আজ থেকে অনেকদিন আগে, বাড়ি থেকে অনেক দূরে চাকরি করতে গিয়েছিল এক ছেলে। সেখানে ফোন নেই; ইন্টারনেট, মোবাইল তখন এ-দেশের কয়েকটা বড়ো শহরে একটুখানি উঁকি দিচ্ছে। স্মার্টফোন তখনও বিজ্ঞানীদের স্বপ্নে। বাড়ির জন্য, বন্ধুর জন্য মনকেমন করলে তখন হাতে থাকত পেনসিল আর কাগজ। তাইতে সেই ভিনজমিতে চলে যাবার কষ্ট, নতুন কাজের আনন্দ এই সবকিছু নিয়ে সে বন্ধুকে এই চিঠি লিখেছিল।

বন্ধুর চিঠি
তারিখ- ২/৯/৯৫
বাসব/রাঘব,
দুজনকে একসঙ্গে চিঠি লেখা ছাড়া গত্যন্তর দেখছি না। ছোটোলোকের চাকরি করতে এসে সময় মেলে না। আসলে সময় বড়ো ভদ্রলোক রে— এবং কিঞ্চিৎ স্পর্শকাতর। ২৩ বছর বয়েস অবধি তার প্রতি অকাতর অবহেলায়, ক্ষুব্ধ হয়ে আজ সে আমার কাছ থেকে উধাও।
আমাদের বন্ধুবর্গের, যারা বলেছিল হারুর যেদিকে পোস্টিং হবে সেদিকে বেড়াতে যাওয়া নেই, তো আমি এদিকে বহাল থাকাকালীন তাদের পক্ষে বম্বে যাওয়াই মুশকিল। কারণ তাহলে গোন্দিয়া ছুঁতেই হবে তাদের। হ্যাঁ, আমার স্টেশনের নাম গেন্দিয়া। শহর হিসেবে বড়োই, পেটের মধ্যে দুটো নৈহাটি ঢুকতে পারে, তবে তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা তো নেই-ই, গর্বও করি না, কারণ নৈহাটি নৈহাটিই!
নাগপুরের ১২৯ কিলোমিটার আগে হাওড়া-বম্বে ট্রাংক লাইনের একটা ব্যস্ত শহর। একমাত্র আর আর আই বাদে সিগন্যালিং সমস্তই এখানে মজুত আছে; প্রাচীন ও বর্তমান, ব্রড ও ন্যারো গেজ – মিউজিয়াম বলা যায়! এখানে মোট আশি কিলোমিটার রেলপথের সিগন্যালিং-এর দেখাশোনার ভার আমার ওপর। সাঁতার না কেটে ছোটার অভ্যেসটা বজায় রাখলেই বোধহয় ভালো হত। মোট ৩৯ জন স্টাফ আমার অধীনে, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন গুপিযন্তরও আছে। তাদের সামলাতে হলে দাঙ্গাবাজ জমিদারের ঘরে জন্মানো উচিত। কোনো পাতাভর্তি করা কবি অথবা বাথরুমে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইয়ের পক্ষে এ এক বিশমনি পাথরের ভার বলতে পারিস।
যদিও সত্যি সত্যি দায়িত্ব পাওয়ার পর কাজটা ভালোই লাগছে। কারণ জানতে চাইলে বলি, আমরা হলাম সেই ধরনের গোরু যাদের ল্যাজ না মুচড়োলে কিছুতেই আগে বাড়ে না। তবে, জানিস, সেদিন ভারি ফুর্তিও হল, যেন সেই ছোটবেলার এক বাঁটুল দি গ্রেট বা নন্টে-ফন্টে গোছের সাধপূরণ হল একরকম। ন্যারো গেজ লাইনে ট্রলিতে চাপার ব্যাপার আর কি – ঢালুপথে হুড়মুড়িয়ে গড়িয়ে যাওয়ার চাপা উল্লাস, ব্রেক কষে যত্রতত্র দাঁড়ানো – এসব দেখে শাগরেদরা বোধহয় একটু ঘাবড়ে গিয়েছিল। বেচারারা বুঝতে পারছিল না সিগন্যাল না ট্রলি, আমি ঠিক কী চেক করতে বেরিয়েছি!
কাজের বাইরে, পূর্ব নির্ধারিত নিষ্প্রাণ জগত। চারজন রেল-চাকুরে একত্র হলে হিসেবনিকেশ অথবা রেলসংক্রান্ত কথাবার্তা ছাড়া আর অন্য কোনও কথাই হয় না। চাকরির ভেতর রেল, বাইরে রেল, খেতে রেল, ঘুমোতে রেল, বিশ্বচরাচর রেলময়; মনে হবে যেন প্রত্যেকের পেটের ভেতর এক-একটা আস্ত রেলগাড়ি ঢুকে বসে আছে। চাকরির চরিত্র ভালো না হলে মানুষের চরিত্রটাই-বা ভালো থাকে কী করে শুনি? আমার যে কী হবে, কে জানে!
ভালো লাগছে না, কাজের বাইরে বাকি কিছুই ভালো লাগছে না রে! কোয়ার্টার পাইনি, পেমেন্টও পাইনি, অষ্ট রাহুগ্রস্ত হয়ে চিৎপাত হয়ে পড়ে আছি। এই অবধি লিখেছি, দিন তিনেকের চেষ্টায়। কে জানে, এ চিঠি আদৌ শেষ হবে কি না!
বাসব, ভোম্বলের কাছে শুনলাম তোর নাকি শরীর খারাপ হয়েছিল? অবাক কাণ্ড! অমন মনোহর কন্দর্পকান্তি যাদের তারা বড়োজোর রোগা হতে পারে অথবা মুটিয়ে যেতে পারে, কিন্তু শরীর তো খারাপ হওয়ার কথা নয়! জ্যোতিকে জিজ্ঞাসা করে দেখিস ওর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কী বলে! আমার সঙ্গে একমত হয় কিনা! ভালো কথা, তোর সেই গানের বই ছাপা কদ্দুর? বেশি রাত অবধি কাজ করে ওভারলোড নিস না। তাহলে হয়তো দেখবি পরে লোড নেওয়াটাই কঠিন হয়ে উঠছে।
রাঘব, তোর আইটিসির স্কলারশিপের কী খবর? তিনমাস তো হতে চলল। সকাল-সন্ধে ঠিকমতো রেওয়াজ করছিস তো? এখন তো আর বলতে পারবি না যে, ‘হারুদা, তুমি সারারাত আড্ডা মেরে আমার ঘুমের বারোটা বাজাচ্ছ, কাল সকালে আমায় রেওয়াজ করতে হবে – ভাল্লাগে না মাইরি!’
বহুদিন তোদের ঘুমের বারোটা বাজাই না রে… আর হয়তো কখনও সেদিন আসবেও না! কিছু কিছু কাজের জন্য জীবনের মাত্র খানিকটা সময়ই বরাদ্দ করা থাকে। তার আগে পরে তাকে আর ফিরে পাওয়া যায় না। আমি মনে রাখব তাদের। পেছনের স্মৃতি কখনও থামিয়ে দেবে যন্ত্রের কাজকর্ম। তখন হয়তো ভেতরে ভেতরে কাঁদব, আমারও কিছু বন্ধু ছিল এই ভেবে।
কাকু-কাকিমা ভালো আছেন নিশ্চয়ই, সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম মান-অভিমানে? পরে ওঁদের চিঠি লিখব। ভালো থাকিস, শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা নিস তোরা। কাকু-কাকিমাকে প্রণাম জানাস।
— হারু
পুনশ্চ- কাল ফোনে নন্দিনীর সঙ্গে কথা হল। তুই ওকে খবর দিয়েছিস শুনে ভীষণ ভালো লাগল।
পত্রালাপের informality-ই তার প্রাণ। একই ছত্রে কৌতুক ও যন্ত্রণা খুব সহজে উঠে এসেছে, মিশে গেছে। জায়গায় জায়গায় নীললোহিতের কথাও মনে পড়ল, তবে এই চিঠিতে পিছুডাকের ভার, স্মৃতির ভার হয়তো কিছুটা বেশি। খুব মনোগ্রাহী।
শুভংকর