গল্প-ফির যব আয়েগা তব-অদিতি ভট্টাচার্য-শরৎ’২৬

আগের গল্প- বাজনাবাবুর বাড়ি, অকাজের জিনিস, এক দুই তিন, সঙ্গে ছিল বদ্রী, ঘড়ি,ঘনশ্যামবাবুর পরোপকার, ভয়, ড্রাগন আঁকা কৌটো , বরুণের দোকানদারিআজব, ফ্ল্যাট নম্বর ৩০৪

“ইস বার নেহি, ফির যব আয়েগা তব…”কথাটা বেশ কিছু দিন যাবৎ অত্রির মনে খালি ঘুরপাক খাচ্ছে। এত বছরে ব্যাপারটা একরকম চাপাই পড়ে গেছিল, অত্রির ঠাকুরদা, ঠাকুরমা তো কবেই মারা গেছেন, বাবা-মার মনে থাকলেও ওঁরা একবারও উচ্চবাচ্যও করেননি। এই মধ্য ত্রিশে এসে হঠাৎ অত্রির কেন মনে পড়ল সেটাই আশ্চর্যের।

ঘটনাটা যখন ঘটেছিল তখন অত্রি বছর আড়াইয়ের। ঠাকুরদা, ঠাকুরমা, মা’র সঙ্গে গেছিল দেরাদুন, মুসৌরি বেড়াতে। সঙ্গে এক কাকাও ছিলেন, অত্রির বাবার খুড়তুতো ভাই। ওইসব দিকে উনি আগে গেছেন বলে ঠাকুরদা ওঁকে সঙ্গে নিয়েছিলেন। বাবা অফিস থেকে ছুটি পাননি, তাই ইচ্ছে থাকলেও তাঁর যাওয়া হয়নি। কাকার উৎসাহে ওঁরা শুধু দেরাদুন, মুসৌরিতে আটকে না থেকে আশেপাশের গ্রামেগঞ্জেও ঘুরে বেড়াতেন। পাহাড়ের কোলে ছোটো ছোটো গ্রাম, নৈসর্গিক শোভা অতুলনীয়। এক দিকে যেমন সবুজের ছড়াছড়ি, অন্য দিকে বরফের মুকুট পরে মাথা তুলে প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে হিমালয়। অত্রির ঠাকুদা, ঠাকুরমা, মা যত দেখেন ততই মুগ্ধ হন। ওঁদের ওই প্রথম হিমালয় দর্শন।

সেদিনও এরকম এক গ্রামে গিয়েছিলেন ওঁরা, খানিক ঘোরাঘুরির পরে এক জায়গায় বসে বসে গল্প করছিলেন। কাকা তাঁর বেড়ানোর গল্প শোনাচ্ছিলেন। আশপাশে কয়েকটা ছোটো ছোটো বাড়ি, সামনের গালিচার মতো ঘন সবুজ ঘাস জমিতে কয়েকটা মুরগি আর মুরগির ছানা ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছোট্ট অত্রি মহা খুশিতে মুরগির পেছনে ছোটোাছুটি করছিল।

“মা… মা…”

হঠাৎই কচি গলার আর্তনাদে সকলে চমকে উঠল। এই তো একটু আগেই খিলখিল করে হাসছিল ছেলেটা!

সবাই দৌড়োলেন। পায়ে কিছু কামড়েছে, যন্ত্রণায় ছটফট করছে অত্রি। আশপাশের ঘরগুলো থেকেও দুচারজন ছুটে এসেছেন। তাঁরা ক্ষত দেখে নীচুগলায় নিজেদের মধ্যে কী যে বলাবলি করলেন অত্রির ঠাকুরদারা তার মর্মোদ্ধার করতে পারলেন না, তবে ব্যাপার যে সুবিধের নয় সেটা ওদের হাবভাব দেখে ভালোই বুঝলেন।

“হাসপাতাল কোথায়? কত দূরে?” ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুরদা, তিনি ততক্ষণে নাতিকে কোলে তুলে নিয়েছেন।

“হাসপাতাল! সে তো এখান থেকে বহু দূরে। আরও দু তিনটে গাঁ পার করে, “একজন উত্তর দিল, “অতক্ষণ বাচ্চা ছেলে যদি যুঝতে না পারে? তার চেয়ে বাবার কোঠরিতে যাও। বাবা জড়িবুটি জানে, লাগিয়ে দেবে, বাচ্চার জান বেঁচে যাবে। আমরা গাঁয়ের লোক তাই যাই।”  

অকারণ সময় নষ্ট করে লাভ নেই, অত্রিকে নিয়ে সবাই পড়িমরি করে ছুটলেন ‘বাবার কোঠরি’-র দিকে। সঙ্গে একজন স্থানীয় মানুষও গেলেন চিনিয়ে দেওয়ার জন্য।

পাথরের দেওয়ালের একেবারেই একটা ছোটো বাড়ি। বাড়ির চারদিকে নানান গাছপালা এ ওর সঙ্গে জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে। শহুরে লোকের চোখে বনজঙ্গল বলেই মনে হবে। ঘরের দেওয়ালে ঠেসান দিয়ে দু পা ছড়িয়ে মাঝবয়সী একজন লোক আনমনে গুনগুন করে গান গাইছেন। সে গানের সুর একঘেয়ে কিন্তু রেশ রেখে যাওয়া।

পথপ্রদর্শক অত্রিদের দাঁড়াতে বলে কোঠরির দিকে ছুটল।

“বাবা…” কাছে এসে হাতজোড় করে মৃদু কন্ঠে ডাকল সে।

বাবা আধবোজা চোখ খুলে তাকালেন। শুধু লোকটির দিকে নয়, খানিক দূরে দাঁড়ানো অত্রিদের দিকেও নজর পড়ল তাঁর। ইশারায় ডাকলেন। পথ প্রদর্শকও চেঁচাল, “আইয়ে, আইয়ে, জলদি আইয়ে।”  

অত্রির ঠাকুরদা আর কাকা অত্রিকে নিয়ে ছুটতে ছুটতে এলেন, পেছন পেছন অত্রির ঠাকুরমা আর মা।

“দেখুন না বাবা, কী হয়ে গেল! সুস্থ ছেলে, খেলছিল, কী কামড়াল। তুই বল না হিন্দীতে, বাবা তো আমাদের ভাষা বুঝবেন না, “অত্রির ঠাকুরদা ভাইপোকে বললেন।

বাবা হাত তুলে সবাইকে থামালেন, তারপর অত্রির কাছে এসে মন দিয়ে ক্ষতস্থান পরীক্ষা করলেন, করে চলেও গেলেন।

“ওষুধ আনতে গেলেন, ডরিয়ে মাৎ, বাচ্চা ঠিক হয়ে যাবে, “সঙ্গের লোকটি আশ্বস্ত করল।

সত্যিই তাই, বাবা কী সব লতাপাতা এনে ছেঁচে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলেন।

“কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন, জ্বালা যন্ত্রণা কমে যাবে। ভয়ের কিছু নেই, “এতক্ষণে বাবা কথা বললেন।

ওঁর কথাতে এমন কিছু ছিল যে অত্রির ঠাকুরদা অপেক্ষা করাই মনস্থ করলেন। তাছাড়া হাসপাতাল এখান থেকে বহু দূর। সত্যি কথা, কিছুক্ষণ পরেই অরিত্রর কান্না থেমে গেল।

একটা বড়ো পাতায় করে কিছুটা প্রলেপ এনে বাবা অত্রির ঠাকুরদার হাতে দিলেন, কখন, কীভাবে লাগাতে হবে বলেও দিলেন, তারপর আবার আশ্বস্ত করলেন, “ভয়ের কিছু নেই।”  

অত্রির ঠাকুরমা, মা অবশ্য ততক্ষণে অনেকবার অত্রিকে জিজ্ঞেস করেছেন, “কষ্ট হচ্ছে বাবা? এখনও জ্বালা করছে? ব্যথা করছে?”

অত্রি দু’দিকে মাথা নেড়ে কাছেই একটা গাছের ওপর বসা পাখির দিকে দেখাল, “পাখির কাছে নিয়ে চলো, পাখি দেখব।”  

সবাই হেসে উঠলেন, বাবাও মৃদু হাসলেন, আবার পাথরের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে পড়লেন।

অত্রির ঠাকুরদা গ্রামবাসীটিকে বললেন, “আপনি জিজ্ঞেস করুন ওঁকে, টাকাপয়সা কী লাগবে?”

লোকটি জিভ কেটে একেবারে হাঁ হাঁ করে উঠল, “চিকিৎসার জন্যে বাবা কোনও দিন কারুর কাছ থেকে একটা পয়সাও নেন না। আমরা ভালোবেসে, ভক্তিতে খাবারদাবার দিই, কোনও কিছুর দরকার হলে কিনে দিই – ব্যাস ওইটুকুই। বাবা নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটা কিচ্ছু নেন না।”  

“তাহলে আমরাও না হয় চাল, ডাল বা আনাজপাতি এখানে যা পাওয়া যায় তাই কিনে দিই। এত বড়ো উপকার করলেন, আমাদেরও তো ওঁকে কিছু দেওয়া উচিত, “এবার অত্রির ঠাকুরমা বললেন।

বাবা বোধহয় কিছু বুঝলেন, হাত নেড়ে গ্রামবাসীটিকে ডাকলেন, তাকে কিছু বললেন, সে ফিরে এসে বলল, “বাবা বলছেন আপনারা মেহমান, আপনাদের কাছ থেকে কিছু নেওয়া যায় নাকি!”

এদিকে অত্রির ঠাকুরদারা নাছোড়বান্দা, গ্রামবাসীটি আবার ছুটল বাবার কাছে। বাবা নিরুত্তর, চোখ বন্ধ।

লোকটি বিব্রত মুখে পাশে দাঁড়িয়ে। ওরা গ্রামের সহজ সরল মানুষ, বাবা একবার কিছু বললেই তারা সে কথা শিরোধার্য ধরে চলে আসে, এতবার অনুরোধ উপরোধের কথা চিন্তাও করতে পারে না। বেশ কয়েক মিনিট পরে বাবা চোখ খুললেন, পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন মা’র কোলে থাকা অত্রির দিকে, তারপর বললেন, “ইস বার নেহি, ফির যব আয়েগা তব…”

এমনভাবে উচ্চারণ করলে শব্দগুলো যে আর কেউ কোনও কথা বলতে পারলেন না, ওখান থেকে চলে আসাই সমীচীন মনে করলেন। গ্রামবাসী লোকটি তো বিলক্ষণ বিরক্ত। গজগজ করতে করতে সেও চলে গেল।

অত্রিকে নিয়ে পরে হাসপাতালে যাওয়া হয়েছিল, ওখানে ডাক্তার দেখেছিলেন, যা চিকিৎসা করার করেছিলেন, বলেছিলেন, “কী হয়েছিল, কীসে কামড়েছিল সে সব বলে আর আপনাদের ভয় পাইয়ে দরকার নেই। বিপদ হয়েছিল – এ কথা যেমন সত্যি, তেমন বিপদ কেটে গেছে এও সত্যি। আজ অবধি বাবার চিকিৎসা ব্যর্থ হতে দেখিনি। কী সব যে লাগান! কিন্তু কাজ হয় অব্যর্থ। কম তো দেখলাম না। তবে সব সময় ওঁকে পাওয়া যায় না। এক জায়গায় তো থাকেন না, ঘুরে বেড়ান। আমি এদিককার গ্রামের ছেলে, তাই জানি।”  

এক সময় বেড়ানো শেষ হল, সবাই বাড়ি ফিরে এলেন।

“বাবা প্রাণরক্ষে করেছেন, ওঁকে শতকোটি প্রণাম। তবে ওই কথাটা আমার ভালো লাগেনি, “বাড়ি ফিরে ঠাকুরমা বললেন, “আমরা তো কৃতজ্ঞতা থেকেই কিছু দিতে চেয়েছিলাম। সে সব না নিয়ে, ও কী কথা! পরের বার যখন আসবে তখন, তখন কী? শোনো, এসব কথা বড়ো হলে ওকে কেউ যেন না বলে আর ওই দেরাদুন মুসৌরিটুসৌরি যেন না যায় কোনও দিন। কোনও দরকার নেই।”  

অত্রির মাও সায় দিলেন।

অত্রিও হয়তো কিছুই কোনও দিন জানতে পারত না। কিন্তু অত্রির কাকা বেশ দায়িত্ব নিয়ে এই ঘটনা সর্বত্র প্রচার করেছিলেন এবং অবশ্যই বেশ ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে। তার ফল যা হওয়ার হল, অত্রি একটু বড়ো হতে না হতেই সব জেনে গেল। তবে ঠাকুরদা-ঠাকুরমা, বাবা-মা এসব ভুলিয়ে রাখার চেষ্টার কোনও ত্রুটি করেননি, আত্মীয়স্বজনও এক সময় একই কথা কপচাতে কপচাতে বোধহয় ক্লান্ত হয়েই থেমে যান, তাই ব্যাপারটা দেখতে দেখতে চাপাই পড়ে গেল।

তারপর, তারপর এই এত বছর পরে বিস্মৃতির কোন অতল থেকে উঠে এসে সেই বাবার উক্তিটি নাছোড় পোকার মতো অত্রির মনে ঘুরঘুর করে যাচ্ছে। এক সময় বিরক্ত হয়ে অত্রি সিদ্ধান্ত নিল যে ওদিকটা একবার ঘুরেই আসবে। একা নয়, বাড়ির সবাইকে নিয়েই। মা একটু খুঁতখুঁত করছিলেন বটে, কিন্তু অন্য সকলের উৎসাহের কাছে ওঁর আপত্তি ধোপে টিঁকল না।

“আমি ব্যাপারটা নিয়ে অনেক ভেবেছি। একটা সাধারণ কথা তখন আমাদের কারুর মাথায় আসেনি, “অত্রির বাবা বললেন, “প্রথমে উনি কিছু নিতে চাননি। পরিষ্কার জানিয়েছিলেন যে মেহমানের কাছ থেকে কিছু নেওয়া যায় না। তোমরা সে কথা না শুনে জোরজার করতে লাগলেন, তখন উনি ওই কথা বললেন। কায়দা করে তোমারদের থামালেন আর কী। আবার কবে ওখানে বেড়াতে যাবে তার কি কোনও ঠিক আছে? আদৌ যে যাবে তারই বা কী মানে? গেলেও যে ওঁর সঙ্গে দেখা হবেই তাই বা কে বলতে পারে? বলছি না, কায়দা করে এড়ালেন। তবে মানুষটা যে ভালো এবং পরোপকারী তাতে তো কোনও সন্দেহ নেই। আমি থাকলে ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ জমাতাম। এরকম লোকজন আর কটা আছে? আগে যদি বা দুচারজনকে পাওয়া যেত, এখন তো একদমই নয়।”  

যুক্তি অস্বীকার করা যায় না, তাই বেড়াতে যাওয়াই ঠিক হল। সবাই মিলে হইহই করে হরিদ্বার, হৃষিকেশ, দেরাদুন, মুসৌরি, ধনৌলটি ঘুরে ফেললেন। অত্রির পুঁচকে ছেলেমেয়েদুটো তো চুটিয়ে হুটোপুটি করল।

“দেখলে তো, হল কিছু? বাবাই ঠিক বলেছিল, “ফেরার ট্রেনে উঠে অত্রি বলল।

“সত্যি কথা, এই কদিনে একবারও তো ও কথা মনে পড়েনি! আমরা অকারণেই ভয় পেয়েছিলাম। একজন ভালো মানুষ কি আর কারুর ক্ষতি করতে পারেন! মন দুর্বল হলে যে কত কিছু মনে হয়!”অপ্রতিভ হাসি মার মুখে।

অত্রির বাবা কিছু বললেন না, শুধু মুখের সামনে থেকে খবরের কাগজটা নামিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।

গোলমালটা শুরু হল ফিরে আসার কয়েক দিন পরে। ওই কদিন যে কিছু ঘটেনি, এমনকি ওই কথাটাও কারুর মনে পড়েনি – এটাই এখন অত্রির অস্বাভাবিক লাগছে। যে অত্রির মনে হয়েছিল বাবাই ঠিক বলছেন, তারই এখন মনে হচ্ছে বাবারও বোধহয় বোঝার কোনও ভুল হচ্ছে। যদিও কী ভুল হচ্ছে, কী হওয়া উচিত ছিল – এসব সেও জানে না।

“ওই ঘটনাটা তো প্রপার মুসৌরিতে ঘটেনি বোধহয়? ধনৌলটিতে কি?”অত্রি মাকে জিজ্ঞেস করল।

“না না। একটা গ্রামে। নামধাম জানি না। এদিক ওদিক কত জায়গায় যে ঘুরতে যাওয়া হত! ওই সমুর পাল্লায় পড়ে। সব ছোটো ছোটো গ্রাম, “মা বললেন।

অত্রির মনে হল, ভুল এখানেই হয়েছে। ওদেরও আশেপাশের গ্রামটামে যাওয়া উচিত ছিল।

অদ্ভুত এক অস্বস্তি শুরু হল। অত্রি বলে কাউকেই বোঝাতে পারবে না, খালি মনে হচ্ছে আবার যেতে হবে, ঘুরে বেড়াতে হবে, একা একা। কিন্তু মনে হলেই তো আর বেরিয়ে পড়া যায় না। চাকরিবাকরি আছে, সংসার আছে। তাই বেরোতে বেরোতে সেই দুর্গাপুজো এসে গেল।

“আবার ওদিকে কেন? এই তো গরমের সময় ঘুরে এলাম, “মার গলা শুকিয়ে গেল।

“সত্যি কথা হচ্ছে, ওটুকু ঘুরে আমার মন ভরেনি। বড্ড তাড়াহুড়ো করে ঘোরা হয়েছে। দেরাদুন, মুসৌরি আমার অত ভালোও লাগেনি। তোমরাই তো বললে অনেক ঘিঞ্জি হয়ে গেছে। তার থেকে নিরিবিলিতে যদি কটা দিন কাটানো যায়। পাহাড়ের দিকে তাকিয়েই বসে থাকব, নিজের মনে ঘুরব, ফটো তুলব। তোমরা তো পুজোর কটা দিন বাড়ি ছেড়ে নড়বে না, তাই একাই যাই। তাছাড়া তোমাদের এরকম বেড়ানো পোষাবে না, “অত্রি উত্তর দিয়েছে।

“যাক না, যাক। অপিস থাকলে তো কাজের চাপে মাথা তুলতে পারে না, ঘুরে আসুক, “অত্রির বাবা বললেন।

এবার অক্টোবরের শুরু থেকেই এদিকে জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়েছে। তবে আবহাওয়া চমৎকার। আকাশে এতটুকু মেঘ নেই, সোনালি রোদে চারদিক ঝকমক করছে।

অত্রি এবার অন্য কোথাও সময় নষ্ট না করে সোজা ধনৌলটিতে এসেছে। হোটেলটার পজিশন দারুণ। এক পাশে পাইন, দেবদারুর বন, অন্য দিকে গাড়োয়াল রেঞ্জের সুউচ্চ শৃঙ্গগুলো। পৌঁছতে পোঁছতে সন্ধে হয়ে গিয়েছিল, সারাদিনের যাতায়াতের ধকলে ক্লান্তও ছিল, তাই তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়েছিল। পরের দিন ভোরে উঠে জানলার পর্দা সরাতেই বরফে ঢাকা পাহাড় যেন হেসে উঠল। সারা দিন নিজের মনে ঘুরে বেড়াল অত্রি, মনের সুখে ছবি তুলে বাড়াল, বিকেল হতেই হোটেলের পেছনে পাইন বনের দিকে এগোল। এখান থেকে সূর্যাস্তর দারুণ ভিউ পাওয়া যায়, হোটেলের ম্যানেজার ভদ্রলোক বলেছিলেন।

আজ সপ্তমী, এখানে এখনও টুরিস্টের তেমন ভিড় শুরু হয়নি। হোটেলে ও ছাড়া আরও কয়েকজন আছে বটে, কিন্তু এই মুহূর্তে তারা কেউ আশেপাশে নেই। হয়তো সূর্যাস্ত দেখার তত উৎসাহ নেই। ম্যানেজার ভুল কিছু বলে বলেননি। হলুদ-কমলা রঙের সূর্যটা এত বড়ো আকাশটাকে শুধু নয়, দূরের পাহাড়কেও তার নিজের রঙে রাঙিয়ে এক সময় টুপ করে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। অত্রি মুগ্ধ হয়ে দেখল, মনে মনে বলল, “ভাগ্যিস এসেছিলাম, না হলে এরকম একটা মায়াবী বিকেল দেখতে পেতাম না।”  

খসখস আওয়াজটা কিছুক্ষণ ধরেই পাচ্ছিল অত্রি। কেউ যেন পা ঘষটে ঘষটে হাঁটছে। সাদায় কালোয় মেশানো একটা ঘন লোমশ কুকুরও ছোটোাছুটি করে বেড়াচ্ছে। কুকুরটার উদ্দেশেও থেকে থেকে কেউ বোধহয় কিছু বলছে, কুকুরটা চলে যাচ্ছে, আবার ফিরে ফিরে আসছে। অত্রি বুঝলেও এতক্ষণ ওদিকে মন দিতে পারেনি। এখন ফিরতে গিয়ে লোকটার একেবারে মুখোমুখি পড়ে গেল। অস্বীকার করতে পারে না অত্রি, লোকটাকে দেখে গা শিরশির করে উঠল ওর, অস্ফূটে গলা দিয়ে আওয়াজও বেরিয়ে এল। একেবারে মুখের সামনে কেলেকুলো কম্বল জড়ানো একটা লোক দাঁড়িয়ে, রুক্ষ্ম কটা চুলে পাকানো পাকানো জটা, সে জটা নেমে এসেছে কোমর অবধি। এই শীতেও লোকটার পা খালি, একটা চটি অবধি নেই, হাতে একটা গাছের ডাল। লোকটা অন্ধ, চোখদুটো ফ্যাটফ্যাটে সাদা, তাতে কালো গোলকদুটোর চিহ্ন মাত্র নেই। সেই মণিহীণ চোখ নিয়ে লোকটা অত্রির নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে, কুকুরটাও চলে এসেছে, মনিবের পাশে দাঁড়িয়ে মুখ উঁচু করে অত্রিকেই দেখছে। ভয় পাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। অত্রি পাশ কাটিয়ে চলে আসতে চাইল, পারল না, লোকটার সরু, লম্বা আঙুলগুলো অত্রির মুখ স্পর্শ করল, ঘুরে বেড়াতে লাগল সারা মুখে। অত্রি অনুভব করল, লোকটার হাতের চামড়া আশ্চর্যরকম নরম! কয়েক সেকেন্ড মোটে, লোকটা হাত নামিয়ে নিল। অত্রিও আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না, হুড়মুড়িয়ে চলে এল। ঢাল বেয়ে নীচের রাস্তায় গিয়ে নামল, আর একটু এগোলেই ওর হোটেল।, কিন্তু এগোতে আর পারল না। কোন অদৃশ্য সুতোর টানে আবার ঢাল বেয়ে ওপরে উঠল, পাইন বনের ভেতরে ঢুকল। লোকটা তখনও ওখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে, পাথরের মূর্তির মতো, এতটুকু নড়েনি। অত্রি আবার তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মণিহীন চোখেও কি দৃষ্টি থাকা সম্ভব? সাধারণ বুদ্ধিতে না মনে হলেও অত্রির মনে হল, সম্ভব। লোকটা হাসল, শিশুর সরল, নিষ্পাপ হাসি। কী সব বলল, অত্রি তার বিন্ধুবিসর্গ কিছুই বুঝল না। এবার লোকটাই আর দাঁড়াল না। যে দিকে রাস্তা তার সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে গেল, পেছন পেছন কুকুরটাও। একটু পরেই তাদের আর দেখা গেল না। অত্রিও ফিরে এল হোটেলে।

“ইস বার নেহি, ফির যব আয়েগা তব…”কানের কাছে কে যেন কথাটা বলল, অত্রি ধড়ফড় করে উঠে বসল।

হোটেলে ফিরে চা-টা খেয়ে কম্বলের তলায় ঢুকেছিল, কখন চোখ লেগে গেছে বুঝতেও পারেনি। মনে হল, কেউ যেন ওকে ওর আসল উদ্দেশ্যর কথা মনে করিয়ে দিল। বাড়িতে যাই বলে আসুক, আসলে তো এসেছে এই জন্যেই। কোথাও যে একটা যেতে হবে, কিছু যে করতে হবে – এ বিশ্বাস ক্রমশই যেন দৃঢ় হয়ে বসছে অত্রির মনে।

রুম সার্ভিসে ফোন করে কড়া এক কাপ কফি পাঠাতে বলল অত্রি। একটু পরেই বেল বাজল।

“কাছেপিঠে আর দেখার কী আছে?”কফি রেখে দিয়ে বয় চলে যাচ্ছিল, অত্রি জানতে চাইল।

ছেলেটা যা যা বলল সেগুলো আজই সব মোটামুটি ঘুরে ফেলেছে অত্রি। ছেলেটা বোধহয় বুঝল সে কথা, জিজ্ঞেস করল, “গাঁও যাওগে স্যার? বঁহা সে আচ্ছা ভিউ মিলেগা।”  

“গাঁও? কোন গ্রাম?”

“আমার গ্রাম স্যার, আইন্দি।”  

নামটা শুনে চমকাল অত্রি। ওই অন্ধ লোকটার মুখে এ নামটা দু’একবার শুনেছে বলে মনে হল, তবে এটা যে কোনও গ্রামের নাম তা তখন বুঝতে পারেনি।

“খুব সুন্দর জায়গা, স্যার, “ছেলেটা আবার বলল।

“কত দূর এখান থেকে? কী করে যাব?”

“বাস যায় স্যার। আপনি গাড়িতেও যেতে পারেন, তাহলে তাড়াতাড়ি পৌঁছতে পারবেন।”  

“থাকব কোথায়? হোটেল-টোটেল আছে কিছু?”

“না স্যার, এরকম হোটেল পাবেন না। তবে আপনার থাকার অসুবিধে হবে না। আমার বন্ধু হরিশের বাড়িতে থাকবেন। টুরিস্টদের ভাড়া দেয় স্যার, ট্রেকিংএর লোকজনও থাকে। ভালো ব্যবস্থা, আমি বলে দেব স্যার।”  

“বেশ, বলে দাও। আমি কাল ভোর ভোরই বেরোব। গাড়ির ব্যবস্থাও তো করতে হবে।”  

“ম্যানেজারসাবকে বলুন স্যার, গাড়ি ঠিক সময়ে এসে যাবে।”  

সব বন্দোবস্ত হতে সময় লাগল না। ম্যানেজার জানালেন ঠিক ন’টার সময় গাড়ি এসে যাবে, হরিশের সঙ্গে ফোনে কথাও হয়ে গেল।

আইন্দির মতো একেবারেই ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামে যে থাকার এরকম ব্যবস্থা হবে তা সত্যিই ভাবেনি অত্রি। আর কত দিনই বা থাকবে? তিন দিনের বেশি তো কোনোভাবেই নয়।

ছবির মতো সুন্দর গ্রাম। দু চোখ ভরে দেখতে দেখতেই সময় কেটে যায়। গ্রামের সবচেয়ে উঁচু জায়গার ওপর একটা ছোট্ট মন্দির। হরিশ নিজে ঘুরে ঘুরে সব দেখাচ্ছে অত্রিকে।

“মাতারানি হ্যায় অন্দর মে। আভি মন্দির বন্ধ হ্যায়, কাল সুবে আকে দর্শন করনা স্যার, “হরিশ বলল।

মন্দিরের ওপাশে আর কোনও ঘরবাড়ি নেই, ঢেউ খেলানো বুগিয়াল আছে, তার ওপারে পাইন, ওকে, দেবদারু, আরও নানান নাম না জানা গাছ গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে, যেন ঘন সবুজের এক পর্দা।

“ওদিকে জঙ্গল, তাই না?”অত্রি জিজ্ঞেস করল।

“হ্যাঁ, “হরিশ মাথা নাড়ল, “ঘন বন।”  

“বুনো জন্তু জানোয়ারও আছে নিশ্চয়ই?”

“খাম্বা আছে স্যার, খাম্বা।”  

“খাম্বা!”অত্রি বিলক্ষণ অবাক হল, খাম্বা শব্দটা উচ্চারণ করার সময় হরিশের চোখমুখে যে ভক্তি মিশ্রিত আতঙ্ক ফুটে উঠছে তাও অত্রির নজর এড়াল না।

“হ্যাঁ, দু’দুটো খাম্বা আছে। সেই কোনকাল থেকে আছে। আমরা কেউ দেখিনি, শুনেছি। আমার দাদাজি শুনেছে, পরদাদা শুনেছে, তার দাদা শুনেছে… ও বন খাম্বার বন, আমরা গাঁওওয়ালো তাই বলি। আশপাশের সব গাঁয়ের লোকও এই বনের কথা জানে।”  

“তার মানে বেশ বিখ্যাত বন। ওই খাম্বা দেখা যায় না?”

পথ চলতে চলতে কথা হচ্ছিল, অত্রির প্রশ্ন শুনে হরিশ দাঁড়িয়ে পড়ল, ভীত স্বরে বলল, “শোচনা ভি মাৎ। ও বনে দিনের বেলাতেও কেউ যায় যায় না।”  

“কেন? গেলে কী হয়?”অত্রির কৌতূহল ক্রমশ বাড়ছে।

“কেউ যায় না। যাওয়া বারণ। আমরা এসব বিধিনিষেধ মেনে চলি, আপনিও মেনে চলবেন। এ আপনাদের আলো ঝলমলে বড়ো শহর নয় স্যার, এখানে অনেক কিছু আছে, অনেক কিছু হয়। তাই আমরা অনেক নিয়মকানুন মেনে চলি, “হরিশ আর কোনও কথাই বলতে চাইল না।

সন্ধ্যের পর আর গ্রামের পথে ঘোরাঘুরি না করাই যে ভালো, বাড়ি পৌঁছে সে কথাও বারবার মনে করিয়ে দিয়ে গেল।

পরের দিন ভোরে ঘুম ভাঙল অসহ্য মাথার যন্ত্রণা নিয়ে। ঘুমিয়েছে ভালোই, তা সত্ত্বেও এরকম যন্ত্রণার কারণ বুঝতে পারল না অত্রি। আজ একটা ঝরণা দেখতে যাওয়ার কথা আছে। হরিশই তার সন্ধান দিয়েছে, বলেছে দেখতে ভালো লাগবে। তবে সেটা আইন্দিতে নয়। গ্রাম থেকে বেরিয়ে চড়াই উৎরাই বেয়ে খানিকটা পথ গেলেই তাকে দেখা যাবে।

আলুর পরোটা, আচার আর চা সহযোগে জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়ল অত্রি। হরিশ সঙ্গে যেতে পারল না, তার ক্ষেতির কাজ আছে, তবে গ্রামেরই একজনকে সঙ্গে দিয়েছে, নাম বিরজু। বিরজু বকবক করতে করতে অত্রির সামনে সামনে চলেছে, এতই যে অত্রির মাথার যন্ত্রণা আরও বেড়ে গেল। পথের মাঝে থেমে অত্রিকে ছবি তুলতে দেখলেও হাজার প্রশ্ন করে। এক সময় অত্রি বিরক্ত হয়ে উঠল।

“এখান থেকে ঝরণা আর কত দূর?”জানতে চাইল।

“আর বেশি দূর নয়। একটু গেলেই জলের শব্দ পাবেন, “বিরজু বলল।

“এখানে তো দেখছি রাস্তা এক দিকেই গেছে, এই পথ ধরেই তো যাব?”

বিরজু ঘাড় নাড়ল।

“তাহলে তুমি বরং গ্রামে ফিরে যাও, তোমারও তো কাজকর্ম আছে। আমি ঠিক চলে যেতে পারব। ঝরণা দেখা হয়ে গেলে আবার এই পথেই ফিরে আসব, “বলল অত্রি।

বিরজু খুশি হল। সত্যি কথা হচ্ছে, অত্রির সঙ্গে যেতে ওর মোটেই ভালো লাগছে না। ও দশটা কথা বললে অত্রি একটাও বলে কীনা সন্দেহ, বললেও হুঁ হাঁ করে। এরকম লোকের সঙ্গ বিরজুর কাছে তেমন সুখকর নয়।

পাহাড়ি পথের বাঁকে বিরজু অদৃশ্য হয়ে গেলে অত্রিও সামনে এগোল। দিনের বেলা, লোকজন যাচ্ছে আসছে, একা যেতে কোনও অসুবিধেই নেই।

ঝরণা সুন্দর, প্রাকৃতিক দৃশ্যও অতি মনোরম, কিন্তু অত্রি উপভোগ করতে পারল না। ওর খালি মনে হচ্ছে দেরি হয়ে যাচ্ছে। কীসের দেরি, তা জানে না। ভেবেছিল ঝরণার ধারে কিছুক্ষণ বসবে, কিন্তু এখন আর বসার কোনও ইচ্ছেই নেই। অত্রি ফেরার পথ ধরল। একটা বাঁক ঘুরে পাদুটো যেন মাটিতে আটকে গেল। সামনেই অন্ধ লোকটা দাঁড়িয়ে, মুখে হাসি, সে হাসির ছোঁয়া মণিহীন চোখেও লেগেছে। কুকুরটা পাশে বসে। ঝিম ধরানো একটা মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে আছে চারপাশে, লোকটার গা থেকেই কি আসছে? লোকটা হাত তুলে সামনের পথ দেখাল।

“এ পথেই তো ফিরব, এছাড়া তো আর রাস্তা নেই, তাহলে আবার দেখানোর কী আছে?”অত্রি ভাবল।

লোকটা হো হো করে হেসে উঠল, পাহাড়ের গায়ে সে হাসি ধাক্কা খেয়ে আবার ফিরে এল। অত্রি আর দাঁড়াল না, লোকটার সান্নিধ্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর। কোনওরকমে লোকটাকে পাশ কাটিয়ে অত্রি এগিয়ে গেল, পেছনে ফিরে আর তাকালও না।

কতক্ষণ যে একভাবে অত্রি হেঁটে চলল তা ওর নিজেরই খেয়াল নেই। যখন হুঁশ হল, তখন বুঝল এ পথ আইন্দিতে ফেরার নয়। ও রাস্তা ভুল করেছে। চট করে ঘাবড়োানোর ছেলে অত্রি নয়। এখনও দিনের আলো আছে, আইন্দিতে না পৌঁছতে পারে, অন্য কোনও গ্রামে গিয়ে উঠতে পারলেও হয়। ব্যাকপ্যাক থেকে মোবাইল ফোন বার করল, কোনও নেটওয়ার্ক নেই। অত্রি চারপাশ ভালো করে নজর করল। নাহ, এ পথে ও আসেনি, এ অন্য রাস্তা। অথচ যে পথ ধরে ঝরণার কাছে গেছিল, সে পথ ধরেই তো ফিরছিল। তবে কি গোলমাল হল ওই অন্ধ লোকটার সঙ্গে দেখা হওয়ার পরেই? কিন্তু সেই বাঁকেও তো রাস্তা ভাগ হয়নি! একই রাস্তা ঘুরে ঘুরে নেমে গেছে। অত্রির মাথা গুলিয়ে গেল।

পথের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও চলে না, পাহাড়ে সন্ধ্যে নামে ঝপ করে, তার ওপর হঠাৎ মেঘের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে আকাশে। এ রাস্তা একেবারে শুনশান, একটা লোকেরও দেখা নেই। অত্রি পা চালাল। রাস্তা ক্রমশ সরু, এবড়োখেবড়ো হতে হতে বনের সামনে এসে যেন থমকে দাঁড়িতে পড়ল। দাঁড়িয়ে পড়ল অত্রিও। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল কোনও লোকালয়ের চিহ্নমাত্র নেই। এদিকে সূর্য ডুবব ডুবব করছে। হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়া উঠল। লম্বা লম্বা পাইন গাছগুলো সে হাওয়ায় মাথা দোলাতে লাগল। অদ্ভুত এক সুরেলা আওয়াজ ভেসে এল বনের ভেতর থেকে। এ যেন প্রকৃতির আমন্ত্রণ। গোটা এই পাহাড়ি বন যেন এক শহুরে পর্যটককে বলছে, “এসো, এসো, ভেতরে এসো। ওখানে দাঁড়িয়ে পড়লে কেন?”

অত্রিও যেন আর নিজের বশে নেই, মন্ত্রমুগ্ধর মতো ঢুকল ভেতরে। শেষ বিকেলের পড়ন্ত আলোয় এ বন হয়ে উঠেছে একেবারে অন্যরকম। গাছপালার যে এরকম রূপ হতে পারে তা না এখানে না এলে জানতে পারত না অত্রি। সব কিছু যেন বড়ো বেশি সবুজ, বড়ো বেশি প্রাণবন্ত। কিছুক্ষণ এলোমেলো ঘোরার পর এসে দাঁড়াল একেবারে ফাঁকা একটা উপবৃত্তাকার জায়গায়। আশ্চর্য, এইটুকু জায়গায় একটা গাছও নেই! তার বদলে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে দুটো সুউচ্চ স্তম্ভ!

খাম্বা-র বন! অত্রির শিরদাঁড়া দিয়ে শিহরণ বয়ে গেল। গতকাল খাম্বা-র বন নিয়ে কৌতূহল প্রকাশ করেছিল ঠিকই, কিন্তু এখন এই সন্ধে হবো হবো মুহূর্তে খাম্বার বনে দাঁড়িয়ে থাকতে ওর মোটেই ভালো লাগছে না। বিপদের আশঙ্কায় এই শীতেও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। এই বনে রাত কাটাতে হলে, আর কিছু না হোক ঠান্ডাতেই মরে যাবে। কলকাতার মানুষ, পাহাড়ি শীত সহ্য করার অভ্যেস নেই।

বন থেকে বেরোতেই হবে, এক্ষুণি, আর এক মুহূর্ত দেরি করলেও চলবে না। অত্রি উলটো মুখে ছুটতে শুরু করল, বার দুয়েক হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তেও নিজেকে সামলে নিল, কিন্তু বেশি দূর যেতে পারল না। ঝুপ করে চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। যেন এক ফুঁয়ে কেউ টিমটিমে আলোটাকেও নিভিয়ে দিল। আর ঠিক তখনই অত্রি অনুভব করল যে এ বনে ও একা নয়। আরও কেউ আছে, আরও অনেকে আছে। যাদের দেখা যায় না, শুধু তাদের অস্তিত্ব অনুভব করা যায়। এতক্ষণ দিনের আলোয় তারা নিজেদের কোথাও লুকিয়ে রেখেছিল, ঢেকে রেখেছিল, এখন যেন দলে দলে বেরিয়ে এসেছে, ঘিরে ফেলেছে অত্রিকে, যেন ভালো করে দেখছে, বুঝতে চাইছে লোকটা কে, কী করতে এই খাম্বার বনে এসেছে, তাও এই সময়ে!

অত্রি মোবাইল ফোন বের করে টর্চ জ্বালাল। সাদা আলো এত বড়ো জায়গায় ফ্যাকাশে হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল, কনকনে ঠান্ডা বাতাস এসে মুখে ঝাপটা মারল, কাছেপিঠেই কে যেন আহাহাহা করে জোরে আর্তনাদ করে উঠল। আতঙ্কে দিশাহারা অত্রির আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার উপক্রম। কোনও রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে, আবার ভালো করে চারপাশ দেখার চেষ্টা করল, নিজেই নিজেকে শুনিয়ে বলল, “মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে, ভয় পেলে চলবে না।”  এবার নজরে পড়ল, খানিক দূরে ঘরের মতো কিছু একটা আছে। মনে জোর এনে অত্রি সে দিকেই এগোল।

দেখে মনে হয়েছিল খুব বেশি দূরে নয়, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল পথ আর ফুরোয় না। আকাশে হঠাৎ জোরে বিদ্যুৎ চমকে উঠল, কড়কড় শব্দে কাছাকাছি কোথাও বাজ পড়ল। পাশ দিয়ে কিছু একটা জোরে ছুটে চলে গেল, অত্রির মনে হল সেই কুকুরটা। তবে কি ওই অন্ধ লোকটাও আছে এই বনে? সরু ফিতের মতো কোনও পায়ে চলা পথও নেই, ঝোপঝাড় ভেঙে হোঁচট খেতে খেতে এগিয়ে চলেছে অত্রি। যে করে হোক ওই ঘরের কাছে পৌঁছতে হবে। ফিসফিস করে কানের কাছে কেউ কিছু বলল কি? অত্রি সভয়ে চিৎকার করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে কারা যেন হেসে উঠল, বিচিত্র স্বরে বিচিত্র সে হাসি, শুনলে অতি বড়ো সাহসীরও গায়ে কাঁপুনি ধরবে। হঠাৎ সামনে চোখ ধাঁধানো আলো, ভয়ে সিঁটিয়ে অত্রি দেখল সামনেই একটা বিরাট বড়ো পাথুরে মুখ। সবজেটে হলুদ আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে তা থেকে। চারদিকে জমাট কালো কালো কী সব ঘুরে বেড়াচ্ছে… ক্রমশ এগিয়ে আসছে তারা অত্রির দিকে… আর একটু… আর একটু গেলেই ওই ঘরটা।”  আর একটু… আর একটু…”নিজের মনেই বিড়বিড় করতে করতে একোনও রকমে এগোচ্ছে অত্রি। কেউ কি পিঠে হাত দিল, অত্রি শিউরে উঠল…”এই তো… এই তো এসে গেছি…”অত্রি কোনও রকমে হাত বাড়িয়ে দেওয়াল ধরল। ক্লান্ত পাদুটো আর শরীরের ভার বইতে পারছে না, স্নায়ুরও আর ক্ষমতা নেই এত ধকল সহ্য করার। সবুজ শ্যাওলা ঢাকা পাথুরে মেঝের ওপর এলিয়ে পড়ল অত্রি।

যখন জ্ঞান হল তখন দিনের আলো ফুটেছে, তবে আকাশ এখনও মেঘলা। কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল স্থান, কাল বুঝতে। পাথরের একটা নীচু, ছোটো ঘরে রয়েছে ও। ঘর বলতে ছাদটা এখনও অক্ষত আছে, তিন দিকের দেওয়ালগুলোও মোঠামুটি ঠিক আছে। একদিকের দেওয়ালে মনে হয় দরজাটরজা ছিল, সে সব আর এখন কিছু নেই, সে দেওয়ালটাও নেই। ছোটো বড়ো পাথর এদিকে ওদিকে ছড়িয়েছিটিয়ে রয়েছে পাথরের খাঁজে খাঁজে ফার্ণ। একটা গোটা রাত ও এই খাম্বার বনে কাটিয়েছে!

অত্রি বাইরে বেরিয়ে এল। এবার বন থেকে বেরোনোর চেষ্টা করতে হবে। আবার শুরু হল এলোমেলো ঘোরা। ঘুরতে ঘুরতে আবার সেই ফাঁকা জায়গায়। এখন দিনের আলোয় স্তম্ভদুটোকে ভালো করে দেখল অত্রি আর দেখে চমকে উঠল। দুটো স্তম্ভে দুটো বিরাটাকায় বড়ো বড়ো, গোল গোল চোখওয়ালা, হাঁ করা দুটো মুখ! নিছক পাথুরে ভাস্কর্য নয়, মনে হল মুখদুটো যেন জীবন্ত। যেই ঢুকবে বনে তাকেই দেখবে। এরকম একটা মুখই কাল রাতে দেখেছিল না ও! সঙ্গে এক ফোঁটা জল নেই, এদিকে গলা শুকিয়ে কাঠ।

মুখ ছাড়াও স্তম্ভের গায়ে হাজারো কারুকার্য। সাধারণ ফুল, লতাপাতা নয়, অদ্ভুত সব নকশা! স্তম্ভদুটো আকারে সমান, দুটোর মাঝে আন্দাজ ফুট চারেকের দিকে। হঠাৎ সেই ঝিম ধরানো মিষ্টি গন্ধটা নাকে এল অত্রির। ও এদিক ওদিক তাকাল, কাউকে দেখতে পেল না বটে, তবে চোখের সামনে ভেসে উঠল এক দৃশ্য। এই বনেরই।

দৃশ্যটা যেমন হঠাৎ ভেসে উঠেছিল, তেমন হঠাৎ মিলিয়েও গেল। ওই জায়গাটা খুঁজে বার করতে হবে? কিছু একটা আছে ওখানে, সেটা নিয়ে আসতে হবে? কেন? কী প্রয়োজনে? ওকেই কেন আনতে হবে? তাছাড়া এখন ওই জায়গা খুঁজে বার করতে গেলে অত্রি এই বন থেকে বেরোবে কী করে? গন্ধটা ক্রমশ উগ্র হয়ে উঠছে, এতটাই যে অত্রি অস্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করল। এখানে আর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়। অত্রি দ্রুত পায়ে চলতে শুরু করল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে বেরোতে হবে, কোনও লোকালয়ে পৌঁছতে হবে।

আধ ঘণ্টাও কাটল কীনা সন্দেহ, অত্রি বুঝল ও বন থেকে বেরোনোর কোনও চেষ্টাই করছে না, বরং সেই জায়গাটাই খুঁজে চলেছে। খিদেয়, তেষ্টায় অবর্ণনীয় অবস্থা, তাও যন্ত্রচালিতর মতো বনের মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছে। বেশ বুঝতে পারছে, এ বন থেকে কেউ নিজের ইচ্ছেয় বেরোতে পারে না। ঘুরতে ঘুরতেই এক সময় দেখতে পেল সেটাকে, ঝরা পাতার ওপর উলটিয়ে পড়ে আছে। অত্রি সঙ্গে সঙ্গে সেটাকে তুলল আর তুলেই দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়তে শুরু করল।

“স্যার… স্যার…”

কেউ কি ডাকছে? সঙ্গে যেন দরজা ধাক্কানোরও আওয়াজ। অত্রি অতি কষ্টে চোখ মেলল। আশপাশে তাকিয়ে বুঝল ও হরিশের বাড়িতে। কোনও রকমে উঠে দরজা খুলল।

“কী ভয় পেয়ে গেছিলাম স্যার যে কী বলব!”অত্রিকে দেখে মনে হল হরিশের ধড়ে প্রাণ এল, “কাল সেই যে ঝরণা দেখে সন্ধেবেলায় ফিরে ঘরে ঢুকলেন আর বেরোচ্ছেনই না। ডাকতে বারণ করেছিলেন বলে রাতে আর ডাকিনি, কিন্তু সকাল হতেও যখন উঠলেন না তখন যে কী ভয় করছিল। আপনার ফোনও তো বন্ধ!”

ঝরণা দেখে ও এখানে ফিরেছিল! তা কী করে হয়! ও তো পথ হারিয়ে খাম্বার বনে চলে গেছিল! সেখানে রাত কাটিয়েছে। পাঁচ তারিখ, মঙ্গলবার ও আইন্দিতে এসেছিল। পরেরদিন বুধবার গেছিল ঝরণা দেখতে, সেখান থেকে পথ ভুলে খাম্বার বনে, তারপর বৃহস্পতিবার বন থেকে বেরোতে পেরেছিল, যদিও কী করে শেষ অবধি হরিশের বাড়িতে পৌঁছেছিল তা আর মনে নেই।

“ক্যায়া শোচ রহে হো স্যার? তবিয়ত ঠিক হ্যায় না?”হরিশ জিজ্ঞেস করল।

“আজ শুক্রবার তো? আট তারিখ?”অত্রি জিজ্ঞেস করল।

“না তো। আজ তো সাত তারিখ, বৃহস্পতিবার। আপনি তো পরশুই এলেন স্যার, মঙ্গলবারে, “হরিশ উত্তর সিল।

“সাত তারিখ!”অত্রি ফ্যালফ্যাল করে তাকাল, তা কী করে হয়?

“এই তো দেখুন না, “হরিশ ওর মোবাইল ফোনটা দেখাল।

অত্রির মাথা টলে গেল। হরিশ না ধরে ফেললে পড়েই যেত।

হরিশ ব্যস্ত হয়ে পড়ল। অত্রিকে ধরে ধরে বিছানায় নিয়ে গিয়ে বসাল, গরম দুধ নিয়ে এসে একরকম জোর করেই খাওয়াল।

এর মধ্যে বাড়ি থেকেও কয়েকবার ফোন এসে গেল। কাল সন্ধে থেকে ফোন করেনি বলে অত্রির বাবা-মা খুব রাগারাগি করলেন।

“এবার তো ফিরতে হয় হরিশ। একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে দেবে? তাহলে সোজা মুসৌরিতে চলে যাই, “অত্রি বলল।

“আজ যাওয়া হবে না স্যার। আজ গ্রামে উৎসব আছে, ভোজ আছে। আমরা আজ আপনাকে ছাড়ব না। কাল ভোর ভোর না হয় বেরিয়ে যাবেন, “এতক্ষণে হরিশের মুখেও হাসি ফুটেছে।

“কীসের উৎসব আজ? কোনও পরবটরব?”

“না পরব নয়। তবে পরবের চেয়ে কম খুশির দিন নয় স্যার। সে অনেক কথা। আজ থেকে প্রায় আট বছর আগে আমাদের গাঁয়ের মন্দিরে চুরি হয়েছিল। মাতারানির মূর্তি ছাড়াও আরও ছোটো ছোটো দুটো পাথরের মূর্তি আছে মন্দিরে। সে দুটো নিয়ে গেছিল চোরেরা, সঙ্গে অখণ্ড জ্যোতির দিয়াও। ও দিয়া এমনি যে সে দিয়া নয় স্যার। ওরকম দিয়া কোথাও দেখতে পাবেন না। তবে চোরেরা চুরি করে পালাতে পারেনি। দু’দিন পরে খাম্বার বনের ধারে মরে পড়েছিল, মূর্তিদুটোও ছিল। গলায় ফাঁস দিয়ে মারা হয়েছিল। থানা পুলিশ হল, কিন্তু কে মারল জানা যায়নি। মূর্তিদুটো আবার মন্দিরে নিয়ে আসা হল, কিন্তু দিয়া আর পাওয়া যায়নি। গ্রামের সবাইয়ের খুব মন খারাপ হয়েছিল স্যার। সবাই এত বছর ধরে মাতারানির কাছে প্রার্থনা করে এসেছে, যেন ও দিয়া আবার পাওয়া যায়। সে দিয়া ফিরে এসেছে স্যার। দুপুরবেলায় মন্দির বন্ধ ছিল, সন্ধেবেলা পুরুতমশাই মন্দির খুলতে এসে দেখে দরজার সামনে দিয়া রাখা!”

প্রদীপ! বনের মধ্যে একটা প্রদীপ দেখতে পেয়েই তো তুলে নিয়েছিল অত্রি! কেমন কালচে লাল রঙের পাথরের প্রদীপ, গায়ে নকশা কাটা। এ তবে সেই অখণ্ড জ্যোতির দিয়া! এই কাজই তবে ওর জন্যে নির্দিষ্ট ছিল?

“একটা কথা বলো তো হরিশ, এখানে কোনও অন্ধ লোক আছে? গায়ে কম্বল জড়ানো, হাতে লাঠি, সঙ্গে একটা কুকুর থাকে?” অত্রি জিজ্ঞেস না করে পারল না।

“অন্ধাবুবা! অনেক বছর আগে ছিলেন। পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতেন। আমার বাবা একবার দেখেছিলেন। এদিকের লোকজন ওঁকে খুব মানে। ওঁর একজন চেলা ছিলেন। অনেক চিকিৎসা জানতেন। কিছু হলে গ্রামের লোকজন ওঁর কাছেই যেত। তবে উনিও এক জায়গায় থাকতেন না বেশি দিন। সাধুমহাত্মা মানুষ সব, “হরিশ দু’হাত জোড় করে কপালে ঠেকাল, তারপর অত্রিকে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু আপনি অন্ধাবুবার কথা জানলেন কী করে?”

“শুনলাম। এখানেই কোথাও, “কাঁপা কাঁপা স্বরে উত্তর দিল অত্রি।

অন্ধাবুবার সেই শিষ্যই কি অত্রির চিকিৎসা করেছিলেন? তার জন্যে কোনও কিছু নেননি তিনি, অত্রির ঠাকুরদা জোরাজুরি করলে বলেছিলেন, “ইস বার নেহি, ফির যব আয়েগা তব…”

একগাদা প্রশ্ন অত্রির মনে ভিড় করে এল। তবে সব প্রশ্নের বোধহয় উত্তর পাওয়া যায় না। সব রহস্যেরই কি কিনারা হয়? এই যেমন, ওর স্পষ্ট মনে আছে যে ও এক রাত ওই খাম্বার বনে কাটিয়েছে, সেই হিসেবে আজ আট তারিখ হওয়ার কথা, কিন্তু আজ সাত তারিখ, তাই বা হয় কী করে?

ভাবতে গিয়ে অত্রির মাথা আবার ঝিমঝিম করে উঠল। মনে হল, এসব নিয়ে আর না ভাবাই বোধহয় ভালো। এত কিছুর পরেও তো ওর কোনও ক্ষতি হয়নি, বরং দিয়া ফিরে এসেছে, গ্রামের লোকেরও আনন্দের সীমা নেই। এই যথেষ্ট, আর কী চাই?

জয়ঢাকের সমস্ত গল্পের লাইব্রেরি এই লিংকে

Leave a Reply