শাশ্বত করের আগের গল্প- উপন্যাস পানডুবরা, সোনার কন্যে সুলুং টুং , দাদানদার বাঁধানো খাতা

বোকা মেয়ে নিমি। বোকা নয়তো কী? নিজের নাম বলতে পারে না! নাইয়ে না দিলে তার নাওয়া হয় না, খাইয়ে না দিলে তার খাওয়া হয় না। সারাদিন নেচে নেচে ঘোরে। নাচে আর হাসে। সবেতেই তার হাসি। হাসি ছাড়া তার আর শব্দ নেই। কোনও শব্দ নেই। হাসি আর খেলায় তার দিন কেটে যায়।
সেনবাড়িতে ফুটফুটে মেয়েটা এসে উঠল তা প্রায় বছর খানেক। সেদিন ছিল মাঘীপূর্ণিমা। সেনবাড়িতে কুলদেবতার পুজো। সম্ভ্রান্ত এই বাড়িটির অনেক কিছুই সময়ের কাছে ফিরে গেছে, তবু কুলদেবতার বাৎসরিক পুজোর এই দিনটি এখনও সসম্মানে আছে। পারিবারিক আচার শেষে রীতি মেনে সন্ধেবেলা পুজো শুরু হয়, শেষ হতে হতে রাত দশটাটাক। প্রসাদ বিতরণ শেষে বাড়ির সকলের খাওয়াদাওয়া শেষ হতে আরও প্রায় ঘণ্টা দু-আড়াই তো যায়ই। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে সবাই ঘুমোতে গেলে বড়মা টর্চ হাতে সবক’টা দরজা দেখে নিজের ঘরে আসেন। পিতলের ঘটি থেকে দু-ঢোঁক মিছরির জল খান। তারপর পালঙ্কে যান।
সেদিন সবে আধখানা উঠেছেন পালঙ্কে, অমনি পিছনের বাগানে ঝুপ করে এক শব্দ। নিঝুম রাত। ঝিঁঝিঁর ডাক বুজিয়ে একটা কোকিল ডেকে উঠল। পালঙ্ক থেকে নেমে বড়মা পিছনের দিকের জানালাটা খুললেন। অমনি দমকা একটা হাওয়া একরাশ কুয়াশা ঢুকিয়ে দিল ঘরে। কই, কোথাও তো কিছু নেই! কেবল কুয়াশা যেন চুঁইয়ে পড়ছে বাতাবি ফুলের পাপড়ি থেকে। আর ভুলোটা গোয়ালের ছাতে উঠে নীচে কী যেন দেখছে। নিঃশব্দে।
জানালাটা বন্ধ করতে করতে বড়মা ভাবছিলেন এত কুয়াশা জমল কখন? এই তো সারা সন্ধে পুজো হল, এই তো খানিক আগে বাইরে থেকে এলেন, তখন তো কুয়াশা ছিল না! এসব ভাবতে-ভাবতেই বাতাবি ফুলের মিষ্টি গন্ধে ভরে গেল ঘরটা, চোখ তাঁর ভারী হয়ে এল।
পরদিন সকালে সেনবাড়ির ন’ছেলের চেঁচামেচিতে বড়মা আবার জানালা খুলে তো হাঁ! বাতাবিতলায় ফুলের পাপড়ির উপর ফুলের মতো ফুটফুটে এক মেয়ে। বাতাবির পাপড়ির মতো রঙের এক ডান্সিং ফ্রক তার পরনে। ফুলের বিছানায় সেই ফুলকুমারী তখনও ঘুমোচ্ছে। হাতে ধরা ছোট্ট একটা নিমের ডাল।
সেই থেকে এ-বাড়িতেই নিমি। সেই যে ন’কাকার কোলে চড়ে বড়মার পালঙ্কে এসে শুল, ঘুম ভাঙল সেই দুপুরে। বড়মাকে দেখেই তার একমুখ হাসি। নিমের ডাল হাতে মেয়েটার নাম বড়মাই দিয়েছিলেন, নিমি। এ-বাড়ির রীতিই তাই। বাড়ির যিনি বড়ো, তিনিই নাম দেন সবার। কম লোক তো নয় এই সেনবাড়িতে! পাঁচ ছেলে, তিন মেয়ে, দেওর, ননদ ঘর মিলিয়ে সাতাশ জন। ঠাকুর-চাকর মিলিয়ে পঁয়ত্রিশ। সবাই বড়ো। বাচ্চা খেলে বেড়ায় না এ-বাড়িতে সে কতদিন হল।
নিমিকে পেয়ে সবাই খুশি। নিমিও খুশি। সবাইকে দেখে আর হাততালি দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে ঘুরে ঘুরে নাচে। ফুলের মতো মেয়ের ফুলের মতো ফ্রক থেকে ফুলের পাপড়ির মতো চুমকি ঝরে পড়ে।
দিন যায় আদরে আদরে। রাতে ঘুমোয় বড়মার কাছে পরির গল্প শুনে। সবাই কত কথা বলে! নিমি কোনও কথা বলে না। কেবল হাসে। বৃষ্টি-ধোওয়া আকাশে একফালি চাঁদের মতো হাসি।
সে-হাসি মিলিয়ে যায় ঝগড়া হলেই। অত বড়ো বাড়ি, অত মানুষ, অত বিষয়-আশয়— ঠোকাঠুকি তো বাঁধবেই! সেনবাড়ির সুনাম তো ছিলই এই নিয়ে। লোকে বলত, ছাদ থেকে কাক-চিল না উড়লে নাকি সেনবাড়ির হাঁড়ি চড়ে না। নিমির জ্বালায় সে-সুনাম ঘুচেছে।
না ঘুচে উপায় আছে! ঝগড়া হলেই সে-মেয়ের অমন চাঁদপানা মুখে মেঘ জমে। টসটস করে দু-চোখ বেয়ে জল ঝরে। নিঃশব্দে। কার ক্ষমতা আছে সেই দেখেও ঝগড়া করে? তাছাড়া সেই মেয়ে কি এতেই থামবে? ঝগড়ারত দুজনের দু-হাত ধরে দরজা খুলে নিয়ে যাবে বাগানে। সে দিন হোক কি রাত। যাবেই। সেনবাড়ির বাগান তো নামেই বাগান। এক কালে হয়তো যত্নআত্তি ছিল, কিন্তু এখন গোলাপের ঝাড় মানে কাঁটাঝোপ, চাঁপার গা বেয়ে জার্মান লতার ঘন আবাদ, যেখানে যেমন খুশি পাথরকুচি, গাঁদা, মল্লিকা, জবার গাছ। আগাছার বাড়বাড়ন্তে ভাঙা কলশি কাঁখে পাথরের পরির ম্লান মুখ। তবুও সেখানেই যাবে। দুজনকে ঘিরে ঘুরে ঘুরে নাচবে। জানালার ফাঁক দিয়ে বড়মা দেখবেন আর হাসতে হাসতে বলবেন, ‘বেশ হয়েছে। কেমন জব্দ!’
ছোট্ট নিমির জন্য সেনবাড়িতে তাই ঝগড়ার পাট চুকেছে। ঋতু বদলের নিয়ম মেনে সেনবাড়িতে এখন ভালোবাসার দিন। সবাই সবার বন্ধু। একের কাজে এখন অন্যেরা হাত মেলায়।
আচ্ছা, তাই কি নিমির কথা কেউ আর তেমন বলে না? কই, আগের মতো তো দেখলেই মাথায় তুলে আদর করে না! রাত্রে পরির গল্প বলতে বলতে বড়মা বলেন, “নিমি-মা, তুই তো এখন এই বাড়িরই একজন রে! বাড়ির মানুষ কে কি আর রোজ রোজ কেউ মাথায় তুলে আদর করে?”
নিমির অবশ্য তাতে বয়েই গেছে। নিজের খেয়ালে অত বড়ো বাড়িটায় ঘুরে বেড়ায়। বাড়ির পুবদিকটা তো অনেকদিন আগেই ভেঙেছে, ছাত ধসে যাতায়াতের অযোগ্য। নিমিকে আটকাবে কে? তুরতুর করে কাঠবিড়ালির মতো দৌড়ায়। অমন দৌড়েই তো ভাঙা স্তূপের ভিতর থেকে সেই বাক্সটা খুঁজে এনেছে মেয়েটা। সেই বাক্স ভরতি কুলদেবতার আভরণ। বড়মার চোখে জল। ভাঙা সেই স্তূপে কেউ যায়নি এতদিন। এজমালি সম্পত্তি, কেউ সারায়ওনি।
গোটা বাগানে চরকির মতো ঘুরে বেড়ায় নিমি। ঝড় এলে নিমি আমের বাগানে, মুষলধারে বৃষ্টি এলে নিমি ভাঙা পরির ছোট্ট ছাউনিতে, ফুল ফুটলে কখনও প্রজাপতির সঙ্গে কখনও ভোমরার পিছনে, অথবা ঝোপে-ঝাড়ে কুকুরছানা, কাঠবিড়ালির ছানা, ডাহুক-বুলবুলির সঙ্গে নেচে বেড়ায়।
ধুলোয় ধুলোয় নিমির ধপধপে ফ্রকটা ময়লা হয়েছে দেখে নিমির নতুন জামা আনিয়েছেন বড়মা। দুটো। নিজের হাতে উল দিয়ে বুনেছেন গোলাপ রঙের সোয়েটার আর টুপি। তা সে-সব মেয়ে পরলে তো!
রাতটি গাঢ় হলে বড়মার বুকের কাছে পাখির ছানার মতো ঘুমোয় নিমি। মাঝে মাঝে চমকে ওঠে। বড়মা তখন একখানা হাত রাখেন ওর গায়ে। নিশ্চিন্তে সে তলিয়ে যায় ঘুমের দেশে।
কেবল আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠলে স্থির থাকতে পারে না নিমি। একটা কথা বড়মা কাউকে বলেননি। পূর্ণিমার চাঁদ উঠলে রাত-দুপ্পুরে খোলা আকাশে চাঁদ দেখতে যেতেই হবে নিমির। উথালিপাতালি করতে থাকে মেয়েটা। প্রথম প্রথম আটকানোর চেষ্টা করেছিলেন বটে, কিন্তু শব্দহীন নিমির মুখ জুড়ে কষ্টের ছাপ সহ্য করতে পারেননি। চোরা দরজাটি খুলে খোলা আকাশের নীচে এসে দাঁড়াতেন নিমির সঙ্গে।
নিমির তখন আনন্দ দেখে কে। গোল চাঁদের রহস্যময় আলোয় ফুটফুটে জ্যোৎস্নার মতো সেই মেয়ে যেন ঘুরে ঘুরে, উড়ে উড়ে বেড়ায়। নাম না জানা ফুলের মিষ্টিগন্ধ ভেসে আসে। বড়মার চোখ ভারী হয়ে আসে।
বছর ঘুরে মাঘীপূর্ণিমা এল। কুলদেবতা আজ আভরণে সেজে উঠেছেন। ষোড়শোপচারে তাঁর পুজো হয়েছে। কত মানুষ প্রসাদ পেয়েছেন। বড়মার দেওয়া চাঁপাফুলের মতো রঙের ফ্রক পরেছিল আজ নিমি, কী মিষ্টিই যে দেখাচ্ছিল ওকে। সবাই আজ বড়ো তৃপ্ত।
রাত গাঢ় হতেই ছটফট শুরু করেছে নিমি। আজ যে পূর্ণিমা। ওদিকে বড়মার শরীর আজ আর চলছে না। অবোধ মেয়ে কি তা বোঝে? চোখের কোল তার ভরে আসে জলে। গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।
হাঁটুর ব্যথায় কাতর বড়মা কোনোমতে চোর দরজা খুলে দিয়ে বলে ওঠেন, “যা। যেখানে পারিস যা।”
বাঁধনছেঁড়া পাখির মতন দরজা দিয়ে উড়ে যেতে গিয়েও একবার বড়মার মুখের দিকে তাকায় মেয়ে। কুয়াশার চাদরছেঁড়া গোল চাঁদের মতো সেই মুখের মনভোলানো হাসিতে কি কিছু কথা ছিল? কে জানে! নিমির সবই যে ফুল ফোটার মতো নিঃশব্দ।
ওর পিছু পিছু খোঁড়াতে খোঁড়াতে বেরিয়ে কোনোমতে পৈঠায় বসে পড়েন বড়মা। দুনিয়া ভেসে যাচ্ছে জ্যোৎস্নায়। বাতাবি ফুলের গন্ধ ভাসছে হাওয়ায়। চোখ ভারী হয়ে আসে। নিমি কোথায় গেল?
ডেকে তো লাভ নেই। ও-মেয়ে তো উত্তর দিতে জানে না। পায়ে আর জোরও নেই। চলে আসবে ঠিক, এই ভেবে দরজাটা খোলা রেখেই কোনোমতে ঘরে এসে ঢোকেন বড়মা। পালঙ্কে আধখানা সবে উঠেছেন, অমনি পিছনের বাগানে কোকিল ডেকে উঠল।
কোনোমতে গিয়ে পিছনের বাগানের দিকের জানালাটা খুলে দিলেন বড়মা। অমনি দমকা হাওয়া একরাশ কুয়াশা ঢুকিয়ে দিল ঘরে। বাইরে কুয়াশা স্নান করছে জ্যোৎস্নায়। জ্যোৎস্নায় ঝরে পড়ছে বাতাবি ফুলের পাপড়ি। উড়ে উড়ে নাচছে চাঁপা রঙের ফ্রক— চাঁদের মেয়ে। একা নয়। ওর মতোই যেন আরও ক’জন। জ্যোৎস্না যেন মায়ের মতো সাপটে কোলে তুলছে ওদের। হাত ধরে ধরে ঘুরে ঘুরে নাচতে নাচতে যত উপরে উঠছে ওরা, তত কুয়াশা এসে জমছে ওদের ফেলে যাওয়া পথে। কুয়াশায় মুছে যাচ্ছে জ্যোৎস্না মেয়ের দল।
জানালার শিক আঁকড়ে ধরে বুজে আসা গলায় বড়মা ডাকছেন, “নিমি! সোনা মেয়ে আমার!”
জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস