স্মরণীয় যাঁরা- আমার সঙ্গে কাগজ কথা বলে- সুমন চক্রবর্তী-শীত ২০২৫

কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘ছাড়পত্র’-তে লিখেছেন— ‘চলে যাব তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ। প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল, এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি – নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’

বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে প্রাক শিল্প-বিপ্লবকালীন সময় থেকে বর্তমানে গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, ২১০০ সালের মধ্যে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়তে পারে আরও ২ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বর্তমান প্রজন্ম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব নয় কি আগামী প্রজন্মকে এক বাসযোগ্য পৃথিবী দিয়ে যাওয়া?

এমতাবস্থায় এই বিশ্ব উষ্ণায়ন রোধ করবার উপায়গুলির মধ্যে অন্যতম হল গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ রোধ এবং বনসৃজন। ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী, পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রিতে সীমিত রাখতে, ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন ডাই-অক্সাইড সহ অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ ৫০% কমাতে হবে। এর অর্থ বনাঞ্চল সৃষ্টির মাধ্যমে এবং বৃক্ষচ্ছেদ রোধ করে পৃথিবীতে গ্রিনহাউস গ্যাসের উৎপাদন ও অপসারণের সমতা আনা অত্যন্ত প্রয়োজন। যদি কোনও ব্যক্তি স্ব-উদ্যোগে হাজার হাজার গাছ কাটা রোধ করেন, তাকে কী বলবেন— প্রকৃতিপ্রেমী? পরিবেশ চিন্তক? নাকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ?

কাগজের ব্যবহার নানা ক্ষেত্রে সর্বজনবিদিত। শুধুমাত্র লিখতে বা ছবি আঁকার জন্য নয়, কাগজ ব্যবহার করা হয় লেখা ছাপানো এবং নানান দ্রব্যের মোড়ক হিসেবেও। প্রাচীন ভারতে লেখাপড়ার ক্ষেত্রে তালপাতা, কলাপাতা, সুপারি ও নারকেল গাছের খোসা এবং অন্যান্য নানান পত্র ব্যবহৃত হত। এইজন্যই চিঠিকে পত্র বলা হয়। কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ক্ষেত্রে তাম্রফলক অথবা অন্য ধাতুফলক, কখনও কাঠের ফলকও ব্যবহার করা হত লিখে রাখার জন্য। কাগজ প্রচলিত থাকলেও, ঊনবিংশ শতকে বাষ্পচালিত কাগজ তৈরির যন্ত্র আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে কাগজ উৎপাদনের খরচ কমে। আসে বিশ্বব্যাপী পরিবর্তন। সাশ্রয়ী উপাদান হিসেবে কাঠের পাল্প থেকে তৈরি কাগজ উৎপাদন নতুন শিল্প রূপে আবির্ভূত হয়।

এছাড়াও প্রচলিত ছিল হস্তনির্মিত কাগজ, যা একটি ঐতিহ্যগত উপাদান হিসাবে পরিগণিত হয়। মনে রাখতে হবে, হস্তনির্মিত কাগজ উৎপাদন একটি শ্রম-নিবিড়, কারিগর নির্ভরশীল কারুশিল্প। এই কাগজের টেক্সচার প্রায়শই অনিয়মিত। হস্তনির্মিত কাগজ শৈল্পিক অভিব্যক্তি এবং উৎকৃষ্ট সৃজনশীল প্রচেষ্টার জন্য একটি অনন্য ক্যানভাস। এর স্পর্শকাতর গুণাবলি এবং নান্দনিক আবেদন এটিকে শিল্পীমহলে আকর্ষণীয় করে তোলে। অন্যদিকে মেশিনে তৈরি কাগজ সামঞ্জস্য, নির্ভরযোগ্যতা এবং সাধ্যের দিক থেকে উৎকৃষ্ট। এটি বাণিজ্যিক এবং শিল্পক্ষেত্রে অপরিহার্য। হস্তনির্মিত কাগজ প্রাকৃতিক ফাইবার থেকে তৈরি, ফলে এটি গাছ কাটার প্রয়োজনীয়তা রোধ করে, বন সংরক্ষণে সহায়তা করে। উপরন্তু, হস্তনির্মিত কাগজ উৎপাদনে কম শক্তি ব্যবহার হয় বলে এটি প্রথাগত কাগজ উৎপাদনের তুলনায় কম গ্রিনহাউস গ্যাস উৎপাদন করে। এই কাগজ বায়ো-ডিগ্রেডেবল এবং পরিবেশ-বান্ধব। যারা পৃথিবী নামক গ্রহের যত্ন নেয়, তাদের জন্য এটি একটি দুর্দান্ত উপাদান। এই কাগজ ব্যবহার করে মানুষ স্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টিতে অবদান রেখে বিশ্বে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গের গুটিকয়েক হ্যান্ড মেড পেপার উৎপাদন ইউনিটের মধ্যে অন্যতম হল ‘কে. দত্ত অ্যান্ড কোং’। প্রোপ্রাইটর, শ্রী কিংশুক দত্ত। জন্ম ১৯৬০ সালের ১২ আগস্ট কলকাতার সিমলা স্ট্রিটে। পড়াশোনা স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট স্কুলে। ছেলেবেলা কাটিয়েছেন উত্তর কলকাতার ভীম ঘোষ লেনে। ১৯৮৪ সালে বিড়লা ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ডিপ্লোমা শেষ করে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন চোদ্দ বছর, ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৮। কিন্তু প্রবল ইচ্ছে, অন্যের কথায় উঠবোস না করে নিজে স্বতন্ত্রভাবে কিছু করবার। তাই জয়পুরে কুমারাপ্পা ন্যাশনাল হ্যান্ড মেড পেপার ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ১৯৯৮ সালে খাদি এবং গ্রাম শিল্প কমিশনের সাহায্যে এবং ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার সহায়তায় নিজের ব্যাবসায়িক প্রচেষ্টা শুরু করেন। হাতে তৈরি কাগজ উৎপাদনের কারখানা ‘কে. দত্ত অ্যান্ড কোং’। উত্তর চব্বিশ পরগনার মছলন্দপুর মগড়ার নিকটস্থ আটঘড়াতে ভারত সরকারে গ্রামীণ কর্ম উৎপাদন কর্মসূচির অধীনে এই কারখানা তৈরি হয় মোট ১০ লক্ষ টাকার মূলধন, কুড়ি জন কর্মী ও মাথাপিছু পঞ্চাশ হাজার টাকা বিনিয়োগ নিয়ে।

অন্যসব ব্যাবসার মতো প্রথম কয়েক বছর সমস্যা হলেও, ২০০৫ নাগাদ ব্যাবসার চাকা গড়াতে শুরু করে। প্রথম পনেরো বছরে ব্যাংকের দেনা শোধ হয়ে যায়। কারখানায় তৈরি কাগজের গুণগত মান প্রশংসিত হতে শুরু করে সর্বত্র। ক্রমশ কাগজ পৌঁছে যায় রাজভবন, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিভিন্ন অফিস, আজকের বিশ্ববাংলায়। মূলমন্ত্র, হ্যান্ড মেড পেপার তৈরির মাধ্যমে গাছ বাঁচাও আন্দোলন। ফিল্টার কাগজ, বিশোষক কাগজ, আলংকারিক কাগজ, অন্তরক কাগজ, সার্টিফিকেটের জলছাপ কাগজ— যে-কোনো রকমের হ্যান্ড মেড কাগজ তৈরি হতে থাকে কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ মন্ত্রকের অধীনস্থ এই কাগজ ল্যাবরেটরিতে।

সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই মানুষটি সদস্য ছিলেন ‘ইন্ডিয়ান পাল্প অ্যান্ড পেপার টেকনিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন’ সাহারানপুর এবং ‘রপ্তানি উন্নয়ন পরিষদ’-এর। তাঁর কোম্পানিতে তৈরি কাগজ রপ্তানি হয়েছে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডায়। অংশ নিয়েছেন খাদি এবং গ্রামোদ্যোগ বিভাগের একাধিক প্রদর্শনীতে। নিজের কোম্পানির প্রতিনিধিত্ব করেছেন সিকিম, দিল্লি, গুয়াহাটি, তিরুবনন্তপুরমে অনুষ্ঠিত নানা ন্যাশনাল এক্সিবিশনে। অংশ নিয়েছেন নিউ দিল্লির প্রগতি ময়দানে অনুষ্ঠিত ‘পেপারেক্স’ এবং মুম্বইয়ের নেহেরু সেন্টারে আয়োজিত ‘গিফটেক্স’ সম্মেলনে। মনোনীত হয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশিং হাউসের তরফে ভারতের ‘শ্রেষ্ঠ নাগরিক সম্মান’-এ। এ ছাড়াও পেয়েছেন ‘ইন্দিরা গান্ধি সদভাবনা গোল্ড মেডেল’, ‘রাষ্ট্রীয় গৌরব পুরস্কার’। ব্যক্তিগত জীবনে খেতে ভালোবাসতেন। স্কুলে পড়াকালীন প্রেম এবং সেখান থেকে বিয়ে ১৯৮৭ সালে। স্ত্রী নীলাঞ্জনা দত্ত। কলেজে পড়াকালীন হয়েছিল আরও তিন ভালোবাসা। মোহনবাগান, ছাত্র পরিষদ আর কংগ্রেস। উত্তর কলকাতা থেকে দমদম ক্যান্টনমেন্টে বাড়ি করে চলে আসেন ১৯৯২ সাল নাগাদ।

তবে নিজের কারখানায় শুধুমাত্র কাগজ উৎপাদন করেই থেমে থাকেননি তিনি। কর্মীদের এবং তাদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার দায়িত্বও নিয়েছেন। গ্রামের মেয়েরা কাজ করলেও জানত না টাকার হিসাব, চিনত না সংখ্যা। তাদের কী পারিশ্রমিক দিচ্ছেন, সেটা যাতে তারা বুঝে নিতে পারে তার জন্যে লেখাপড়া, সংখ্যা, যোগ-বিয়োগ শিখিয়েছেন। টাকা জমা রাখার জন্যে পোস্ট অফিসে অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছেন তাদের। তাঁর সংস্থার মোট কর্মীদের ৭০% মহিলা কর্মী। আজকের দিনে যেখানে মহিলা কর্মীদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা প্রশ্নের সম্মুখীন, সেখানে গ্রামের মেয়েদের নিরাপদ বাতাবরণে স্বাবলম্বী করে তুলেছেন তিনি। জাতীয় গ্রামীণ উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের অধীনে অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন সেমিনারে। কেন্দ্রীয় বাণিজ্য দফতরের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান কলকাতার ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ফরেন ট্রেড’-এ ট্রেনিং করেছেন। দাম কমানোর জন্য কটন পাল্পের সঙ্গে কখনও একটুকুও পেপার পাল্প মেশাননি। বলতেন, গুণমানের সঙ্গে কোনও আপস নয়। হস্তনির্মিত কাগজের একটি অপরিহার্য গুণ হল, সময়ের সঙ্গে কাগজটি ভঙ্গুর হয় না। তাই এই গুণটির সঙ্গে কোনও আপস করেননি। উপোস করেছেন, কিন্তু আপস নয়। এই জন্যই তাঁর কারখানায় তৈরি কাগজ থেকে নির্মিত হয়েছে বিভিন্ন পণ্য। যেমন বই, ল্যাম্প শেড, লেটার প্যাড, খাম, ফটো-ফ্রেম, কোস্টার, কনফারেন্স ফাইল, পেন স্ট্যান্ড ইত্যাদি। শুধু কলকাতার মধ্যে নয়, এইসব পণ্য ছড়িয়ে পড়েছে দেশে-বিদেশে।

কিন্তু এতে পরিবেশের প্রতি তাঁর কী অবদান? একটু অঙ্ক কষলেই বোঝা যাবে। তাঁর কারখানায় গড়ে বছরে কাগজ তৈরি হয়েছে প্রায় ৩০ টন। গত পঁচিশ বছর ধরে ধরা যায় মোট কাগজ উৎপাদন হয়েছে আনুমানিক সাড়ে সাতশো টন। একটা গাছ কাটা হলে তার থেকে ১৬ রিম কাগজ তৈরি হয়। অর্থাৎ, ১ টন কাগজ উৎপাদনে গাছ কাটা পড়ে ২৫টি। সুতরাং বলা যায়, এই মানুষটি তাঁর সুবিশাল কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে প্রায় ২০,০০০ গাছ কাটা রোধ করেছেন। ধরা হয়, একটি পরিপক্ক পাতাযুক্ত গাছ এক মৌসুমে যতটা অক্সিজেন উৎপন্ন করে, বছরে তার জন্যে ১০ জন মানুষ শ্বাস নেয়। অর্থাৎ শুধু তাঁর কাজের মাধ্যমে তিনি দু-লক্ষ মানুষের বসবাসযোগ্য করে গেছেন এই পৃথিবীকে। জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে এ কি কিছু কম অবদান?

শুধুমাত্র কারখানা নয়, পাড়ার সমস্ত সামাজিক কাজ এবং উৎসব আনন্দ উদযাপনে ছিল তাঁর অসীম উৎসাহ। বিভিন্ন বয়সের মানুষের সঙ্গে তার মতো করে মিশতে পারতেন তিনি। শরীর ভেঙে গেলেও রোজ ছুটে ছুটে গেছেন কারখানায়। বলতেন, ‘আমার সঙ্গে মেশিন কথা বলে।’ কাজপাগল লোকটা চলে গেলেন গত ১১ আগস্ট, ২০২৪। নিঃশব্দে। কিছুটা অভিমান নিয়েই। ২৩ আগস্ট ২০২৪ তাঁর শ্রাদ্ধ-শান্তির দিনেই তাঁর কোম্পানির ২৫তম বর্ষপূর্তি। অদ্ভুত এক সমাপতন!

Leave a Reply