
আজ পৌষালি অনেকদিন পরে এল। ও আমাদের পাশের বাড়ির মেয়ে, চোখের সামনে বড়ো হতে দেখেছি। আমাদের খুব ন্যাওটা ছিল। পৌষালি মেধাবী ছাত্রী, কম্পিউটার সায়েন্সে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করে এখন একটা নামি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে, একই সঙ্গে পি.এইচ.ডি-র কাজও চলছে। কাজে-কর্মে ব্যস্ত থাকায় এখন আর অত দেখা-টেখা হয় না, তবে আগের মতোই অমায়িক, হাসিখুশি আছে।
ওর কাকিমার সঙ্গে রান্নাঘরে কিছু কথা-টথা সেরে বাইরের ঘরে সোফায় এসে বসল। বলল, “কাকু, কেমন আছ বলো।”
বললাম, “ভালো আছি। তোর খবর-টবর পাই। তবে তোদের সব টেকনোলজি-টজি যেভাবে হুড়ুমতাল করে এগোচ্ছে, মাঝে-মধ্যে সব গুলিয়ে যাচ্ছে।”
ও হাসতে লাগল। বললাম, “তুই কিছুক্ষণ ফ্রি আছিস? তাহলে কয়েকটা জিনিস জেনে নিতাম।”
পৌষালি ব্যস্ত হয়ে বলল, “স্বচ্ছন্দে কাকু৷ আজ বাড়ি থেকেই কাজ করব, তাও সেরকম চাপ নেই।”
বললাম, “শুরু থেকেই শুরু করা যাক। আজকাল কৃত্রিম বুদ্ধি বা এ.আই নিয়ে এত কথা শুনি, এটা আসলে ঠিক কী? সাধারণ কম্পিউটার থেকে এটা কীভাবে আলাদা?”
পৌষালি বলল, “ভালো প্রশ্ন দিয়ে শুরু করেছ। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স শব্দবন্ধটি অনেকদিন আগে পাঁচের দশকে প্রথম ব্যবহার করেন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী জন ম্যাককার্থি৷ তার পরিপ্রেক্ষিত ছিল ভিন্ন৷ তবে ইদানীং যে এ.আই নিয়ে এত হইচই হচ্ছে, তা মূলত ডিপ লার্নিং বলে একটি প্রযুক্তি-নির্ভর। আলোড়ন ফেলে দেওয়া চ্যাট-জিপিটি বা জেমিনাইয়ের মতো সহজলভ্য সফটওয়্যারগুলি এই প্রযুক্তিই ব্যবহার করে।
“এবারে, সাধারণ বা কনভেনশনাল কম্পিউটারের সঙ্গে এর পার্থক্য কী?
“সোজা কথায়, কম্পিউটারের জন্য এতদিন প্রোগ্রাম লেখা হত এবং সেই অনুযায়ী প্রতিটি ধাপে নির্দিষ্ট সূত্র মেনে সে কাজ করে এসেছে। একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করি। আজকাল আমরা সকলেই ই-মেল ব্যবহার করি। আমরা যে মেল পাই তার মধ্যে কিছু মেলকে স্প্যাম বা জাংক বলে চিহ্নিত করা হয়। এবারে সনাতন পদ্ধতিতে স্প্যাম আলাদা করতে গেলে নির্দিষ্ট কিছু শব্দ বা ব্যবহার চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী প্রোগ্রাম লিখতে হবে৷ ধরো, মেইলে ‘লটারি’, ‘গেট রিচ’, ‘ডিসকাউন্ট’ এই শব্দগুলি থাকলে তা জাংক, তিন বা ততোধিক ব্যক্তিকে পাঠানো হলে তা জাংক বা এরকম আরও অনেক শর্ত।”
একটু থেমে সে বলল, “ডিপ লার্নিং প্রযুক্তির এইধরনের নির্দিষ্ট নিয়মের প্রয়োজন হয় না। তার শুধু তথ্য বা ডেটা নিয়ে কারবার৷ তাকে হাজার হাজার স্প্যাম মেল পড়ালে সে নিজেই এই শ্রেণির মেলের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য বুঝে নেয় এবং অনায়াসে চিহ্নিত করে দেয়৷ বলা যেতে পারে, নিজের প্রোগ্রাম সে নিজেই লেখে।
“আর একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরো কম্পিউটারকে অনেকগুলি ছবির মধ্যে একটা বিড়ালের ছবি দেখে চিনতে হবে৷ সনাতন পদ্ধতিতে আগে আমাদের বিড়ালের শারীরিক গঠনের বৈশিষ্ট্যগুলি নির্ভুলভাবে বুঝতে হবে এবং সেই অনুযায়ী প্রোগ্রাম লিখতে হবে৷ সেগুলি মিললে তবেই কম্পিউটার ছবিটি বিড়ালের বলে চিনতে পারবে। অন্যদিকে, ডিপ লার্নিং পদ্ধতিতে কম্পিউটারকে যথেষ্ট সংখ্যক বিড়ালের ছবি দেখালে সে নিজেই এই বৈশিষ্ট্যগুলি শনাক্ত করে নেবে এবং ঠিক একটি মানবশিশুর মতো বিড়াল বা বিড়ালের ছবি দেখলে চিনে নেবে।”
সে একটু থেমে আমার দিকে তাকাল। বললাম, “এ পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু এই প্রযুক্তি সনাতন পদ্ধতির থেকে উন্নত কেন?”
“তার কারণ অনেক ক্ষেত্রেই এই কার্যকারণ সম্পর্ক এত জটিল ও সূক্ষ্ম যে তা সঠিক ও সম্পূর্ণভাবে গাণিতিক সূত্র দিয়ে বুঝে ওঠা প্রায় অসম্ভব। বিড়ালের উদাহরণটা চিন্তা করো। কোনও দুটি বিড়াল কিন্তু এক নয় এবং বিড়ালের মতো দেখতে আরও অনেক প্রাণী আছে। তাই কোন কোন শারীরিক বৈশিষ্ট্য— আকৃতি, অনুপাত ইত্যাদি মিললে বা একটা সীমার মধ্যে থাকলে একটি বিড়ালকে বিড়াল বলে চেনা যাবে, বুঝতেই পারছ সেটা নির্দিষ্ট করে বলা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। ডিপ লার্নিং পদ্ধতিতে এই সমস্যা নেই, তাই সে অনেক বেশি দক্ষ। কিংবা স্প্যাম মেলের ক্ষেত্রে সনাতন পদ্ধতিতে প্রচুর ‘মার্কার’ চিহ্নিত করলেও সেগুলি এড়িয়ে কেউ মেল পাঠালে তা ধরা পড়বে না। ডিপ লার্নিং পদ্ধতিতে যেহেতু হাজার হাজার স্প্যাম মেল সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা হয়, কোনও না কোনোভাবে ধরা পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। তা ছাড়া এই পদ্ধতি নমনীয়ও বলতে পারো। নতুন পরিস্থিতি বা তথ্য সামনে এলে সে নিজেই প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করে নেবে, নতুন করে প্রোগ্রাম লেখার দরকার হবে না।”
স্ত্রী চা আর টুকিটাকি নিয়ে এসেছেন। পৌষালি তৃপ্তির সঙ্গে চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, “আহ্, কাকিমার হাতের চা অনেকদিন পরে খাচ্ছি।”
স্ত্রীকে বললাম, “তুমিও পৌষালির ক্লাসে বসে পড়ো।”
স্ত্রী বিজ্ঞানের ছাত্রী ছিলেন, কিছুদিন শিক্ষকতাও করেছেন। আমার থেকে বেশি খবর রাখেন। বললেন, “হ্যাঁ, তোমাদের কথা টুকটাক কানে আসছিল। হ্যাঁ রে পুষু, মেডিক্যাল সায়েন্সে এ.আই-র ব্যবহার নিয়ে আজকাল অনেক কথা শুনি।”
পৌষালি খুশি হয়ে বলল, “ভালো মনে করিয়েছ। সত্যিই এক্ষেত্রে সম্ভাবনা প্রচুর৷ ধরো, একটা এক্স-রে বা স্ক্যানের প্লেট দেখে অভিজ্ঞ ডাক্তারবাবুরা বিভিন্ন রোগনির্ণয় করেন৷ কিন্তু খালি চোখে যা দেখা যায় তার বাইরেও সূক্ষ্ম প্যাটার্ন বা বিপদসংকেত থাকতে পারে। এবারে এ.আই-কে হাজার হাজার প্লেট বা স্ক্যান দেখিয়ে ট্রেইন করলে সে এগুলি বুঝতে পারবে, কোনো-কোনো ক্ষেত্রে অনেক আগে রোগের পূর্বাভাস দিতে পারবে৷ এ ছাড়া এদের স্পিড ও অ্যাকিউরেসিও ধর্তব্য। ইমার্জেন্সিতে বা চাপ বেশি হলে ডাক্তারবাবুরা এ.আই-র সাহায্য নিতেই পারেন। এ ছাড়া ই.সি.জি বিশ্লেষণ করে কার্ডিয়াক সমস্যা নির্ণয় ও পূর্বাভাসের কাজও শুরু হয়েছে। আমেরিকার বিখ্যাত ক্লিভল্যান্ড ইন্সটিটিউটে এই কাজ বেশ কিছুদিন হল চলছে।”
তারপর সে বলল, “আগে কম্পিউটার যে পদ্ধতি ব্যবহার করত এবং এখনও অনেক ক্ষেত্রেই করা হয়, তাকে রুল বেসড কম্পিউটিং বলা হয়। অর্থাৎ, প্রতিটি ধাপ নির্দিষ্ট সূত্র মেনে চলবে এবং সেই অনুযায়ী সবসময়ই নির্ভুল গণনা করবে৷ কিন্তু প্রোগ্রামের বাইরে সে কাজ করবে না।”
ধীরে ধীরে ছবিটা যেন পরিষ্কার হচ্ছে। স্ত্রী কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই বললাম, “তুই যে উদাহরণগুলি দিলি, ছবি চেনা, চিকিৎসাবিজ্ঞান বা অন্যান্য ক্ষেত্রের। আবহাওয়ার পূর্বাভাসের কথাও শুনি। কিন্তু ইদানীং চ্যাট-জিপিটি বা অন্যান্য যে এ.আই-গুলি সাড়া ফেলে দিয়েছে, তারা তো বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করলে উত্তর দেয়, এমনকি কবিতা লেখে বা ছবি আঁকে বলেও শুনেছি৷ এ দুটি কি এক?”
“খুব প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন৷ উত্তর হল, দুই ক্ষেত্রেই ডিপ লার্নিং প্রযুক্তি কাজ করে, কিন্তু আলাদাভাবে৷ চ্যাট-জিপিটি বা অন্যান্য চ্যাটবটগুলি মূলত টেক্সট নির্ভর— এদের প্রচুর বই, ম্যাগাজিন বা ওয়েবসাইট পড়িয়ে ট্রেইন করা হয়। যার ফলে এরা ভাষার ঘোরপ্যাঁচ বুঝতে পারে, আমাদের যাবতীয় প্রশ্ন বুঝে ঠিক মানুষের মতো উত্তর দেয়। ঠিক একটি শিশু যেভাবে শেখে। এইভাবেই এরা অনুবাদ, সামারি করা বা নির্দেশমতো মৌলিক রচনা লেখা— এই সবকিছুই করে। আর অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের জন্য সেই বিষয় সম্পর্কিত তথ্য বা ডেটা তাকে ফিড করা হয়, যেমন আবহাওয়ার পূর্বাভাসের জন্য স্যাটেলাইট বা ওয়েদার-স্টেশন থেকে পাওয়া অনেক বছরের তথ্য ব্যবহার করা হয়। মূল ব্যাপার সেই একই, বিপুল তথ্যের মধ্যে প্যাটার্ন খুঁজে বার করা।”
তারপর সে স্ত্রীর দিকে ফিরে বলল, “কাকিমা, তোমার বোধ হয় কোনও প্রশ্ন আছে?”
স্ত্রী বললেন, “হ্যাঁ। তুই যে বললি রুল বেসড কম্পিউটিং-এ সর্বদা নির্ভুল এবং একই রেজাল্ট পাওয়া যায়, সেটা কি এ.আই-র ক্ষেত্রে নিশ্চিত নয়?”
পৌষালি হেসে বলল, “এককথায় উত্তর হল, না। ডিপ লার্নিং কোনও নির্দিষ্ট সূত্র মেনে কাজ করে না, তাই কিছুটা ভুলভ্রান্তির সম্ভাবনা থেকেই যায়। বিশেষ করে গাণিতিক ও অন্যান্য সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেশনের ক্ষেত্রে সনাতন পদ্ধতি এখনও বেশি নির্ভরযোগ্য। এ-প্রসঙ্গে পরে আবার আসব।”
এবার দুজনেরই ভুরু একসঙ্গে উপরে উঠল। পৌষালি বলল, “ভাবছ, তা হলে এত মাতামাতি কেন? আসলে যে সমস্যাগুলি সহজেই নির্দিষ্ট সূত্র ও ফর্মুলা দিয়ে চিহ্নিত করা যায়, সে-কাজে অত্যন্ত দক্ষ কম্পিউটার অনেকদিন থেকেই আছে। কিন্তু যেটা বললাম, ভাষা, প্যাটার্ন রেকগনিশন বা আরও অনেক ক্ষেত্র, যেখানে এইধরনের নির্দিষ্ট গাণিতিক সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া কঠিন, সেখানে ডিপ লার্নিং প্রযুক্তি অনেক বেশি সফল।
“একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। তোমাদের মনে থাকবে, ১৯৯৮ সালে ডিপ ব্লু বলে একটি কম্পিউটার তৎকালীন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন কাসপারভকে হারিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিল। সেটি কিন্তু সনাতন পদ্ধতিতেই কাজ করত, অর্থাৎ প্রতিটি চালের পালটা কী চাল হতে পারে সে দ্রুত হিসেব করে সিদ্ধান্ত নিত।
“তবে যেসব খেলা দাবার মতো অঙ্কের নিয়মে বাঁধা যায় না, যেমন ‘গো’ বলে একটি স্ট্র্যাটেজি বেসড গেম, সেক্ষেত্রে তুলনীয় সাফল্য পাওয়া যায় ২০১৬ সালে, যখন গুগল ডিপ মাইন্ড কোম্পানি ডিপ লার্নিং ও সমগোত্রীয় অন্য একটি প্রযুক্তি নির্ভর কম্পিউটার ‘আলফা-গো’ তৈরি করে। কিংবা তুমি যে চ্যাটবটগুলির কথা বললে, ডিপ লার্নিং পদ্ধতি ব্যবহার করেই তারা সহজে আমাদের প্রশ্ন বুঝতে ও উত্তর দিতে শিখেছে।”
সে একটু থেমে বলল, “তবে এ.আই কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সনাতন কম্পিউটিং পদ্ধতিই ব্যবহার করে। একে অপরের পরিপূরক বলতে পারো। যেমন চিকিৎসা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এ.আই-র ক্ষমতা অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও অন্য বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানেই ব্যবহার করা হয়। আবহাওয়ার পূর্বাভাসের জন্য অনেক গবেষণা করে সুপার কম্পিউটারের জন্য জটিল গাণিতিক মডেল গড়ে তোলা হয়েছে। যতদূর জানি দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসের নির্ভরযোগ্য মডেল হিসেবে এখনও এটিই ব্যবহার করা হয়। তবে স্থানীয় বা স্বল্পমেয়াদি পূর্বাভাসের জন্য এ.আই মডেল ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে৷ এটি অনেক দ্রুত ও এর জন্য সুপার কম্পিউটারেরও প্রয়োজন হয় না।”
তারপর সে ঘড়ি দেখে বলল, “এবারে যাই। পরশু আমি ফ্রি আছি, যদি আলোচনাটা আরও চালাতে চাও চলে আসব।”
স্ত্রী বললেন, “তা হলে দুপুর নাগাদ আসিস, একেবারে দুটো খেয়ে যাবি।”
দুই

মধ্যাহ্নভোজ সেরে মিষ্টান্ন-পর্ব চলছে। পৌষালির প্রিয় দোকান থেকে সন্দেশ এসেছে। আমার মিষ্টি বারণ, ওর খাতিরেই বোধ হয় একটি পেয়েছি।
খাওয়া শেষ করে তিনজনে আবার গোল হয়ে বসলাম। পৌষালি বলল, “আগের দিন যা আলোচনা হল একটু ঝালিয়ে নেওয়া যাক। তোমরা কেউ বলবে?”
প্রমাদ গুনলাম। স্ত্রী আমাকে বাঁচিয়ে দিয়ে বললেন, “মোটামুটি যা বলেছিলি, এ.আই প্রচুর ভাষা বা তথ্য নিজেই বিশ্লেষণ করে লেখা, ছবি চেনা ও আঁকা বা এক্স-রে, স্ক্যান ইত্যাদি দেখে রোগনির্ণয়ের মতো এমন অনেক কাজ করতে পারে যা সনাতন পদ্ধতিতে সম্ভব হত না।”
পৌষালি খুশি হয়ে বলল, “আসল কথাটা মনে রেখেছ। এবারে আরও একটু এগোনো যাক৷ তোমাদের কোনও প্রশ্ন থাকলে বলো।”
এবারে আমি বললাম, “জেনারেটিভ এ.আই কথাটা কালকেই একটা ম্যাগাজিনে দেখলাম। এটা কি এ.আই-র থেকে আলাদা কিছু?”
“না। জেনারেটিভ কথাটার মানে হল যে এ.আই শুধু হ্যাঁ বা না-এ উত্তর না দিয়ে নির্দেশমতো গান, ছবি বা ভিডিও ইত্যাদি তৈরি করতে পারে। আজকালকার অধিকাংশ এ.আই-ই জেনারেটিভ। কিন্তু ধরো, এ.আই-কে রোগীর চেস্ট এক্স-রে প্লেট দেখিয়ে টিবি আছে কি না জানতে চাওয়া হল। সেটা কিন্তু জেনারেটিভ কাজের মধ্যে পড়বে না।”
“কিন্তু তুই যে কাজগুলির কথা বললি, সেগুলি কি আগে করা যেত না?”
পৌষালি একটু ভেবে বলল, “গেলেও অনেক প্রাথমিক বা সীমিত পর্যায়ের ছিল। বড়োজোর একটা শেপ আঁকতে বা আড়ষ্ট কয়েক লাইন লিখতে পারত। ধরো, তুমি একটি ছেলে বা মেয়ের গম্ভীর মুখের ছবি দেখিয়ে এ.আই-কে বলছ তার মুখে হাসি ফোটাতে৷ এজন্য প্রথমে ছবিটির যাবতীয় খুঁটিনাটি ভালো করে বুঝতে ও পরে সেই অনুযায়ী আঁকতে হবে৷ এ-কাজটা ডিপ লার্নিং পদ্ধতিতেই সম্ভব।”
স্ত্রী এবারে বললেন, “মেশিন লার্নিং কথাটা মাঝে-মধ্যে শুনি। সেটা কি ডিপ লার্নিং গোছেরই কিছু?”
“ওহো, এটা মিস করে গেছি। আমরা যা আলোচনা করেছি, সবই কিন্তু একধরনের মেশিন লার্নিং অর্থাৎ কম্পিউটার নিজে শিখে কাজ করছে। মেশিন লার্নিং-এর বিভিন্ন মডেল আছে, ডিপ লার্নিং তার মধ্যে একটি। মেশিন লার্নিং-এর ব্যবহার অনেক আগেই শুরু হয়। তবে তুলনায় তা অনেক সরল ও সীমিত ছিল।”
একটু থেমে সে বলল, “এই সূত্রে একটু জটিল প্রসঙ্গে ঢোকা যাক। তোমরা হয়তো লক্ষ করেছ, আলোচনায় ‘মানুষের মতো’ কথাটা বার বার আসছে। আমাদের ব্রেনে প্রায় একশো বিলিয়ন কার্যনির্বাহী নার্ভ সেল বা নিউরোন আছে। এগুলি তাদের সংযোগরক্ষাকারী সিন্যাপ্সের মাধ্যমে নিয়ত সংকেত বিনিময় করে চলেছে। ডিপ লার্নিং বা কিছু কিছু মেশিন লার্নিং সিস্টেম অনেকটা এই নিউরোন জালিকার আদতেই তৈরি, এদের ‘আর্টিফিশিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্ক’ বলা হয়। তাদের শেখা ও বোঝার পদ্ধতির সঙ্গে ব্রেনের যথেষ্ট মিল। প্রথম নিউরাল নেটওয়ার্ক তৈরি হয় পাঁচের দশকের শেষের দিকে, ছয় ও সাতের দশকে কিছু কিছু প্রয়োগও শুরু হয়। তবে এদের কম্পিউটিং পাওয়ার ও তথ্য বিশ্লেষণ ক্ষমতা সীমিত ছিল৷ এই শতকের প্রথমে মাল্টিলেয়ার বা বহুস্তরীয় নিউরাল নেটওয়ার্ক তৈরি হওয়ার পর ধীরে ধীরে ডিপ লার্নিং প্রযুক্তির সফল ব্যবহার শুরু হয়।”
স্ত্রী বললেন, “কিন্তু চ্যাট-জিপিটি চালু হল তো মাত্র কয়েক বছর আগে।”
“হ্যাঁ, ২০২২-এ। তবে এই এ.আই চ্যাটবটগুলি কিন্তু প্রায় বৈপ্লবিক প্রযুক্তি৷ ভেবে দ্যাখো, কম্পিউটার ঠিক মানুষের মতো আমাদের ভাষায় কথা বলছে, জটিল এবং বিমূর্ত বা অ্যাবস্ট্রাক্ট প্রশ্নের নিমেষে উত্তর দিচ্ছে। এ-জিনিস কয়েক বছর আগেও কল্পবিজ্ঞানের গল্প মনে হত। আসলে টেকনোলজির মজা হল, যত অভিনবই হোক না কেন, আমরা চট করে অভ্যস্ত হয়ে যাই। যাই হোক, ডিপ লার্নিং প্রযুক্তিকেও ধাপে ধাপে এগোতে হয়েছে। ২০০৬ সালে গুগল ডিপ মাইন্ডের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী জিওফ্রে হিন্টন ও অন্য দুই বিজ্ঞানী ‘ডিপ বিলিফ নেটওয়ার্ক’ উদ্ভাবন করেন। এর সাহায্যে প্রথম মাল্টিলেয়ার বা বহুস্তরীয় নিউরাল নেটওয়ার্ককে সফলভাবে ট্রেনিং দেওয়া সম্ভব হয়। প্রথম সফল ব্যবহারিক প্রয়োগ হয় ২০১২ সালে। ‘আলেক্সনেট’ নামে একটি সফটওয়ার ইমেজ প্রসেসিং বা সোজা কথায় ছবি দেখে চেনার ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করে। অনেকেই মনে করেন, এটিই আধুনিক ডিপ লার্নিং-এর সূত্রপাত। এর পর থেকেই গুগল বা মেটার মতো কোম্পানিগুলির হাত ধরে ডিপ লার্নিং গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগ শুরু হয়। ২০১৬ সালে তৈরি আলফা-গো কম্পিউটারটির কথা আগে বলেছি। আর ২০১৭ সালে গুগল ডিপ মাইন্ডের বিজ্ঞানীরা ডিপ লার্নিং-এর জন্য ‘ট্রান্সফর্মার’ নামে যুগান্তকারী প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন। চ্যাট-জিপিটির মতো এ.আই চ্যাটবট এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেই সম্ভব হয়েছে৷ অনেকেই জানেন না, ডিপ মাইন্ডের এই দলটির নেতৃত্বে ছিলেন ভাসওয়ানি নামে এক ভারতীয় বিজ্ঞানী। আর গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন এ.আই চ্যাটবট ‘মাল্টি-মোডাল’ হয়ে উঠেছে অর্থাৎ, ভাষা ছাড়াও ছবি বা ভিডিও সহজে বুঝতে বা তৈরি করতে পারে।”
বললাম, “ইতিহাস তো বুঝলাম। এবারে একটা কথা বল, আমাদের ভাষায় অনেক জটিল বাক্য থাকে, বিভিন্ন সমার্থক শব্দ থাকে বা বাক্যে তাদের অবস্থানেরও আলাদা তাৎপর্য থাকে। বিভিন্ন ভাষার মধ্যে গঠনগত তফাতও অনেক। এত কিছু চ্যাটবটগুলি বোঝে কী করে?”
“কাকু, মোক্ষম প্রশ্ন। এর উত্তর আমিও যে পুরোপুরি জানি এমন নয়। তবু খুব সরল করে বললে, এদের ট্রেনিংয়ের সময় এত বেশি সংখ্যায় বই বা ম্যাগাজিন ইত্যাদি পড়ানো হয়, জটিল ব্যাপারগুলি এদের কাছে সমস্যা হয় না। সেই মানুষের সঙ্গে তুলনা এসে যায়। আর যদি একটু টেকনিক্যালি বুঝতে চাও, এক-একটি শব্দ বা শব্দবন্ধকে ‘টোকেন’-এ পরিবর্তন করা হয় এবং বিশেষ গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে কোনটির পর কোনটি আসবে সেটা অনুমান করা হয়। টোকেনের সংখ্যা যত বেশি হবে এ.আই-র দক্ষতা ততটাই বাড়বে। তবে ব্যাপারটি আসলে অত্যন্ত জটিল। ভাসওয়ানি ও তাঁর টিম যে ‘ট্রান্সফর্মার’ মডেল উদ্ভাবন করেছিলেন, সেজন্যই এটা সম্ভব হয়েছে৷ এঁদের একটা যুগান্তকারী রিসার্চ পেপার আছে, সেটায় মূল কনসেপ্ট ব্যাখ্যা করা আছে।”
একটু থেমে সে বলল, “আগের দিন যে কথা হচ্ছিল, তোমরা শুনলে আশ্চর্য হবে যে চ্যাটবটগুলি সাধারণ যোগ-বিয়োগও ক্যালকুলেটরের মতো নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে করে না। ধরো দুই আর দুইয়ে কত হয়, এই প্রশ্নের উত্তর কিন্তু তার কাছে একটা টোকেন মাত্র। এবার বিশাল ট্রেনিং ডেটা ঘেঁটে সে বুঝে নেয় এই টোকেনটি চার হওয়ার সম্ভাবনা সর্বাধিক। হুবহু ভাষা শেখার বা লেখার মতো। এজন্যই একটু জটিল গণনায় তার ভুল হওয়ার একটা সম্ভাবনা থেকে যায়। চ্যাটবটগুলির উন্নত মডেলে অবশ্য গণনা করার জন্য ডিপ লার্নিং-এর বদলে অন্য রুল-বেসড প্রোগ্রাম ব্যবহার করার সুযোগ থাকে। তবে এই মডেলগুলি সাধারণত ফ্রি হয় না।”
বললাম, “কিছুটা বুঝলাম। এবারে একটু আলাদা প্রশ্ন করি। আমরা যখন কাউকে মেল পাঠাই বা চ্যাট করি, তখন ইন্টারনেট সংযোগ লাগে। এ.আই ব্যবহার করতে দরকার হয় কেন?”
পৌষালি বলার আগেই স্ত্রী তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি বলি? এটা বোধ হয় যে-কোনো ওয়েবসাইট ব্যবহার করার মতো, যে-দেশে বা যেখানে এদের কম্পিউটার আছে, সেখানে পৌঁছতে হবে।”
পৌষালি খুশি হয়ে বলল, “একদম ঠিক। আমরা যখন কোনও প্রশ্ন করি, সেটা ইন্টারনেট বেয়ে এদের কম্পিউটার বা সার্ভারে পৌঁছতে হবে।”
স্ত্রী বললেন, “আমাকে একসময় স্কুলের উঁচু ক্লাসে একেবারে বেসিক কম্পিউটার পড়াতে হয়েছে, তাই অল্পস্বল্প শিখতে হয়েছিল। একটা কথা বল, এই এ.আই-র গঠন কি সাধারণ কম্পিউটারের মতোই, অর্থাৎ সি.পি.ইউ বা সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট, মেমরি, পেরিফেরাল ডিভাইস ইত্যাদি ইত্যাদি?”
“তফাত একটাই, এরা সি.পি.ইউ-এর বদলে জি.পি.ইউ বা গ্রাফিক্যাল প্রসেসিং ইউনিট ব্যবহার করে। এগুলি ডিপ লার্নিং প্রযুক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিশেষ করে এ.আই-কে ট্রেনিং দেওয়ার জন্য গঠিত। পৃথিবীতে হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানি এগুলি তৈরি করে, তাদের মধ্যেও আমেরিকার একটি কোম্পানির সিংহভাগ বাজার।”
স্ত্রী বললেন, “এই ট্রেনিং দেওয়াটা কী করে হয় একটু বলবি? আমাদের বাড়ির যে ল্যাপটপ বা কম্পিউটার আছে, সেগুলিকেও কি ট্রেনিং দেওয়া যায়?”
পৌষালি বলল, “একভাবে দেখলে, যায়। তবে এদের গতি ও ক্ষমতা তুলনায় অনেক কম, তাই খুব প্রাথমিক মডেলই সম্ভব। ট্রেনিং ব্যাপারটা আমি টেকনিক্যাল টার্মস বাদ দিয়ে সরল করে বোঝানোর চেষ্টা করছি। ধরো, একটি মডেল বৃষ্টির পূর্বাভাসের জন্য ব্যবহার হবে৷ এখানে মডেল বলতে সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার দুটোই। এবারে প্রথমে আবহাওয়া সংক্রান্ত ঐতিহাসিক ডেটা চাই, ধরো গত দশ বছরের তাপমান, আদ্রতা, বাতাসের গতি ও এরকম আরও অনেক তথ্য এবং অবশ্যই দৈনিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ।”
একটু থেমে সে বলল, “এবার ধরো প্রথমে এক সেট ডেটা মডেলটিকে দেওয়া হল যাতে যে-কোনো সাতদিনের ডেটা এবং অষ্টম দিনে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ থাকবে। মডেলটি প্রথমে অষ্টম দিনে বৃষ্টি নিছক আন্দাজ করে পূর্বাভাস করবে যেটা অবশ্যই বাস্তবে যা বৃষ্টিপাত হয়েছিল তার থেকে অনেক আলাদা হবে। এবার, এটাই গুরুত্বপূর্ণ, মডেলটি তার বিভিন্ন প্যারামিটার অ্যাডজাস্ট করতে থাকবে যার ফলে নতুন পূর্বাভাস কিছুটা কাছাকাছি হবে৷ এবার পরের সেটে আরও আটদিনের তথ্য ও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দেওয়া হবে। আবার একই প্রক্রিয়া চলবে, প্যারামিটার পরিবর্তন করা হবে যার ফলে পূর্বাভাস আরও কিছুটা মিলবে। এইভাবে বহুবার করার পর দেখা যাবে পূর্বাভাস প্রায় মিলে যাচ্ছে বা আর উন্নতি সম্ভব হচ্ছে না। এবারে ট্রায়াল থামিয়ে সাম্প্রতিক সাতদিনের তথ্য, যা তার ট্রেনিং ডেটায় ছিল না, মডেলটিকে দেওয়া হবে এবং আগামীকাল বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস করতে বলা হবে৷ উত্তর যদি নির্ভুল ও সন্তোষজনক হয়, তার প্যারামিটারগুলি ‘ফ্রিজ’ করে দেওয়া হবে এবং মডেলটির ব্যবহারিক প্রয়োগের অনুমতি দেওয়া হবে।”
সে আমাদের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, “একটু কি জটিল হয়ে গেল?”
আমি বিশেষ যে বুঝেছি এমন নয়, তবু একটা অস্পষ্ট যুক্তির কাঠামো যেন দেখতে পাচ্ছি। স্ত্রী অবশ্য খুশি হয়ে বললেন, “জটিল হলেও লজিকটা অনেকটা বুঝেছি মনে হচ্ছে। আপাতত এটুকু যথেষ্ট।”
পৌষালি মুচকি হেসে বলল, “সবই ডেটা, সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যারের খেলা৷ এর মধ্যে কোনও রহস্য, চেতনা বা বিমূর্ত কোনও গল্প নেই।”
বললাম, “সম্প্রতি চিনের একটি কোম্পানি পড়েছি সস্তায় একটি এ.আই চ্যাটবট তৈরি করে সাড়া ফেলে দিয়েছে।”
“হ্যাঁ, ডিপ-সিক। যতদূর বুঝেছি, এরা কিছু প্র্যাকটিক্যাল শর্টকাট এবং কিছু মৌলিক উদ্ভাবন করে এই মডেলটি তৈরি করেছে। হয়তো অন্যগুলির মতো বহুমুখী ও শক্তিশালী না হলেও এটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, এটি যাকে বলে ‘ওপেন সোর্স সফটওয়্যার’।”
আড়চোখে একবার স্ত্রীকে দেখলাম, তিনিও গম্ভীর। পৌষালি হাসতে হাসতে বলল, “আসলে ব্যাপারটা খুব সোজা। ওপেন সোর্স মানে এরা এদের মূল প্রোগ্রাম বা সোর্স কোড ইন্টারনেটে তুলে দিয়েছে, যে-কেউ চাইলে নিজেদের সুবিধামতো পরিবর্তন বা কাস্টমাইজ করতে পারে।”
“তাতে লাভ?”
“এ.আই চ্যাটবটগুলি এমনিতে শুধু তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতে বা ছবি-টবি আঁকতে পারে। এবার ধরো তুমি এদের সঙ্গে অন্য কোনও সফটওয়্যার, যেমন তোমার অফিসের কোনও সিস্টেম যুক্ত করে চাইছ। ওপেন সোর্স হলে এ-কাজটা তোমার সফটওয়্যার টিম নিজেরাই দরকারমতো পরিবর্তন করে নিতে পারবে। এ.আই কোম্পানিটিকে বিপুল অর্থ দিতে হবে না৷ তবে শুনেছি ডিপ-সিক আসার পর অন্য এ.আই কোম্পানিগুলিও ধীরে ধীরে সীমিতভাবে ওপেন সোর্স ভার্শন বাজারে ছাড়তে শুরু করেছে।”
তারপর সে বলল, “প্রাথমিক ব্যাপারগুলি বোধ হয় মোটামুটি আলোচনা হয়ে গেল। আপাতত এই পর্যন্তই থাক। তোমরা আরও জানতে চাইলে নিজেরা নেড়েচেড়ে দেখতে পারো, আমি তো আছিই। কয়েকটা আর্টিকল আমিও তোমাদের পাঠিয়ে দেব।”
বললাম, “দাঁড়া, এখনও তো আসল কথাই হয়নি। তুই যান্ত্রিক প্রক্রিয়া বললি বটে, কিন্তু চারদিকে তো শুনি এ.আই আরও শক্তিশালী হলে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সব সে-ই করবে, মানুষের প্রায় কোনও কাজই থাকবে না। একদিন নাকি পৃথিবী দখল-টখলও করে নিতে পারে। এসব কি সত্যি?”
পৌষালি গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল, “সত্যি বলেই তো মনে হয়। কিছুদিন আগে এ.আই ২০২৭ নামে একটি গবেষণাপত্র বেশ সাড়া জাগিয়েছে৷ লেখকরা ধাপে ধাপে এ.আই প্রযুক্তি নিয়ে সম্ভাব্য উদ্ভাবন ও আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, ২০২৭-এর শেষার্ধ থেকে পৃথিবীতে বিপুল পরিবর্তন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।”
তারপর হেসে ফেলে বলল, “কাকু, এর বিরুদ্ধ মতও প্রবল। এই খাতে কত বিনিয়োগ হবে, এ.আই-র ক্ষমতা বাড়লেও সমাজ ও বিজ্ঞানের অন্যান্য সীমাবদ্ধতা বা বাধা-নিষেধ কতটা কী থাকবে এসবও মাথায় রাখতে হবে। কিন্তু সব মিলিয়ে দীর্ঘ আলোচনা। আমরা আর এক দিন বসব।”
তারপর মুখ টিপে হেসে বলল, “মোবাইলে এ.আই-কেও জিজ্ঞেস করতে পারো, মোটামুটি একই কথা বলবে।”
একমুখ হাসি ছড়িয়ে হাত নেড়ে সে বিদায় নিল।
বললাম, “সহজ করে অনেক কিছু শিখলাম কিন্তু।”
স্ত্রী বললেন, “অবশ্যই। পুষু চাইলে ভালো শিক্ষিকা হতে পারে।”
“তুমি তো মোবাইলে এ.আই ইনস্টল করে নিয়েছ। একদিন প্রশ্ন করে দ্যাখো, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভালোমন্দ কী বলে।”
স্ত্রী বিরক্ত হয়ে বললেন, “কোনও দরকার নেই। এ.আই-র কাছে বোঝা আর মানুষের কাছে বোঝা কি এক হল?”
এবার দুজনেই হাসতে লাগলাম।
——————————–
লেখকের নিবেদন: সাধারণ পাঠকদের বোঝার সুবিধার জন্য কিছু কিছু বিষয় জটিলতা এড়িয়ে সরলভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে।
বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে