক চর। বর্ধমান জেলার পুর্বস্থলীর এই চর বা দ্বীপ চুপির চর নামে পাখিপ্রিয় মানুষদের কাছে পরিচিত।
এর আগেও বেশ কয়েকবার পাখির ছবি তুলতে চুপির চরে এসেছি। তবে প্রতিবার গাড়ী নিয়ে এলেও এইবার ব্যান্ডেল থেকে ট্রেনে এসে পূর্বস্থলীর কাষ্টশালির এক গেস্ট-হাউসে রাত কাটিয়েছিলাম ভোরবেলা বেরিয়ে পড়ার জন্য। গতকাল রাতে যখন চেনা মাঝি সাহাবুদ্দিনকে ফোনে খুব ভোরে নৌকা নিয়ে বেরোবার কথা বলেছিলাম তখনই জেনেছিলাম এই চরে মুণ্ডুহীন দেহ পাবার কথা। খবরটা নাকি কাগজেও বেরিয়েছিল। আমি জানতাম না, জানলে এখন আসতাম না।
হ্রদের বুক থেকে ওঠা কুয়াশার স্তম্ভগুলোর মাঝ দিয়ে নৌকা এগিয়েছিল নিঃশব্দে। আমাদের নৌকা ছাড়া আর কোন নৌকা নেই। যদিও এর আগে অনেক ছবি তুলিয়েকে এই সময় নৌকা নিয়ে আমারই মতো ভেসে যেতে দেখেছি। এই চরে মুণ্ডহীন দেহ পাবার খবর জানার জন্য হয়তো কেউ আসেনি।
হ্রদ খুব গভীর না হওয়ায় লগি ঠেলে নৌকা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল সাহাবুদ্দিন। ও জানে বৈঠার আওয়াজ পেলে জলে ভেসে থাকা পাখিরা সরে যাবে। টকটকে লাল সূর্যটা কুয়াশার জাল ছিঁড়ে জল থেকে কেঁপে কেঁপে সবে উঠতে শুরু করেছে। দেখি হ্রদের মাঝে আড়াআড়ি ভাবে লাগানো জেলেদের বাঁশের ওপর এক পানকৌড়ি দু-পাখা ছড়িয়ে বসে। আলোর বিপরীতে মনে হচ্ছিল যেন সূর্যটাকে দুই পাখা দিয়ে জাপটে ধরেছে। আমাকে ক্যামেরা তাক করতে দেখেই নৌকাটাকে থামিয়ে দিয়েছিল সাহাবুদ্দিন। ছবি তুলিয়েদের নৌকা বাইতে বাইতে ও জেনে গেছে কখন কি করতে হয়। তখনই নজরে এসেছিল জল থেকে উঠে থাকা বাঁশে আটকে উপুড় হওয়া একটা দেহ। কোন পচা গন্ধ পাইনি, তার মানে সদ্য মৃত, পচন ধরা শুরু হয়নি এখনও।
খানকয়েক পাখির শট নেওয়া হয়ে গেছিল। আর এগোতে চাইলাম না। সাহাবুদ্দিনকে বলতে ও নৌকা ঘুরিয়ে নিয়ে চলল ঘাটের দিকে – পুলিশকে খবরটা দেওয়া দরকার। সাহাবুদ্দিন বলল এটা নিয়ে নাকি মোট ছ’টা মুণ্ডুহীন বডি পাওয়া গেল দিন কয়েকের মধ্যে।
পূর্বস্থলী থেকে সাড়ে চারটের ৩১১১২ ডাউন কাটোয়া-শিয়ালদহ লোকালে চেপে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলাম। ছবি তুলতে এসে যে এ’রকম পুলিশি হাঙ্গামায় জড়িয়ে পড়তে হবে ভাবিনি। একই প্রশ্ন বারবার করে বিরক্ত করে তুলেছিল। ভাগ্যিস ডি এস পি ভদ্রলোক কোন এক ম্যাগাজিনে আমার তোলা ছবির কথা মনে রেখে আমায় শখের ফোটগ্রাফার বলে চিনতে পেরে আমাকে আর সাহাবুদ্দিনকে থানা থেকে ছেড়ে দিয়েছিল। না হলে হয়তো আজ সারারাত থানাতেই থাকতে হত। পুলিশের অফিসাররা এমনভাবে কথা বলছিল যেন আমরাই খুনটা করেছি, অথবা খুনের ব্যাপারে সব জানি।
লোকাল ট্রেনে আজকাল আর খুব একটা যাতায়াত করি না, ফলে বুঝতে না পেরে একটা ভেন্ডার বগিতে উঠে পড়েছিলাম। কামরাতে খুব বেশি লোক নেই। দু’একটা লোক যাও বা ছিল নেমে গেছিল ফাঁকা ঝুড়ি নিয়ে। আমি ছাড়াও আর একজন লোক একটা ছোট ঝুড়ি মাথায় নিয়ে উঠে ঝুড়িটাকে সিটের নীচে রেখে আমার পাশে বসে ছিল।
“চুপিতে ছবি তুলতে গেছিলেন নাকি বাবু?”
“গেছিলাম তো, কিন্তু ছবি আর তোলা হল কোথায়!! সারাদিন কেটে গেল পুলিশ স্টেশনে।”
“আজকের ‘বডি’ কেসে ফেঁসেছিলেন বোধহয়?”
“ঠিক বলেছেন ভাই, কেন যে এখন ছবি তুলতে এসেছিলাম!”
“এখন আর কটা বডি জলে ভেসে আসে বাবু, আগে তো…”
“এ’রকম অনেক খুন হত নাকি? শুনিনি তো!”
“বাবু ক’টা খবর আর জানতে পারেন। অট্টহাস সতীপীঠের নাম শুনেছেন?”
“না! সেটা কোথায়?”
“কাটোয়ার নাম তো শুনেছেন, যেখান থেকে এই ট্রেনটা আসছে। সেই কাটোয়া থেকে বাসে করে নিরোল গিয়ে সেখান থেকে আট কিলোমিটার টোটো করে গেলে পৌঁছবেন অট্টহাসের সতীপীঠে।”
“ওঃ মা কালীর মন্দির!”
“ও কথা বলবেন না বাবু। খুব জাগ্রত দেবী। এখানে পঞ্চমুন্ডির আসন আছে…”
“পঞ্চমুন্ডির আসন…”
“জানেন না বোধহয়।”
“কথাটা শুনেছি, কিন্তু বিষয়টা জানা নেই।”
“পাঁচটা নরমুণ্ডের ওপর তৈরি করা বসার আসন – তন্ত্র সাধনায় লাগে।”
“বাহ, আপনি তো অনেক খোঁজ রাখেন।”
“আমি ওই গ্রামের কাছেই থাকি কিনা।”
“এখনও নরমুণ্ডের আসন আছে?”
“অবশ্যই আছে বাবু, তন্ত্র সাধনা এখনও হয়। জানেন এটা আগে রঘু ডাকাতের আখড়া ছিল! ডাকাতরা ডাকাতিতে বার হবার আগে নরবলি দিত। এখানে নিয়মিত শিবাভোগ হত।”
“শিবাভোগ?”
“শেয়ালকে খাওয়ান হয়। আগে অনেক শেয়াল ছিল এখানে। জানেন তো কালী মায়ের সাথে শেয়াল থাকে। মা এখানে জাগ্রত, তাই এতো শেয়াল। তবে ১৯৭৮এর বন্যায় শেয়ালরা সব মরে যায়। তারপর শিবাভোগ বন্ধ হয়ে গেলেও আবার চালু হয়েছে –শেয়ালেরা ফিরে এসেছে যে। চারপাশেই তো জঙ্গল।”
“ইন্টারেস্টিং তো! শেয়ালের ছবি তুলতে যেতে হয়।”
“সে চেষ্টা না করাই ভালো বাবু, ওখানে ছবি তোলা বারণ। প্রতি অমাবস্যায় তান্ত্রিকদের আসর বসে, সাধনা ছাড়াও ট্রেনিং হয়। ক্যামেরা নিয়ে কাউকে দেখলে…”
“নরবলি এখনও হয় নাকি?”
“বাবু এসব জানতে চাইবেন না, অনেক কিছুই হয় এখানে। আমি জানি, কারণ তন্ত্র সাধনার মালপত্র আমি সাপ্লাই দিই। শুধু এই মন্দিরেই নয়, সারা দেশে সাধনার উপকরণ সাপ্লাই করি।”
“আপনিও তন্ত্র সাধনা…”
“না বাবু। পেটের দায়ে মাল সাপ্লাই দিই, যখন অর্ডার থাকে না, তখন বাজারে বাজারে সব্জি বিক্রি করি।”
“কী কী সাপ্লাই দিতে হয়?”
“সে বলা যাবে না বাবু।”
“এখন তো আর নরবলি হয় না, সেই ডাকাতরাও নেই!”
“ছাড়ুন বাবু ওসব কথা, তবে আপনি যা ভাবছেন তা ঠিক নয়, এখনও অনেক কিছুই ঘটে…”
ট্রেনের কামরায় কোনো কারণে একটাই আলো জ্বলছিল, – তাও কামরার প্রথম দিকে। সেদিকে কিছু লোকজন থাকলেও হয়তো অন্ধকারের জন্যই আমাদের অংশে আমরা দু’জন ছাড়া কেউ ছিল না। ত্রিবেণীতে একজন লোক একটা কালো কম্বল মুড়ি দিয়ে আমাদের কামরাতে উঠে বসেছিল, আমার পাশে বসা লোকটার বাঁদিকে। চেনা পরিচিত হবে, কুমড়োর চাষ নিয়ে কথা বলছিল নিজেদের মধ্যে।
আর দুটো স্টেশন পরে ব্যান্ডেল নামব। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে আনন্দবাজার পত্রিকা খুলেতেই নজরে এসেছিল খবরটা।
“খুলি ও বেশ কিছু হাড়়গোড় উদ্ধার বেলেঘাটা আইডিতে! পড়ে ছিল মর্গের বাইরে! কী ভাবে এল, রয়েছে ধন্দ” বোঝো অবস্থা – খানিক আগেই নরবলি – পঞ্চমুন্ডির আসন – তন্ত্র সাধনা নিয়ে কথা হচ্ছিল, আর এখন কিনা খাস কলকাতা শহরের মধ্যে মানুষের খুলি আর হাড়গোড় পাওয়া গেল। কিছুদিন ধরেই অবশ্য এই তন্ত্রসাধনা আর তাকে ঘিরে মৃত্যু বা হত্যার খবর কানে আসছিল।
ট্রেনটা বাঁশবেড়িয়া স্টেশনে দাঁড়িয়েছিল। এর পরেরটাই ব্যান্ডেল। ওহ! একটা দিন গেল বটে। ব্যাগ কাঁধে উঠে দাঁড়িয়ে গেটের দিকে যাব তখনি ফোনটা বেজে উঠেছিল – গিন্নীর ফোন – কিছু সব্জি নিয়ে যেতে হবে, বিশেষ করে কুমড়ো, ফ্রিজে চিংড়ি আছে তাই দিয়ে কুমড়োর ঘ্যাঁট হবে।
ফোনে সব্জি নিয়ে যাবার হুকুমটা আমার এতক্ষণকার সহযাত্রীর কানে এসেছিল নিশ্চই, সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল “বাবু আজ আমার ঝুড়ি খালি, শুধু একজনের অর্ডারে চুপির চরের পাঁচটা কুমড়ো নিয়ে যাচ্ছি – একটা বেশি আছে নিয়ে যান,” বলে সিটের তলা থেকে ঝুড়ি টেনে বের করে তার থেকে একটা কালো প্লাস্টিকে প্যাক করা একটা গোল কুমড়ো এগিয়ে দিয়ে একটা মাঙ্কি ক্যাপ মাথায় পরে ঝুড়িটা মাথায় তুলে নেয়, “আমিও এখানেই নামব।”
“বাবু ইচ্ছে না থাকলেও তন্ত্র সাধকদের পেটের দায়ে মাল সাপ্লাই করি। রঘু ডাকাতের বংশধর আমি – এতক্ষণ বলিনি ভয় পেতে পারেন বলে। নরবলি এখনও আমাদের রক্তে। এখনও নরবলি হয় বাবু, পুলিশ জানেলেও বন্ধ করতে পারবে না। মিলিয়ে নেবেন।”
কথাগুলো বলে লোকটা স্টেশনের সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে যায়। কথায় কথায় কুমড়োর জন্য ধন্যবাদ দেওয়াও হয়ে ওঠেনি। রঘু ডাকাতের বংশধরকে আবার দেখলেও চিনতে পারব না, এতক্ষণ পাশাপাশি বসে থাকলেও অন্ধকারের জন্য মুখটা দেখতে পারিনি।
স্টেশনের রাস্তার ধারের বাজার থেকে কেনা ফুলকপি, মুলো, ধনেপাতা, কাঁচালঙ্কা একটা বড় প্লাস্টিকের প্যাকে দিয়ে দিয়েছিল দোকানদার। কুমড়োর প্যাকেটটা ওই বড় প্যাকেটে ভরতে গিয়ে কুমড়োর গায়ে হাত লাগতে একটু অস্বাভাবিক লাগল। কেমন যেন নরম নরম রোমশ ভাব। চুপির চরে বিশেষ জাতের কুমড়োর চাষ হয় নাকি?
ভিড় বাজারের মাঝে প্যাকেটের ভেতর থেকে থেকে কুমড়োটা একটু বের করেই আবার ভরে দিয়েছিলাম প্যাকেটের ভেতর। আতঙ্কে আমার হাত-পা কাঁপতে শুরু করেছিল।
কাটামুন্ডুটা এবার কোথায় ফেলি?